সংবাদ

বাইশে শ্রাবণ রবীন্দ্রমৃত্যুবার্ষিকী স্মরণে

রবীন্দ্রভাবনায় প্রেম: প্রসঙ্গ মানসী


আনোয়ার মল্লিক
আনোয়ার মল্লিক
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৬:৫১ এএম

রবীন্দ্রভাবনায় প্রেম: প্রসঙ্গ মানসী
রবীন্দ্রনাথের আঁকা চিত্রকর্ম


বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু বাংলা ভাষারই নন, বিশ্বসাহিত্যেরও একজন শ্রেষ্ঠ কবিপ্রতিভা। রোমান্টিক গীতিকবি হিসেবে বাংলা তথা বিশ্বসাহিত্যে তাঁর স্থান অনন্য। বাংলা ভাষায় গীতিকবিতার সূচনা হয় কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর হাত ধরে, যাঁর সম্পর্কে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই উপাধি দিয়েছিলেন ‘গীতিকবিতার ভোরের পাখি’। বিহারীলাল ছিলেন তৎকালীন কলকাতা সংস্কৃত কলেজের একজন কৃতী ছাত্র। এই কলেজ থেকে তিনি কাব্য ও অলংকারশাস্ত্রে বিশেষ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। এছাড়া ইংরেজি-শিক্ষিত বন্ধুর সাহায্যে তিনি ইংরেজি ভাষা শিক্ষা লাভ করেন। সেই সাথে তিনি শেক্সপিয়ার, বায়রনসহ অন্যান্য ইংরেজ কবির কবিতা পাঠ করেন। ইংরেজি গীতিকবিতা (লিরিক্যাল ব্যালাড) থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি বাংলা ভাষায় ‘বঙ্গসুন্দরী’ এবং ‘সারদামঙ্গল’ নামক দুটি সার্থক গীতিকাব্য রচনা করেন। এর ফলে বাংলা কবিতায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। মধ্যযুগীয় ধর্মীয় আখ্যানকাব্য এবং তৎপরবর্তী মহাকাব্যের যুগ পেরিয়ে বাংলা কবিতা পাশ্চাত্যের রোমান্টিক কাব্যভাবনার সংস্পর্শ লাভ করে। তবে বিহারীলাল সম্পর্কে একটি কথা বলা হয়, তিনি যতখানি কবি ছিলেন, ততখানি শিল্পী ছিলেন না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ এই অপূর্ণতা দূর করেন। তাঁর হাতে বাংলা রোমান্টিক গীতিকবিতা সাফল্যের চূড়া স্পর্শ করে। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের মতামত প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন:

“বিশ্বের মহত্তম রোম্যান্টিকদের একজন রবীন্দ্রনাথ। তার মধ্যে পাই রোম্যান্টিসিজমের বৈশিষ্ট্যগুলোর শ্রেষ্ঠ প্রকাশ, যা পাই না পুব-পশ্চিমের আর কারো মধ্যে।... তীব্রতায় তিনি অদ্বিতীয়, শেলির থেকেও অনেক বেশি তীব্র। বিলেতের পাঁচ রোম্যান্টিক— ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কোলরিজ, শেলি, কিটস, বায়রন মিলে যা করে গেছেন, বাংলায় একলা তিনি করেছেন তার চেয়ে অনেক বেশি।” (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রধান কবিতা, পৃষ্ঠা-৯)

রবীন্দ্রনাথের কাব্যপরিক্রমার দিকে তাকালে দেখা যায়, ‘মানসী’তে এসে তাঁর কাব্যশক্তি এবং অন্তর্গত বোধ সংহত হয়েছে। বহুমুখী ভাবের বিস্তার, ভাষা ও ছন্দের বিচিত্র নিরীক্ষা, অভিনব কাব্য-আঙ্গিকের প্রয়োগ— সবকিছু মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব কাব্য-উদ্দীপনার প্রকাশ ঘটে মানসীতে। রবীন্দ্রনাথ নিজেও এ কথার স্বীকৃতি দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য:

“কড়ি ও কোমল-এ অনেক ত্যাজ্য জিনিস আছে কিন্তু সেই পর্বে আমার কাব্য-ভূসংস্থানে ডাঙা জেগে উঠতে আরম্ভ করেছে। তারপর মানসী থেকে আরম্ভ করে বাকি বইগুলির কবিতায় ভালো-মন্দ মাঝারি ভেদ আছে, কিন্তু আমার আদর্শ অনুসারে ওরা প্রবেশিকা অতিক্রম করে কবিতার শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে।” (ভূমিকা, সঞ্চয়িতা)

তাঁর একেবারে প্রথম দিকের রচনা যেমন সন্ধ্যাসংগীত (১৮৮২), প্রভাতসংগীত (১৮৮৩), ছবি ও গান (১৮৮৪), এমনকি ভানুসিংহের পদাবলী (১৮৮৪)-কেও তিনি পরবর্তী জীবনে স্বীকার করতে চাননি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের অস্বীকার করা কাব্যগ্রন্থগুলোতে এমন কিছু বিখ্যাত কবিতার দেখা মেলে যেগুলো তাঁর নামের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ রবীন্দ্রনাথের এরকম একটি কবিতা। প্রভাতসংগীত কাব্যের অন্তর্ভুক্ত এই কবিতাটি তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলোর অন্যতম। প্রভাতসংগীতে আরেকটি কবিতা আছে, ‘প্রভাত উৎসব’। ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতায় জীবনের যে আনন্দ-মুখরতা, হৃদয়ের যে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস এবং বহির্জগতের প্রতি কবির যে আকুলতা, তারই প্রকাশ এখানেও ধ্বনিত হয়েছে। যেমন—

“হৃদয় আজি মোর কেমনে গেল খুলি,/ জগৎ আসি হেথা করিছে কোলাকুলি।/ ধরায় আছে যত মানুষ শত শত/ আসিছে প্রাণে মোর, হাসিছে গলাগলি।/ পরান পুরে গেল হরষে হল ভোর/ জগতে যারা আছে সবাই প্রাণে মোর।” (প্রভাত উৎসব, প্রভাতসংগীত)

কবির এই বিহ্বলতা এত অপ্রতিরোধ্য, এত দুর্নিবার যে, জীবন বা মৃত্যুর আলাদা কোনো তাৎপর্য নেই তাঁর কাছে। এই বোধেরই যেন প্রতিধ্বনি শোনা যায় ভানুসিংহের পদাবলী কাব্যের মরণ কবিতায়—

“মরণ রে, / তুঁহুঁ মম শ্যামসমান। / মেঘবরণ তুঝ, মেঘজটাজূট, / রক্ত কমলকর, রক্ত অধরপুট,/ তাপবিমোচন করুণ কোর তব / মৃত্যু-অমৃত করে দান। তুঁহুঁ মম শ্যামসমান।।” (মরণ, ভানুসিংহের পদাবলী)

কবিতাটি ব্রজবুলি ভাষায় লেখা। প্রাক-মানসী কাব্য কড়ি ও কোমল-এ ‘প্রাণ’ নামে একটি কবিতা আছে। এখানেও কবি জীবনের বন্দনা করেছেন। জগতের অনির্বচনীয় রূপময়তা এবং আনন্দ-কোলাহলের মধ্যে তিনি জীবনকে গভীরভাবে উদযাপন করতে চেয়েছেন। রবীন্দ্রজীবনের স্বপ্ন এবং আকাঙ্ক্ষা এই কবিতায় অসাধারণভাবে ধরা দিয়েছে। কবিতাটির প্রথম চারটি পঙ্ক্তি—

“মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, / মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই। / এই সূর্যকরে এই পুষ্পিত কাননে / জীবন্ত-হৃদয়-মাঝে যদি স্থান পাই!” (প্রাণ, কড়ি ও কোমল)

কড়ি ও কোমলে রোমান্টিক প্রেমভাবনার পাশাপাশি নারীর দৈহিক সৌন্দর্যও কবিকে আকৃষ্ট করেছে। স্তন, চুম্বন, দেহের মিলন, বিবসনা প্রভৃতি কবিতায় একজন রক্ত-মাংসের কামনা-বাসনা তাড়িত কবির দেখা পাওয়া যায়। রবীন্দ্র-কাব্যপ্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটে মানসীতে এসে। প্রাক-মানসীতে যা ছিল ব্যতিক্রম, হঠাৎ আলোর ঝলকানি, মানসীতে তা যেন এক স্থায়ী রূপ পরিগ্রহ করে। কড়ি ও কোমলে রবীন্দ্র-রশ্মির যে আভা দেখা দিয়েছিল, মানসীতে তা রৌদ্রকরোজ্জ্বল বিভায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। মানসীর পরে বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো একে একে রচনা করেন সোনার তরী, চিত্রা, কল্পনা, ক্ষণিকার মতো কাব্যগ্রন্থ। মানসী রবীন্দ্রনাথের এই পর্বের প্রথম শিল্পসফল কাব্য। এ বিষয়ে কবির নিজস্ব ভাষ্য:

“পূর্ববর্তী কড়ি ও কোমল-এর সঙ্গে এর বিশেষ মিল পাওয়া যাবে না। আমার রচনার এই পর্বেই যুক্ত অক্ষরকে পূর্ণ মূল্য দিয়ে ছন্দকে নতুন শক্তি দিতে পেরেছি। মানসীতে ছন্দের নানা খেয়াল দেখা দিতে আরম্ভ করেছে। কবির সঙ্গে একজন শিল্পী এসে যোগ দিল।” (রবীন্দ্র-রচনাবলী, ২য় খণ্ড, ভূমিকা)

মানসী কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে। কড়ি ও কোমল (১৮৮৬)-এর পরে তিন বছর ধরে লেখা কবিতা এই কাব্যে স্থান পেয়েছে। ফলে বিষয় ও ভাবে অনেক বৈচিত্র্যময় কবিতার সন্নিবেশ ঘটেছে এখানে। মানসীর কবিতাগুলো প্রকৃতি, নারী এবং স্বদেশভাবনামূলক। তবে সবকিছু ছাপিয়ে প্রেমই মানসী কাব্যের প্রধান সুর। আর এই প্রেমের মধ্যে বয়ে চলেছে জীবনের অপ্রাপ্তি আর বেদনার এক ফল্গুধারা। কামনার সংকীর্ণতা এবং পাওয়া-না-পাওয়ার ক্ষুদ্রতা দ্বারা একে বাঁধা যায় না। বরং প্রেমের বেদনায় লীন হয়ে পৃথিবীর অপার, অপার্থিব সৌন্দর্যে অবগাহন করতে চেয়েছেন কবি। মানসী কাব্যের প্রথম কবিতা ‘উপহার’ যার মধ্যে কাব্যের মূল সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে। কবি এখানে খুবই নিঃসঙ্গ। তাঁর হৃদয়ে দিনরাত্রি অবিরাম বেজে চলেছে জগতের তরঙ্গাঘাত, সুখ-দুঃখের গীতস্বর। কিন্তু হৃদয়ে শুধু ধ্বনিই বাজে, তার কোনো ভাষা নেই। সেই বিচিত্র কলরোল কবিকে ব্যাকুল করে, হতাশায় নিমজ্জিত করে। তাঁর আর কোনো কাজ নেই। ভাষা দিয়ে তিনি অসীম বহির্জগতের সীমাবন্ধন করতে চান এবং সেই ভাষা দিয়েই কবি তাঁর একান্ত মানসীর প্রতিমূর্তি নির্মাণ করেন। কিন্তু কবির সেই মানসী শুধু কল্পনাতেই থেকে যায়। তাকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না। প্রকৃতপক্ষে সমগ্র জীবনব্যাপী মানুষ একজন মানসপ্রিয়ার সন্ধান করে চলে। কিন্তু তাকে পায় না। না-পাওয়ার সেই বেদনাবোধ নিয়েই তার পথ চলা। মানুষের সেই চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা এবং না-পাওয়ার বেদনার মধ্য দিয়ে জীবনকে উপলব্ধি করার একটা প্রয়াস ‘উপহার’ কবিতায় আমরা লক্ষ করি। ‘ক্ষণিক মিলন’ কবিতায়ও সেই একই বিরহের সুরধ্বনি অনুরণিত হয়েছে। কোনো এক এলোকেশী নারী কবির দুয়ারে হঠাৎ একবার দেখা দিয়ে হারিয়ে গেছে চিরতরে। সেই নারীর আগমনে চারপাশের বন, দখিনা-বায়ুর সঙ্গে কবির মনও কেঁপে ওঠে, দুলে ওঠে। কিন্তু ক্ষণিকের দেখা সেই নারী কবির হৃদয়-মনকে ভেঙে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে যায়। কবি এখন রিক্ত, মৃতপ্রায়। নির্জনে বসে হৃদয়ের ধুকধুক শব্দে কবি যেন তারই চরণধ্বনি শুনতে পান।

“শবদ নাহি আর, চারি ধার প্রাণহীন— / কেবল ধুক ধুক করে বুক নিশিদিন। / যেন গো ধ্বনি এই তারই সেই চরণের / কেবলি বাজে শুনি, তাই গুনি দুই তিন।” (ক্ষণিক মিলন, মানসী)

কবিতার কলাকৌশল এবং ভাববস্তুগত দিক দিয়ে বুদ্ধদেব বসু ‘মানসী’কে রবীন্দ্রকাব্যের অণুবিশ্ব হিসেবে অভিহিত করেছেন। রবীন্দ্রনাথ মানসী কাব্যেই প্রথম মাত্রাবৃত্ত ছন্দে যুক্তবর্ণের যথার্থ ও বিচিত্র ব্যবহারের উদাহরণ দেখিয়েছেন। এর ফলে বাংলা কবিতার বিরাট সম্ভাবনার দ্বার খুলে যায়। বাংলা কবিতায় অন্ত্যমিলের বৈচিত্র্যময় ব্যবহার এই কাব্যে দেখা যায়। কবিতার ছন্দ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কাজ সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন:

“যেসব ছন্দ তাঁর হাতে কখনো বীণা, কখনো শঙ্খ, কখনো বা বাঁশি হয়ে মধুর, করুণ, উদাস, চপল, গম্ভীর, অথবা উৎসাহী সুরে ধীর বা দ্রুতলয়ে ধ্বনিত হয়েছে সেগুলিরও মানসীতেই আরম্ভ, কোনোটির আরম্ভ মাত্র, কোনোটি বা ইতিমধ্যেই বিকশিত।” (বাংলা কবিতার স্বপ্নভঙ্গ: মানসী, বুদ্ধদেব বসু, প্রবন্ধ সংগ্রহ-৩)

মানসীর অন্তর্ভুক্ত ‘নিষ্ফল কামনা’ ভাবগত এবং শৈল্পিক বিচারে উৎকৃষ্ট একটি কবিতা। মানুষ তার সীমিত সামর্থ্য নিয়ে অসীমকে কাছে পেতে চায়। কিন্তু মানুষের এই আকাঙ্ক্ষা কখনো পূর্ণ হয় না। এই আশা দুরাশা মাত্র। কারণ এই বিশাল বিশ্বজগতে মানুষ অতি তুচ্ছ। প্রেমের যে ঐশ্বর্য, প্রকৃতির যে সৌন্দর্যময়তা তা পরিপূর্ণভাবে ক্ষুদ্র মানুষের পক্ষে উপভোগ করা সম্ভব নয়। তারপরও মানসপ্রতিমাকে কাছে পেতে মানুষ ব্যাকুল হয়। কবির ভাষায়—

“তোমার আঁখির মাঝে, / হাসির আড়ালে, / বচনের সুধাস্রোতে, / তোমার বদনব্যাপী / করুণ শান্তির তলে / তোমারে কোথায় পাব—/ তাই এ ক্রন্দন।।” (নিষ্ফল কামনা, মানসী)

কিন্তু কল্পনায় যার অধিষ্ঠান তাকে কখনো বাস্তব জীবনে ধরা যায় না। দূর থেকে তাকে যতটুকু পাওয়া যায়, তাতেই সন্তুষ্ট হতে হয়। অতি লোভে মত্ত না হয়ে তার সৌন্দর্য-সুধা উপভোগ করাই মূল কথা। কবি বলেন:

“লও তার মধুর সৌরভ, / দেখো তার সৌন্দর্য বিকাশ, / মধু তার করো তুমি পান, / ভালোবাসো, প্রেমে হও বলী— / চেয়ো না তাহারে। / আকাঙ্ক্ষার ধন নহে আত্মা মানবের।” (প্রাগুক্ত)।

‘নিষ্ফল কামনা’ কবিতায় রবীন্দ্র-হৃদয়ের অন্তর্গত প্রেমের মর্মকথা ফুটে উঠেছে। রোমান্টিকতার বৈশিষ্ট্য হলো ব্যক্তিগত আবেগ, কল্পনাপ্রবণতা এবং প্রকৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ। এই সবগুলো বৈশিষ্ট্য রবীন্দ্রকাব্যে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। তাঁর রোমান্টিক কাব্যভাবনার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ ‘বর্ষার দিনে’ কবিতা। মেঘমেদুর বর্ষার দিনে যখন চারদিকে অবিরাম বৃষ্টি ঝরতে থাকে, সেই নির্জন প্রহরে প্রিয় মানুষের মুখোমুখি বসে হৃদয়ের অর্গল খুলে কথা বলা যায়। সেই পরম কাঙ্ক্ষিত পরিবেশে মুখে নয়, কথা হয় চোখে চোখে, সেই কথা হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়। নৈমিত্তিক জীবনের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব করতে অনেক সময় পড়ে আছে। কিন্তু শ্রাবণের এই আবেগঘন মুহূর্ত সব সময় আসে না। সুতরাং হৃদয়ের অব্যক্ত কথার এটাই শ্রেষ্ঠ সময়। কবি বলেন:

“ব্যাকুল বেগে আজি বহে যায়, / বিজুলি থেকে থেকে চমকায়। / যে কথা এ জীবনে রহিয়া গেল মনে / সে কথা আজি যেন বলা যায় / এমন ঘনঘোর বরষায়।।” (বর্ষার দিনে, মানসী)

প্রাক-মানসীতে রবীন্দ্রনাথের প্রেমভাবনায় ব্যক্তিগত কামনা-বাসনার যে ছায়া পড়েছিল, মানসীতে এসে তা দূরীভূত হয়ে যায়। এখানে কবিহৃদয় এক অজানা বিশ্বলোকের দিকে ধাবিত হয়েছে। জগতের যাবতীয় ঐশ্বর্য ও সৌন্দর্যের মাঝে নিরন্তর বয়ে চলা এক বেদনাকে কবি অনুভব করেন এবং মানসী কাব্যে সেই অব্যক্ত বেদনাকেই তিনি ধরতে চেয়েছেন। 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬


রবীন্দ্রভাবনায় প্রেম: প্রসঙ্গ মানসী

প্রকাশের তারিখ : ১৩ আগস্ট ২০২৬

featured Image


বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শুধু বাংলা ভাষারই নন, বিশ্বসাহিত্যেরও একজন শ্রেষ্ঠ কবিপ্রতিভা। রোমান্টিক গীতিকবি হিসেবে বাংলা তথা বিশ্বসাহিত্যে তাঁর স্থান অনন্য। বাংলা ভাষায় গীতিকবিতার সূচনা হয় কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর হাত ধরে, যাঁর সম্পর্কে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথই উপাধি দিয়েছিলেন ‘গীতিকবিতার ভোরের পাখি’। বিহারীলাল ছিলেন তৎকালীন কলকাতা সংস্কৃত কলেজের একজন কৃতী ছাত্র। এই কলেজ থেকে তিনি কাব্য ও অলংকারশাস্ত্রে বিশেষ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। এছাড়া ইংরেজি-শিক্ষিত বন্ধুর সাহায্যে তিনি ইংরেজি ভাষা শিক্ষা লাভ করেন। সেই সাথে তিনি শেক্সপিয়ার, বায়রনসহ অন্যান্য ইংরেজ কবির কবিতা পাঠ করেন। ইংরেজি গীতিকবিতা (লিরিক্যাল ব্যালাড) থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি বাংলা ভাষায় ‘বঙ্গসুন্দরী’ এবং ‘সারদামঙ্গল’ নামক দুটি সার্থক গীতিকাব্য রচনা করেন। এর ফলে বাংলা কবিতায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। মধ্যযুগীয় ধর্মীয় আখ্যানকাব্য এবং তৎপরবর্তী মহাকাব্যের যুগ পেরিয়ে বাংলা কবিতা পাশ্চাত্যের রোমান্টিক কাব্যভাবনার সংস্পর্শ লাভ করে। তবে বিহারীলাল সম্পর্কে একটি কথা বলা হয়, তিনি যতখানি কবি ছিলেন, ততখানি শিল্পী ছিলেন না। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ এই অপূর্ণতা দূর করেন। তাঁর হাতে বাংলা রোমান্টিক গীতিকবিতা সাফল্যের চূড়া স্পর্শ করে। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের মতামত প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেন:

“বিশ্বের মহত্তম রোম্যান্টিকদের একজন রবীন্দ্রনাথ। তার মধ্যে পাই রোম্যান্টিসিজমের বৈশিষ্ট্যগুলোর শ্রেষ্ঠ প্রকাশ, যা পাই না পুব-পশ্চিমের আর কারো মধ্যে।... তীব্রতায় তিনি অদ্বিতীয়, শেলির থেকেও অনেক বেশি তীব্র। বিলেতের পাঁচ রোম্যান্টিক— ওয়ার্ডসওয়ার্থ, কোলরিজ, শেলি, কিটস, বায়রন মিলে যা করে গেছেন, বাংলায় একলা তিনি করেছেন তার চেয়ে অনেক বেশি।” (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রধান কবিতা, পৃষ্ঠা-৯)

রবীন্দ্রনাথের কাব্যপরিক্রমার দিকে তাকালে দেখা যায়, ‘মানসী’তে এসে তাঁর কাব্যশক্তি এবং অন্তর্গত বোধ সংহত হয়েছে। বহুমুখী ভাবের বিস্তার, ভাষা ও ছন্দের বিচিত্র নিরীক্ষা, অভিনব কাব্য-আঙ্গিকের প্রয়োগ— সবকিছু মিলিয়ে এক অভূতপূর্ব কাব্য-উদ্দীপনার প্রকাশ ঘটে মানসীতে। রবীন্দ্রনাথ নিজেও এ কথার স্বীকৃতি দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য:

“কড়ি ও কোমল-এ অনেক ত্যাজ্য জিনিস আছে কিন্তু সেই পর্বে আমার কাব্য-ভূসংস্থানে ডাঙা জেগে উঠতে আরম্ভ করেছে। তারপর মানসী থেকে আরম্ভ করে বাকি বইগুলির কবিতায় ভালো-মন্দ মাঝারি ভেদ আছে, কিন্তু আমার আদর্শ অনুসারে ওরা প্রবেশিকা অতিক্রম করে কবিতার শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে।” (ভূমিকা, সঞ্চয়িতা)

তাঁর একেবারে প্রথম দিকের রচনা যেমন সন্ধ্যাসংগীত (১৮৮২), প্রভাতসংগীত (১৮৮৩), ছবি ও গান (১৮৮৪), এমনকি ভানুসিংহের পদাবলী (১৮৮৪)-কেও তিনি পরবর্তী জীবনে স্বীকার করতে চাননি। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের অস্বীকার করা কাব্যগ্রন্থগুলোতে এমন কিছু বিখ্যাত কবিতার দেখা মেলে যেগুলো তাঁর নামের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ রবীন্দ্রনাথের এরকম একটি কবিতা। প্রভাতসংগীত কাব্যের অন্তর্ভুক্ত এই কবিতাটি তাঁর শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলোর অন্যতম। প্রভাতসংগীতে আরেকটি কবিতা আছে, ‘প্রভাত উৎসব’। ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতায় জীবনের যে আনন্দ-মুখরতা, হৃদয়ের যে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস এবং বহির্জগতের প্রতি কবির যে আকুলতা, তারই প্রকাশ এখানেও ধ্বনিত হয়েছে। যেমন—

“হৃদয় আজি মোর কেমনে গেল খুলি,/ জগৎ আসি হেথা করিছে কোলাকুলি।/ ধরায় আছে যত মানুষ শত শত/ আসিছে প্রাণে মোর, হাসিছে গলাগলি।/ পরান পুরে গেল হরষে হল ভোর/ জগতে যারা আছে সবাই প্রাণে মোর।” (প্রভাত উৎসব, প্রভাতসংগীত)

কবির এই বিহ্বলতা এত অপ্রতিরোধ্য, এত দুর্নিবার যে, জীবন বা মৃত্যুর আলাদা কোনো তাৎপর্য নেই তাঁর কাছে। এই বোধেরই যেন প্রতিধ্বনি শোনা যায় ভানুসিংহের পদাবলী কাব্যের মরণ কবিতায়—

“মরণ রে, / তুঁহুঁ মম শ্যামসমান। / মেঘবরণ তুঝ, মেঘজটাজূট, / রক্ত কমলকর, রক্ত অধরপুট,/ তাপবিমোচন করুণ কোর তব / মৃত্যু-অমৃত করে দান। তুঁহুঁ মম শ্যামসমান।।” (মরণ, ভানুসিংহের পদাবলী)

কবিতাটি ব্রজবুলি ভাষায় লেখা। প্রাক-মানসী কাব্য কড়ি ও কোমল-এ ‘প্রাণ’ নামে একটি কবিতা আছে। এখানেও কবি জীবনের বন্দনা করেছেন। জগতের অনির্বচনীয় রূপময়তা এবং আনন্দ-কোলাহলের মধ্যে তিনি জীবনকে গভীরভাবে উদযাপন করতে চেয়েছেন। রবীন্দ্রজীবনের স্বপ্ন এবং আকাঙ্ক্ষা এই কবিতায় অসাধারণভাবে ধরা দিয়েছে। কবিতাটির প্রথম চারটি পঙ্ক্তি—

“মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে, / মানবের মাঝে আমি বাঁচিবারে চাই। / এই সূর্যকরে এই পুষ্পিত কাননে / জীবন্ত-হৃদয়-মাঝে যদি স্থান পাই!” (প্রাণ, কড়ি ও কোমল)

কড়ি ও কোমলে রোমান্টিক প্রেমভাবনার পাশাপাশি নারীর দৈহিক সৌন্দর্যও কবিকে আকৃষ্ট করেছে। স্তন, চুম্বন, দেহের মিলন, বিবসনা প্রভৃতি কবিতায় একজন রক্ত-মাংসের কামনা-বাসনা তাড়িত কবির দেখা পাওয়া যায়। রবীন্দ্র-কাব্যপ্রতিভার পূর্ণ বিকাশ ঘটে মানসীতে এসে। প্রাক-মানসীতে যা ছিল ব্যতিক্রম, হঠাৎ আলোর ঝলকানি, মানসীতে তা যেন এক স্থায়ী রূপ পরিগ্রহ করে। কড়ি ও কোমলে রবীন্দ্র-রশ্মির যে আভা দেখা দিয়েছিল, মানসীতে তা রৌদ্রকরোজ্জ্বল বিভায় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। মানসীর পরে বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো একে একে রচনা করেন সোনার তরী, চিত্রা, কল্পনা, ক্ষণিকার মতো কাব্যগ্রন্থ। মানসী রবীন্দ্রনাথের এই পর্বের প্রথম শিল্পসফল কাব্য। এ বিষয়ে কবির নিজস্ব ভাষ্য:

“পূর্ববর্তী কড়ি ও কোমল-এর সঙ্গে এর বিশেষ মিল পাওয়া যাবে না। আমার রচনার এই পর্বেই যুক্ত অক্ষরকে পূর্ণ মূল্য দিয়ে ছন্দকে নতুন শক্তি দিতে পেরেছি। মানসীতে ছন্দের নানা খেয়াল দেখা দিতে আরম্ভ করেছে। কবির সঙ্গে একজন শিল্পী এসে যোগ দিল।” (রবীন্দ্র-রচনাবলী, ২য় খণ্ড, ভূমিকা)

মানসী কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৮৯০ খ্রিস্টাব্দে। কড়ি ও কোমল (১৮৮৬)-এর পরে তিন বছর ধরে লেখা কবিতা এই কাব্যে স্থান পেয়েছে। ফলে বিষয় ও ভাবে অনেক বৈচিত্র্যময় কবিতার সন্নিবেশ ঘটেছে এখানে। মানসীর কবিতাগুলো প্রকৃতি, নারী এবং স্বদেশভাবনামূলক। তবে সবকিছু ছাপিয়ে প্রেমই মানসী কাব্যের প্রধান সুর। আর এই প্রেমের মধ্যে বয়ে চলেছে জীবনের অপ্রাপ্তি আর বেদনার এক ফল্গুধারা। কামনার সংকীর্ণতা এবং পাওয়া-না-পাওয়ার ক্ষুদ্রতা দ্বারা একে বাঁধা যায় না। বরং প্রেমের বেদনায় লীন হয়ে পৃথিবীর অপার, অপার্থিব সৌন্দর্যে অবগাহন করতে চেয়েছেন কবি। মানসী কাব্যের প্রথম কবিতা ‘উপহার’ যার মধ্যে কাব্যের মূল সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে। কবি এখানে খুবই নিঃসঙ্গ। তাঁর হৃদয়ে দিনরাত্রি অবিরাম বেজে চলেছে জগতের তরঙ্গাঘাত, সুখ-দুঃখের গীতস্বর। কিন্তু হৃদয়ে শুধু ধ্বনিই বাজে, তার কোনো ভাষা নেই। সেই বিচিত্র কলরোল কবিকে ব্যাকুল করে, হতাশায় নিমজ্জিত করে। তাঁর আর কোনো কাজ নেই। ভাষা দিয়ে তিনি অসীম বহির্জগতের সীমাবন্ধন করতে চান এবং সেই ভাষা দিয়েই কবি তাঁর একান্ত মানসীর প্রতিমূর্তি নির্মাণ করেন। কিন্তু কবির সেই মানসী শুধু কল্পনাতেই থেকে যায়। তাকে ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না। প্রকৃতপক্ষে সমগ্র জীবনব্যাপী মানুষ একজন মানসপ্রিয়ার সন্ধান করে চলে। কিন্তু তাকে পায় না। না-পাওয়ার সেই বেদনাবোধ নিয়েই তার পথ চলা। মানুষের সেই চিরন্তন আকাঙ্ক্ষা এবং না-পাওয়ার বেদনার মধ্য দিয়ে জীবনকে উপলব্ধি করার একটা প্রয়াস ‘উপহার’ কবিতায় আমরা লক্ষ করি। ‘ক্ষণিক মিলন’ কবিতায়ও সেই একই বিরহের সুরধ্বনি অনুরণিত হয়েছে। কোনো এক এলোকেশী নারী কবির দুয়ারে হঠাৎ একবার দেখা দিয়ে হারিয়ে গেছে চিরতরে। সেই নারীর আগমনে চারপাশের বন, দখিনা-বায়ুর সঙ্গে কবির মনও কেঁপে ওঠে, দুলে ওঠে। কিন্তু ক্ষণিকের দেখা সেই নারী কবির হৃদয়-মনকে ভেঙে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে যায়। কবি এখন রিক্ত, মৃতপ্রায়। নির্জনে বসে হৃদয়ের ধুকধুক শব্দে কবি যেন তারই চরণধ্বনি শুনতে পান।

“শবদ নাহি আর, চারি ধার প্রাণহীন— / কেবল ধুক ধুক করে বুক নিশিদিন। / যেন গো ধ্বনি এই তারই সেই চরণের / কেবলি বাজে শুনি, তাই গুনি দুই তিন।” (ক্ষণিক মিলন, মানসী)

কবিতার কলাকৌশল এবং ভাববস্তুগত দিক দিয়ে বুদ্ধদেব বসু ‘মানসী’কে রবীন্দ্রকাব্যের অণুবিশ্ব হিসেবে অভিহিত করেছেন। রবীন্দ্রনাথ মানসী কাব্যেই প্রথম মাত্রাবৃত্ত ছন্দে যুক্তবর্ণের যথার্থ ও বিচিত্র ব্যবহারের উদাহরণ দেখিয়েছেন। এর ফলে বাংলা কবিতার বিরাট সম্ভাবনার দ্বার খুলে যায়। বাংলা কবিতায় অন্ত্যমিলের বৈচিত্র্যময় ব্যবহার এই কাব্যে দেখা যায়। কবিতার ছন্দ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের কাজ সম্পর্কে বুদ্ধদেব বসু লিখেছেন:

“যেসব ছন্দ তাঁর হাতে কখনো বীণা, কখনো শঙ্খ, কখনো বা বাঁশি হয়ে মধুর, করুণ, উদাস, চপল, গম্ভীর, অথবা উৎসাহী সুরে ধীর বা দ্রুতলয়ে ধ্বনিত হয়েছে সেগুলিরও মানসীতেই আরম্ভ, কোনোটির আরম্ভ মাত্র, কোনোটি বা ইতিমধ্যেই বিকশিত।” (বাংলা কবিতার স্বপ্নভঙ্গ: মানসী, বুদ্ধদেব বসু, প্রবন্ধ সংগ্রহ-৩)

মানসীর অন্তর্ভুক্ত ‘নিষ্ফল কামনা’ ভাবগত এবং শৈল্পিক বিচারে উৎকৃষ্ট একটি কবিতা। মানুষ তার সীমিত সামর্থ্য নিয়ে অসীমকে কাছে পেতে চায়। কিন্তু মানুষের এই আকাঙ্ক্ষা কখনো পূর্ণ হয় না। এই আশা দুরাশা মাত্র। কারণ এই বিশাল বিশ্বজগতে মানুষ অতি তুচ্ছ। প্রেমের যে ঐশ্বর্য, প্রকৃতির যে সৌন্দর্যময়তা তা পরিপূর্ণভাবে ক্ষুদ্র মানুষের পক্ষে উপভোগ করা সম্ভব নয়। তারপরও মানসপ্রতিমাকে কাছে পেতে মানুষ ব্যাকুল হয়। কবির ভাষায়—

“তোমার আঁখির মাঝে, / হাসির আড়ালে, / বচনের সুধাস্রোতে, / তোমার বদনব্যাপী / করুণ শান্তির তলে / তোমারে কোথায় পাব—/ তাই এ ক্রন্দন।।” (নিষ্ফল কামনা, মানসী)

কিন্তু কল্পনায় যার অধিষ্ঠান তাকে কখনো বাস্তব জীবনে ধরা যায় না। দূর থেকে তাকে যতটুকু পাওয়া যায়, তাতেই সন্তুষ্ট হতে হয়। অতি লোভে মত্ত না হয়ে তার সৌন্দর্য-সুধা উপভোগ করাই মূল কথা। কবি বলেন:

“লও তার মধুর সৌরভ, / দেখো তার সৌন্দর্য বিকাশ, / মধু তার করো তুমি পান, / ভালোবাসো, প্রেমে হও বলী— / চেয়ো না তাহারে। / আকাঙ্ক্ষার ধন নহে আত্মা মানবের।” (প্রাগুক্ত)।

‘নিষ্ফল কামনা’ কবিতায় রবীন্দ্র-হৃদয়ের অন্তর্গত প্রেমের মর্মকথা ফুটে উঠেছে। রোমান্টিকতার বৈশিষ্ট্য হলো ব্যক্তিগত আবেগ, কল্পনাপ্রবণতা এবং প্রকৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ। এই সবগুলো বৈশিষ্ট্য রবীন্দ্রকাব্যে প্রতিধ্বনিত হয়েছে। তাঁর রোমান্টিক কাব্যভাবনার একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ ‘বর্ষার দিনে’ কবিতা। মেঘমেদুর বর্ষার দিনে যখন চারদিকে অবিরাম বৃষ্টি ঝরতে থাকে, সেই নির্জন প্রহরে প্রিয় মানুষের মুখোমুখি বসে হৃদয়ের অর্গল খুলে কথা বলা যায়। সেই পরম কাঙ্ক্ষিত পরিবেশে মুখে নয়, কথা হয় চোখে চোখে, সেই কথা হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে হয়। নৈমিত্তিক জীবনের চাওয়া-পাওয়ার হিসাব করতে অনেক সময় পড়ে আছে। কিন্তু শ্রাবণের এই আবেগঘন মুহূর্ত সব সময় আসে না। সুতরাং হৃদয়ের অব্যক্ত কথার এটাই শ্রেষ্ঠ সময়। কবি বলেন:

“ব্যাকুল বেগে আজি বহে যায়, / বিজুলি থেকে থেকে চমকায়। / যে কথা এ জীবনে রহিয়া গেল মনে / সে কথা আজি যেন বলা যায় / এমন ঘনঘোর বরষায়।।” (বর্ষার দিনে, মানসী)

প্রাক-মানসীতে রবীন্দ্রনাথের প্রেমভাবনায় ব্যক্তিগত কামনা-বাসনার যে ছায়া পড়েছিল, মানসীতে এসে তা দূরীভূত হয়ে যায়। এখানে কবিহৃদয় এক অজানা বিশ্বলোকের দিকে ধাবিত হয়েছে। জগতের যাবতীয় ঐশ্বর্য ও সৌন্দর্যের মাঝে নিরন্তর বয়ে চলা এক বেদনাকে কবি অনুভব করেন এবং মানসী কাব্যে সেই অব্যক্ত বেদনাকেই তিনি ধরতে চেয়েছেন। 



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত