দেশে মারাত্মক আকার ধারণ করা হামের প্রাদুর্ভাব কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের থাবায় ঝরে গেল আরও তিনটি নিষ্পাপ প্রাণ। এই নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সরকারি হিসাবেই হামে আক্রান্ত হয়ে মোট ৮৪৭ জন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হলো। এর মধ্যে সন্দেহজনক হামে মারা গেছে ৭৫১ জন এবং নিশ্চিতভাবে হামের কারণে মৃত্যু হয়েছে ৯৬টি শিশুর। প্রতিনিয়তই দেশের কোনো না কোনো প্রান্তে হাম আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে, যা জন্ম দিচ্ছে এক আতঙ্কজনক পরিস্থিতির।
এদিকে
শেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন
করে ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৮০
জন শিশু। আক্রান্তদের মধ্যে ৯৬৭ জন সন্দেহজনক
এবং ১১৩ জন নিশ্চিতভাবে
হামে আক্রান্ত বলে শনাক্ত করা
হয়েছে। বিভাগভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, রাজধানীসহ
ঢাকা বিভাগে সন্দেহজনক হামে ৩৪৪ ও
নিশ্চিত হামে ৩৬ জন,
চট্টগ্রাম বিভাগে সন্দেহজনক ২৩৯ ও নিশ্চিত
২৪ জন, বরিশাল বিভাগে
সন্দেহজনক ১৩৩১ ও নিশ্চিত
১১ জন, সিলেট বিভাগে
সন্দেহজনক ১০১ ও নিশ্চিত
২৮ জন, খুলনা বিভাগে
সন্দেহজনক ৫০ জন, ময়মনসিংহে
সন্দেহজনক ৪৮ ও নিশ্চিত
৬ জন, রাজশাহী বিভাগে
সন্দেহজনক ২৯ ও নিশ্চিত
৬ জন এবং রংপুর
বিভাগে সন্দেহজনক ১৯ ও নিশ্চিত
২ জন শিশু নতুন
করে আক্রান্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য
অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) ডা. জাহিদ রায়হান
দেশের সার্বিক চিত্র তুলে ধরে নিয়মিত
তথ্যে বিষয়গুলো নিশ্চিত করেছেন। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের
মতে, উদ্বেগের বিষয় হলো যেসব
শিশু হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে বাসাবাড়িতে
চিকিৎসাধীন রয়েছে, তাদের বড় একটি অংশ
সরকারি হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে। ওই
সব আক্রান্ত শিশুর তথ্য সঠিকভাবে সংগৃহীত
হলে আক্রান্ত ও মৃতের প্রকৃত
সংখ্যা আরও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে
পারে বলে মনে করছেন
সংশ্লিষ্টরা।
টিকা
কভারেজ শতভাগ হলেও নিয়ন্ত্রণে নেই প্রাদুর্ভাব
দৈনিক
সংক্রমণ ও মৃত্যুর এই
উচ্চ হারের বিপরীতে সরকারের টিকাদান কর্মসূচির পরিসংখ্যান অবশ্য শতভাগের ঘর অতিক্রম করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের
৮টি বিভাগে ১৮ কোটি ১
লাখ ৫০ হাজার ৬৪টি
টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও গতকাল
পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ৯০
লাখ ৫ হাজার ৪০৯টি
টিকা, যা শতকরা হিসাবে
১০৫ শতাংশ। অন্যদিকে ১২টি সিটি কর্পোরেশন
এলাকায় ১৯ লাখ ৫
হাজার ৯৫০টি লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২০ লাখ ৪৫
হাজার ১৯০টি টিকা দেওয়া হয়েছে,
যার অর্জিত হার ১০৭ শতাংশ।
টিকাদানের এমন রেকর্ড সাফল্যের
পরও কেন রোগটি এভাবে
মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ছে,
তা নিয়ে জনমনে বড়
ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
চিকিৎসার
খরচে নিঃস্ব ৮৯ শতাংশ পরিবার, জমানো সঞ্চয় শেষ
সন্তান
হারানোর এই চরম মানসিক
বেদনার পাশাপাশি হামে আক্রান্ত পরিবারগুলোকে
কী পরিমাণ আর্থিক বিপর্যয় ও সামাজিক সংকটের
মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তা
উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর সমীক্ষায়।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি
(বিডিআরসিএস) এবং আন্তর্জাতিক মানবিক
সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস
অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের
(আইএফআরসি) যৌথ জরিপ রিপোর্টে
এই করুণ চিত্র প্রকাশিত
হয়।
দেশের
১২টি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা
হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া ২ হাজার ৭৪৬টি
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ওপর পরিচালিত এই
সমীক্ষায় দেখা যায়, আক্রান্ত
শিশুদের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে
প্রায় ৮৯ শতাংশ পরিবারকে
কঠিন ঋণের জালে জড়াতে
হয়েছে। এছাড়া প্রতি ১০টি পরিবারের মধ্যে
৬টিরও বেশি (প্রায় ৬১ শতাংশ) পরিবারকে
বাধ্য হয়ে নিজেদের জমানো
সব সঞ্চয় ভেঙে ফেলতে হয়েছে।
চিকিৎসার খরচ জোগাতে ৪
শতাংশ পরিবার তাদের শেষ সম্বল বিক্রি
করেছে এবং ৩ শতাংশ
পরিবার জীবন বাঁচাতে সাহায্য
বা অনুদানের ওপর নির্ভর করতে
বাধ্য হয়েছে।
সমীক্ষা
অনুযায়ী, আক্রান্ত রোগীদের ৭৫ শতাংশেরই বয়স
৪ বছরের নিচে। এছাড়া ৫ থেকে ১৭
বছর বয়সী রোগী ১৯
শতাংশ এবং ১৮ বছরের
বেশি বয়সী রোগী রয়েছে
৬ শতাংশ। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, একটি শিশুর
চিকিৎসা ও আনুমানিক অন্যান্য
আনুষঙ্গিক খরচে প্রতিটি পরিবারকে
গড়ে প্রায় ১৬ হাজার টাকা
করে ব্যয় করতে হয়েছে।
আয়ের
পথ বন্ধ, কাজ হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় নিম্নবিত্তরা
জরিপে
অংশ নেওয়া ৭৮ শতাংশ পরিবারই
মূলত অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন,
যাদের মাসিক আয় অত্যন্ত সীমিত—মাত্র ৬ হাজার থেকে
২০ হাজার টাকার মধ্যে। শিশুরা দীর্ঘ সময় ধরে হাসপাতালে
ভর্তি থাকায় কাজের লোক বা অভিভাবকরা
আয়-রোজগারের সুযোগ হারিয়েছেন, এমনকি অনেকের ক্ষেত্রে চাকরি হারানোর মতো নির্মম ঘটনাও
ঘটেছে। জরিপভুক্ত শতভাগ পরিবারই এই ধকল সামলে
উঠতে দ্রুত মানবিক ও আর্থিক সহায়তার
তাগিদ দিয়েছে। এর মধ্যে ৩৫
শতাংশ পরিবার জরুরি ওষুধ, ৩৩ শতাংশ পানি
ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) এবং ২২ শতাংশ
পরিবার খাদ্য সহায়তার দাবি জানিয়েছে।
রংপুরের
বাসিন্দা হাজেরা খাতুন তেমনি এক ভুক্তভোগী মা।
গত জুন মাসে তিনি
তার ১১ মাস বয়সী
অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় এসে
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি
করান। চিকিৎসকের পরামর্শ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায়
এ পর্যন্ত তাদের ৭০ হাজার টাকার
বেশি গলে গেছে। নিজের
করুণ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে হাজেরা
খাতুন বলেন, "সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে হলেও এর বাইরে
অনেক খরচ থাকে। শুধু
অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় আসতেই
আমাদের প্রায় ২০ হাজার টাকা
খরচ হয়েছে। প্রতিদিন খাবার কিনতে হচ্ছে, বিভিন্ন মেডিকেল পরীক্ষার খরচ দিতে হচ্ছে,
সঙ্গে আরও নানা দৈনন্দিন
ব্যয় রয়েছে।" কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি আরও বলেন,
"আমি ইতোমধ্যে আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে টাকা
ধার করেছি। আমার স্বামী সৌদি
আরবে কাজ করেন, কিন্তু
এই মাসে তিনি বেতন
পাননি। এতে আমাদের পরিস্থিতি
আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।"
মানবিক
সহায়তা বৃদ্ধি ও যৌথ পদক্ষেপের আহ্বান
পরিস্থিতি
মোকাবেলায় জরিপের নির্ধারিত ঝুঁকির মানদণ্ড অনুযায়ী সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার ৪০০টি
পরিবারকে আপদকালীন ১০ হাজার টাকা
করে জরুরি নগদ অর্থ সহায়তার
জন্য মনোনীত করা হয়েছে। বর্তমান
ভয়াবহ সংকটের বিষয়ে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির
সেক্রেটারি জেনারেল কবির এম আশরাফ
আলম বলেন, "এই মূল্যায়নে দেখা
যাচ্ছে, অনেক পরিবার শুধু
স্বাস্থ্য সংকট নয়, একই
সঙ্গে বড় ধরনের আর্থিক
সংকটেরও মুখোমুখি হয়েছে। আমাদের জরুরি সাড়ার অংশ হিসেবে আমরা
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নগদ সহায়তা দিচ্ছি
এবং একই সঙ্গে কমিউনিটিতে
সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।"
একই
সুর মিলিয়ে বাংলাদেশে আইএফআরসির হেড অব ডেলিগেশন
আলবার্তো বোকানেগ্রা মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বলেন,
"হামের এই স্বাস্থ্য জরুরি
অবস্থার প্রভাব শুধু হাসপাতালের মধ্যেই
সীমাবদ্ধ থাকছে না। অসুস্থ শিশু
বা পরিবারের অন্য সদস্যের যত্ন
নিতে গিয়ে অনেক পরিবার
কঠিন আর্থিক সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে। এই
মূল্যায়নের ফলাফল বলছে, জনস্বাস্থ্যের জন্য জরুরি পরিস্থিতিতে
মানবিক সহায়তা এবং শক্তিশালী সামাজিক
সুরক্ষা–দুটোই জরুরি। আমাদের কার্যক্রম অবশ্যই তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে
পরিচালিত হওয়া উচিত।"
বর্তমানে আইএফআরসির সার্বিক সহযোগিতায় বাংলাদেশ সরকারের এই বৃহৎ টিকাদান কর্মসূচিতে সরাসরি অংশ নিচ্ছে বিডিআরসিএস। টিকাদান কেন্দ্র পরিচালনা ও সাধারণ মানুষকে টিকা গ্রহণে আগ্রহী করতে মাঠপর্যায়ে ১ হাজারের বেশি রেড ক্রিসেন্ট স্বেচ্ছাসেবক নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। চিকিৎসকদের মতে, কেবল টিকাদানই নয়, প্রান্তিক পরিবারগুলোকে সামাজিক নিরাপত্তা দেওয়া ও দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনাই এখন হামের এই বিধ্বংসী মহামারী ঠেকানোর একমাত্র পথ।

সোমবার, ০৩ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ আগস্ট ২০২৬
দেশে মারাত্মক আকার ধারণ করা হামের প্রাদুর্ভাব কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের থাবায় ঝরে গেল আরও তিনটি নিষ্পাপ প্রাণ। এই নিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সরকারি হিসাবেই হামে আক্রান্ত হয়ে মোট ৮৪৭ জন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হলো। এর মধ্যে সন্দেহজনক হামে মারা গেছে ৭৫১ জন এবং নিশ্চিতভাবে হামের কারণে মৃত্যু হয়েছে ৯৬টি শিশুর। প্রতিনিয়তই দেশের কোনো না কোনো প্রান্তে হাম আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে, যা জন্ম দিচ্ছে এক আতঙ্কজনক পরিস্থিতির।
এদিকে
শেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন
করে ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৮০
জন শিশু। আক্রান্তদের মধ্যে ৯৬৭ জন সন্দেহজনক
এবং ১১৩ জন নিশ্চিতভাবে
হামে আক্রান্ত বলে শনাক্ত করা
হয়েছে। বিভাগভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, রাজধানীসহ
ঢাকা বিভাগে সন্দেহজনক হামে ৩৪৪ ও
নিশ্চিত হামে ৩৬ জন,
চট্টগ্রাম বিভাগে সন্দেহজনক ২৩৯ ও নিশ্চিত
২৪ জন, বরিশাল বিভাগে
সন্দেহজনক ১৩৩১ ও নিশ্চিত
১১ জন, সিলেট বিভাগে
সন্দেহজনক ১০১ ও নিশ্চিত
২৮ জন, খুলনা বিভাগে
সন্দেহজনক ৫০ জন, ময়মনসিংহে
সন্দেহজনক ৪৮ ও নিশ্চিত
৬ জন, রাজশাহী বিভাগে
সন্দেহজনক ২৯ ও নিশ্চিত
৬ জন এবং রংপুর
বিভাগে সন্দেহজনক ১৯ ও নিশ্চিত
২ জন শিশু নতুন
করে আক্রান্ত হয়েছে।
স্বাস্থ্য
অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) ডা. জাহিদ রায়হান
দেশের সার্বিক চিত্র তুলে ধরে নিয়মিত
তথ্যে বিষয়গুলো নিশ্চিত করেছেন। তবে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের
মতে, উদ্বেগের বিষয় হলো যেসব
শিশু হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে বাসাবাড়িতে
চিকিৎসাধীন রয়েছে, তাদের বড় একটি অংশ
সরকারি হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে। ওই
সব আক্রান্ত শিশুর তথ্য সঠিকভাবে সংগৃহীত
হলে আক্রান্ত ও মৃতের প্রকৃত
সংখ্যা আরও আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে
পারে বলে মনে করছেন
সংশ্লিষ্টরা।
টিকা
কভারেজ শতভাগ হলেও নিয়ন্ত্রণে নেই প্রাদুর্ভাব
দৈনিক
সংক্রমণ ও মৃত্যুর এই
উচ্চ হারের বিপরীতে সরকারের টিকাদান কর্মসূচির পরিসংখ্যান অবশ্য শতভাগের ঘর অতিক্রম করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের
৮টি বিভাগে ১৮ কোটি ১
লাখ ৫০ হাজার ৬৪টি
টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও গতকাল
পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে ১ কোটি ৯০
লাখ ৫ হাজার ৪০৯টি
টিকা, যা শতকরা হিসাবে
১০৫ শতাংশ। অন্যদিকে ১২টি সিটি কর্পোরেশন
এলাকায় ১৯ লাখ ৫
হাজার ৯৫০টি লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে ২০ লাখ ৪৫
হাজার ১৯০টি টিকা দেওয়া হয়েছে,
যার অর্জিত হার ১০৭ শতাংশ।
টিকাদানের এমন রেকর্ড সাফল্যের
পরও কেন রোগটি এভাবে
মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ছে,
তা নিয়ে জনমনে বড়
ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
চিকিৎসার
খরচে নিঃস্ব ৮৯ শতাংশ পরিবার, জমানো সঞ্চয় শেষ
সন্তান
হারানোর এই চরম মানসিক
বেদনার পাশাপাশি হামে আক্রান্ত পরিবারগুলোকে
কী পরিমাণ আর্থিক বিপর্যয় ও সামাজিক সংকটের
মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তা
উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক চাঞ্চল্যকর সমীক্ষায়।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি
(বিডিআরসিএস) এবং আন্তর্জাতিক মানবিক
সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস
অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজের
(আইএফআরসি) যৌথ জরিপ রিপোর্টে
এই করুণ চিত্র প্রকাশিত
হয়।
দেশের
১২টি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা
হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া ২ হাজার ৭৪৬টি
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের ওপর পরিচালিত এই
সমীক্ষায় দেখা যায়, আক্রান্ত
শিশুদের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে
প্রায় ৮৯ শতাংশ পরিবারকে
কঠিন ঋণের জালে জড়াতে
হয়েছে। এছাড়া প্রতি ১০টি পরিবারের মধ্যে
৬টিরও বেশি (প্রায় ৬১ শতাংশ) পরিবারকে
বাধ্য হয়ে নিজেদের জমানো
সব সঞ্চয় ভেঙে ফেলতে হয়েছে।
চিকিৎসার খরচ জোগাতে ৪
শতাংশ পরিবার তাদের শেষ সম্বল বিক্রি
করেছে এবং ৩ শতাংশ
পরিবার জীবন বাঁচাতে সাহায্য
বা অনুদানের ওপর নির্ভর করতে
বাধ্য হয়েছে।
সমীক্ষা
অনুযায়ী, আক্রান্ত রোগীদের ৭৫ শতাংশেরই বয়স
৪ বছরের নিচে। এছাড়া ৫ থেকে ১৭
বছর বয়সী রোগী ১৯
শতাংশ এবং ১৮ বছরের
বেশি বয়সী রোগী রয়েছে
৬ শতাংশ। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, একটি শিশুর
চিকিৎসা ও আনুমানিক অন্যান্য
আনুষঙ্গিক খরচে প্রতিটি পরিবারকে
গড়ে প্রায় ১৬ হাজার টাকা
করে ব্যয় করতে হয়েছে।
আয়ের
পথ বন্ধ, কাজ হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় নিম্নবিত্তরা
জরিপে
অংশ নেওয়া ৭৮ শতাংশ পরিবারই
মূলত অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন,
যাদের মাসিক আয় অত্যন্ত সীমিত—মাত্র ৬ হাজার থেকে
২০ হাজার টাকার মধ্যে। শিশুরা দীর্ঘ সময় ধরে হাসপাতালে
ভর্তি থাকায় কাজের লোক বা অভিভাবকরা
আয়-রোজগারের সুযোগ হারিয়েছেন, এমনকি অনেকের ক্ষেত্রে চাকরি হারানোর মতো নির্মম ঘটনাও
ঘটেছে। জরিপভুক্ত শতভাগ পরিবারই এই ধকল সামলে
উঠতে দ্রুত মানবিক ও আর্থিক সহায়তার
তাগিদ দিয়েছে। এর মধ্যে ৩৫
শতাংশ পরিবার জরুরি ওষুধ, ৩৩ শতাংশ পানি
ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) এবং ২২ শতাংশ
পরিবার খাদ্য সহায়তার দাবি জানিয়েছে।
রংপুরের
বাসিন্দা হাজেরা খাতুন তেমনি এক ভুক্তভোগী মা।
গত জুন মাসে তিনি
তার ১১ মাস বয়সী
অসুস্থ মেয়েকে নিয়ে ঢাকায় এসে
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি
করান। চিকিৎসকের পরামর্শ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায়
এ পর্যন্ত তাদের ৭০ হাজার টাকার
বেশি গলে গেছে। নিজের
করুণ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে হাজেরা
খাতুন বলেন, "সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে হলেও এর বাইরে
অনেক খরচ থাকে। শুধু
অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় আসতেই
আমাদের প্রায় ২০ হাজার টাকা
খরচ হয়েছে। প্রতিদিন খাবার কিনতে হচ্ছে, বিভিন্ন মেডিকেল পরীক্ষার খরচ দিতে হচ্ছে,
সঙ্গে আরও নানা দৈনন্দিন
ব্যয় রয়েছে।" কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি আরও বলেন,
"আমি ইতোমধ্যে আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে টাকা
ধার করেছি। আমার স্বামী সৌদি
আরবে কাজ করেন, কিন্তু
এই মাসে তিনি বেতন
পাননি। এতে আমাদের পরিস্থিতি
আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।"
মানবিক
সহায়তা বৃদ্ধি ও যৌথ পদক্ষেপের আহ্বান
পরিস্থিতি
মোকাবেলায় জরিপের নির্ধারিত ঝুঁকির মানদণ্ড অনুযায়ী সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার ৪০০টি
পরিবারকে আপদকালীন ১০ হাজার টাকা
করে জরুরি নগদ অর্থ সহায়তার
জন্য মনোনীত করা হয়েছে। বর্তমান
ভয়াবহ সংকটের বিষয়ে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির
সেক্রেটারি জেনারেল কবির এম আশরাফ
আলম বলেন, "এই মূল্যায়নে দেখা
যাচ্ছে, অনেক পরিবার শুধু
স্বাস্থ্য সংকট নয়, একই
সঙ্গে বড় ধরনের আর্থিক
সংকটেরও মুখোমুখি হয়েছে। আমাদের জরুরি সাড়ার অংশ হিসেবে আমরা
সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নগদ সহায়তা দিচ্ছি
এবং একই সঙ্গে কমিউনিটিতে
সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি।"
একই
সুর মিলিয়ে বাংলাদেশে আইএফআরসির হেড অব ডেলিগেশন
আলবার্তো বোকানেগ্রা মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বলেন,
"হামের এই স্বাস্থ্য জরুরি
অবস্থার প্রভাব শুধু হাসপাতালের মধ্যেই
সীমাবদ্ধ থাকছে না। অসুস্থ শিশু
বা পরিবারের অন্য সদস্যের যত্ন
নিতে গিয়ে অনেক পরিবার
কঠিন আর্থিক সীমাবদ্ধতার মুখে পড়েছে। এই
মূল্যায়নের ফলাফল বলছে, জনস্বাস্থ্যের জন্য জরুরি পরিস্থিতিতে
মানবিক সহায়তা এবং শক্তিশালী সামাজিক
সুরক্ষা–দুটোই জরুরি। আমাদের কার্যক্রম অবশ্যই তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে
পরিচালিত হওয়া উচিত।"
বর্তমানে আইএফআরসির সার্বিক সহযোগিতায় বাংলাদেশ সরকারের এই বৃহৎ টিকাদান কর্মসূচিতে সরাসরি অংশ নিচ্ছে বিডিআরসিএস। টিকাদান কেন্দ্র পরিচালনা ও সাধারণ মানুষকে টিকা গ্রহণে আগ্রহী করতে মাঠপর্যায়ে ১ হাজারের বেশি রেড ক্রিসেন্ট স্বেচ্ছাসেবক নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। চিকিৎসকদের মতে, কেবল টিকাদানই নয়, প্রান্তিক পরিবারগুলোকে সামাজিক নিরাপত্তা দেওয়া ও দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনাই এখন হামের এই বিধ্বংসী মহামারী ঠেকানোর একমাত্র পথ।

আপনার মতামত লিখুন