সংবাদ

চলনবিল আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র : দর্শনীয় বহু নিদর্শন


হাবিবুর রহমান স্বপন, পাবনা
হাবিবুর রহমান স্বপন, পাবনা
প্রকাশ: ২২ আগস্ট ২০২৬, ০৪:২৩ পিএম

চলনবিল আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র : দর্শনীয় বহু নিদর্শন
ছবি : সংবাদ

দেশের উত্তর জনপদের এক বিরল প্রাকৃতিক জলসম্পদ চলনবিলের অবয়ব আর ঐতিহ্য যেমন বিরাট তেমনি এর কিংবদন্তির ভাণ্ডারও বিশাল। বহুল প্রচলিত প্রবাদ আছে, ‘বিল দেখতে চলন, গ্রাম দেখতে কলম’। ঐতিহ্যবাহী চলনবিল- যার নাম শুনলেই গা ছমছম করে ওঠে। অথৈ পানিতে উত্তাল তরঙ্গের কথা ভেবে। তবে চলনবিলের এ রূপ বর্ষার। ষড়ঋতুর এই দেশে প্রতি ঋতুতে ভিন্ন ভিন্ন রূপ দেখা যায় চলনবিলকে। বর্ষায় সাগরের মতো বিশাল জলরাশি বুক নিয়ে ভয়ংকর রূপ ধারণ করে এ বিল, শরতে শান্ত জলরাশির ওপর ছাপ ছাপ সবুজ রঙের খেলা। হেমন্তে পাকা ধান আর কাঁচা মাটির গন্ধ মঁ মঁ করে চারদিক। শীত হলুদ আর সবুজের সমারোহ এবং গ্রীষ্ম চলনবিলের রুক্ষ রূপ। প্রতি ঋতুতে চলনবিলের মূল আকর্ষণ নবরূপ।

চলনবিল জনপদের মানুষের মুখে মুখে কত যে উপকথা ছড়িয়ে আছে তার হিসাব করা দুষ্কর। উত্তর জনপদের ঐতিহ্যবাহী চলনবিল একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র। বর্ষাকাল শুরু থেকে শরৎকালের শেষভাগ এ সময় পর্যন্ত বিশাল চলনবিলের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে নয়নাভিরাম লাল, বেগুনি ও সাদা শাপলা। বিল শাপলার নয়নাভিরাম এ দৃশ্য দেখার জন্য ছুটে আসেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। এছাড়া দেখা মিলবে হরেক রকমের পাখির। রঙিন মাছরাঙার মাছ শিকার তো আছেই। জল পানকৌড়িদের ডুবসাঁতারের খেলা। ধবল বক, শালিক, ডাহুক, ফিঙে, দোয়েল তো আছেই।

দেশের উত্তর জনপদের চলনবিলের অবয়ব আর ঐতিহ্য যেমন বিরাট তেমনি এর কিংবদন্তির ভাণ্ডারও বিশাল। চলনবিল দেখতে পাবনা, দেশের বড় গ্রামগুলোর অন্যতম কলম গ্রাম। চাটমোহর জগৎশেঠের কুঠি, বুড়াপীরের দরগা; সিংড়ার হযরত ঘাসী দেওয়ান (ইন) এর মাজার শরীফ; ফরিদপুরের বনওয়ারীনগর জমিদারবাড়ি; সিরাজগঞ্জের তাড়াশের কাছে পিঠ বিনসারা গ্রাম। সেখানে গিয়ে দেখা মিলবে কিংবদন্তি বহু ললনার বাবা বাচ্চা বানিয়া ওরফে সায় সদাগরের বসতভিটা ‘জিয়ন কূপ’। এছাড়া নাটোরের গুরুদাসপুর খুবজিপুর গ্রাম দেখা যাবে চলনবিলের ঐতিহ্যবাহী জাদুঘর। এখানে পাবেন চলনবিলের বিভিন্ন ঐতিহ্যময় জিনিসপত্র। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে উত্তর জনপদের চলনবিল দেশের একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র।

নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজিপুর অসংখ্য গ্রন্থপ্রণেতা মরহুম অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদের হাত গড়া চলনবিল জাদুঘর এ অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান। জাদুঘরে আছে সুলতান নাসির উদ্দিনের নিজ হাতে লেখা কোরআন শরীফ। গাছের ছাল বাংলায় লেখা প্রাচীন পুথিসহ অসংখ্য সামগ্রী। প্রায় ৩৫৫ বছর আগে সিংড়া উপজেলার ডাহিয়া এলাকায় ইসলাম প্রচার করতে আসা ঘাসী-ই-দেওয়ানের ৩০ হাত দীর্ঘ মাজার। এখানে প্রতি শুক্রবার হাজার হাজার ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে।

এখানে আনোয়ারা উপন্যাসের লেখক নজিবর রহমানের মাজার। রায় বাহাদুরের বাড়ির ধ্বংসস্তূপ। দেশের বৃহত্তম গোবিন্দ মন্দির, কপিলেশ্বর মন্দির, বারুহাসের ইমাম বাড়ি, শীতলাইয়ের জমিদার বাড়ি। হান্ডিয়ালের জগন্নাথ মন্দির। রায়গঞ্জের জয়সাগর। চাটমোহরের হরিপুর লেখক প্রমথ চৌধুরী ও বড়াইগ্রামের জোয়ারীতে লেখক প্রমথ নাথ বিশীর বাড়িসহ অসংখ্য দর্শনীয় স্থান বুক ধারণ করে আছে চলনবিল।

চলনবিলের জনপদ অসংখ্য প্রাচীন মসজিদ, মন্দির, মাজার ঘিরে রয়েছে আর সেগুলোকে ঘিরে রয়েছে নানা ইতিকথা, বিশ্বাস। বিলপাড়ের তাড়াশ উপজেলার নবগ্রাম নওগাঁ শাহী মসজিদ (মামার মসজিদ) ও ভাগ্নে মসজিদ নামে দুটি মসজিদ রয়েছে। মামার মসজিদটির পাশেই হযরত শাহ শরীফ জিন্দানী (র.) মাজার অবস্থিত। অনেকেই বলেন, মসজিদটি তিনিই নির্মাণ করেছিলেন। জনশ্রুতি আছে, তিনি বাঘের পিঠে সওয়ার হয়ে বাগদাদ থেকে এ দেশ ষোড়শ খ্রিস্টাব্দে এসেছিলেন ইসলাম প্রচারের জন্য। রাজা ভানসিংহের সময় তার আগমন হয় বলে জানা যায়।

রাজা ভানসিংহের পরিষদবর্গ ও তার ঠাকুররা দল দল ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ায় তিনি তার খিড়কি পুকুরে ডুবে প্রাণ বিসর্জন দেন বলে কথিত আছে। এখনও ভানসিংহের খিড়কি পুকুর রয়েছে। মামার মসজিদের পাশে ভাগ্নে মসজিদ নিয়ে নানা উপকথা শোনা যায়। কোন এক ভাগ্নে মামার সাথে পাল্লা দিয়ে এক রাতে নাকি মসজিদ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রাতের মধ্যে ছাদ দেওয়া সম্ভব হয়নি, তাই সেটি ছাদবিহীন অবস্থায় ছিল। কেউ বলে, সেই ভাগ্নে ওই রাতেই মারা যাওয়ায় মসজিদটির নির্মাণ অসম্পূর্ণ থাকে।

বিলপাড়ের চাটমোহরের হান্ডিয়াল শেঠের বাংলা ও শেঠের কুঠি মীরজাফরের সহচর জগৎশেঠের বিশ্রামাগার ছিল বলে লোক এগুলোকে আজা ঘণ্টার চোখ দেখে। হান্ডিয়ালে রয়েছে বুড়াপীরের দরগা। শোনা যায়, ১২৯২ বাংলা সন গঙ্গাধর সরকার নামক একজন সরকারি সার্ভেয়ার বুড়াপীরের নিষ্কর জমি বাজেয়াপ্ত করতে চাওয়ায় তার রক্তবমি শুরু হয়। শেষে বুড়াপীরের দরগায় গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে আরোগ্য লাভ করেন।

চাটমোহরের সমাজ গ্রামের সমাজ মসজিদ নির্মাণ নিয়ে কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। শেরশাহের ছেলে সলিম মসজিদটি নির্মাণ করেন বলে শোনা যায়। সলিমের জন্মের আগেই তার মা কে শেরশাহ ভুল বুঝে দিল্লি চলে যান। পরে পুত্র সলিমকে স্বীকৃতি দেন এবং তাকে বাংলার সুবেদার নিযুক্ত করেন। লোকজন আজো বিশ্বাস করেন, হযরত আশরাফ জিন্দানী (র.)-এর দোয়ায় শেরশাহের ভুল ভাঙে।

বিলপাড়ের সিরাজগঞ্জ জেলার নিমগাছিতে ফকির দলের আস্তানা ছিল। শোনা যায়, বিদ্রোহী ফকিরদল মুক্তাগাছার মহারাজার পূর্বপুরুষ চন্দ্রশেখর আচার্যকে ময়মনসিংহ থেকে বন্দী করে নিমগাছিতে আটকে রেখেছিল। নিমগাছির হাটখোলার পশ্চিম ভালা দেওয়ান নামে এক কামেলের মাজার রয়েছে। মাজারের পাশে একটি মসজিদ আছে। মাজারের ওপর একটি বটগাছ সারা বছর মচাকে থাকতো বলে হিন্দুরা কুসংস্কারচ্ছন্ন হয়ে মাজার তলে সিঁদুর দিত।

চলনবিলের কাহিত ডাকাতের কথা মানুষ এখনও বলে। কার সাধ্য কাহিতকে আটকে রাখে। একবার নাকি পুলিশ ধরেছিল তাকে। দড়ি দিয়ে নয়, ডাণ্ডা বেড়ি দিয়ে বেঁধেছিল কাহিতকে। নৌকায় করে নেওয়ার সময় কাহিত শুধু একটি ডুব দিতে চেয়েছিল। ডুব দেওয়ার পর সে অদৃশ্য হয়ে যায়। পুলিশের হাতে পড়ে থাকল শুধু শিকল আর ডাণ্ডা।

বেহুলা-লখিন্দরের উপকথা শুনে কে না মোহিত হয়। লখিন্দরের বাবা চাঁদ সদাগর মনসা দেবীকে মানতো না, তাই নিয়ে কত কাণ্ড। সেই চাঁদ সদাগরের সময়ে চাঁদের বাজার লাগতো চলনবিল পাড়ে। বিনসারা গ্রাম রয়েছে বেহুলা-লখিন্দর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এর পাশেই আছে বেহুলার কুয়া (কূপ)। বেহুলা চাঁদের বাজার যে পথ দিয়ে যাতায়াত করতো সেটি বেহুলার খাঁড়ি নামে পরিচিত। বেহুলার খাঁড়ি নামক এই জলা এখনো রয়েছে। খাঁড়ির পাশে নকশাদৃশ্য ঢিবি রয়েছে। গ্রামের লোক এখনো বিশ্বাস করে, ঢিবির নিচে বেহুলার নৌকা রয়েছে।

নিমগাছি হাটের পশ্চিমে জয়সাগর নামে এক বিশাল দীঘি রয়েছে। এই দীঘি নিয়ে নানা উপকথা প্রচলিত। রাজা অচ্যুত সেন এক যুদ্ধ জয়লাভ করে বিজয়ের স্মৃতিস্বরূপ জয়সাগর খনন করেছিলেন। দীঘি ১২ বছর ধরে খনন করার পরও নাকি এ দীঘিতে পানি ওঠেনি। এক রাতে রাজাকে এক সাধু স্বপ্নে দেখায় তার ছেলেকে বিয়ে দেওয়ার পর বাসর রাতে সে দীঘিতে নেমে একমুঠো মাটি তুললে পানি উঠবে। রাজার ছেলে তা করায় দীঘি পানিতে পূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু রাজকুমারের সলিল সমাধি ঘটে। এরপর রাজবধূও সেখানে প্রাণ বিসর্জন দেয়। এই রাজবধূ নাকি অভিশাপ দিয়ে যায় কেউ এর পানি ছুঁবে না। লোক ভয়ে এর পানি ব্যবহার না করায় জঙ্গলে ভরে যায় দীঘি। দীঘির মাঝে বেল গাছ জন্মায়। সেই বেলও ভয়ে কেউ ছুঁতো না। এখন সেখানে মাছের চাষ হচ্ছে।

চলনবিলপাড়ের নটমন্দির, তাড়াশ কপিলেশ্বর মন্দির, মামা-ভাগ্নে মসজিদ, পাগলাপীরের, বারুহাসের বাংলা, ত্রিশালীর ঘাসী দেওয়ানের মাজার, চণ্ডীগ্রামের বুড়াপীরের মাজার, চাঁপিলার মসজিদ, পরশুরাম পাটপাড়া মসজিদ, গুরুদাসপুরের নীলকুঠি নিয়ে কত উপকথা ছড়িয়ে আছে তার হিসাব করা দুষ্কর।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা ৮ আগস্ট চলনবিল পরিদর্শন করেন। চলনবিল সমন্বিত ইকো ট্যুরিজম প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শিগগিরই সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করা হবে বলে এ সময় তিনি জানিয়েছেন।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬


চলনবিল আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র : দর্শনীয় বহু নিদর্শন

প্রকাশের তারিখ : ২২ আগস্ট ২০২৬

featured Image

দেশের উত্তর জনপদের এক বিরল প্রাকৃতিক জলসম্পদ চলনবিলের অবয়ব আর ঐতিহ্য যেমন বিরাট তেমনি এর কিংবদন্তির ভাণ্ডারও বিশাল। বহুল প্রচলিত প্রবাদ আছে, ‘বিল দেখতে চলন, গ্রাম দেখতে কলম’। ঐতিহ্যবাহী চলনবিল- যার নাম শুনলেই গা ছমছম করে ওঠে। অথৈ পানিতে উত্তাল তরঙ্গের কথা ভেবে। তবে চলনবিলের এ রূপ বর্ষার। ষড়ঋতুর এই দেশে প্রতি ঋতুতে ভিন্ন ভিন্ন রূপ দেখা যায় চলনবিলকে। বর্ষায় সাগরের মতো বিশাল জলরাশি বুক নিয়ে ভয়ংকর রূপ ধারণ করে এ বিল, শরতে শান্ত জলরাশির ওপর ছাপ ছাপ সবুজ রঙের খেলা। হেমন্তে পাকা ধান আর কাঁচা মাটির গন্ধ মঁ মঁ করে চারদিক। শীত হলুদ আর সবুজের সমারোহ এবং গ্রীষ্ম চলনবিলের রুক্ষ রূপ। প্রতি ঋতুতে চলনবিলের মূল আকর্ষণ নবরূপ।

চলনবিল জনপদের মানুষের মুখে মুখে কত যে উপকথা ছড়িয়ে আছে তার হিসাব করা দুষ্কর। উত্তর জনপদের ঐতিহ্যবাহী চলনবিল একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র। বর্ষাকাল শুরু থেকে শরৎকালের শেষভাগ এ সময় পর্যন্ত বিশাল চলনবিলের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে নয়নাভিরাম লাল, বেগুনি ও সাদা শাপলা। বিল শাপলার নয়নাভিরাম এ দৃশ্য দেখার জন্য ছুটে আসেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। এছাড়া দেখা মিলবে হরেক রকমের পাখির। রঙিন মাছরাঙার মাছ শিকার তো আছেই। জল পানকৌড়িদের ডুবসাঁতারের খেলা। ধবল বক, শালিক, ডাহুক, ফিঙে, দোয়েল তো আছেই।

দেশের উত্তর জনপদের চলনবিলের অবয়ব আর ঐতিহ্য যেমন বিরাট তেমনি এর কিংবদন্তির ভাণ্ডারও বিশাল। চলনবিল দেখতে পাবনা, দেশের বড় গ্রামগুলোর অন্যতম কলম গ্রাম। চাটমোহর জগৎশেঠের কুঠি, বুড়াপীরের দরগা; সিংড়ার হযরত ঘাসী দেওয়ান (ইন) এর মাজার শরীফ; ফরিদপুরের বনওয়ারীনগর জমিদারবাড়ি; সিরাজগঞ্জের তাড়াশের কাছে পিঠ বিনসারা গ্রাম। সেখানে গিয়ে দেখা মিলবে কিংবদন্তি বহু ললনার বাবা বাচ্চা বানিয়া ওরফে সায় সদাগরের বসতভিটা ‘জিয়ন কূপ’। এছাড়া নাটোরের গুরুদাসপুর খুবজিপুর গ্রাম দেখা যাবে চলনবিলের ঐতিহ্যবাহী জাদুঘর। এখানে পাবেন চলনবিলের বিভিন্ন ঐতিহ্যময় জিনিসপত্র। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা পেলে উত্তর জনপদের চলনবিল দেশের একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র।

নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার খুবজিপুর অসংখ্য গ্রন্থপ্রণেতা মরহুম অধ্যক্ষ আব্দুল হামিদের হাত গড়া চলনবিল জাদুঘর এ অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ দর্শনীয় স্থান। জাদুঘরে আছে সুলতান নাসির উদ্দিনের নিজ হাতে লেখা কোরআন শরীফ। গাছের ছাল বাংলায় লেখা প্রাচীন পুথিসহ অসংখ্য সামগ্রী। প্রায় ৩৫৫ বছর আগে সিংড়া উপজেলার ডাহিয়া এলাকায় ইসলাম প্রচার করতে আসা ঘাসী-ই-দেওয়ানের ৩০ হাত দীর্ঘ মাজার। এখানে প্রতি শুক্রবার হাজার হাজার ভক্ত ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে।

এখানে আনোয়ারা উপন্যাসের লেখক নজিবর রহমানের মাজার। রায় বাহাদুরের বাড়ির ধ্বংসস্তূপ। দেশের বৃহত্তম গোবিন্দ মন্দির, কপিলেশ্বর মন্দির, বারুহাসের ইমাম বাড়ি, শীতলাইয়ের জমিদার বাড়ি। হান্ডিয়ালের জগন্নাথ মন্দির। রায়গঞ্জের জয়সাগর। চাটমোহরের হরিপুর লেখক প্রমথ চৌধুরী ও বড়াইগ্রামের জোয়ারীতে লেখক প্রমথ নাথ বিশীর বাড়িসহ অসংখ্য দর্শনীয় স্থান বুক ধারণ করে আছে চলনবিল।

চলনবিলের জনপদ অসংখ্য প্রাচীন মসজিদ, মন্দির, মাজার ঘিরে রয়েছে আর সেগুলোকে ঘিরে রয়েছে নানা ইতিকথা, বিশ্বাস। বিলপাড়ের তাড়াশ উপজেলার নবগ্রাম নওগাঁ শাহী মসজিদ (মামার মসজিদ) ও ভাগ্নে মসজিদ নামে দুটি মসজিদ রয়েছে। মামার মসজিদটির পাশেই হযরত শাহ শরীফ জিন্দানী (র.) মাজার অবস্থিত। অনেকেই বলেন, মসজিদটি তিনিই নির্মাণ করেছিলেন। জনশ্রুতি আছে, তিনি বাঘের পিঠে সওয়ার হয়ে বাগদাদ থেকে এ দেশ ষোড়শ খ্রিস্টাব্দে এসেছিলেন ইসলাম প্রচারের জন্য। রাজা ভানসিংহের সময় তার আগমন হয় বলে জানা যায়।

রাজা ভানসিংহের পরিষদবর্গ ও তার ঠাকুররা দল দল ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ায় তিনি তার খিড়কি পুকুরে ডুবে প্রাণ বিসর্জন দেন বলে কথিত আছে। এখনও ভানসিংহের খিড়কি পুকুর রয়েছে। মামার মসজিদের পাশে ভাগ্নে মসজিদ নিয়ে নানা উপকথা শোনা যায়। কোন এক ভাগ্নে মামার সাথে পাল্লা দিয়ে এক রাতে নাকি মসজিদ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রাতের মধ্যে ছাদ দেওয়া সম্ভব হয়নি, তাই সেটি ছাদবিহীন অবস্থায় ছিল। কেউ বলে, সেই ভাগ্নে ওই রাতেই মারা যাওয়ায় মসজিদটির নির্মাণ অসম্পূর্ণ থাকে।

বিলপাড়ের চাটমোহরের হান্ডিয়াল শেঠের বাংলা ও শেঠের কুঠি মীরজাফরের সহচর জগৎশেঠের বিশ্রামাগার ছিল বলে লোক এগুলোকে আজা ঘণ্টার চোখ দেখে। হান্ডিয়ালে রয়েছে বুড়াপীরের দরগা। শোনা যায়, ১২৯২ বাংলা সন গঙ্গাধর সরকার নামক একজন সরকারি সার্ভেয়ার বুড়াপীরের নিষ্কর জমি বাজেয়াপ্ত করতে চাওয়ায় তার রক্তবমি শুরু হয়। শেষে বুড়াপীরের দরগায় গিয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে আরোগ্য লাভ করেন।

চাটমোহরের সমাজ গ্রামের সমাজ মসজিদ নির্মাণ নিয়ে কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। শেরশাহের ছেলে সলিম মসজিদটি নির্মাণ করেন বলে শোনা যায়। সলিমের জন্মের আগেই তার মা কে শেরশাহ ভুল বুঝে দিল্লি চলে যান। পরে পুত্র সলিমকে স্বীকৃতি দেন এবং তাকে বাংলার সুবেদার নিযুক্ত করেন। লোকজন আজো বিশ্বাস করেন, হযরত আশরাফ জিন্দানী (র.)-এর দোয়ায় শেরশাহের ভুল ভাঙে।

