সংবাদ

মুরগি-মাছেও স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখছেন গবেষকরা


বিশাখা চৌধুরী
বিশাখা চৌধুরী
প্রকাশ: ৫ আগস্ট ২০২৬, ০৮:৪৭ পিএম

মুরগি-মাছেও স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখছেন গবেষকরা
ছবি: সংগৃহীত

দেশের খাদ্যশৃঙ্খলে নতুন উদ্বেগ যোগ করেছে সাম্প্রতিক দুটি গবেষণা। একদিকে ব্রয়লার মুরগির মাংসে নিরাপদ মাত্রার চেয়ে বেশি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল (অ্যান্টিবায়োটিক) অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে ঢাকা ও মুন্সিগঞ্জের আড়িয়াল বিলের দেশি পাঁচ প্রজাতির মাছের মাংসপেশিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। জনস্বাস্থ্যের জন্য দুটি বিষয়ই বড় হুমকি বলে মনে করছেন গবেষকরা।

লন্ডনের রয়্যাল ভেটেরিনারি কলেজের (আরভিসি) গবেষণায় বাংলাদেশ, ভারত ও ভিয়েতনামের ৫৫৮টি মুরগির বুকের মাংসের নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু বিক্রয়কেন্দ্রের ৩.৭ থেকে ৮.৬ শতাংশ নমুনায় নিরাপদ সীমার চেয়ে বেশি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের উপস্থিতি রয়েছে। অথচ ২০২১-২২ সালে ইইউ দেশগুলোতে এই হার ছিল গড়ে মাত্র ০.০৫ থেকে ০.০৯ শতাংশ।

অধ্যাপক লুডোভিক পেলিগ্যান্ডের নেতৃত্বে এই গবেষণায় বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জবাইয়ের ঠিক আগ মুহূর্তেও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ প্রয়োগ করা হয়ে থাকতে পারে। মুরগির খাদ্য ও পানীয় জলও দূষণের কারণ হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করে বলেছে, মানুষের শরীরে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক প্রবেশ করলে তা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) তৈরি করে। ফলে সাধারণ সংক্রমণও নিরাময়ে ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশে এএমআর-জনিত মৃত্যুর হার বাড়ছে।

এদিকে, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় আড়িয়াল বিলের কই, বাটা, মেনি, গুলশা টেংরা ও পুঁটি মাছের অন্ত্র, ফুলকা ও মাংসপেশিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে কই মাছে। বর্ষা, শীত ও শুষ্ক মৌসুমে প্রতিটি কই মাছের মাংসে গড়ে একটি করে প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।

গবেষণায় প্রতি লিটার পানিতে ১১ থেকে ৩১.৬৭টি এবং প্রতি কেজি পলিমাটিতে ১২.৩৩ থেকে ১২৭.৩৩টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। বর্ষাকালে পানিতে দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি ছিল। ৩৪ থেকে ৬৩ শতাংশ কণা ছিল মাইক্রোফাইবার, যার প্রধান উৎস কাপড় ধোয়ার পানি, গৃহস্থালির বর্জ্য ও মাছ ধরার জাল।

গবেষকরা বলছেন, মাছের অন্ত্র বা ফুলকায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার ঘটনা আগেও জানা গেছে। তবে মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত মাংসপেশিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. শাহজাহান বলেন, ‘বর্তমানে এসব মাছ খেয়ে সরাসরি ক্ষতির প্রমাণ নেই। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে এ ধরনের কণা জমতে থাকলে ২৫ থেকে ৩০ বছর পর এর প্রভাব দেখা দিতে পারে। পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।’

গবেষণায় পলিথিলিন, পলিপ্রোপিলিন, পলিস্টাইরিন, পলিভিনাইল ক্লোরাইড ও পলিকার্বোনেট শনাক্ত হয়েছে। আড়িয়াল বিলের পানি ও পলিমাটি উচ্চ পরিবেশগত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলেও সতর্ক করেছে গবেষক দল।

গবেষণার এই তথ্য সামনে আসার মধ্যেই ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২১০-২৩০ টাকা কেজিতে। মাছের বাজারেও দাম বেশি। ফলে অনেক ক্রেতা কম দামি চাপিলা মাছের দিকে ঝুঁকছেন। কিছু কারখানায় মুরগির বিষ্ঠা দিয়ে মাছ চাষের অভিযোগও রয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করছে।

অধ্যাপক পেলিগ্যান্ড বলেন, ‘এটি একটি যুগান্তকারী গবেষণা। এতদিন এশিয়ায় একই মানদণ্ডে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের অবশিষ্টাংশ পরিমাপের এমন তথ্য ছিল না। এই গবেষণা খাদ্য নিরাপত্তার উন্নতিতে কাজ করবে।’

গবেষক দল এখন পোলট্রি উৎপাদন চক্রে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধের ব্যবহার ও মাইক্রোপ্লাস্টিক কীভাবে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে, তা নিয়ে কাজ করছে।


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬


মুরগি-মাছেও স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখছেন গবেষকরা

প্রকাশের তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬

featured Image

দেশের খাদ্যশৃঙ্খলে নতুন উদ্বেগ যোগ করেছে সাম্প্রতিক দুটি গবেষণা। একদিকে ব্রয়লার মুরগির মাংসে নিরাপদ মাত্রার চেয়ে বেশি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল (অ্যান্টিবায়োটিক) অবশিষ্টাংশ পাওয়া গেছে। অন্যদিকে ঢাকা ও মুন্সিগঞ্জের আড়িয়াল বিলের দেশি পাঁচ প্রজাতির মাছের মাংসপেশিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। জনস্বাস্থ্যের জন্য দুটি বিষয়ই বড় হুমকি বলে মনে করছেন গবেষকরা।

লন্ডনের রয়্যাল ভেটেরিনারি কলেজের (আরভিসি) গবেষণায় বাংলাদেশ, ভারত ও ভিয়েতনামের ৫৫৮টি মুরগির বুকের মাংসের নমুনা বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু বিক্রয়কেন্দ্রের ৩.৭ থেকে ৮.৬ শতাংশ নমুনায় নিরাপদ সীমার চেয়ে বেশি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের উপস্থিতি রয়েছে। অথচ ২০২১-২২ সালে ইইউ দেশগুলোতে এই হার ছিল গড়ে মাত্র ০.০৫ থেকে ০.০৯ শতাংশ।

অধ্যাপক লুডোভিক পেলিগ্যান্ডের নেতৃত্বে এই গবেষণায় বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জবাইয়ের ঠিক আগ মুহূর্তেও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ প্রয়োগ করা হয়ে থাকতে পারে। মুরগির খাদ্য ও পানীয় জলও দূষণের কারণ হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করে বলেছে, মানুষের শরীরে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক প্রবেশ করলে তা অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) তৈরি করে। ফলে সাধারণ সংক্রমণও নিরাময়ে ব্যর্থ হয়। বাংলাদেশে এএমআর-জনিত মৃত্যুর হার বাড়ছে।

এদিকে, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় আড়িয়াল বিলের কই, বাটা, মেনি, গুলশা টেংরা ও পুঁটি মাছের অন্ত্র, ফুলকা ও মাংসপেশিতে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে কই মাছে। বর্ষা, শীত ও শুষ্ক মৌসুমে প্রতিটি কই মাছের মাংসে গড়ে একটি করে প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।

গবেষণায় প্রতি লিটার পানিতে ১১ থেকে ৩১.৬৭টি এবং প্রতি কেজি পলিমাটিতে ১২.৩৩ থেকে ১২৭.৩৩টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। বর্ষাকালে পানিতে দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি ছিল। ৩৪ থেকে ৬৩ শতাংশ কণা ছিল মাইক্রোফাইবার, যার প্রধান উৎস কাপড় ধোয়ার পানি, গৃহস্থালির বর্জ্য ও মাছ ধরার জাল।

গবেষকরা বলছেন, মাছের অন্ত্র বা ফুলকায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়ার ঘটনা আগেও জানা গেছে। তবে মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত মাংসপেশিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. শাহজাহান বলেন, ‘বর্তমানে এসব মাছ খেয়ে সরাসরি ক্ষতির প্রমাণ নেই। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে এ ধরনের কণা জমতে থাকলে ২৫ থেকে ৩০ বছর পর এর প্রভাব দেখা দিতে পারে। পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।’

গবেষণায় পলিথিলিন, পলিপ্রোপিলিন, পলিস্টাইরিন, পলিভিনাইল ক্লোরাইড ও পলিকার্বোনেট শনাক্ত হয়েছে। আড়িয়াল বিলের পানি ও পলিমাটি উচ্চ পরিবেশগত ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলেও সতর্ক করেছে গবেষক দল।

গবেষণার এই তথ্য সামনে আসার মধ্যেই ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২১০-২৩০ টাকা কেজিতে। মাছের বাজারেও দাম বেশি। ফলে অনেক ক্রেতা কম দামি চাপিলা মাছের দিকে ঝুঁকছেন। কিছু কারখানায় মুরগির বিষ্ঠা দিয়ে মাছ চাষের অভিযোগও রয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করছে।

অধ্যাপক পেলিগ্যান্ড বলেন, ‘এটি একটি যুগান্তকারী গবেষণা। এতদিন এশিয়ায় একই মানদণ্ডে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়ালের অবশিষ্টাংশ পরিমাপের এমন তথ্য ছিল না। এই গবেষণা খাদ্য নিরাপত্তার উন্নতিতে কাজ করবে।’

গবেষক দল এখন পোলট্রি উৎপাদন চক্রে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধের ব্যবহার ও মাইক্রোপ্লাস্টিক কীভাবে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে, তা নিয়ে কাজ করছে।



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত