সংবাদ

হুকোয় তামাক সেবনের দিনকাল


হাবিবুর রহমান স্বপন
হাবিবুর রহমান স্বপন
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬, ০৮:২৪ পিএম

হুকোয় তামাক সেবনের দিনকাল
ছবি : সংগৃহীত

হুক্কায় (হুকো) তামাকু সেবন ছিল বাংলার এক গ্রামীণ সংস্কৃতি। ষাট ও সত্তুরের দশকে বাংলা মুল্লুকে প্রায় প্রতিটি শ্রমজীবী পরিবারে এই হুক্কা ছিল। কৃষক, তাতী, কুলি, মজুর সকলেই তামাক সেবন করতো এমন হুক্কার মাধ্যমে।

অবস্থা সম্পন্ন গৃহস্থ পরিবারে হুক্কা দেখেছি। মুঠো মুঠো সুঘ্রাণ যুক্ত তামাক থাকতো বৈঠক ঘরের একপাশে। একাধিক হুক্কা থাকতো। আমি আমার দাদার বাড়িতে বৈঠক ঘরে এমন হুক্কা দেখেছি দুটি। একটি ব্যবহার করতো মুসলিম ক্ষেতমজুররা অপরটি ব্যবহার করতো হিন্দু শ্রমিক বা কারিগররা (কাঠমিস্ত্রী, কামার, নাপিত, মৃৎশিল্পীরা)। 

বর্ষাকাল তখন ছিল দীর্ঘ। আষাঢ় থেকে আশ্বিন। কার্তিক মাসকে তখন বলা হতো মরা কার্তিক। এই মাসে কলেরা, আমশায়, কালাজ্বর, টাইফয়েড জ্বরে বহু লোক মারা যেতো। বৃষ্টিপাতের পরিমাণও ছিল বেশি। একটানা ২১ দিন অবিশ্রান্ত বৃষ্টি হতে দেখেছি। আমরা স্কুলে যেতে পারি নাই শ্রাবণ মাসে। এই দীর্ঘ সময় আমার দাদা ও নানা বাড়ির বিশাল বৈঠক ঘরে কর্মহীন সময় কাটতো শ্রমজীবীদের। অখণ্ড অবসর। বৃষ্টির দিনগুলোতে কেউ জাল বুনতো, কেউ মাছ ধরার বিভিন্ন প্রকার ফাঁদ তৈরি করতো (চারো, খাদুম, দোয়াইর, পলো ইত্যাদি)। এসব তৈরি হতো বাঁশ দিয়ে। আরও তৈরি করতো কুলা, চালুনি, ডালা। বেত দিয়েও ডালা তৈরি হতো। আরও হতো ধামা, সাজি, টুরি।

বৃষ্টির দিনের দিনগুলোতে মাছ শিকার করা ছিল অন্যতম কাজ। বাড়ির আঙিনায় পানি। পানির মধ্যে ধান, পাট, আখ, কাউন, ভুরা ইত্যাদি ফসল। আমন ও আউশ ধান ক্ষেতে চার/ছয় হাত পানি। পানির মধ্যে মাছ ধরার নানা প্রকার জাল ও বাসন পাতা হতো। প্রচুর মাছ ধরা পড়তো। আমরা শিশুকাল ও কৈশোরে মাছ ধরতাম বৃষ্টিতে ভিজে।

শ্রাবণ মাসে পাট কেটে ধুয়ে ঘরে উঠানো ছিল সবচেয়ে পরিশ্রমের কাজ। একটানা বৃষ্টির কারণে পাট শুকানো ছিল দূরুহ কর্ম। কৃষক পরিবার সকলে নারী-পুরুষ, কিশোর-যুবক-যুবতী সকলে মিলে পাটের জন্য আক্লান্ত শ্রম দিতো।

বৃষ্টিভেজা দিনগুলোতে হুক্কায় তামাকের ধুঁয়া তুলে জমজমাট আড্ডা হতো বৈঠক ঘরে। শীতকালে শরীর গরম করতে দলবেঁধে কৃষিশ্রমিকদের হুকোয় সুখটান দিতে দেখেছি। আমাদের এলাকায় বৈঠক ঘরের আর একটি নাম আছে ‘আলগা ঘর’, ও ‘কাছারি ঘর’। অর্থাৎ এই ঘরের তিন দিকে বেড়া দেয়া থাকে আর একপাশ খোলা থাকে। ছনের ছাউনির চালা, বাঁশের খুঁটি ও পাটশোলার বেড়া। 

এখনকার সময়ের মতো সহজলভ্য থালা, কলস, চেয়ার টেবিল কিম্বা তৈরি করা ঘরের আসবাবপত্র পাওয়া যেতো না। আমার দাদা ও নানার বাড়িতে সকল সদস্যের এমনকি রাখাল, দিনমজুর সকলের জন্য কাঁসার থালা ছিল।পায়খানা ছিল কাঁচা। বাড়ির রান্না ঘর ও বসত ঘরে বড় বড় পেতলের কলস ছিল। পায়খানার ঘেরার মধ্যেই খোলা জায়গায় থাকতো একাধিক পেতলের বদনা।

মাঝে মধ্যে পেতলের বদনা, ঘটি, চামচ ইত্যাদি চুরি যেতো। 

চোর তামাক সেবন করতে এসে না-কি রেকি করে যেতো গৃহস্থ বাড়িতে। বৈঠক ঘরে তামাকু সেবন করে ফেরিওয়ালা কিম্বা বহিরাগতরা ঘুমিয়ে পড়তো। বৃষ্টিতে ভিজে কাদামাটির রাস্তায় চলাচল করাও ছিল কষ্টকর।

প্রতিটি অবস্থা সম্পন্ন গৃহস্থ বাড়িতে গরু/মহিষের গাড়ি ও নৌকা ছিল। মাঝারি কৃষক পরিবারেও ডিঙি নৌকা ছিল। অনেকে কলার ভেলায় কৃষি কাজ করেতো। আমরা ছোটরা সখ করে কলার ভেলা তৈরি করে পানিতে ঝাপ দিতাম।

নৌকায় হুক্কা থাকতো। বিশেষ করে জেলে, নিকারি ও মালটানা (পণ্য পরিবহন) বড় বড় নৌকায় থাকতো হুক্কা।

নারিকেলের খোল দিয়ে হুকো তৈরি করতে দেখেছি। বেদেরা হুকো তৈরি করতো। একটি লোহার প্যাঁচানি দিয়ে ঝুনা নারিকেলের শাঁস তুলে সুন্দর করে পরিস্কার করে তৈরি করা হতো হুকো। পানিতে পূর্ণকরা হতো হুকোর খোলটি। খোলের সঙ্গে নলচে আর তার উপরে কলকে সংযুক্ত করে হুকো বা হুক্কা তৈরি করা হতো। নলচের উপরের কলকের মধ্যে তামাক দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিলেই ধোঁয়া বের হয়। সেই ধোঁয়া খোলের মধ্যের পানিতে ফিল্টার হয়ে মুখে-নাকে এসে নেশাগ্রস্থ হতো ব্যবহারকারী। হুকোর তামাকে মেশানো হতো সুগন্ধি আতর। তামাকে যখন আগুন জ্বলে উঠতো তখন সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়তো আঙিনায়। নারীরা তামাক খেতো পানের সঙ্গে। কেউ কেউ তামাক দিয়ে গুল তৈরি করে ব্যবহার করতো। হাটে বাজারে তামাক বিক্রি হতো। ছোট বড় দলা বা মুঠো আকৃতির তামাক বিকিকিনির সঙ্গে জড়িত থাকতো নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়ী। কারণ তামাক হুকোয় ব্যবহার উপযোগী করাটাও ছিল মুন্সীয়ানা।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬


হুকোয় তামাক সেবনের দিনকাল

প্রকাশের তারিখ : ১০ আগস্ট ২০২৬

featured Image

হুক্কায় (হুকো) তামাকু সেবন ছিল বাংলার এক গ্রামীণ সংস্কৃতি। ষাট ও সত্তুরের দশকে বাংলা মুল্লুকে প্রায় প্রতিটি শ্রমজীবী পরিবারে এই হুক্কা ছিল। কৃষক, তাতী, কুলি, মজুর সকলেই তামাক সেবন করতো এমন হুক্কার মাধ্যমে।

অবস্থা সম্পন্ন গৃহস্থ পরিবারে হুক্কা দেখেছি। মুঠো মুঠো সুঘ্রাণ যুক্ত তামাক থাকতো বৈঠক ঘরের একপাশে। একাধিক হুক্কা থাকতো। আমি আমার দাদার বাড়িতে বৈঠক ঘরে এমন হুক্কা দেখেছি দুটি। একটি ব্যবহার করতো মুসলিম ক্ষেতমজুররা অপরটি ব্যবহার করতো হিন্দু শ্রমিক বা কারিগররা (কাঠমিস্ত্রী, কামার, নাপিত, মৃৎশিল্পীরা)। 

বর্ষাকাল তখন ছিল দীর্ঘ। আষাঢ় থেকে আশ্বিন। কার্তিক মাসকে তখন বলা হতো মরা কার্তিক। এই মাসে কলেরা, আমশায়, কালাজ্বর, টাইফয়েড জ্বরে বহু লোক মারা যেতো। বৃষ্টিপাতের পরিমাণও ছিল বেশি। একটানা ২১ দিন অবিশ্রান্ত বৃষ্টি হতে দেখেছি। আমরা স্কুলে যেতে পারি নাই শ্রাবণ মাসে। এই দীর্ঘ সময় আমার দাদা ও নানা বাড়ির বিশাল বৈঠক ঘরে কর্মহীন সময় কাটতো শ্রমজীবীদের। অখণ্ড অবসর। বৃষ্টির দিনগুলোতে কেউ জাল বুনতো, কেউ মাছ ধরার বিভিন্ন প্রকার ফাঁদ তৈরি করতো (চারো, খাদুম, দোয়াইর, পলো ইত্যাদি)। এসব তৈরি হতো বাঁশ দিয়ে। আরও তৈরি করতো কুলা, চালুনি, ডালা। বেত দিয়েও ডালা তৈরি হতো। আরও হতো ধামা, সাজি, টুরি।

বৃষ্টির দিনের দিনগুলোতে মাছ শিকার করা ছিল অন্যতম কাজ। বাড়ির আঙিনায় পানি। পানির মধ্যে ধান, পাট, আখ, কাউন, ভুরা ইত্যাদি ফসল। আমন ও আউশ ধান ক্ষেতে চার/ছয় হাত পানি। পানির মধ্যে মাছ ধরার নানা প্রকার জাল ও বাসন পাতা হতো। প্রচুর মাছ ধরা পড়তো। আমরা শিশুকাল ও কৈশোরে মাছ ধরতাম বৃষ্টিতে ভিজে।

শ্রাবণ মাসে পাট কেটে ধুয়ে ঘরে উঠানো ছিল সবচেয়ে পরিশ্রমের কাজ। একটানা বৃষ্টির কারণে পাট শুকানো ছিল দূরুহ কর্ম। কৃষক পরিবার সকলে নারী-পুরুষ, কিশোর-যুবক-যুবতী সকলে মিলে পাটের জন্য আক্লান্ত শ্রম দিতো।

বৃষ্টিভেজা দিনগুলোতে হুক্কায় তামাকের ধুঁয়া তুলে জমজমাট আড্ডা হতো বৈঠক ঘরে। শীতকালে শরীর গরম করতে দলবেঁধে কৃষিশ্রমিকদের হুকোয় সুখটান দিতে দেখেছি। আমাদের এলাকায় বৈঠক ঘরের আর একটি নাম আছে ‘আলগা ঘর’, ও ‘কাছারি ঘর’। অর্থাৎ এই ঘরের তিন দিকে বেড়া দেয়া থাকে আর একপাশ খোলা থাকে। ছনের ছাউনির চালা, বাঁশের খুঁটি ও পাটশোলার বেড়া। 

এখনকার সময়ের মতো সহজলভ্য থালা, কলস, চেয়ার টেবিল কিম্বা তৈরি করা ঘরের আসবাবপত্র পাওয়া যেতো না। আমার দাদা ও নানার বাড়িতে সকল সদস্যের এমনকি রাখাল, দিনমজুর সকলের জন্য কাঁসার থালা ছিল।পায়খানা ছিল কাঁচা। বাড়ির রান্না ঘর ও বসত ঘরে বড় বড় পেতলের কলস ছিল। পায়খানার ঘেরার মধ্যেই খোলা জায়গায় থাকতো একাধিক পেতলের বদনা।

মাঝে মধ্যে পেতলের বদনা, ঘটি, চামচ ইত্যাদি চুরি যেতো। 

চোর তামাক সেবন করতে এসে না-কি রেকি করে যেতো গৃহস্থ বাড়িতে। বৈঠক ঘরে তামাকু সেবন করে ফেরিওয়ালা কিম্বা বহিরাগতরা ঘুমিয়ে পড়তো। বৃষ্টিতে ভিজে কাদামাটির রাস্তায় চলাচল করাও ছিল কষ্টকর।

প্রতিটি অবস্থা সম্পন্ন গৃহস্থ বাড়িতে গরু/মহিষের গাড়ি ও নৌকা ছিল। মাঝারি কৃষক পরিবারেও ডিঙি নৌকা ছিল। অনেকে কলার ভেলায় কৃষি কাজ করেতো। আমরা ছোটরা সখ করে কলার ভেলা তৈরি করে পানিতে ঝাপ দিতাম।

নৌকায় হুক্কা থাকতো। বিশেষ করে জেলে, নিকারি ও মালটানা (পণ্য পরিবহন) বড় বড় নৌকায় থাকতো হুক্কা।

নারিকেলের খোল দিয়ে হুকো তৈরি করতে দেখেছি। বেদেরা হুকো তৈরি করতো। একটি লোহার প্যাঁচানি দিয়ে ঝুনা নারিকেলের শাঁস তুলে সুন্দর করে পরিস্কার করে তৈরি করা হতো হুকো। পানিতে পূর্ণকরা হতো হুকোর খোলটি। খোলের সঙ্গে নলচে আর তার উপরে কলকে সংযুক্ত করে হুকো বা হুক্কা তৈরি করা হতো। নলচের উপরের কলকের মধ্যে তামাক দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিলেই ধোঁয়া বের হয়। সেই ধোঁয়া খোলের মধ্যের পানিতে ফিল্টার হয়ে মুখে-নাকে এসে নেশাগ্রস্থ হতো ব্যবহারকারী। হুকোর তামাকে মেশানো হতো সুগন্ধি আতর। তামাকে যখন আগুন জ্বলে উঠতো তখন সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়তো আঙিনায়। নারীরা তামাক খেতো পানের সঙ্গে। কেউ কেউ তামাক দিয়ে গুল তৈরি করে ব্যবহার করতো। হাটে বাজারে তামাক বিক্রি হতো। ছোট বড় দলা বা মুঠো আকৃতির তামাক বিকিকিনির সঙ্গে জড়িত থাকতো নির্দিষ্ট কিছু ব্যবসায়ী। কারণ তামাক হুকোয় ব্যবহার উপযোগী করাটাও ছিল মুন্সীয়ানা।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত