সংবাদ

‘স্কুল ঘর তো নদীত চলি গেইল, হামরা ক্লাস করিম কই’



‘স্কুল ঘর তো নদীত চলি গেইল, হামরা ক্লাস করিম কই’
তিস্তার পেটে বিলীন হওয়ার আগে ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ছবি: প্রতিনিধি

“ইস্কুল ঘরডা তো নদীত চলি গেইল, আমরা এ্যাকন কনে (কোথায়) ক্লাস করিম? কতো দিন থাকি ইস্কুল ঘরডা বাচাবার জন্যি স্যারগুলা কতো জাগাত দৌড়াদৌড়ি করল। এর আগে পানি সম্পদ মন্ত্রী, ডিসি, ইউএনও আসি ঘুরি গেইল, তাও তো ইস্কুলের ঘর রক্ষা হইল না। কতো দিনে যে এই ইস্কুল ঘরডা আবার উঠবে, তার পর ক্লাস শুরু হইবে। আমরা এ্যাকন কি করমো?”

তিস্তার ভাঙনে চোখের সামনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার দৃশ্য অবাক বিস্ময়ে দেখতে দেখতে এমন কথা বলে শিক্ষার্থী ফুলমতি, সাকিলা, বিলকিছ, ছকিনা ও সাগর।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে হঠাৎ তিস্তার তীব্র ভাঙন দেখা দেয়। এতে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের লালচামার গ্রামের ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি মুহূর্তেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। স্কুলে ক্লাস করতে আসা শিশু শিক্ষার্থীরা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। এরপর হতাশ হয়ে ফিরে যায়।

স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য রাজা মিয়া জানান, গত ৮ আগস্ট পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ লালচামার গ্রামের তিস্তার ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। সে সময় লালচামার বাজারের পথসভার বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন আর কোনো প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার, রাস্তাঘাট নদীগর্ভে বিলীন হতে দেয়া হবে না। স্থানীয়ভাবে সমাধান করা হবে।তবে মন্ত্রীর সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের আগেই তিস্তার পেটে চলে গেল স্কুলটি। 

রাজা মিয়া বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ প্রশাসনের আন্তরিকতার অভাবে স্কুলটি নদীগর্ভে চলে গেল। এলাকার ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার দ্রুত ব্যবস্থা করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সু-দৃষ্টি কামনা করেছেন এলাকাবাসী।’

স্কুলটির প্রধান শিক্ষক মো. সাইফুল ইসলাম সাদা বলেন,  ভোরে ভাঙনের খবর পেয়ে তিনি অন্য সহকারী শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে স্কুলে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও কিছু আসবাসপত্র সরিয়ে নেন। সেই সঙ্গে টিনশেড ঘরের টিন খোলার চেষ্টা করেন। এরই মধ্যে একটি ঘর নদীতে চলে যায়। নিমিষের মধ্যে ওয়াশ ব্লকসহ অন্য ঘরটিও নদীগর্ভে চলে যায়।

কাপাশিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য সচিব আব্দুর রহিম সরকার বলেন, ‘আমরা জিও ব্যাগ চাই না। আমরা স্থায়ীভাবে নদী শাসন চাই। তা না হলে এই এলাকা রক্ষা করা সম্ভব হবে না।’

আব্দুর রহিম সরকার আরো বলেন, ‘আমার বাব-দাদার ভিটা-মাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছি। নদী ভাঙার ব্যথা আমরাই জানি। জায়গা কিনে অন্য স্থানে বসবাস করে আসছি।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘খবর পেয়ে সহকারী শিক্ষা অফিসার মুকুল চন্দ্র বর্মনসহ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে শিক্ষক ও এলাকাবাসীর সহায়তায় স্কুলের কিছু আসবাবপত্র সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হয়। এলাকার শিক্ষার পরিবেশ ফিরে আনার জন্য অতিদ্রুত শিক্ষা অধিদপ্তর, উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

তিস্তার ভাঙনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রক্ষায় ব্যর্থ হয়ে গ্রামবাসী অসহায়। ছবি: প্রতিনিধি

উপজেলা নিবার্হী অফিসার ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, ‘সকালে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার বিষয়টি তাকে অবগত করেছেন। তিনি শিক্ষা অফিসার ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এলাকার ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার পরিবেশ ফিরে আনার দ্রুত ব্যবস্থা করা হবে।’

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিবার্হী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম জানান তিনি লালচামার গ্রামের ভোরের পাখি স্কুলটির বিষয়ে তিনি অবগত। তিনি বলেন, ‘এখানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু করার নাই। নদীভাঙন দেখা দিলে জিও টিউব, জিও ব্যাগ ফেলা এবং সরকারের ওপর মহলে তথ্য প্রদান ছাড়া আর কোনো কাজ নেই তাদের। নদী খনন, ড্রেজিং, শাসন এবং নদীর গতিপথ পরিবর্তন করা ছাড়া তিস্তার ভাঙন রোধ সম্ভাব নয়।’


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬


‘স্কুল ঘর তো নদীত চলি গেইল, হামরা ক্লাস করিম কই’

প্রকাশের তারিখ : ১৮ আগস্ট ২০২৬

featured Image

“ইস্কুল ঘরডা তো নদীত চলি গেইল, আমরা এ্যাকন কনে (কোথায়) ক্লাস করিম? কতো দিন থাকি ইস্কুল ঘরডা বাচাবার জন্যি স্যারগুলা কতো জাগাত দৌড়াদৌড়ি করল। এর আগে পানি সম্পদ মন্ত্রী, ডিসি, ইউএনও আসি ঘুরি গেইল, তাও তো ইস্কুলের ঘর রক্ষা হইল না। কতো দিনে যে এই ইস্কুল ঘরডা আবার উঠবে, তার পর ক্লাস শুরু হইবে। আমরা এ্যাকন কি করমো?”

তিস্তার ভাঙনে চোখের সামনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার দৃশ্য অবাক বিস্ময়ে দেখতে দেখতে এমন কথা বলে শিক্ষার্থী ফুলমতি, সাকিলা, বিলকিছ, ছকিনা ও সাগর।

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকাল ১০টার দিকে হঠাৎ তিস্তার তীব্র ভাঙন দেখা দেয়। এতে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের লালচামার গ্রামের ভোরের পাখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি মুহূর্তেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। স্কুলে ক্লাস করতে আসা শিশু শিক্ষার্থীরা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। এরপর হতাশ হয়ে ফিরে যায়।

স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য রাজা মিয়া জানান, গত ৮ আগস্ট পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ লালচামার গ্রামের তিস্তার ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। সে সময় লালচামার বাজারের পথসভার বক্তব্যে তিনি বলেছিলেন আর কোনো প্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার, রাস্তাঘাট নদীগর্ভে বিলীন হতে দেয়া হবে না। স্থানীয়ভাবে সমাধান করা হবে।তবে মন্ত্রীর সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নের আগেই তিস্তার পেটে চলে গেল স্কুলটি। 

রাজা মিয়া বলেন, ‘পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ প্রশাসনের আন্তরিকতার অভাবে স্কুলটি নদীগর্ভে চলে গেল। এলাকার ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার দ্রুত ব্যবস্থা করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সু-দৃষ্টি কামনা করেছেন এলাকাবাসী।’

স্কুলটির প্রধান শিক্ষক মো. সাইফুল ইসলাম সাদা বলেন,  ভোরে ভাঙনের খবর পেয়ে তিনি অন্য সহকারী শিক্ষকদের সঙ্গে নিয়ে স্কুলে গিয়ে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও কিছু আসবাসপত্র সরিয়ে নেন। সেই সঙ্গে টিনশেড ঘরের টিন খোলার চেষ্টা করেন। এরই মধ্যে একটি ঘর নদীতে চলে যায়। নিমিষের মধ্যে ওয়াশ ব্লকসহ অন্য ঘরটিও নদীগর্ভে চলে যায়।

কাপাশিয়া ইউনিয়ন বিএনপির সদস্য সচিব আব্দুর রহিম সরকার বলেন, ‘আমরা জিও ব্যাগ চাই না। আমরা স্থায়ীভাবে নদী শাসন চাই। তা না হলে এই এলাকা রক্ষা করা সম্ভব হবে না।’

আব্দুর রহিম সরকার আরো বলেন, ‘আমার বাব-দাদার ভিটা-মাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছি। নদী ভাঙার ব্যথা আমরাই জানি। জায়গা কিনে অন্য স্থানে বসবাস করে আসছি।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার নূর মোহাম্মদ বলেন, ‘খবর পেয়ে সহকারী শিক্ষা অফিসার মুকুল চন্দ্র বর্মনসহ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে শিক্ষক ও এলাকাবাসীর সহায়তায় স্কুলের কিছু আসবাবপত্র সরিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হয়। এলাকার শিক্ষার পরিবেশ ফিরে আনার জন্য অতিদ্রুত শিক্ষা অধিদপ্তর, উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলোচনা সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

তিস্তার ভাঙনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রক্ষায় ব্যর্থ হয়ে গ্রামবাসী অসহায়। ছবি: প্রতিনিধি

উপজেলা নিবার্হী অফিসার ঈফফাত জাহান তুলি বলেন, ‘সকালে ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার বিষয়টি তাকে অবগত করেছেন। তিনি শিক্ষা অফিসার ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। এলাকার ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার পরিবেশ ফিরে আনার দ্রুত ব্যবস্থা করা হবে।’

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিবার্হী প্রকৌশলী মো. শরিফুল ইসলাম জানান তিনি লালচামার গ্রামের ভোরের পাখি স্কুলটির বিষয়ে তিনি অবগত। তিনি বলেন, ‘এখানে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু করার নাই। নদীভাঙন দেখা দিলে জিও টিউব, জিও ব্যাগ ফেলা এবং সরকারের ওপর মহলে তথ্য প্রদান ছাড়া আর কোনো কাজ নেই তাদের। নদী খনন, ড্রেজিং, শাসন এবং নদীর গতিপথ পরিবর্তন করা ছাড়া তিস্তার ভাঙন রোধ সম্ভাব নয়।’



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত