সংবাদ

সংবাদ সংগ্রহের আড়ালে ভেঙে পড়ছেন সাংবাদিকরা


বিশাখা চৌধুরী
বিশাখা চৌধুরী
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৭:৫১ পিএম

সংবাদ সংগ্রহের আড়ালে ভেঙে পড়ছেন সাংবাদিকরা
ছবি: এআই

পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু সামনে আনল সাংবাদিকদের মানসিক স্বাস্থ্য ও পেশাগত নিরাপত্তার পুরোনো প্রশ্ন

সাংবাদিকরা প্রতিদিন অন্য মানুষের সংকট, মৃত্যু, দুর্নীতি, সহিংসতা, নিপীড়ন ও হতাশার খবর লেখেন। কিন্তু সাংবাদিকের নিজের ভেঙে পড়ার খবরটি কে লেখে?

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বরিশালে সিনিয়র সাংবাদিক ও দৈনিক সমকালের সাবেক ব্যুরো চিফ পুলক চ্যাটার্জির (৫৭) মরদেহ উদ্ধারের পর প্রশ্নটি আবার সামনে এসেছে। নগরীর প্যারারা রোডে সমকাল কার্যালয় থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।  প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যার ধারণার কথা জানানো হয়েছে।তবে তদন্ত ও ময়নাতদন্ত শেষ হওয়ার আগে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

পুলক চ্যাটার্জি ২০২৩ সাল পর্যন্ত সমকালের বরিশাল ব্যুরোপ্রধান ছিলেন। তার স্ত্রী নিলোৎপলা মুখার্জি বলেছেন, চাকরি হারানোর পর থেকে তিনি হতাশ ছিলেন। একই সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে কয়েকটি চিরকুট উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে। এসব তথ্যের পূর্ণ তাৎপর্য তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে।

কিন্তু একটি মানুষের মৃত্যুকে ঘিরে অনুমান করার চেয়ে বড় যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা হলো—সাংবাদিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের সংবাদমাধ্যমগুলো আসলে কতটা ভাবছে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যে এই প্রশ্নে আলোচনা, সমালোচনা ও তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়েছে। চাকরি হারানো, অনিশ্চিত আয়, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, রাজনৈতিক চাপ, মাঠের ঝুঁকি, সহিংসতা, রাতজাগা, পারিবারিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং প্রতিদিন অসংখ্য নেতিবাচক ঘটনার মুখোমুখি হওয়ার মানসিক অভিঘাত- সব মিলিয়ে সাংবাদিকতা কি ধীরে ধীরে সাংবাদিকদের জন্যই একটি অসুস্থ কর্মপরিবেশ তৈরি করছে?

গবেষণার তথ্য বলছে, প্রশ্নটি একেবারে অমূলক নয়। বাংলাদেশি সাংবাদিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বহুল আলোচিত একটি গবেষণা প্রকাশিত হয় ২০২১ সালে। গবেষণাটিতে ঢাকাভিত্তিক ১৯১ জন সাংবাদিককে নিয়ে জরিপ করা হয়েছিল। গবেষকেরা কর্মক্ষেত্রের চাপ, বিষণ্ণতার লক্ষণ, হতাশা এবং জীবন নিয়ে সন্তুষ্টির মতো বিভিন্ন সূচক ব্যবহার করেন।

গবেষণায় দেখা যায়, ৮২.২ শতাংশ সাংবাদিক উচ্চমাত্রার কর্ম-চাপের কথা জানিয়েছেন। ৭৯.১ শতাংশ জীবন নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন। আরও উদ্বেগজনক ছিল হতাশার সূচক—৯৯.৫ শতাংশ উত্তরদাতার স্কোর গবেষণায় ‘চরম হতাশা’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হয়েছিল। তবে বিষণ্ণতার ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন; অধিকাংশের ক্ষেত্রে তা ন্যূনতম থেকে মৃদু মাত্রায় ছিল।

দেশের মাঠসাংবাদিকদের ৭৯ শতাংশ জীবন নিয়ে অসন্তুষ্ট, তীব্র কর্মক্লান্তিতে ৩০ শতাংশ।

তবে এখানে একটি বিষয় খুব পরিষ্কার করা জরুরি। ৭৯ শতাংশ মানে এই নয় যে বাংলাদেশের ৭৯ শতাংশ সাংবাদিক এখন বিষণ্ণতায় ভুগছেন। সেটা ২০২১ সালের একটি নির্দিষ্ট গবেষণা, নির্দিষ্ট নমুনা এবং নির্দিষ্ট মানসিক-স্বাস্থ্য সূচকের ফল। ফলে ২০২৬ সালে এসে এটিকে বর্তমান জাতীয় হার হিসেবে ব্যবহার করা বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক হবে না।তবে সংখ্যাটি গুরুত্বপূর্ণ অন্য কারণে। এটি দেখায়, সাংবাদিকদের মানসিক সুস্থতা নিয়ে উদ্বেগ বাংলাদেশের সাংবাদিকতা অঙ্গনে নতুন কোনো সমস্যা নয়।

সাংবাদিকতার ভিত

বরং নতুন গবেষণা বলছে, সেই উদ্বেগের নানা দিক এখনও রয়ে গেছে। কারণ নতুন গবেষণায়ও স্বস্তির ছবি নেই। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি মিশ্র-পদ্ধতির গবেষণায় ২০২০ থেকে ২০২৫ সময়কালে বাংলাদেশি মাঠসাংবাদিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কাজ করা হয়েছে। এতে ১০০ জন প্রতিবেদকের জরিপ এবং ১৫টি গভীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। গবেষণাটি বিশেষভাবে কোভিড-১৯, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্যোগ ও দুর্ঘটনার মতো ট্রমাটিক ঘটনা কভার করার অভিজ্ঞতার দিকে নজর দেয়।

ফলাফল ছিল উদ্বেগজনক। গবেষণায় ৩০ শতাংশ সাংবাদিকের মধ্যে উচ্চমাত্রার তীব্র কর্মক্লান্তি পাওয়া যায়। ১৫ শতাংশ মাঝারি থেকে তীব্র বিষণ্ণতার মানদণ্ডে এবং ২০ শতাংশ উদ্বেগের মানদণ্ডে পড়েছেন। ১০ শতাংশ উত্তরদাতা সম্ভাব্য পিটিএসডির মানদণ্ড পূরণ করেছেন। পাশাপাশি প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সাংবাদিকের মধ্যে কোনো না কোনো ধরনের বিষণ্ণতাসংক্রান্ত উপসর্গ পাওয়া গেছে।

গবেষণায় ৭০ শতাংশ সাংবাদিক সহকর্মীদের সহায়তার কথা বলেছেন। ৪০ শতাংশ ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক চর্চার ওপর নির্ভর করেছেন। কিন্তু ৫৫ শতাংশ এড়িয়ে যাওয়ার মতো অস্বাস্থ্যকর মোকাবিলা-পদ্ধতি এবং ৩০ শতাংশ মাদক বা পদার্থ ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন। গবেষণাটি সংবাদমাধ্যমের প্রাতিষ্ঠানিক মানসিক-স্বাস্থ্য সহায়তার ঘাটতিকেও গুরুত্ব দিয়েছে।

অর্থাৎ সমস্যা শুধু সাংবাদিকের ব্যক্তিগত মানসিক শক্তির নয়। প্রশ্নটি কর্মপরিবেশেরও। আর সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় অদৃশ্য চাপ—অনিশ্চয়তা। সাংবাদিকতার পেশায় একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য আছে। সাংবাদিককে বলা হয় সত্যের অনুসন্ধান করতে, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে এবং মানুষের অধিকার রক্ষা করতে। কিন্তু নিজের চাকরি, বেতন, কর্মঘণ্টা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলার জায়গাটি অনেক সময় তার নিজের কর্মক্ষেত্রেই থাকে না।

কোভিড-১৯ পর্বে বাংলাদেশি সংবাদপত্রের সাংবাদিকদের নিয়ে করা আরেক গবেষণায় চাকরি ছাঁটাই, বেতন কমানো, পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব, জনবল সংকট এবং দীর্ঘ কর্মঘণ্টার সঙ্গে তীব্র কর্মক্লান্তির সম্পর্ক উঠে এসেছে। গবেষণাটিতে আটজন প্রতিবেদক ও চারজন কপি এডিটরের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল; অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই সাংবাদিকতা ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছিলেন।

কোভিড চলে গেছে। কিন্তু অনিশ্চয়তা যায়নি। বরং সংবাদমাধ্যমের ব্যবসায়িক মডেল বদলেছে, ডিজিটাল প্রতিযোগিতা বেড়েছে, বিজ্ঞাপনের বাজার বদলেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংবাদ পরিবেশনের কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে একই সাংবাদিককে রিপোর্টিং, ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, লাইভ, অনলাইন আপডেট—সবকিছুর দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। কাজের পরিমাণ বাড়ছে; কিন্তু মানুষের ধারণক্ষমতা বাড়ছে না।

ট্রমার পেশায় ব্যবস্থাপনা কোথায়

একজন ক্রাইম রিপোর্টার দিনের পর দিন হত্যাকাণ্ড দেখছেন। একজন আদালত প্রতিবেদক প্রতিদিন অপরাধ, ধর্ষণ, নির্যাতন ও বিচারপ্রার্থীদের কান্নার গল্প শুনছেন। একজন রাজনৈতিক প্রতিবেদক সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার, হুমকি ও উত্তেজনার মধ্যে কাজ করছেন। দুর্যোগ প্রতিবেদক বন্যা, লাশ, ধ্বংসস্তূপ ও মানুষের অসহায়ত্বের সামনে দাঁড়াচ্ছেন।

সাংবাদিককে পেশাগতভাবে এসব দৃশ্য থেকে নিজেকে আলাদা রাখতে হয়। কিন্তু মানুষ হিসেবে তার মস্তিষ্ক ও শরীর সবকিছুই গ্রহণ করে। বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণায় ট্রমা, হুমকি, সাংগঠনিক চাপ, সামাজিক সহায়তার ঘাটতি এবং নেতিবাচক মোকাবিলা-পদ্ধতির সঙ্গে পিটিএসডি, বিষণ্নতা ও অন্যান্য মানসিক সমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

সাংবাদিকতায় বাধা

বাংলাদেশের নতুন গবেষণাটিও সেই বৈশ্বিক চিত্রের সঙ্গে মিল দেখাচ্ছে। সমস্যা হলো—সাংবাদিককে সাধারণত শেখানো হয় কীভাবে ক্যামেরা ধরতে হয়, কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়, কীভাবে দ্রুত সংবাদ লিখতে হয়।

কিন্তু তাকে খুব কমই শেখানো হয়— নিজের মানসিক চাপ কীভাবে সামলাতে হয়? দীর্ঘ কর্মঘণ্টার ক্লান্তি কীভাবে দূর করা যায়? সাংবাদিকতার সঙ্গে রাতজাগা, অনিয়মিত শিফট এবং দীর্ঘ কর্মঘণ্টার সম্পর্ক পুরোনো। ডিজিটাল সাংবাদিকতার যুগে বিষয়টি আরও জটিল হয়েছে। সংবাদ এখন ২৪ ঘণ্টার। কিন্তু মানুষের শরীর ২৪ ঘণ্টার নিউজরুম নয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার যৌথ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টা বা তার বেশি কাজ করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ৩৫–৪০ ঘণ্টা কাজ করা ব্যক্তিদের তুলনায় স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় ৩৫ শতাংশ এবং ইস্কেমিক হৃদ্‌রোগে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি। গবেষণাটি ২০১৬ সালে দীর্ঘ কর্মঘণ্টার সঙ্গে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭ লাখ ৪৫ হাজার মৃত্যুর সম্পর্কও অনুমান করেছে।

এটি সাংবাদিকদের ওপর করা গবেষণা নয়। তাই এটিকে সাংবাদিকদের হৃদ্‌রোগের পরিসংখ্যান হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু সাংবাদিকদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অনিয়মিত জীবনযাপন এবং দীর্ঘস্থায়ী কর্ম-চাপের স্বাস্থ্যঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক প্রমাণ। অর্থাৎ ‘সাংবাদিকরা হার্টের রোগী’—এমন দাবি করার মতো প্রমাণ নেই; কিন্তু দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও দীর্ঘস্থায়ী চাপ যে হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, তার শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আছে। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।

পুলকের মৃত্যু কী ভাবতে বাধ্য করে

পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু সম্পর্কে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো কারণ নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। একজন মানুষের আত্মহত্যাকে একটি মাত্র কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করাও বিপজ্জনক সরলীকরণ। মানুষের মানসিক সংকট সাধারণত বহুস্তরীয়। চাকরি হারানো তার একটি কারণ হতে পারে, কিন্তু পারিবারিক, আর্থিক, সামাজিক, শারীরিক ও মানসিক নানা বিষয়ও একজন মানুষের জীবনে একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

তবু পুলকের ঘটনা একটি প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয় না। তা হলো, চাকরি হারানোর পর একজন সাংবাদিকের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তার প্রতিষ্ঠান, সহকর্মী বা পেশাজগতের কোনো কাঠামো আছে কি? একজন সাংবাদিক ২০-২৫ বছর একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর হঠাৎ চাকরি হারালে তার পেশাগত পরিচয়, আয়, সামাজিক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ—সবকিছুতে ধাক্কা লাগে।

অনেক সাংবাদিকের সঞ্চয় থাকে না। স্বাস্থ্যবিমা থাকে না। অবসর-পরবর্তী নিরাপত্তা থাকে না। মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার ব্যবস্থা থাকে না। অথচ আমরা ধরে নিই, সাংবাদিক মানেই শক্ত মানুষ। কারণ তিনি অন্যের কান্নার সামনে মাইক্রোফোন ধরতে পারেন। কিন্তু মাইক্রোফোন ধরতে পারা আর নিজের কষ্ট সামলাতে পারা এক জিনিস নয়।

সাংবাদিকতায় চাপে শেষ পরিণতি

তাহলে সংবাদমাধ্যমের করণীয় কী? প্রথম কাজ—মানসিক স্বাস্থ্যকে ‘ব্যক্তিগত দুর্বলতা’ হিসেবে দেখা বন্ধ করা। একজন সাংবাদিক যদি বলেন তিনি ঘুমাতে পারছেন না, বারবার কোনো দুর্ঘটনার দৃশ্য মনে পড়ছে, কাজে মন বসছে না, প্রচণ্ড উদ্বেগ হচ্ছে কিংবা সবকিছু অর্থহীন মনে হচ্ছে—তাকে ‘দুর্বল’, ‘অপেশাদার’ কিংবা ‘বেশি আবেগপ্রবণ’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।

দ্বিতীয়ত, বড় সংবাদমাধ্যমে অন্তত মৌলিক কর্মী-সহায়তা ব্যবস্থা থাকা দরকার। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শের সুযোগ, ট্রমাটিক অ্যাসাইনমেন্টের পর ডিব্রিফিং, যুক্তিসঙ্গত কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত ছুটি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সহকর্মীর পাশে দাঁড়ানোর সংস্কৃতি—এসবকে বিলাসিতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তৃতীয়ত, চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে বাস্তব আলোচনা দরকার। সাংবাদিকতা একটি পেশা। পেশাজীবীর শ্রমের বিনিময়ে ন্যায্য মজুরি, সময়মতো বেতন, ছুটি এবং সামাজিক নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার আছে।

চতুর্থত, সাংবাদিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা নতুন করে ভাবতে হবে। প্রেসক্লাব, সাংবাদিক ইউনিয়ন কিংবা পেশাজীবী সংগঠনের কাজ শুধু নির্বাচন, বিবৃতি, মানববন্ধন বা সাংবাদিক নির্যাতনের প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য, আইনি সহায়তা, ক্যারিয়ার পরিবর্তন, বেকারত্বের সময় সহায়তা এবং সংকট মোকাবিলার জন্য কার্যকর কাঠামো দরকার।

সবচেয়ে জরুরি হলো নতুন গবেষণা। ২০২১ সালের ১৯১ জন সাংবাদিকের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের ১০০ মাঠসাংবাদিকের গবেষণাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এগুলোর কোনোটিকেই ২০২৬ সালের বাংলাদেশের সব সাংবাদিকের মানসিক স্বাস্থ্যের জাতীয় চিত্র বলা যাবে না। কারণ নমুনা সীমিত, গবেষণার পদ্ধতি ভিন্ন এবং গবেষণাগুলোর উদ্দেশ্যও এক নয়।

তাই এখন সবচেয়ে প্রয়োজন দেশব্যাপী, প্রতিনিধিত্বশীল সাংবাদিক-মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ। সেখানে বয়স, লিঙ্গ, পদ, সংবাদমাধ্যমের ধরন, কর্মঘণ্টা, বেতন, চাকরির স্থায়িত্ব, মাঠসাংবাদিকতা, রাজনৈতিক চাপ, ট্রমাটিক অ্যাসাইনমেন্ট, ঘুম, উদ্বেগ, বিষণ্নতা, বার্নআউট এবং পেশা ছাড়ার প্রবণতা—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে।

সাংবাদিকতায় চাপ

তাহলেই বোঝা যাবে, পুলক চ্যাটার্জির মতো একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের সংকট আসলে কতটা ব্যক্তিগত, কতটা পেশাগত এবং কতটা প্রাতিষ্ঠানিক। শেষ প্রশ্নটি হচ্ছে, একজন সাংবাদিক প্রতিদিন খবর করেন, কারও চাকরি গেছে, সে খবর কি করেন?কেউ বেতন পাননি, সে খবরও করেন। কেউ মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন, সেই খবরও করেন। কেউ অন্যায়ের শিকার হয়েছেন, সেটাও খবর হয়।

কিন্তু সাংবাদিক নিজে যখন চাকরি হারান, যখন তার ঘুম নষ্ট হয়, যখন তিনি ক্রমাগত চাপের মধ্যে থাকেন, যখন কোনো ভয়াবহ ঘটনার ছবি মাথা থেকে সরাতে পারেন না, যখন তিনি ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়েন—তখন তার খবর কে রাখে? পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু সেই প্রশ্নটিই আবার সামনে এনে দিয়েছে।

তার মৃত্যুর কারণ নিয়ে তদন্ত তার নিজস্ব গতিতে চলবে। কিন্তু সাংবাদিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যে প্রশ্নটি বহু বছর ধরে গবেষণায় উঠে আসছে, সেটিকে আর পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ সুস্থ সাংবাদিক ছাড়া সুস্থ সাংবাদিকতাও সম্ভব নয়। আর সাংবাদিকদের খবর রাখার দায়িত্ব শুধু তাদের নিজেদের নয়—সংবাদমাধ্যমের প্রতিষ্ঠান, মালিক, সম্পাদক, সহকর্মী, পেশাজীবী সংগঠন এবং বৃহত্তর সমাজেরও।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


সংবাদ সংগ্রহের আড়ালে ভেঙে পড়ছেন সাংবাদিকরা

প্রকাশের তারিখ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু সামনে আনল সাংবাদিকদের মানসিক স্বাস্থ্য ও পেশাগত নিরাপত্তার পুরোনো প্রশ্ন

সাংবাদিকরা প্রতিদিন অন্য মানুষের সংকট, মৃত্যু, দুর্নীতি, সহিংসতা, নিপীড়ন ও হতাশার খবর লেখেন। কিন্তু সাংবাদিকের নিজের ভেঙে পড়ার খবরটি কে লেখে?

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) বরিশালে সিনিয়র সাংবাদিক ও দৈনিক সমকালের সাবেক ব্যুরো চিফ পুলক চ্যাটার্জির (৫৭) মরদেহ উদ্ধারের পর প্রশ্নটি আবার সামনে এসেছে। নগরীর প্যারারা রোডে সমকাল কার্যালয় থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।  প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যার ধারণার কথা জানানো হয়েছে।তবে তদন্ত ও ময়নাতদন্ত শেষ হওয়ার আগে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

পুলক চ্যাটার্জি ২০২৩ সাল পর্যন্ত সমকালের বরিশাল ব্যুরোপ্রধান ছিলেন। তার স্ত্রী নিলোৎপলা মুখার্জি বলেছেন, চাকরি হারানোর পর থেকে তিনি হতাশ ছিলেন। একই সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে কয়েকটি চিরকুট উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে। এসব তথ্যের পূর্ণ তাৎপর্য তদন্তের পরই স্পষ্ট হবে।

কিন্তু একটি মানুষের মৃত্যুকে ঘিরে অনুমান করার চেয়ে বড় যে প্রশ্নটি সামনে এসেছে, তা হলো—সাংবাদিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের সংবাদমাধ্যমগুলো আসলে কতটা ভাবছে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যে এই প্রশ্নে আলোচনা, সমালোচনা ও তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়েছে। চাকরি হারানো, অনিশ্চিত আয়, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, রাজনৈতিক চাপ, মাঠের ঝুঁকি, সহিংসতা, রাতজাগা, পারিবারিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং প্রতিদিন অসংখ্য নেতিবাচক ঘটনার মুখোমুখি হওয়ার মানসিক অভিঘাত- সব মিলিয়ে সাংবাদিকতা কি ধীরে ধীরে সাংবাদিকদের জন্যই একটি অসুস্থ কর্মপরিবেশ তৈরি করছে?

গবেষণার তথ্য বলছে, প্রশ্নটি একেবারে অমূলক নয়। বাংলাদেশি সাংবাদিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বহুল আলোচিত একটি গবেষণা প্রকাশিত হয় ২০২১ সালে। গবেষণাটিতে ঢাকাভিত্তিক ১৯১ জন সাংবাদিককে নিয়ে জরিপ করা হয়েছিল। গবেষকেরা কর্মক্ষেত্রের চাপ, বিষণ্ণতার লক্ষণ, হতাশা এবং জীবন নিয়ে সন্তুষ্টির মতো বিভিন্ন সূচক ব্যবহার করেন।

গবেষণায় দেখা যায়, ৮২.২ শতাংশ সাংবাদিক উচ্চমাত্রার কর্ম-চাপের কথা জানিয়েছেন। ৭৯.১ শতাংশ জীবন নিয়ে অসন্তুষ্ট ছিলেন। আরও উদ্বেগজনক ছিল হতাশার সূচক—৯৯.৫ শতাংশ উত্তরদাতার স্কোর গবেষণায় ‘চরম হতাশা’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ হয়েছিল। তবে বিষণ্ণতার ক্ষেত্রে চিত্রটি ভিন্ন; অধিকাংশের ক্ষেত্রে তা ন্যূনতম থেকে মৃদু মাত্রায় ছিল।

দেশের মাঠসাংবাদিকদের ৭৯ শতাংশ জীবন নিয়ে অসন্তুষ্ট, তীব্র কর্মক্লান্তিতে ৩০ শতাংশ।

তবে এখানে একটি বিষয় খুব পরিষ্কার করা জরুরি। ৭৯ শতাংশ মানে এই নয় যে বাংলাদেশের ৭৯ শতাংশ সাংবাদিক এখন বিষণ্ণতায় ভুগছেন। সেটা ২০২১ সালের একটি নির্দিষ্ট গবেষণা, নির্দিষ্ট নমুনা এবং নির্দিষ্ট মানসিক-স্বাস্থ্য সূচকের ফল। ফলে ২০২৬ সালে এসে এটিকে বর্তমান জাতীয় হার হিসেবে ব্যবহার করা বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক হবে না।তবে সংখ্যাটি গুরুত্বপূর্ণ অন্য কারণে। এটি দেখায়, সাংবাদিকদের মানসিক সুস্থতা নিয়ে উদ্বেগ বাংলাদেশের সাংবাদিকতা অঙ্গনে নতুন কোনো সমস্যা নয়।

সাংবাদিকতার ভিত

বরং নতুন গবেষণা বলছে, সেই উদ্বেগের নানা দিক এখনও রয়ে গেছে। কারণ নতুন গবেষণায়ও স্বস্তির ছবি নেই। ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি মিশ্র-পদ্ধতির গবেষণায় ২০২০ থেকে ২০২৫ সময়কালে বাংলাদেশি মাঠসাংবাদিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কাজ করা হয়েছে। এতে ১০০ জন প্রতিবেদকের জরিপ এবং ১৫টি গভীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। গবেষণাটি বিশেষভাবে কোভিড-১৯, রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্যোগ ও দুর্ঘটনার মতো ট্রমাটিক ঘটনা কভার করার অভিজ্ঞতার দিকে নজর দেয়।

ফলাফল ছিল উদ্বেগজনক। গবেষণায় ৩০ শতাংশ সাংবাদিকের মধ্যে উচ্চমাত্রার তীব্র কর্মক্লান্তি পাওয়া যায়। ১৫ শতাংশ মাঝারি থেকে তীব্র বিষণ্ণতার মানদণ্ডে এবং ২০ শতাংশ উদ্বেগের মানদণ্ডে পড়েছেন। ১০ শতাংশ উত্তরদাতা সম্ভাব্য পিটিএসডির মানদণ্ড পূরণ করেছেন। পাশাপাশি প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সাংবাদিকের মধ্যে কোনো না কোনো ধরনের বিষণ্ণতাসংক্রান্ত উপসর্গ পাওয়া গেছে।

গবেষণায় ৭০ শতাংশ সাংবাদিক সহকর্মীদের সহায়তার কথা বলেছেন। ৪০ শতাংশ ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক চর্চার ওপর নির্ভর করেছেন। কিন্তু ৫৫ শতাংশ এড়িয়ে যাওয়ার মতো অস্বাস্থ্যকর মোকাবিলা-পদ্ধতি এবং ৩০ শতাংশ মাদক বা পদার্থ ব্যবহারের কথা জানিয়েছেন। গবেষণাটি সংবাদমাধ্যমের প্রাতিষ্ঠানিক মানসিক-স্বাস্থ্য সহায়তার ঘাটতিকেও গুরুত্ব দিয়েছে।

অর্থাৎ সমস্যা শুধু সাংবাদিকের ব্যক্তিগত মানসিক শক্তির নয়। প্রশ্নটি কর্মপরিবেশেরও। আর সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় অদৃশ্য চাপ—অনিশ্চয়তা। সাংবাদিকতার পেশায় একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য আছে। সাংবাদিককে বলা হয় সত্যের অনুসন্ধান করতে, ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে এবং মানুষের অধিকার রক্ষা করতে। কিন্তু নিজের চাকরি, বেতন, কর্মঘণ্টা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তোলার জায়গাটি অনেক সময় তার নিজের কর্মক্ষেত্রেই থাকে না।

কোভিড-১৯ পর্বে বাংলাদেশি সংবাদপত্রের সাংবাদিকদের নিয়ে করা আরেক গবেষণায় চাকরি ছাঁটাই, বেতন কমানো, পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব, জনবল সংকট এবং দীর্ঘ কর্মঘণ্টার সঙ্গে তীব্র কর্মক্লান্তির সম্পর্ক উঠে এসেছে। গবেষণাটিতে আটজন প্রতিবেদক ও চারজন কপি এডিটরের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছিল; অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই সাংবাদিকতা ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছার কথাও জানিয়েছিলেন।

কোভিড চলে গেছে। কিন্তু অনিশ্চয়তা যায়নি। বরং সংবাদমাধ্যমের ব্যবসায়িক মডেল বদলেছে, ডিজিটাল প্রতিযোগিতা বেড়েছে, বিজ্ঞাপনের বাজার বদলেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সংবাদ পরিবেশনের কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে একই সাংবাদিককে রিপোর্টিং, ভিডিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, লাইভ, অনলাইন আপডেট—সবকিছুর দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে। কাজের পরিমাণ বাড়ছে; কিন্তু মানুষের ধারণক্ষমতা বাড়ছে না।

ট্রমার পেশায় ব্যবস্থাপনা কোথায়

একজন ক্রাইম রিপোর্টার দিনের পর দিন হত্যাকাণ্ড দেখছেন। একজন আদালত প্রতিবেদক প্রতিদিন অপরাধ, ধর্ষণ, নির্যাতন ও বিচারপ্রার্থীদের কান্নার গল্প শুনছেন। একজন রাজনৈতিক প্রতিবেদক সংঘর্ষ, গ্রেপ্তার, হুমকি ও উত্তেজনার মধ্যে কাজ করছেন। দুর্যোগ প্রতিবেদক বন্যা, লাশ, ধ্বংসস্তূপ ও মানুষের অসহায়ত্বের সামনে দাঁড়াচ্ছেন।

সাংবাদিককে পেশাগতভাবে এসব দৃশ্য থেকে নিজেকে আলাদা রাখতে হয়। কিন্তু মানুষ হিসেবে তার মস্তিষ্ক ও শরীর সবকিছুই গ্রহণ করে। বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণায় ট্রমা, হুমকি, সাংগঠনিক চাপ, সামাজিক সহায়তার ঘাটতি এবং নেতিবাচক মোকাবিলা-পদ্ধতির সঙ্গে পিটিএসডি, বিষণ্নতা ও অন্যান্য মানসিক সমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

সাংবাদিকতায় বাধা

বাংলাদেশের নতুন গবেষণাটিও সেই বৈশ্বিক চিত্রের সঙ্গে মিল দেখাচ্ছে। সমস্যা হলো—সাংবাদিককে সাধারণত শেখানো হয় কীভাবে ক্যামেরা ধরতে হয়, কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে তথ্য যাচাই করতে হয়, কীভাবে দ্রুত সংবাদ লিখতে হয়।

কিন্তু তাকে খুব কমই শেখানো হয়— নিজের মানসিক চাপ কীভাবে সামলাতে হয়? দীর্ঘ কর্মঘণ্টার ক্লান্তি কীভাবে দূর করা যায়? সাংবাদিকতার সঙ্গে রাতজাগা, অনিয়মিত শিফট এবং দীর্ঘ কর্মঘণ্টার সম্পর্ক পুরোনো। ডিজিটাল সাংবাদিকতার যুগে বিষয়টি আরও জটিল হয়েছে। সংবাদ এখন ২৪ ঘণ্টার। কিন্তু মানুষের শরীর ২৪ ঘণ্টার নিউজরুম নয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার যৌথ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সপ্তাহে ৫৫ ঘণ্টা বা তার বেশি কাজ করা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ৩৫–৪০ ঘণ্টা কাজ করা ব্যক্তিদের তুলনায় স্ট্রোকের ঝুঁকি প্রায় ৩৫ শতাংশ এবং ইস্কেমিক হৃদ্‌রোগে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ১৭ শতাংশ বেশি। গবেষণাটি ২০১৬ সালে দীর্ঘ কর্মঘণ্টার সঙ্গে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭ লাখ ৪৫ হাজার মৃত্যুর সম্পর্কও অনুমান করেছে।

এটি সাংবাদিকদের ওপর করা গবেষণা নয়। তাই এটিকে সাংবাদিকদের হৃদ্‌রোগের পরিসংখ্যান হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। কিন্তু সাংবাদিকদের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অনিয়মিত জীবনযাপন এবং দীর্ঘস্থায়ী কর্ম-চাপের স্বাস্থ্যঝুঁকি বোঝার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক প্রমাণ। অর্থাৎ ‘সাংবাদিকরা হার্টের রোগী’—এমন দাবি করার মতো প্রমাণ নেই; কিন্তু দীর্ঘ কর্মঘণ্টা ও দীর্ঘস্থায়ী চাপ যে হৃদ্‌রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে, তার শক্তিশালী বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আছে। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ।

পুলকের মৃত্যু কী ভাবতে বাধ্য করে

পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু সম্পর্কে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো কারণ নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। একজন মানুষের আত্মহত্যাকে একটি মাত্র কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করাও বিপজ্জনক সরলীকরণ। মানুষের মানসিক সংকট সাধারণত বহুস্তরীয়। চাকরি হারানো তার একটি কারণ হতে পারে, কিন্তু পারিবারিক, আর্থিক, সামাজিক, শারীরিক ও মানসিক নানা বিষয়ও একজন মানুষের জীবনে একসঙ্গে কাজ করতে পারে।

তবু পুলকের ঘটনা একটি প্রশ্নকে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয় না। তা হলো, চাকরি হারানোর পর একজন সাংবাদিকের পাশে দাঁড়ানোর জন্য তার প্রতিষ্ঠান, সহকর্মী বা পেশাজগতের কোনো কাঠামো আছে কি? একজন সাংবাদিক ২০-২৫ বছর একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পর হঠাৎ চাকরি হারালে তার পেশাগত পরিচয়, আয়, সামাজিক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ—সবকিছুতে ধাক্কা লাগে।

অনেক সাংবাদিকের সঞ্চয় থাকে না। স্বাস্থ্যবিমা থাকে না। অবসর-পরবর্তী নিরাপত্তা থাকে না। মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার ব্যবস্থা থাকে না। অথচ আমরা ধরে নিই, সাংবাদিক মানেই শক্ত মানুষ। কারণ তিনি অন্যের কান্নার সামনে মাইক্রোফোন ধরতে পারেন। কিন্তু মাইক্রোফোন ধরতে পারা আর নিজের কষ্ট সামলাতে পারা এক জিনিস নয়।

সাংবাদিকতায় চাপে শেষ পরিণতি

তাহলে সংবাদমাধ্যমের করণীয় কী? প্রথম কাজ—মানসিক স্বাস্থ্যকে ‘ব্যক্তিগত দুর্বলতা’ হিসেবে দেখা বন্ধ করা। একজন সাংবাদিক যদি বলেন তিনি ঘুমাতে পারছেন না, বারবার কোনো দুর্ঘটনার দৃশ্য মনে পড়ছে, কাজে মন বসছে না, প্রচণ্ড উদ্বেগ হচ্ছে কিংবা সবকিছু অর্থহীন মনে হচ্ছে—তাকে ‘দুর্বল’, ‘অপেশাদার’ কিংবা ‘বেশি আবেগপ্রবণ’ বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।

দ্বিতীয়ত, বড় সংবাদমাধ্যমে অন্তত মৌলিক কর্মী-সহায়তা ব্যবস্থা থাকা দরকার। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শের সুযোগ, ট্রমাটিক অ্যাসাইনমেন্টের পর ডিব্রিফিং, যুক্তিসঙ্গত কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত ছুটি এবং জরুরি পরিস্থিতিতে সহকর্মীর পাশে দাঁড়ানোর সংস্কৃতি—এসবকে বিলাসিতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তৃতীয়ত, চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে বাস্তব আলোচনা দরকার। সাংবাদিকতা একটি পেশা। পেশাজীবীর শ্রমের বিনিময়ে ন্যায্য মজুরি, সময়মতো বেতন, ছুটি এবং সামাজিক নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার আছে।

চতুর্থত, সাংবাদিক সংগঠনগুলোর ভূমিকা নতুন করে ভাবতে হবে। প্রেসক্লাব, সাংবাদিক ইউনিয়ন কিংবা পেশাজীবী সংগঠনের কাজ শুধু নির্বাচন, বিবৃতি, মানববন্ধন বা সাংবাদিক নির্যাতনের প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। সদস্যদের মানসিক স্বাস্থ্য, আইনি সহায়তা, ক্যারিয়ার পরিবর্তন, বেকারত্বের সময় সহায়তা এবং সংকট মোকাবিলার জন্য কার্যকর কাঠামো দরকার।

সবচেয়ে জরুরি হলো নতুন গবেষণা। ২০২১ সালের ১৯১ জন সাংবাদিকের গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৫ সালের ১০০ মাঠসাংবাদিকের গবেষণাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এগুলোর কোনোটিকেই ২০২৬ সালের বাংলাদেশের সব সাংবাদিকের মানসিক স্বাস্থ্যের জাতীয় চিত্র বলা যাবে না। কারণ নমুনা সীমিত, গবেষণার পদ্ধতি ভিন্ন এবং গবেষণাগুলোর উদ্দেশ্যও এক নয়।

তাই এখন সবচেয়ে প্রয়োজন দেশব্যাপী, প্রতিনিধিত্বশীল সাংবাদিক-মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ। সেখানে বয়স, লিঙ্গ, পদ, সংবাদমাধ্যমের ধরন, কর্মঘণ্টা, বেতন, চাকরির স্থায়িত্ব, মাঠসাংবাদিকতা, রাজনৈতিক চাপ, ট্রমাটিক অ্যাসাইনমেন্ট, ঘুম, উদ্বেগ, বিষণ্নতা, বার্নআউট এবং পেশা ছাড়ার প্রবণতা—সবকিছু বিবেচনায় নিতে হবে।

সাংবাদিকতায় চাপ

তাহলেই বোঝা যাবে, পুলক চ্যাটার্জির মতো একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের সংকট আসলে কতটা ব্যক্তিগত, কতটা পেশাগত এবং কতটা প্রাতিষ্ঠানিক। শেষ প্রশ্নটি হচ্ছে, একজন সাংবাদিক প্রতিদিন খবর করেন, কারও চাকরি গেছে, সে খবর কি করেন?কেউ বেতন পাননি, সে খবরও করেন। কেউ মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন, সেই খবরও করেন। কেউ অন্যায়ের শিকার হয়েছেন, সেটাও খবর হয়।

কিন্তু সাংবাদিক নিজে যখন চাকরি হারান, যখন তার ঘুম নষ্ট হয়, যখন তিনি ক্রমাগত চাপের মধ্যে থাকেন, যখন কোনো ভয়াবহ ঘটনার ছবি মাথা থেকে সরাতে পারেন না, যখন তিনি ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়েন—তখন তার খবর কে রাখে? পুলক চ্যাটার্জির মৃত্যু সেই প্রশ্নটিই আবার সামনে এনে দিয়েছে।

তার মৃত্যুর কারণ নিয়ে তদন্ত তার নিজস্ব গতিতে চলবে। কিন্তু সাংবাদিকদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে যে প্রশ্নটি বহু বছর ধরে গবেষণায় উঠে আসছে, সেটিকে আর পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। কারণ সুস্থ সাংবাদিক ছাড়া সুস্থ সাংবাদিকতাও সম্ভব নয়। আর সাংবাদিকদের খবর রাখার দায়িত্ব শুধু তাদের নিজেদের নয়—সংবাদমাধ্যমের প্রতিষ্ঠান, মালিক, সম্পাদক, সহকর্মী, পেশাজীবী সংগঠন এবং বৃহত্তর সমাজেরও।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত