ওবায়েদ আকাশ বিশ শতকের নব্বইয়ের দশকের নিরন্তর সৃষ্টিশীল এক মেধাবী কবি, কবিতাই যার ধ্যান ও জ্ঞান। তিন দশকের অধিক সময় ধরে তিনি কাব্যচর্চা করে যাচ্ছেন নিরলসভাবে, হয়ে উঠেছেন দশকটির গুরুত্বপূর্ণ কবি। ‘সুবর্ণ আকাশ’ হলো তাঁর কাব্যকৃতি ও জীবন নিয়ে ৮০০ পৃষ্ঠার এক ঢাউস সংকলন, যাকে বলা হচ্ছে ‘কবি ওবায়েদ আকাশ সুবর্ণজয়ন্তী স্মারকগ্রন্থ’। ২০২২ সালে ওবায়েদ আকাশ ৫০ বছরে পা দিয়েছিলেন এবং তখনই সিদ্ধান্ত হয়েছিল জীবনের সুবর্ণজয়ন্তীকে লিপিবদ্ধ করে রাখা হবে এক সংকলনে। অগ্রজ, সমসাময়িক ও অনুজ মিলে সংকলনটিতে ওবায়েদ আকাশ ও তার কবিতা নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন ১৩৬ জন। এর বাইরে রয়ে গেছে ৫০টির মতো লেখা যেগুলো পরিসরের অভাবে ছাপা যায়নি। এসব তথ্য প্রমাণ করে ওবায়েদ আকাশ কবি, সম্পাদক ও মানুষ হিসেবে খুবই জনপ্রিয়। তিনি দখল করে আছেন বহু কবি ও লেখকের অন্তরের কিছু কিছু অঞ্চল।
৩১ জুলাই বিকেল ও সন্ধ্যায় সুবর্ণ আকাশ-এর প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হলো বাংলা একাডেমির কবি জসীম উদদীন ভবনের সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সভাগৃহে। প্রকাশনা উৎসবকে ঘিরে যেহেতু কবি-লেখকদের এক সম্মিলন ঘটবে তাই এর অপর নাম ‘শুভেচ্ছা সম্মিলন’। অনুষ্ঠান শুরু হবে চারটায়, আমার পৌঁছাতে বিলম্ব হলো কুড়ি মিনিট, তাতে অবশ্য কোনো কিছু হারাতে হয়নি, কেননা অনুষ্ঠান তখনো শুরু হয়নি। একসময় বাংলা একাডেমির পুরনো ভবনের এই দ্বিতলটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এখানে মহাপরিচালক ও তার সচিব বসতেন। এই সভাগৃহটিতে কত যে গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে তার ইতিহাস লিখে রাখলে ৮০০ নয় ৮০০০ পৃষ্ঠা ছাড়িয়ে যেত।
অনুষ্ঠান শুরু হলো পৌনে পাঁচটায়। কবি ও শিল্পী স্বপন নাথ পোডিয়ামের পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে আগ্রহী মুখ নিয়ে অপেক্ষায় থাকা মাইক্রোফোনে তার ভরাট কণ্ঠ ভাসালেন। তিনি বললেন এ হলো ফিরে দেখা, তিন দশকের কাব্যপথচলার মূল্যায়ন। তিনি প্রথমেই মঞ্চে ডেকে নিলেন কবি বিমল গুহ, কবি ও নন্দনতাত্ত্বিক মাহফুজ আল-হোসেন, প্রাবন্ধিক সরকার আবদুল মান্নান, কবি সরকার আমিন, কবি খোকন মাহমুদ ও কবি নীলিমা নূরকে। এক মঞ্চে দুই সরকারকে দেখে জনতা উৎসাহী হলো তারা কী করে তা দেখতে।
‘সুবর্ণ আকাশ’ স্মারকগ্রন্থটির সম্পাদনা করেছেন মাহফুজ আল-হোসেন। সঙ্গতভাবেই স্বাগত বক্তব্য দিতে তাকে আহবান করা হলো। স্মারকগ্রন্থটির সম্পাদনা ও প্রকাশকে ‘জীবনের সবচেয়ে বড়ো অর্জন’ বললেন মাহফুজ আল-হোসেন। ওবায়েদ আকাশের সাথে বন্ধুত্বকে বললেন ‘জীবনের সবচেয়ে বড়ো পাওয়া’। তাদের বন্ধুত্ব যে গভীর ও শক্ত বন্ধনে আবদ্ধ তার সাক্ষী হলো দুবার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েও সুস্থ হয়ে ফিরে এসে তিনি বিপুল, আর বিপুল বলেই জটিল, কাজটি করে গেছেন। তিনি দমে যাননি, শেষাবধি কাজটি সম্পন্ন করেছেন। ওবায়েদ আকাশকে তিনি সম্বোধন করলেন ‘লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের একজন অগ্রবর্তী যোদ্ধা’ হিসেবে যিনি ‘শালুক’-এর মতো একটি সিরিয়াস ও উচ্চপ্রশংসিত লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা করে যাচ্ছেন বহু বছর ধরে, পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী পত্রিকা দৈনিক ‘সংবাদ’-এর সাহিত্য সাময়িকীর ৪ পৃষ্ঠা সম্পাদনা করছেন প্রায় দুই যুগ ধরে। তিনি বহু নবীন কবির লেখা প্রকাশ করেছেন। তাই সুবর্ণ আকাশে কেবল একটি তারা নয়, রয়েছে অনেক তারা। অনেক মূল্যায়নধর্মী লেখা রয়েছে স্মারকগ্রন্থটিতে। সেসব লেখায় যে ভাষা ব্যবহার করেছেন লেখকরা, এর নন্দনতাত্ত্বিক দিকের প্রশংসা করে তিনি বললেন যেন এক ধরনের ‘পাবলিক স্কুলিং’ ঘটছে। ওবায়েদ আকাশ খুবই উদ্যমী। তিনি, তার সতীর্থদের নিয়ে ‘শালুক সাহিত্য সন্ধ্যা’র আয়োজন করে থাকেন, তাদের নতুন চিন্তার দর্শন ‘অধুনাবাদ’কে একটি কাঠামো দান করেছেন।
মাহফুজ আল-হোসেনের কিছুটা আবেগতাড়িত বক্তৃতায় ফুটে উঠল ওবায়েদ আকাশের সাথে কাটানো অসংখ্য আড্ডার স্মৃতি, যাকে তিনি ‘জীবনের পরম সঞ্চয়’ বললেন। শারীরিক অসুস্থতা নিয়েও দীর্ঘ ৪ বছরের চেষ্টায় ‘সুবর্ণ আকাশ’ প্রকাশ করতে পেরে মাহফুজ আল-হোসেনকে পরিতৃপ্ত মনে হলো। প্রতিবার হাসপাতাল থেকে ফিরে তার একটিই পণ ছিল— আর তা হলো স্মারকগ্রন্থটি প্রকাশ করা।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সভাগৃহে একে একে প্রবেশ করছিল অতিথিরা। এমনি দুজন, দুজনেই কবি-সরকার মাসুদ ও ভাগ্যধন বড়ুয়াকে মঞ্চে এসে বসতে আমন্ত্রণ জানালেন স্বপন নাথ। ভাগ্যধন এসে মঞ্চে বসলেও সরকার মাসুদকে কোথাও দেখা গেল না। আমার কেন জানি না মনে হলো— ঘাই দিয়ে মাছ পালিয়ে গেছে বড়শি থেকে।
এ অবসরে ওবায়েদ আকাশের কবিতা থেকে আবৃত্তি করলেন বাচিক শিল্পী নায়লা তারান্নুম। আশ্চর্য যে এই বাচিক শিল্পীকে আমি পরপর তিনটি অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করতে শুনলাম। কবিতা আবৃত্তির আগে তিনি কবিকে পুস্পস্তবক অর্পণ করলেন। নায়লা তারান্নুমের কণ্ঠস্বর ভরাট এবং তিনি আবৃত্তি করেন চমৎকার, খুব সুস্পষ্ট তার উচ্চারণ। তিনি ওবায়েদ আকাশের দুটি কবিতা আবৃত্তি করলেন যার একটি নাম ‘প্রকৃতিপুত্র’। অন্য নামটি আমি ধরতে পারলাম না। আমার পাশে বসেছিলেন কবি বিনয় বর্মণ, তিনিও ধরতে পারেননি।
আবৃত্তির পরে আলোচনা করতে এলেন করি সরকার আমিন, তার হাতে ঢাউস স্মারকগ্রন্থটি। তিনি সেটা দর্শকশ্রোতাদের দিকে তুলে ধরে বললেন, এত বড়ো একটা বই, ঈর্ষা জাগাই স্বাভাবিক। আমরা তো মৃত মানুষকেও ঈর্ষা করি, জীবিত মানুষের প্রতি ঈর্ষা থাকা স্বাভাবিক। বইটিকে পুনরায় তুলে ধরে তিনি বললেন, এই বইটি ঈর্ষা তৈরি করেছে। এ কথা বলে সরকার আমিন চলে গেলেন ঈর্ষার ব্যাখ্যায়। তিনি ঈর্ষাকে প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়া ও মানবিক বলে আখ্যায়িত করলেন। বললেন আমরা রবীন্দ্রনাথকে ঈর্ষা করি, টি এস এলিয়টকে ঈর্ষা করি। কেন? কারণ আমরা তাঁদের মতো লিখতে পারি না, তাঁদের প্রতিভার সমান হতে পারি না। সরকার আমিন, তেজী ও উষ্ণীষের মতো উত্তোলিত চুলের সুদর্শন কবি, বললেন শুধু ঈর্ষা নয়, স্মারকগ্রন্থটি আনন্দও জোগায়। জীবনকে ভালোবাসলে রোগ কোনো প্রতিরোধক নয়। মাহফুজ আল-হোসেনের হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েও অদম্য মনোবল দিয়ে ফিরে আসার প্রসঙ্গে সরকার আমিন বললেন, তার নিজের হৃৎপিণ্ডেও দুটি রিং বসানো হয়েছিল এক যুগ আগে, তিনি প্রায়শ ভুলেই থাকেন সে কথা। আমিনের বক্তব্য, হৃদরোগ আবিস্কারের পর তার ভেতর ‘পাগলামি’ আরও বেড়েছে। হৃদরোগ হলো একপ্রকার সতর্কতা বা ‘ওয়ার্নিং’। আমিনের মনে পড়ল এমনকি কবি ওবায়েদ আকাশও একবার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এরপরে ওবায়েদ আকাশের সৃষ্টিশীলতা থেমে থাকেনি, বরং বেড়েছে। হৃদরোগ ও সৃষ্টিশীলতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সরকার আমিনের দৃষ্টি চলে যায় অতিথিদের মাঝে বসে থাকা কথাসাহিত্যিক নাসরিন জাহান ও কবি ঋজু রেজওয়ানের দিকে। তারা দুজনেই ক্যান্সারে আক্রান্ত। কিন্তু রোগ তাদের দমিয়ে রাখতে পারেনি। কেনন কবি-লেখকদের রয়েছে অদম্য প্রাণশক্তি।
ওবায়েদ আকাশকে ‘অকৃপণ হৃদয়ের মানুষ’ হিসেবে উল্লেখ করে সরকার আমিন বললেন, ওবায়েদ অনেক তরুণ কবিকে সাহায্য করেছে, আশ্রয় দিয়েছে। তার মগজে ভেসে উঠল একসঙ্গে কাটানো অনেক স্মৃতি, যার ভেতর একটি হলো ২০ বছর আগে রাজবাড়ী ভ্রমণ, মধ্যরাতে পদ্মার চর দেখতে যাওয়ার মতো পাগলামি।
সরকার আমিন বললেন, কবিতা দু প্রকার, এক, বক্তব্যপ্রধান; দুই, বোধপ্রধান। বক্তব্যপ্রধান কবিতায় সহজে ঢোকা যায়, কারণ সেখানে সিঁড়ি আছে। ওবায়েদ আকাশের কবিতায় সহজে ঢোকা যায় না, কারণ তার কবিতা বোধসম্পন্ন। সেখানি সিঁড়িটি খুঁজে পাওয়া কঠিন, কিন্তু একবার খুঁজে পেলে এর মনোহারিত্ব আবিষ্কার করা সহজ হয়। সরকার আমিনের মতে, ওবায়েদ আকাশের কবিতার নিজস্ব ভাষা তৈরি হয়েছে। কবিতায় নিজস্ব ভাষা তৈরি মৌলিক কাজ। এরপরে সভাগৃহের বাতি নামিয়ে ওবায়েদ আকাশ ও সুবর্ণ আকাশকে ঘিরে একটি ডকুমেন্টারি জাতীয় ছবি দেখানো হলো। ছবিটি নির্মাণ করেছেন বহু গুণের অধিকারী স্বপন নাথ।
ওবায়েদ আকাশের বন্ধু খোকন মাহমুদ একজন কবি। তাদের দুজনের বাড়ি রাজবাড়ী হলেও শৈশবে পরিচয় ছিল না। পরিচয় হলো ১৯৯৪ সালে আকাশ যখন সিনেপত্রিকা স্টারভিশনে চাকরি করতেন। দিনের শেষে আড্ডা হতো পত্রিকা অফিসে। আর আড্ডা হতো নব্বইয়ের কবি-লেখকদের উতরোল মিলনস্থল শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেটে। খোকন বললেন আমাদের যৌবন কেটেছে আজিজ মার্কেটের চত্বরে। স্টারভিশন থেকে ওবায়েদ আকাশ যখন জনকণ্ঠে যোগ দিল তখন খোকন মাহমুদ থাকতেন রাজবাড়ী, তখন যোগাযোগ ছিল চিঠিপত্রমারফত।
খোকন মাহমুদ বললেন ওবায়েদ আকাশ কবি হতে চেয়েছিল, তার প্রস্তুতিও ছিল, একটি জীবন সে উৎসর্গ করেছে কবিতার জন্য। শেষাবধি তার আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়েছে, সে কবি হয়েছে। খোকন মাহমুদের ভালো লাগে ওবায়েদ আকাশ তার বন্ধু, অনেক গল্প আছে একত্র পথচলার। সরকার আমিন যা বলেছেন খোকন মাহমুদও তা বললেন। বললেন ওবায়েদ আকাশের নিজস্ব কাব্যভাষা তৈরি হয়েছে, হাজার কবিতার মাঝেও তার কবিতা শনাক্ত করা যায়।
এর মাঝে বড়শি দেখে পালিয়ে যাওয়া বিরাট মৎস্য সরকার মাসুদ কী ভেবে টোপের কাছে এসেছেন। সঙ্গে সঙ্গে তাকে টেনে মঞ্চে তুললেন অনুষ্ঠান সঞ্চালক। মঞ্চে উঠতে অনীহ ছিলেন কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহান। তাকেও সাধ্যসাধনা করে মঞ্চে তুলতে হলো। কবি নাসির আহমেদ অগ্রজ কবি হিসেবে যে অনুষ্ঠানেই যান, তাকে মঞ্চে উঠতে হয় প্রধান অতিথি বা সভাপতি হিসেবে। তিনি জানেন ওটাই তার নিয়তি। নিয়তি মেনে তিনিও মঞ্চে ওঠেন।
ভাগ্যধন বড়ুয়া চট্টগ্রামে থাকেন, সেখানকার জাদরেল ডাক্তার তিনি। যেহেতু চট্টগ্রাম তাই একটু টুইস্ট করে বললেন আমি (চট্ট)গ্রাম থেকে এসেছি। বললেন কুমার নদ থেকে বুড়িগঙ্গা— ওবায়েদ আকাশের কাব্যপরিক্রমাটি বিস্তীর্ণ। কাব্যে বিস্তীর্ণ আকাশ, বন্ধুত্বেও বিস্তীর্ণ আকাশ। সে আকাশে তারা ওড়াওড়ি করেন। ভাগ্যধনও ওবায়েদ আকাশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বললেন, ওর সাথে থাকাটাই উদযাপন। তারা দু’বন্ধু ভারতে অনুষ্ঠিত দুটি আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে যোগ দিয়েছিলেন, প্রথমটি রাজস্থানে, দ্বিতীয়টি দিল্লিতে। দিল্লির সার্ক সাহিত্য উৎসবে আমিও ছিলাম। মনে পড়ছে আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল দিল্লি নগরীর এক হোস্টেলে ও নয়ডায় এক রিসার্চ ইনস্টিটিউটে। দু’বন্ধুর কক্ষ বরাদ্দ ছিল দুজায়গায়। ওবায়েদের সঙ্গে থাকার জন্য ভাগ্যধন তার আবাসন বদলে নিয়েছিল প্রথম দিনেই। ভাগ্যধন বড়ুয়া এই বলে শেষ করলেন যে, মুহূর্তই জীবন আর জীবনের ভালো মুহূর্তগুলোই মনে থাকে।
কবি ওবায়েদ আকাশের প্রতি কিছু মানুষের ভালোবাসা যে গভীর ও অকৃত্রিম তার একটি পরিচয় অসুস্থ শরীর নিয়েও কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহান আজকের সভাগৃহে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি ওবায়েদ আকাশের কবিতার ভেতর থেকে কিছু চমকে ওঠার মতো পঙ্ক্তি পাঠ করে শোনালেন। এমন একটি পঙ্ক্তি হলো ‘মেয়েটির স্যাঁতসেঁতে প্রকাণ্ড শরীর রৌদ্রে শুকাতে দেওয়া আছে’। পঙ্ক্তিটি পাঠ করে তিনি চমকে গেছেন। একজন সৃষ্টিশীল ফিকশন রাইটার হিসেবে এমন বাক্য তিনি খুঁজে বেড়ান এবং পেলে জুড়ে দেন লেখায়। ওবায়েদ আকাশের নিজের গ্রাম নিয়ে লেখা ‘পৃষ্ঠাজুড়ে সুলতানপুর’ কাব্যগ্রন্থটি তার ভীষণ ভালো লেগেছে। ওবায়েদের একটি কবিতায় লেখা আছে ‘তার পাশের ডালা থেকে একটি কর্তিত কাতলের মাথা/আমার ব্যাগের ভেতর লাফিয়ে ঢুকে গেল’— যার জাদুবাস্তবতা চমকে দেয়। আরেকটি পঙ্ক্তি আছে ‘মধ্যরাতের টিউকল থেকে অঝরে জল ঝরে পড়ে’। তিনি আরও কিছু চমকে ওঠার মতো বাক্য উদ্ধৃত করেছিলেন কিন্তু আমি তা হুবহু শুনতে পাইনি বা শুনলেও সঙ্গে সঙ্গে নোট করে নিতে পারিনি।
বললেন বইমেলায় একা একা ঘুরে বেড়াতেন। ওবায়েদ আকাশ সম্পাদিত ‘শালুক’-এর স্টলে এসে বসতেন। বললেন, শালুক একটা বিশাল ব্যাপার। অনুষ্ঠানের পুরো সময়টা নীলিমা নূর মঞ্চের এক প্রান্তে চুপচাপ বসেছিলেন। ডাক পড়লে মাইকের কাছে এসে শ্রোতাদের জানালেন তিনি ‘ঘরামি’ নামের একটি ছোট কাগজ সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন। ‘ঘরামি’র একটি সংখ্যায় তিনি কবি ওবায়েদ আকাশের একটি সাক্ষাৎকার ছেপেছিলেন। সেখানে টের পেয়েছেন কবিতা ও জীবন সম্পর্কে ওবায়েদ আকাশের বিস্তীর্ণ ধারণা। কবির একটি বড়ো গুণ তিনি নবীনদের উদ্বুদ্ধ করেন। এভাবে ওবায়েদ আকাশ একজন সোনার মানুষ হয়ে উঠেছেন বলেই নীলিমা নূরের বিশ্বাস।
মঞ্চের আরেক অতিথি প্রাবন্ধিক ও গবেষক সরকার আবদুল মান্নানের সাথে ওবায়েদ আকাশের পরিচয় দুই যুগের। ওবায়েদ আকাশ সেসময়ে কেবল সংবাদে যোগ দিয়েছেন কিংবদন্তি সম্পাদক আবুল হাসনাতের স্থলাভিষিক্ত হয়ে। প্রথম পরিচয়েই ওবায়েদ আকাশকে তার ভালো লেগে গিয়েছিল তার কথাবার্তা, নম্র আচরণ ও চিন্তার পরিচ্ছন্নতা দেখে। তিনি একবার খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে কবি জগদীশ গুপ্তের ওপর গবেষণা করে প্রবন্ধ লিখছিলেন আর সংবাদ সাময়িকীর পাতায় তা ছাপা হচ্ছিল। তিনি বললেন সংবাদের সাহিত্য পাতায় ওবায়েদ আকাশ প্রচুর নবীন কবিকে স্থান দিয়েছেন, প্রমোট করেছেন। তাদের একাংশ আজ এলে সভাগৃহটিতে ঠাঁই দেওয়া যেত না।
নাসরীন জাহানের মতো তারও প্রিয় কাব্যগ্রন্থ ‘পৃষ্ঠাজুড়ে সুলতানপুর’। তার নিজের পিতৃপুরুষের ভিটে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। শৈশবের চারণভূমি জলের অতলে বিলুপ্ত। এ প্রসঙ্গে সরকার আবদুল মান্নান একটি চমৎকার কথা বললেন। তিনি বললেন, ‘নদীর বুক ফুঁড়ে চর জেগে উঠলেই হারানো গ্রাম জাগে না।’ ‘পৃষ্ঠাজুড়ে সুলতানপুর’ পাঠ করে তার মনে হলো এ তার নিজের গ্রাম। তিনি এতটাই অভিভূত হয়ে পড়লেন যে, তা নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখে ফেললেন। প্রবন্ধটি ‘সুবর্ণ আকাশ’-এ আছে। প্রথমে ছিলেন দুই সরকার, পরে সরকার মাসুদ যোগ দিলে তিন সরকারই অধিষ্ঠিত হতো মঞ্চের সিংহাসনে, কিন্তু সরকার আমিন রাজা অষ্টম এডওয়ার্ডের মতো সিংহাসন পরিত্যাগ করে গিয়ে বসেছেন তার প্রণয়িনী শাহনাজ মুন্নীরূপী মিসেস সিম্পসনের পাশে।
কী প্রসঙ্গে তার মনে পড়ল একটি কবিতার পঙ্ক্তি, ‘তোমার হাসির শব্দে চমকে উঠছে বনফুল’। পঙ্ক্তিটি তার ভালো লেগেছিল। আরও দু’লাইন শোনালেন শ্রোতাদের, ‘তুমি কি জানো আমি কেন তারাভরা রাতে নড়বড়ে সেতুর উপর এসে দাঁড়াই?’ এসব পঙক্তি কি ওবায়েদ আকাশ রচিত নাকি তার নিজের, নাকি অন্য কোনো কবির, ঠিক ধরতে পারলাম না। সরকার মাসুদের পরে সংক্ষিপ্ত শুভেচ্ছা বক্তব্য দিলেন কবি চন্দন চৌধুরী। ‘বেহুলা বাংলা’ প্রকাশনা সংস্থা থেকে তিনি ওবায়েদ আকাশের দু’টি বই প্রকাশ করেছেন। ওই যে যাকে একটু আগে দরোজার পাশে বসে থাকতে দেখেছিলাম, সেই পিওনা আফরোজ মঞ্চে এলেন। তার উপস্থিতিই এত মাধুর্যময় যে কবিতা উচ্চারণ এমনিতেই মধুর হয়ে ওঠে। তিনি ওবায়েদ আকাশের দুটি কবিতা পড়লেন। দ্বিতীয় কবিতাটির নাম ‘রূপনগর’। রূপবতী পড়ছেন রূপনগরের কবিতা— এককথায় চমৎকার! এরপর এলেন বহুগুণের অধিকারী খায়রুল আলম সবুজ।
তিনি শুভ্র চাদর গায়ে জড়ানো নায়কোচিত চেহারার অভিনেতা, বললেন তিনি বহুদিন ধরেই ওবায়েদ আকাশকে খেয়াল করছেন। শুধু ওবায়েদ আকাশ নয়, সরকার আমিন, মুজিব ইরমসহ মঙ্গলসন্ধ্যার ৫ জনের একটি দল, বয়সে ছোট সকলেই, কিন্তু তিনি তাদের বন্ধু হয়ে গেলেন। কারণ ওরা সব কবি আর ওদের ভালো লেগে গিয়েছিল। সেসময়ে এরা সকলেই বিশ ছাড়িয়ে তরুণ যুবা আর তিনি ত্রিশের শেষভাগে। বুঝলেন এরা সকলেই, প্রোপার স্কুলিং হলে, ভালো কবিতা লিখবে, কেননা কবিতা এদের ভেতরে বাস করে। তার মনে পড়ল, পড়াটাই স্বাভাবিক, পুরনে দিনের কথা। ওবায়েদ আকাশ তখন হাতিরপুলে থাকত। দুপুরে রান্না হতো খিচুড়ি। জম্পেশ আড্ডা হতো। বড়ো ভাই হলেও তিনি ছিলেন পাঁচ কবির বন্ধুসম। তাঁর ভালো লাগছে যে সেই কবিরা এখন সবাই ম্যাচিউর, কবি হিসেবে স্বীকৃত। বললেন, They represent a different kind of schooling। ওবায়েদ আকাশ সম্পর্কে তাঁর আশাবাদ, আকাশ মস্ত বড়ো কবি হবে। বললেন, এরকম অনেক ওবায়েদ আকাশ আমাদের দরকার, এরকম অনেক আমিন আমাদের দরকার। ওরা চলে যাবে, আরেকদল আসবে, আরেকটু সুন্দর করে তুলবে শিল্পের ভুবন।
কবি বিমল গুহ পরিধান করে আছেন টকটকে সবুজ রঙের পাঞ্জাবী। পোডিয়ামের পেছনে এসে দাঁড়ালে মনে হলো একটি সবুজ গাছ এসে দাঁড়িয়েছে। বিমল গুহ বললেন, ‘ওবায়েদ আকাশ আর সুবর্ণ আকাশ অনেকটা জমজের মতো।’ মাহফুজ আল-হোসেন যে অক্লান্ত ও একনিষ্ঠ শ্রম ও মেধা দিয়ে স্মারকগ্রন্থটি সম্পাদনা ও প্রকাশ করেছেন তা শুধু বন্ধুকৃত্য নয়, এ হলো প্রতিভালালন। আমাদের সমাজে প্রতিভালালনের সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি।
কবি ওবায়েদ আকাশ সম্পর্কে তার মূল্যায়ন— ওবায়েদ দাঁড়িয়ে গেছে। একটি জীবন সে পার করেছে কবিতায়। বললেন, একটি বিমূর্ত শিল্পকলা দেখে তিনি যে আনন্দ পান একটি কবিতা পাঠ করেও সমান আনন্দলাভ করেন।
নাসির আহমেদ ও ওবায়েদ আকাশের মাঝে অনেকগুলো মিল, তারা দুজন কবি তো বটেই, দুজনেই সাংবাদিক এবং সাহিত্য সম্পাদক। তাদের একটি জীবন কেটে গেছে, বা এখনও যাচ্ছে ওই তিন কাজে— কবিতা লেখা, সাংবাদিক হিসেবে পেশাচর্চা এবং সাহিত্য পাতা সম্পাদনা। আজ থেকে ৩২ বছর আগে, সেই ১৯৯৩ সালে প্রথম যখন জনকণ্ঠ পত্রিকা প্রকাশিত হয় তার মাত্র তিন বছর পরে থেকেই থেকেই তারা পরস্পরের সহকর্মী। নাসির আহমেদ যোগ দিয়েছিলেন প্রারম্ভেই, ওবায়েদ আকাশ ১৯৯৬ সালে। জনকণ্ঠের তখন রমরমা দিন। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া— সমগ্র বাংলাদেশে এক নম্বর জনপ্রিয় দৈনিক ছিল জনকণ্ঠ, যা একসঙ্গে ছাপা হতো চারটি জায়গা থেকে। নতুন প্রযুক্তিরর সর্বোচ্চ ব্যবহার করছিল পত্রিকাটি। ওবায়েদ আকাশ একসময় স্বেচ্ছায় চলে যায় দৈনিক সংবাদে, কিংবদন্তি সাংবাদিক আবুল হাসনাতের স্থলাভিষিক্ত হয়।
ওবায়েদ আকাশের প্রথম বইটি বেরিয়েছিল ২০০১ সালে। বইটির নাম ‘পতন গুঞ্জনে ভাসে খরস্রোতা চাঁদ’। নিখুঁত অক্ষরবৃত্তে বাধা নাম। ওবায়েদ আকাশ তখন তরুণ। বইটি পড়ে নাসির আহমেদের মনে হয়েছিল, এ ছেলেটার হবে। সে ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত আছে। এ প্রসঙ্গে নাসির আহমেদের অভিমত— ঐতিহ্যবিচ্যুৎ হলে সাহিত্য টেকে না। ছান্দসিক এ কবি বললেন, ‘ছন্দ হলো হাঁটা, আর কবিতা হলো দৌড়ানো। হাঁটতে না জানলে আপনি দৌড়াবেন কীভাবে?’
পরবর্তী আলোচক হিসেবে মঞ্চে এলেন ফরিদ কবির। ফরিদ কবির বললেন, তিনি নব্বইয়ের দশকের কবিদের সাথে প্রচুর আড্ডা দিয়েছেন, তরুণদের সাথে মেলামেশা করেছেন তরুণরা কী ভাবছে তা জানতে।
একবার তার নাম ঘোষিত হবার পরে পালিয়ে গিয়েছিলেন, দ্বিতীয়বার ভেতরে এসে বসতেই জালে ধরা পড়ে গেলেন মঞ্চভীরু কবি আবদুর রাজ্জাক। সঞ্চালক স্বপন নাথের ভারি কণ্ঠের সুস্পষ্ট ও কাব্যিক আহ্বানে বাধ্য হয়ে ‘আমারে নামাইয়েন না’ জাতীয় শরীরী ভাষার, অরিজিনাল সত্তরের দশকের কবি মঞ্চে এসে শুভেচ্ছা জানিয়েই ফের পালালেন। এরপরে সুরাইয়া ফারজানা হাসান নামের একজন রূপবতী মঞ্চ আলোকিত করে তার নিজের করা ওবায়েদ আকাশের একটি কবিতার চারটি লাইন স্প্যানিশ ভাষায় পাঠ করে শোনালেন। প্রথমে বাংলা, পরে স্প্যানিশ। পুরো কবিতা না শোনানোয় আমাদের আশ মেটেনি। অতৃপ্তি রয়ে গেল, কেননা মঞ্চে তার উপস্থিতি ছিল চোখের শুশ্রুষা।
সঞ্চালক স্বপন নাথের আহ্বানে এবার মঞ্চে এলেন হাইকেল হাশমী। পেশায় ব্যাংকার মানুষটি একজন কবি ও অনুবাদক। বললেন আকাশের যেমন সপ্ত আসমান, তেমনি ওবায়েদ আকাশেরও সাতটি আকাশ রয়েছে। বললেন, ‘ওর মতো একটি কবিতাও আমি লিখতে পারব না। তিনি ঢাকা শহরে বড়ো হয়েছেন, তাই তার জীবনে গ্রাম নেই। তার কবিতায় চালতাফুল নেই। ওবায়েদ আকাশের ‘পৃষ্ঠাজুড়ে সুলতানপুর’ পাঠ করে তার মনে হয়েছে তার যদি গ্রাম থাকতো তবে তা হতো সুলতানপুরের মতো শ্যামলসুন্দর। বইটি তার এত ভালো লাগলো যে তিনি বইয়ের কবিতাগুলো অনুবাদ করতে লাগলেন। এমনি করতে করতে গোটা সুলতানপুর অনুবাদ হয়ে গেল।
আমি ভেবেছিলাম যাকে কেন্দ্রে রেখে এ প্রকাশনা অনুষ্ঠান সেই কবি ওবায়েদ আকাশ নিশ্চয়ই মঞ্চে থাকবেন। তিনিও মঞ্চঅপ্রতিভ কিনা জানি না, তবে তিনি সারাটা সময়ই মঞ্চের নিচে সম্মুখ সারিতে বসে ছিলেন। অনুষ্ঠানটির একবারে শেষে সঞ্চালকের অনুরোধে তিনি মাইক্রোফোনের সমুখে এলেন। আজকের এই সমাবেশে তার প্রতি অগ্রজ, সমবয়সী ও অনুজ কবি-লেখকরা যে ভালোবাসা প্রদর্শন করেছেন তাতে তিনি অভিভূত। সকলকে তাদের উপস্থিতি ও দীর্ঘসময় অনুষ্ঠানে থাকার জন্য ধন্যবাদ জানালেন। তিনি সুবর্ণ আকাশ সম্পাদক কবি মাহফুজ আল-হোসেন প্রসঙ্গে বললেন, আজকের দিনে এমন বন্ধুলাভ করা বিরল ঘটনা। এমন মানুষ সাধারণত খুঁজে পাওয়া যায় না, যিনি বন্ধুর জন্য এতবড় ত্যাগ স্বীকার করেন। তিনি তার প্রতি কৃহজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। এছাড়াও বললেন, ‘আমাকে সত্যিকার ভালোবাসে এমন কিছু মানুষ আজ এখানে সমবেত।’ যে ১৩৬ জন ‘সুবর্ণ আকাশ’ স্মারকগ্রন্থে লিখেছেন তাদের প্রতি তার কৃতজ্ঞতা, যে ৫০টি লেখা পরিসরের অভাবে ছাপতে পারেননি, তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন ২৭ বছর ধরে লিটল ম্যাগাজিন ‘শালুক’ ও ২২ বছর ধরে দৈনিক সংবাদ সাহিত্য সাময়িকীর পাতা সম্পাদনা করা কবি ওবায়েদ আকাশ।
***

বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ আগস্ট ২০২৬
ওবায়েদ আকাশ বিশ শতকের নব্বইয়ের দশকের নিরন্তর সৃষ্টিশীল এক মেধাবী কবি, কবিতাই যার ধ্যান ও জ্ঞান। তিন দশকের অধিক সময় ধরে তিনি কাব্যচর্চা করে যাচ্ছেন নিরলসভাবে, হয়ে উঠেছেন দশকটির গুরুত্বপূর্ণ কবি। ‘সুবর্ণ আকাশ’ হলো তাঁর কাব্যকৃতি ও জীবন নিয়ে ৮০০ পৃষ্ঠার এক ঢাউস সংকলন, যাকে বলা হচ্ছে ‘কবি ওবায়েদ আকাশ সুবর্ণজয়ন্তী স্মারকগ্রন্থ’। ২০২২ সালে ওবায়েদ আকাশ ৫০ বছরে পা দিয়েছিলেন এবং তখনই সিদ্ধান্ত হয়েছিল জীবনের সুবর্ণজয়ন্তীকে লিপিবদ্ধ করে রাখা হবে এক সংকলনে। অগ্রজ, সমসাময়িক ও অনুজ মিলে সংকলনটিতে ওবায়েদ আকাশ ও তার কবিতা নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন ১৩৬ জন। এর বাইরে রয়ে গেছে ৫০টির মতো লেখা যেগুলো পরিসরের অভাবে ছাপা যায়নি। এসব তথ্য প্রমাণ করে ওবায়েদ আকাশ কবি, সম্পাদক ও মানুষ হিসেবে খুবই জনপ্রিয়। তিনি দখল করে আছেন বহু কবি ও লেখকের অন্তরের কিছু কিছু অঞ্চল।
৩১ জুলাই বিকেল ও সন্ধ্যায় সুবর্ণ আকাশ-এর প্রকাশনা উৎসব অনুষ্ঠিত হলো বাংলা একাডেমির কবি জসীম উদদীন ভবনের সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সভাগৃহে। প্রকাশনা উৎসবকে ঘিরে যেহেতু কবি-লেখকদের এক সম্মিলন ঘটবে তাই এর অপর নাম ‘শুভেচ্ছা সম্মিলন’। অনুষ্ঠান শুরু হবে চারটায়, আমার পৌঁছাতে বিলম্ব হলো কুড়ি মিনিট, তাতে অবশ্য কোনো কিছু হারাতে হয়নি, কেননা অনুষ্ঠান তখনো শুরু হয়নি। একসময় বাংলা একাডেমির পুরনো ভবনের এই দ্বিতলটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এখানে মহাপরিচালক ও তার সচিব বসতেন। এই সভাগৃহটিতে কত যে গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে তার ইতিহাস লিখে রাখলে ৮০০ নয় ৮০০০ পৃষ্ঠা ছাড়িয়ে যেত।
অনুষ্ঠান শুরু হলো পৌনে পাঁচটায়। কবি ও শিল্পী স্বপন নাথ পোডিয়ামের পেছনে গিয়ে দাঁড়িয়ে আগ্রহী মুখ নিয়ে অপেক্ষায় থাকা মাইক্রোফোনে তার ভরাট কণ্ঠ ভাসালেন। তিনি বললেন এ হলো ফিরে দেখা, তিন দশকের কাব্যপথচলার মূল্যায়ন। তিনি প্রথমেই মঞ্চে ডেকে নিলেন কবি বিমল গুহ, কবি ও নন্দনতাত্ত্বিক মাহফুজ আল-হোসেন, প্রাবন্ধিক সরকার আবদুল মান্নান, কবি সরকার আমিন, কবি খোকন মাহমুদ ও কবি নীলিমা নূরকে। এক মঞ্চে দুই সরকারকে দেখে জনতা উৎসাহী হলো তারা কী করে তা দেখতে।
‘সুবর্ণ আকাশ’ স্মারকগ্রন্থটির সম্পাদনা করেছেন মাহফুজ আল-হোসেন। সঙ্গতভাবেই স্বাগত বক্তব্য দিতে তাকে আহবান করা হলো। স্মারকগ্রন্থটির সম্পাদনা ও প্রকাশকে ‘জীবনের সবচেয়ে বড়ো অর্জন’ বললেন মাহফুজ আল-হোসেন। ওবায়েদ আকাশের সাথে বন্ধুত্বকে বললেন ‘জীবনের সবচেয়ে বড়ো পাওয়া’। তাদের বন্ধুত্ব যে গভীর ও শক্ত বন্ধনে আবদ্ধ তার সাক্ষী হলো দুবার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েও সুস্থ হয়ে ফিরে এসে তিনি বিপুল, আর বিপুল বলেই জটিল, কাজটি করে গেছেন। তিনি দমে যাননি, শেষাবধি কাজটি সম্পন্ন করেছেন। ওবায়েদ আকাশকে তিনি সম্বোধন করলেন ‘লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের একজন অগ্রবর্তী যোদ্ধা’ হিসেবে যিনি ‘শালুক’-এর মতো একটি সিরিয়াস ও উচ্চপ্রশংসিত লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদনা করে যাচ্ছেন বহু বছর ধরে, পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী পত্রিকা দৈনিক ‘সংবাদ’-এর সাহিত্য সাময়িকীর ৪ পৃষ্ঠা সম্পাদনা করছেন প্রায় দুই যুগ ধরে। তিনি বহু নবীন কবির লেখা প্রকাশ করেছেন। তাই সুবর্ণ আকাশে কেবল একটি তারা নয়, রয়েছে অনেক তারা। অনেক মূল্যায়নধর্মী লেখা রয়েছে স্মারকগ্রন্থটিতে। সেসব লেখায় যে ভাষা ব্যবহার করেছেন লেখকরা, এর নন্দনতাত্ত্বিক দিকের প্রশংসা করে তিনি বললেন যেন এক ধরনের ‘পাবলিক স্কুলিং’ ঘটছে। ওবায়েদ আকাশ খুবই উদ্যমী। তিনি, তার সতীর্থদের নিয়ে ‘শালুক সাহিত্য সন্ধ্যা’র আয়োজন করে থাকেন, তাদের নতুন চিন্তার দর্শন ‘অধুনাবাদ’কে একটি কাঠামো দান করেছেন।
মাহফুজ আল-হোসেনের কিছুটা আবেগতাড়িত বক্তৃতায় ফুটে উঠল ওবায়েদ আকাশের সাথে কাটানো অসংখ্য আড্ডার স্মৃতি, যাকে তিনি ‘জীবনের পরম সঞ্চয়’ বললেন। শারীরিক অসুস্থতা নিয়েও দীর্ঘ ৪ বছরের চেষ্টায় ‘সুবর্ণ আকাশ’ প্রকাশ করতে পেরে মাহফুজ আল-হোসেনকে পরিতৃপ্ত মনে হলো। প্রতিবার হাসপাতাল থেকে ফিরে তার একটিই পণ ছিল— আর তা হলো স্মারকগ্রন্থটি প্রকাশ করা।
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সভাগৃহে একে একে প্রবেশ করছিল অতিথিরা। এমনি দুজন, দুজনেই কবি-সরকার মাসুদ ও ভাগ্যধন বড়ুয়াকে মঞ্চে এসে বসতে আমন্ত্রণ জানালেন স্বপন নাথ। ভাগ্যধন এসে মঞ্চে বসলেও সরকার মাসুদকে কোথাও দেখা গেল না। আমার কেন জানি না মনে হলো— ঘাই দিয়ে মাছ পালিয়ে গেছে বড়শি থেকে।
এ অবসরে ওবায়েদ আকাশের কবিতা থেকে আবৃত্তি করলেন বাচিক শিল্পী নায়লা তারান্নুম। আশ্চর্য যে এই বাচিক শিল্পীকে আমি পরপর তিনটি অনুষ্ঠানে কবিতা আবৃত্তি করতে শুনলাম। কবিতা আবৃত্তির আগে তিনি কবিকে পুস্পস্তবক অর্পণ করলেন। নায়লা তারান্নুমের কণ্ঠস্বর ভরাট এবং তিনি আবৃত্তি করেন চমৎকার, খুব সুস্পষ্ট তার উচ্চারণ। তিনি ওবায়েদ আকাশের দুটি কবিতা আবৃত্তি করলেন যার একটি নাম ‘প্রকৃতিপুত্র’। অন্য নামটি আমি ধরতে পারলাম না। আমার পাশে বসেছিলেন কবি বিনয় বর্মণ, তিনিও ধরতে পারেননি।
আবৃত্তির পরে আলোচনা করতে এলেন করি সরকার আমিন, তার হাতে ঢাউস স্মারকগ্রন্থটি। তিনি সেটা দর্শকশ্রোতাদের দিকে তুলে ধরে বললেন, এত বড়ো একটা বই, ঈর্ষা জাগাই স্বাভাবিক। আমরা তো মৃত মানুষকেও ঈর্ষা করি, জীবিত মানুষের প্রতি ঈর্ষা থাকা স্বাভাবিক। বইটিকে পুনরায় তুলে ধরে তিনি বললেন, এই বইটি ঈর্ষা তৈরি করেছে। এ কথা বলে সরকার আমিন চলে গেলেন ঈর্ষার ব্যাখ্যায়। তিনি ঈর্ষাকে প্রাকৃতিক প্রতিক্রিয়া ও মানবিক বলে আখ্যায়িত করলেন। বললেন আমরা রবীন্দ্রনাথকে ঈর্ষা করি, টি এস এলিয়টকে ঈর্ষা করি। কেন? কারণ আমরা তাঁদের মতো লিখতে পারি না, তাঁদের প্রতিভার সমান হতে পারি না। সরকার আমিন, তেজী ও উষ্ণীষের মতো উত্তোলিত চুলের সুদর্শন কবি, বললেন শুধু ঈর্ষা নয়, স্মারকগ্রন্থটি আনন্দও জোগায়। জীবনকে ভালোবাসলে রোগ কোনো প্রতিরোধক নয়। মাহফুজ আল-হোসেনের হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েও অদম্য মনোবল দিয়ে ফিরে আসার প্রসঙ্গে সরকার আমিন বললেন, তার নিজের হৃৎপিণ্ডেও দুটি রিং বসানো হয়েছিল এক যুগ আগে, তিনি প্রায়শ ভুলেই থাকেন সে কথা। আমিনের বক্তব্য, হৃদরোগ আবিস্কারের পর তার ভেতর ‘পাগলামি’ আরও বেড়েছে। হৃদরোগ হলো একপ্রকার সতর্কতা বা ‘ওয়ার্নিং’। আমিনের মনে পড়ল এমনকি কবি ওবায়েদ আকাশও একবার হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। এরপরে ওবায়েদ আকাশের সৃষ্টিশীলতা থেমে থাকেনি, বরং বেড়েছে। হৃদরোগ ও সৃষ্টিশীলতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সরকার আমিনের দৃষ্টি চলে যায় অতিথিদের মাঝে বসে থাকা কথাসাহিত্যিক নাসরিন জাহান ও কবি ঋজু রেজওয়ানের দিকে। তারা দুজনেই ক্যান্সারে আক্রান্ত। কিন্তু রোগ তাদের দমিয়ে রাখতে পারেনি। কেনন কবি-লেখকদের রয়েছে অদম্য প্রাণশক্তি।
ওবায়েদ আকাশকে ‘অকৃপণ হৃদয়ের মানুষ’ হিসেবে উল্লেখ করে সরকার আমিন বললেন, ওবায়েদ অনেক তরুণ কবিকে সাহায্য করেছে, আশ্রয় দিয়েছে। তার মগজে ভেসে উঠল একসঙ্গে কাটানো অনেক স্মৃতি, যার ভেতর একটি হলো ২০ বছর আগে রাজবাড়ী ভ্রমণ, মধ্যরাতে পদ্মার চর দেখতে যাওয়ার মতো পাগলামি।
সরকার আমিন বললেন, কবিতা দু প্রকার, এক, বক্তব্যপ্রধান; দুই, বোধপ্রধান। বক্তব্যপ্রধান কবিতায় সহজে ঢোকা যায়, কারণ সেখানে সিঁড়ি আছে। ওবায়েদ আকাশের কবিতায় সহজে ঢোকা যায় না, কারণ তার কবিতা বোধসম্পন্ন। সেখানি সিঁড়িটি খুঁজে পাওয়া কঠিন, কিন্তু একবার খুঁজে পেলে এর মনোহারিত্ব আবিষ্কার করা সহজ হয়। সরকার আমিনের মতে, ওবায়েদ আকাশের কবিতার নিজস্ব ভাষা তৈরি হয়েছে। কবিতায় নিজস্ব ভাষা তৈরি মৌলিক কাজ। এরপরে সভাগৃহের বাতি নামিয়ে ওবায়েদ আকাশ ও সুবর্ণ আকাশকে ঘিরে একটি ডকুমেন্টারি জাতীয় ছবি দেখানো হলো। ছবিটি নির্মাণ করেছেন বহু গুণের অধিকারী স্বপন নাথ।
ওবায়েদ আকাশের বন্ধু খোকন মাহমুদ একজন কবি। তাদের দুজনের বাড়ি রাজবাড়ী হলেও শৈশবে পরিচয় ছিল না। পরিচয় হলো ১৯৯৪ সালে আকাশ যখন সিনেপত্রিকা স্টারভিশনে চাকরি করতেন। দিনের শেষে আড্ডা হতো পত্রিকা অফিসে। আর আড্ডা হতো নব্বইয়ের কবি-লেখকদের উতরোল মিলনস্থল শাহবাগ আজিজ সুপার মার্কেটে। খোকন বললেন আমাদের যৌবন কেটেছে আজিজ মার্কেটের চত্বরে। স্টারভিশন থেকে ওবায়েদ আকাশ যখন জনকণ্ঠে যোগ দিল তখন খোকন মাহমুদ থাকতেন রাজবাড়ী, তখন যোগাযোগ ছিল চিঠিপত্রমারফত।
খোকন মাহমুদ বললেন ওবায়েদ আকাশ কবি হতে চেয়েছিল, তার প্রস্তুতিও ছিল, একটি জীবন সে উৎসর্গ করেছে কবিতার জন্য। শেষাবধি তার আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়েছে, সে কবি হয়েছে। খোকন মাহমুদের ভালো লাগে ওবায়েদ আকাশ তার বন্ধু, অনেক গল্প আছে একত্র পথচলার। সরকার আমিন যা বলেছেন খোকন মাহমুদও তা বললেন। বললেন ওবায়েদ আকাশের নিজস্ব কাব্যভাষা তৈরি হয়েছে, হাজার কবিতার মাঝেও তার কবিতা শনাক্ত করা যায়।
এর মাঝে বড়শি দেখে পালিয়ে যাওয়া বিরাট মৎস্য সরকার মাসুদ কী ভেবে টোপের কাছে এসেছেন। সঙ্গে সঙ্গে তাকে টেনে মঞ্চে তুললেন অনুষ্ঠান সঞ্চালক। মঞ্চে উঠতে অনীহ ছিলেন কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহান। তাকেও সাধ্যসাধনা করে মঞ্চে তুলতে হলো। কবি নাসির আহমেদ অগ্রজ কবি হিসেবে যে অনুষ্ঠানেই যান, তাকে মঞ্চে উঠতে হয় প্রধান অতিথি বা সভাপতি হিসেবে। তিনি জানেন ওটাই তার নিয়তি। নিয়তি মেনে তিনিও মঞ্চে ওঠেন।
ভাগ্যধন বড়ুয়া চট্টগ্রামে থাকেন, সেখানকার জাদরেল ডাক্তার তিনি। যেহেতু চট্টগ্রাম তাই একটু টুইস্ট করে বললেন আমি (চট্ট)গ্রাম থেকে এসেছি। বললেন কুমার নদ থেকে বুড়িগঙ্গা— ওবায়েদ আকাশের কাব্যপরিক্রমাটি বিস্তীর্ণ। কাব্যে বিস্তীর্ণ আকাশ, বন্ধুত্বেও বিস্তীর্ণ আকাশ। সে আকাশে তারা ওড়াওড়ি করেন। ভাগ্যধনও ওবায়েদ আকাশের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বললেন, ওর সাথে থাকাটাই উদযাপন। তারা দু’বন্ধু ভারতে অনুষ্ঠিত দুটি আন্তর্জাতিক সাহিত্য উৎসবে যোগ দিয়েছিলেন, প্রথমটি রাজস্থানে, দ্বিতীয়টি দিল্লিতে। দিল্লির সার্ক সাহিত্য উৎসবে আমিও ছিলাম। মনে পড়ছে আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল দিল্লি নগরীর এক হোস্টেলে ও নয়ডায় এক রিসার্চ ইনস্টিটিউটে। দু’বন্ধুর কক্ষ বরাদ্দ ছিল দুজায়গায়। ওবায়েদের সঙ্গে থাকার জন্য ভাগ্যধন তার আবাসন বদলে নিয়েছিল প্রথম দিনেই। ভাগ্যধন বড়ুয়া এই বলে শেষ করলেন যে, মুহূর্তই জীবন আর জীবনের ভালো মুহূর্তগুলোই মনে থাকে।
কবি ওবায়েদ আকাশের প্রতি কিছু মানুষের ভালোবাসা যে গভীর ও অকৃত্রিম তার একটি পরিচয় অসুস্থ শরীর নিয়েও কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহান আজকের সভাগৃহে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি ওবায়েদ আকাশের কবিতার ভেতর থেকে কিছু চমকে ওঠার মতো পঙ্ক্তি পাঠ করে শোনালেন। এমন একটি পঙ্ক্তি হলো ‘মেয়েটির স্যাঁতসেঁতে প্রকাণ্ড শরীর রৌদ্রে শুকাতে দেওয়া আছে’। পঙ্ক্তিটি পাঠ করে তিনি চমকে গেছেন। একজন সৃষ্টিশীল ফিকশন রাইটার হিসেবে এমন বাক্য তিনি খুঁজে বেড়ান এবং পেলে জুড়ে দেন লেখায়। ওবায়েদ আকাশের নিজের গ্রাম নিয়ে লেখা ‘পৃষ্ঠাজুড়ে সুলতানপুর’ কাব্যগ্রন্থটি তার ভীষণ ভালো লেগেছে। ওবায়েদের একটি কবিতায় লেখা আছে ‘তার পাশের ডালা থেকে একটি কর্তিত কাতলের মাথা/আমার ব্যাগের ভেতর লাফিয়ে ঢুকে গেল’— যার জাদুবাস্তবতা চমকে দেয়। আরেকটি পঙ্ক্তি আছে ‘মধ্যরাতের টিউকল থেকে অঝরে জল ঝরে পড়ে’। তিনি আরও কিছু চমকে ওঠার মতো বাক্য উদ্ধৃত করেছিলেন কিন্তু আমি তা হুবহু শুনতে পাইনি বা শুনলেও সঙ্গে সঙ্গে নোট করে নিতে পারিনি।
বললেন বইমেলায় একা একা ঘুরে বেড়াতেন। ওবায়েদ আকাশ সম্পাদিত ‘শালুক’-এর স্টলে এসে বসতেন। বললেন, শালুক একটা বিশাল ব্যাপার। অনুষ্ঠানের পুরো সময়টা নীলিমা নূর মঞ্চের এক প্রান্তে চুপচাপ বসেছিলেন। ডাক পড়লে মাইকের কাছে এসে শ্রোতাদের জানালেন তিনি ‘ঘরামি’ নামের একটি ছোট কাগজ সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন। ‘ঘরামি’র একটি সংখ্যায় তিনি কবি ওবায়েদ আকাশের একটি সাক্ষাৎকার ছেপেছিলেন। সেখানে টের পেয়েছেন কবিতা ও জীবন সম্পর্কে ওবায়েদ আকাশের বিস্তীর্ণ ধারণা। কবির একটি বড়ো গুণ তিনি নবীনদের উদ্বুদ্ধ করেন। এভাবে ওবায়েদ আকাশ একজন সোনার মানুষ হয়ে উঠেছেন বলেই নীলিমা নূরের বিশ্বাস।
মঞ্চের আরেক অতিথি প্রাবন্ধিক ও গবেষক সরকার আবদুল মান্নানের সাথে ওবায়েদ আকাশের পরিচয় দুই যুগের। ওবায়েদ আকাশ সেসময়ে কেবল সংবাদে যোগ দিয়েছেন কিংবদন্তি সম্পাদক আবুল হাসনাতের স্থলাভিষিক্ত হয়ে। প্রথম পরিচয়েই ওবায়েদ আকাশকে তার ভালো লেগে গিয়েছিল তার কথাবার্তা, নম্র আচরণ ও চিন্তার পরিচ্ছন্নতা দেখে। তিনি একবার খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে বসে কবি জগদীশ গুপ্তের ওপর গবেষণা করে প্রবন্ধ লিখছিলেন আর সংবাদ সাময়িকীর পাতায় তা ছাপা হচ্ছিল। তিনি বললেন সংবাদের সাহিত্য পাতায় ওবায়েদ আকাশ প্রচুর নবীন কবিকে স্থান দিয়েছেন, প্রমোট করেছেন। তাদের একাংশ আজ এলে সভাগৃহটিতে ঠাঁই দেওয়া যেত না।
নাসরীন জাহানের মতো তারও প্রিয় কাব্যগ্রন্থ ‘পৃষ্ঠাজুড়ে সুলতানপুর’। তার নিজের পিতৃপুরুষের ভিটে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। শৈশবের চারণভূমি জলের অতলে বিলুপ্ত। এ প্রসঙ্গে সরকার আবদুল মান্নান একটি চমৎকার কথা বললেন। তিনি বললেন, ‘নদীর বুক ফুঁড়ে চর জেগে উঠলেই হারানো গ্রাম জাগে না।’ ‘পৃষ্ঠাজুড়ে সুলতানপুর’ পাঠ করে তার মনে হলো এ তার নিজের গ্রাম। তিনি এতটাই অভিভূত হয়ে পড়লেন যে, তা নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ লিখে ফেললেন। প্রবন্ধটি ‘সুবর্ণ আকাশ’-এ আছে। প্রথমে ছিলেন দুই সরকার, পরে সরকার মাসুদ যোগ দিলে তিন সরকারই অধিষ্ঠিত হতো মঞ্চের সিংহাসনে, কিন্তু সরকার আমিন রাজা অষ্টম এডওয়ার্ডের মতো সিংহাসন পরিত্যাগ করে গিয়ে বসেছেন তার প্রণয়িনী শাহনাজ মুন্নীরূপী মিসেস সিম্পসনের পাশে।
কী প্রসঙ্গে তার মনে পড়ল একটি কবিতার পঙ্ক্তি, ‘তোমার হাসির শব্দে চমকে উঠছে বনফুল’। পঙ্ক্তিটি তার ভালো লেগেছিল। আরও দু’লাইন শোনালেন শ্রোতাদের, ‘তুমি কি জানো আমি কেন তারাভরা রাতে নড়বড়ে সেতুর উপর এসে দাঁড়াই?’ এসব পঙক্তি কি ওবায়েদ আকাশ রচিত নাকি তার নিজের, নাকি অন্য কোনো কবির, ঠিক ধরতে পারলাম না। সরকার মাসুদের পরে সংক্ষিপ্ত শুভেচ্ছা বক্তব্য দিলেন কবি চন্দন চৌধুরী। ‘বেহুলা বাংলা’ প্রকাশনা সংস্থা থেকে তিনি ওবায়েদ আকাশের দু’টি বই প্রকাশ করেছেন। ওই যে যাকে একটু আগে দরোজার পাশে বসে থাকতে দেখেছিলাম, সেই পিওনা আফরোজ মঞ্চে এলেন। তার উপস্থিতিই এত মাধুর্যময় যে কবিতা উচ্চারণ এমনিতেই মধুর হয়ে ওঠে। তিনি ওবায়েদ আকাশের দুটি কবিতা পড়লেন। দ্বিতীয় কবিতাটির নাম ‘রূপনগর’। রূপবতী পড়ছেন রূপনগরের কবিতা— এককথায় চমৎকার! এরপর এলেন বহুগুণের অধিকারী খায়রুল আলম সবুজ।
তিনি শুভ্র চাদর গায়ে জড়ানো নায়কোচিত চেহারার অভিনেতা, বললেন তিনি বহুদিন ধরেই ওবায়েদ আকাশকে খেয়াল করছেন। শুধু ওবায়েদ আকাশ নয়, সরকার আমিন, মুজিব ইরমসহ মঙ্গলসন্ধ্যার ৫ জনের একটি দল, বয়সে ছোট সকলেই, কিন্তু তিনি তাদের বন্ধু হয়ে গেলেন। কারণ ওরা সব কবি আর ওদের ভালো লেগে গিয়েছিল। সেসময়ে এরা সকলেই বিশ ছাড়িয়ে তরুণ যুবা আর তিনি ত্রিশের শেষভাগে। বুঝলেন এরা সকলেই, প্রোপার স্কুলিং হলে, ভালো কবিতা লিখবে, কেননা কবিতা এদের ভেতরে বাস করে। তার মনে পড়ল, পড়াটাই স্বাভাবিক, পুরনে দিনের কথা। ওবায়েদ আকাশ তখন হাতিরপুলে থাকত। দুপুরে রান্না হতো খিচুড়ি। জম্পেশ আড্ডা হতো। বড়ো ভাই হলেও তিনি ছিলেন পাঁচ কবির বন্ধুসম। তাঁর ভালো লাগছে যে সেই কবিরা এখন সবাই ম্যাচিউর, কবি হিসেবে স্বীকৃত। বললেন, They represent a different kind of schooling। ওবায়েদ আকাশ সম্পর্কে তাঁর আশাবাদ, আকাশ মস্ত বড়ো কবি হবে। বললেন, এরকম অনেক ওবায়েদ আকাশ আমাদের দরকার, এরকম অনেক আমিন আমাদের দরকার। ওরা চলে যাবে, আরেকদল আসবে, আরেকটু সুন্দর করে তুলবে শিল্পের ভুবন।
কবি বিমল গুহ পরিধান করে আছেন টকটকে সবুজ রঙের পাঞ্জাবী। পোডিয়ামের পেছনে এসে দাঁড়ালে মনে হলো একটি সবুজ গাছ এসে দাঁড়িয়েছে। বিমল গুহ বললেন, ‘ওবায়েদ আকাশ আর সুবর্ণ আকাশ অনেকটা জমজের মতো।’ মাহফুজ আল-হোসেন যে অক্লান্ত ও একনিষ্ঠ শ্রম ও মেধা দিয়ে স্মারকগ্রন্থটি সম্পাদনা ও প্রকাশ করেছেন তা শুধু বন্ধুকৃত্য নয়, এ হলো প্রতিভালালন। আমাদের সমাজে প্রতিভালালনের সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি।
কবি ওবায়েদ আকাশ সম্পর্কে তার মূল্যায়ন— ওবায়েদ দাঁড়িয়ে গেছে। একটি জীবন সে পার করেছে কবিতায়। বললেন, একটি বিমূর্ত শিল্পকলা দেখে তিনি যে আনন্দ পান একটি কবিতা পাঠ করেও সমান আনন্দলাভ করেন।
নাসির আহমেদ ও ওবায়েদ আকাশের মাঝে অনেকগুলো মিল, তারা দুজন কবি তো বটেই, দুজনেই সাংবাদিক এবং সাহিত্য সম্পাদক। তাদের একটি জীবন কেটে গেছে, বা এখনও যাচ্ছে ওই তিন কাজে— কবিতা লেখা, সাংবাদিক হিসেবে পেশাচর্চা এবং সাহিত্য পাতা সম্পাদনা। আজ থেকে ৩২ বছর আগে, সেই ১৯৯৩ সালে প্রথম যখন জনকণ্ঠ পত্রিকা প্রকাশিত হয় তার মাত্র তিন বছর পরে থেকেই থেকেই তারা পরস্পরের সহকর্মী। নাসির আহমেদ যোগ দিয়েছিলেন প্রারম্ভেই, ওবায়েদ আকাশ ১৯৯৬ সালে। জনকণ্ঠের তখন রমরমা দিন। টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া— সমগ্র বাংলাদেশে এক নম্বর জনপ্রিয় দৈনিক ছিল জনকণ্ঠ, যা একসঙ্গে ছাপা হতো চারটি জায়গা থেকে। নতুন প্রযুক্তিরর সর্বোচ্চ ব্যবহার করছিল পত্রিকাটি। ওবায়েদ আকাশ একসময় স্বেচ্ছায় চলে যায় দৈনিক সংবাদে, কিংবদন্তি সাংবাদিক আবুল হাসনাতের স্থলাভিষিক্ত হয়।
ওবায়েদ আকাশের প্রথম বইটি বেরিয়েছিল ২০০১ সালে। বইটির নাম ‘পতন গুঞ্জনে ভাসে খরস্রোতা চাঁদ’। নিখুঁত অক্ষরবৃত্তে বাধা নাম। ওবায়েদ আকাশ তখন তরুণ। বইটি পড়ে নাসির আহমেদের মনে হয়েছিল, এ ছেলেটার হবে। সে ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত আছে। এ প্রসঙ্গে নাসির আহমেদের অভিমত— ঐতিহ্যবিচ্যুৎ হলে সাহিত্য টেকে না। ছান্দসিক এ কবি বললেন, ‘ছন্দ হলো হাঁটা, আর কবিতা হলো দৌড়ানো। হাঁটতে না জানলে আপনি দৌড়াবেন কীভাবে?’
পরবর্তী আলোচক হিসেবে মঞ্চে এলেন ফরিদ কবির। ফরিদ কবির বললেন, তিনি নব্বইয়ের দশকের কবিদের সাথে প্রচুর আড্ডা দিয়েছেন, তরুণদের সাথে মেলামেশা করেছেন তরুণরা কী ভাবছে তা জানতে।
একবার তার নাম ঘোষিত হবার পরে পালিয়ে গিয়েছিলেন, দ্বিতীয়বার ভেতরে এসে বসতেই জালে ধরা পড়ে গেলেন মঞ্চভীরু কবি আবদুর রাজ্জাক। সঞ্চালক স্বপন নাথের ভারি কণ্ঠের সুস্পষ্ট ও কাব্যিক আহ্বানে বাধ্য হয়ে ‘আমারে নামাইয়েন না’ জাতীয় শরীরী ভাষার, অরিজিনাল সত্তরের দশকের কবি মঞ্চে এসে শুভেচ্ছা জানিয়েই ফের পালালেন। এরপরে সুরাইয়া ফারজানা হাসান নামের একজন রূপবতী মঞ্চ আলোকিত করে তার নিজের করা ওবায়েদ আকাশের একটি কবিতার চারটি লাইন স্প্যানিশ ভাষায় পাঠ করে শোনালেন। প্রথমে বাংলা, পরে স্প্যানিশ। পুরো কবিতা না শোনানোয় আমাদের আশ মেটেনি। অতৃপ্তি রয়ে গেল, কেননা মঞ্চে তার উপস্থিতি ছিল চোখের শুশ্রুষা।
সঞ্চালক স্বপন নাথের আহ্বানে এবার মঞ্চে এলেন হাইকেল হাশমী। পেশায় ব্যাংকার মানুষটি একজন কবি ও অনুবাদক। বললেন আকাশের যেমন সপ্ত আসমান, তেমনি ওবায়েদ আকাশেরও সাতটি আকাশ রয়েছে। বললেন, ‘ওর মতো একটি কবিতাও আমি লিখতে পারব না। তিনি ঢাকা শহরে বড়ো হয়েছেন, তাই তার জীবনে গ্রাম নেই। তার কবিতায় চালতাফুল নেই। ওবায়েদ আকাশের ‘পৃষ্ঠাজুড়ে সুলতানপুর’ পাঠ করে তার মনে হয়েছে তার যদি গ্রাম থাকতো তবে তা হতো সুলতানপুরের মতো শ্যামলসুন্দর। বইটি তার এত ভালো লাগলো যে তিনি বইয়ের কবিতাগুলো অনুবাদ করতে লাগলেন। এমনি করতে করতে গোটা সুলতানপুর অনুবাদ হয়ে গেল।
আমি ভেবেছিলাম যাকে কেন্দ্রে রেখে এ প্রকাশনা অনুষ্ঠান সেই কবি ওবায়েদ আকাশ নিশ্চয়ই মঞ্চে থাকবেন। তিনিও মঞ্চঅপ্রতিভ কিনা জানি না, তবে তিনি সারাটা সময়ই মঞ্চের নিচে সম্মুখ সারিতে বসে ছিলেন। অনুষ্ঠানটির একবারে শেষে সঞ্চালকের অনুরোধে তিনি মাইক্রোফোনের সমুখে এলেন। আজকের এই সমাবেশে তার প্রতি অগ্রজ, সমবয়সী ও অনুজ কবি-লেখকরা যে ভালোবাসা প্রদর্শন করেছেন তাতে তিনি অভিভূত। সকলকে তাদের উপস্থিতি ও দীর্ঘসময় অনুষ্ঠানে থাকার জন্য ধন্যবাদ জানালেন। তিনি সুবর্ণ আকাশ সম্পাদক কবি মাহফুজ আল-হোসেন প্রসঙ্গে বললেন, আজকের দিনে এমন বন্ধুলাভ করা বিরল ঘটনা। এমন মানুষ সাধারণত খুঁজে পাওয়া যায় না, যিনি বন্ধুর জন্য এতবড় ত্যাগ স্বীকার করেন। তিনি তার প্রতি কৃহজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। এছাড়াও বললেন, ‘আমাকে সত্যিকার ভালোবাসে এমন কিছু মানুষ আজ এখানে সমবেত।’ যে ১৩৬ জন ‘সুবর্ণ আকাশ’ স্মারকগ্রন্থে লিখেছেন তাদের প্রতি তার কৃতজ্ঞতা, যে ৫০টি লেখা পরিসরের অভাবে ছাপতে পারেননি, তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন ২৭ বছর ধরে লিটল ম্যাগাজিন ‘শালুক’ ও ২২ বছর ধরে দৈনিক সংবাদ সাহিত্য সাময়িকীর পাতা সম্পাদনা করা কবি ওবায়েদ আকাশ।
***

আপনার মতামত লিখুন