সংবাদ

আগস্টে এলএনজি শূন্য: জ্বালানি সংকটে নতুন উদ্বেগ


মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, চট্টগ্রাম
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৯:১১ পিএম

আগস্টে এলএনজি শূন্য: জ্বালানি সংকটে নতুন উদ্বেগ
ছবি : সংগৃহীত

চট্টগ্রামসহ সারা দেশে গ্যাস সংকট কাটার যে আশা তৈরি হয়েছিল, তা আবার অনিশ্চয়তায় পড়েছে। আগস্টে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে আনার কথা থাকা চারটি এলএনজি কার্গোর একটিও এখনো দেশে না পৌঁছানোয় চট্টগ্রামসহ দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে একটি কার্গোর জন্য প্রস্তাবিত জাহাজ যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকায় সেটিও গ্রহণ করেনি সরকার। ফলে চট্টগ্রামসহ দেশের শিল্প, বিদ্যুৎ, সিএনজি ও আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাস সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের দুর্ঘটনার পর সম্প্রতি মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালগুলো আংশিক সচল হওয়ার পর সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও নতুন এলএনজি কার্গো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

আগস্টে মোট নয়টি এলএনজি কার্গো সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল। এর মধ্যে দরপত্রের মাধ্যমে তিনটি, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে একটি, স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে একটি এবং সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে চারটি কার্গো সংগ্রহের কথা। তবে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে কেনা চারটি কার্গোর সরবরাহ সময় নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে আরও পাঁচটি এলএনজি কার্গো কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগস্টের জন্য তিনটি ও সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের জন্য দুটি কার্গো কিনতে দরপত্র আহ্বান করা হলেও পাঁচটির মধ্যে মাত্র দুটির জন্য দর পাওয়া গেছে। উভয় ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম। দর প্রতি এমএমবিটিইউ প্রায় ২২ ডলার। কিন্তু অন্য তিনটি কার্গোর জন্য কোনো কোম্পানি দর দেয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন,এ তিনটি কার্গোর জন্য পুনরায় দরপত্র আহ্বান করতে হতে পারে।

এদিকে, গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে চট্টগ্রামের শিল্প উৎপাদন ও বন্দরনির্ভর অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। ইতোমধ্যে সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, আনোয়ারা, কালুরঘাট ও ফৌজদারহাটসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি ও পরিবহন সংকটও নগরবাসীর ভোগান্তি বাড়াচ্ছে।

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) আওতাধীন এলাকায় দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৫০ থেকে ৪৫০মিলিয়ন ঘনফুট। এর পুরোটারই যোগান নির্ভরশীল আমদানিকৃত এলএনজির ওপর। কোনো কারণে আমদানি ব্যাহত হলে চট্টগ্রামের গ্যাস সেক্টরে হাহাকার শুরু হয়। সাম্প্রতিক সময়ে সেই অবস্থা চলছে।

মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের সংকটের মধ্যে চট্টগ্রামে সরবরাহ ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে গেছে। ফলে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নগরীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি এবং অনেক এলাকায় বাসাবাড়িতে দিনের বেশির ভাগ সময় চুলা জ্বলছে না। এতে  গ্রাহকরা ভোগান্তিতে পড়েছে।

গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকান্ডের পর পরিস্থিতির অবনতি হয়। ওই টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়। প্রায় দুই সপ্তাহ পর ৬ আগস্ট টার্মিনালটি আংশিক চালু হলে শুরুতে সীমিত পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা হয়।

টার্মিনালটি আংশিক চালু হলেও সরবরাহ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। এরপর সামিটের টার্মিনাল থেকেও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে পড়ে। সেটি চালু হওয়ার পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। কিন্তু দুয়েকদিনের মধ্যে সংকট আবার প্রকট হয়ে ওঠে।

মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনালের সম্মিলিত রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে কোনো একটি টার্মিনালে কারিগরি ক্রুটি, সমুদ্র উত্তাল হওয়া কিংবা নতুন এলএনজি কার্গো সময়মতো না পৌঁছালে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহে।

চলতি আগস্টে নয়টি এলএনজি কার্গো সরবরাহের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি দরপত্রের মাধ্যমে, একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়, একটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে এবং চারটি সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে সংগ্রহের কথা। দরপত্রের তিনটি কার্গোর দুটি ইতিমধ্যে সরবরাহ করেছে। অন্যটি ২০ আগস্ট আসার কথা। কাতারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় একটি কার্গো পাওয়া গেলেও সৌদি আরামকোর সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির একটি কার্গো থেকে টার্মিনাল কর্তৃপক্ষ এলএনজি নিতে রাজি হয়নি।

সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে কেনা চার কার্গো নিয়ে। আগস্টের শুরুতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ব্ল্যাককিউব ইন্টারন্যাশনাল, ওমানভিত্তিক ম্যাঙওয়েল ইন্টারন্যাশনাল এসপিসি এবং হংকংভিত্তিক ঝেনইউ শিপিং কোম্পানির কাছ থেকে এসব কার্গো কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ব্ল্যাককিউব ও ঝেনইউ বাজারদরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম দরে এলএনজি সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম যেখানে প্রতি এমএমবিটিইউ প্রায় ২২ ডলার, সেখানে ব্ল্যাককিউবের দর ছিল ১৫ দশমিক ৫০ ডলার এবং ঝেনইউর ১৪ দশমিক ৯৫ ডলার।

কিন্তু কম দামের এই সুবিধা এখন উল্টো সরবরাহ–অনিশ্চয়তায় পরিণত হয়েছে। ঝেনইউর দুটি কার্গোর একটি সরবরাহের জন্য যে জাহাজের তথ্য দেওয়া হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে সেটি যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে। জাহাজটি গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক কোম্পানি ও জাহাজের সঙ্গে বাংলাদেশের লেনদেনে জটিলতা তৈরি হতে পারে–এই আশঙ্কায় সরকার সেটি গ্রহণ করেনি। অন্য কার্গোগুলোর সরবরাহের সময়ও এখনো নিশ্চিত নয়। সরবরাহকারীরা সময় বাড়িয়ে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নেওয়ার অনুমতি চাইতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এলএনজি সরবরাহের এই অনিশ্চয়তা চট্টগ্রামের ওপর চাপ আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আগস্টের শুরুতে চট্টগ্রামের দৈনিক চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে গেলে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকেরা মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়েন। এর প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামের শিল্প উৎপাদনেও। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানায় নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। 

বিশেষ করে সীতাকুন্ড, মীরসরাই, আনোয়ারা, কালুরঘাট, ফৌজদারহাট ও নগরের শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপের ওঠানামা উৎপাদন পরিকল্পনাকে অনিশ্চিত করে তুলছে। গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহেও চাপ তৈরি হচ্ছে। দেশজুড়ে গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় আগস্টের শুরুতে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একটি বড় অংশ জ্বালানি সংকটে ছিল।

চট্টগ্রামের পরিবহন খাতেও গ্যাস সংকট প্রভাব ফেলেছে। গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে নগরের সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়, অনেক স্টেশন আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ থাকে। এর ফলে সিএনজিচালিত টেঙি ও অন্যান্য যানবাহনের চলাচল কমে গিয়ে নগরের গণপরিবহনেও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। সিএনজি টেঙির ভাড়া অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়ে দেওয়ায় নগরবাসীকে বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে।

চট্টগ্রাম চেম্বার এবং মেট্রোপলিটন চেম্বার ইতোপূর্বে গ্যাস–সংকট দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছে। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, চট্টগ্রাম দেশের প্রধান শিল্প ও বন্দরনির্ভর অর্থনৈতিক অঞ্চল হওয়ায় এখানে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি দেশের জাতীয় উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এটা প্রভাব ফেলবে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) দাপ্তরিক কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান বলেন, ‘দীর্ঘ ১৫ দিনের সংকটের পর চলতি সপ্তাহের শুরুতে একদিন ভালোমতো গ্যাস পাওয়া গেছে। দ্বিতীয় দিন থেকেই গ্যাস কমে গেল, আর আজকে নেই বললেই চলে। বিটিএমএর ১৮০০ সদস্য কারখানাতেই এই পরিস্থিতি।’

গ্যাস

নিট পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘হুট করে গ্যাসের সংকট দেখা দিলে দ্বিগুণ ক্ষতি হয়। অন্তত আগে থেকে জানিয়ে রাখলে সেভাবে অর্ডার নেওয়া ও উৎপাদন পরিকল্পনা সাজানো যায়।’ 

পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএলের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মার্কিন মালিকানার এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে দেওয়ার মতো কার্গো তাদের হাতে নেই। আপাতত দেশি প্রতিষ্ঠান সামিটের টার্মিনাল থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে ক্রয়াদেশ পাওয়া সরবরাহকারীরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি (ডকুমেন্টেশন) ও আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে পারেনি। তাদের জাহাজ না আসায় ইতিমধ্যে দরপত্র আহ্বান করে নতুন এলএনজি জাহাজ আনা হচ্ছে। সরবরাহ ধরে রাখা যাবে, কোনো সমস্যা হবে না।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬


আগস্টে এলএনজি শূন্য: জ্বালানি সংকটে নতুন উদ্বেগ

প্রকাশের তারিখ : ১৯ আগস্ট ২০২৬

featured Image

চট্টগ্রামসহ সারা দেশে গ্যাস সংকট কাটার যে আশা তৈরি হয়েছিল, তা আবার অনিশ্চয়তায় পড়েছে। আগস্টে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে আনার কথা থাকা চারটি এলএনজি কার্গোর একটিও এখনো দেশে না পৌঁছানোয় চট্টগ্রামসহ দেশের গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে একটি কার্গোর জন্য প্রস্তাবিত জাহাজ যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকায় সেটিও গ্রহণ করেনি সরকার। ফলে চট্টগ্রামসহ দেশের শিল্প, বিদ্যুৎ, সিএনজি ও আবাসিক গ্রাহকদের গ্যাস সরবরাহ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের দুর্ঘটনার পর সম্প্রতি মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালগুলো আংশিক সচল হওয়ার পর সরবরাহ কিছুটা বাড়লেও নতুন এলএনজি কার্গো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

আগস্টে মোট নয়টি এলএনজি কার্গো সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল। এর মধ্যে দরপত্রের মাধ্যমে তিনটি, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে একটি, স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে একটি এবং সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে চারটি কার্গো সংগ্রহের কথা। তবে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে কেনা চারটি কার্গোর সরবরাহ সময় নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে জরুরি ভিত্তিতে আরও পাঁচটি এলএনজি কার্গো কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগস্টের জন্য তিনটি ও সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের জন্য দুটি কার্গো কিনতে দরপত্র আহ্বান করা হলেও পাঁচটির মধ্যে মাত্র দুটির জন্য দর পাওয়া গেছে। উভয় ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন দরদাতা ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম। দর প্রতি এমএমবিটিইউ প্রায় ২২ ডলার। কিন্তু অন্য তিনটি কার্গোর জন্য কোনো কোম্পানি দর দেয়নি। সংশ্লিষ্টরা বলছেন,এ তিনটি কার্গোর জন্য পুনরায় দরপত্র আহ্বান করতে হতে পারে।

এদিকে, গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হলে চট্টগ্রামের শিল্প উৎপাদন ও বন্দরনির্ভর অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। ইতোমধ্যে সীতাকুণ্ড, মিরসরাই, আনোয়ারা, কালুরঘাট ও ফৌজদারহাটসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি ও পরিবহন সংকটও নগরবাসীর ভোগান্তি বাড়াচ্ছে।

কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (কেজিডিসিএল) আওতাধীন এলাকায় দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৫০ থেকে ৪৫০মিলিয়ন ঘনফুট। এর পুরোটারই যোগান নির্ভরশীল আমদানিকৃত এলএনজির ওপর। কোনো কারণে আমদানি ব্যাহত হলে চট্টগ্রামের গ্যাস সেক্টরে হাহাকার শুরু হয়। সাম্প্রতিক সময়ে সেই অবস্থা চলছে।

মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালের সংকটের মধ্যে চট্টগ্রামে সরবরাহ ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে গেছে। ফলে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নগরীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি এবং অনেক এলাকায় বাসাবাড়িতে দিনের বেশির ভাগ সময় চুলা জ্বলছে না। এতে  গ্রাহকরা ভোগান্তিতে পড়েছে।

গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকান্ডের পর পরিস্থিতির অবনতি হয়। ওই টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের সরবরাহ কমে যায়। প্রায় দুই সপ্তাহ পর ৬ আগস্ট টার্মিনালটি আংশিক চালু হলে শুরুতে সীমিত পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা হয়।

টার্মিনালটি আংশিক চালু হলেও সরবরাহ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। এরপর সামিটের টার্মিনাল থেকেও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে পড়ে। সেটি চালু হওয়ার পর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। কিন্তু দুয়েকদিনের মধ্যে সংকট আবার প্রকট হয়ে ওঠে।

মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনালের সম্মিলিত রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে কোনো একটি টার্মিনালে কারিগরি ক্রুটি, সমুদ্র উত্তাল হওয়া কিংবা নতুন এলএনজি কার্গো সময়মতো না পৌঁছালে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে চট্টগ্রামের গ্যাস সরবরাহে।

চলতি আগস্টে নয়টি এলএনজি কার্গো সরবরাহের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি দরপত্রের মাধ্যমে, একটি দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায়, একটি স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে এবং চারটি সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে সংগ্রহের কথা। দরপত্রের তিনটি কার্গোর দুটি ইতিমধ্যে সরবরাহ করেছে। অন্যটি ২০ আগস্ট আসার কথা। কাতারের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় একটি কার্গো পাওয়া গেলেও সৌদি আরামকোর সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির একটি কার্গো থেকে টার্মিনাল কর্তৃপক্ষ এলএনজি নিতে রাজি হয়নি।

সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে কেনা চার কার্গো নিয়ে। আগস্টের শুরুতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক ব্ল্যাককিউব ইন্টারন্যাশনাল, ওমানভিত্তিক ম্যাঙওয়েল ইন্টারন্যাশনাল এসপিসি এবং হংকংভিত্তিক ঝেনইউ শিপিং কোম্পানির কাছ থেকে এসব কার্গো কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ব্ল্যাককিউব ও ঝেনইউ বাজারদরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম দরে এলএনজি সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম যেখানে প্রতি এমএমবিটিইউ প্রায় ২২ ডলার, সেখানে ব্ল্যাককিউবের দর ছিল ১৫ দশমিক ৫০ ডলার এবং ঝেনইউর ১৪ দশমিক ৯৫ ডলার।

কিন্তু কম দামের এই সুবিধা এখন উল্টো সরবরাহ–অনিশ্চয়তায় পরিণত হয়েছে। ঝেনইউর দুটি কার্গোর একটি সরবরাহের জন্য যে জাহাজের তথ্য দেওয়া হয়েছিল, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে সেটি যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছে। জাহাজটি গ্রহণ করলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক কোম্পানি ও জাহাজের সঙ্গে বাংলাদেশের লেনদেনে জটিলতা তৈরি হতে পারে–এই আশঙ্কায় সরকার সেটি গ্রহণ করেনি। অন্য কার্গোগুলোর সরবরাহের সময়ও এখনো নিশ্চিত নয়। সরবরাহকারীরা সময় বাড়িয়ে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নেওয়ার অনুমতি চাইতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

এলএনজি সরবরাহের এই অনিশ্চয়তা চট্টগ্রামের ওপর চাপ আরো বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আগস্টের শুরুতে চট্টগ্রামের দৈনিক চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ প্রায় ১৫০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে গেলে শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকেরা মারাত্মক ভোগান্তিতে পড়েন। এর প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামের শিল্প উৎপাদনেও। গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় অনেক কারখানায় নির্ধারিত সময়ে উৎপাদন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। 

বিশেষ করে সীতাকুন্ড, মীরসরাই, আনোয়ারা, কালুরঘাট, ফৌজদারহাট ও নগরের শিল্পাঞ্চলগুলোতে গ্যাসের চাপের ওঠানামা উৎপাদন পরিকল্পনাকে অনিশ্চিত করে তুলছে। গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহেও চাপ তৈরি হচ্ছে। দেশজুড়ে গ্যাস সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় আগস্টের শুরুতে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একটি বড় অংশ জ্বালানি সংকটে ছিল।

চট্টগ্রামের পরিবহন খাতেও গ্যাস সংকট প্রভাব ফেলেছে। গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে নগরের সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়, অনেক স্টেশন আংশিক বা পুরোপুরি বন্ধ থাকে। এর ফলে সিএনজিচালিত টেঙি ও অন্যান্য যানবাহনের চলাচল কমে গিয়ে নগরের গণপরিবহনেও বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে। সিএনজি টেঙির ভাড়া অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়ে দেওয়ায় নগরবাসীকে বাড়তি চাপ সামলাতে হচ্ছে।

চট্টগ্রাম চেম্বার এবং মেট্রোপলিটন চেম্বার ইতোপূর্বে গ্যাস–সংকট দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছে। শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, চট্টগ্রাম দেশের প্রধান শিল্প ও বন্দরনির্ভর অর্থনৈতিক অঞ্চল হওয়ায় এখানে গ্যাস সরবরাহের ঘাটতি দেশের জাতীয় উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এটা প্রভাব ফেলবে।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) দাপ্তরিক কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান বলেন, ‘দীর্ঘ ১৫ দিনের সংকটের পর চলতি সপ্তাহের শুরুতে একদিন ভালোমতো গ্যাস পাওয়া গেছে। দ্বিতীয় দিন থেকেই গ্যাস কমে গেল, আর আজকে নেই বললেই চলে। বিটিএমএর ১৮০০ সদস্য কারখানাতেই এই পরিস্থিতি।’

গ্যাস

নিট পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, ‘হুট করে গ্যাসের সংকট দেখা দিলে দ্বিগুণ ক্ষতি হয়। অন্তত আগে থেকে জানিয়ে রাখলে সেভাবে অর্ডার নেওয়া ও উৎপাদন পরিকল্পনা সাজানো যায়।’ 

পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএলের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মার্কিন মালিকানার এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে দেওয়ার মতো কার্গো তাদের হাতে নেই। আপাতত দেশি প্রতিষ্ঠান সামিটের টার্মিনাল থেকে পূর্ণ সক্ষমতায় গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে ক্রয়াদেশ পাওয়া সরবরাহকারীরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি (ডকুমেন্টেশন) ও আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে পারেনি। তাদের জাহাজ না আসায় ইতিমধ্যে দরপত্র আহ্বান করে নতুন এলএনজি জাহাজ আনা হচ্ছে। সরবরাহ ধরে রাখা যাবে, কোনো সমস্যা হবে না।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত