সংবাদ

সুন্দরবনের রুট সাতক্ষীরায় অপার সম্ভাবনার ইকোট্যুরিজম


কে এম আণিচুর রহমান, সাতক্ষীরা
কে এম আণিচুর রহমান, সাতক্ষীরা
প্রকাশ: ২৯ জুলাই ২০২৬, ১১:৩৯ এএম

সুন্দরবনের রুট সাতক্ষীরায় অপার সম্ভাবনার ইকোট্যুরিজম
ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন, উত্তাল বঙ্গোপসাগর, নদী-খাল, চিংড়িঘের, প্রাচীন মসজিদ-মন্দির আর সুফি সাধকদের স্মৃতিবিজড়িত তীর্থস্থান- সাতক্ষীরায় প্রকৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এমন বৈচিত্র্য দেশের খুব কম অঞ্চলেই দেখা যায়। অথচ অপর্যাপ্ত প্রচার, দুর্বল অবকাঠামো ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার অভাবে জেলার অধিকাংশ দর্শনীয় স্থান এখনো পর্যটকদের কাছে আড়ালেই রয়ে গেছে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই জেলাটি পর্যটনের দিক থেকে এক অমূল্য সম্ভাবনার ভান্ডার। একদিকে সুন্দরবনের পশ্চিম দুয়ার, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের তীরে মান্দারবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত । শীত মৌসুম, সরকারি ছুটি ও বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর দেশের নানা প্রান্ত থেকে পর্যটক আসেন । কেউ সুন্দরবনের গভীর সবুজ, হরিণ, বানর ও নদীপথের সৌন্দর্য দেখতে চান; কেউ ছুটে যান ঐতিহাসিক মন্দির, মসজিদ ও সুফি সাধকদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানে।

তবে এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সাতক্ষীরা এখনো দেশের মূল পর্যটন মানচিত্রে তার প্রাপ্য অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। পর্যাপ্ত প্রচার, পরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থাপনা, মানসম্মত আবাসন, নিরাপদ নৌযান, প্রশিক্ষিত গাইড, উন্নত সড়ক যোগাযোগ, তথ্যকেন্দ্র, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার ও পর্যটকবান্ধব অবকাঠামোর অভাবে জেলার অধিকাংশ দর্শনীয় স্থান এখনো দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে অনেকটাই অজানা।

বিদেশি পর্যটক

সুন্দরবনের রুট

পর্যটকদের একটি বড় অংশ সুন্দরবন বলতে কেবল খুলনা-মোংলার পথকেই চেনে। কিন্তু সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ও নীলডুমুর দিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করলে অল্প সময়েই নদী, বন ও বন্যপ্রাণীর কাছাকাছি পৌঁছানো যায় । মুন্সিগঞ্জকে বলা হয় সুন্দরবনের পশ্চিম দ্বার। মুন্সিগঞ্জ ও নীলডুমুর ঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা পর্যটকবাহী ট্রলারে কলাগাছিয়া, দোবেকি এবং সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী-খাল ঘুরে দেখা যায় । এই পথের দুপাশে দেখা মেলে কেওড়া, গরান, গেওয়া ও গোলপাতার বন; নদীতে ভেসে চলা জেলের নৌকা; কাঁকড়া ও চিংড়ি চাষের ঘের; আর প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা উপকূলীয় মানুষের জীবন।

কলাগাছিয়া ইকোট্যুরিজম পার্ক

সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সবচেয়ে পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র কলাগাছিয়া ইকোট্যুরিজম পার্ক। নদীর ঘাট থেকে কংক্রিটের তৈরি হাঁটার পথ ধরে বনের ভেতরে প্রবেশ করা যায়। ওয়াচ টাওয়ারে উঠে চারপাশের বন, নদী এবং বিস্তৃত ম্যানগ্রোভ অঞ্চল দেখা যায়। বর্তমানে পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াতে সেখানে বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে হরিণ ও কুমির রাখা হয়েছে।

আকাশলীনা ইকোট্যুরিজম সেন্টার

শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জে মালঞ্চ নদীর তীরে গড়ে উঠেছে আকাশলীনা ইকোট্যুরিজম সেন্টার। নদীর ওপারেই সুন্দরবনের সবুজ দেয়াল। বিকেলের শেষ আলোয় নদী ও বনের ওপর সূর্যের রং বদলের দৃশ্য দেখতে এখানে প্রতিদিন স্থানীয় বাসিন্দা ও দূরদূরান্তের পর্যটকেরা ভিড় করেন। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যেই কেন্দ্রটি গড়ে তোলা হয়েছে। রয়েছে রাত্রিযাপনের ব্যবস্থাও।

মান্দারবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত

মান্দারবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত মান্দারবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত । এটি দেশের পরিচিত সমুদ্র সৈকতগুলোর তুলনায় অনেকটাই নির্জন ও দুর্গম। হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মোহনা, বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত জলরাশি এবং পাশে সুন্দরবনের সবুজ বন, এই তিনের মিলিত দৃশ্য মান্দারবাড়িয়াকে অনন্য করেছে।

৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বেলাভূমি এখনও যেন অনেকটাই অনাবিষ্কৃত। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামোগত উন্নয়নের ঘাটতি, সরকারি প্রচার-প্রসারের উদ্যোগহীনতা- নানাবিধ কারণে দীর্ঘদিনেও সেভাবে জনসম্মুখে আসেনি এটি। তবে সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে এটি দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম প্রধান পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।

সম্ভাবনার হাতছানি

ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় নিদর্শন

শ্যামনগরের ঈশ্বরীপুরে ধুমঘাট গ্রাম ছিল রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজধানী। তার সময়ে প্রতিষ্ঠিত যশোরেশ্বরী কালীমন্দির সাতক্ষীরার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থান। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি একটি পবিত্র তীর্থস্থান। মন্দিরকে কেন্দ্র করে ঈশ্বরীপুর এলাকায় রয়েছে প্রাচীন স্থাপত্যের আরও কিছু নিদর্শন। ঈশ্বরীপুর এলাকাতেই রয়েছে ঈশ্বরীপুর শাহী জামে মসজিদ, যা মোঘল সম্রাট আকবরের শাসনকালে তৈরি করা হয়। এছাড়া কালিগঞ্জের প্রবাজপুর শাহী জামে মসজিদ ও তালার তেঁতুলিয়া জামে মসজিদ মুঘল স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন। কালীগঞ্জের নলতায় অবস্থিত খানবাহাদুর আহছানউল্লার স্মৃতিবিজড়িত নলতা শরীফ দেশের পরিচিত ধর্মীয় ও মানবকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান। প্রতিবছর বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও ওরসকে কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক মানুষ এখানে আসেন ।

পর্যটন বিকাশের প্রতিবন্ধকতা

অপার সম্ভাবনা থাকলেও সাতক্ষীরার পর্যটন বিকাশে বেশ কিছু সংকট রয়েছে। এগুলোর অন্যতম হচ্ছে, সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় মানসম্মত আবাসন সীমিত, পর্যটকদের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্যকেন্দ্র, প্রশিক্ষিত গাইডের অভাব, নিরাপদ ও মানসম্মত নৌযানের ঘাটতি, পর্যাপ্ত শৌচাগার, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসাসেবা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল, অনেক স্থানে নির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড নেই, জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র নিয়ে নির্ভুল মানচিত্র, ওয়েবসাইট বা মোবাইল অ্যাপের অভাব। এছাড়াও রয়েছে নানা অবকাঠামো সংকট। 

প্রকৃতি আর মানুষের মিতালী

স্থানীয়দের প্রত্যাশা

মুন্সিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা আব্দুল আহাদ বলেন, ‘প্রতিবছর শীত মৌসুমে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বহু পর্যটক সুন্দরবন দেখতে আসেন। পর্যটকদের আগমন বাড়লে স্থানীয় দোকান, হোটেল, নৌযান, ভ্যান ও মোটরসাইকেল চালকদের আয়ও বাড়ে।’ তবে তিনি মানসম্মত আবাসন ও নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা আরও বাড়ানোর দাবি জানান। মুন্সিগঞ্জ ফরেস্ট ঘাট ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি আনিছুর রহমান বলেন, ‘মুন্সিগঞ্জ ঘাটকে পরিকল্পিতভাবে আধুনিক পর্যটন ঘাটে রূপান্তর করা প্রয়োজন। পর্যটকদের বসার স্থান, বিশুদ্ধ পানি, শৌচাগার, টিকিট কাউন্টার ও তথ্যকেন্দ্র থাকলে সেবার মান বাড়বে।’

সম্ভাবনার পথে

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ বলেছেন, ‘সুন্দরবন ছাড়াও সাতক্ষীরায় ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও প্রাকৃতিক অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এসব স্থানকে একটি সমন্বিত পর্যটন পরিকল্পনার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পর্যটনের উন্নয়নের পাশাপাশি সুন্দরবন ও উপকূলীয় পরিবেশ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।’ এতে শুধু জেলার পরিচিতিই বাড়বে না, স্থানীয় পরিবহন, নৌযান, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, হস্তশিল্প ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্যও তৈরি হবে নতুন আয়ের সুযোগ। সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে সাতক্ষীরা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রধান পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬


সুন্দরবনের রুট সাতক্ষীরায় অপার সম্ভাবনার ইকোট্যুরিজম

প্রকাশের তারিখ : ২৯ জুলাই ২০২৬

featured Image

বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন, উত্তাল বঙ্গোপসাগর, নদী-খাল, চিংড়িঘের, প্রাচীন মসজিদ-মন্দির আর সুফি সাধকদের স্মৃতিবিজড়িত তীর্থস্থান- সাতক্ষীরায় প্রকৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এমন বৈচিত্র্য দেশের খুব কম অঞ্চলেই দেখা যায়। অথচ অপর্যাপ্ত প্রচার, দুর্বল অবকাঠামো ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার অভাবে জেলার অধিকাংশ দর্শনীয় স্থান এখনো পর্যটকদের কাছে আড়ালেই রয়ে গেছে।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই জেলাটি পর্যটনের দিক থেকে এক অমূল্য সম্ভাবনার ভান্ডার। একদিকে সুন্দরবনের পশ্চিম দুয়ার, অন্যদিকে বঙ্গোপসাগরের তীরে মান্দারবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত । শীত মৌসুম, সরকারি ছুটি ও বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর দেশের নানা প্রান্ত থেকে পর্যটক আসেন । কেউ সুন্দরবনের গভীর সবুজ, হরিণ, বানর ও নদীপথের সৌন্দর্য দেখতে চান; কেউ ছুটে যান ঐতিহাসিক মন্দির, মসজিদ ও সুফি সাধকদের স্মৃতিবিজড়িত স্থানে।

তবে এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সাতক্ষীরা এখনো দেশের মূল পর্যটন মানচিত্রে তার প্রাপ্য অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। পর্যাপ্ত প্রচার, পরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থাপনা, মানসম্মত আবাসন, নিরাপদ নৌযান, প্রশিক্ষিত গাইড, উন্নত সড়ক যোগাযোগ, তথ্যকেন্দ্র, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার ও পর্যটকবান্ধব অবকাঠামোর অভাবে জেলার অধিকাংশ দর্শনীয় স্থান এখনো দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে অনেকটাই অজানা।

বিদেশি পর্যটক

সুন্দরবনের রুট

পর্যটকদের একটি বড় অংশ সুন্দরবন বলতে কেবল খুলনা-মোংলার পথকেই চেনে। কিন্তু সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ও নীলডুমুর দিয়ে সুন্দরবনে প্রবেশ করলে অল্প সময়েই নদী, বন ও বন্যপ্রাণীর কাছাকাছি পৌঁছানো যায় । মুন্সিগঞ্জকে বলা হয় সুন্দরবনের পশ্চিম দ্বার। মুন্সিগঞ্জ ও নীলডুমুর ঘাট থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকা বা পর্যটকবাহী ট্রলারে কলাগাছিয়া, দোবেকি এবং সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী-খাল ঘুরে দেখা যায় । এই পথের দুপাশে দেখা মেলে কেওড়া, গরান, গেওয়া ও গোলপাতার বন; নদীতে ভেসে চলা জেলের নৌকা; কাঁকড়া ও চিংড়ি চাষের ঘের; আর প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকা উপকূলীয় মানুষের জীবন।

কলাগাছিয়া ইকোট্যুরিজম পার্ক

সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সবচেয়ে পরিচিত পর্যটনকেন্দ্র কলাগাছিয়া ইকোট্যুরিজম পার্ক। নদীর ঘাট থেকে কংক্রিটের তৈরি হাঁটার পথ ধরে বনের ভেতরে প্রবেশ করা যায়। ওয়াচ টাওয়ারে উঠে চারপাশের বন, নদী এবং বিস্তৃত ম্যানগ্রোভ অঞ্চল দেখা যায়। বর্তমানে পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াতে সেখানে বন বিভাগের তত্ত্বাবধানে হরিণ ও কুমির রাখা হয়েছে।

আকাশলীনা ইকোট্যুরিজম সেন্টার

শ্যামনগরের মুন্সিগঞ্জে মালঞ্চ নদীর তীরে গড়ে উঠেছে আকাশলীনা ইকোট্যুরিজম সেন্টার। নদীর ওপারেই সুন্দরবনের সবুজ দেয়াল। বিকেলের শেষ আলোয় নদী ও বনের ওপর সূর্যের রং বদলের দৃশ্য দেখতে এখানে প্রতিদিন স্থানীয় বাসিন্দা ও দূরদূরান্তের পর্যটকেরা ভিড় করেন। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় প্রাকৃতিক পরিবেশের মধ্যেই কেন্দ্রটি গড়ে তোলা হয়েছে। রয়েছে রাত্রিযাপনের ব্যবস্থাও।

মান্দারবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত

মান্দারবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত মান্দারবাড়িয়া সমুদ্র সৈকত । এটি দেশের পরিচিত সমুদ্র সৈকতগুলোর তুলনায় অনেকটাই নির্জন ও দুর্গম। হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মোহনা, বঙ্গোপসাগরের বিস্তৃত জলরাশি এবং পাশে সুন্দরবনের সবুজ বন, এই তিনের মিলিত দৃশ্য মান্দারবাড়িয়াকে অনন্য করেছে।

৮ কিলোমিটার দীর্ঘ এই বেলাভূমি এখনও যেন অনেকটাই অনাবিষ্কৃত। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা, অবকাঠামোগত উন্নয়নের ঘাটতি, সরকারি প্রচার-প্রসারের উদ্যোগহীনতা- নানাবিধ কারণে দীর্ঘদিনেও সেভাবে জনসম্মুখে আসেনি এটি। তবে সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে এটি দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম প্রধান পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।

সম্ভাবনার হাতছানি

ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় নিদর্শন

শ্যামনগরের ঈশ্বরীপুরে ধুমঘাট গ্রাম ছিল রাজা প্রতাপাদিত্যের রাজধানী। তার সময়ে প্রতিষ্ঠিত যশোরেশ্বরী কালীমন্দির সাতক্ষীরার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্থান। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি একটি পবিত্র তীর্থস্থান। মন্দিরকে কেন্দ্র করে ঈশ্বরীপুর এলাকায় রয়েছে প্রাচীন স্থাপত্যের আরও কিছু নিদর্শন। ঈশ্বরীপুর এলাকাতেই রয়েছে ঈশ্বরীপুর শাহী জামে মসজিদ, যা মোঘল সম্রাট আকবরের শাসনকালে তৈরি করা হয়। এছাড়া কালিগঞ্জের প্রবাজপুর শাহী জামে মসজিদ ও তালার তেঁতুলিয়া জামে মসজিদ মুঘল স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন। কালীগঞ্জের নলতায় অবস্থিত খানবাহাদুর আহছানউল্লার স্মৃতিবিজড়িত নলতা শরীফ দেশের পরিচিত ধর্মীয় ও মানবকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান। প্রতিবছর বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও ওরসকে কেন্দ্র করে বিপুলসংখ্যক মানুষ এখানে আসেন ।

পর্যটন বিকাশের প্রতিবন্ধকতা

অপার সম্ভাবনা থাকলেও সাতক্ষীরার পর্যটন বিকাশে বেশ কিছু সংকট রয়েছে। এগুলোর অন্যতম হচ্ছে, সুন্দরবনসংলগ্ন এলাকায় মানসম্মত আবাসন সীমিত, পর্যটকদের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্যকেন্দ্র, প্রশিক্ষিত গাইডের অভাব, নিরাপদ ও মানসম্মত নৌযানের ঘাটতি, পর্যাপ্ত শৌচাগার, বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসাসেবা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি, বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল, অনেক স্থানে নির্দেশনামূলক সাইনবোর্ড নেই, জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র নিয়ে নির্ভুল মানচিত্র, ওয়েবসাইট বা মোবাইল অ্যাপের অভাব। এছাড়াও রয়েছে নানা অবকাঠামো সংকট। 

প্রকৃতি আর মানুষের মিতালী

স্থানীয়দের প্রত্যাশা

মুন্সিগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা আব্দুল আহাদ বলেন, ‘প্রতিবছর শীত মৌসুমে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বহু পর্যটক সুন্দরবন দেখতে আসেন। পর্যটকদের আগমন বাড়লে স্থানীয় দোকান, হোটেল, নৌযান, ভ্যান ও মোটরসাইকেল চালকদের আয়ও বাড়ে।’ তবে তিনি মানসম্মত আবাসন ও নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা আরও বাড়ানোর দাবি জানান। মুন্সিগঞ্জ ফরেস্ট ঘাট ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি আনিছুর রহমান বলেন, ‘মুন্সিগঞ্জ ঘাটকে পরিকল্পিতভাবে আধুনিক পর্যটন ঘাটে রূপান্তর করা প্রয়োজন। পর্যটকদের বসার স্থান, বিশুদ্ধ পানি, শৌচাগার, টিকিট কাউন্টার ও তথ্যকেন্দ্র থাকলে সেবার মান বাড়বে।’

সম্ভাবনার পথে

সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ বলেছেন, ‘সুন্দরবন ছাড়াও সাতক্ষীরায় ঐতিহাসিক, ধর্মীয় ও প্রাকৃতিক অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এসব স্থানকে একটি সমন্বিত পর্যটন পরিকল্পনার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পর্যটনের উন্নয়নের পাশাপাশি সুন্দরবন ও উপকূলীয় পরিবেশ সংরক্ষণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে।’ এতে শুধু জেলার পরিচিতিই বাড়বে না, স্থানীয় পরিবহন, নৌযান, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ক্ষুদ্র ব্যবসা, হস্তশিল্প ও নারী উদ্যোক্তাদের জন্যও তৈরি হবে নতুন আয়ের সুযোগ। সঠিক পরিকল্পনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে সাতক্ষীরা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রধান পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হতে পারে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত