কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার হোটেল ‘শিখা ইন’-এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯। নিহতদের মধ্যে আটজনই বাংলাদেশের নাগরিক বলে নিশ্চিত করেছেন কলকাতায় বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশনার মহম্মদ খালেদ। মৃতদের মধ্যে রয়েছেন কুষ্টিয়ার আড়ুয়াপাড়ার বাসিন্দা সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তার স্ত্রী আফসানা সিমমিন, তিন বছরের ছেলে স্বর্ণশিস দত্ত এবং শ্বশুর আকরাম আলি।
এছাড়া ঢাকার বাসিন্দা আহমেদ বাবুর মৃত্যুর খবরও নিশ্চিত হয়েছে। বাকি মৃতদের পরিচয় জানার কাজ চলছে। অন্যদিকে, অগ্নিদগ্ধ ও অসুস্থ ছয় বাংলাদেশি বর্তমানে চিকিৎসাধীন এবং তাদের অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন।
দেবাশীষ দত্ত পেশায় সাংবাদিক ছিলেন। তিনি ‘আজকের পত্রিকা’ ও ‘চ্যানেল নাইন’-এর কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি স্থানীয় দৈনিক ‘আজকের আলো’র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্বও সামলাচ্ছিলেন।
শ্বশুর আকরাম আলীর চিকিৎসার জন্য গত ৪ আগস্ট স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে ভারতে আসেন তিনি। বেঙ্গালুরুতে চিকিৎসা শেষে কলকাতায় ফিরে শিখা ইন হোটেলে ওঠেন। বুধবারই (১৯ আগস্ট) তাদের বাংলাদেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই গভীর রাতের ভয়াবহ আগুন কেড়ে নেয় পরিবারের চারটি প্রাণ।
এই মর্মান্তিক ঘটনায় অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে গিয়েছে দেবাশীষের আট বছরের বড় মেয়ে পাখি। সে কুষ্টিয়ার বাড়িতেই থাকায় ওই সফরে ভারতে আসেনি। ফলে বাবা, মা, ছোট ভাই এবং দাদুকে একসঙ্গে হারিয়ে কার্যত অনাথ হয়ে পড়েছে সে। চিকিৎসার আশায় দেশ ছেড়ে ভারতে আসা একটি পরিবারের এমন মর্মান্তিক পরিণতি দুই বাংলাতেই শোকের আবহ তৈরি করেছে।
অগ্নিকাণ্ডের সেই বিভীষিকাময় রাতের বর্ণনা দিয়েছেন হোটেলে থাকা বাংলাদেশি দম্পতি সুমাই আখতার ও রেজাউল ইসলাম। রাত তখন প্রায় ১টা ৪০। গভীর ঘুমের মধ্যে আচমকাই দরজায় কড়া নাড়েন হোটেল কর্মীরা। দরজা খুলতেই জানানো হয়, দ্রুত বেরিয়ে যেতে হবে, হোটেলে আগুন লেগেছে। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ও ঘন ধোঁয়া পুরো তলা গ্রাস করে ফেলে। প্রাণ বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত তিনতলার কার্নিশের গ্রিল আঁকড়ে ঝুলে থাকতে হয় তাদের।
নিচে থাকা স্থানীয়রা বিষয়টি দেখে দমকলে খবর দেন। পরে দমকলকর্মীরা এসে তাদের নিরাপদে উদ্ধার করেন। উদ্ধারকারী দল বারবার তাদের নিচে ঝাঁপ না দেওয়ার অনুরোধ জানায়। পরে সুমাই বলেন, ‘কোনও রকমে প্রাণে বেঁচেছি’—একটি বাক্যেই ধরা পড়েছে সেই রাতের বিভীষিকা।
একই ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ঝাড়খণ্ডের গিরিডি জেলার বাসিন্দা ১৯ বছরের সন্দীপ পাসওয়ান। মাত্র তিন মাস আগে কাজের সন্ধানে কলকাতায় এসেছিলেন তিনি। নাগেরবাজারে থাকা কাকা সীতারাম পাসওয়ানের উদ্যোগে শিখা ইন হোটেলে ঝাড়ু ও সাফাই কর্মীর কাজ পান সন্দীপ। মঙ্গলবার রাতেও হোটেলেই ছিলেন তিনি। আগুন লাগার পর অন্যান্য আবাসিকদের মতো তিনিও বেরোতে পারেননি। সংকীর্ণ সিঁড়ি, ঘন ধোঁয়া এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুনের কারণে তাঁরও মৃত্যু হয় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে।
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ভাইপোর দেহ শনাক্ত করার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন কাকা সীতারাম পাসওয়ান। তিনি জানান, চার বছর আগে সন্দীপের বাবার মৃত্যু হয়েছিল। সংসারের হাল ধরতেই কাজের খোঁজে কলকাতায় এসেছিলেন তিনি।
সীতারামের দাবি, সন্দীপ হোটেলের ফ্রিজের কাছেই ঘুমোতেন। স্থানীয় সূত্রে তিনি শুনেছেন, ফ্রিজের কম্প্রেসার বিস্ফোরণ থেকেই আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। যদিও এই দাবি এখনও সরকারিভাবে নিশ্চিত হয়নি। দেহে মুখ ও বুকে পোড়ার চিহ্নও রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
ঘটনার পর থেকেই শুরু হয়েছে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত। দমকল, পুলিশ এবং ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা আগুন লাগার প্রকৃত কারণ, অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা, জরুরি নির্গমন পথ এবং কোনও গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন।
এই মর্মান্তিক ঘটনায় ভারত ও বাংলাদেশ—দুই দেশেই শোকের ছায়া নেমে এসেছে। চিকিৎসা, ব্যবসা ও ভ্রমণের জন্য প্রতিবছর বহু বাংলাদেশি কলকাতায় আসেন। সেই প্রেক্ষাপটে নিউমার্কেটের এই অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, দুই দেশের মানুষের আবেগের সঙ্গেও জড়িয়ে গেল। তদন্ত শেষ হলে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হবে। তবে এই ঘটনা শহরের বাণিজ্যিক এলাকায় অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে একাধিক প্রশ্ন তুলে দিল।
প্রধানমন্ত্রী শোকবার্তা: কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার একটি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন।
একই সঙ্গে জানিয়েছেন, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে প্রশাসন সবরকম সহায়তা করছে। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ত্রাণ তহবিল থেকে নিহত প্রত্যেকের নিকটাত্মীয়কে ২ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা করেছেন।
মুখ্যমন্ত্রীর শোকবার্তা: “নিউমার্কেটের শিখা ইন হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় আমি গভীরভাবে শোকাহত। নিহতদের পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাই এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করি। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ আগস্ট ২০২৬
কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার হোটেল ‘শিখা ইন’-এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯। নিহতদের মধ্যে আটজনই বাংলাদেশের নাগরিক বলে নিশ্চিত করেছেন কলকাতায় বাংলাদেশের উপ-হাইকমিশনার মহম্মদ খালেদ। মৃতদের মধ্যে রয়েছেন কুষ্টিয়ার আড়ুয়াপাড়ার বাসিন্দা সাংবাদিক দেবাশীষ দত্ত, তার স্ত্রী আফসানা সিমমিন, তিন বছরের ছেলে স্বর্ণশিস দত্ত এবং শ্বশুর আকরাম আলি।
এছাড়া ঢাকার বাসিন্দা আহমেদ বাবুর মৃত্যুর খবরও নিশ্চিত হয়েছে। বাকি মৃতদের পরিচয় জানার কাজ চলছে। অন্যদিকে, অগ্নিদগ্ধ ও অসুস্থ ছয় বাংলাদেশি বর্তমানে চিকিৎসাধীন এবং তাদের অবস্থা আপাতত স্থিতিশীল বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন।
দেবাশীষ দত্ত পেশায় সাংবাদিক ছিলেন। তিনি ‘আজকের পত্রিকা’ ও ‘চ্যানেল নাইন’-এর কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি স্থানীয় দৈনিক ‘আজকের আলো’র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকের দায়িত্বও সামলাচ্ছিলেন।
শ্বশুর আকরাম আলীর চিকিৎসার জন্য গত ৪ আগস্ট স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে ভারতে আসেন তিনি। বেঙ্গালুরুতে চিকিৎসা শেষে কলকাতায় ফিরে শিখা ইন হোটেলে ওঠেন। বুধবারই (১৯ আগস্ট) তাদের বাংলাদেশে ফেরার কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই গভীর রাতের ভয়াবহ আগুন কেড়ে নেয় পরিবারের চারটি প্রাণ।
এই মর্মান্তিক ঘটনায় অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে গিয়েছে দেবাশীষের আট বছরের বড় মেয়ে পাখি। সে কুষ্টিয়ার বাড়িতেই থাকায় ওই সফরে ভারতে আসেনি। ফলে বাবা, মা, ছোট ভাই এবং দাদুকে একসঙ্গে হারিয়ে কার্যত অনাথ হয়ে পড়েছে সে। চিকিৎসার আশায় দেশ ছেড়ে ভারতে আসা একটি পরিবারের এমন মর্মান্তিক পরিণতি দুই বাংলাতেই শোকের আবহ তৈরি করেছে।
অগ্নিকাণ্ডের সেই বিভীষিকাময় রাতের বর্ণনা দিয়েছেন হোটেলে থাকা বাংলাদেশি দম্পতি সুমাই আখতার ও রেজাউল ইসলাম। রাত তখন প্রায় ১টা ৪০। গভীর ঘুমের মধ্যে আচমকাই দরজায় কড়া নাড়েন হোটেল কর্মীরা। দরজা খুলতেই জানানো হয়, দ্রুত বেরিয়ে যেতে হবে, হোটেলে আগুন লেগেছে। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আগুন ও ঘন ধোঁয়া পুরো তলা গ্রাস করে ফেলে। প্রাণ বাঁচাতে শেষ পর্যন্ত তিনতলার কার্নিশের গ্রিল আঁকড়ে ঝুলে থাকতে হয় তাদের।
নিচে থাকা স্থানীয়রা বিষয়টি দেখে দমকলে খবর দেন। পরে দমকলকর্মীরা এসে তাদের নিরাপদে উদ্ধার করেন। উদ্ধারকারী দল বারবার তাদের নিচে ঝাঁপ না দেওয়ার অনুরোধ জানায়। পরে সুমাই বলেন, ‘কোনও রকমে প্রাণে বেঁচেছি’—একটি বাক্যেই ধরা পড়েছে সেই রাতের বিভীষিকা।
একই ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ঝাড়খণ্ডের গিরিডি জেলার বাসিন্দা ১৯ বছরের সন্দীপ পাসওয়ান। মাত্র তিন মাস আগে কাজের সন্ধানে কলকাতায় এসেছিলেন তিনি। নাগেরবাজারে থাকা কাকা সীতারাম পাসওয়ানের উদ্যোগে শিখা ইন হোটেলে ঝাড়ু ও সাফাই কর্মীর কাজ পান সন্দীপ। মঙ্গলবার রাতেও হোটেলেই ছিলেন তিনি। আগুন লাগার পর অন্যান্য আবাসিকদের মতো তিনিও বেরোতে পারেননি। সংকীর্ণ সিঁড়ি, ঘন ধোঁয়া এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুনের কারণে তাঁরও মৃত্যু হয় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে।
কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ভাইপোর দেহ শনাক্ত করার পর কান্নায় ভেঙে পড়েন কাকা সীতারাম পাসওয়ান। তিনি জানান, চার বছর আগে সন্দীপের বাবার মৃত্যু হয়েছিল। সংসারের হাল ধরতেই কাজের খোঁজে কলকাতায় এসেছিলেন তিনি।
সীতারামের দাবি, সন্দীপ হোটেলের ফ্রিজের কাছেই ঘুমোতেন। স্থানীয় সূত্রে তিনি শুনেছেন, ফ্রিজের কম্প্রেসার বিস্ফোরণ থেকেই আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। যদিও এই দাবি এখনও সরকারিভাবে নিশ্চিত হয়নি। দেহে মুখ ও বুকে পোড়ার চিহ্নও রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
ঘটনার পর থেকেই শুরু হয়েছে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত। দমকল, পুলিশ এবং ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞরা আগুন লাগার প্রকৃত কারণ, অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা, জরুরি নির্গমন পথ এবং কোনও গাফিলতি ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন।
এই মর্মান্তিক ঘটনায় ভারত ও বাংলাদেশ—দুই দেশেই শোকের ছায়া নেমে এসেছে। চিকিৎসা, ব্যবসা ও ভ্রমণের জন্য প্রতিবছর বহু বাংলাদেশি কলকাতায় আসেন। সেই প্রেক্ষাপটে নিউমার্কেটের এই অগ্নিকাণ্ড শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, দুই দেশের মানুষের আবেগের সঙ্গেও জড়িয়ে গেল। তদন্ত শেষ হলে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হবে। তবে এই ঘটনা শহরের বাণিজ্যিক এলাকায় অগ্নি-নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে একাধিক প্রশ্ন তুলে দিল।
প্রধানমন্ত্রী শোকবার্তা: কলকাতার নিউমার্কেট এলাকার একটি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তিনি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন।
একই সঙ্গে জানিয়েছেন, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়াতে প্রশাসন সবরকম সহায়তা করছে। এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ত্রাণ তহবিল থেকে নিহত প্রত্যেকের নিকটাত্মীয়কে ২ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা করেছেন।
মুখ্যমন্ত্রীর শোকবার্তা: “নিউমার্কেটের শিখা ইন হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় আমি গভীরভাবে শোকাহত। নিহতদের পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাই এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করি। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

আপনার মতামত লিখুন