সংবাদ

যমুনা ও পদ্মা থেকে বালু উত্তোলনে হুমকিতে কাঠামো, বাঁধ ও গ্রিড লাইন


নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, পাবনা
নিজস্ব বার্তা পরিবেশক, পাবনা
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:১৩ পিএম

যমুনা ও পদ্মা থেকে বালু উত্তোলনে হুমকিতে কাঠামো, বাঁধ ও গ্রিড লাইন
পাবনার বেড়া উপজেলায় পদ্মা ও যমুনা নদীতে ইংলিশ কাটার মেশিন বসিয়ে তোলা হচ্ছে বালু। ছবি : সংবাদ

পাবনার বেড়া উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত যমুনা ও পদ্মা নদীর তলদেশে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘ইংলিশ কাটার’ মেশিন বসিয়ে ভূ-অভ্যন্তরের কাঠামো ভেঙে তছনছ করে অবাধে তোলা হচ্ছে বালু। তুলনামূলক বেশি লাভজনক হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসনের বারবার অভিযানের পরও থামানো যাচ্ছে না এই অনৈতিক কর্মকাণ্ড। নদী তলদেশের ১৫ থেকে ২০ ফুট গভীর থেকে বালু তোলায় ভূস্তর ও নদীর স্বাভাবিক সমতল বা ‘বেড লেভেল’ এলোমেলো হয়ে পড়ছে। এতে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে পাবনা অঞ্চলে যান্ত্রিক শক্তি প্রয়োগ করে নদী থেকে বালু উত্তোলন শুরু হয়, যা পরে সিরাজগঞ্জ হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। পাবনার নদ-নদী থেকে কী পরিমাণ বালু উত্তোলনের ফলে তলদেশে কতটা ফাঁকা বা শূন্যতার (ভ্যাকুয়াম) সৃষ্টি হয়েছে, তা পরিমাপ করা হয়নি। স্থানীয় প্রশাসন মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে ড্রেজার আটক এবং জরিমানা করলেও কিছুদিন পর পরিস্থিতি আবার আগের রূপ নেয়। এদিকে বালু উত্তোলনের পেছনে কাজীরহাট নৌ-ফাঁড়ির পুলিশ ও ইনচার্জের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, পদ্মা ও যমুনা নদী থেকে স্থানীয় প্রভাবশালী দুই রাজনৈতিক নেতা ড্রেজারের সাহায্যে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করছেন। তারা ইংলিশ কাটার মেশিনে প্রতি রাতে লাখের বেশি ঘনফুট বালু তুলছেন। এতে নদীর তীর সংরক্ষণ বাঁধ, রেলস্টেশন এবং পূর্ব-পশ্চিম জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন গ্রিডের টাওয়ার নদীভাঙনের মুখে পড়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, যমুনা নদীর নাটানখোলা, কাজীরহাট ফেরিঘাট ও ঢালানচর রেলস্টেশনের অদূরে পদ্মা নদীতে প্রতি রাতে বালু তুলে কার্গোজাহাজে করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে। এতে সরকার বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অন্যদিকে, নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন হওয়ায় গত তিন বছরে অন্তত ৫০০ বসতবাড়ি, প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক, কবরস্থান, মসজিদ, মন্দির ও বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

বেড়ার নাটানখোলায় অবস্থিত পূর্ব-পশ্চিম জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের টাওয়ারের মাত্র ১৫০ মিটার দূর দিয়ে যমুনা প্রবাহিত হচ্ছে। বালু উত্তোলনের ফলে পুরো জাতীয় গ্রিডের টাওয়ারটি এখন চরম ঝুঁকিতে। একই সঙ্গে কাজীরহাট ফেরিঘাট ও পাবনা-ঢালানচর রেলপথের দিকে নদী ক্রমশ সরে আসছে। এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডে স্থানীয় বিএনপি নেতা জুয়েল ফকির ও বাতেন ফকির জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। নৌ-পুলিশের সহায়তায় এসব চলছে বলেও দাবি স্থানীয়দের।

তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে বেড়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. বাতেন ফকিরের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। আর কাজীরহাট নৌ-ফাঁড়ির পরিদর্শক মো. এনামুল হক জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন, তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের কারণে ভূগর্ভের বিন্যাস নষ্ট হচ্ছে এবং পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। রিখটার স্কেলে মাঝারি ধরনের ভূমিকম্প হলেও এসব এলাকা দেবে যাওয়ার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে।

বেড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, নদীভাঙন প্রতিরক্ষা কাজের গা ঘেঁষে বালু তোলা মারাত্মক হুমকি। বালু তোলার স্থানের চারপাশের এলাকা যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে। তাই এটি রোধে প্রশাসনকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রূবেল চাকমা জানান, কাজীরহাট ঘাটে পূর্বে অভিযান চালিয়ে বাতেন ফকিরকে হাতেনাতে ধরে জরিমানা করা হয়েছিল। রাতের বেলা বালু উত্তোলনের বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬


যমুনা ও পদ্মা থেকে বালু উত্তোলনে হুমকিতে কাঠামো, বাঁধ ও গ্রিড লাইন

প্রকাশের তারিখ : ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

পাবনার বেড়া উপজেলার উপর দিয়ে প্রবাহিত যমুনা ও পদ্মা নদীর তলদেশে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘ইংলিশ কাটার’ মেশিন বসিয়ে ভূ-অভ্যন্তরের কাঠামো ভেঙে তছনছ করে অবাধে তোলা হচ্ছে বালু। তুলনামূলক বেশি লাভজনক হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসনের বারবার অভিযানের পরও থামানো যাচ্ছে না এই অনৈতিক কর্মকাণ্ড। নদী তলদেশের ১৫ থেকে ২০ ফুট গভীর থেকে বালু তোলায় ভূস্তর ও নদীর স্বাভাবিক সমতল বা ‘বেড লেভেল’ এলোমেলো হয়ে পড়ছে। এতে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে জলজ প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে পাবনা অঞ্চলে যান্ত্রিক শক্তি প্রয়োগ করে নদী থেকে বালু উত্তোলন শুরু হয়, যা পরে সিরাজগঞ্জ হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। পাবনার নদ-নদী থেকে কী পরিমাণ বালু উত্তোলনের ফলে তলদেশে কতটা ফাঁকা বা শূন্যতার (ভ্যাকুয়াম) সৃষ্টি হয়েছে, তা পরিমাপ করা হয়নি। স্থানীয় প্রশাসন মাঝে মাঝে অভিযান চালিয়ে ড্রেজার আটক এবং জরিমানা করলেও কিছুদিন পর পরিস্থিতি আবার আগের রূপ নেয়। এদিকে বালু উত্তোলনের পেছনে কাজীরহাট নৌ-ফাঁড়ির পুলিশ ও ইনচার্জের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগ রয়েছে, পদ্মা ও যমুনা নদী থেকে স্থানীয় প্রভাবশালী দুই রাজনৈতিক নেতা ড্রেজারের সাহায্যে বালু উত্তোলন করে বিক্রি করছেন। তারা ইংলিশ কাটার মেশিনে প্রতি রাতে লাখের বেশি ঘনফুট বালু তুলছেন। এতে নদীর তীর সংরক্ষণ বাঁধ, রেলস্টেশন এবং পূর্ব-পশ্চিম জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন গ্রিডের টাওয়ার নদীভাঙনের মুখে পড়েছে।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, যমুনা নদীর নাটানখোলা, কাজীরহাট ফেরিঘাট ও ঢালানচর রেলস্টেশনের অদূরে পদ্মা নদীতে প্রতি রাতে বালু তুলে কার্গোজাহাজে করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে। এতে সরকার বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অন্যদিকে, নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তন হওয়ায় গত তিন বছরে অন্তত ৫০০ বসতবাড়ি, প্রাথমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক, কবরস্থান, মসজিদ, মন্দির ও বিপুল পরিমাণ ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

বেড়ার নাটানখোলায় অবস্থিত পূর্ব-পশ্চিম জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের টাওয়ারের মাত্র ১৫০ মিটার দূর দিয়ে যমুনা প্রবাহিত হচ্ছে। বালু উত্তোলনের ফলে পুরো জাতীয় গ্রিডের টাওয়ারটি এখন চরম ঝুঁকিতে। একই সঙ্গে কাজীরহাট ফেরিঘাট ও পাবনা-ঢালানচর রেলপথের দিকে নদী ক্রমশ সরে আসছে। এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডে স্থানীয় বিএনপি নেতা জুয়েল ফকির ও বাতেন ফকির জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। নৌ-পুলিশের সহায়তায় এসব চলছে বলেও দাবি স্থানীয়দের।

তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে বেড়া উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. বাতেন ফকিরের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। আর কাজীরহাট নৌ-ফাঁড়ির পরিদর্শক মো. এনামুল হক জানান, বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবগত নন, তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের কারণে ভূগর্ভের বিন্যাস নষ্ট হচ্ছে এবং পানিতে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। রিখটার স্কেলে মাঝারি ধরনের ভূমিকম্প হলেও এসব এলাকা দেবে যাওয়ার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে।

বেড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, নদীভাঙন প্রতিরক্ষা কাজের গা ঘেঁষে বালু তোলা মারাত্মক হুমকি। বালু তোলার স্থানের চারপাশের এলাকা যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে। তাই এটি রোধে প্রশাসনকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রূবেল চাকমা জানান, কাজীরহাট ঘাটে পূর্বে অভিযান চালিয়ে বাতেন ফকিরকে হাতেনাতে ধরে জরিমানা করা হয়েছিল। রাতের বেলা বালু উত্তোলনের বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত