ঢাকায় অবস্থিত আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডাইরিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের ৯৭.৩ শতাংশের হাম শনাক্ত হয়েছে। টিকার বয়স হয়নি বা টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুরাই এ প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।
বাংলাদেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবে ভাইরাসের এমন কোনো জিনগত পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা বর্তমানে ব্যবহৃত টিকার সুরক্ষাকে এড়িয়ে যেতে পারে। আইসিডিডিআরবির গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। তবে যেসব শিশুর টিকা দেওয়ার বয়স হয়নি, তারাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে বলে ওই গবেষণায় বলা হয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দুই ডোজ টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার তুলনামূলকভাবে কম। বর্তমানে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসটি ‘বি৩ জিনোটাইপ’-এর, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্রাদুর্ভাবেও শনাক্ত হয়েছে।
আইসিডিডিআরবি ও বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের গবেষকরা ২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল থেকে ২১ মে পর্যন্ত শিশু হাসপাতালে সন্দেহভাজন হাম নিয়ে ভর্তি হওয়া ১৪ বছরের কম বয়সী ৩৪১ শিশুকে নিয়ে অনুসন্ধান চালান। পরীক্ষাগারে ৩২৪ শিশুর হাম নিশ্চিত হয়।
বয়স ও টিকা নেওয়ার ভিত্তিতে শিশুদের চারটি দল
আইসিডিডিআরবির সংক্রমণ রোগ বিভাগের ভাইরোলজি ল্যাবরেটরির সহযোগী বিজ্ঞানী ডা. নূরজাহান মালিহা বলেন, ‘টিকা এখনো কার্যকর কিনা, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরী হওয়া স্বাভাবিক। আমাদের অনুসন্ধানে ভাইরাসটি টিকার সুরক্ষা এড়িয়ে যাচ্ছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দুই ডোজ টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে পরীক্ষায় পজিটিভ হওয়ার হার কম ছিল।’
বাংলাদেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় হাম-রুবেলার টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয় ৯ মাস ও দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাস বয়সে। প্রথম ডোজের আগে শিশুরা মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি এবং সমষ্টিগত সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল থাকে।
আইসিডিডিআরবির আগের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জন্মের পর প্রথম কয়েক মাসেই মায়ের কাছ থেকে পাওয়া হামের অ্যান্টিবডি দ্রুত কমে যায়। তিন থেকে আট মাস বয়সে কোনো সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি শনাক্ত হয়নি। তবে সেই বিশ্লেষণে মাত্র ১৬ জন শিশু অন্তর্ভুক্ত ছিল, তাই আরও বিস্তৃত গবেষণার পরামর্শ দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
আইসিডিডিআরবির ফাইলোজেনেটিক বিশ্লেষণে ৫৫টি পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স অন্তর্ভুক্ত ছিল। সব ভাইরাসই ‘বি৩’ ধরনের সঙ্গে মিল রয়েছে। ভাইরাসের ‘এইচ’ প্রোটিনের অ্যান্টিবডি শনাক্ত করতে পারে- এমন অংশে চারটি পরিবর্তন বা মিউটেশন শনাক্ত হয়েছে।
‘এইচ’ প্রোটিন ভাইরাসকে মানুষের কোষে প্রবেশ করতে সহায়তা করে এবং টিকার মাধ্যমে তৈরি অ্যান্টিবডির প্রধান লক্ষ্য এটি। তবে মিউটেশন থাকার অর্থ এই নয় যে টিকা আর কাজ করছে না। হাম ভাইরাস এখনো একটি একক সেরোটাইপ এবং টিকার অ্যান্টিবডি ভাইরাসের একাধিক স্থান শনাক্ত করতে পারে।
আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক ডা. তাহমিদ আহমেদ বলেন, ‘এই প্রাথমিক ফলাফল কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে, আবার দেখিয়েছে আমাদের আরও অনেক কিছু জানা দরকার। টিকা নেওয়া কিছু শিশু কেন আক্রান্ত হয়েছে, গুরুতর অসুস্থতা ও মৃত্যুর পেছনে কোন বিষয়গুলো কাজ করছে, অপুষ্টি কীভাবে সুরক্ষাকে প্রভাবিত করে—সেসব অনুসন্ধানে আমরা আরও বিস্তৃত গবেষণা কার্যক্রম গ্রহণ করছি।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ২২ হাজার ৭৬৩ জন সন্দেহভাজন এবং পরীক্ষাগারে নিশ্চিত ১৫ হাজার ২৭২ জন হাম রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময়ে হামজনিত সন্দেহজনক ৭২১ জন এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত ৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়ে আরও ৪ শিশু মারা গেছে। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৮৪৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে সন্দেহভাজনসহ আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ১৩৭ জন।
এ পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৭৮ জন। এর মধ্যে সন্দেহজনক হামে ১ লাখ ৩০ হাজার ৮৩ জন এবং নিশ্চিত হামে ১৬ হাজার ২৯৫ জন শিশু আক্রান্ত হয়েছে।
হামে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে
আইসিডিডিআরবির ভাইরোলজি ল্যাবরেটরির সহকারী বিজ্ঞানী ডা. কামরুন নাহার বলেন, ‘শিশুরা কেন টিকা নিতে পারছে না এবং জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের যে হার জানানো হচ্ছে, তার আড়ালে কোনো কোনো এলাকায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বড় ঘাটতি রয়েছে কিনা- তা আমাদের নির্ধারণ করতে হবে। এই গবেষণা টিকাদান কৌশল আরও কার্যকর করতে এবং ভবিষ্যৎ প্রাদুর্ভাবে শিশুদের আরও ভালোভাবে সুরক্ষা দিতে সহায়তা করবে।’
ডা. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘হাম প্রতিরোধ ও গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি কমাতে টিকাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে টিকা দেওয়ার হার তুলনামূলকভাবে বেশি জানানো হলেও এই প্রাদুর্ভাব এত বড় হলো কেন- সেটিও আমাদের বুঝতে হবে।’

রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ আগস্ট ২০২৬
ঢাকায় অবস্থিত আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডাইরিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের ৯৭.৩ শতাংশের হাম শনাক্ত হয়েছে। টিকার বয়স হয়নি বা টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুরাই এ প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।
বাংলাদেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাবে ভাইরাসের এমন কোনো জিনগত পরিবর্তনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা বর্তমানে ব্যবহৃত টিকার সুরক্ষাকে এড়িয়ে যেতে পারে। আইসিডিডিআরবির গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। তবে যেসব শিশুর টিকা দেওয়ার বয়স হয়নি, তারাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে বলে ওই গবেষণায় বলা হয়েছে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দুই ডোজ টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের হার তুলনামূলকভাবে কম। বর্তমানে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাসটি ‘বি৩ জিনোটাইপ’-এর, যা বিশ্বের অন্যান্য দেশের প্রাদুর্ভাবেও শনাক্ত হয়েছে।
আইসিডিডিআরবি ও বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের গবেষকরা ২০২৬ সালের ২০ এপ্রিল থেকে ২১ মে পর্যন্ত শিশু হাসপাতালে সন্দেহভাজন হাম নিয়ে ভর্তি হওয়া ১৪ বছরের কম বয়সী ৩৪১ শিশুকে নিয়ে অনুসন্ধান চালান। পরীক্ষাগারে ৩২৪ শিশুর হাম নিশ্চিত হয়।
বয়স ও টিকা নেওয়ার ভিত্তিতে শিশুদের চারটি দল
আইসিডিডিআরবির সংক্রমণ রোগ বিভাগের ভাইরোলজি ল্যাবরেটরির সহযোগী বিজ্ঞানী ডা. নূরজাহান মালিহা বলেন, ‘টিকা এখনো কার্যকর কিনা, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরী হওয়া স্বাভাবিক। আমাদের অনুসন্ধানে ভাইরাসটি টিকার সুরক্ষা এড়িয়ে যাচ্ছে—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। দুই ডোজ টিকা পাওয়া শিশুদের মধ্যে পরীক্ষায় পজিটিভ হওয়ার হার কম ছিল।’
বাংলাদেশে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় হাম-রুবেলার টিকার প্রথম ডোজ দেওয়া হয় ৯ মাস ও দ্বিতীয় ডোজ ১৫ মাস বয়সে। প্রথম ডোজের আগে শিশুরা মায়ের কাছ থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডি এবং সমষ্টিগত সুরক্ষার ওপর নির্ভরশীল থাকে।
আইসিডিডিআরবির আগের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, জন্মের পর প্রথম কয়েক মাসেই মায়ের কাছ থেকে পাওয়া হামের অ্যান্টিবডি দ্রুত কমে যায়। তিন থেকে আট মাস বয়সে কোনো সুরক্ষামূলক অ্যান্টিবডি শনাক্ত হয়নি। তবে সেই বিশ্লেষণে মাত্র ১৬ জন শিশু অন্তর্ভুক্ত ছিল, তাই আরও বিস্তৃত গবেষণার পরামর্শ দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
আইসিডিডিআরবির ফাইলোজেনেটিক বিশ্লেষণে ৫৫টি পূর্ণাঙ্গ জিনোম সিকোয়েন্স অন্তর্ভুক্ত ছিল। সব ভাইরাসই ‘বি৩’ ধরনের সঙ্গে মিল রয়েছে। ভাইরাসের ‘এইচ’ প্রোটিনের অ্যান্টিবডি শনাক্ত করতে পারে- এমন অংশে চারটি পরিবর্তন বা মিউটেশন শনাক্ত হয়েছে।
‘এইচ’ প্রোটিন ভাইরাসকে মানুষের কোষে প্রবেশ করতে সহায়তা করে এবং টিকার মাধ্যমে তৈরি অ্যান্টিবডির প্রধান লক্ষ্য এটি। তবে মিউটেশন থাকার অর্থ এই নয় যে টিকা আর কাজ করছে না। হাম ভাইরাস এখনো একটি একক সেরোটাইপ এবং টিকার অ্যান্টিবডি ভাইরাসের একাধিক স্থান শনাক্ত করতে পারে।
আইসিডিডিআরবির নির্বাহী পরিচালক ডা. তাহমিদ আহমেদ বলেন, ‘এই প্রাথমিক ফলাফল কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে, আবার দেখিয়েছে আমাদের আরও অনেক কিছু জানা দরকার। টিকা নেওয়া কিছু শিশু কেন আক্রান্ত হয়েছে, গুরুতর অসুস্থতা ও মৃত্যুর পেছনে কোন বিষয়গুলো কাজ করছে, অপুষ্টি কীভাবে সুরক্ষাকে প্রভাবিত করে—সেসব অনুসন্ধানে আমরা আরও বিস্তৃত গবেষণা কার্যক্রম গ্রহণ করছি।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ২২ হাজার ৭৬৩ জন সন্দেহভাজন এবং পরীক্ষাগারে নিশ্চিত ১৫ হাজার ২৭২ জন হাম রোগীর তথ্য পাওয়া গেছে। একই সময়ে হামজনিত সন্দেহজনক ৭২১ জন এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত ৯৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হামে আক্রান্ত হয়ে আরও ৪ শিশু মারা গেছে। এ নিয়ে ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৮৪৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে সন্দেহভাজনসহ আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ১৩৭ জন।
এ পর্যন্ত মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার ৩৭৮ জন। এর মধ্যে সন্দেহজনক হামে ১ লাখ ৩০ হাজার ৮৩ জন এবং নিশ্চিত হামে ১৬ হাজার ২৯৫ জন শিশু আক্রান্ত হয়েছে।
হামে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে
আইসিডিডিআরবির ভাইরোলজি ল্যাবরেটরির সহকারী বিজ্ঞানী ডা. কামরুন নাহার বলেন, ‘শিশুরা কেন টিকা নিতে পারছে না এবং জাতীয় পর্যায়ে টিকাদানের যে হার জানানো হচ্ছে, তার আড়ালে কোনো কোনো এলাকায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বড় ঘাটতি রয়েছে কিনা- তা আমাদের নির্ধারণ করতে হবে। এই গবেষণা টিকাদান কৌশল আরও কার্যকর করতে এবং ভবিষ্যৎ প্রাদুর্ভাবে শিশুদের আরও ভালোভাবে সুরক্ষা দিতে সহায়তা করবে।’
ডা. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘হাম প্রতিরোধ ও গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি কমাতে টিকাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে টিকা দেওয়ার হার তুলনামূলকভাবে বেশি জানানো হলেও এই প্রাদুর্ভাব এত বড় হলো কেন- সেটিও আমাদের বুঝতে হবে।’

আপনার মতামত লিখুন