বিলপাড়ের সিরাজগঞ্জ জেলার নিমগাছিতে ফকির দলের আস্তানা ছিল। শোনা যায়, বিদ্রোহী ফকিরদল মুক্তাগাছার মহারাজার পূর্বপুরুষ চন্দ্রশেখর আচার্যকে ময়মনসিংহ থেকে বন্দী করে নিমগাছিতে আটকে রেখেছিল। নিমগাছির হাটখোলার পশ্চিম ভালা দেওয়ান নামে এক কামেলের মাজার রয়েছে। মাজারের পাশে একটি মসজিদ আছে। মাজারের ওপর একটি বটগাছ সারা বছর মচাকে থাকতো বলে হিন্দুরা কুসংস্কারচ্ছন্ন হয়ে মাজার তলে সিঁদুর দিত।

চলনবিলের কাহিত ডাকাতের কথা মানুষ এখনও বলে। কার সাধ্য কাহিতকে আটকে রাখে। একবার নাকি পুলিশ ধরেছিল তাকে। দড়ি দিয়ে নয়, ডাণ্ডা বেড়ি দিয়ে বেঁধেছিল কাহিতকে। নৌকায় করে নেওয়ার সময় কাহিত শুধু একটি ডুব দিতে চেয়েছিল। ডুব দেওয়ার পর সে অদৃশ্য হয়ে যায়। পুলিশের হাতে পড়ে থাকল শুধু শিকল আর ডাণ্ডা।

বেহুলা-লখিন্দরের উপকথা শুনে কে না মোহিত হয়। লখিন্দরের বাবা চাঁদ সদাগর মনসা দেবীকে মানতো না, তাই নিয়ে কত কাণ্ড। সেই চাঁদ সদাগরের সময়ে চাঁদের বাজার লাগতো চলনবিল পাড়ে। বিনসারা গ্রাম রয়েছে বেহুলা-লখিন্দর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এর পাশেই আছে বেহুলার কুয়া (কূপ)। বেহুলা চাঁদের বাজার যে পথ দিয়ে যাতায়াত করতো সেটি বেহুলার খাঁড়ি নামে পরিচিত। বেহুলার খাঁড়ি নামক এই জলা এখনো রয়েছে। খাঁড়ির পাশে নকশাদৃশ্য ঢিবি রয়েছে। গ্রামের লোক এখনো বিশ্বাস করে, ঢিবির নিচে বেহুলার নৌকা রয়েছে।

নিমগাছি হাটের পশ্চিমে জয়সাগর নামে এক বিশাল দীঘি রয়েছে। এই দীঘি নিয়ে নানা উপকথা প্রচলিত। রাজা অচ্যুত সেন এক যুদ্ধ জয়লাভ করে বিজয়ের স্মৃতিস্বরূপ জয়সাগর খনন করেছিলেন। দীঘি ১২ বছর ধরে খনন করার পরও নাকি এ দীঘিতে পানি ওঠেনি। এক রাতে রাজাকে এক সাধু স্বপ্নে দেখায় তার ছেলেকে বিয়ে দেওয়ার পর বাসর রাতে সে দীঘিতে নেমে একমুঠো মাটি তুললে পানি উঠবে। রাজার ছেলে তা করায় দীঘি পানিতে পূর্ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু রাজকুমারের সলিল সমাধি ঘটে। এরপর রাজবধূও সেখানে প্রাণ বিসর্জন দেয়। এই রাজবধূ নাকি অভিশাপ দিয়ে যায় কেউ এর পানি ছুঁবে না। লোক ভয়ে এর পানি ব্যবহার না করায় জঙ্গলে ভরে যায় দীঘি। দীঘির মাঝে বেল গাছ জন্মায়। সেই বেলও ভয়ে কেউ ছুঁতো না। এখন সেখানে মাছের চাষ হচ্ছে।

চলনবিলপাড়ের নটমন্দির, তাড়াশ কপিলেশ্বর মন্দির, মামা-ভাগ্নে মসজিদ, পাগলাপীরের, বারুহাসের বাংলা, ত্রিশালীর ঘাসী দেওয়ানের মাজার, চণ্ডীগ্রামের বুড়াপীরের মাজার, চাঁপিলার মসজিদ, পরশুরাম পাটপাড়া মসজিদ, গুরুদাসপুরের নীলকুঠি নিয়ে কত উপকথা ছড়িয়ে আছে তার হিসাব করা দুষ্কর।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা ৮ আগস্ট চলনবিল পরিদর্শন করেন। চলনবিল সমন্বিত ইকো ট্যুরিজম প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে শিগগিরই সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করা হবে বলে এ সময় তিনি জানিয়েছেন।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত