সংবাদ

শ্রদ্ধাঞ্জলি

জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য: কবিতায় আন্তর্জাতিক চেতনা


মুনীর সিরাজ
মুনীর সিরাজ
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ০৭:২৩ এএম

জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য: কবিতায় আন্তর্জাতিক চেতনা
সুকান্ত ভট্টাচার্য: জন্ম: ১৫ আগস্ট ১৯২৬; মৃত্যু: ১৩ মে ১৯৪৭


সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা নিয়ে লেখার তাগিদ অনুভব করেছি অনেক দিন ধরে। কেনো এ তাগিদ তা ভাবতে গেলে এ কথাই বলতে হয় যে জীবনঘনিষ্ঠ চিন্তাচেতনার এক অবক্ষয়ী স্রোত যেন সমগ্র পৃথিবী গ্রাস করতে উদ্যত হয়ে উঠেছে। সন্ত্রাস ও ফ্যাসিবাদের আত্মার পুনরুত্থান ঘটেছে, আর সেই ক্রূরতম বিকৃত মানসিকতা উন্মুক্ত অস্ত্র হাতে ছুটে বেড়াচ্ছে পৃথিবীব্যাপী।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং যুদ্ধোত্তর সময়ে যাদের জন্ম, তাদের কাছে হিটলারের ভূত আজো এতটাই স্পষ্ট, যেনো আজো তারা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আবহেই এখনো বেঁচে আছেন। সেই সময়কার কবি কিশোর সুকান্ত সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, ফ্যাসিবাদবিরোধী এক আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের পরিবেশে বিস্ময়ে অবাক হয়েছিলেন যে পৃথিবীব্যাপী এক নব জাগরণের সূত্রপাত হয়েছে— যা একদিন সমগ্র পৃথিবীকে মুক্ত করবে। তাই বিশ্বব্যাপী বুর্জোয়া উদারনৈতিক সাহিত্য ও সংস্কৃতির পরিবেশের মধ্যে নতুন সংস্কৃতির খোঁজ পেয়ে সুকান্ত উল্লসিত হয়েছিলেন এবং বিশ্বযুদ্ধের আবহে এক আন্তর্জাতিক চেতনায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বনাগরিক। প্রতিবাদের ভাষায় উৎকৃষ্টতম কবিতা রচনা করে এক নবজাগরণের চেতনা সৃষ্টি করলেন কবিতায়। বাংলা সাহিত্যের সেই অবিস্মরণীয় বিস্ময় সুকান্ত সেদিন একা ছিলেন না। নয়া সংস্কৃতির অঙ্গনে তাঁর আগে এবং তাঁর সময়কালে শক্তি সঞ্চয় করেছিলেন ম্যাক্সিম গোর্কি, মায়াকোভস্কি, লু স্যুন, সমর সেন, সুভাস মুখোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, আহসান হাবীব প্রমুখ। ফ্যাসিবাদবিরোধী চেতনাকে ধারণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল।  

কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আবহে মুক্ত মানুষের খোঁজে আন্তর্জাতিক চেতনায় ফ্যাসিবাদ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী কণ্ঠ ছিলেন সুকান্ত। আজকের বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর নগ্ন ফ্যাসিবাদী চক্রান্তের সময় তেমন প্রতিবাদী কণ্ঠ যথেষ্ট উচ্চকিত নয়। কেনো সময়ের দাবি থাকা সত্ত্বেও একজন ম্যাক্সিম গোর্কি, একজন লু স্যুন, একজন সুকান্তকে খুঁজে পাওয়া যায় না, সে প্রশ্নের মুখোমুখি হতেই সুকান্তের কবিতার আন্তর্জাতিক চেতনার নির্য়াসে অবগাহনের ইচ্ছা জাগে। সে প্রবল ইচ্ছার ফলে আবার নতুন সংস্কৃতির নির্মাণ অগ্রসর হবে এবং বিশ্বের নিপীড়িত গণমানুষদের সাম্রাজ্যবাদ এবং ফ্যাসিবাদের যাঁতাকল থেকে মুক্ত করার জন্য উদ্বেলিত হয়ে উঠবে আমাদের মন, সে বিশ্বাসে জাগ্রত হয়ে ওঠে মন।

সুকান্ত ভট্টাচর্যের কবিতায়  আন্তর্জাতিক চেতনার কথা উল্লেখ করতে হলে প্রথমেই তাঁর ‘ঠিকানা’ কবিতাটি আলাচনা করতে হয়। ১৯৪৩ সালে সুকান্ত একবার পার্টিকর্মী বন্ধুদের আমন্ত্রণে চট্টগ্রাম এসেছিলেন।  সুকান্তের কবিখ্যাতি ইতোমধ্যে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছে।  বিশেষ করে চট্টগ্রামের তরুণদের মধ্যে সুকান্ত তখন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। এই তরুণ বন্ধুরা সুকান্তের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার জন্য তাঁর ঠিকানা চেয়েছিলেন। তারই উত্তরে সুকান্ত ‘ঠিকানা’ নামক ঐতিাসিক কবিতটি লিখেছিলেন এবং চট্টগ্রামের এক সভায় তা পাঠ করেছিলেন। সুকান্ত ইে কবিতাটিতে নিজেকে স্বদেশের একজন মুক্তিকামী মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং পৃথিবীর সমস্ত মুক্তিকামী মানুষের সাথে তিনি যে এক অভিন্ন সত্তা, সে কথাটিই স্পষ্ট করে তোলেন। তিনি এ কবিতাটিতে নিজের কোনো পরিচয় দেয়ার প্রয়োজন বোধ করেন নি। মুক্ত স্বদেশ এবং মুক্ত বিশ্বই যে তাঁর ঠিকানা এবং মুক্ত স্বাধীন মানুষই যে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়, কবিতাটির ছত্রে ছত্রে তার অনুরণন শোনা যায়। 

ঠিকানা আমার চেয়েছ বন্ধু
ঠিকানার সন্ধান
আজও পাওনি? দুঃখ যে দিলে 
           করব না অভিমান?
ঠিকানা না হয় না নিলে বন্ধু
পথে পথে বাস করি,
কখনো গাছের তলতে
সখনো পর্ণকুটির গড়ি।
আমি যাযাবর কুড়াই পথের নুড়ি,
হাজার জনতা যেখানে, সেখানে
আমি প্রতিদিন ঘুরি,
বন্ধু ঘরের খোঁজে পাই না তো পথ
তাইতো পথের নুড়িতে গড়বো
মজবুত  ইমারত।

মুক্তিকামী মানুষের ঠিকানা জানার কি প্রয়োজন আছে? এখানে খ্যাতির প্রশ্ন নয়, বৃহত্তর স্বার্থ এবং ত্যাগের প্রশ্ন। সমস্ত মানুষর সত্তায় যার অস্তিত্ব, সে বস্তুতই পৃথিবীবাসী। “বন্ধ,ু আজকে আঘাত দিও না/ তোমাদের দেওয়া ক্ষতে/ আমার ঠিকানা খোঁজ কর শুধু/ সূর্যোদয়ের পথে।/ ইন্দোনেশিয়া, যুগোশ্লাভিয়া,/ রুশ ও চীনের কাছে/ আামার ঠিকানা বহুকাল ধরে/ জেনো গচ্ছিত আছে।”

যেখানেই মুক্তিকামী মানুষ, সেখানেই তাঁর উপস্থিতি। তাই ইন্দোনেশিয়া, যুগোশ্লাভিয়া, রুশ, চীন এবং সমগ্র পৃথিবীর সংগ্রামী মানুষ এবং সর্বহারা বিপ্লবের পথ ধরেই তিনি পৃথিবীর পথের পথিক । 

ফরাসি বিপ্লবী মজুর অ. গ্যাঁ. পতিয়ে-এর ইনটারন্যাশানাল সঙ্গীত সম্বন্ধে মন্তব্য করতে গিয়ে লেনিন বলেছিলেন যে, ‘বিপ্লবী কবিতা লাখ লাখ শ্রমিকের মনকে উদ্বুদ্ধ করতে সাহায্য করে, তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি করে এবং তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সংগ্রামের প্রস্ততি গ্রহণ করতে সাহস দান করে। বহু ভাষাভাষি শ্রমিকগণ যদি এক স্থানে দাঁড়িয়ে এ সঙ্গীতটি বিভিন্ন ভাষাতেও গায়, এ সঙ্গীতটির অন্তর্নিহিত অর্থ ও  সুর সমস্ত শ্রমিককেই এক বৃন্তে আবদ্ধ করে এবং তাঁরা সকলেই এক হয়ে যান। সুকান্তের ‘ঠিকানা’ কবিতায়ও সেই আন্তর্জাতিক চেতনাই যে পরিস্ফুটিত তা নিঃসন্দেহেই বলা যায়।

‘খবর’ কবিতায় সুকান্তের আন্তর্জাতিক চেতনার আরো পরিচয় পাওয়া যায়। সাংবাদিকের ভূমিকায় কবি খবর পাচ্ছেন পৃথিবীর চতুর্দিক থেকে। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সাংবাদিক কবি অপেক্ষা করছেন চূড়ান্ত সংবাদের জন্য। “জ্বলে ওঠে কি স্তালিনগ্রাদের প্রতিরোধে,/ মহাত্মাজীর মুক্তিতে, প্যারিসে অভ্যুত্থানে?”

আর এসব সংবাদ পেতে পেতে বিপ্লবী কবির মন স্বপ্নময় হয়ে ওঠে এবং তখনই ‘খবর’ কবিতাটি নিছক একটি সংবাদ বুলেটিন না হয়ে একটি পরিপূর্ণ কবিতায় রূপান্তরিত হয়— “আমার হৃদযন্ত্রে ঘা লেগে বেজে ওঠে কয়েকটি কথা/ পৃথিবী মুক্ত, জনগণ চূড়ান্ত সংগ্রামে জয়ী।”

‘লেনিন’ কবিতাটিতে সুকান্ত শুধু লেনিনের চিন্তাচেতনাকে ধারণ করেননি। সেই চেতনাকে কবিতার প্রতিটি ছত্রে দৃঢ় উজ্জ্বল ভাষায় ব্যক্ত করেছেন।

বিদ্যুৎ ইশারা চোখে, আজকেও অযুত লেনিন/ ক্রমশ সংক্ষিপ্ত করে বিশ্বব্যাপী প্রতীক্ষিত দিন,/ বিপর্যস্ত ধনতন্ত্র, কণ্ঠরুদ্ধ, বুকে আর্তনাদ/ আসে শত্রুজয়ের সংবাদ।”

অ. গ্যাঁ. পতিয়েকে লেনিন বিপ্লবী কবি এবং সর্বহারার কবি বলে উল্লেখ করেন। এবং তাঁকে প্রকৃত আন্তর্জাতিক ব্যক্তির উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। সুকান্তও লেনিনের সুরে লেনিনকেই বিশ্বব্যাপী সংগ্রামী মানুষের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং নিজেকেও লেনিন বলে সম্বোধন করেন। লেনিন তখন আর একজন ব্যক্তি লেনিন নন, তিনি তখন এমন এক আন্তর্জাতিক চেতনা, যা বিশ্বব্যাপী সমস্ত সংগ্রামী মানুষের চেতনায় ব্যাপ্ত— “বিপ্লব হয়েছে শুরু, পদনত জনতর ব্যগ্র গাত্রোত্থানে /দেশে দেশে বিস্ফোরণ অতর্কিত অগ্নুৎপত হানে।/ দিকে দিকে কোণে কোণে লেনিনের পদধ্বনি।/ আজো যায় শোনা

দলিত হাজার কণ্ঠে বিপ্লবের আজো সংবর্ধনা।/ পৃথিবীর প্রতি ঘরে ঘরেকে আকাশে/ লেনিনের সূর্যদীপ্ত রক্তের তরঙ্গ ভেসে আসে;/ ইতালি, জার্মান, জাপ, ইংল্যান্ড, আমেরিকা, চীন/ যেখানে মুক্তির যুদ্ধ সেখানেই কমরেড লেনিন।”

এই লেনিন কে? লেনিন এখানে ব্যক্তি নিরেপেক্ষ, যেখানেই মুক্তির যুদ্ধ, সেখানেই কমরেড লেনিন। লেখাটির মাধ্যমে সুকান্তের কবিতাটি কি সমগ্র মানব জাতির  সম্পদ হয়ে ওঠেননি? কবি সুকান্ত নিজের আত্ম পরিচয় ভুলে গিয়ে ভাবতে থাকেন— “বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন।”

দুর্ভিক্ষের সময় চট্টগ্রামের অবস্থা কেমন? যদিও ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তশব্দ চট্টগ্রামের বাতাসে ভেসে বেড়ায়, তবুও চট্টগ্রামের বীরত্বের ইতিহাস ভুলে যাননি কবি সুকান্ত। বিক্ষত বিধ্বস্ত চট্টগ্রামের নিঃশব্দ সহিষ্ণুতা কবির কাছে ঝড়ের পূর্বাভাসের মতো মনে হয়েছে। অরণ্যের স্বপ্ন চেখে নিয়ে একদিন ক্ষুধিত শ্বাপদের মতো জেগে উঠবে চট্টগ্রাম এবং নিপীড়কের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হবে, সে দৃঢ় আস্থাই ব্যক্ত করেন কবি। আরোও অনুধাবনের বিষয় যে চট্টগ্রামের ঘটনাকে পৃথিবীর সংগ্রামী ঘটনার সাথে আলাদা করে দেখেননি তিনি এবং নির্দি¦ধায় চট্টগ্রামকে উদ্দেশ্য করে বলেন— “তুমি চাও শোণিতের স্বাদ/ যে স্বাদ জেনেছে স্তালিনগ্রাদ।”

দুর্ভিক্ষ এবং ক্ষুধায় আক্রান্ত মানুষের ধর্মঘটকে সুকান্ত বেআব্রু ক্ষুধার চূড়ন্ত প্রকাশ বলে চিত্রায়িত করেছেন। লোভী বিষাক্ত সরীসৃপের বিরুদ্ধে এই ধর্মঘটে মজুররাই চূড়ান্তভাবে বিজয়ী হবে এই ছিল সুকান্তের দৃঢ় বিশ্বাস। আর তাই ‘মজুরদের ঝড়’ কবিতায় ধর্মঘট ভাঙার চেষ্টায় রত দালালদের বিরুদ্ধে তিনি বিষোদ্গার করেন। আর এই মজুরদের কথা বলতে গিয়ে সুকান্তের চেতনা শুধু স্বাদেশিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে না। স্বদেশের মজুর ধর্মঘটও তাই পৃথিবীর সমস্ত মজুরশ্রেণির সংগ্রমের প্রতীক হয়ে দঁড়ায়। 

ঝড় আসছে সেই ঝড়
যে ঝড় পথিবীর বুক থেকে জঞ্জালদের
টেনে তুলবে
আর হুঁশিয়ার মজুর
সে ঝড় প্রায় মুখোমুখি।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় সোভিয়েত রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রন্সের সাথে হাত মিলিয়ে ফ্যাসিস্ট হিটলারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। সোভিয়েত  রাশিয়ার সমর্থনপুষ্ট মিত্রশক্তি সেদিন বিজয়ী হয়েছিল। সোভিয়েত রাশিয়ার সথে সে সময় মুক্তবিশ্ব কায়েমের সমর্থনকরীরা ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পরাজিত করার জন্য জোট বেঁধেছিল। কিন্তু সে যুদ্ধের সমাপনই যে সংগ্রামী মানুয়ের শেষ যুদ্ধ নয়, তা অনুধাবন করেই সুকান্ত তঁর কবিতায় দিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হওয়ার সময়টাকে শুধুমাত্র দিন বদলের ক্রান্তিকাল বলে উল্লেখ করেছেন— “পৃথিবীতে যুদ্ধ শেষ বন্ধু সৈনিকের রক্ত ঢালা/ ভেবেছ তোমার জয়, তোমার প্রাপ্য এ জয়মালা/ জানো না এখানে যুদ্ধ শুধু দিন বদলের পালা।”

গভীরভাবে সচেতন একজন মানুষের পক্ষেই কেবল এমন অনুধাবন সম্ভব। ফ্যাসিস্ট শক্তির পরজয়ই যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির চূড়ান্ত পরাজয় নয়, এবং সেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে পদানত করার জন্য অবিরাম সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন কিশোর বয়সেই। আর সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উত্থান এবং তাদের হিটলারের মতোই বা তার চেয়েও জঘন্য ফ্যাসিবাদী তৎপরতা আমাদের আরো দীর্ঘ যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। 

প্রিয়তমাকে ঘরে ফেলে রেখে মুুক্তিপাগল কবি ছুটে গিয়েছেন পৃথিবীর দিকে দিকে। যেখানেই মুক্তির সংগ্রাম, সেখানেই সুকান্ত। ‘প্রিয়তমাসু’ কবিতা তারই উজ্জ্বর উদাহরণ— “ধূসর তিউনিসয়িা থেকে স্নিগ্ধ ইতালি/ স্নিগ্ধ ইতালি থেকে ছুটে গেছে বিপ্লবী ফ্রান্সে/ নক্ষত্র নিয়স্ত্রিত নিয়তির মতো/ দুর্নিবার অপরাহত রাইফেলর হাতে/ ফ্রান্স থেকে প্রতিবশী বার্মাতেও।”

‘রোম: ১৯৪৩’ কবিতায় সুকান্ত সোভিয়েত বিপ্লবের তাৎপর্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। ১৯১৭ সালের পরে পৃথিবীর সংগ্রমী জনগণের জন্য সচেয়ে বড় সংবদ ছিল সোভিয়েত বিপ্লব। আত্মগর্ব এবং অহংকারে সেদিন কুণ্ঠাহীনভাবে উঠে দাঁড়িয়েছিল পৃথিবীর সংগ্রামী মানুষ। পৃথিবীর সমস্ত ন্যায় সংগ্রাম এবং বিপ্লবী মানুষকে সোভিয়েত সমর্থন দেবে, এবং সোভিয়েতকে পাশে পেয়ে তারা দিনে দিনে দুঃসাহসী হয়ে উঠবে এ আকাঙ্ক্ষার সেদিন কোনো তুলনা ছিল না— “এদিকে ত্বরিত সূর্য রোমের আকাশে/ যদিও কুয়াশা ঢাকা আকাশের নীল/ তবুও বিপ্লবী জানে, সোভিয়েত পাশে।”      

শত সহস্র শ্রমিকের হাতে গড়া বিলাসী প্রাসাদ ভেঙে দেয়ার আহ্বানের মাধ্যমে ‘ভগ্নস্তূপে ভবিষ্যত মুক্তির প্রচার’-এর সন্ধান দিয়েছিলেন সুকান্ত। সারা পৃথিবীর লুণ্ঠনকারীরা একটি দল। আর সারা পৃথিবীর লুণ্ঠিত নিপীড়িত মানুষরা আর একটি দল। দেশ-কালের উর্ধে আন্তর্জাতিক চেতনার এর চেয়ে সহজ প্রকাশ আর কী হতে পারে!  ‘হদিস’  কবিতায় সুকান্তের সে চেহারাকে অত্যন্ত সহজে চিনে নেয়া যায়— “এখন যুদ্ধ শুরু সারা বিশ্বজুড়ে/ জগতের যত লুণ্ঠনকারী আর মজুরে/ চঞ্চল দিন ঘোড়ার খুরে।”

‘পৃথিবীর দিকে তাকাও’ কবিতায় সোভিয়েত রাশিয়র বিপ্লব যে সমগ্র পৃথিবীর বিপ্লবকামী মানুষের জয়ের প্রতীক, সোভিয়েতের জয় যে তারা নিজের জয় মনে করেন আর এর মধ্যে যে জড়িত রয়েছে বিপ্লবী আান্তর্জাতিক চেতনা, কবিতাটি পড়া মাত্রই তা সকলের মনই উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। 

রাশিয়াই শুধু রাশিয়া মহান দেশ
যেখানে হয়েছে গোলামীর দিন শেষ,
রাশিয়া যেখানে মজুরের আজ জয়।
লেনিন গড়িছে রাশিয়া! কি বিস্ময়!
রশিয়া যেখানে ন্যায়ের রাজ্য স্থায়ী
নিষ্ঠুর ‘জার’ সেই দেশে ধরাশায়ী,
সোভিয়েত— ‘তারা’ যেখানে দিচ্ছে আলো
প্রিয়তম সেই মজুরের দেশ ভাল।

ছোটদের জন্য লেখা ‘মিঠেকড়া’ গ্রন্থটিতে সুকান্তের এ কবিতাটি সংকলিত। শিশুদেরকেও সাম্যবাদী চিন্তা এবং শিক্ষায় দীক্ষিত করে তোলার জন্য সুকান্ত গভীর মমতায় নিপীড়িত মানুষের চিত্র এঁকেছেন এবং তাদের মুক্তির পথ প্রদর্শন করার চেষ্টা করেছেন। একেকটি রসঘন গল্প বলারর ছলে শিশুদের ন্যায়-অন্যায়, ধনীর লুণ্ঠন এবং দরিদ্র ও মজুরদের সংগ্রাম সম্বন্ধে শিক্ষাদানের জন্য এ ধরনের কবিতা লেখার অন্য উদাহরণ বাংলা সাহিত্যে প্রায় অনুপস্থিত। একটি কথা অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন যে, শিশুদের সাম্যবাদী চেতনায় দিক্ষিত করার জন্য ‘মিঠেকড়া’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো একেবারেই ব্যতিক্রম। 

‘মার্শাল তিতোর প্রতি’ কবিতাটিতেও সুকান্তের আন্তর্জাতিক বিপ্লবী মানসিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মার্শাল তিতোকে সুকান্ত লেনিনের দূরবর্তী কোনো সত্তা ভাবতে পারেননি। তাই তিতোর সেনাবাহিনীর অগ্রযাত্রার সাথে সুকান্তও এক হেেয় যান। 

তোমর সেনানী পথে-প্রান্তরে দোসর খোঁজে
কোথায় কে আছে মুুক্তিকামী?
ক্ষিপ্ত করেছে তোমার যে ডাক আমাকেও যে
তাইতো তোমার পিছনে আমি।

সামগ্রিকভাবে সুকান্তর কবিতায় আন্তর্জাতিক চিন্তাচেতনার যে লক্ষণ আমরা খুঁজে পাই, তা বাংলা কবিতার অঙ্গনে শুধু নতুন সৃষ্টির প্রয়াস বলে থেমে যাওয়াটা একটা অসঙ্গত ব্যাপার; সুকান্ত সেই কবি যে বার বার খ্যাতিমান হওয়াকে অপ্রয়োজনীয় মনে করেছেন এবং কবিতা লেখার সাথে সাথে সাধারণ মানুষের কাতারে হারিয়ে গেছেন। মাটির কাছাকাছি যাওয়ার টান নয়, বরং তিনি ছিলেন মাটির কবি। পৃথিবীর সাহিত্যের ইতিহাসেও এমন দৃষ্টান্ত বিরল। যে কবি সত্তা কার্য ও কলমে অভিন্ন ছিলেন, এমন দৃষ্টান্ত অ. গ্যাঁ. পতিয়ের মতো সর্বহারার কবিদের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায়। সারা পৃথিবীর বিপ্লবী চিন্তাচেতনার প্রতি তাঁর দৃষ্টি ছিল সজাগ এবং এক মুক্ত বিশ্বের কথা যে বয়সে তিনি ধারণ করেছিলেন—  যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, কাল ও সীমার উর্ধে সব মানুষই অভিন্ন এবং সকলেই সকলের জন্য— বাংল সাহিত্যের জগতে এ ধরনের মনন ও মানসিকথার উত্থন বিস্ময়কর বৈকি! 

নিষ্কলুষ মুগ্ধ চিত্ত নিয়ে সুকান্তর কবিতা  অনুধাবনের  চেষ্টা না করলে পণ্ডিতের কাছে আমার এ বক্তব্য অতিকথন মনে হতে পারে। কিন্তু অস্বীকার করা তো যাবে না যে, বাংলা কবিতায় সুকান্ত অতি অল্প বয়সেই এক নতুন মাত্রা সৃষ্টি ও যোগ  করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কবিতার  নান্দনিকতার প্রয়োজন পূরণ করেও তাঁর উচ্চারণ ক্ষীণ  ছিল না। বরং বলা যায় যে সুকান্তই ছিলেন বাংলা কবিতার গণসচেতন সবচেয়ে অভ্রান্ত উচ্চারণ।      

*** 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট ২০২৬


জন্মশতবর্ষে সুকান্ত ভট্টাচার্য: কবিতায় আন্তর্জাতিক চেতনা

প্রকাশের তারিখ : ১৩ আগস্ট ২০২৬

featured Image


সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা নিয়ে লেখার তাগিদ অনুভব করেছি অনেক দিন ধরে। কেনো এ তাগিদ তা ভাবতে গেলে এ কথাই বলতে হয় যে জীবনঘনিষ্ঠ চিন্তাচেতনার এক অবক্ষয়ী স্রোত যেন সমগ্র পৃথিবী গ্রাস করতে উদ্যত হয়ে উঠেছে। সন্ত্রাস ও ফ্যাসিবাদের আত্মার পুনরুত্থান ঘটেছে, আর সেই ক্রূরতম বিকৃত মানসিকতা উন্মুক্ত অস্ত্র হাতে ছুটে বেড়াচ্ছে পৃথিবীব্যাপী।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং যুদ্ধোত্তর সময়ে যাদের জন্ম, তাদের কাছে হিটলারের ভূত আজো এতটাই স্পষ্ট, যেনো আজো তারা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আবহেই এখনো বেঁচে আছেন। সেই সময়কার কবি কিশোর সুকান্ত সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, ফ্যাসিবাদবিরোধী এক আন্তর্জাতিক প্রতিবাদ ও প্রতিরোধের পরিবেশে বিস্ময়ে অবাক হয়েছিলেন যে পৃথিবীব্যাপী এক নব জাগরণের সূত্রপাত হয়েছে— যা একদিন সমগ্র পৃথিবীকে মুক্ত করবে। তাই বিশ্বব্যাপী বুর্জোয়া উদারনৈতিক সাহিত্য ও সংস্কৃতির পরিবেশের মধ্যে নতুন সংস্কৃতির খোঁজ পেয়ে সুকান্ত উল্লসিত হয়েছিলেন এবং বিশ্বযুদ্ধের আবহে এক আন্তর্জাতিক চেতনায় তিনি হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বনাগরিক। প্রতিবাদের ভাষায় উৎকৃষ্টতম কবিতা রচনা করে এক নবজাগরণের চেতনা সৃষ্টি করলেন কবিতায়। বাংলা সাহিত্যের সেই অবিস্মরণীয় বিস্ময় সুকান্ত সেদিন একা ছিলেন না। নয়া সংস্কৃতির অঙ্গনে তাঁর আগে এবং তাঁর সময়কালে শক্তি সঞ্চয় করেছিলেন ম্যাক্সিম গোর্কি, মায়াকোভস্কি, লু স্যুন, সমর সেন, সুভাস মুখোপাধ্যায়, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, আহসান হাবীব প্রমুখ। ফ্যাসিবাদবিরোধী চেতনাকে ধারণ করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ এবং নজরুল।  

কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আবহে মুক্ত মানুষের খোঁজে আন্তর্জাতিক চেতনায় ফ্যাসিবাদ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী কণ্ঠ ছিলেন সুকান্ত। আজকের বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর নগ্ন ফ্যাসিবাদী চক্রান্তের সময় তেমন প্রতিবাদী কণ্ঠ যথেষ্ট উচ্চকিত নয়। কেনো সময়ের দাবি থাকা সত্ত্বেও একজন ম্যাক্সিম গোর্কি, একজন লু স্যুন, একজন সুকান্তকে খুঁজে পাওয়া যায় না, সে প্রশ্নের মুখোমুখি হতেই সুকান্তের কবিতার আন্তর্জাতিক চেতনার নির্য়াসে অবগাহনের ইচ্ছা জাগে। সে প্রবল ইচ্ছার ফলে আবার নতুন সংস্কৃতির নির্মাণ অগ্রসর হবে এবং বিশ্বের নিপীড়িত গণমানুষদের সাম্রাজ্যবাদ এবং ফ্যাসিবাদের যাঁতাকল থেকে মুক্ত করার জন্য উদ্বেলিত হয়ে উঠবে আমাদের মন, সে বিশ্বাসে জাগ্রত হয়ে ওঠে মন।

সুকান্ত ভট্টাচর্যের কবিতায়  আন্তর্জাতিক চেতনার কথা উল্লেখ করতে হলে প্রথমেই তাঁর ‘ঠিকানা’ কবিতাটি আলাচনা করতে হয়। ১৯৪৩ সালে সুকান্ত একবার পার্টিকর্মী বন্ধুদের আমন্ত্রণে চট্টগ্রাম এসেছিলেন।  সুকান্তের কবিখ্যাতি ইতোমধ্যে চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছে।  বিশেষ করে চট্টগ্রামের তরুণদের মধ্যে সুকান্ত তখন বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। এই তরুণ বন্ধুরা সুকান্তের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার জন্য তাঁর ঠিকানা চেয়েছিলেন। তারই উত্তরে সুকান্ত ‘ঠিকানা’ নামক ঐতিাসিক কবিতটি লিখেছিলেন এবং চট্টগ্রামের এক সভায় তা পাঠ করেছিলেন। সুকান্ত ইে কবিতাটিতে নিজেকে স্বদেশের একজন মুক্তিকামী মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং পৃথিবীর সমস্ত মুক্তিকামী মানুষের সাথে তিনি যে এক অভিন্ন সত্তা, সে কথাটিই স্পষ্ট করে তোলেন। তিনি এ কবিতাটিতে নিজের কোনো পরিচয় দেয়ার প্রয়োজন বোধ করেন নি। মুক্ত স্বদেশ এবং মুক্ত বিশ্বই যে তাঁর ঠিকানা এবং মুক্ত স্বাধীন মানুষই যে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়, কবিতাটির ছত্রে ছত্রে তার অনুরণন শোনা যায়। 

ঠিকানা আমার চেয়েছ বন্ধু
ঠিকানার সন্ধান
আজও পাওনি? দুঃখ যে দিলে 
           করব না অভিমান?
ঠিকানা না হয় না নিলে বন্ধু
পথে পথে বাস করি,
কখনো গাছের তলতে
সখনো পর্ণকুটির গড়ি।
আমি যাযাবর কুড়াই পথের নুড়ি,
হাজার জনতা যেখানে, সেখানে
আমি প্রতিদিন ঘুরি,
বন্ধু ঘরের খোঁজে পাই না তো পথ
তাইতো পথের নুড়িতে গড়বো
মজবুত  ইমারত।

মুক্তিকামী মানুষের ঠিকানা জানার কি প্রয়োজন আছে? এখানে খ্যাতির প্রশ্ন নয়, বৃহত্তর স্বার্থ এবং ত্যাগের প্রশ্ন। সমস্ত মানুষর সত্তায় যার অস্তিত্ব, সে বস্তুতই পৃথিবীবাসী। “বন্ধ,ু আজকে আঘাত দিও না/ তোমাদের দেওয়া ক্ষতে/ আমার ঠিকানা খোঁজ কর শুধু/ সূর্যোদয়ের পথে।/ ইন্দোনেশিয়া, যুগোশ্লাভিয়া,/ রুশ ও চীনের কাছে/ আামার ঠিকানা বহুকাল ধরে/ জেনো গচ্ছিত আছে।”

যেখানেই মুক্তিকামী মানুষ, সেখানেই তাঁর উপস্থিতি। তাই ইন্দোনেশিয়া, যুগোশ্লাভিয়া, রুশ, চীন এবং সমগ্র পৃথিবীর সংগ্রামী মানুষ এবং সর্বহারা বিপ্লবের পথ ধরেই তিনি পৃথিবীর পথের পথিক । 

ফরাসি বিপ্লবী মজুর অ. গ্যাঁ. পতিয়ে-এর ইনটারন্যাশানাল সঙ্গীত সম্বন্ধে মন্তব্য করতে গিয়ে লেনিন বলেছিলেন যে, ‘বিপ্লবী কবিতা লাখ লাখ শ্রমিকের মনকে উদ্বুদ্ধ করতে সাহায্য করে, তাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি করে এবং তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য সংগ্রামের প্রস্ততি গ্রহণ করতে সাহস দান করে। বহু ভাষাভাষি শ্রমিকগণ যদি এক স্থানে দাঁড়িয়ে এ সঙ্গীতটি বিভিন্ন ভাষাতেও গায়, এ সঙ্গীতটির অন্তর্নিহিত অর্থ ও  সুর সমস্ত শ্রমিককেই এক বৃন্তে আবদ্ধ করে এবং তাঁরা সকলেই এক হয়ে যান। সুকান্তের ‘ঠিকানা’ কবিতায়ও সেই আন্তর্জাতিক চেতনাই যে পরিস্ফুটিত তা নিঃসন্দেহেই বলা যায়।

‘খবর’ কবিতায় সুকান্তের আন্তর্জাতিক চেতনার আরো পরিচয় পাওয়া যায়। সাংবাদিকের ভূমিকায় কবি খবর পাচ্ছেন পৃথিবীর চতুর্দিক থেকে। দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সাংবাদিক কবি অপেক্ষা করছেন চূড়ান্ত সংবাদের জন্য। “জ্বলে ওঠে কি স্তালিনগ্রাদের প্রতিরোধে,/ মহাত্মাজীর মুক্তিতে, প্যারিসে অভ্যুত্থানে?”

আর এসব সংবাদ পেতে পেতে বিপ্লবী কবির মন স্বপ্নময় হয়ে ওঠে এবং তখনই ‘খবর’ কবিতাটি নিছক একটি সংবাদ বুলেটিন না হয়ে একটি পরিপূর্ণ কবিতায় রূপান্তরিত হয়— “আমার হৃদযন্ত্রে ঘা লেগে বেজে ওঠে কয়েকটি কথা/ পৃথিবী মুক্ত, জনগণ চূড়ান্ত সংগ্রামে জয়ী।”

‘লেনিন’ কবিতাটিতে সুকান্ত শুধু লেনিনের চিন্তাচেতনাকে ধারণ করেননি। সেই চেতনাকে কবিতার প্রতিটি ছত্রে দৃঢ় উজ্জ্বল ভাষায় ব্যক্ত করেছেন।

বিদ্যুৎ ইশারা চোখে, আজকেও অযুত লেনিন/ ক্রমশ সংক্ষিপ্ত করে বিশ্বব্যাপী প্রতীক্ষিত দিন,/ বিপর্যস্ত ধনতন্ত্র, কণ্ঠরুদ্ধ, বুকে আর্তনাদ/ আসে শত্রুজয়ের সংবাদ।”

অ. গ্যাঁ. পতিয়েকে লেনিন বিপ্লবী কবি এবং সর্বহারার কবি বলে উল্লেখ করেন। এবং তাঁকে প্রকৃত আন্তর্জাতিক ব্যক্তির উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। সুকান্তও লেনিনের সুরে লেনিনকেই বিশ্বব্যাপী সংগ্রামী মানুষের প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং নিজেকেও লেনিন বলে সম্বোধন করেন। লেনিন তখন আর একজন ব্যক্তি লেনিন নন, তিনি তখন এমন এক আন্তর্জাতিক চেতনা, যা বিশ্বব্যাপী সমস্ত সংগ্রামী মানুষের চেতনায় ব্যাপ্ত— “বিপ্লব হয়েছে শুরু, পদনত জনতর ব্যগ্র গাত্রোত্থানে /দেশে দেশে বিস্ফোরণ অতর্কিত অগ্নুৎপত হানে।/ দিকে দিকে কোণে কোণে লেনিনের পদধ্বনি।/ আজো যায় শোনা

দলিত হাজার কণ্ঠে বিপ্লবের আজো সংবর্ধনা।/ পৃথিবীর প্রতি ঘরে ঘরেকে আকাশে/ লেনিনের সূর্যদীপ্ত রক্তের তরঙ্গ ভেসে আসে;/ ইতালি, জার্মান, জাপ, ইংল্যান্ড, আমেরিকা, চীন/ যেখানে মুক্তির যুদ্ধ সেখানেই কমরেড লেনিন।”

এই লেনিন কে? লেনিন এখানে ব্যক্তি নিরেপেক্ষ, যেখানেই মুক্তির যুদ্ধ, সেখানেই কমরেড লেনিন। লেখাটির মাধ্যমে সুকান্তের কবিতাটি কি সমগ্র মানব জাতির  সম্পদ হয়ে ওঠেননি? কবি সুকান্ত নিজের আত্ম পরিচয় ভুলে গিয়ে ভাবতে থাকেন— “বিপ্লব স্পন্দিত বুকে মনে হয় আমিই লেনিন।”

দুর্ভিক্ষের সময় চট্টগ্রামের অবস্থা কেমন? যদিও ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তশব্দ চট্টগ্রামের বাতাসে ভেসে বেড়ায়, তবুও চট্টগ্রামের বীরত্বের ইতিহাস ভুলে যাননি কবি সুকান্ত। বিক্ষত বিধ্বস্ত চট্টগ্রামের নিঃশব্দ সহিষ্ণুতা কবির কাছে ঝড়ের পূর্বাভাসের মতো মনে হয়েছে। অরণ্যের স্বপ্ন চেখে নিয়ে একদিন ক্ষুধিত শ্বাপদের মতো জেগে উঠবে চট্টগ্রাম এবং নিপীড়কের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হবে, সে দৃঢ় আস্থাই ব্যক্ত করেন কবি। আরোও অনুধাবনের বিষয় যে চট্টগ্রামের ঘটনাকে পৃথিবীর সংগ্রামী ঘটনার সাথে আলাদা করে দেখেননি তিনি এবং নির্দি¦ধায় চট্টগ্রামকে উদ্দেশ্য করে বলেন— “তুমি চাও শোণিতের স্বাদ/ যে স্বাদ জেনেছে স্তালিনগ্রাদ।”

দুর্ভিক্ষ এবং ক্ষুধায় আক্রান্ত মানুষের ধর্মঘটকে সুকান্ত বেআব্রু ক্ষুধার চূড়ন্ত প্রকাশ বলে চিত্রায়িত করেছেন। লোভী বিষাক্ত সরীসৃপের বিরুদ্ধে এই ধর্মঘটে মজুররাই চূড়ান্তভাবে বিজয়ী হবে এই ছিল সুকান্তের দৃঢ় বিশ্বাস। আর তাই ‘মজুরদের ঝড়’ কবিতায় ধর্মঘট ভাঙার চেষ্টায় রত দালালদের বিরুদ্ধে তিনি বিষোদ্গার করেন। আর এই মজুরদের কথা বলতে গিয়ে সুকান্তের চেতনা শুধু স্বাদেশিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে না। স্বদেশের মজুর ধর্মঘটও তাই পৃথিবীর সমস্ত মজুরশ্রেণির সংগ্রমের প্রতীক হয়ে দঁড়ায়। 

ঝড় আসছে সেই ঝড়
যে ঝড় পথিবীর বুক থেকে জঞ্জালদের
টেনে তুলবে
আর হুঁশিয়ার মজুর
সে ঝড় প্রায় মুখোমুখি।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় সোভিয়েত রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ফ্রন্সের সাথে হাত মিলিয়ে ফ্যাসিস্ট হিটলারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিল। সোভিয়েত  রাশিয়ার সমর্থনপুষ্ট মিত্রশক্তি সেদিন বিজয়ী হয়েছিল। সোভিয়েত রাশিয়ার সথে সে সময় মুক্তবিশ্ব কায়েমের সমর্থনকরীরা ফ্যাসিস্ট শক্তিকে পরাজিত করার জন্য জোট বেঁধেছিল। কিন্তু সে যুদ্ধের সমাপনই যে সংগ্রামী মানুয়ের শেষ যুদ্ধ নয়, তা অনুধাবন করেই সুকান্ত তঁর কবিতায় দিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হওয়ার সময়টাকে শুধুমাত্র দিন বদলের ক্রান্তিকাল বলে উল্লেখ করেছেন— “পৃথিবীতে যুদ্ধ শেষ বন্ধু সৈনিকের রক্ত ঢালা/ ভেবেছ তোমার জয়, তোমার প্রাপ্য এ জয়মালা/ জানো না এখানে যুদ্ধ শুধু দিন বদলের পালা।”

গভীরভাবে সচেতন একজন মানুষের পক্ষেই কেবল এমন অনুধাবন সম্ভব। ফ্যাসিস্ট শক্তির পরজয়ই যে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির চূড়ান্ত পরাজয় নয়, এবং সেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে পদানত করার জন্য অবিরাম সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছিলেন কিশোর বয়সেই। আর সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উত্থান এবং তাদের হিটলারের মতোই বা তার চেয়েও জঘন্য ফ্যাসিবাদী তৎপরতা আমাদের আরো দীর্ঘ যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। 

প্রিয়তমাকে ঘরে ফেলে রেখে মুুক্তিপাগল কবি ছুটে গিয়েছেন পৃথিবীর দিকে দিকে। যেখানেই মুক্তির সংগ্রাম, সেখানেই সুকান্ত। ‘প্রিয়তমাসু’ কবিতা তারই উজ্জ্বর উদাহরণ— “ধূসর তিউনিসয়িা থেকে স্নিগ্ধ ইতালি/ স্নিগ্ধ ইতালি থেকে ছুটে গেছে বিপ্লবী ফ্রান্সে/ নক্ষত্র নিয়স্ত্রিত নিয়তির মতো/ দুর্নিবার অপরাহত রাইফেলর হাতে/ ফ্রান্স থেকে প্রতিবশী বার্মাতেও।”

‘রোম: ১৯৪৩’ কবিতায় সুকান্ত সোভিয়েত বিপ্লবের তাৎপর্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। ১৯১৭ সালের পরে পৃথিবীর সংগ্রমী জনগণের জন্য সচেয়ে বড় সংবদ ছিল সোভিয়েত বিপ্লব। আত্মগর্ব এবং অহংকারে সেদিন কুণ্ঠাহীনভাবে উঠে দাঁড়িয়েছিল পৃথিবীর সংগ্রামী মানুষ। পৃথিবীর সমস্ত ন্যায় সংগ্রাম এবং বিপ্লবী মানুষকে সোভিয়েত সমর্থন দেবে, এবং সোভিয়েতকে পাশে পেয়ে তারা দিনে দিনে দুঃসাহসী হয়ে উঠবে এ আকাঙ্ক্ষার সেদিন কোনো তুলনা ছিল না— “এদিকে ত্বরিত সূর্য রোমের আকাশে/ যদিও কুয়াশা ঢাকা আকাশের নীল/ তবুও বিপ্লবী জানে, সোভিয়েত পাশে।”      

শত সহস্র শ্রমিকের হাতে গড়া বিলাসী প্রাসাদ ভেঙে দেয়ার আহ্বানের মাধ্যমে ‘ভগ্নস্তূপে ভবিষ্যত মুক্তির প্রচার’-এর সন্ধান দিয়েছিলেন সুকান্ত। সারা পৃথিবীর লুণ্ঠনকারীরা একটি দল। আর সারা পৃথিবীর লুণ্ঠিত নিপীড়িত মানুষরা আর একটি দল। দেশ-কালের উর্ধে আন্তর্জাতিক চেতনার এর চেয়ে সহজ প্রকাশ আর কী হতে পারে!  ‘হদিস’  কবিতায় সুকান্তের সে চেহারাকে অত্যন্ত সহজে চিনে নেয়া যায়— “এখন যুদ্ধ শুরু সারা বিশ্বজুড়ে/ জগতের যত লুণ্ঠনকারী আর মজুরে/ চঞ্চল দিন ঘোড়ার খুরে।”

‘পৃথিবীর দিকে তাকাও’ কবিতায় সোভিয়েত রাশিয়র বিপ্লব যে সমগ্র পৃথিবীর বিপ্লবকামী মানুষের জয়ের প্রতীক, সোভিয়েতের জয় যে তারা নিজের জয় মনে করেন আর এর মধ্যে যে জড়িত রয়েছে বিপ্লবী আান্তর্জাতিক চেতনা, কবিতাটি পড়া মাত্রই তা সকলের মনই উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। 

রাশিয়াই শুধু রাশিয়া মহান দেশ
যেখানে হয়েছে গোলামীর দিন শেষ,
রাশিয়া যেখানে মজুরের আজ জয়।
লেনিন গড়িছে রাশিয়া! কি বিস্ময়!
রশিয়া যেখানে ন্যায়ের রাজ্য স্থায়ী
নিষ্ঠুর ‘জার’ সেই দেশে ধরাশায়ী,
সোভিয়েত— ‘তারা’ যেখানে দিচ্ছে আলো
প্রিয়তম সেই মজুরের দেশ ভাল।

ছোটদের জন্য লেখা ‘মিঠেকড়া’ গ্রন্থটিতে সুকান্তের এ কবিতাটি সংকলিত। শিশুদেরকেও সাম্যবাদী চিন্তা এবং শিক্ষায় দীক্ষিত করে তোলার জন্য সুকান্ত গভীর মমতায় নিপীড়িত মানুষের চিত্র এঁকেছেন এবং তাদের মুক্তির পথ প্রদর্শন করার চেষ্টা করেছেন। একেকটি রসঘন গল্প বলারর ছলে শিশুদের ন্যায়-অন্যায়, ধনীর লুণ্ঠন এবং দরিদ্র ও মজুরদের সংগ্রাম সম্বন্ধে শিক্ষাদানের জন্য এ ধরনের কবিতা লেখার অন্য উদাহরণ বাংলা সাহিত্যে প্রায় অনুপস্থিত। একটি কথা অত্যন্ত স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন যে, শিশুদের সাম্যবাদী চেতনায় দিক্ষিত করার জন্য ‘মিঠেকড়া’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো একেবারেই ব্যতিক্রম। 

‘মার্শাল তিতোর প্রতি’ কবিতাটিতেও সুকান্তের আন্তর্জাতিক বিপ্লবী মানসিকতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মার্শাল তিতোকে সুকান্ত লেনিনের দূরবর্তী কোনো সত্তা ভাবতে পারেননি। তাই তিতোর সেনাবাহিনীর অগ্রযাত্রার সাথে সুকান্তও এক হেেয় যান। 

তোমর সেনানী পথে-প্রান্তরে দোসর খোঁজে
কোথায় কে আছে মুুক্তিকামী?
ক্ষিপ্ত করেছে তোমার যে ডাক আমাকেও যে
তাইতো তোমার পিছনে আমি।

সামগ্রিকভাবে সুকান্তর কবিতায় আন্তর্জাতিক চিন্তাচেতনার যে লক্ষণ আমরা খুঁজে পাই, তা বাংলা কবিতার অঙ্গনে শুধু নতুন সৃষ্টির প্রয়াস বলে থেমে যাওয়াটা একটা অসঙ্গত ব্যাপার; সুকান্ত সেই কবি যে বার বার খ্যাতিমান হওয়াকে অপ্রয়োজনীয় মনে করেছেন এবং কবিতা লেখার সাথে সাথে সাধারণ মানুষের কাতারে হারিয়ে গেছেন। মাটির কাছাকাছি যাওয়ার টান নয়, বরং তিনি ছিলেন মাটির কবি। পৃথিবীর সাহিত্যের ইতিহাসেও এমন দৃষ্টান্ত বিরল। যে কবি সত্তা কার্য ও কলমে অভিন্ন ছিলেন, এমন দৃষ্টান্ত অ. গ্যাঁ. পতিয়ের মতো সর্বহারার কবিদের মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যায়। সারা পৃথিবীর বিপ্লবী চিন্তাচেতনার প্রতি তাঁর দৃষ্টি ছিল সজাগ এবং এক মুক্ত বিশ্বের কথা যে বয়সে তিনি ধারণ করেছিলেন—  যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, কাল ও সীমার উর্ধে সব মানুষই অভিন্ন এবং সকলেই সকলের জন্য— বাংল সাহিত্যের জগতে এ ধরনের মনন ও মানসিকথার উত্থন বিস্ময়কর বৈকি! 

নিষ্কলুষ মুগ্ধ চিত্ত নিয়ে সুকান্তর কবিতা  অনুধাবনের  চেষ্টা না করলে পণ্ডিতের কাছে আমার এ বক্তব্য অতিকথন মনে হতে পারে। কিন্তু অস্বীকার করা তো যাবে না যে, বাংলা কবিতায় সুকান্ত অতি অল্প বয়সেই এক নতুন মাত্রা সৃষ্টি ও যোগ  করতে সক্ষম হয়েছিলেন। কবিতার  নান্দনিকতার প্রয়োজন পূরণ করেও তাঁর উচ্চারণ ক্ষীণ  ছিল না। বরং বলা যায় যে সুকান্তই ছিলেন বাংলা কবিতার গণসচেতন সবচেয়ে অভ্রান্ত উচ্চারণ।      

*** 



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত