বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, আড়িয়াল বিলের পাঁচ দেশি মাছের মধ্যে কই মাছের শরীরে সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক। কারণ হিসেবে গবেষকেরা চিহ্নিত করেছেন এর খাদ্যাভ্যাস ও আবাসস্থল।
মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন পরিবেশের সর্বত্র। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল আড়িয়াল বিলের পাঁচটি প্রজাতির মাছের (কই, বাটা, মেনি, গুলশা টেংরা ও পুঁটি) মাংসপেশি ও অন্ত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে কই মাছ-এ। গবেষণায় নেতৃত্ব দেন ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক মো. শাহজাহান।
গবেষকদের মতে, কই মাছের সর্বভুক স্বভাবই এর প্রধান কারণ। কই মাছ খাবারের সন্ধানে পানির তলানি ও প্ল্যাঙ্কটনের মধ্যে বিচরণ করে। এই তলানি ও প্ল্যাঙ্কটনের সঙ্গে মিশে থাকা প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণাগুলো সহজেই গ্রহণ করে। ফলে অন্য মাছের তুলনায় কই মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি বেশি।
বৈজ্ঞানিক পরিভাষায়, কই মাছ বেনথোপেলাজিক প্রকৃতির-যারা পানি ও তলানি-উভয় স্থানেই খাবার খোঁজে। একাধিক গবেষণা বলছে, বিস্তৃত আবাসস্থল ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাসের মাছেরা মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শে বেশি আসে। গবেষণায় দেখা গেছে, কই মাছের অন্ত্রে গড়ে ১.৭০ থেকে ১.৯০টি এবং ফুলকায় ১.৩০ থেকে ১.৪০টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।
তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো-কই মাছের মাংসপেশিতে অন্য চার প্রজাতির চেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। বর্ষা, শীত ও শুষ্ক-তিন মৌসুমেই প্রতিটি কই মাছের মাংসে গড়ে একটি করে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, অন্য চার প্রজাতির (বাটা, মেনি, গুলশা টেংরা ও পুঁটি) মাংসপেশিতে গড়ে ০.৫০-০.৯০টি কণা পাওয়া গেছে।
গবেষণা বলছে, মাছ সাধারণত অনিচ্ছাকৃতভাবেই মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করে। খাবার খোঁজার সময় বা শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় এগুলো পানির সঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে এগুলো অন্ত্র ও ফুলকার পাশাপাশি মাংসপেশিতেও জমা হতে পারে। আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা অনুযায়ী, ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলে।
অধ্যাপক মো. শাহজাহান বলেন, ‘বর্তমানে এসব মাছ খেয়ে সরাসরি ক্ষতির প্রমাণ নেই। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে এ ধরনের কণা জমতে থাকলে ২৫ থেকে ৩০ বছর পর এর প্রভাব দেখা দিতে পারে। পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।’
প্রসঙ্গত, গবেষণায় আড়িয়াল বিলের পানিতে প্রতি লিটারে ১১-৩১.৬৭টি এবং পলিমাটিতে প্রতি কেজিতে ১২.৩৩-১২৭.৩৩টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। বর্ষাকালে দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি ছিল। ফোরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপি পরীক্ষায় ৩৪-৬৩ শতাংশ কণা ছিল মাইক্রোফাইবার- যার প্রধান উৎস কাপড় ধোয়ার পানি, গৃহস্থালি বর্জ্য ও মাছ ধরার প্লাস্টিক জাল।
এই তথ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। কারণ কই মাছ বাংলাদেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি খাদ্য। আড়িয়াল বিলের মাছ নিয়মিত ঢাকাসহ আশপাশের বাজারে বিক্রি হয়। মাছের মাংসপেশিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মানে প্লাস্টিক কণা সরাসরি মানুষের খাদ্য শৃঙ্খলে প্রবেশ করছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক মো. শাহজাহানের নেতৃত্বে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ‘জার্নাল অব হ্যাজার্ডাস ম্যাটেরিয়ালস অ্যাডভান্সেস’-এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ।
গবেষণার আওতায় ২০২৪ সালের বর্ষাকাল, ২০২৪-২৫ সালের শীতকাল ও ২০২৫ সালের শুষ্ক মৌসুমে আড়িয়াল বিলের পাঁচটি স্থান থেকে পানি ও তলানির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। একই সময়ে পাঁচটি প্রজাতির (কই, বাটা, মেনি, গুলশা টেংরা ও পুঁটি) মোট ১৫০টি মাছের অন্ত্র, ফুলকা ও মাংসপেশি পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়।
পরীক্ষাগার পরীক্ষায় পদ্ধতি ছিল- রাসায়নিক পরিপাক, ঘনত্বের ভিত্তিতে পৃথকীকরণ এবং ফিল্ট্রেশন; পলিমার শনাক্তকরণে ফুরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপি ব্যবহার করা হয়।

বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, আড়িয়াল বিলের পাঁচ দেশি মাছের মধ্যে কই মাছের শরীরে সবচেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক। কারণ হিসেবে গবেষকেরা চিহ্নিত করেছেন এর খাদ্যাভ্যাস ও আবাসস্থল।
মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন পরিবেশের সর্বত্র। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল আড়িয়াল বিলের পাঁচটি প্রজাতির মাছের (কই, বাটা, মেনি, গুলশা টেংরা ও পুঁটি) মাংসপেশি ও অন্ত্রে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে কই মাছ-এ। গবেষণায় নেতৃত্ব দেন ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক মো. শাহজাহান।
গবেষকদের মতে, কই মাছের সর্বভুক স্বভাবই এর প্রধান কারণ। কই মাছ খাবারের সন্ধানে পানির তলানি ও প্ল্যাঙ্কটনের মধ্যে বিচরণ করে। এই তলানি ও প্ল্যাঙ্কটনের সঙ্গে মিশে থাকা প্লাস্টিকের ক্ষুদ্র কণাগুলো সহজেই গ্রহণ করে। ফলে অন্য মাছের তুলনায় কই মাছের শরীরে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি বেশি।
বৈজ্ঞানিক পরিভাষায়, কই মাছ বেনথোপেলাজিক প্রকৃতির-যারা পানি ও তলানি-উভয় স্থানেই খাবার খোঁজে। একাধিক গবেষণা বলছে, বিস্তৃত আবাসস্থল ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাসের মাছেরা মাইক্রোপ্লাস্টিকের সংস্পর্শে বেশি আসে। গবেষণায় দেখা গেছে, কই মাছের অন্ত্রে গড়ে ১.৭০ থেকে ১.৯০টি এবং ফুলকায় ১.৩০ থেকে ১.৪০টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে।
তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো-কই মাছের মাংসপেশিতে অন্য চার প্রজাতির চেয়ে বেশি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে। বর্ষা, শীত ও শুষ্ক-তিন মৌসুমেই প্রতিটি কই মাছের মাংসে গড়ে একটি করে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, অন্য চার প্রজাতির (বাটা, মেনি, গুলশা টেংরা ও পুঁটি) মাংসপেশিতে গড়ে ০.৫০-০.৯০টি কণা পাওয়া গেছে।
গবেষণা বলছে, মাছ সাধারণত অনিচ্ছাকৃতভাবেই মাইক্রোপ্লাস্টিক গ্রহণ করে। খাবার খোঁজার সময় বা শ্বাস-প্রশ্বাসের সময় এগুলো পানির সঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে এগুলো অন্ত্র ও ফুলকার পাশাপাশি মাংসপেশিতেও জমা হতে পারে। আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা অনুযায়ী, ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলে।
অধ্যাপক মো. শাহজাহান বলেন, ‘বর্তমানে এসব মাছ খেয়ে সরাসরি ক্ষতির প্রমাণ নেই। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে শরীরে এ ধরনের কণা জমতে থাকলে ২৫ থেকে ৩০ বছর পর এর প্রভাব দেখা দিতে পারে। পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।’
প্রসঙ্গত, গবেষণায় আড়িয়াল বিলের পানিতে প্রতি লিটারে ১১-৩১.৬৭টি এবং পলিমাটিতে প্রতি কেজিতে ১২.৩৩-১২৭.৩৩টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। বর্ষাকালে দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি ছিল। ফোরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপি পরীক্ষায় ৩৪-৬৩ শতাংশ কণা ছিল মাইক্রোফাইবার- যার প্রধান উৎস কাপড় ধোয়ার পানি, গৃহস্থালি বর্জ্য ও মাছ ধরার প্লাস্টিক জাল।
এই তথ্য জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। কারণ কই মাছ বাংলাদেশের অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি খাদ্য। আড়িয়াল বিলের মাছ নিয়মিত ঢাকাসহ আশপাশের বাজারে বিক্রি হয়। মাছের মাংসপেশিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি মানে প্লাস্টিক কণা সরাসরি মানুষের খাদ্য শৃঙ্খলে প্রবেশ করছে।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক মো. শাহজাহানের নেতৃত্বে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ‘জার্নাল অব হ্যাজার্ডাস ম্যাটেরিয়ালস অ্যাডভান্সেস’-এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ।
গবেষণার আওতায় ২০২৪ সালের বর্ষাকাল, ২০২৪-২৫ সালের শীতকাল ও ২০২৫ সালের শুষ্ক মৌসুমে আড়িয়াল বিলের পাঁচটি স্থান থেকে পানি ও তলানির নমুনা সংগ্রহ করা হয়। একই সময়ে পাঁচটি প্রজাতির (কই, বাটা, মেনি, গুলশা টেংরা ও পুঁটি) মোট ১৫০টি মাছের অন্ত্র, ফুলকা ও মাংসপেশি পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়।
পরীক্ষাগার পরীক্ষায় পদ্ধতি ছিল- রাসায়নিক পরিপাক, ঘনত্বের ভিত্তিতে পৃথকীকরণ এবং ফিল্ট্রেশন; পলিমার শনাক্তকরণে ফুরিয়ার ট্রান্সফর্ম ইনফ্রারেড স্পেকট্রোস্কোপি ব্যবহার করা হয়।

আপনার মতামত লিখুন