রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য প্রধান শহরগুলোর সড়কগুলোতে তাকালে একটি দৃশ্য প্রায় সবার চোখেই ধরা পড়বে- উচ্চ গতিতে ছুটে চলা শত শত তিন চাকার বৈদ্যুতিক যান। স্থানীয়ভাবে এই বাহনগুলো অটো-রিকশা, ই-রিকশা, ইজি-বাইক বা রূপক অর্থে বাংলা টেসলা নামে পরিচিত। ২০০৯-২০১০ সালের দিকে মফস্বল শহর ও গ্রামীণ এলাকায় প্রথম চলাচল শুরু হলেও, দ্রুততম সময়ে এরা রাজধানী ঢাকার অলিতে-গলিতে আধিপত্য বিস্তার করেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পরবর্তীতে ট্রাফিক নজরদারির শৈথিল্যের সুযোগে ঢাকার প্রধান সড়কগুলোতে এই গাড়ির সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়ে গেছে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ ব্যাটারি চালিত রিকশা ও ইজি-বাইক চলাচল করছে। রাজধানী ঢাকায় এর সংখ্যা প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ। এই ই-রিকশা যেমন লাখ লাখ গ্রামীণ অভিবাসী ও বেকার মানুষের আয়ের প্রধান লাইফলাইন হয়ে দাঁড়িয়েছে, তেমনই এর পেছনে উঁকি দিচ্ছে পরিবেশগত, স্বাস্থ্যগত ও অবকাঠামোগত খতের এক ভয়াবহ চিত্র। সড়ক দুর্ঘটনা, জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ এবং সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারির অনিরাপদ রিসাইক্লিংয়ের কারণে ঘটা সীসার বিষক্রিয়া দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধা ও জনস্বাস্থ্যকে চিরতরে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। দেশে ই-রিকশার ইতিবাচক ও নেতিবাচক অর্থনৈতিক চালচিত্র, পরিবেশ ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং বন্ধের জটিলতাসহ এক সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের উপায় বিশ্লেষণ করা হলো।
১. জিডিপিতে বিপুল অবদান বনাম কর ফাঁকি ও চাঁদাবাজি
প্রত্যক্ষ অবদান ও কর্মসংস্থান
• অনানুষ্ঠানিকভাবে জিডিপিতে ইতিবাচক প্রভাব: বাংলাদেশে এই ব্যাটারি চালিত রিকশা খাতের মোট বার্ষিক অর্থনৈতিক অবদান ৯৭ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা (৯.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার), যা দেশের সামগ্রিক অনানুষ্ঠানিক খাতের অন্যতম বৃহৎ অংশ।
• উৎপাদন ও খুচরা যন্ত্রাংশের বিশাল বাজার: স্থানীয় গ্যারেজে রিকশা তৈরি, চ্যাসিস নির্মাণ ও খুচরা যন্ত্রাংশের বার্ষিক বাজার প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা (৮০২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)।
• ব্যাটারির দেশীয় বাণিজ্য: রিকশাগুলোতে ব্যবহারের জন্য ব্যাটারি ক্রয়, বিক্রয় ও পরিবর্তনের বার্ষিক বাজারের আকার প্রায় ৮,০০০ কোটি টাকা (৯৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ।
• দরিদ্র মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল: জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার বন্যা-কবলিত ও নদীভাঙনে নিঃস্ব গ্রামীণ মানুষ আয়ের খোঁজে প্রতিদিন ঢাকায় আসছেন। গড়ে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ নতুন চালক ঢাকার রাস্তায় নামছে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা জটিল লাইসেন্সিং ছাড়াই দৈনিক এক হাজার থেকে এক হাজার ২শ টাকা আয়ের মাধ্যমে তারা চরম দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে রক্ষা পাচ্ছেন।
চাঁদাবাজি ও কর ফাঁকির অর্থনীতি
এই বিপুল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হওয়া সত্ত্বেও খাতটি সম্পূর্ণ কর নজরদারির বাইরে রয়েছে। সম্পূর্ণ অনানুষ্ঠানিক ও নিবন্ধনহীনভাবে চলায় সরকার এই খাত থেকে কোনো প্রত্যক্ষ কর পাচ্ছে না, যার ফলে সরকারের বার্ষিক প্রত্যক্ষ রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৯১৫ কোটি টাকা (৯১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)।
অপরদিকে, চালকেরা হাড়ভাঙা খাটুনি করলেও তাদের আয়ের একটি বিশাল অংশ গ্রাস করছে স্থানীয় গ্যারেজ মালিক, প্রভাবশালী লাইনম্যান ও অনানুষ্ঠানিক চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট। শুধু ঢাকা শহরেই এই চাঁদা বাণিজ্য ও অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে বার্ষিক প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার কালো অর্থনীতি গড়ে উঠেছে।
২. সড়কে বিশৃঙ্খলা ও টেসলা ট্রমা: ই-রিকশাগুলো সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের কারণে সড়কে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা সাধারণ যাত্রী এবং লাইসেন্সড চালকদের কাছে একটি বড় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকে এই ভয়েকে টেসলা ট্রমা নামে আখ্যায়িত করেছেন।
• গতি বনাম ব্রেক: ঐতিহ্যবাহী প্যাডেল রিকশার চ্যাসিস ও ব্রেকিং সিস্টেম ডিজাইন করা হয়েছে সর্বোচ্চ ১০-১৫ কিমি ঘণ্টা গতির জন্য। কিন্তু এই কাঠ ও লোহার ফ্রেমে মোটর এবং ভারী ব্যাটারি যুক্ত করার ফলে এগুলো অনায়াসেই ৩০ থেকে ৫০ কিমি ঘণ্টা বেগে চলতে পারে। এই উচ্চ গতি নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত হয় অত্যন্ত দুর্বল ইউ ব্রেক বা ক্যাবল ব্রেক। ফলে, আকস্মিক কোনো বাধার মুখোমুখি হয়ে চালক জোরে ব্রেক কষলে ভারসাম্য হারিয়ে গাড়িটি উল্টে যায় এবং মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে।
• অনভিজ্ঞ চালক: কোনো ট্রাফিক নিয়মের প্রশিক্ষণ ও ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই অনভিজ্ঞ কিশোর, যুবক, বৃদ্ধরা এই রিকশা নিয়ে রাজধানীর মূল সড়ক এমন কি ফ্লাইওভারগুলোতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এদের ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা, উল্টো পথে যাওয়া ও বেপরোয়া ওভারটেক করার প্রবণতা সড়কে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে।
সড়ক মৃত্যুর মহামারী
পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ তা প্রকাশ পায় বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ARI) ও বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যে। বুয়েটের গবেষণা অনুযায়ী দেশের মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ এই ব্যাটারি চালিত রিকশার কারণে ঘটছে ।
৩. জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে চরম চাপ, লোডশেডিংয়ের নতুন কারণ
বাংলাদেশের বর্তমান তীব্র জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিংয়ের অন্যতম অঘোষিত কারণ হচ্ছে এই ব্যাটারি চালিত যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ চার্জিং ব্যবস্থা ।
বিদ্যুতের বিপুল ব্যবহার
দেশব্যাপী ৫০ লাখের বেশি ই-রিকশা ও ইজি-বাইক প্রতিদিন ৪ থেকে ৬ ইউনিট করে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, যা জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ৪০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ইউনিট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ চাহিদা যুক্ত করে। এই বিশাল চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরাসরি গ্রিড থেকে নেওয়া হচ্ছে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার ২.৫ থেকে ৫ শতাংশ ।
মধ্যরাতের বিদ্যুৎ বিপর্যয়
বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এর চার্জিং প্যাটার্ন। সাধারণত রাত ১২টার পর দেশের সাধারণ বাণিজ্যিক ও আবাসিক চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ ব্যবহারের চাপ এক হাজার থেকে এক হাজার পাঁচশ মেগাওয়াট হ্রাস পাওয়ার কথা। কিন্তু চালকেরা গভীর রাতে রিকশা চার্জে দেওয়ায় মধ্যরাতেও বিদ্যুতের চাহিদা হ্রাস পাচ্ছে না, যা গ্রিড ব্যবস্থাপনাকে চরম সংকটে ফেলছে এবং তীব্র লোডশেডিংয়ের সৃষ্টি করছে।
৪. ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আইকিউ ও মেধা বিনাশ
ব্যাটারি রিকশার কারণে দেশের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়টি ঘটছে নীরবে, পরিবেশে ব্যাটারির ক্ষতিকর সীসা দূষণের মাধ্যমে। এটি আমাদের শিশুদের মস্তিষ্ককে স্থায়ীভাবে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
ই-রিকশায় ব্যবহৃত সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারির গড় আয়ুষ্কাল অত্যন্ত কম, মাত্র ৮ থেকে ১১ মাস। দেশের মোট ব্যাটারির বর্জ্যের ৭৭ ভাগ তৈরি করে এই অটো-রিকশা খাত, যা বার্ষিক প্রায় ৯০ হাজার থেকে এক লাখ ৬৮ হাজার মেট্রিক টন বিষাক্ত সীসা বর্জ্য সৃষ্টি করে। এই বর্জ্যের মাত্র ২০ শতাংশ রহিম আফরোজের মতো লাইসেন্সপ্রাপ্ত ও পরিবেশসম্মত কারখানায় রিসাইকেল করা হয়। বাকি ৮০ শতাংশ ব্যাটারি রিসাইকেল করা হয় এক হাজার একশটিরও বেশি ক্ষতিকর অননুমোদিত খোলা উনুনে বা ভাট্টিতে। এই ভাট্টিগুলোতে শ্রমিকেরা কোনো ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE) ছাড়াই হাত দিয়ে ব্যাটারি ভেঙে বিষাক্ত অ্যাসিড মাটিতে, নদীতে ঢেলে দেয়। চুল্লিতে সীসা গলায়। এর ফলে সালফিউরিক অ্যাসিড ও সীসার বিষাক্ত বাষ্প ও ধূলিকণা বাতাস, মাটি, কৃষি জমি ও খাবার পানিতে ছড়িয়ে পড়ছে।
শিশুদের মস্তিষ্কে স্থায়ী ক্ষতি
সীসা একটি তীব্র ও মারাত্মক নিউরোটক্সিন। পরিবেশ অধিদপ্তর ও আইসিডিডিয়ারবি-র গবেষণা অনুযায়ী, দেশের ৩৫ মিলিয়নেরও বেশি শিশুর রক্তে বিপজ্জনক মাত্রায় সীসা পাওয়া গেছে। এই সীসা বিষক্রিয়ার ফলে আমাদের শিশুদের বুদ্ধিমত্তা ও মেধার মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে:
আইকিউ (IQ) হ্রাস: শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক মেধার গড় আইকিউ ৫.৯ থেকে ৬.৯ পয়েন্ট কমে যাচ্ছে ।
মানসিক ও আচরণগত বিপর্যয়: সীসার ক্ষতিকর প্রভাবে শিশুদের মধ্যে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (ASD), মনোযোগের অভাব, অতি-চঞ্চলতা ও মাত্রাতিরিক্ত আক্রমণাত্মক আচরণের সৃষ্টি হচ্ছে।
৩. গর্ভবতী নারীদের ক্ষতি: সীসা চুল্লি সংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারী নারীদের গর্ভপাতের হার প্রায় ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি বিকল হওয়া, স্মৃতিশক্তি হ্রাস ও আজীবন রক্তশূন্যতা দেখা দিচ্ছে।
৪. খাদ্যে প্রবেশ: ভাট্টির চারপাশের মাটিতে সীসার মাত্রা অত্যন্ত বেশি থাকায় উৎপাদিত চাল, গম ও শাকসবজির মতো খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে এই বিষ সরাসরি দেশের সাধারণ মানুষের দেহে প্রবেশ করছে।
৫. আয়ের ইতিবাচকতা বনাম স্বাস্থ্যের নেতিবাচকতা
৬. সরকার কেন এটি নিষিদ্ধ করতে পারছে না?
জনস্বাস্থ্যের এই ভয়াবহ বিপর্যয় দেখেও সরকার এই খাতটি বন্ধ করতে পারছে না বা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ব্যর্থ হচ্ছে। এর পেছনে অত্যন্ত জটিল কিছু আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা রয়েছে:
• বিশাল কর্মসংস্থানের নির্ভরতা: সরাসরি ৬০ লাখ চালকের জীবিকা এবং মেকানিক, গ্যারেজ মালিক ও খুচরা বিক্রেতাসহ সাড়ে ৪ কোটি মানুষের দৈনিক জীবন সরাসরি এই খাতের সচলতার ওপর নির্ভরশীল। হঠাৎ এটি নিষিদ্ধ করলে এক বিশাল জনগোষ্ঠী অনাহার ও দারিদ্র্যের কবলে পড়বে।
• গণপরিবহন ব্যবস্থার তীব্র সংকট: ঢাকার মতো মেগাসিটিতে সাধারণ জনগণের জন্য পর্যাপ্ত ও আরামদায়ক কোনো গণপরিবহন ব্যবস্থা নেই। মেট্রোরেল বা বড় বাস থাকলেও লাস্ট-মাইল কানেক্টিভিটি বা অলিগলির মধ্য দিয়ে অল্প দূরত্বের যাতায়াতের জন্য মানুষ এই সস্তা যানের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। দৈনিক প্রায় ২৫ মিলিয়ন যাত্রী এই যানের মাধ্যমেই স্বল্প খরচে যাতায়াত করেন।
• আইন: ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে হাইকোর্ট ঢাকা মহানগরে ব্যাটারি রিকশা বন্ধের নির্দেশ দিলেও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ মানবিক ও আর্থ-সামাজিক দিক বিবেচনা করে হাইকোর্টের আদেশের ওপর স্থিতাবস্থা (Status Quo) জারি করে, যার ফলে আইনিভাবে এগুলো বন্ধ করা জটিল হয়ে পড়েছে।
• সহিংস আন্দোলন ও ক্ষোভ: যখনই ঢাকার রাস্তায় এগুলো বন্ধ করার কঠোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তখনই চালকেরা সড়ক অবরোধ করে সহিংস বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। সিন্ডিকেটের কারণে এই বিক্ষোভকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়া সহজ হওয়ায় সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয় ।
৭. বন্ধ নয়, সুশৃঙ্খল রূপান্তর
ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের বাস্তবতা ও সীসা দূষণের তীব্র সংকট বিবেচনা করে একমাত্র পথ হলো খাতটিকে বন্ধ না করে পরিবেশবান্ধব এবং নিরাপদ আধুনিক কাঠামোতে রূপান্তর করা।
এর জন্য সরকারকে অবিলম্বে কিছু কার্যকর পদক্ষে বাস্তবায়ন করতে হবে :
ক) সীসা-অ্যাসিড থেকে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে রূপান্তর
সীসা দূষণ চিরতরে বন্ধ করতে হলে রিকশাগুলোতে পরিবেশবান্ধব লিথিয়াম-আয়ন (Li-ion) ব্যাটারির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে।
• লিথিয়ামের কার্যকারিতা: লিথিয়াম ব্যাটারি ৫,০০০ বারের বেশি চার্জ করা যায়, যা সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারির চেয়ে ৫ গুণ বেশি স্থায়ী । এছাড়া এর চার্জ হতে সময় লাগে মাত্র ১ থেকে ৩ ঘণ্টা।
• শুল্ক হ্রাস: লিথিয়াম ব্যাটারির আমদানিতে থাকা উচ্চ শুল্ক (প্রায় ৫৮.৬% থেকে ৮৯%) কমিয়ে এনে সাধারণ চালকদের ক্রয়সীমার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।
• সহজ কিস্তি ও ঋণ: চালকেরা যেন ১,২০,০০০ টাকা মূল্যের লিথিয়াম ব্যাটারি সহজে কিনতে পারেন, সেজন্য ব্যাংক ও এনজিওগুলোর মাধ্যমে সহজ কিস্তিতে ও শর্তে ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা করতে হবে ।
• ব্যাটারি সোয়াপ মডেল জনপ্রিয় করা যেতে পারে, যেখানে চালক চার্জ করা ব্যাটারি ভাড়া নিয়ে ব্যবহার করবেন এবং চার্জ শেষ হলে অদলবদল করে নেবেন ।
খ) গ্রিড বিদ্যুতের বদলে বাধ্যতামূলক সৌর চার্জিং হাব
• সোলার পার্কিং হাব: পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনের জায়গায় সোলার চার্জিং হাব গড়ে তুলতে হবে। দিনের বেলা সৌরশক্তির সাহায্যে চার্জ করলে গ্রিডের ওপর চাপ শূন্যে নেমে আসবে।
• বিদ্যুৎ সাশ্রয়: সোলার চার্জিংয়ের ফলে রিকশা চার্জিং খরচ প্রতি মাসে ১,২৮৩ টাকা থেকে মাত্র ২৭০ টাকায় নেমে আসবে।
গ) বুয়েট-নকশাকৃত চ্যাসিস ও উন্নত ব্রেকিং সিস্টেম বাধ্যতামূলক করা
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে স্থানীয় গ্যারেজে অননুমোদিত রিকশা রূপান্তর বন্ধ করতে হবে। বুয়েটের ডিজাইন করা নিরাপদ চ্যাসিস, বডি ও আধুনিক হাইড্রোলিক বা ড্রাম ব্রেক সংবলিত ব্রেকিং সিস্টেম যুক্ত করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এর গতিসীমা সর্বোচ্চ ২০ থেকে ৩০ কিমি ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে হবে।
ঘ) জোনাল কালার কোডিং এবং জিও-ফেন্সিংঙ) চালকদের বাধ্যতামূলক ট্রাফিক প্রশিক্ষণ ও নিবন্ধন
সব রিকশাকে সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আওতায় বাধ্যতামূলক ডিজিটাল নিবন্ধনে আনতে হবে। চালকদের ট্রাফিক নিয়মাবলী ও যাত্রী নিরাপত্তার বিষয়ে সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে লাইসেন্স দেওয়া বাধ্যতামূলক করা উচিত। এতে চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ হবে এবং নিবন্ধনের মাধ্যমে সরকার বছরে হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করতে পারবে
এখন না জাগলে সকাল হবে না
ই-রিকশা পরিচালনা নীতিমালাকে যুগোপযোগী করে একে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে রূপান্তরিত করা। সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি নিষিদ্ধ করে লিথিয়াম প্রযুক্তির প্রবর্তন, সৌর বিদ্যুৎ চালিত চার্জিং স্টেশনের অবকাঠামো তৈরি এবং বুয়েট অনুমোদিত নিরাপত্তা নকশার বাস্তবায়নই পারে এই বাংলা টেসলাকে সত্যিকারের একটি সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও সবুজ পরিবহনে রূপ দিতে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের সস্তা ভ্রমণের চেয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ শিশুদের মেধার মূল্য অনেক বেশি।

রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ আগস্ট ২০২৬
রাজধানী ঢাকা ও অন্যান্য প্রধান শহরগুলোর সড়কগুলোতে তাকালে একটি দৃশ্য প্রায় সবার চোখেই ধরা পড়বে- উচ্চ গতিতে ছুটে চলা শত শত তিন চাকার বৈদ্যুতিক যান। স্থানীয়ভাবে এই বাহনগুলো অটো-রিকশা, ই-রিকশা, ইজি-বাইক বা রূপক অর্থে বাংলা টেসলা নামে পরিচিত। ২০০৯-২০১০ সালের দিকে মফস্বল শহর ও গ্রামীণ এলাকায় প্রথম চলাচল শুরু হলেও, দ্রুততম সময়ে এরা রাজধানী ঢাকার অলিতে-গলিতে আধিপত্য বিস্তার করেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও পরবর্তীতে ট্রাফিক নজরদারির শৈথিল্যের সুযোগে ঢাকার প্রধান সড়কগুলোতে এই গাড়ির সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বেড়ে গেছে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ লাখ ব্যাটারি চালিত রিকশা ও ইজি-বাইক চলাচল করছে। রাজধানী ঢাকায় এর সংখ্যা প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ। এই ই-রিকশা যেমন লাখ লাখ গ্রামীণ অভিবাসী ও বেকার মানুষের আয়ের প্রধান লাইফলাইন হয়ে দাঁড়িয়েছে, তেমনই এর পেছনে উঁকি দিচ্ছে পরিবেশগত, স্বাস্থ্যগত ও অবকাঠামোগত খতের এক ভয়াবহ চিত্র। সড়ক দুর্ঘটনা, জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ এবং সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারির অনিরাপদ রিসাইক্লিংয়ের কারণে ঘটা সীসার বিষক্রিয়া দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেধা ও জনস্বাস্থ্যকে চিরতরে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। দেশে ই-রিকশার ইতিবাচক ও নেতিবাচক অর্থনৈতিক চালচিত্র, পরিবেশ ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি এবং বন্ধের জটিলতাসহ এক সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের উপায় বিশ্লেষণ করা হলো।
১. জিডিপিতে বিপুল অবদান বনাম কর ফাঁকি ও চাঁদাবাজি
প্রত্যক্ষ অবদান ও কর্মসংস্থান
• অনানুষ্ঠানিকভাবে জিডিপিতে ইতিবাচক প্রভাব: বাংলাদেশে এই ব্যাটারি চালিত রিকশা খাতের মোট বার্ষিক অর্থনৈতিক অবদান ৯৭ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা (৯.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার), যা দেশের সামগ্রিক অনানুষ্ঠানিক খাতের অন্যতম বৃহৎ অংশ।
• উৎপাদন ও খুচরা যন্ত্রাংশের বিশাল বাজার: স্থানীয় গ্যারেজে রিকশা তৈরি, চ্যাসিস নির্মাণ ও খুচরা যন্ত্রাংশের বার্ষিক বাজার প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা (৮০২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)।
• ব্যাটারির দেশীয় বাণিজ্য: রিকশাগুলোতে ব্যবহারের জন্য ব্যাটারি ক্রয়, বিক্রয় ও পরিবর্তনের বার্ষিক বাজারের আকার প্রায় ৮,০০০ কোটি টাকা (৯৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) ।
• দরিদ্র মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল: জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার বন্যা-কবলিত ও নদীভাঙনে নিঃস্ব গ্রামীণ মানুষ আয়ের খোঁজে প্রতিদিন ঢাকায় আসছেন। গড়ে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ নতুন চালক ঢাকার রাস্তায় নামছে। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা জটিল লাইসেন্সিং ছাড়াই দৈনিক এক হাজার থেকে এক হাজার ২শ টাকা আয়ের মাধ্যমে তারা চরম দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে রক্ষা পাচ্ছেন।
চাঁদাবাজি ও কর ফাঁকির অর্থনীতি
এই বিপুল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হওয়া সত্ত্বেও খাতটি সম্পূর্ণ কর নজরদারির বাইরে রয়েছে। সম্পূর্ণ অনানুষ্ঠানিক ও নিবন্ধনহীনভাবে চলায় সরকার এই খাত থেকে কোনো প্রত্যক্ষ কর পাচ্ছে না, যার ফলে সরকারের বার্ষিক প্রত্যক্ষ রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ৯১৫ কোটি টাকা (৯১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)।
অপরদিকে, চালকেরা হাড়ভাঙা খাটুনি করলেও তাদের আয়ের একটি বিশাল অংশ গ্রাস করছে স্থানীয় গ্যারেজ মালিক, প্রভাবশালী লাইনম্যান ও অনানুষ্ঠানিক চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট। শুধু ঢাকা শহরেই এই চাঁদা বাণিজ্য ও অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ব্যবহার করে বার্ষিক প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার কালো অর্থনীতি গড়ে উঠেছে।
২. সড়কে বিশৃঙ্খলা ও টেসলা ট্রমা: ই-রিকশাগুলো সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদের কারণে সড়কে সৃষ্ট বিশৃঙ্খলা সাধারণ যাত্রী এবং লাইসেন্সড চালকদের কাছে একটি বড় ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকে এই ভয়েকে টেসলা ট্রমা নামে আখ্যায়িত করেছেন।
• গতি বনাম ব্রেক: ঐতিহ্যবাহী প্যাডেল রিকশার চ্যাসিস ও ব্রেকিং সিস্টেম ডিজাইন করা হয়েছে সর্বোচ্চ ১০-১৫ কিমি ঘণ্টা গতির জন্য। কিন্তু এই কাঠ ও লোহার ফ্রেমে মোটর এবং ভারী ব্যাটারি যুক্ত করার ফলে এগুলো অনায়াসেই ৩০ থেকে ৫০ কিমি ঘণ্টা বেগে চলতে পারে। এই উচ্চ গতি নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত হয় অত্যন্ত দুর্বল ইউ ব্রেক বা ক্যাবল ব্রেক। ফলে, আকস্মিক কোনো বাধার মুখোমুখি হয়ে চালক জোরে ব্রেক কষলে ভারসাম্য হারিয়ে গাড়িটি উল্টে যায় এবং মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে।
• অনভিজ্ঞ চালক: কোনো ট্রাফিক নিয়মের প্রশিক্ষণ ও ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়াই অনভিজ্ঞ কিশোর, যুবক, বৃদ্ধরা এই রিকশা নিয়ে রাজধানীর মূল সড়ক এমন কি ফ্লাইওভারগুলোতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এদের ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করা, উল্টো পথে যাওয়া ও বেপরোয়া ওভারটেক করার প্রবণতা সড়কে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে।
সড়ক মৃত্যুর মহামারী
পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ তা প্রকাশ পায় বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ARI) ও বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যে। বুয়েটের গবেষণা অনুযায়ী দেশের মোট সড়ক দুর্ঘটনার প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ এই ব্যাটারি চালিত রিকশার কারণে ঘটছে ।
৩. জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডে চরম চাপ, লোডশেডিংয়ের নতুন কারণ
বাংলাদেশের বর্তমান তীব্র জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিংয়ের অন্যতম অঘোষিত কারণ হচ্ছে এই ব্যাটারি চালিত যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত ও অবৈধ চার্জিং ব্যবস্থা ।
বিদ্যুতের বিপুল ব্যবহার
দেশব্যাপী ৫০ লাখের বেশি ই-রিকশা ও ইজি-বাইক প্রতিদিন ৪ থেকে ৬ ইউনিট করে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, যা জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ৪০ থেকে ৫০ মিলিয়ন ইউনিট অতিরিক্ত বিদ্যুৎ চাহিদা যুক্ত করে। এই বিশাল চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরাসরি গ্রিড থেকে নেওয়া হচ্ছে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার ২.৫ থেকে ৫ শতাংশ ।
মধ্যরাতের বিদ্যুৎ বিপর্যয়
বিদ্যুৎ খাতের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এর চার্জিং প্যাটার্ন। সাধারণত রাত ১২টার পর দেশের সাধারণ বাণিজ্যিক ও আবাসিক চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ ব্যবহারের চাপ এক হাজার থেকে এক হাজার পাঁচশ মেগাওয়াট হ্রাস পাওয়ার কথা। কিন্তু চালকেরা গভীর রাতে রিকশা চার্জে দেওয়ায় মধ্যরাতেও বিদ্যুতের চাহিদা হ্রাস পাচ্ছে না, যা গ্রিড ব্যবস্থাপনাকে চরম সংকটে ফেলছে এবং তীব্র লোডশেডিংয়ের সৃষ্টি করছে।
৪. ভবিষ্যৎ প্রজন্মের আইকিউ ও মেধা বিনাশ
ব্যাটারি রিকশার কারণে দেশের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়টি ঘটছে নীরবে, পরিবেশে ব্যাটারির ক্ষতিকর সীসা দূষণের মাধ্যমে। এটি আমাদের শিশুদের মস্তিষ্ককে স্থায়ীভাবে ধ্বংস করে দিচ্ছে।
ই-রিকশায় ব্যবহৃত সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারির গড় আয়ুষ্কাল অত্যন্ত কম, মাত্র ৮ থেকে ১১ মাস। দেশের মোট ব্যাটারির বর্জ্যের ৭৭ ভাগ তৈরি করে এই অটো-রিকশা খাত, যা বার্ষিক প্রায় ৯০ হাজার থেকে এক লাখ ৬৮ হাজার মেট্রিক টন বিষাক্ত সীসা বর্জ্য সৃষ্টি করে। এই বর্জ্যের মাত্র ২০ শতাংশ রহিম আফরোজের মতো লাইসেন্সপ্রাপ্ত ও পরিবেশসম্মত কারখানায় রিসাইকেল করা হয়। বাকি ৮০ শতাংশ ব্যাটারি রিসাইকেল করা হয় এক হাজার একশটিরও বেশি ক্ষতিকর অননুমোদিত খোলা উনুনে বা ভাট্টিতে। এই ভাট্টিগুলোতে শ্রমিকেরা কোনো ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE) ছাড়াই হাত দিয়ে ব্যাটারি ভেঙে বিষাক্ত অ্যাসিড মাটিতে, নদীতে ঢেলে দেয়। চুল্লিতে সীসা গলায়। এর ফলে সালফিউরিক অ্যাসিড ও সীসার বিষাক্ত বাষ্প ও ধূলিকণা বাতাস, মাটি, কৃষি জমি ও খাবার পানিতে ছড়িয়ে পড়ছে।
শিশুদের মস্তিষ্কে স্থায়ী ক্ষতি
সীসা একটি তীব্র ও মারাত্মক নিউরোটক্সিন। পরিবেশ অধিদপ্তর ও আইসিডিডিয়ারবি-র গবেষণা অনুযায়ী, দেশের ৩৫ মিলিয়নেরও বেশি শিশুর রক্তে বিপজ্জনক মাত্রায় সীসা পাওয়া গেছে। এই সীসা বিষক্রিয়ার ফলে আমাদের শিশুদের বুদ্ধিমত্তা ও মেধার মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে:
আইকিউ (IQ) হ্রাস: শিশুদের বুদ্ধিবৃত্তিক মেধার গড় আইকিউ ৫.৯ থেকে ৬.৯ পয়েন্ট কমে যাচ্ছে ।
মানসিক ও আচরণগত বিপর্যয়: সীসার ক্ষতিকর প্রভাবে শিশুদের মধ্যে অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (ASD), মনোযোগের অভাব, অতি-চঞ্চলতা ও মাত্রাতিরিক্ত আক্রমণাত্মক আচরণের সৃষ্টি হচ্ছে।
৩. গর্ভবতী নারীদের ক্ষতি: সীসা চুল্লি সংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারী নারীদের গর্ভপাতের হার প্রায় ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি বিকল হওয়া, স্মৃতিশক্তি হ্রাস ও আজীবন রক্তশূন্যতা দেখা দিচ্ছে।
৪. খাদ্যে প্রবেশ: ভাট্টির চারপাশের মাটিতে সীসার মাত্রা অত্যন্ত বেশি থাকায় উৎপাদিত চাল, গম ও শাকসবজির মতো খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে এই বিষ সরাসরি দেশের সাধারণ মানুষের দেহে প্রবেশ করছে।
৫. আয়ের ইতিবাচকতা বনাম স্বাস্থ্যের নেতিবাচকতা
৬. সরকার কেন এটি নিষিদ্ধ করতে পারছে না?
জনস্বাস্থ্যের এই ভয়াবহ বিপর্যয় দেখেও সরকার এই খাতটি বন্ধ করতে পারছে না বা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ব্যর্থ হচ্ছে। এর পেছনে অত্যন্ত জটিল কিছু আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা রয়েছে:
• বিশাল কর্মসংস্থানের নির্ভরতা: সরাসরি ৬০ লাখ চালকের জীবিকা এবং মেকানিক, গ্যারেজ মালিক ও খুচরা বিক্রেতাসহ সাড়ে ৪ কোটি মানুষের দৈনিক জীবন সরাসরি এই খাতের সচলতার ওপর নির্ভরশীল। হঠাৎ এটি নিষিদ্ধ করলে এক বিশাল জনগোষ্ঠী অনাহার ও দারিদ্র্যের কবলে পড়বে।
• গণপরিবহন ব্যবস্থার তীব্র সংকট: ঢাকার মতো মেগাসিটিতে সাধারণ জনগণের জন্য পর্যাপ্ত ও আরামদায়ক কোনো গণপরিবহন ব্যবস্থা নেই। মেট্রোরেল বা বড় বাস থাকলেও লাস্ট-মাইল কানেক্টিভিটি বা অলিগলির মধ্য দিয়ে অল্প দূরত্বের যাতায়াতের জন্য মানুষ এই সস্তা যানের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল। দৈনিক প্রায় ২৫ মিলিয়ন যাত্রী এই যানের মাধ্যমেই স্বল্প খরচে যাতায়াত করেন।
• আইন: ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে হাইকোর্ট ঢাকা মহানগরে ব্যাটারি রিকশা বন্ধের নির্দেশ দিলেও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ মানবিক ও আর্থ-সামাজিক দিক বিবেচনা করে হাইকোর্টের আদেশের ওপর স্থিতাবস্থা (Status Quo) জারি করে, যার ফলে আইনিভাবে এগুলো বন্ধ করা জটিল হয়ে পড়েছে।
• সহিংস আন্দোলন ও ক্ষোভ: যখনই ঢাকার রাস্তায় এগুলো বন্ধ করার কঠোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তখনই চালকেরা সড়ক অবরোধ করে সহিংস বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছে। সিন্ডিকেটের কারণে এই বিক্ষোভকে রাজনৈতিক রূপ দেওয়া সহজ হওয়ায় সরকার পিছু হটতে বাধ্য হয় ।
৭. বন্ধ নয়, সুশৃঙ্খল রূপান্তর
ব্যাটারিচালিত রিকশা বন্ধের বাস্তবতা ও সীসা দূষণের তীব্র সংকট বিবেচনা করে একমাত্র পথ হলো খাতটিকে বন্ধ না করে পরিবেশবান্ধব এবং নিরাপদ আধুনিক কাঠামোতে রূপান্তর করা।
এর জন্য সরকারকে অবিলম্বে কিছু কার্যকর পদক্ষে বাস্তবায়ন করতে হবে :
ক) সীসা-অ্যাসিড থেকে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারিতে রূপান্তর
সীসা দূষণ চিরতরে বন্ধ করতে হলে রিকশাগুলোতে পরিবেশবান্ধব লিথিয়াম-আয়ন (Li-ion) ব্যাটারির ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে।
• লিথিয়ামের কার্যকারিতা: লিথিয়াম ব্যাটারি ৫,০০০ বারের বেশি চার্জ করা যায়, যা সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারির চেয়ে ৫ গুণ বেশি স্থায়ী । এছাড়া এর চার্জ হতে সময় লাগে মাত্র ১ থেকে ৩ ঘণ্টা।
• শুল্ক হ্রাস: লিথিয়াম ব্যাটারির আমদানিতে থাকা উচ্চ শুল্ক (প্রায় ৫৮.৬% থেকে ৮৯%) কমিয়ে এনে সাধারণ চালকদের ক্রয়সীমার মধ্যে নিয়ে আসতে হবে।
• সহজ কিস্তি ও ঋণ: চালকেরা যেন ১,২০,০০০ টাকা মূল্যের লিথিয়াম ব্যাটারি সহজে কিনতে পারেন, সেজন্য ব্যাংক ও এনজিওগুলোর মাধ্যমে সহজ কিস্তিতে ও শর্তে ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা করতে হবে ।
• ব্যাটারি সোয়াপ মডেল জনপ্রিয় করা যেতে পারে, যেখানে চালক চার্জ করা ব্যাটারি ভাড়া নিয়ে ব্যবহার করবেন এবং চার্জ শেষ হলে অদলবদল করে নেবেন ।
খ) গ্রিড বিদ্যুতের বদলে বাধ্যতামূলক সৌর চার্জিং হাব
• সোলার পার্কিং হাব: পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনের জায়গায় সোলার চার্জিং হাব গড়ে তুলতে হবে। দিনের বেলা সৌরশক্তির সাহায্যে চার্জ করলে গ্রিডের ওপর চাপ শূন্যে নেমে আসবে।
• বিদ্যুৎ সাশ্রয়: সোলার চার্জিংয়ের ফলে রিকশা চার্জিং খরচ প্রতি মাসে ১,২৮৩ টাকা থেকে মাত্র ২৭০ টাকায় নেমে আসবে।
গ) বুয়েট-নকশাকৃত চ্যাসিস ও উন্নত ব্রেকিং সিস্টেম বাধ্যতামূলক করা
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে স্থানীয় গ্যারেজে অননুমোদিত রিকশা রূপান্তর বন্ধ করতে হবে। বুয়েটের ডিজাইন করা নিরাপদ চ্যাসিস, বডি ও আধুনিক হাইড্রোলিক বা ড্রাম ব্রেক সংবলিত ব্রেকিং সিস্টেম যুক্ত করা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এর গতিসীমা সর্বোচ্চ ২০ থেকে ৩০ কিমি ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে হবে।
ঘ) জোনাল কালার কোডিং এবং জিও-ফেন্সিংঙ) চালকদের বাধ্যতামূলক ট্রাফিক প্রশিক্ষণ ও নিবন্ধন
সব রিকশাকে সিটি করপোরেশন ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আওতায় বাধ্যতামূলক ডিজিটাল নিবন্ধনে আনতে হবে। চালকদের ট্রাফিক নিয়মাবলী ও যাত্রী নিরাপত্তার বিষয়ে সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে লাইসেন্স দেওয়া বাধ্যতামূলক করা উচিত। এতে চাঁদাবাজ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ হবে এবং নিবন্ধনের মাধ্যমে সরকার বছরে হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আয় করতে পারবে
এখন না জাগলে সকাল হবে না
ই-রিকশা পরিচালনা নীতিমালাকে যুগোপযোগী করে একে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে রূপান্তরিত করা। সীসা-অ্যাসিড ব্যাটারি নিষিদ্ধ করে লিথিয়াম প্রযুক্তির প্রবর্তন, সৌর বিদ্যুৎ চালিত চার্জিং স্টেশনের অবকাঠামো তৈরি এবং বুয়েট অনুমোদিত নিরাপত্তা নকশার বাস্তবায়নই পারে এই বাংলা টেসলাকে সত্যিকারের একটি সাশ্রয়ী, নিরাপদ ও সবুজ পরিবহনে রূপ দিতে। আমাদের মনে রাখতে হবে, আমাদের সস্তা ভ্রমণের চেয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ শিশুদের মেধার মূল্য অনেক বেশি।

আপনার মতামত লিখুন