ফরিদা আখতার, গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন, ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে। অনেকগুলো বিষয় নিয়ে তাঁর আপত্তি ছিল ঐ সরকারের সময়ে। সামগ্রিক বিষয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন সংবাদ ডিজিটাল বিভাগের প্রধান রাশেদ আহমেদ।
রাশেদ আহমেদ : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তির যে সমালোচনাগুলো হচ্ছে, এটি নির্বাচনের তিন দিন আগে আপনাদের সময়ে স্বাক্ষরিত হলো। তখন কি আপনি কিছু বলেছিলেন?
ফরিদা আখতার: আসলে এটি তিন দিন আগে হয়নি। তিন দিন আগে ঘোষিত হয়েছে। মানে, ৯ ফেব্রুয়ারি তারিখে যে ক্যাবিনেট মিটিং হলো, সেদিন আমরা এটাকে অনুমোদন দিয়েছি। কিন্তু প্রক্রিয়াটা চলছিল ২০২৫ সালের মার্চ মাস থেকে, যখন নাকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা শুল্ক ঘোষণা করেছিল ৩৭ শতাংশ। এটা বাংলাদেশের জন্য তো একটা বড়... কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটা বড় বাজার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র খুব তারা যেন মানে খুব কষ্ট পাচ্ছে যে আমাদের ৮ বিলিয়ন ডলারের যে বাণিজ্য, তার মধ্যে ৬ বিলিয়ন আমরাই রপ্তানি করছি আর ওখান থেকে কিছু আমদানি মাত্র ২ বিলিয়ন ডলার আনছি। এটাতে তারা কমাবে। ফলে আমাদের অনেক কিছু ওদের থেকে আনতে হবে। এমনকী রেডিমেইড গার্মেন্ট যে আমরা এখান থেকে পাঠাবো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটা বড় বাজার আমাদের, সেটাও তারা পরিবর্তন করতে চাচ্ছে যে তুলাটা ওখান থেকে আনতে হবে। যেটা চিন্তা করেন, এত দূর থেকে এনে আমাদের ওটা দিয়ে কাপড় বুনে আবার পাঠানো, যেখানে আমি ভারত থেকে আনতে পারি, আমি পাকিস্তান থেকে আনতে পারি, অনেক কাছের দেশ থেকে আনতে পারি, সেটা আমাদেরকে করতে দেবে না।
তো এই প্রক্রিয়ার মধ্যে আমি একটা বলবো, নন-ডিসক্লোজার অ্যাক্ট, যেটা নাকি একেবারে জুন মাস থেকে চুক্তির আলোচনা হয়, যেটাতে সরকার একটা বাধ্যবাধকতায় পড়ে গিয়েছিল যে এটাকে গোপন রাখতে হবে। সে কারণে আপনারা কেউই ফেব্রুয়ারি ৯ তারিখের আগে জানতে পারেন নাই।
রাশেদ আহমেদ: আপনাদের জানানো হয়েছিলো। মানে কেবিনেটে?
ফরিদা আখতার: আগে কেবিনেটেও আলোচনা হয়নি।ঐ নন-ডিসক্লোজার অ্যাক্টটাকেই আমি আপত্তি জানিয়েছিলাম যে একজন নাগরিক হিসেবে আমি একটা চুক্তি করব অথচ আমি জনগণকে জানাবো না, এটা আমি মেনে নিতে পারি নাই। আপনারা দেখেছেন যে সে সময় প্রেস সেক্রেটারি সেটাকে আবার খণ্ডনও করেছিলেন। কিন্তু আমি এখনও সেটা মনে করি যে এটা আসলে আমাদের দেশের জন্য ক্ষতি হয়েছে। ভিতরে আমি বিশেষ করে মাংস আমদানির বিরুদ্ধে আমি মত দিই নাই। আমি বলেছিলাম এটা আমাদের খামারিদের ক্ষতি হবে এবং আমরা নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তার দিক থেকেও রিস্ক আছে। কারণ মাংস একটা জীবন্ত জিনিস। ঐটা আসবে, এত দূর থেকে আসবে, ঐটা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য কেমন হবে? ওখানে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড ভুট্টা এবং সয়াবিন খাওয়ানো গরুর মাংস আসবে। এগুলো নিয়ে আপত্তি করেছিলাম। কিন্তু অবশ্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তো আমাদের সরকার... মানে সেই হিসেবে দুর্বল ছিল।
রাশেদ আহমেদ : ওরা এতটাই দুর্বল ছিল যে দেশের স্বার্থের বাইরে গিয়ে এগুলো করতে হবে?
ফরিদা আখতার: হ্যাঁ, সেটা সবচেয়ে ভালো হতো যদি এটাকে ওপেন করা যেত। জনগণের একটা মতামত নেওয়ার যদি সুযোগটা রাখা যেত, তাহলে এই দুর্বলতাটা... আসলে কি হয় আপনাকে যদি আমি বন্দী করে কোথাও কিছু করি, তাহলে আপনি তো অলরেডি দুর্বল হয়ে গেলেন। কিন্তু আপনি যদি বাইরে এসে আর দশজনের সামনে বলতে পারতেন যে 'আমি এই চুক্তি করতে যাচ্ছি, আপনারা কী বলেন?', তাহলে কিন্তু এই দুর্বলতাটা থাকত না। আমরা নন-ডিসক্লোজার অ্যাক্ট করার কারণেই দুর্বল হয়েছিলাম।
রাশেদ আহমেদ : এটা কে করল, নন-ডিসক্লোজার অ্যাক্ট?
ফরিদা আখতার: এটা তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সাথে শুধু না, সবার সাথেই করেছে। এবং এই পলিসিটাই আমাদের জন্য ক্ষতি হয়েছে আর কী।
এখানে আপনারা ষড়যন্ত্র দেখেন না। কারণ ষড়যন্ত্র করে অন্তর্বর্তী সরকার যে দেশের ক্ষতি করার পরিকল্পনা করেছে, তা না। মানে, ৩৭ শতাংশ শুল্ক থেকে বাঁচার জন্য, যদি এটা না করত, চুক্তিটা না করত, তাহলে ঐ যে শুল্কে ফেরত যেতে হতো। যেটাকে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বলা হচ্ছে। সেটাতে যদি ফেরত যেত, তাহলেও কিন্তু আবার জনগণ বা এখন আপনারা সবাই বলতেন যে 'আপনারা একটা চুক্তি করলেই পারতেন, এই যে এখন এত বড় শুল্কের বোঝায় পড়ে গেল।' সেটা একটা বিষয় ছিল। মানে... অন্তর্বর্তী সরকারের হাতটা অনেকটা বাঁধা ছিল।
রাশেদ আহমেদ : আপনি বললেন যে এটা ষড়যন্ত্র নয়, ষড়যন্ত্র দেখতে চান না। কিন্তু দেশের তো বিশাল একটা ক্ষতি হয়ে গেছে।
ফরিদা আখতার: ক্ষতি হয়ে গেছে। বললাম তো, দুইটা অপশন ছিল। হয় শুল্কে ফেরত যাওয়া, উচ্চ শুল্কে, ৩৭ শতাংশ। তো এখন যেমন ১৯ শতাংশে আসছে। তো ১৯ শতাংশ বনাম ৩৭ শতাংশ তখন আবার জনগণ সমালোচনা করত।
আর একটা জিনিস যেটা অনেকে খেয়াল করেন না, আসলে ধরেন, ঐ চুক্তিটা অন্তর্বর্তী সরকার করেছে বলা হলেও, বর্তমানে বিএনপি সরকার এবং বিরোধী দলে যারা আছেন, তাদের মতামত নিয়েই তো করা হয়েছে। যদি মতামত তারা না দিতেন, তাহলে এখন কেন তারা সংসদে তুলছেন না? তাদেরই তো হাতে সবচেয়ে বড় শক্তি। তারা আর কিছু না হোক সংসদে তুলুক। বুঝছেন? সংসদে তুললেও তো জনগণ জানতে পারত এবং এখানে যেহেতু বিরোধী দলও কিছু বলছে না এবং তারা আসলে সম্মতি দিয়েছিল বলেই অন্তর্বর্তী সরকার করতে পেরেছিল।
রাশেদ আহমেদ : আপনি কি নিশ্চিত তারা সমর্থন দিয়েছিল?
ফরিদা আখতার: হ্যাঁ, এটা তো খলিলুর রহমান সাহেব বলেছেন। আমি নিশ্চিত হওয়ার বিষয় না, খলিল সাহেবই বলেছেন।
এটাতে মেইন ভূমিকাটা রেখেছিলেন খলিলুর রহমান, যিনি প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ছিলেন। এবং দেখেন বিএনপি তো তাঁকে পররাষ্ট্র মন্ত্রীও করে নিলেন। তো এইখানে পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে কি আরেকটা দৃশ্য আপনাদের সামনে ভেসে ওঠে না যে এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র... দলগুলো হাতে রাখতে চেয়েছে। তারা যেমন অন্তর্বর্তী সরকারকে চাপ দিয়েছে, তেমনি এই দলগুলোকেও চাপ দিয়েছে। ঐ চাপ অব্যাহত আছে। যদিও এই সরকার চাইলে করতে পারত একটা হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের চুক্তি আমরা মানি না, কারণ অনেকগুলো তো তারা বাতিল করেছে। অনেকগুলো আমরা অধ্যাদেশ করেছিলাম ওগুলো বাতিল করেছে, এটাও বাতিল করে দিত। তাদের তো সেই ম্যানডেট আছে। তারা ঐটা তো করেই নাই, তারা... এখানের চুক্তিতে দুইটা ধারা আছে, মডিফাই করা যায় কিংবা ক্যানসেল করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট যেখানে বলেছে যে ট্রাম্প এটা ঠিক করে নাই, তাহলে সেটারও তো সুযোগ নেওয়া যেত যেটা মালয়েশিয়া নিয়েছে। তাহলে কেন এটা এখন অন্তর্বর্তী সরকারের উপর শুধু এককভাবে পড়ে?
রাশেদ আহমেদ : কিন্তু সংকটের সময়ে আপনারা সমস্ত political দলগুলোর সঙ্গে মিটিং করতেন, প্রধান উপদেষ্টা মিটিং করতেন, এটা আমরা দেখেছি। এরকম একটি ক্রাইসিস তৈরি হয়েছে, সেটাও সবাইকে ডেকে আলোচনা করা যেত না?
ফরিদা আখতার: সবাইকে ডেকে করা হয়নি ঠিকই, কিন্তু খলিল সাহেবের... কারণ এটা তো ওয়াশিংটনে ওরা গিয়ে করেই ছিল অনেকটা বলতে গেলে ডিসেম্বর-জানুয়ারি পুরাটাই কেটেছে ঐ চুক্তির কারণে। আমার মনে হয় সম্ভবত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও চেয়েছে যে কারা ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে তাদের মতামতটা নিয়ে ফেলা বা তাদেরকে অন বোর্ড করা। তো তারা সেটাই করেছে। এখন হয়তো ছোট দলগুলোর সাথে ওরা চুক্তিটা শেয়ার করেনি। কিন্তু বিএনপির ক্ষমতায় আসার চান্স আছে, তাহলে বিএনপির সাথে করেছে। জামায়াত বা জোট হিসেবে ওরা যদি মেজরিটি পায়, হতে পারত, তাহলে তাদের কাছে করেছে, কিংবা তারা বিরোধী দল বা সরকারি দল তো হবেই একটা কিছু, দুইটা মিলেই তো সরকার। তো কাজেই এখন দেখেন সেটার রূপ আমরা দেখতে পাচ্ছি। আমি বরং এখনকার সরকারকে বলবো যে আপনারা আপনাদের দায়িত্ব পালন করেন। কারণ আপনারা সরাসরি জনগণের ভোটে আসছেন, আপনাদের দায়িত্ব আছে। আমাদের যে দায়, সেটার ভুলত্রুটি সমস্ত মেনে নিচ্ছি। কিন্তু এটা তো এখন আপনাদের হাতে, সেটা কেন আপনারা করবেন না?
রাশেদ আহমেদ : আপনি কি বলতে চাচ্ছেন যে কোনো কন্ডিশনের মধ্য দিয়ে এই বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে?
ফরিদা আখতার: সেটা বলাটা ঠিক হবে না, আমি ওভাবে করে বলবো না। কিন্তু তারা জেনে আসছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এটা সেভাবে করিয়েছে।
রাশেদ আহমেদ : ঐটাতে আপনি শুধু আমদানির কথা বললেন, মাংসের বিষয়ে বললেন, যেহেতু ঐটা আপনার মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছিল..
ফরিদা আখতার : না, রপ্তানির ক্ষেত্রে যেমন আরএমজি রপ্তানির ক্ষেত্রে কন্ডিশন হলো যে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা এনেই তারপর দিতে হবে। আর আমাদের ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিও কিন্তু অনেক এফেক্টেড হবে, তারপর ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস আমরা দিতে পারবো না, ওদের ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস মানতে হবে। তারপর আমাদের যে টেস্টিং ফেসিলিটিগুলো আছে ওগুলোকে তারা গুরুত্ব দেবে না, তাদেরটাকেই গুরুত্ব দিতে হবে। মোট কথা হলো পুরা অর্থনীতির একটা ভিতকে তারা মানে দখলে নিয়ে নিয়েছে আর কী। এটা আমার কাছে মনে হয় যে খুবই বড় ধরনের একটা ক্ষতি।
রাশেদ আহমেদ : অনেক কিছু আমদানি করতে হলে তাদের পারমিশন নিতে হবে, এরকম একটা...
ফরিদা আখতার: চীনের সাথে আপনি যদি কিছু করতে যান, সেটা পারবেন না। বোয়িং ওদের কাছ থেকেই নিতে হবে, মানে আরও অনেকগুলো সেক্টর আছে। আপনি অন্য কোনো দেশের সাথে চুক্তি করতে গেলেও তাদের পারমিশন লাগবে। তাহলে কি পুরা সার্বভৌমত্ব এখানে থাকছে না। অর্থনৈতিক কোনো সার্বভৌমত্ব এখানে থাকছে না।
রাশেদ আহমেদ : এটা কি কিচেন ক্যাবিনেটে আলোচনা হয়েছিল?
ফরিদা আখতার: সেটা যেহেতু আমি কিচেন ক্যাবিনেটে ছিলাম না, আমি তো বলতে পারবো না। কিন্তু আমার মনে হয় ছোট ছোট ভাবে... খলিল সাহেব বিভিন্ন জনের সাথে আলাপ করেছেন, প্রধান উপদেষ্টা সহ, এবং যেখানে করার করেছেন ঐটা।
রাশেদ আহমেদ : কিচেন ক্যাবিনেটে কারা ছিলেন?
ফরিদা আখতার: আমি সেটা জানি না।এরকম তো কিচেন ক্যাবিনেট বলে কোনো শব্দ তো আমরা ঐ সময় থাকাকালীন শুনি নাই। আমরা এটাই জানতাম যে একটা আলাদা মিটিং কখনো কখনো হয়, এটা ইস্যু বেইজড হয়। কিন্তু কিচেন ক্যাবিনেট একটা শব্দ বা ঐটা ধরে... আমরা ক্যাবিনেট মিটিং জানতাম, কিচেন ক্যাবিনেট জানতাম না।
রাশেদ আহমেদ : পরবর্তীতে তো শুনেছেন, একটা কিচেন ক্যাবিনেট ছিল।
ফরিদা আখতার: শুনেছি, কিন্তু কিচেন ক্যাবিনেট ঐটা অনেকেই আখ্যায়িত করছেন। কিন্তু আমি এটাকে কিচেন ক্যাবিনেট বলতে চাচ্ছি না এজন্য যে কিচেন ক্যাবিনেট বলতে যেটা আন্তর্জাতিকভাবেও বোঝা যায়, এখন যেমন অনেকে বলছেন না যে কিচেন ক্যাবিনেট তো সারা বিশ্বেই আছে, এটাতে অসুবিধাটা কী? এরকম সরকার প্রধান যদি চান তো করতেই পারেন, অন্যায় তো কিছু নাই। কিন্তু কথা হলো যে এই ঘোষণাটা তো আমরা শুনি নাই যে এই কয়েকজন আলাদা করে সবসময় বসবে এবং তারাই কিছু সিদ্ধান্ত নেবে যেগুলো ক্যাবিনেট মিটিং থেকে আলাদা হবে। এটা আমরা থাকতে শুনি নাই, কাজেই আমি ঐটা ওভাবে বলতে চাচ্ছি না।
রাশেদ আহমেদ : কিন্তু অনেকে স্বীকার করছেন যে কিচেন ক্যাবিনেট একটি ছিল।
ফরিদা আখতার: ছিল, বলছে তো। আমি বললাম তো, কিছু উপদেষ্টা আলাদা করে বসতেন, সেটা একটা ফিক্সড গ্রুপ ছিল কিনা সেটাও আমরা জানি না, আবার কম-বেশিও ছিল, এটাই আর কি। তো আমি কাজেই কিচেন ক্যাবিনেটের ব্যাপারটা আমি... যদি যেহেতু ঐ সময় যদি শুনতাম ওভাবে, তাহলে নিশ্চয়ই আমাদের একটা প্রশ্ন ক্যাবিনেটেও আমরা তুলতে পারতাম। যারা বলছেন তারা ক্যাবিনেট মিটিংয়ের দিন ঐটা তুললে ভালো হতো যে 'আমরা শুনছি একটা ছোট্ট গ্রুপ আপনারা বসেন, তাহলে কী সিদ্ধান্ত...'
রাশেদ আহমেদ : পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদুল ইসলাম বলেছেন যে কিচেন ক্যাবিনেট একটি ছিল। আকস্মিকভাবেই কোনো একটি কিচেন ক্যাবিনেটের মিটিংয়ে তিনি কোনো একটি কাজের জন্য উপস্থিত হয়েছিলেন এবং তিনি তখন জেনেছেন, কিন্তু নামগুলো বলেন নাই। তো এইরকম কোনো কিছু কি আপনার ক্ষেত্রে ঘটেছিল?
ফরিদা আখতার: না, আমার ক্ষেত্রে ঘটেনি।আমি বারবার একটু আপনাদেরকে অনুরোধ করবো যে ক্যাবিনেটে যে আমরা সিদ্ধান্তগুলো নিতাম ওটার দিকে গুরুত্ব দেয়া। কারণ ক্যাবিনেটে আমরা যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে যেতাম এবং প্রস্তুতি নিয়ে আমরা তর্ক-বিতর্কও করতাম।
ওটা রিয়েল সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটা প্রক্রিয়া ছিল। যেমন আইন মন্ত্রণালয় থেকে কিছু উত্থাপিত হলো, আমরা আইন মন্ত্রণালয় না হলেও আমরা কিন্তু পড়ে যেতাম এবং যেটা আমাদের কাছে ক্লিয়ার হতো না আমরা সেটা প্রশ্ন তুলতাম। আইন উপদেষ্টাকে সেটা পরিষ্কার করতে হতো। সিদ্ধান্ত একেবারে যতক্ষণ না আমরা সবাই মিলে বলছি যে এটা হোক, ততক্ষণ হয়নি। কোনো কোনো সময় কোনো অধ্যাদেশ ফেরতও পাঠানো হয়েছে।
রাশেদ আহমেদ : আপনাদের সময় দেখা গেল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আঘাত করা হলো, ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হলো, বঙ্গবন্ধুর বাড়ি নষ্ট করা হলো, আপনারা নিশ্চুপ ছিলেন।
ফরিদা আখতার: এটার দায় শেখ হাসিনার। হাসিনার দায় কেন বলবো? হাসিনা এমন এমন কথা বলেছে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, এই নামেই যদি বলি, তাঁকে পচিয়েছে কে? হাসিনাই তো পচিয়েছে। না হলে দেখেন এত ভাঙচুর যেখানে একেবারে জেলা পর্যায়েও মূর্তি ভাঙা হলো, কোনো জনগণ কি আফসোস করছে? মানে আওয়ামী লীগ ছাড়া? কাজেই আমার মনে হয় যে এটা শেখ হাসিনার দায়।
রাশেদ আহমেদ : জনগণ তো সন্ত্রাসের কাছে অসহায়।
ফরিদা আখতার: এটা সন্ত্রাস কি ছিল? মানে এটা তো জনগণের অভ্যুত্থানের একটা অংশ ছিল, বুঝছেন? সন্ত্রাস বললে আমি মনে করি যে আপনি এটা একটা ভুল টার্ম ব্যবহার করলেন।
রাশেদ আহমেদ : তাজউদ্দীনের ভাষ্কর্য ভাঙা হলো, অনেক মুক্তিযোদ্ধার ভাষ্কর্য ভাঙচুর হলো...
ফরিদা আখতার: এগুলো তো ধরেন যেকোনো একটা অভ্যুত্থানের পরে বা একটা বড় ধরনের পরিবর্তনের পরে অনেক কিছুই এদিক-ওদিক হবে, এটা সবকিছু নিশ্চয়ই কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো নির্দেশের প্রেক্ষিতে হয়নি। তাই না? কাজেই এখানে যে যেখানে যেটা মনে করেছে, তাজউদ্দীনকে চিনেই ভাঙছে কিনা কে জানে, ঐটা আওয়ামী লীগ ভেবে তো করেছে। তো এই যে ভাঙচুরগুলো সব দায়দায়িত্ব কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের ছিল না। এটা হাসিনারই যে কথাবার্তার কারণে যেভাবে মানুষের ক্ষোভ ছিল, সেটারই ধারাবাহিকতায় এটা হয়েছে, আমি বলবো।
৩২ নম্বরের ভাঙার ক্ষেত্রেও হাসিনা কিন্তু ঐ দিন যদি একটা বক্তব্য যে 'আসছে' বা ওরকম না বলত, তাহলে কিন্তু এরকম একটা অবস্থা তৈরি হতো না । আমি মনে করি যে এখানে অন্তর্বর্তী সরকারের ফেইলুরের মধ্যে বা ব্যর্থতার মধ্যে এটাকে আমি রাখতে রাজি না।
এটা জনগণের একটা স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া ছিল। তারা এটা করেছে এবং সেটা একটা হাসিনা যাওয়ার পরে কি মানুষের ক্ষোভ কি প্রশমন সাথে সাথে তো হয়নি। তো কাজেই সেটাকে আমরা মনে করি যে এইটা ফ্যাসিবাদেরই একটা ধারাবাহিকতায়...
রাশেদ আহমেদ : কাজগুলো ঠিক হয়েছিল কিনা?
ফরিদা আখতার: সবগুলো ঠিক হয়নি, ভাঙচুর তো সব ক্ষেত্রে ঠিক হয় না। কিন্তু এখন আলাদা করে কোনটা ঠিক হয়েছে কোনটা ভুল হয়েছে, এটা আমি বলতে পারবো না।
২৪-এর যে অভ্যুত্থান, সেটাকে অনেক সময় ৭১ মাইনাস করে করার চেষ্টা করা হয়। অনেকে কিন্তু এরকম একটা চিন্তা আনতে চায়। যেহেতু তরুণরা যারা করেছে তারা তো ঐ সময় জন্মই হয়নি।
তো তারা ২৪ দেখেছে, ৭১ দেখেনি। কিন্তু ৭১-কে বাদ দিয়ে ২৪ চিন্তা করারও কি কোনো জায়গা আছে? কিন্তু যেহেতু আমাদের এখন একটা গোষ্ঠী ৭১-এ তাদের ভূমিকাটা ভিন্ন রকম ছিল, তারা ঐ বয়ানটা অনেক সময় হাজির করতে চায় যে ২৪ বেশি গুরুত্বপূর্ণ, ৭১ না। যেহেতু ঐ সময় আরো ভারত টারত এগুলো নানান রকম বিষয় আছে। তো আমার কাছে মনে হয় যে এটা একটু উদ্বেগজনক।
রাশেদ আহমেদ : কাদের কথা বলছেন?
ফরিদা আখতার: এখানে জামায়াতে ইসলামী আছে, ধর্মীয় অনেকগুলো রাজনৈতিক দল আছে। তাদের প্রত্যেকের মধ্যেই একটা টেনডেন্সি আছে যে ৭১...বা ৭১-কে তারা এমন ভাবে ইয়ে করে যে ধরেন ৭১ যদি বলি, জামায়াতে ইসলামীর কথাই যদি বলি, তারা যদি নিজেদের ভূমিকা নিয়ে যদি একটা ক্ষমা চেয়ে বলতে যে 'হ্যাঁ ৭১-এ আমরা এই ভুল করেছি, এটা আমাদের করা ঠিক হয়নি।' বিশেষ করে আমরা নারীরা বলবো যে এত নারী, ২ লক্ষ আড়াই লক্ষ নারী যেখানে ধর্ষিত হয়েছে, সেই ৭১-কে কোনোভাবে অন্যভাবে তুলে ধরবে, এটা তো মেনে নেয়া যায় না। ৩ লক্ষ শহীদের কথাও আমরা অন্যভাবে মেনে নিতে পারি না। সেখানে তারা কেউ শহীদের সন্তান কেউ শহীদ পরিবারের সন্তান, এরকম করে আবার অন্য দিকে নিতে চাওয়া, এটা আমি মনে করি যে বরং এটা আরও বেশি ভালো হয় যদি ৭১-এ যে ভূমিকাই ছিল, সে সময়কার জন্য যদি সঠিকও হয়, এখন যদি মনে করে যে ওটা ঠিক ছিল না, সেটা স্বীকার করা।
রাশেদ আহমেদ : কিন্তু ঐ সময় আপনাদের সরকারের সময়ে তো আপনারা এটাকে রিকগনাইজ করেছেন।
ফরিদা আখতার: আমরা রিকগনাইজ করেছি একটা রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদেরকে রিকগনাইজ করা হয়েছে। তাদেরকে তো ৭১-এর ভূমিকাটাকে রিকগনাইজ করা হয়নি। ৭১-এর ভূমিকায় যে তাদের ছিল, ভূমিকা ছিল, সেটা তো আমরা বলি নাই যে তারা ওটা ঠিক করেছে। আমরা যেহেতু ঐটা তারা একটা বৈধ রাজনৈতিক দল হিসেবে এসে গেছে সবার সামনে...
রাশেদ আহমেদ : না, ঐ সময় বৈধ ছিল না।
ফরিদা আখতার: বৈধতা পেয়েছে নির্বাচন কমিশনের কাছে, পরে।
রাশেদ আহমেদ : পরবর্তীতে...
ফরিদা আখতার: পরবর্তীতে পেয়েছে। হ্যাঁ, সেটা বলছি তো। সেটাই এই ধারাটাই আমার কাছে... আমি এখন ব্যক্তিগতভাবে আমার মনের কথা বলছি যে এটা একটা যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, এটা সামনের দিকে যদি চলতে থাকে, এটা আমাদের জন্য ভালো হবে না। আরও ব্যাপারটা হলো কি যে দেখেন এরাও কিন্তু বিদেশী শক্তিরও সহায়তা নেয়। এরাও মানে এরা শুধু দেশের জনগণের উপর নির্ভরশীল হয়ে কিন্তু তারা তাদের কাজ করছে না। এখানেও আবার বিদেশী শক্তির একটা খেলা আছে। তো সেইসব দিক বিবেচনা করলে আমাদের একটু সতর্ক হওয়া দরকার আছে।
রাশেদ আহমেদ : কিন্তু ঐ সময় তাদেরকে রিকগনাইজ করার কথা তো বললাম। এবং সেটা অন্যভাবেও হয়েছে আপনাদের সময়ে। রিসেট বাটনের চাপ দেয়া এসব কথাবার্তা হয়েছে, যেটার মধ্যে...৭১-কে ভুলে যাওয়ার বিষয়টা আসে।
ফরিদা আখতার: না, রিসেট বাটন... আমার মনে হয় না। আমার মনে হয় রিসেট বাটনকে ওভাবে ব্যাখ্যা একটু বেশি করা হয়েছে। রিসেট বাটন মানেই ৭১ চেঞ্জ করে অন্য কিছু সেট করা, তা না। এটা আমি... আমি বলবো না ঐটা রিসেট বাটনের কথা এভাবে বলা
রাশেদ আহমেদ : ৭১-কে আলোচনায় না আনা, ৭১-কে ভুলে যাওয়ার এইরকম একটা ব্যবস্থা ছিল?
ফরিদা আখতার: আমাদের উপদেষ্টা কমিটিতে ম্যাক্সিমাম ছিল যারা ৭১-এর ব্যাপারে কোনো... ম্যাক্সিমাম কি সবাই, ৭১-এর ব্যাপারে কোনো কম্প্রোমাইজ করবে না। কোনোভাবেই না। কাজেই এটা আমি বলতে পারি যে এখানে কোনোভাবে...
রাশেদ আহমেদ : এইসব যখন আলোচনা হলো, তখন কি আপনারা ক্যাবিনেটে এগুলো নিয়ে উত্থাপন করেছিলেন?
ফরিদা আখতার: হ্যাঁ। উত্থাপন হয়েছে। ৭১-এর ব্যাপারে তো যখনই আলোচনা হয়েছে তখন তো এই আলোচনাই হয়েছে, ৭১-এর পক্ষে আলোচনা হয়েছে। ৭১-এর অন্যরকম কোনো চিন্তা থাকলে সেটাকে সমালোচনা করা হয়েছে।
রাশেদ আহমেদ : কী ধরনের সমালোচনা করেছে? আপনি কী ধরনের... সমালোচনা করেছে?
ফরিদা আখতার: এত কিছু... এত কিছু বলা যাবে না, আর এত কিছু আমার মনেও নাই। কারণ কনটেক্সট ওয়াইজ তো বলতে হবে। এত কিছু আমি বলতে পারবো না, এটা আমার... আমি মনে করি বলাটা ঠিকও হবে না। মানে এটা এখনও বলার সময় হয় নাই, এই বিষয়টা।
হ্যাঁ, আর আমার সত্যি কথা বলতে কি, এগুলো একেকটা বিশেষ কনটেক্সটে তো ঘটনাগুলো এসেছে, তখন কে কী বলছে, এখন যদি আমি আবার বলতে যাই হয়তো আমার সঠিকভাবে বলা নাও হতে পারে।
রাশেদ আহমেদ : সামগ্রিকভাবে যদি বলি আপনাদের ঐ সরকারের সময়, ইউনুস সরকারের সময়, এটার সফলতা-ব্যর্থতা মূল্যায়ন করতে বললে আপনি কিভাবে করবেন?
ফরিদা আখতার: আমি বলবো গণঅভ্যুত্থানের পরে যে একটা সরকার গঠনের প্রয়োজন ছিল এবং সে সময় যারা যুক্ত হয়েছেন, অধ্যাপক ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে যে হয়েছে, তো সেখানে এই যে প্রথমে এসে আন্তর্জাতিক একটা স্বীকৃতিটা যে পাওয়া গেল বা সে সময় একটা প্রশ্ন ওঠেনি যে এই সরকারকে আমরা নেব কি নেব না, অন্য কেউ আসলে প্রশ্ন উঠত কিনা আমার মনে হয় যে উঠত, হ্যাঁ? তো সেজন্য ডক্টর ইউনুসের নেতৃত্বে যে সরকার গঠিত হয়েছিল ওটা ঠিকই ছিল। ওটা আমি মনে করি যে শপথ গ্রহণটা হয়তো ঠিক ছিল না। ওটা হয়তো আমরা আরেকটু যদি সঠিকভাবে সংবিধানের প্রশ্ন, বিশেষ করে রাষ্ট্রপতির শপথের হাতে শপথ গ্রহণটা, এটা খুবই আমাদের জন্য বড় মানে ক্ষতি ঐদিনই হয়ে গেছে।
তারপর যেটা হলো যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, আমি তো বারবার বলছি যে আমরা যেভাবে যে অবস্থায় পেয়েছি, মানে ধরেন মন্ত্রণালয়গুলোতে কী? আপনি যদি একটা কর্মকর্তার সাথে কাজ করতে যান, হয়তো প্রশ্ন আসবে উনি দোষর না হলে বঞ্চিত। বুঝছেন? এতদিন বঞ্চিত ছিলাম তাই ওনাকে আবার আনতে হবে আর না হলে উনি দোষর ওনাকে বাদ দিতে হবে। এই দোষর বাছাই করা কে দোষর কে ভিতরে কী, এই যে ফ্যাসিবাদ তো শুধু হাসিনা চলে গেলে তো হেলিকপ্টারে তো সবার জায়গা হয় না, সবাই তো আর যায় না। বাকিরা তো সবাই ছিল এবং তারা নানা ফর্মে কিন্তু তাদের রূপও অনেক সময় দেখাচ্ছিল। অনেকগুলো কিন্তু এখানেও একটা সংকট ছিল। তো এজন্য বলছি যে ব্যর্থতার দায়টা দেয়ার আগে আমাদেরকে এটাও ভাবতে হবে যে আমরা কোন অবস্থায় কাজটা করেছি।
রাশেদ আহমেদ : আপা, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদের সময় দেয়ার জন্য।
ফরিদা আখতার: জি, অনেক ধন্যবাদ। আমিও কথা বললাম, অনেক আনন্দ পেলাম।

সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ জুলাই ২০২৬
ফরিদা আখতার, গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন, ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে। অনেকগুলো বিষয় নিয়ে তাঁর আপত্তি ছিল ঐ সরকারের সময়ে। সামগ্রিক বিষয় নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন সংবাদ ডিজিটাল বিভাগের প্রধান রাশেদ আহমেদ।
রাশেদ আহমেদ : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য চুক্তির যে সমালোচনাগুলো হচ্ছে, এটি নির্বাচনের তিন দিন আগে আপনাদের সময়ে স্বাক্ষরিত হলো। তখন কি আপনি কিছু বলেছিলেন?
ফরিদা আখতার: আসলে এটি তিন দিন আগে হয়নি। তিন দিন আগে ঘোষিত হয়েছে। মানে, ৯ ফেব্রুয়ারি তারিখে যে ক্যাবিনেট মিটিং হলো, সেদিন আমরা এটাকে অনুমোদন দিয়েছি। কিন্তু প্রক্রিয়াটা চলছিল ২০২৫ সালের মার্চ মাস থেকে, যখন নাকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা শুল্ক ঘোষণা করেছিল ৩৭ শতাংশ। এটা বাংলাদেশের জন্য তো একটা বড়... কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটা বড় বাজার এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র খুব তারা যেন মানে খুব কষ্ট পাচ্ছে যে আমাদের ৮ বিলিয়ন ডলারের যে বাণিজ্য, তার মধ্যে ৬ বিলিয়ন আমরাই রপ্তানি করছি আর ওখান থেকে কিছু আমদানি মাত্র ২ বিলিয়ন ডলার আনছি। এটাতে তারা কমাবে। ফলে আমাদের অনেক কিছু ওদের থেকে আনতে হবে। এমনকী রেডিমেইড গার্মেন্ট যে আমরা এখান থেকে পাঠাবো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটা বড় বাজার আমাদের, সেটাও তারা পরিবর্তন করতে চাচ্ছে যে তুলাটা ওখান থেকে আনতে হবে। যেটা চিন্তা করেন, এত দূর থেকে এনে আমাদের ওটা দিয়ে কাপড় বুনে আবার পাঠানো, যেখানে আমি ভারত থেকে আনতে পারি, আমি পাকিস্তান থেকে আনতে পারি, অনেক কাছের দেশ থেকে আনতে পারি, সেটা আমাদেরকে করতে দেবে না।
তো এই প্রক্রিয়ার মধ্যে আমি একটা বলবো, নন-ডিসক্লোজার অ্যাক্ট, যেটা নাকি একেবারে জুন মাস থেকে চুক্তির আলোচনা হয়, যেটাতে সরকার একটা বাধ্যবাধকতায় পড়ে গিয়েছিল যে এটাকে গোপন রাখতে হবে। সে কারণে আপনারা কেউই ফেব্রুয়ারি ৯ তারিখের আগে জানতে পারেন নাই।
রাশেদ আহমেদ: আপনাদের জানানো হয়েছিলো। মানে কেবিনেটে?
ফরিদা আখতার: আগে কেবিনেটেও আলোচনা হয়নি।ঐ নন-ডিসক্লোজার অ্যাক্টটাকেই আমি আপত্তি জানিয়েছিলাম যে একজন নাগরিক হিসেবে আমি একটা চুক্তি করব অথচ আমি জনগণকে জানাবো না, এটা আমি মেনে নিতে পারি নাই। আপনারা দেখেছেন যে সে সময় প্রেস সেক্রেটারি সেটাকে আবার খণ্ডনও করেছিলেন। কিন্তু আমি এখনও সেটা মনে করি যে এটা আসলে আমাদের দেশের জন্য ক্ষতি হয়েছে। ভিতরে আমি বিশেষ করে মাংস আমদানির বিরুদ্ধে আমি মত দিই নাই। আমি বলেছিলাম এটা আমাদের খামারিদের ক্ষতি হবে এবং আমরা নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তার দিক থেকেও রিস্ক আছে। কারণ মাংস একটা জীবন্ত জিনিস। ঐটা আসবে, এত দূর থেকে আসবে, ঐটা আমাদের স্বাস্থ্যের জন্য কেমন হবে? ওখানে জেনেটিক্যালি মডিফায়েড ভুট্টা এবং সয়াবিন খাওয়ানো গরুর মাংস আসবে। এগুলো নিয়ে আপত্তি করেছিলাম। কিন্তু অবশ্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তো আমাদের সরকার... মানে সেই হিসেবে দুর্বল ছিল।
রাশেদ আহমেদ : ওরা এতটাই দুর্বল ছিল যে দেশের স্বার্থের বাইরে গিয়ে এগুলো করতে হবে?
ফরিদা আখতার: হ্যাঁ, সেটা সবচেয়ে ভালো হতো যদি এটাকে ওপেন করা যেত। জনগণের একটা মতামত নেওয়ার যদি সুযোগটা রাখা যেত, তাহলে এই দুর্বলতাটা... আসলে কি হয় আপনাকে যদি আমি বন্দী করে কোথাও কিছু করি, তাহলে আপনি তো অলরেডি দুর্বল হয়ে গেলেন। কিন্তু আপনি যদি বাইরে এসে আর দশজনের সামনে বলতে পারতেন যে 'আমি এই চুক্তি করতে যাচ্ছি, আপনারা কী বলেন?', তাহলে কিন্তু এই দুর্বলতাটা থাকত না। আমরা নন-ডিসক্লোজার অ্যাক্ট করার কারণেই দুর্বল হয়েছিলাম।
রাশেদ আহমেদ : এটা কে করল, নন-ডিসক্লোজার অ্যাক্ট?
ফরিদা আখতার: এটা তো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সাথে শুধু না, সবার সাথেই করেছে। এবং এই পলিসিটাই আমাদের জন্য ক্ষতি হয়েছে আর কী।
এখানে আপনারা ষড়যন্ত্র দেখেন না। কারণ ষড়যন্ত্র করে অন্তর্বর্তী সরকার যে দেশের ক্ষতি করার পরিকল্পনা করেছে, তা না। মানে, ৩৭ শতাংশ শুল্ক থেকে বাঁচার জন্য, যদি এটা না করত, চুক্তিটা না করত, তাহলে ঐ যে শুল্কে ফেরত যেতে হতো। যেটাকে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ বলা হচ্ছে। সেটাতে যদি ফেরত যেত, তাহলেও কিন্তু আবার জনগণ বা এখন আপনারা সবাই বলতেন যে 'আপনারা একটা চুক্তি করলেই পারতেন, এই যে এখন এত বড় শুল্কের বোঝায় পড়ে গেল।' সেটা একটা বিষয় ছিল। মানে... অন্তর্বর্তী সরকারের হাতটা অনেকটা বাঁধা ছিল।
রাশেদ আহমেদ : আপনি বললেন যে এটা ষড়যন্ত্র নয়, ষড়যন্ত্র দেখতে চান না। কিন্তু দেশের তো বিশাল একটা ক্ষতি হয়ে গেছে।
ফরিদা আখতার: ক্ষতি হয়ে গেছে। বললাম তো, দুইটা অপশন ছিল। হয় শুল্কে ফেরত যাওয়া, উচ্চ শুল্কে, ৩৭ শতাংশ। তো এখন যেমন ১৯ শতাংশে আসছে। তো ১৯ শতাংশ বনাম ৩৭ শতাংশ তখন আবার জনগণ সমালোচনা করত।
আর একটা জিনিস যেটা অনেকে খেয়াল করেন না, আসলে ধরেন, ঐ চুক্তিটা অন্তর্বর্তী সরকার করেছে বলা হলেও, বর্তমানে বিএনপি সরকার এবং বিরোধী দলে যারা আছেন, তাদের মতামত নিয়েই তো করা হয়েছে। যদি মতামত তারা না দিতেন, তাহলে এখন কেন তারা সংসদে তুলছেন না? তাদেরই তো হাতে সবচেয়ে বড় শক্তি। তারা আর কিছু না হোক সংসদে তুলুক। বুঝছেন? সংসদে তুললেও তো জনগণ জানতে পারত এবং এখানে যেহেতু বিরোধী দলও কিছু বলছে না এবং তারা আসলে সম্মতি দিয়েছিল বলেই অন্তর্বর্তী সরকার করতে পেরেছিল।
রাশেদ আহমেদ : আপনি কি নিশ্চিত তারা সমর্থন দিয়েছিল?
ফরিদা আখতার: হ্যাঁ, এটা তো খলিলুর রহমান সাহেব বলেছেন। আমি নিশ্চিত হওয়ার বিষয় না, খলিল সাহেবই বলেছেন।
এটাতে মেইন ভূমিকাটা রেখেছিলেন খলিলুর রহমান, যিনি প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ছিলেন। এবং দেখেন বিএনপি তো তাঁকে পররাষ্ট্র মন্ত্রীও করে নিলেন। তো এইখানে পুরো প্রক্রিয়ার মধ্যে কি আরেকটা দৃশ্য আপনাদের সামনে ভেসে ওঠে না যে এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র... দলগুলো হাতে রাখতে চেয়েছে। তারা যেমন অন্তর্বর্তী সরকারকে চাপ দিয়েছে, তেমনি এই দলগুলোকেও চাপ দিয়েছে। ঐ চাপ অব্যাহত আছে। যদিও এই সরকার চাইলে করতে পারত একটা হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের চুক্তি আমরা মানি না, কারণ অনেকগুলো তো তারা বাতিল করেছে। অনেকগুলো আমরা অধ্যাদেশ করেছিলাম ওগুলো বাতিল করেছে, এটাও বাতিল করে দিত। তাদের তো সেই ম্যানডেট আছে। তারা ঐটা তো করেই নাই, তারা... এখানের চুক্তিতে দুইটা ধারা আছে, মডিফাই করা যায় কিংবা ক্যানসেল করা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট যেখানে বলেছে যে ট্রাম্প এটা ঠিক করে নাই, তাহলে সেটারও তো সুযোগ নেওয়া যেত যেটা মালয়েশিয়া নিয়েছে। তাহলে কেন এটা এখন অন্তর্বর্তী সরকারের উপর শুধু এককভাবে পড়ে?
রাশেদ আহমেদ : কিন্তু সংকটের সময়ে আপনারা সমস্ত political দলগুলোর সঙ্গে মিটিং করতেন, প্রধান উপদেষ্টা মিটিং করতেন, এটা আমরা দেখেছি। এরকম একটি ক্রাইসিস তৈরি হয়েছে, সেটাও সবাইকে ডেকে আলোচনা করা যেত না?
ফরিদা আখতার: সবাইকে ডেকে করা হয়নি ঠিকই, কিন্তু খলিল সাহেবের... কারণ এটা তো ওয়াশিংটনে ওরা গিয়ে করেই ছিল অনেকটা বলতে গেলে ডিসেম্বর-জানুয়ারি পুরাটাই কেটেছে ঐ চুক্তির কারণে। আমার মনে হয় সম্ভবত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও চেয়েছে যে কারা ক্ষমতায় আসতে যাচ্ছে তাদের মতামতটা নিয়ে ফেলা বা তাদেরকে অন বোর্ড করা। তো তারা সেটাই করেছে। এখন হয়তো ছোট দলগুলোর সাথে ওরা চুক্তিটা শেয়ার করেনি। কিন্তু বিএনপির ক্ষমতায় আসার চান্স আছে, তাহলে বিএনপির সাথে করেছে। জামায়াত বা জোট হিসেবে ওরা যদি মেজরিটি পায়, হতে পারত, তাহলে তাদের কাছে করেছে, কিংবা তারা বিরোধী দল বা সরকারি দল তো হবেই একটা কিছু, দুইটা মিলেই তো সরকার। তো কাজেই এখন দেখেন সেটার রূপ আমরা দেখতে পাচ্ছি। আমি বরং এখনকার সরকারকে বলবো যে আপনারা আপনাদের দায়িত্ব পালন করেন। কারণ আপনারা সরাসরি জনগণের ভোটে আসছেন, আপনাদের দায়িত্ব আছে। আমাদের যে দায়, সেটার ভুলত্রুটি সমস্ত মেনে নিচ্ছি। কিন্তু এটা তো এখন আপনাদের হাতে, সেটা কেন আপনারা করবেন না?
রাশেদ আহমেদ : আপনি কি বলতে চাচ্ছেন যে কোনো কন্ডিশনের মধ্য দিয়ে এই বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে?
ফরিদা আখতার: সেটা বলাটা ঠিক হবে না, আমি ওভাবে করে বলবো না। কিন্তু তারা জেনে আসছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রও এটা সেভাবে করিয়েছে।
রাশেদ আহমেদ : ঐটাতে আপনি শুধু আমদানির কথা বললেন, মাংসের বিষয়ে বললেন, যেহেতু ঐটা আপনার মন্ত্রণালয়ের অধীনে ছিল..
ফরিদা আখতার : না, রপ্তানির ক্ষেত্রে যেমন আরএমজি রপ্তানির ক্ষেত্রে কন্ডিশন হলো যে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা এনেই তারপর দিতে হবে। আর আমাদের ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিও কিন্তু অনেক এফেক্টেড হবে, তারপর ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস আমরা দিতে পারবো না, ওদের ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি রাইটস মানতে হবে। তারপর আমাদের যে টেস্টিং ফেসিলিটিগুলো আছে ওগুলোকে তারা গুরুত্ব দেবে না, তাদেরটাকেই গুরুত্ব দিতে হবে। মোট কথা হলো পুরা অর্থনীতির একটা ভিতকে তারা মানে দখলে নিয়ে নিয়েছে আর কী। এটা আমার কাছে মনে হয় যে খুবই বড় ধরনের একটা ক্ষতি।
রাশেদ আহমেদ : অনেক কিছু আমদানি করতে হলে তাদের পারমিশন নিতে হবে, এরকম একটা...
ফরিদা আখতার: চীনের সাথে আপনি যদি কিছু করতে যান, সেটা পারবেন না। বোয়িং ওদের কাছ থেকেই নিতে হবে, মানে আরও অনেকগুলো সেক্টর আছে। আপনি অন্য কোনো দেশের সাথে চুক্তি করতে গেলেও তাদের পারমিশন লাগবে। তাহলে কি পুরা সার্বভৌমত্ব এখানে থাকছে না। অর্থনৈতিক কোনো সার্বভৌমত্ব এখানে থাকছে না।
রাশেদ আহমেদ : এটা কি কিচেন ক্যাবিনেটে আলোচনা হয়েছিল?
ফরিদা আখতার: সেটা যেহেতু আমি কিচেন ক্যাবিনেটে ছিলাম না, আমি তো বলতে পারবো না। কিন্তু আমার মনে হয় ছোট ছোট ভাবে... খলিল সাহেব বিভিন্ন জনের সাথে আলাপ করেছেন, প্রধান উপদেষ্টা সহ, এবং যেখানে করার করেছেন ঐটা।
রাশেদ আহমেদ : কিচেন ক্যাবিনেটে কারা ছিলেন?
ফরিদা আখতার: আমি সেটা জানি না।এরকম তো কিচেন ক্যাবিনেট বলে কোনো শব্দ তো আমরা ঐ সময় থাকাকালীন শুনি নাই। আমরা এটাই জানতাম যে একটা আলাদা মিটিং কখনো কখনো হয়, এটা ইস্যু বেইজড হয়। কিন্তু কিচেন ক্যাবিনেট একটা শব্দ বা ঐটা ধরে... আমরা ক্যাবিনেট মিটিং জানতাম, কিচেন ক্যাবিনেট জানতাম না।
রাশেদ আহমেদ : পরবর্তীতে তো শুনেছেন, একটা কিচেন ক্যাবিনেট ছিল।
ফরিদা আখতার: শুনেছি, কিন্তু কিচেন ক্যাবিনেট ঐটা অনেকেই আখ্যায়িত করছেন। কিন্তু আমি এটাকে কিচেন ক্যাবিনেট বলতে চাচ্ছি না এজন্য যে কিচেন ক্যাবিনেট বলতে যেটা আন্তর্জাতিকভাবেও বোঝা যায়, এখন যেমন অনেকে বলছেন না যে কিচেন ক্যাবিনেট তো সারা বিশ্বেই আছে, এটাতে অসুবিধাটা কী? এরকম সরকার প্রধান যদি চান তো করতেই পারেন, অন্যায় তো কিছু নাই। কিন্তু কথা হলো যে এই ঘোষণাটা তো আমরা শুনি নাই যে এই কয়েকজন আলাদা করে সবসময় বসবে এবং তারাই কিছু সিদ্ধান্ত নেবে যেগুলো ক্যাবিনেট মিটিং থেকে আলাদা হবে। এটা আমরা থাকতে শুনি নাই, কাজেই আমি ঐটা ওভাবে বলতে চাচ্ছি না।
রাশেদ আহমেদ : কিন্তু অনেকে স্বীকার করছেন যে কিচেন ক্যাবিনেট একটি ছিল।
ফরিদা আখতার: ছিল, বলছে তো। আমি বললাম তো, কিছু উপদেষ্টা আলাদা করে বসতেন, সেটা একটা ফিক্সড গ্রুপ ছিল কিনা সেটাও আমরা জানি না, আবার কম-বেশিও ছিল, এটাই আর কি। তো আমি কাজেই কিচেন ক্যাবিনেটের ব্যাপারটা আমি... যদি যেহেতু ঐ সময় যদি শুনতাম ওভাবে, তাহলে নিশ্চয়ই আমাদের একটা প্রশ্ন ক্যাবিনেটেও আমরা তুলতে পারতাম। যারা বলছেন তারা ক্যাবিনেট মিটিংয়ের দিন ঐটা তুললে ভালো হতো যে 'আমরা শুনছি একটা ছোট্ট গ্রুপ আপনারা বসেন, তাহলে কী সিদ্ধান্ত...'
রাশেদ আহমেদ : পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদুল ইসলাম বলেছেন যে কিচেন ক্যাবিনেট একটি ছিল। আকস্মিকভাবেই কোনো একটি কিচেন ক্যাবিনেটের মিটিংয়ে তিনি কোনো একটি কাজের জন্য উপস্থিত হয়েছিলেন এবং তিনি তখন জেনেছেন, কিন্তু নামগুলো বলেন নাই। তো এইরকম কোনো কিছু কি আপনার ক্ষেত্রে ঘটেছিল?
ফরিদা আখতার: না, আমার ক্ষেত্রে ঘটেনি।আমি বারবার একটু আপনাদেরকে অনুরোধ করবো যে ক্যাবিনেটে যে আমরা সিদ্ধান্তগুলো নিতাম ওটার দিকে গুরুত্ব দেয়া। কারণ ক্যাবিনেটে আমরা যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে যেতাম এবং প্রস্তুতি নিয়ে আমরা তর্ক-বিতর্কও করতাম।
ওটা রিয়েল সিদ্ধান্ত গ্রহণের একটা প্রক্রিয়া ছিল। যেমন আইন মন্ত্রণালয় থেকে কিছু উত্থাপিত হলো, আমরা আইন মন্ত্রণালয় না হলেও আমরা কিন্তু পড়ে যেতাম এবং যেটা আমাদের কাছে ক্লিয়ার হতো না আমরা সেটা প্রশ্ন তুলতাম। আইন উপদেষ্টাকে সেটা পরিষ্কার করতে হতো। সিদ্ধান্ত একেবারে যতক্ষণ না আমরা সবাই মিলে বলছি যে এটা হোক, ততক্ষণ হয়নি। কোনো কোনো সময় কোনো অধ্যাদেশ ফেরতও পাঠানো হয়েছে।
রাশেদ আহমেদ : আপনাদের সময় দেখা গেল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় আঘাত করা হলো, ভাস্কর্য ভাঙচুর করা হলো, বঙ্গবন্ধুর বাড়ি নষ্ট করা হলো, আপনারা নিশ্চুপ ছিলেন।
ফরিদা আখতার: এটার দায় শেখ হাসিনার। হাসিনার দায় কেন বলবো? হাসিনা এমন এমন কথা বলেছে এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, এই নামেই যদি বলি, তাঁকে পচিয়েছে কে? হাসিনাই তো পচিয়েছে। না হলে দেখেন এত ভাঙচুর যেখানে একেবারে জেলা পর্যায়েও মূর্তি ভাঙা হলো, কোনো জনগণ কি আফসোস করছে? মানে আওয়ামী লীগ ছাড়া? কাজেই আমার মনে হয় যে এটা শেখ হাসিনার দায়।
রাশেদ আহমেদ : জনগণ তো সন্ত্রাসের কাছে অসহায়।
ফরিদা আখতার: এটা সন্ত্রাস কি ছিল? মানে এটা তো জনগণের অভ্যুত্থানের একটা অংশ ছিল, বুঝছেন? সন্ত্রাস বললে আমি মনে করি যে আপনি এটা একটা ভুল টার্ম ব্যবহার করলেন।
রাশেদ আহমেদ : তাজউদ্দীনের ভাষ্কর্য ভাঙা হলো, অনেক মুক্তিযোদ্ধার ভাষ্কর্য ভাঙচুর হলো...
ফরিদা আখতার: এগুলো তো ধরেন যেকোনো একটা অভ্যুত্থানের পরে বা একটা বড় ধরনের পরিবর্তনের পরে অনেক কিছুই এদিক-ওদিক হবে, এটা সবকিছু নিশ্চয়ই কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো নির্দেশের প্রেক্ষিতে হয়নি। তাই না? কাজেই এখানে যে যেখানে যেটা মনে করেছে, তাজউদ্দীনকে চিনেই ভাঙছে কিনা কে জানে, ঐটা আওয়ামী লীগ ভেবে তো করেছে। তো এই যে ভাঙচুরগুলো সব দায়দায়িত্ব কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের ছিল না। এটা হাসিনারই যে কথাবার্তার কারণে যেভাবে মানুষের ক্ষোভ ছিল, সেটারই ধারাবাহিকতায় এটা হয়েছে, আমি বলবো।
৩২ নম্বরের ভাঙার ক্ষেত্রেও হাসিনা কিন্তু ঐ দিন যদি একটা বক্তব্য যে 'আসছে' বা ওরকম না বলত, তাহলে কিন্তু এরকম একটা অবস্থা তৈরি হতো না । আমি মনে করি যে এখানে অন্তর্বর্তী সরকারের ফেইলুরের মধ্যে বা ব্যর্থতার মধ্যে এটাকে আমি রাখতে রাজি না।
এটা জনগণের একটা স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া ছিল। তারা এটা করেছে এবং সেটা একটা হাসিনা যাওয়ার পরে কি মানুষের ক্ষোভ কি প্রশমন সাথে সাথে তো হয়নি। তো কাজেই সেটাকে আমরা মনে করি যে এইটা ফ্যাসিবাদেরই একটা ধারাবাহিকতায়...
রাশেদ আহমেদ : কাজগুলো ঠিক হয়েছিল কিনা?
ফরিদা আখতার: সবগুলো ঠিক হয়নি, ভাঙচুর তো সব ক্ষেত্রে ঠিক হয় না। কিন্তু এখন আলাদা করে কোনটা ঠিক হয়েছে কোনটা ভুল হয়েছে, এটা আমি বলতে পারবো না।
২৪-এর যে অভ্যুত্থান, সেটাকে অনেক সময় ৭১ মাইনাস করে করার চেষ্টা করা হয়। অনেকে কিন্তু এরকম একটা চিন্তা আনতে চায়। যেহেতু তরুণরা যারা করেছে তারা তো ঐ সময় জন্মই হয়নি।
তো তারা ২৪ দেখেছে, ৭১ দেখেনি। কিন্তু ৭১-কে বাদ দিয়ে ২৪ চিন্তা করারও কি কোনো জায়গা আছে? কিন্তু যেহেতু আমাদের এখন একটা গোষ্ঠী ৭১-এ তাদের ভূমিকাটা ভিন্ন রকম ছিল, তারা ঐ বয়ানটা অনেক সময় হাজির করতে চায় যে ২৪ বেশি গুরুত্বপূর্ণ, ৭১ না। যেহেতু ঐ সময় আরো ভারত টারত এগুলো নানান রকম বিষয় আছে। তো আমার কাছে মনে হয় যে এটা একটু উদ্বেগজনক।
রাশেদ আহমেদ : কাদের কথা বলছেন?
ফরিদা আখতার: এখানে জামায়াতে ইসলামী আছে, ধর্মীয় অনেকগুলো রাজনৈতিক দল আছে। তাদের প্রত্যেকের মধ্যেই একটা টেনডেন্সি আছে যে ৭১...বা ৭১-কে তারা এমন ভাবে ইয়ে করে যে ধরেন ৭১ যদি বলি, জামায়াতে ইসলামীর কথাই যদি বলি, তারা যদি নিজেদের ভূমিকা নিয়ে যদি একটা ক্ষমা চেয়ে বলতে যে 'হ্যাঁ ৭১-এ আমরা এই ভুল করেছি, এটা আমাদের করা ঠিক হয়নি।' বিশেষ করে আমরা নারীরা বলবো যে এত নারী, ২ লক্ষ আড়াই লক্ষ নারী যেখানে ধর্ষিত হয়েছে, সেই ৭১-কে কোনোভাবে অন্যভাবে তুলে ধরবে, এটা তো মেনে নেয়া যায় না। ৩ লক্ষ শহীদের কথাও আমরা অন্যভাবে মেনে নিতে পারি না। সেখানে তারা কেউ শহীদের সন্তান কেউ শহীদ পরিবারের সন্তান, এরকম করে আবার অন্য দিকে নিতে চাওয়া, এটা আমি মনে করি যে বরং এটা আরও বেশি ভালো হয় যদি ৭১-এ যে ভূমিকাই ছিল, সে সময়কার জন্য যদি সঠিকও হয়, এখন যদি মনে করে যে ওটা ঠিক ছিল না, সেটা স্বীকার করা।
রাশেদ আহমেদ : কিন্তু ঐ সময় আপনাদের সরকারের সময়ে তো আপনারা এটাকে রিকগনাইজ করেছেন।
ফরিদা আখতার: আমরা রিকগনাইজ করেছি একটা রাজনৈতিক দল হিসেবে তাদেরকে রিকগনাইজ করা হয়েছে। তাদেরকে তো ৭১-এর ভূমিকাটাকে রিকগনাইজ করা হয়নি। ৭১-এর ভূমিকায় যে তাদের ছিল, ভূমিকা ছিল, সেটা তো আমরা বলি নাই যে তারা ওটা ঠিক করেছে। আমরা যেহেতু ঐটা তারা একটা বৈধ রাজনৈতিক দল হিসেবে এসে গেছে সবার সামনে...
রাশেদ আহমেদ : না, ঐ সময় বৈধ ছিল না।
ফরিদা আখতার: বৈধতা পেয়েছে নির্বাচন কমিশনের কাছে, পরে।
রাশেদ আহমেদ : পরবর্তীতে...
ফরিদা আখতার: পরবর্তীতে পেয়েছে। হ্যাঁ, সেটা বলছি তো। সেটাই এই ধারাটাই আমার কাছে... আমি এখন ব্যক্তিগতভাবে আমার মনের কথা বলছি যে এটা একটা যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, এটা সামনের দিকে যদি চলতে থাকে, এটা আমাদের জন্য ভালো হবে না। আরও ব্যাপারটা হলো কি যে দেখেন এরাও কিন্তু বিদেশী শক্তিরও সহায়তা নেয়। এরাও মানে এরা শুধু দেশের জনগণের উপর নির্ভরশীল হয়ে কিন্তু তারা তাদের কাজ করছে না। এখানেও আবার বিদেশী শক্তির একটা খেলা আছে। তো সেইসব দিক বিবেচনা করলে আমাদের একটু সতর্ক হওয়া দরকার আছে।
রাশেদ আহমেদ : কিন্তু ঐ সময় তাদেরকে রিকগনাইজ করার কথা তো বললাম। এবং সেটা অন্যভাবেও হয়েছে আপনাদের সময়ে। রিসেট বাটনের চাপ দেয়া এসব কথাবার্তা হয়েছে, যেটার মধ্যে...৭১-কে ভুলে যাওয়ার বিষয়টা আসে।
ফরিদা আখতার: না, রিসেট বাটন... আমার মনে হয় না। আমার মনে হয় রিসেট বাটনকে ওভাবে ব্যাখ্যা একটু বেশি করা হয়েছে। রিসেট বাটন মানেই ৭১ চেঞ্জ করে অন্য কিছু সেট করা, তা না। এটা আমি... আমি বলবো না ঐটা রিসেট বাটনের কথা এভাবে বলা
রাশেদ আহমেদ : ৭১-কে আলোচনায় না আনা, ৭১-কে ভুলে যাওয়ার এইরকম একটা ব্যবস্থা ছিল?
ফরিদা আখতার: আমাদের উপদেষ্টা কমিটিতে ম্যাক্সিমাম ছিল যারা ৭১-এর ব্যাপারে কোনো... ম্যাক্সিমাম কি সবাই, ৭১-এর ব্যাপারে কোনো কম্প্রোমাইজ করবে না। কোনোভাবেই না। কাজেই এটা আমি বলতে পারি যে এখানে কোনোভাবে...
রাশেদ আহমেদ : এইসব যখন আলোচনা হলো, তখন কি আপনারা ক্যাবিনেটে এগুলো নিয়ে উত্থাপন করেছিলেন?
ফরিদা আখতার: হ্যাঁ। উত্থাপন হয়েছে। ৭১-এর ব্যাপারে তো যখনই আলোচনা হয়েছে তখন তো এই আলোচনাই হয়েছে, ৭১-এর পক্ষে আলোচনা হয়েছে। ৭১-এর অন্যরকম কোনো চিন্তা থাকলে সেটাকে সমালোচনা করা হয়েছে।
রাশেদ আহমেদ : কী ধরনের সমালোচনা করেছে? আপনি কী ধরনের... সমালোচনা করেছে?
ফরিদা আখতার: এত কিছু... এত কিছু বলা যাবে না, আর এত কিছু আমার মনেও নাই। কারণ কনটেক্সট ওয়াইজ তো বলতে হবে। এত কিছু আমি বলতে পারবো না, এটা আমার... আমি মনে করি বলাটা ঠিকও হবে না। মানে এটা এখনও বলার সময় হয় নাই, এই বিষয়টা।
হ্যাঁ, আর আমার সত্যি কথা বলতে কি, এগুলো একেকটা বিশেষ কনটেক্সটে তো ঘটনাগুলো এসেছে, তখন কে কী বলছে, এখন যদি আমি আবার বলতে যাই হয়তো আমার সঠিকভাবে বলা নাও হতে পারে।
রাশেদ আহমেদ : সামগ্রিকভাবে যদি বলি আপনাদের ঐ সরকারের সময়, ইউনুস সরকারের সময়, এটার সফলতা-ব্যর্থতা মূল্যায়ন করতে বললে আপনি কিভাবে করবেন?
ফরিদা আখতার: আমি বলবো গণঅভ্যুত্থানের পরে যে একটা সরকার গঠনের প্রয়োজন ছিল এবং সে সময় যারা যুক্ত হয়েছেন, অধ্যাপক ডক্টর মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে যে হয়েছে, তো সেখানে এই যে প্রথমে এসে আন্তর্জাতিক একটা স্বীকৃতিটা যে পাওয়া গেল বা সে সময় একটা প্রশ্ন ওঠেনি যে এই সরকারকে আমরা নেব কি নেব না, অন্য কেউ আসলে প্রশ্ন উঠত কিনা আমার মনে হয় যে উঠত, হ্যাঁ? তো সেজন্য ডক্টর ইউনুসের নেতৃত্বে যে সরকার গঠিত হয়েছিল ওটা ঠিকই ছিল। ওটা আমি মনে করি যে শপথ গ্রহণটা হয়তো ঠিক ছিল না। ওটা হয়তো আমরা আরেকটু যদি সঠিকভাবে সংবিধানের প্রশ্ন, বিশেষ করে রাষ্ট্রপতির শপথের হাতে শপথ গ্রহণটা, এটা খুবই আমাদের জন্য বড় মানে ক্ষতি ঐদিনই হয়ে গেছে।
তারপর যেটা হলো যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, আমি তো বারবার বলছি যে আমরা যেভাবে যে অবস্থায় পেয়েছি, মানে ধরেন মন্ত্রণালয়গুলোতে কী? আপনি যদি একটা কর্মকর্তার সাথে কাজ করতে যান, হয়তো প্রশ্ন আসবে উনি দোষর না হলে বঞ্চিত। বুঝছেন? এতদিন বঞ্চিত ছিলাম তাই ওনাকে আবার আনতে হবে আর না হলে উনি দোষর ওনাকে বাদ দিতে হবে। এই দোষর বাছাই করা কে দোষর কে ভিতরে কী, এই যে ফ্যাসিবাদ তো শুধু হাসিনা চলে গেলে তো হেলিকপ্টারে তো সবার জায়গা হয় না, সবাই তো আর যায় না। বাকিরা তো সবাই ছিল এবং তারা নানা ফর্মে কিন্তু তাদের রূপও অনেক সময় দেখাচ্ছিল। অনেকগুলো কিন্তু এখানেও একটা সংকট ছিল। তো এজন্য বলছি যে ব্যর্থতার দায়টা দেয়ার আগে আমাদেরকে এটাও ভাবতে হবে যে আমরা কোন অবস্থায় কাজটা করেছি।
রাশেদ আহমেদ : আপা, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদের সময় দেয়ার জন্য।
ফরিদা আখতার: জি, অনেক ধন্যবাদ। আমিও কথা বললাম, অনেক আনন্দ পেলাম।

আপনার মতামত লিখুন