চিত্রাঙ্গদা
সঞ্জয় মাথার ওপর হাত ঘুরিয়ে ঋষিদের মতো লম্বা দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলেন, তো এমন ঠিক নয় যে রবি তেমন প্রাচীন কবিদের একজন যার হাতে মহাকাব্য বর্ধিত পরিবর্তিত হবে বা হয়েছে! ঘটনা নিজের মতো প্রকাশ করার স্বাধীনতা নিয়েছেন রবি, ফলে বিশ্বাস ও সংস্কারমুক্ত রবি প্রাচীন কবিদের দাসত্ব না ক’রে নিজের মতো রূপ তৈরি ক’রে নিয়েছেন, ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। যেভাবে ঘটেছে পুরাণে, যে সুর ছন্দে আন্দোলিত আদি কবিদের কাব্য, রবীন্দ্রনাথ সেই সুর ছন্দে নিজের স্বর ও স্বাক্ষর যুক্ত করেছেন, নিজের মতো ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করেছেন স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশে, সেই প্রকাশে কাব্য-আত্মা দলিত নয় বরং ব্যঞ্জনাময় এবং কালের উপযোগী ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে। সবই তো কাব্য ও স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষার ইতিহাস, যা সময়ের ঘটনা থেকে নয়, কবির হৃদয়ে জন্ম নেয় স্বাধীনভাবে; যুক্তি সংগতি সম্ভব অসম্ভবের বিচার হবে কাব্যসত্যের আদালতে, সমালোচকের কাঠগড়ায় নয়। যেমন দেখ রবির লেখা ‘চিত্রাঙ্গদা’ কাব্য নাটকটি মহাভারতের চিত্রাঙ্গদা থেকে অনেকটাই অন্য রকম। রূপ-যৌবন ও নারী সত্তার প্রতি পুরুষের উপেক্ষা চিত্রাঙ্গদাকে পীড়িত করে, সব নারীকেই করবে হয়তো। বসন্ত ও মদন দেবের সহযোগিতায় ওই উপেক্ষার বদলে প্রেম ও সম্মান আদায় করে ছাড়ে অর্জুনের। কিন্তু পুরুষের কাছে এই নারী সম্পূর্ণ নিবেদন করেও আত্মাভিমান ও আত্ম-স্বাতন্ত্র্যের বোধে তৃপ্ত হতে পারে না একান্ত নিজের কাছে। বসন্ত ও মদনের কাছ থেকে ধার নেয়া রূপ ও মদির যৌবন চিত্রাঙ্গদার নিজের দেহে বহন করলেও একান্ত অন্তর্গতভাবে আত্মার সঙ্গে দেহ সৌন্দর্যের সতীন সম্পর্ক অনুভব করে। আত্মসম্মানবোধ সংবেদী চিত্রাঙ্গদা গভীরে দীর্ণ হয়, নরলোকের অশান্তি দেহসুখ ছাপিয়ে জেগে ওঠে অন্তরে। ধার করা বাহ্যিক রূপের মোহ দিয়ে ভোলানোয় অস্বস্তি রবির সৃষ্টি করা চিত্রাঙ্গদার, আদি কবির নয়। চিত্রাঙ্গদার কণ্ঠে তার সেই অন্তরগূঢ় বোধের কথা শোনো,
আজ প্রাতে উঠে, নৈরাশ্যধিক্কার বেগে
অন্তরে অন্তরে টুটিছে হৃদয়। মনে
পড়িতেছে একে একে রজনীর কথা।
বিদ্যুৎবেদনাসহ হতেছে চেতনা।
অন্তরে বাহিরে মোর হয়েছে সতীন
আর তাহা নারিব ভুলিতে। সপত্নীরে
স্বহস্তে সাজায়ে সযতনে, প্রতিদিন
পাঠাইতে হবে, আমার আকাঙ্ক্ষাতীর্থ
বাসরশয্যায়; অবিশ্রাম সঙ্গে রহি
প্রতিক্ষণ দেখিতে হইবে চক্ষু মেলি
তাহার আদর। ওগো, দেহের সোহাগে
অন্তর জ্বলিবে হিংসানলে, হেন শাপ
নরলোকে কে পেয়েছে আর।
তোমাকে একটা কথা বলে রাখি, রবির বিশাল কর্মরাজির মধ্যে আরও বহু বহু নারী চরিত্র সৃষ্টি হয়েছে, রবির বিশেষ করে মেয়েদের নিয়ে নিজের ভাবনাও লিখবেন কিন্তু কালে তা গৃহীত নাও হতে পারে, ওর নারী চিন্তার পুরাতনী ভাব লোকে সমালোচনা করবে যদিও এর সত্য ও বাস্তব রূপ উপেক্ষা করা যাবে না। অভিভূত জ্যোতি ঠাকুরের দিকে চেয়ে সঞ্জয় বলেন, চিত্রাঙ্গদা অসাধারণ কাব্য, গীতিধর্মী কাব্য নাটক। জ্যোতি বলেন, অদৃষ্ট দ্রষ্টা, রবি তার জীবনকালে যা যা রচনা করবেন তার সব পাঠ শেষ করেছেন! শোনো জ্যোতি, দিব্যদৃষ্টিসম্পন্নের জন্য এ কোনো বিস্ময়কর কাজ নয়। তবে আমি তোমাকে শুধু বলছি পুরাণের আখ্যান ব্যবহার ক’রে নিজের স্বাধীন কাব্যবোধ থেকে কী সব রসসৃষ্টি করেছন বা করবেন তার কিছু নমুনা। আদি কবিদের চিন্তা ও কাহিনীকে রবি কাব্য নির্মাণের প্রতিভায় নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেখেই মূলত আমি ঠিক ক’রে নিয়েছি রবিই সেই কবি এই সঞ্জয়ের জীবনকে যে ব্যাসদেবের বর থেকে আরও বড়ো বরে নায়ক ক’রে তুলতে পারবেন। তুমি দেখো এই চিত্রাঙ্গদা নাট্য ভাবনাটি তাঁর মনে কীভাবে তৈরি হলো! প্রথমে সে জীবনের সত্য, বাস্তবতার গভীর একটি বোধ দ্বারা আলোড়িত হলো, তারপর সেই আলোড়নকে কাব্যে প্রকাশ করার ভাবনায় চিত্রাঙ্গদা উপাখ্যানটি তার মাথায় আসে। মহাভারতের চিত্রাঙ্গদা উপাখ্যানটি তেমন বড়ো কিছু নয়। সংস্কৃত তেরটি শ্লোকে যে আখ্যান বর্ণিত হয়েছে তাতে আত্মসচেতন, বোধোজ্জ্বল কোনো রমণীর গল্প সেখানে নেই। মহাভারতের আদি পর্বের অর্জুন বনবাস পর্বাধ্যায়-এ চিত্রাঙ্গদার খবর আমরা জানি। যাই হোক, এখন রবির কাছ থেকেই শোনো ‘চিত্রাঙ্গদা’ সূচনার কথা—
“অনেক বছর আগে রেলগাড়িতে যাচ্ছিলাম শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতার দিকে। তখন বোধ করি চৈত্র মাস হবে। রেললাইনের ধারে ধারে আগাছার জঙ্গল। হলদে বেগনি সাদা রঙের ফুল ফুটেছে অজস্র। দেখতে দেখতে এই ভাবনা এল মনে যে আর কিছুকাল পরেই রৌদ্র হবে প্রখর, ফুলগুলি তাদের রঙের মরীচিকা নিয়ে যাবে মিলিয়ে— তখন পল্লীপ্রাঙ্গণে আম ধরবে গাছের ডালে ডালে, তরুপ্রকৃতি তার অন্তরের নিগূঢ় রস-সঞ্চয়ের স্থায়ী পরিচয় দেবে আপন অপ্রগলভ ফল সম্ভারে। সেই সঙ্গে কেন জানি হঠাৎ আমার মনে হলো সুন্দরী যুবতী যদি অনুভব করে যে সে তার যৌবনের মায়া দিয়ে প্রেমিকের হৃদয় ভুলিয়েছে তাহলে সে তার সুরূপকেই আপন সৌভাগ্যের মুখ্য অংশে ভাগ বসাবার অভিযোগে সতিন ব’লে ধিক্কার দিতে পারে। এ যে তার বাইরের জিনিস, এ যেন ঋতুরাজ বসন্তের কাছ থেকে পাওয়া বর, ক্ষণিক মোহ বিস্তারের দ্বারা জৈব উদ্দেশ্য সিদ্ধ করবার জন্যে। যদি তার অন্তরের মধ্যে যথার্থ চরিত্রশক্তি থাকে তবে সেই মোহযুক্ত শক্তির দানই তার প্রেমের পক্ষে মহৎলাভ, যুগল জীবনের জয়যাত্রার সহায়। সেই দানে আত্মার স্থায়ী পরিচয়, এর পরিণামে ক্লান্তি নেই, অবসাদ নেই, অভ্যাসের ধূলিপ্রলেপে উজ্জ্বলতার মালিন্য নেই। এই চারিত্রশক্তি জীবনের... সম্বল, নির্মল প্রকৃতির আশু প্রয়োজনের প্রতি তার নির্ভর নয়। অর্থাৎ এর মূল্য মানবিক, এ নয় প্রাকৃতিক।”
“এ ভাবটাকে নাট্য আকারে প্রকাশ-ইচ্ছা তখনই মনে এল, সেই সঙ্গে মনে পড়ল মহাভারতের চিত্রাঙ্গদার কাহিনী। এই কাহিনীটি কিছু রূপান্তর নিয়ে অনেকদিন আমার মনের মধ্যে প্রচ্ছন্ন ছিল। অবশেষে লেখবার আনন্দিত অবকাশ পাওয়া গেল উড়িষ্যায় পাণ্ডুরা বলে এক নিভৃত পল্লীতে গিয়ে” (রবীন্দ্র-রচনাবলী, ২য় খণ্ড, “চিত্রাঙ্গদার সূচনা”)।
জীবন-সায়াহ্নে রবি ‘চিত্রাঙ্গদার সূচনা’র এই খবর জানিয়ে গেছেন। কাব্য, নাট্য ও সঙ্গীতগুণ রচনাটি মুগ্ধ করে। জ্যোতি এই সূচনার কথা জানত না, কথাও নয়। পরবর্তী প্রজন্মের একটি পাঠে সব প্রসঙ্গই উঠে এসেছে, চিত্রাঙ্গদা আলোচনা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মেয়েদের নিয়ে ভাবনাচিন্তার খোঁজখবর, ও রবীন্দ্রনাথের চারপাশের পরিবেশের কিছু খবর এতে রয়েছে।
নারীদের পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রিক, আধ্যাত্মিক এবং দৈহিক বিষয়ে ভূমিকা ও দায়িত্ব-কর্তব্যের ভাবনায় রবীন্দ্রনাথ একজন অতিপ্রজ লেখক। গল্প-উপন্যাস-কবিতায় নারী ও নারীভাবনা নির্মিত হয়েছে দুই একটি ব্যতিক্রম বাদে তাঁর সুচিন্তিত প্রবন্ধের দৃষ্টিভঙ্গি এবং মত অনুসারেই। সচেতন চিন্তার বিপরীতে বা উদাসীন থেকে কেবল শিল্পের স্বার্থে, গল্পের খাতিরে ভিন্ন নারীসত্তা ও সামাজিকতা সৃষ্টি করতে রবীন্দ্রনাথকে দেখা প্রায় যায় না। বিশেষ ব্যতিক্রম হলো ভাদ্র ১২৯৮ বাংলা সালে লেখা ভাদ্র ১২৯৯ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত ‘চিত্রাঙ্গদা’ কাব্য নাটক। মহাভারতের ছোট একটি উপাখ্যানকে অনুষঙ্গ ক’রে চিত্রাঙ্গদা কাব্য নাটক নির্মিত হয়। নারী সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মনে যে বিশেষ কিছু ধারণা ধ্রুব হয়ে আছে তা শিল্প নৈপুণ্যে ভরা অতুলনীয় কাব্যনাটক ‘চিত্রাঙ্গদা’-য় তার কিছু ক্ষেত্রে ভিন্ন রকম ঘটে। মণিপুর রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদার জন্মই তো একটা চ্যালেঞ্জ। দেব উমাপতি মহাদেব তুষ্ট হয়ে বর দিয়েছিল এই বংশে শুধু পুত্রই জন্মাবে।
তপস্যায় তুষ্ট মহাবর নিষ্ফল করে চিত্রাঙ্গদার জন্ম হয়। চিত্রাঙ্গদা বলে,
‘আমি সেই মহাবর
ব্যর্থ করিয়াছি। অমোঘ দেবতাবাক্য
মাতৃগর্ভ পশি দুর্বল প্রারম্ভ মোর
পারিল না পুরুষ করিতে শিব তেজে,
এমনি কঠিন নারী আমি।’
কন্যাকেই রাজা পুত্রবৎ লালন পালন করে শেখায় ধনুর্বিদ্যা, রাজদণ্ডনীতি; ধনুর্বিদ্যায় সে বীর, রাজ্যের শত্রু ও অমঙ্গলের কাছে ত্রাস, দুর্বলের সহায়। রাজদণ্ডনীতি শিক্ষা এবং চর্চা করে, চিত্রাঙ্গদার মণিপুর রাজ্যে অমঙ্গল ঘটে না। বিমলা রাজনীতিতে আগ্রহী হওয়ায় এবং পরিণতিতে ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসে নিখিলেশের সংসারের মতো ওই রাজ্য শ্মশানও হয়ে ওঠে না তখন।
রবীন্দ্রনাথ দ্বিধাহীন প্রত্যয় ও বিশ্বাসের সঙ্গে সুচিন্তিত গদ্যে লিখেছেন, গল্প কবিতায় নয়, ‘...মেয়ে সংসারস্থিতির লক্ষ্মী আবার সংসার ছারখার করবার প্রলয়ংকারী তার মতো কেউ নেই’ (পশ্চিমযাত্রীর ডায়ারি)। নিখিলবঙ্গ-মহিলা কর্মী সম্মেলনে (১৯৩৪) লিখিত ‘নারী’ (কালান্তর) প্রবন্ধে তিনি বলেন, ‘...নারীর মধ্যে প্রেয়সী, নারীর মধ্যে জননী প্রকৃতির দৌত্যে স্থির প্রতিষ্ঠিত হয়ে আপন কাজ ক’রে চলেছে।’ প্রেয়সী কল্যাণী জননী হিসেবে সংসারে নারীর ভূমিকা ‘জীবপ্রকৃতি চূড়ান্তভাবে স্থিত ও প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছে।’ চিত্রাঙ্গদাও প্রেয়সী কিন্তু একটি মাত্র ভূমিকাতেই সে সীমাবদ্ধ নয়। ধনুর্বিদ্যা আর রাজদণ্ডনীতি শেখা সফল মানুষ। রবীন্দ্রনাথ কথিত পুরুষের সংগ্রাম, জয়ের নেশা, লড়াই বীর্যবান আচরণ চিত্রাঙ্গদার জীবনেও সত্য হয়ে উঠেছে। নারী পুরাতনী ধারণার রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতির দোহাই দিয়ে বলেন, ‘প্রকৃতি তাকে যে হৃদয় সম্পদ দিয়েছেন নিত্য কৌতূহলপ্রবণ বুদ্ধির হাতে তাকে নূতন নূতন অধ্যবসায়ে পরখ করতে দেওয়া হয়নি। নারী পুরাতনী’ (নারী, কালান্তর)। চিত্রাঙ্গদা পুরাতন নয়, নতুন ও আধুনিক। শুধু হৃদয়বৃত্তি নয়, চিত্তবৃত্তিতেও সে সত্য। দ্রৌপদীর সঙ্গে বিয়ের শর্ত ভাঙ্গার অপরাধে বারো বছরের বনবাসে আছে অর্জুন। পূর্ণা নদীতীরে, দুর্গম কুটিল বন পথে একাকী মৃগ অন্বেষণে চিত্রাঙ্গদা। সংসারে যে দুই জাতের নারী আছে ‘এক জাত প্রধানত মা, আর এক জাত প্রিয়া’ রবীন্দ্রনাথের মত মোতাবেক ঘোষণা করে গল্পের নারী শর্মিলা (দুই বোন)। ব্যতিক্রমী চিত্রাঙ্গদা ভিন্ন জাতের, সে অনন্য। জাত অন্য হলেও হৃদয়বৃত্তি ও চিত্তবৃত্তির সমন্বয়ে সংবেদনশীল, আত্মসম্মানে উজ্জ্বল মানুষ এবং নারী।
পরবর্তী প্রজন্মের একজন লেখক ক্ষুদিরাম দাস তাঁর রবীন্দ্র প্রতিভার পরিচয় (পরিবর্ধিত সংস্করণ ১৩৮৪) গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সমালোচক ক্ষুদিরাম দাস মহাকাব্যিক আখ্যানগুলোর কাহিনী ও চরিত্রের নবরূপায়ণ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন,
“চিত্রাঙ্গদায় নারীত্ব সম্বন্ধে, বিদায় অভিশাপে প্রণয়মহিমা সম্বন্ধে, এবং গান্ধারীর আবেদন ও নরকবাসে মানবধর্ম সম্বন্ধে কবির একটি বিশেষ ভাবুকতাই এদের কবিহৃদয়ে স্বীকরণকে নিরূপিত করেছে। চিত্রাঙ্গদায় কাব্যের অতিরিক্ত কবির যে সূক্ষ্ম আদর্শবোধ প্রকাশিত হয়েছে তা বোধ হয় এই যে, পুরুষের যৌন আকর্ষণে নারীর রূপ অনেকাংশে কাজ করলেও নারীকে ভোগের বস্তুরূপে দেখলে অকৃতার্থ হয় পুরুষ নিজেই। বিদায়-অভিশাপ খণ্ডকাব্যে করুণরসের মধ্য দিয়ে প্রতিপন্ন করা হয়েছে কর্তব্য থেকে প্রেমের মর্যাদা গুরুতর। কর্ণ-কুন্তী-সংবাদে মাতৃধর্মের নৃশংস অবহেলা দেখানো হয়েছে, গান্ধারীর আবেদনে রাজনীতি ও রাজধর্মের নৃশংস কর্তব্যকে পাপ ও অধর্ম বলে ঘোষণা করা হয়েছে, আর নরকবাসে শাস্ত্র ও প্রথার আনুগত্যের নিষ্ঠুর দিক উদ্ঘাটিত করা হয়েছে।” (পৃ. ১১৫)
চিত্রাঙ্গদার মূল্যায়ন করতে গিয়ে ক্ষুদিরাম দাস জানিয়েছেন:
“মহাভারতের চিত্রাঙ্গদা আখ্যানকে রবীন্দ্রনাথ মাত্র স্পর্শ করেছেন। এর পট, কাহিনী, চরিত্র, পরিণাম সবই তাঁর উদ্ভাবিত। চিত্রাঙ্গদার সঙ্গে অর্জুনের অরণ্যে সাক্ষাৎকার, এই সাক্ষাৎকারে চিত্রাঙ্গদার পূর্বরাগ, মদন ও বসন্তের কাছে চিত্রাঙ্গদার রূপযৌবন প্রাপ্তির জন্য আবেদন, অর্জুনের মোহ এবং মোহভঙ্গ প্রভৃতি ঘটনা মূলে নেই। মূলে রয়েছে মণিপুররাজ চিত্রবাহন তাঁর এই কন্যাটিকে পুত্রভাবে দেখতেন, কারণ তাঁর পুত্র ছিল না। সুতরাং চিত্রাঙ্গদা কতকটা স্বচ্ছন্দ বিচরণের অনুমতি পেয়েছিলেন। এরই উপর রবীন্দ্রনাথ তাঁর কল্পনাকে বিস্তৃত করে দিয়েছেন।... মূলে চিত্রাঙ্গদা কুরূপা ছিলেন না, বরং অতিসুন্দরী ছিলেন। চিত্রাঙ্গদাকে বিবাহ করে অর্জুন তিন বৎসর মণিপুর রাজ্যে অবস্থিতির পর পুনরায় তীর্থদর্শনে গেলেন এবং ফিরে এসে পুত্র বভ্রুবাহনকে দেখলেন। তিনি চিত্রাঙ্গদাকে বললেন, পুত্রকে পালন কোরো, রাজসূয় যজ্ঞের সময় পিতার সঙ্গে ইন্দ্রপ্রস্থে যেয়ো।” (পৃ. ১১৬)
‘লতাগুল্মে গহন গম্ভীর মহারণ্যে’ পথ রুদ্ধ ক’রে চীরধারী এক পুরুষ শুয়ে আছে। বীর্যবান চিত্রাঙ্গদা সেই পুরুষকে উঠতে বলে, চীরধারী পুরুষটি ওঠে না। তখন ‘উদ্ধত অধীর রোষে ধনু-অগ্রভাগে’ তাকে তাড়া করে। পুরুষটি সরল সুদীর্ঘ দেহ নিয়ে মুহূর্তেই তীরবেগে উঠে দাঁড়ায়, চোখে রোষদৃষ্টি। কোনো শক্ত প্রতিপক্ষ নয় দেখে চিত্রাঙ্গদাকে বালক শিকারী ভেবে পুরুষটির ‘নাচিল অধরপ্রান্তে স্নিগ্ধ গুপ্ত কৌতুক মৃদু হাস্যরেখা।’ বালক রূপের বিভ্রমে ঢাকা পড়ে গেছে তার নারীসত্তা, চিত্রাঙ্গদা অপমানিত বোধ করে, আহত হয়, বুঝতে পারে ‘সেই মুহূর্তেই জানিলাম মনে, নারী আমি। সেই মুহূর্তেই প্রথম দেখিনু সম্মুখে পুরুষ মোর। দেবতা মদন (অবশ্যই পুরুষ) সঙ্গে সঙ্গে চিত্রাঙ্গদার এই উপলব্ধির কৃতিত্ব নিজে অধিকার করে বলে, ‘সে শিক্ষা আমারি... আমিই চেতন করে দিই নারীরে হইতে নারী, পুরুষে পুরুষ।’ চিত্রাঙ্গদা জানতে পারে এই সেই মহাবীর অপরাজেয় অর্জুন, ব্রহ্মচর্যরত পার্থ, বীর। ধনুর্বিদ্যায় মহাপারদর্শী চিত্রাঙ্গদার কাছে পার্থ অর্জুন কতকাল থেকেই হয়ে আছে বিস্ময়, আকাঙ্ক্ষিত। নারী সত্তার জাগরণ অথবা মদন দেবের ভূমিকায় শৌর্যবীর্য ধুলায় মিলায়ে অর্জুনের পদতলে সমর্পণ করার বাসনা চিত্রাঙ্গদার দেহে ও মনে সঞ্চারিত হয়। অতঃপর ঋতুরাজ বসন্ত আর পঞ্চশর মদন দেব অন্তত বছরকালের জন্য চিত্রাঙ্গদার দেহমনে অনন্য রূপ ও কামনার বহ্নি দিয়ে সাজিয়ে তোলে। রূপের বহ্নি ও যৌবনের উষ্ণ সৌন্দর্য নিয়ে অর্জুনের কুটিরে এসে তাকে মুগ্ধ, প্রেমাকাঙ্ক্ষী করে তুলতে সক্ষম হয় আশ্রমকন্যারূপী চিত্রাঙ্গদা।
রাজনীতি শেখা চিত্রাঙ্গদা পাণিপ্রার্থী অর্জুনকে শর্ত দেয়, তাদের মিলনজাত সন্তান হবে মণিপুরের রাজার বংশধর। মহাভারতে এই শর্তের কথা অবশ্য চিত্রাঙ্গদার নয়, তার পিতা রাজা চিত্রবাহনই অর্জুনকে জানান। মহাভারতের আখ্যানে অন্য রকম ঘটেছে। হুবহু সেই গল্প অনুসরণের কথা রবীন্দ্রনাথও উল্লেখ করেন নাই। বর্ষব্যাপী মিলনের শেষে বিদায়কালে নাটকের চিত্রাঙ্গদা নিজেই বলে, তার গর্ভের সন্তানকে অর্জুনের মতো বীর শিক্ষায় বীর করে একদিন বাবার কাছে পাঠাবো। ‘আশৈশব বীরশিক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় অর্জুন করি তারে একদিন পাঠাইয়া দিব যবে পিতার চরণে— তখন জানিবে মোরে প্রিয়তম।’ কিন্তু প্রেম-যৌবন-মিলনেই তো চিত্রাঙ্গদার ব্যক্তিত্বের পরিচয় সম্পূর্ণ নয়। মদন ও বসন্তের দেয়া রূপেও চিত্রাঙ্গদা চিত্রাঙ্গদা নয়। সে এক ভিন্ন জাতের নারী। এভাবে শুধু প্রেয়সী, বীরপুরুষের মিলনের সঙ্গী হয়ে থাকা তার কাছে মনে হয় ছলনা। যোদ্ধা, সংগ্রামী, রাজনীতিক নারী পরিচয়ও তার জীবনে প্রবলভাবে সত্য। অর্জুনও চিত্রাঙ্গদার মনের অস্থিরতায় বুঝতে পারে কোথায় যেন ফাঁক রয়ে গেছে। চিত্রাঙ্গদাকে সম্পূর্ণ পেয়েও যেন পাওয়া হলো না, দেহের সুধা মিলে, আত্মা মিলে না। অনাবিষ্কৃত পরিচয়ের রহস্য মনে সম্পূর্ণ তৃপ্তি আনে না। ‘অঙ্গহীন ছন্দোহীন প্রেম, প্রতিক্ষণে পরিতাপ জাগায় অন্তরে।’ এদিকে অর্জুন শুনেছে এই রাজ্যের রাজকন্যার কথা, যে ‘স্নেহে নারী, বীর্যে সে পুরুষ।’ সেই নারী এই বনের রক্ষক। রাজ্যের এক প্রজা বলেছে, সেই রাজকন্যা ‘এক দেহে তিনি পিতা মাতা অনুরক্ত প্রজাদের / স্নেহে তিনি রাজমাতা বীর্যে যুবরাজ।’ এই রাজ্যের তিনি রক্ষক রমণী, ‘তাঁর ভয়ে রাজ্যে নাহি ছিল কোনো ভয়, যমভয় ছাড়া।’ অর্জুন এই বীর্যবান নারীর খবর যত শোনে তত উদাসীন, কৌতূহলী হয়। নিজ পরিচয় গোপন করে আশ্রমকন্যা হিসেবেই পরিচয় দিয়েছিল অর্জুনের কাছে চিত্রাঙ্গদা। এখন এই রাজ্য আসন্ন শত্রু আক্রমণের মুখে, প্রজাগণ আতঙ্কিত, সকলে জানে তাদের রক্ষক রাজকন্যা গেছে তীর্থভ্রমণে। ক্ষত্রীয় বীর অর্জুন প্রেয়সী আশ্রমকন্যা চিত্রাঙ্গদার কাছ থেকে ছুটি নিয়ে ছুটে যেতে চায় শত্রু মোকাবেলা করে রাজ্য রক্ষা করতে। চিত্রাঙ্গদা তখন তাকে নিশ্চিন্ত করে, ভয়ের কিছু নেই, বুদ্ধিমান চিত্রাঙ্গদা ‘তীর্থযাত্রাকালে রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদা স্থাপন করিয়া গেছে সতর্ক প্রহরী দিকে দিকে; বিপদের যত পথ ছিল বন্ধ ক’রে দিয়ে গেছে বহু তর্ক করি।’
চিত্রাঙ্গদা কাব্যনাটক লিখবার মাত্র চার বছর আগে রবীন্দ্রনাথ বিদুষী রমাবাইয়ের বক্তৃতা শুনতে গিয়েছিলেন। রমাবাইয়ের বক্তৃতার একটা কথা ‘মেয়েরা সকল বিষয়ে পুরুষদের সমকক্ষ কেবল মদ্যপানে নয়’ শুনে রবীন্দ্রনাথ বেশ বিরক্ত ও বিতর্কমুখর হয়ে ওঠেন। বক্তৃতা থেকে ফিরে এক পত্র প্রবন্ধে (রমাবাইয়ের বক্তৃতা উপলক্ষে পত্র) তাঁর চিন্তাভাবনা লেখেন। অবশ্য রমাবাই তাঁর বক্তৃতা শেষ করতে পারেননি। পুরুষ শ্রোতাদের আক্রমণে তাঁকে বক্তৃতা রেখে বসে পড়তে হয়। মেয়েরা সকল বিষয়ে পুরুষদের সমকক্ষ বলেছেন রমাবাই, শ্রেষ্ঠও বলেননি। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘মেয়েরা সকল বিষয়েই যদি পুরুষের সমকক্ষ, তাহলে পুরুষের প্রতি বিধাতার নিতান্ত অন্যায় অবিচার বলতে হয়।’ তাঁর মতে ‘রূপ এবং অনেকগুলি হৃদয়ের ভাবে’ মেয়েরা পুরুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু প্রতিভা! সাহিত্য সঙ্গীত সাধনার মতো সৃজনশীল কাজে, প্রতিভায় ও এনার্জিতে পুরুষ শ্রেষ্ঠ ব’লে তিনে মনে করেন। লিখেছেন, ‘আমার তো বোধ হয় না, কবি হতে ভূরিপরিমাণ শিক্ষার আবশ্যক। মেয়েরা এতদিন যেরকম শিক্ষা পেয়েছে তাই যথেষ্ট ছিল। অনেক বড় কবি অপেক্ষাকৃত অশিক্ষিত নিম্নশ্রেণির থেকে উদ্ভূত। স্ত্রী জাতির মধ্যে প্রথম শ্রেণির কবির আবির্ভাব এখনো হয়নি।... বহুদিন থেকে যত বেশি মেয়ে সংগীতবিদ্যা শিখছে এত পুরুষ শেখেনি।... কিন্তু তাদের মধ্যে কটা Mozart কিংবা Beethoven জন্মালো।’ লিখেছেন ‘প্রকৃতি বলে দিচ্ছে যে, বাহিরের কাজ মেয়েরা করতে পারবে না। যদি প্রকৃতির সে-রকম অভিপ্রায় না হতো তাহলে মেয়েরা বলিষ্ঠ হয়ে জন্মাতো।’ চিত্রাঙ্গদা লেখার মাত্র চার বছর আগেই এই গদ্য লিখেও রবীন্দ্রনাথ পুরাণজাত এমন বীর্যবান নায়িকাকে শৌর্যে বীর্যে বুদ্ধি ও সংবেদনশীলতায় অনন্য করে তুলতে পারলেন। চিত্রাঙ্গদা তাঁর ব্যতিক্রমী সৃষ্টি বৈকি।
রবির বন্ধু প্রিয়নাথ সেন চিত্রাঙ্গদা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে লিখেছেন:
“চিত্রাঙ্গদা সর্ব্বতোভাবে রবিবাবুর নূতন সৃষ্টি। মহাভারতে চিত্রাঙ্গদার কোন সুস্পষ্ট মূর্ত্তি নাই। কোথাও কোন বিষয়ে তাহার কর্ত্তৃত্ব বা বিশেষত্ব দেখি না, এবং পরবর্ত্তী ঘটনাবলীর মধ্যেও যখন পুনর্ব্বার তাহার সাক্ষাৎ পাই, তখনও তাহার এইরূপ নির্ব্বিশেষত্ব। মহাভারতকার যেন একতাল মাটীর উপর “চিত্রাঙ্গদা” এই কয়টি কথা লিখিয়া গিয়াছেন। রবিবাবু সেই মাটী লইয়া একটি জীবন্ত অপূর্ব্ব-রমণী মূর্ত্তি সৃষ্টি করিয়াছেন।” (সাহিত্য, সম্পাদক সুরেশচন্দ্র সমাজপতি, কার্তিক ১৩১৬, পৃ. ৩৭৯)
মদন বসন্ত দেবের দেয় বরের সমাপন কাল আসন্ন; চিত্রাঙ্গদার কাছেও এই প্রেম ও প্রিয়া রূপের ছলনা, মিথ্যা আচরণ অসহনীয় হয়ে ওঠে। অন্তরে দগ্ধ হয়। এই দগ্ধ অনুতপ্ত রূপ, এই সত্য হয়ে ওঠার তীব্র তাগিদ চিত্রাঙ্গদাকে রবীন্দ্রনাথের অন্য সব নায়িকাদের থেকে উজ্জ্বল স্বতন্ত্র ক’রে তোলে। একসময় চিত্রাঙ্গদা সেই অমর উজ্জ্বল উপলব্ধির অমোঘ বাণী উচ্চারণ করে অর্জুনের কাছে নিজের সত্য পরিচয় জানিয়ে দেয়—
‘আমি চিত্রাঙ্গদা।
দেবী নহি, নহি আমি সামান্য রমণী পূজা করি রাখিবে
মাথায়, সেও আমি নই; অবহেলা করি পুষিয়া রাখিবে
পিছে, সেও আমি নহি। যদি পার্শ্বে রাখ মোরে সংকটের
পথে, দুরূহ চিন্তার যদি অংশ দাও যদি অনুমতি করো
কঠিন ব্রতের তব সহায় হইতে, যদি সুখে দুঃখে মোরে
করো সহচারী, আমার পাইবে তবে পরিচয়।’
এই পরিচয় প্রকৃতির সেই সৃষ্টি যার মধ্যে শুধু রমণী-প্রিয়া-জননী রূপ স্থায়ী প্রতিষ্ঠিত নয়। এই নারী সংকটের পথে, দুরূহ চিন্তার পথে ‘সমকক্ষ’ অংশীদার। প্রিয়া-জননী বা পূজার সামান্য নারী বানিয়ে বিশ্ব জগতে সংগ্রাম ও আন্দোলন থেকে দূরে গৃহপালিত উপকারী জন্তুর মতো পুষে রাখা যাবে না।
মহাভারতের (আদিঃ ২০৮ : ১৬) চিত্রাঙ্গদার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নায়িকা চিত্রাঙ্গদার পার্থক্য শুধু কাহিনীতেই নয়, বোধ ও চৈতন্যেও প্রবল। মহাভারতের এই ব্যতিক্রমী গল্পটিতে রবীন্দ্রনাথ আগ্রহ বোধ করেন হয়তো চিত্রাঙ্গদার পরিচয়ের বিশিষ্টতায়। কন্যা হয়েও সে চিত্রবাহনের পুত্র, এবং ‘পুত্রিকা-পুত্র’ করবার বিধান অনুসারে যজ্ঞানুষ্ঠান করে এই কন্যাকে ‘পুত্র’ সংজ্ঞায় নিশ্চিত করেছেন। ফলে, এর গর্ভের সন্তানও চিত্রবাহনের বংশধর হবে। এবং অর্জুন-চিত্রাঙ্গদার সন্তান বভ্রুবাহন চিত্রবাহনের বংশধর হিসেবে পরিগণিত হন। রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদার কুৎসিত, কুরূপ কারণ সে বালকের মতো, সেই প্রেয়সী-প্রিয়ার মতো নয়, নারীর সেই বঙ্কিম ভুরুও নয়। বরং কঠিন সবল বাহু বিঁধিতে শিখেছে / লক্ষ্য, বাঁধিতে পারে না বীরতনু হেন / সুকোমল নাগপাশে।
কৌতূহলী অর্জুন ছদ্মবেশী চিত্রাঙ্গদার মুখে চিত্রাঙ্গদার এই নিন্দা শুনেও বলে, ‘কিন্তু শুনিয়াছি,/ স্নেহে নারী, বীর্যে সে পুরুষ। তখন রবীন্দ্রকাহিনীর চিত্রাঙ্গদা, রবীন্দ্রনাথের নারী ধারণার বশবর্তী হয়ে, নারীর শক্তিমত্তার খবরে ধিক্কার প্রকাশ করে—
‘ছি ছি, সেই
তার মন্দভাগ্য। নারী যদি নারী হয়
শুধু, শুধু ধরণীর শোভা, শুধু আলো,
শুধু ভালোবাসা— শুধু সুমধুর ছলে
শতরূপ ভঙ্গিমায় পলকে পলকে
লুটায়ে জড়ায়ে, বেঁকে বেঁধে, হেসে কেঁদে,
সেবায় সোহাগে ছেয়ে ছেয়ে চেয়ে থাকে সদা—
তবে তার সার্থক জনম।’
নারী জনমের এই সার্থকতার ধারণা রবীন্দ্রনাথ চিত্রাঙ্গদা নাটকে বদলে দেন। রবীন্দ্রসাহিত্যে অন্যতম ব্যতিক্রম হয়ে ছদ্মবেশী চিত্রাঙ্গদা, মদন আর বসন্তের গড়া রমণীয়তা আর সৌন্দর্য্যরে খোলস থেকে বেরিয়ে ঘোষণা করে, আমিই সেই চিত্রাঙ্গদা যে বীর্যে সে পুরুষ, দেবী নয়, সামান্য রমণীও নয়, দুরূহ চিন্তার এবং সুখে দুঃখে পুরুষের সহচরী হওয়ার অভিলাষী।
মহাভারতে ব্যাসদেবের সৃষ্টি চিত্রাঙ্গদা রূপসী এবং রমণীয়, পৌরুষ শিক্ষা তেজে সে পৌরুষদীপ্ত নয়। কারণ রাজা চিত্রবাহনের সেই প্রয়োজন ছিল না। বংশ রক্ষার ধারাবাহিকতার স্বার্থে যজ্ঞ করে কন্যাকে পুত্র বিবেচনা করার বিধান করে নিয়েছেন। অর্জুন— চিত্রাঙ্গদার প্রথম দর্শনের ঘটনাও কাব্যনাটকে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি, চিত্রাঙ্গদা চরিত্রের মহিমা এবং মাত্রা সৃষ্টির প্রয়োজনে, কাব্যরসের প্রয়োজনেও সৃষ্টি করেন। ব্যাসদেবের চিত্রাঙ্গদাকে অর্জুন দেখেন মণিপুরের ধার্মিক রাজা চিত্রবাহনের রাজবাড়িতে— ‘যদৃচ্ছ বিচরণ করছিলেন’। ব্যাসদেবের কাহিনীতে যেমন রাজার কাছে চিত্রাঙ্গদাকে প্রার্থনা করেছিলেন, তেমনি, রাজার দেয়া শর্তানুযায়ী অর্জুনই বভ্রুবাহনকে দিয়ে যান। এবং চিত্রাঙ্গদাকে বভ্রুবাহনকে গড়ে তোলার দায়িত্ব দিয়ে গোকর্ণতীর্থের পথে গমন করলেন।
একাধারে পুরুষ ও নারী রাজেন্দ্রনন্দিনী চিত্রাঙ্গদার এই সত্য উপলব্ধি ও প্রকৃত পরিচয়ের উন্মোচন মহাভারতের মতো না হলেও রবীন্দ্রনাথ তাকে সৃষ্টি করে কাব্য সৌন্দর্যে মহাকালে স্থায়ী করে দিয়েছেন। রাজা চিত্রবাহনের কন্যা চিত্রাঙ্গদা মহাভারতের মূল কাহিনী স্রোতের উপর্যুপরি ঢেউয়ে প্রায়বিস্মৃত, রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদা আধুনিক সময়ের চেতনা প্রবাহের আদর্শ প্রতীক। তো এই চিরকালের চিত্রাঙ্গদার বা কালজয়ী চিত্রাঙ্গদার জন্যেই হবে, ত্রিকালজ্ঞ সঞ্জয় গভীর আবেগ অনুভব করেন। রবি চিত্রাঙ্গদাকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন কাব্যে, সঞ্জয়ও চান কাব্যেই সঞ্জয় নিয়ন্ত্রণ করবে ভবিষ্যৎকে, যে ভবিতব্য তিনি দেখতে পারেন।’ (বাকি অংশ আগামী সংখ্যায় পড়ুন)

বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ আগস্ট ২০২৬
চিত্রাঙ্গদা
সঞ্জয় মাথার ওপর হাত ঘুরিয়ে ঋষিদের মতো লম্বা দাড়িতে হাত বুলিয়ে বলেন, তো এমন ঠিক নয় যে রবি তেমন প্রাচীন কবিদের একজন যার হাতে মহাকাব্য বর্ধিত পরিবর্তিত হবে বা হয়েছে! ঘটনা নিজের মতো প্রকাশ করার স্বাধীনতা নিয়েছেন রবি, ফলে বিশ্বাস ও সংস্কারমুক্ত রবি প্রাচীন কবিদের দাসত্ব না ক’রে নিজের মতো রূপ তৈরি ক’রে নিয়েছেন, ঘটনাকে নিয়ন্ত্রণ করছেন। যেভাবে ঘটেছে পুরাণে, যে সুর ছন্দে আন্দোলিত আদি কবিদের কাব্য, রবীন্দ্রনাথ সেই সুর ছন্দে নিজের স্বর ও স্বাক্ষর যুক্ত করেছেন, নিজের মতো ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করেছেন স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশে, সেই প্রকাশে কাব্য-আত্মা দলিত নয় বরং ব্যঞ্জনাময় এবং কালের উপযোগী ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে। সবই তো কাব্য ও স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষার ইতিহাস, যা সময়ের ঘটনা থেকে নয়, কবির হৃদয়ে জন্ম নেয় স্বাধীনভাবে; যুক্তি সংগতি সম্ভব অসম্ভবের বিচার হবে কাব্যসত্যের আদালতে, সমালোচকের কাঠগড়ায় নয়। যেমন দেখ রবির লেখা ‘চিত্রাঙ্গদা’ কাব্য নাটকটি মহাভারতের চিত্রাঙ্গদা থেকে অনেকটাই অন্য রকম। রূপ-যৌবন ও নারী সত্তার প্রতি পুরুষের উপেক্ষা চিত্রাঙ্গদাকে পীড়িত করে, সব নারীকেই করবে হয়তো। বসন্ত ও মদন দেবের সহযোগিতায় ওই উপেক্ষার বদলে প্রেম ও সম্মান আদায় করে ছাড়ে অর্জুনের। কিন্তু পুরুষের কাছে এই নারী সম্পূর্ণ নিবেদন করেও আত্মাভিমান ও আত্ম-স্বাতন্ত্র্যের বোধে তৃপ্ত হতে পারে না একান্ত নিজের কাছে। বসন্ত ও মদনের কাছ থেকে ধার নেয়া রূপ ও মদির যৌবন চিত্রাঙ্গদার নিজের দেহে বহন করলেও একান্ত অন্তর্গতভাবে আত্মার সঙ্গে দেহ সৌন্দর্যের সতীন সম্পর্ক অনুভব করে। আত্মসম্মানবোধ সংবেদী চিত্রাঙ্গদা গভীরে দীর্ণ হয়, নরলোকের অশান্তি দেহসুখ ছাপিয়ে জেগে ওঠে অন্তরে। ধার করা বাহ্যিক রূপের মোহ দিয়ে ভোলানোয় অস্বস্তি রবির সৃষ্টি করা চিত্রাঙ্গদার, আদি কবির নয়। চিত্রাঙ্গদার কণ্ঠে তার সেই অন্তরগূঢ় বোধের কথা শোনো,
আজ প্রাতে উঠে, নৈরাশ্যধিক্কার বেগে
অন্তরে অন্তরে টুটিছে হৃদয়। মনে
পড়িতেছে একে একে রজনীর কথা।
বিদ্যুৎবেদনাসহ হতেছে চেতনা।
অন্তরে বাহিরে মোর হয়েছে সতীন
আর তাহা নারিব ভুলিতে। সপত্নীরে
স্বহস্তে সাজায়ে সযতনে, প্রতিদিন
পাঠাইতে হবে, আমার আকাঙ্ক্ষাতীর্থ
বাসরশয্যায়; অবিশ্রাম সঙ্গে রহি
প্রতিক্ষণ দেখিতে হইবে চক্ষু মেলি
তাহার আদর। ওগো, দেহের সোহাগে
অন্তর জ্বলিবে হিংসানলে, হেন শাপ
নরলোকে কে পেয়েছে আর।
তোমাকে একটা কথা বলে রাখি, রবির বিশাল কর্মরাজির মধ্যে আরও বহু বহু নারী চরিত্র সৃষ্টি হয়েছে, রবির বিশেষ করে মেয়েদের নিয়ে নিজের ভাবনাও লিখবেন কিন্তু কালে তা গৃহীত নাও হতে পারে, ওর নারী চিন্তার পুরাতনী ভাব লোকে সমালোচনা করবে যদিও এর সত্য ও বাস্তব রূপ উপেক্ষা করা যাবে না। অভিভূত জ্যোতি ঠাকুরের দিকে চেয়ে সঞ্জয় বলেন, চিত্রাঙ্গদা অসাধারণ কাব্য, গীতিধর্মী কাব্য নাটক। জ্যোতি বলেন, অদৃষ্ট দ্রষ্টা, রবি তার জীবনকালে যা যা রচনা করবেন তার সব পাঠ শেষ করেছেন! শোনো জ্যোতি, দিব্যদৃষ্টিসম্পন্নের জন্য এ কোনো বিস্ময়কর কাজ নয়। তবে আমি তোমাকে শুধু বলছি পুরাণের আখ্যান ব্যবহার ক’রে নিজের স্বাধীন কাব্যবোধ থেকে কী সব রসসৃষ্টি করেছন বা করবেন তার কিছু নমুনা। আদি কবিদের চিন্তা ও কাহিনীকে রবি কাব্য নির্মাণের প্রতিভায় নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা দেখেই মূলত আমি ঠিক ক’রে নিয়েছি রবিই সেই কবি এই সঞ্জয়ের জীবনকে যে ব্যাসদেবের বর থেকে আরও বড়ো বরে নায়ক ক’রে তুলতে পারবেন। তুমি দেখো এই চিত্রাঙ্গদা নাট্য ভাবনাটি তাঁর মনে কীভাবে তৈরি হলো! প্রথমে সে জীবনের সত্য, বাস্তবতার গভীর একটি বোধ দ্বারা আলোড়িত হলো, তারপর সেই আলোড়নকে কাব্যে প্রকাশ করার ভাবনায় চিত্রাঙ্গদা উপাখ্যানটি তার মাথায় আসে। মহাভারতের চিত্রাঙ্গদা উপাখ্যানটি তেমন বড়ো কিছু নয়। সংস্কৃত তেরটি শ্লোকে যে আখ্যান বর্ণিত হয়েছে তাতে আত্মসচেতন, বোধোজ্জ্বল কোনো রমণীর গল্প সেখানে নেই। মহাভারতের আদি পর্বের অর্জুন বনবাস পর্বাধ্যায়-এ চিত্রাঙ্গদার খবর আমরা জানি। যাই হোক, এখন রবির কাছ থেকেই শোনো ‘চিত্রাঙ্গদা’ সূচনার কথা—
“অনেক বছর আগে রেলগাড়িতে যাচ্ছিলাম শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতার দিকে। তখন বোধ করি চৈত্র মাস হবে। রেললাইনের ধারে ধারে আগাছার জঙ্গল। হলদে বেগনি সাদা রঙের ফুল ফুটেছে অজস্র। দেখতে দেখতে এই ভাবনা এল মনে যে আর কিছুকাল পরেই রৌদ্র হবে প্রখর, ফুলগুলি তাদের রঙের মরীচিকা নিয়ে যাবে মিলিয়ে— তখন পল্লীপ্রাঙ্গণে আম ধরবে গাছের ডালে ডালে, তরুপ্রকৃতি তার অন্তরের নিগূঢ় রস-সঞ্চয়ের স্থায়ী পরিচয় দেবে আপন অপ্রগলভ ফল সম্ভারে। সেই সঙ্গে কেন জানি হঠাৎ আমার মনে হলো সুন্দরী যুবতী যদি অনুভব করে যে সে তার যৌবনের মায়া দিয়ে প্রেমিকের হৃদয় ভুলিয়েছে তাহলে সে তার সুরূপকেই আপন সৌভাগ্যের মুখ্য অংশে ভাগ বসাবার অভিযোগে সতিন ব’লে ধিক্কার দিতে পারে। এ যে তার বাইরের জিনিস, এ যেন ঋতুরাজ বসন্তের কাছ থেকে পাওয়া বর, ক্ষণিক মোহ বিস্তারের দ্বারা জৈব উদ্দেশ্য সিদ্ধ করবার জন্যে। যদি তার অন্তরের মধ্যে যথার্থ চরিত্রশক্তি থাকে তবে সেই মোহযুক্ত শক্তির দানই তার প্রেমের পক্ষে মহৎলাভ, যুগল জীবনের জয়যাত্রার সহায়। সেই দানে আত্মার স্থায়ী পরিচয়, এর পরিণামে ক্লান্তি নেই, অবসাদ নেই, অভ্যাসের ধূলিপ্রলেপে উজ্জ্বলতার মালিন্য নেই। এই চারিত্রশক্তি জীবনের... সম্বল, নির্মল প্রকৃতির আশু প্রয়োজনের প্রতি তার নির্ভর নয়। অর্থাৎ এর মূল্য মানবিক, এ নয় প্রাকৃতিক।”
“এ ভাবটাকে নাট্য আকারে প্রকাশ-ইচ্ছা তখনই মনে এল, সেই সঙ্গে মনে পড়ল মহাভারতের চিত্রাঙ্গদার কাহিনী। এই কাহিনীটি কিছু রূপান্তর নিয়ে অনেকদিন আমার মনের মধ্যে প্রচ্ছন্ন ছিল। অবশেষে লেখবার আনন্দিত অবকাশ পাওয়া গেল উড়িষ্যায় পাণ্ডুরা বলে এক নিভৃত পল্লীতে গিয়ে” (রবীন্দ্র-রচনাবলী, ২য় খণ্ড, “চিত্রাঙ্গদার সূচনা”)।
জীবন-সায়াহ্নে রবি ‘চিত্রাঙ্গদার সূচনা’র এই খবর জানিয়ে গেছেন। কাব্য, নাট্য ও সঙ্গীতগুণ রচনাটি মুগ্ধ করে। জ্যোতি এই সূচনার কথা জানত না, কথাও নয়। পরবর্তী প্রজন্মের একটি পাঠে সব প্রসঙ্গই উঠে এসেছে, চিত্রাঙ্গদা আলোচনা প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের মেয়েদের নিয়ে ভাবনাচিন্তার খোঁজখবর, ও রবীন্দ্রনাথের চারপাশের পরিবেশের কিছু খবর এতে রয়েছে।
নারীদের পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রিক, আধ্যাত্মিক এবং দৈহিক বিষয়ে ভূমিকা ও দায়িত্ব-কর্তব্যের ভাবনায় রবীন্দ্রনাথ একজন অতিপ্রজ লেখক। গল্প-উপন্যাস-কবিতায় নারী ও নারীভাবনা নির্মিত হয়েছে দুই একটি ব্যতিক্রম বাদে তাঁর সুচিন্তিত প্রবন্ধের দৃষ্টিভঙ্গি এবং মত অনুসারেই। সচেতন চিন্তার বিপরীতে বা উদাসীন থেকে কেবল শিল্পের স্বার্থে, গল্পের খাতিরে ভিন্ন নারীসত্তা ও সামাজিকতা সৃষ্টি করতে রবীন্দ্রনাথকে দেখা প্রায় যায় না। বিশেষ ব্যতিক্রম হলো ভাদ্র ১২৯৮ বাংলা সালে লেখা ভাদ্র ১২৯৯ সালে গ্রন্থাকারে প্রকাশিত ‘চিত্রাঙ্গদা’ কাব্য নাটক। মহাভারতের ছোট একটি উপাখ্যানকে অনুষঙ্গ ক’রে চিত্রাঙ্গদা কাব্য নাটক নির্মিত হয়। নারী সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মনে যে বিশেষ কিছু ধারণা ধ্রুব হয়ে আছে তা শিল্প নৈপুণ্যে ভরা অতুলনীয় কাব্যনাটক ‘চিত্রাঙ্গদা’-য় তার কিছু ক্ষেত্রে ভিন্ন রকম ঘটে। মণিপুর রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদার জন্মই তো একটা চ্যালেঞ্জ। দেব উমাপতি মহাদেব তুষ্ট হয়ে বর দিয়েছিল এই বংশে শুধু পুত্রই জন্মাবে।
তপস্যায় তুষ্ট মহাবর নিষ্ফল করে চিত্রাঙ্গদার জন্ম হয়। চিত্রাঙ্গদা বলে,
‘আমি সেই মহাবর
ব্যর্থ করিয়াছি। অমোঘ দেবতাবাক্য
মাতৃগর্ভ পশি দুর্বল প্রারম্ভ মোর
পারিল না পুরুষ করিতে শিব তেজে,
এমনি কঠিন নারী আমি।’
কন্যাকেই রাজা পুত্রবৎ লালন পালন করে শেখায় ধনুর্বিদ্যা, রাজদণ্ডনীতি; ধনুর্বিদ্যায় সে বীর, রাজ্যের শত্রু ও অমঙ্গলের কাছে ত্রাস, দুর্বলের সহায়। রাজদণ্ডনীতি শিক্ষা এবং চর্চা করে, চিত্রাঙ্গদার মণিপুর রাজ্যে অমঙ্গল ঘটে না। বিমলা রাজনীতিতে আগ্রহী হওয়ায় এবং পরিণতিতে ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসে নিখিলেশের সংসারের মতো ওই রাজ্য শ্মশানও হয়ে ওঠে না তখন।
রবীন্দ্রনাথ দ্বিধাহীন প্রত্যয় ও বিশ্বাসের সঙ্গে সুচিন্তিত গদ্যে লিখেছেন, গল্প কবিতায় নয়, ‘...মেয়ে সংসারস্থিতির লক্ষ্মী আবার সংসার ছারখার করবার প্রলয়ংকারী তার মতো কেউ নেই’ (পশ্চিমযাত্রীর ডায়ারি)। নিখিলবঙ্গ-মহিলা কর্মী সম্মেলনে (১৯৩৪) লিখিত ‘নারী’ (কালান্তর) প্রবন্ধে তিনি বলেন, ‘...নারীর মধ্যে প্রেয়সী, নারীর মধ্যে জননী প্রকৃতির দৌত্যে স্থির প্রতিষ্ঠিত হয়ে আপন কাজ ক’রে চলেছে।’ প্রেয়সী কল্যাণী জননী হিসেবে সংসারে নারীর ভূমিকা ‘জীবপ্রকৃতি চূড়ান্তভাবে স্থিত ও প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছে।’ চিত্রাঙ্গদাও প্রেয়সী কিন্তু একটি মাত্র ভূমিকাতেই সে সীমাবদ্ধ নয়। ধনুর্বিদ্যা আর রাজদণ্ডনীতি শেখা সফল মানুষ। রবীন্দ্রনাথ কথিত পুরুষের সংগ্রাম, জয়ের নেশা, লড়াই বীর্যবান আচরণ চিত্রাঙ্গদার জীবনেও সত্য হয়ে উঠেছে। নারী পুরাতনী ধারণার রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতির দোহাই দিয়ে বলেন, ‘প্রকৃতি তাকে যে হৃদয় সম্পদ দিয়েছেন নিত্য কৌতূহলপ্রবণ বুদ্ধির হাতে তাকে নূতন নূতন অধ্যবসায়ে পরখ করতে দেওয়া হয়নি। নারী পুরাতনী’ (নারী, কালান্তর)। চিত্রাঙ্গদা পুরাতন নয়, নতুন ও আধুনিক। শুধু হৃদয়বৃত্তি নয়, চিত্তবৃত্তিতেও সে সত্য। দ্রৌপদীর সঙ্গে বিয়ের শর্ত ভাঙ্গার অপরাধে বারো বছরের বনবাসে আছে অর্জুন। পূর্ণা নদীতীরে, দুর্গম কুটিল বন পথে একাকী মৃগ অন্বেষণে চিত্রাঙ্গদা। সংসারে যে দুই জাতের নারী আছে ‘এক জাত প্রধানত মা, আর এক জাত প্রিয়া’ রবীন্দ্রনাথের মত মোতাবেক ঘোষণা করে গল্পের নারী শর্মিলা (দুই বোন)। ব্যতিক্রমী চিত্রাঙ্গদা ভিন্ন জাতের, সে অনন্য। জাত অন্য হলেও হৃদয়বৃত্তি ও চিত্তবৃত্তির সমন্বয়ে সংবেদনশীল, আত্মসম্মানে উজ্জ্বল মানুষ এবং নারী।
পরবর্তী প্রজন্মের একজন লেখক ক্ষুদিরাম দাস তাঁর রবীন্দ্র প্রতিভার পরিচয় (পরিবর্ধিত সংস্করণ ১৩৮৪) গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। সমালোচক ক্ষুদিরাম দাস মহাকাব্যিক আখ্যানগুলোর কাহিনী ও চরিত্রের নবরূপায়ণ প্রসঙ্গে জানিয়েছেন,
“চিত্রাঙ্গদায় নারীত্ব সম্বন্ধে, বিদায় অভিশাপে প্রণয়মহিমা সম্বন্ধে, এবং গান্ধারীর আবেদন ও নরকবাসে মানবধর্ম সম্বন্ধে কবির একটি বিশেষ ভাবুকতাই এদের কবিহৃদয়ে স্বীকরণকে নিরূপিত করেছে। চিত্রাঙ্গদায় কাব্যের অতিরিক্ত কবির যে সূক্ষ্ম আদর্শবোধ প্রকাশিত হয়েছে তা বোধ হয় এই যে, পুরুষের যৌন আকর্ষণে নারীর রূপ অনেকাংশে কাজ করলেও নারীকে ভোগের বস্তুরূপে দেখলে অকৃতার্থ হয় পুরুষ নিজেই। বিদায়-অভিশাপ খণ্ডকাব্যে করুণরসের মধ্য দিয়ে প্রতিপন্ন করা হয়েছে কর্তব্য থেকে প্রেমের মর্যাদা গুরুতর। কর্ণ-কুন্তী-সংবাদে মাতৃধর্মের নৃশংস অবহেলা দেখানো হয়েছে, গান্ধারীর আবেদনে রাজনীতি ও রাজধর্মের নৃশংস কর্তব্যকে পাপ ও অধর্ম বলে ঘোষণা করা হয়েছে, আর নরকবাসে শাস্ত্র ও প্রথার আনুগত্যের নিষ্ঠুর দিক উদ্ঘাটিত করা হয়েছে।” (পৃ. ১১৫)
চিত্রাঙ্গদার মূল্যায়ন করতে গিয়ে ক্ষুদিরাম দাস জানিয়েছেন:
“মহাভারতের চিত্রাঙ্গদা আখ্যানকে রবীন্দ্রনাথ মাত্র স্পর্শ করেছেন। এর পট, কাহিনী, চরিত্র, পরিণাম সবই তাঁর উদ্ভাবিত। চিত্রাঙ্গদার সঙ্গে অর্জুনের অরণ্যে সাক্ষাৎকার, এই সাক্ষাৎকারে চিত্রাঙ্গদার পূর্বরাগ, মদন ও বসন্তের কাছে চিত্রাঙ্গদার রূপযৌবন প্রাপ্তির জন্য আবেদন, অর্জুনের মোহ এবং মোহভঙ্গ প্রভৃতি ঘটনা মূলে নেই। মূলে রয়েছে মণিপুররাজ চিত্রবাহন তাঁর এই কন্যাটিকে পুত্রভাবে দেখতেন, কারণ তাঁর পুত্র ছিল না। সুতরাং চিত্রাঙ্গদা কতকটা স্বচ্ছন্দ বিচরণের অনুমতি পেয়েছিলেন। এরই উপর রবীন্দ্রনাথ তাঁর কল্পনাকে বিস্তৃত করে দিয়েছেন।... মূলে চিত্রাঙ্গদা কুরূপা ছিলেন না, বরং অতিসুন্দরী ছিলেন। চিত্রাঙ্গদাকে বিবাহ করে অর্জুন তিন বৎসর মণিপুর রাজ্যে অবস্থিতির পর পুনরায় তীর্থদর্শনে গেলেন এবং ফিরে এসে পুত্র বভ্রুবাহনকে দেখলেন। তিনি চিত্রাঙ্গদাকে বললেন, পুত্রকে পালন কোরো, রাজসূয় যজ্ঞের সময় পিতার সঙ্গে ইন্দ্রপ্রস্থে যেয়ো।” (পৃ. ১১৬)
‘লতাগুল্মে গহন গম্ভীর মহারণ্যে’ পথ রুদ্ধ ক’রে চীরধারী এক পুরুষ শুয়ে আছে। বীর্যবান চিত্রাঙ্গদা সেই পুরুষকে উঠতে বলে, চীরধারী পুরুষটি ওঠে না। তখন ‘উদ্ধত অধীর রোষে ধনু-অগ্রভাগে’ তাকে তাড়া করে। পুরুষটি সরল সুদীর্ঘ দেহ নিয়ে মুহূর্তেই তীরবেগে উঠে দাঁড়ায়, চোখে রোষদৃষ্টি। কোনো শক্ত প্রতিপক্ষ নয় দেখে চিত্রাঙ্গদাকে বালক শিকারী ভেবে পুরুষটির ‘নাচিল অধরপ্রান্তে স্নিগ্ধ গুপ্ত কৌতুক মৃদু হাস্যরেখা।’ বালক রূপের বিভ্রমে ঢাকা পড়ে গেছে তার নারীসত্তা, চিত্রাঙ্গদা অপমানিত বোধ করে, আহত হয়, বুঝতে পারে ‘সেই মুহূর্তেই জানিলাম মনে, নারী আমি। সেই মুহূর্তেই প্রথম দেখিনু সম্মুখে পুরুষ মোর। দেবতা মদন (অবশ্যই পুরুষ) সঙ্গে সঙ্গে চিত্রাঙ্গদার এই উপলব্ধির কৃতিত্ব নিজে অধিকার করে বলে, ‘সে শিক্ষা আমারি... আমিই চেতন করে দিই নারীরে হইতে নারী, পুরুষে পুরুষ।’ চিত্রাঙ্গদা জানতে পারে এই সেই মহাবীর অপরাজেয় অর্জুন, ব্রহ্মচর্যরত পার্থ, বীর। ধনুর্বিদ্যায় মহাপারদর্শী চিত্রাঙ্গদার কাছে পার্থ অর্জুন কতকাল থেকেই হয়ে আছে বিস্ময়, আকাঙ্ক্ষিত। নারী সত্তার জাগরণ অথবা মদন দেবের ভূমিকায় শৌর্যবীর্য ধুলায় মিলায়ে অর্জুনের পদতলে সমর্পণ করার বাসনা চিত্রাঙ্গদার দেহে ও মনে সঞ্চারিত হয়। অতঃপর ঋতুরাজ বসন্ত আর পঞ্চশর মদন দেব অন্তত বছরকালের জন্য চিত্রাঙ্গদার দেহমনে অনন্য রূপ ও কামনার বহ্নি দিয়ে সাজিয়ে তোলে। রূপের বহ্নি ও যৌবনের উষ্ণ সৌন্দর্য নিয়ে অর্জুনের কুটিরে এসে তাকে মুগ্ধ, প্রেমাকাঙ্ক্ষী করে তুলতে সক্ষম হয় আশ্রমকন্যারূপী চিত্রাঙ্গদা।
রাজনীতি শেখা চিত্রাঙ্গদা পাণিপ্রার্থী অর্জুনকে শর্ত দেয়, তাদের মিলনজাত সন্তান হবে মণিপুরের রাজার বংশধর। মহাভারতে এই শর্তের কথা অবশ্য চিত্রাঙ্গদার নয়, তার পিতা রাজা চিত্রবাহনই অর্জুনকে জানান। মহাভারতের আখ্যানে অন্য রকম ঘটেছে। হুবহু সেই গল্প অনুসরণের কথা রবীন্দ্রনাথও উল্লেখ করেন নাই। বর্ষব্যাপী মিলনের শেষে বিদায়কালে নাটকের চিত্রাঙ্গদা নিজেই বলে, তার গর্ভের সন্তানকে অর্জুনের মতো বীর শিক্ষায় বীর করে একদিন বাবার কাছে পাঠাবো। ‘আশৈশব বীরশিক্ষা দিয়ে দ্বিতীয় অর্জুন করি তারে একদিন পাঠাইয়া দিব যবে পিতার চরণে— তখন জানিবে মোরে প্রিয়তম।’ কিন্তু প্রেম-যৌবন-মিলনেই তো চিত্রাঙ্গদার ব্যক্তিত্বের পরিচয় সম্পূর্ণ নয়। মদন ও বসন্তের দেয়া রূপেও চিত্রাঙ্গদা চিত্রাঙ্গদা নয়। সে এক ভিন্ন জাতের নারী। এভাবে শুধু প্রেয়সী, বীরপুরুষের মিলনের সঙ্গী হয়ে থাকা তার কাছে মনে হয় ছলনা। যোদ্ধা, সংগ্রামী, রাজনীতিক নারী পরিচয়ও তার জীবনে প্রবলভাবে সত্য। অর্জুনও চিত্রাঙ্গদার মনের অস্থিরতায় বুঝতে পারে কোথায় যেন ফাঁক রয়ে গেছে। চিত্রাঙ্গদাকে সম্পূর্ণ পেয়েও যেন পাওয়া হলো না, দেহের সুধা মিলে, আত্মা মিলে না। অনাবিষ্কৃত পরিচয়ের রহস্য মনে সম্পূর্ণ তৃপ্তি আনে না। ‘অঙ্গহীন ছন্দোহীন প্রেম, প্রতিক্ষণে পরিতাপ জাগায় অন্তরে।’ এদিকে অর্জুন শুনেছে এই রাজ্যের রাজকন্যার কথা, যে ‘স্নেহে নারী, বীর্যে সে পুরুষ।’ সেই নারী এই বনের রক্ষক। রাজ্যের এক প্রজা বলেছে, সেই রাজকন্যা ‘এক দেহে তিনি পিতা মাতা অনুরক্ত প্রজাদের / স্নেহে তিনি রাজমাতা বীর্যে যুবরাজ।’ এই রাজ্যের তিনি রক্ষক রমণী, ‘তাঁর ভয়ে রাজ্যে নাহি ছিল কোনো ভয়, যমভয় ছাড়া।’ অর্জুন এই বীর্যবান নারীর খবর যত শোনে তত উদাসীন, কৌতূহলী হয়। নিজ পরিচয় গোপন করে আশ্রমকন্যা হিসেবেই পরিচয় দিয়েছিল অর্জুনের কাছে চিত্রাঙ্গদা। এখন এই রাজ্য আসন্ন শত্রু আক্রমণের মুখে, প্রজাগণ আতঙ্কিত, সকলে জানে তাদের রক্ষক রাজকন্যা গেছে তীর্থভ্রমণে। ক্ষত্রীয় বীর অর্জুন প্রেয়সী আশ্রমকন্যা চিত্রাঙ্গদার কাছ থেকে ছুটি নিয়ে ছুটে যেতে চায় শত্রু মোকাবেলা করে রাজ্য রক্ষা করতে। চিত্রাঙ্গদা তখন তাকে নিশ্চিন্ত করে, ভয়ের কিছু নেই, বুদ্ধিমান চিত্রাঙ্গদা ‘তীর্থযাত্রাকালে রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদা স্থাপন করিয়া গেছে সতর্ক প্রহরী দিকে দিকে; বিপদের যত পথ ছিল বন্ধ ক’রে দিয়ে গেছে বহু তর্ক করি।’
চিত্রাঙ্গদা কাব্যনাটক লিখবার মাত্র চার বছর আগে রবীন্দ্রনাথ বিদুষী রমাবাইয়ের বক্তৃতা শুনতে গিয়েছিলেন। রমাবাইয়ের বক্তৃতার একটা কথা ‘মেয়েরা সকল বিষয়ে পুরুষদের সমকক্ষ কেবল মদ্যপানে নয়’ শুনে রবীন্দ্রনাথ বেশ বিরক্ত ও বিতর্কমুখর হয়ে ওঠেন। বক্তৃতা থেকে ফিরে এক পত্র প্রবন্ধে (রমাবাইয়ের বক্তৃতা উপলক্ষে পত্র) তাঁর চিন্তাভাবনা লেখেন। অবশ্য রমাবাই তাঁর বক্তৃতা শেষ করতে পারেননি। পুরুষ শ্রোতাদের আক্রমণে তাঁকে বক্তৃতা রেখে বসে পড়তে হয়। মেয়েরা সকল বিষয়ে পুরুষদের সমকক্ষ বলেছেন রমাবাই, শ্রেষ্ঠও বলেননি। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘মেয়েরা সকল বিষয়েই যদি পুরুষের সমকক্ষ, তাহলে পুরুষের প্রতি বিধাতার নিতান্ত অন্যায় অবিচার বলতে হয়।’ তাঁর মতে ‘রূপ এবং অনেকগুলি হৃদয়ের ভাবে’ মেয়েরা পুরুষের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু প্রতিভা! সাহিত্য সঙ্গীত সাধনার মতো সৃজনশীল কাজে, প্রতিভায় ও এনার্জিতে পুরুষ শ্রেষ্ঠ ব’লে তিনে মনে করেন। লিখেছেন, ‘আমার তো বোধ হয় না, কবি হতে ভূরিপরিমাণ শিক্ষার আবশ্যক। মেয়েরা এতদিন যেরকম শিক্ষা পেয়েছে তাই যথেষ্ট ছিল। অনেক বড় কবি অপেক্ষাকৃত অশিক্ষিত নিম্নশ্রেণির থেকে উদ্ভূত। স্ত্রী জাতির মধ্যে প্রথম শ্রেণির কবির আবির্ভাব এখনো হয়নি।... বহুদিন থেকে যত বেশি মেয়ে সংগীতবিদ্যা শিখছে এত পুরুষ শেখেনি।... কিন্তু তাদের মধ্যে কটা Mozart কিংবা Beethoven জন্মালো।’ লিখেছেন ‘প্রকৃতি বলে দিচ্ছে যে, বাহিরের কাজ মেয়েরা করতে পারবে না। যদি প্রকৃতির সে-রকম অভিপ্রায় না হতো তাহলে মেয়েরা বলিষ্ঠ হয়ে জন্মাতো।’ চিত্রাঙ্গদা লেখার মাত্র চার বছর আগেই এই গদ্য লিখেও রবীন্দ্রনাথ পুরাণজাত এমন বীর্যবান নায়িকাকে শৌর্যে বীর্যে বুদ্ধি ও সংবেদনশীলতায় অনন্য করে তুলতে পারলেন। চিত্রাঙ্গদা তাঁর ব্যতিক্রমী সৃষ্টি বৈকি।
রবির বন্ধু প্রিয়নাথ সেন চিত্রাঙ্গদা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে লিখেছেন:
“চিত্রাঙ্গদা সর্ব্বতোভাবে রবিবাবুর নূতন সৃষ্টি। মহাভারতে চিত্রাঙ্গদার কোন সুস্পষ্ট মূর্ত্তি নাই। কোথাও কোন বিষয়ে তাহার কর্ত্তৃত্ব বা বিশেষত্ব দেখি না, এবং পরবর্ত্তী ঘটনাবলীর মধ্যেও যখন পুনর্ব্বার তাহার সাক্ষাৎ পাই, তখনও তাহার এইরূপ নির্ব্বিশেষত্ব। মহাভারতকার যেন একতাল মাটীর উপর “চিত্রাঙ্গদা” এই কয়টি কথা লিখিয়া গিয়াছেন। রবিবাবু সেই মাটী লইয়া একটি জীবন্ত অপূর্ব্ব-রমণী মূর্ত্তি সৃষ্টি করিয়াছেন।” (সাহিত্য, সম্পাদক সুরেশচন্দ্র সমাজপতি, কার্তিক ১৩১৬, পৃ. ৩৭৯)
মদন বসন্ত দেবের দেয় বরের সমাপন কাল আসন্ন; চিত্রাঙ্গদার কাছেও এই প্রেম ও প্রিয়া রূপের ছলনা, মিথ্যা আচরণ অসহনীয় হয়ে ওঠে। অন্তরে দগ্ধ হয়। এই দগ্ধ অনুতপ্ত রূপ, এই সত্য হয়ে ওঠার তীব্র তাগিদ চিত্রাঙ্গদাকে রবীন্দ্রনাথের অন্য সব নায়িকাদের থেকে উজ্জ্বল স্বতন্ত্র ক’রে তোলে। একসময় চিত্রাঙ্গদা সেই অমর উজ্জ্বল উপলব্ধির অমোঘ বাণী উচ্চারণ করে অর্জুনের কাছে নিজের সত্য পরিচয় জানিয়ে দেয়—
‘আমি চিত্রাঙ্গদা।
দেবী নহি, নহি আমি সামান্য রমণী পূজা করি রাখিবে
মাথায়, সেও আমি নই; অবহেলা করি পুষিয়া রাখিবে
পিছে, সেও আমি নহি। যদি পার্শ্বে রাখ মোরে সংকটের
পথে, দুরূহ চিন্তার যদি অংশ দাও যদি অনুমতি করো
কঠিন ব্রতের তব সহায় হইতে, যদি সুখে দুঃখে মোরে
করো সহচারী, আমার পাইবে তবে পরিচয়।’
এই পরিচয় প্রকৃতির সেই সৃষ্টি যার মধ্যে শুধু রমণী-প্রিয়া-জননী রূপ স্থায়ী প্রতিষ্ঠিত নয়। এই নারী সংকটের পথে, দুরূহ চিন্তার পথে ‘সমকক্ষ’ অংশীদার। প্রিয়া-জননী বা পূজার সামান্য নারী বানিয়ে বিশ্ব জগতে সংগ্রাম ও আন্দোলন থেকে দূরে গৃহপালিত উপকারী জন্তুর মতো পুষে রাখা যাবে না।
মহাভারতের (আদিঃ ২০৮ : ১৬) চিত্রাঙ্গদার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের নায়িকা চিত্রাঙ্গদার পার্থক্য শুধু কাহিনীতেই নয়, বোধ ও চৈতন্যেও প্রবল। মহাভারতের এই ব্যতিক্রমী গল্পটিতে রবীন্দ্রনাথ আগ্রহ বোধ করেন হয়তো চিত্রাঙ্গদার পরিচয়ের বিশিষ্টতায়। কন্যা হয়েও সে চিত্রবাহনের পুত্র, এবং ‘পুত্রিকা-পুত্র’ করবার বিধান অনুসারে যজ্ঞানুষ্ঠান করে এই কন্যাকে ‘পুত্র’ সংজ্ঞায় নিশ্চিত করেছেন। ফলে, এর গর্ভের সন্তানও চিত্রবাহনের বংশধর হবে। এবং অর্জুন-চিত্রাঙ্গদার সন্তান বভ্রুবাহন চিত্রবাহনের বংশধর হিসেবে পরিগণিত হন। রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদার কুৎসিত, কুরূপ কারণ সে বালকের মতো, সেই প্রেয়সী-প্রিয়ার মতো নয়, নারীর সেই বঙ্কিম ভুরুও নয়। বরং কঠিন সবল বাহু বিঁধিতে শিখেছে / লক্ষ্য, বাঁধিতে পারে না বীরতনু হেন / সুকোমল নাগপাশে।
কৌতূহলী অর্জুন ছদ্মবেশী চিত্রাঙ্গদার মুখে চিত্রাঙ্গদার এই নিন্দা শুনেও বলে, ‘কিন্তু শুনিয়াছি,/ স্নেহে নারী, বীর্যে সে পুরুষ। তখন রবীন্দ্রকাহিনীর চিত্রাঙ্গদা, রবীন্দ্রনাথের নারী ধারণার বশবর্তী হয়ে, নারীর শক্তিমত্তার খবরে ধিক্কার প্রকাশ করে—
‘ছি ছি, সেই
তার মন্দভাগ্য। নারী যদি নারী হয়
শুধু, শুধু ধরণীর শোভা, শুধু আলো,
শুধু ভালোবাসা— শুধু সুমধুর ছলে
শতরূপ ভঙ্গিমায় পলকে পলকে
লুটায়ে জড়ায়ে, বেঁকে বেঁধে, হেসে কেঁদে,
সেবায় সোহাগে ছেয়ে ছেয়ে চেয়ে থাকে সদা—
তবে তার সার্থক জনম।’
নারী জনমের এই সার্থকতার ধারণা রবীন্দ্রনাথ চিত্রাঙ্গদা নাটকে বদলে দেন। রবীন্দ্রসাহিত্যে অন্যতম ব্যতিক্রম হয়ে ছদ্মবেশী চিত্রাঙ্গদা, মদন আর বসন্তের গড়া রমণীয়তা আর সৌন্দর্য্যরে খোলস থেকে বেরিয়ে ঘোষণা করে, আমিই সেই চিত্রাঙ্গদা যে বীর্যে সে পুরুষ, দেবী নয়, সামান্য রমণীও নয়, দুরূহ চিন্তার এবং সুখে দুঃখে পুরুষের সহচরী হওয়ার অভিলাষী।
মহাভারতে ব্যাসদেবের সৃষ্টি চিত্রাঙ্গদা রূপসী এবং রমণীয়, পৌরুষ শিক্ষা তেজে সে পৌরুষদীপ্ত নয়। কারণ রাজা চিত্রবাহনের সেই প্রয়োজন ছিল না। বংশ রক্ষার ধারাবাহিকতার স্বার্থে যজ্ঞ করে কন্যাকে পুত্র বিবেচনা করার বিধান করে নিয়েছেন। অর্জুন— চিত্রাঙ্গদার প্রথম দর্শনের ঘটনাও কাব্যনাটকে রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি, চিত্রাঙ্গদা চরিত্রের মহিমা এবং মাত্রা সৃষ্টির প্রয়োজনে, কাব্যরসের প্রয়োজনেও সৃষ্টি করেন। ব্যাসদেবের চিত্রাঙ্গদাকে অর্জুন দেখেন মণিপুরের ধার্মিক রাজা চিত্রবাহনের রাজবাড়িতে— ‘যদৃচ্ছ বিচরণ করছিলেন’। ব্যাসদেবের কাহিনীতে যেমন রাজার কাছে চিত্রাঙ্গদাকে প্রার্থনা করেছিলেন, তেমনি, রাজার দেয়া শর্তানুযায়ী অর্জুনই বভ্রুবাহনকে দিয়ে যান। এবং চিত্রাঙ্গদাকে বভ্রুবাহনকে গড়ে তোলার দায়িত্ব দিয়ে গোকর্ণতীর্থের পথে গমন করলেন।
একাধারে পুরুষ ও নারী রাজেন্দ্রনন্দিনী চিত্রাঙ্গদার এই সত্য উপলব্ধি ও প্রকৃত পরিচয়ের উন্মোচন মহাভারতের মতো না হলেও রবীন্দ্রনাথ তাকে সৃষ্টি করে কাব্য সৌন্দর্যে মহাকালে স্থায়ী করে দিয়েছেন। রাজা চিত্রবাহনের কন্যা চিত্রাঙ্গদা মহাভারতের মূল কাহিনী স্রোতের উপর্যুপরি ঢেউয়ে প্রায়বিস্মৃত, রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদা আধুনিক সময়ের চেতনা প্রবাহের আদর্শ প্রতীক। তো এই চিরকালের চিত্রাঙ্গদার বা কালজয়ী চিত্রাঙ্গদার জন্যেই হবে, ত্রিকালজ্ঞ সঞ্জয় গভীর আবেগ অনুভব করেন। রবি চিত্রাঙ্গদাকে নিয়ন্ত্রণ করেছেন কাব্যে, সঞ্জয়ও চান কাব্যেই সঞ্জয় নিয়ন্ত্রণ করবে ভবিষ্যৎকে, যে ভবিতব্য তিনি দেখতে পারেন।’ (বাকি অংশ আগামী সংখ্যায় পড়ুন)

আপনার মতামত লিখুন