ভাদ্র মাস এলেই উত্তরের গ্রামবাংলায় এক চেনা আবহ ফিরে আসে। উঠোনজুড়ে ব্যস্ততা, আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা আর পিঠাপুলির সুগন্ধে ম ম করে চারপাশ। নববধূর বাপের বাড়ি যাওয়ার আনন্দ সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক উৎসবমুখর পরিবেশ। এই চিরচেনা লোকজ উৎসবের নাম ‘ভাদর কাটানি’।
দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়সহ বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের বহু গ্রামে বংশপরম্পরায় এই ঐতিহ্য পালিত হয়ে আসছে। এর কোনো ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নেই, তবুও দীর্ঘদিনের সামাজিক রীতি হিসেবে এটি উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতিতে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। কেবল বাংলাদেশেই নয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও শিলিগুড়ির কিছু বাঙালি সমাজেও এই প্রথার চল রয়েছে।
প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, বিয়ের পর প্রথম ভাদ্র মাসে নববধূকে কয়েক দিনের জন্য বাপের বাড়ি পাঠানো হয়। কোথাও কোথাও এটি মাসের প্রথম ১০ দিন পর্যন্ত চলে। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময়ে স্বামীর মঙ্গল কামনায় নববধূ স্বামীর মুখ দেখেন না। অনেক পরিবারে এই সময়সীমা কিছুটা কম-বেশিও হতে পারে। তবে ভাদ্রের শুরুতে বাপের বাড়ি যাওয়াই হলো ভাদর কাটানির মূল রেওয়াজ।
মেয়েকে নিতে সাধারণত বাপের বাড়ি থেকে লোকজন আসে জামাইয়ের বাড়িতে। সঙ্গে থাকে সামর্থ্য অনুযায়ী মিষ্টি, পায়েস ও রকমারি ফলমূল। একসময় পালকি কিংবা গরুর গাড়িতে চড়ে নববধূরা বাপের বাড়ি যেতেন। কালের বিবর্তনে যাতায়াতের মাধ্যম বদলেছে, এখন অটোরিকশা বা ব্যক্তিগত গাড়িতেই তারা যাতায়াত করেন। কিন্তু সেই উৎসবের আনন্দ এতটুকুও কমেনি।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, এটি মূলত একটি প্রাচীন সামাজিক রীতি। লোকবিশ্বাস কাজ করে যে, বিয়ের পর প্রথম ভাদ্রের শুরুতে নির্দিষ্ট কয়েক দিন স্বামীর মুখ দেখলে অমঙ্গল হতে পারে। তাই স্বামীর দীর্ঘায়ু ও কল্যাণ কামনায় নববধূকে আলাদা রাখার এই প্রথা গড়ে উঠেছে। যদিও আধুনিক যুগে এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, তবুও পারিবারিক বন্ধন ও আবেগের টানেই এই ঐতিহ্য টিকে আছে।
ভাদর কাটানির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর অসাম্প্রদায়িক চরিত্র। একসময় সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারগুলোতে এই উৎসব ধুমধাম করে পালিত হলেও, কালক্রমে তা হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এটি এখন এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় শহরাঞ্চলে এই উৎসবের জৌলুস কিছুটা কমলেও গ্রামাঞ্চলে এর আবেদন এখনও ফুরিয়ে যায়নি। ব্যস্ত জীবন আর পরিবর্তিত আধুনিকতার ভিড়ে ‘ভাদর কাটানি’ কেবল একটি বিশ্বাস নয়; বরং এর সঙ্গে মিশে আছে বাপের বাড়িতে মেয়ের ফেরার আনন্দ আর আত্মীয়তার গভীর বন্ধন।
পালকির জায়গা হয়তো অটোরিকশা নিয়েছে, উৎসবের জৌলুস কিছুটা ম্লান হয়েছে–তবু ভাদ্রের প্রথম সকালে বাপের বাড়ির পথে নববধূর যাত্রা আজও গ্রামবাংলার এক চিরচেনা দৃশ্য। মানুষের ভালোবাসা আর ঐতিহ্যের টানেই ‘ভাদর কাটানি’ বেঁচে থাকবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ আগস্ট ২০২৬
ভাদ্র মাস এলেই উত্তরের গ্রামবাংলায় এক চেনা আবহ ফিরে আসে। উঠোনজুড়ে ব্যস্ততা, আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা আর পিঠাপুলির সুগন্ধে ম ম করে চারপাশ। নববধূর বাপের বাড়ি যাওয়ার আনন্দ সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক উৎসবমুখর পরিবেশ। এই চিরচেনা লোকজ উৎসবের নাম ‘ভাদর কাটানি’।
দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়সহ বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের বহু গ্রামে বংশপরম্পরায় এই ঐতিহ্য পালিত হয়ে আসছে। এর কোনো ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নেই, তবুও দীর্ঘদিনের সামাজিক রীতি হিসেবে এটি উত্তরবঙ্গের লোকসংস্কৃতিতে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। কেবল বাংলাদেশেই নয়, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও শিলিগুড়ির কিছু বাঙালি সমাজেও এই প্রথার চল রয়েছে।
প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, বিয়ের পর প্রথম ভাদ্র মাসে নববধূকে কয়েক দিনের জন্য বাপের বাড়ি পাঠানো হয়। কোথাও কোথাও এটি মাসের প্রথম ১০ দিন পর্যন্ত চলে। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই সময়ে স্বামীর মঙ্গল কামনায় নববধূ স্বামীর মুখ দেখেন না। অনেক পরিবারে এই সময়সীমা কিছুটা কম-বেশিও হতে পারে। তবে ভাদ্রের শুরুতে বাপের বাড়ি যাওয়াই হলো ভাদর কাটানির মূল রেওয়াজ।
মেয়েকে নিতে সাধারণত বাপের বাড়ি থেকে লোকজন আসে জামাইয়ের বাড়িতে। সঙ্গে থাকে সামর্থ্য অনুযায়ী মিষ্টি, পায়েস ও রকমারি ফলমূল। একসময় পালকি কিংবা গরুর গাড়িতে চড়ে নববধূরা বাপের বাড়ি যেতেন। কালের বিবর্তনে যাতায়াতের মাধ্যম বদলেছে, এখন অটোরিকশা বা ব্যক্তিগত গাড়িতেই তারা যাতায়াত করেন। কিন্তু সেই উৎসবের আনন্দ এতটুকুও কমেনি।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, এটি মূলত একটি প্রাচীন সামাজিক রীতি। লোকবিশ্বাস কাজ করে যে, বিয়ের পর প্রথম ভাদ্রের শুরুতে নির্দিষ্ট কয়েক দিন স্বামীর মুখ দেখলে অমঙ্গল হতে পারে। তাই স্বামীর দীর্ঘায়ু ও কল্যাণ কামনায় নববধূকে আলাদা রাখার এই প্রথা গড়ে উঠেছে। যদিও আধুনিক যুগে এর কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, তবুও পারিবারিক বন্ধন ও আবেগের টানেই এই ঐতিহ্য টিকে আছে।
ভাদর কাটানির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর অসাম্প্রদায়িক চরিত্র। একসময় সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবারগুলোতে এই উৎসব ধুমধাম করে পালিত হলেও, কালক্রমে তা হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এটি এখন এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের একটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়েছে।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় শহরাঞ্চলে এই উৎসবের জৌলুস কিছুটা কমলেও গ্রামাঞ্চলে এর আবেদন এখনও ফুরিয়ে যায়নি। ব্যস্ত জীবন আর পরিবর্তিত আধুনিকতার ভিড়ে ‘ভাদর কাটানি’ কেবল একটি বিশ্বাস নয়; বরং এর সঙ্গে মিশে আছে বাপের বাড়িতে মেয়ের ফেরার আনন্দ আর আত্মীয়তার গভীর বন্ধন।
পালকির জায়গা হয়তো অটোরিকশা নিয়েছে, উৎসবের জৌলুস কিছুটা ম্লান হয়েছে–তবু ভাদ্রের প্রথম সকালে বাপের বাড়ির পথে নববধূর যাত্রা আজও গ্রামবাংলার এক চিরচেনা দৃশ্য। মানুষের ভালোবাসা আর ঐতিহ্যের টানেই ‘ভাদর কাটানি’ বেঁচে থাকবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।

আপনার মতামত লিখুন