সংবাদ

রেলে কালো বিড়াল: ৮৮৪ কোটি লোপাটে মহাপরিকল্পনা


মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, চট্টগ্রাম
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, চট্টগ্রাম
প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৫:২৭ পিএম

রেলে কালো বিড়াল: ৮৮৪ কোটি লোপাটে মহাপরিকল্পনা
ছবি : সংগৃহীত

বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ৮৮৩ কোটি ৭২ লাখ (৮৮৪ কোটি প্রায়) টাকার ট্র্যাক রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন প্রকল্পে নিজেদের পছন্দের ঠিকাদারের মাঝে ভাগ ভাটোয়ারা করে বিপুল অর্থ লোপাটের ছক তৈরি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব কাজকে এমনভাবে প্যাকেজ তৈরি করা হয়েছে যাতে হাতে গোনা ২/৩টি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যদের অংশগ্রহণেরই সুযোগ না থাকে। আর যারা অংশগ্রহণ করতে পারবে তারা সবাই অনেক ক্ষমতাশালী মাফিয়া ঠিকাদার হিসেবে পরিচিত। তাদের চাওয়া দরেই কাজ পাবেন বলে মনে করছেন অনেকে। এর ফলে মাফিয়াদের মাধ্যমে রেলের দুর্নীতিবাজ কালো বিড়ালরা ইঞ্জিনিয়ারিং করে অর্থ লোপাটের মহাপরিকল্পনা করছে বলে মনে করছেন স্থানীয় ঠিকাদারেরা।

সূত্রমতে, রেলের ট্র্যাক মেরামতের জন্য স্থানীয় অনেক ঠিকাদার রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রেলের কতিপয় অসৎ কর্মকর্তার যোগসাজসে নিজেদের পছন্দের লোককে কাজ পাইয়ে দিতে নানাভাবে তদবির করে আসছিল। ছোট ছোট প্যাকেজে উন্মুক্ত দরপত্র করা হলে অনেকেই অংশ নিতে পারে। তখন পছন্দের কাউকে কাজ দেওয়া যাবে না ভেবে বিকল্প পথে হাটে সংশ্লিষ্টরা।

একসঙ্গে অনেকগুলো কাজ মিলিয়ে নেওয়া হয় বড় প্রকল্প আকারে। যেখানে কাজের প্রাক্কলিত ব্যয় বেশি ধরায় বড় কাজের অভিজ্ঞতা থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, ফলে ছোট ও মাঝারি ঠিকাদারদের অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়নি। পরে অন্তবর্তী সরকারের আমলেও এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এগিয়ে নেয় প্রকল্পের কাজ।

সূত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই সরঞ্জামসহ মোট ১৭৬১ কোটি টাকার প্রকল্পের মধ্যে ট্র্যাক মেরামতের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় অনুমোদিত হয় ৮৮৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এই পুরো প্রকল্পকে ৮টি প্যাকেজে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে চট্টগ্রামের ষোলশহর থেকে ফতেয়াবাদ হয়ে নাজিরহাট ও ফতেয়াবাদ থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ৫৮ কোটি ৯০ লাখ ৬৪ হাজার টাকা, লাকসাম থেকে নোয়াখালী সেকশনে ৪৬ কোটি ৩০ লাখ ৯ হাজার, জয়দেবপুর থেকে শ্রীপুর ৩৯ কোটি ৭৬ লাখ ২৮ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে।

একইভাবে ময়মনসিংহ থেকে বেগুনবাড়ি, ময়মনসিংহ থেকে মোহনগঞ্জ, শ্যামগঞ্জ জংশন থেকে জারিয়া জাঞ্জাইল স্টেশন ও গৌরিপুর ময়মনসিংহ জংশন থেকে আঠারোবাড়ী স্টেশন পর্যন্ত ২৩৫ কেটি ৬ লাখ ১৭ হাজার টাকা, বেগুনবাড়ী থেকে দেওয়ানগঞ্জ বাজার, জগন্নাথগঞ্জ ঘাট থেকে তারাকান্দি, তারাকান্দি থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব স্টেশন পর্যন্ত ২০০ কোটি ২২ লাখ ৬০ হাজার টাকা, ভৈরব বাজার জংশন থেকে আঠরোবাড়ী স্টেশন পর্যন্ত ৫৩ কোটি ৬৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা, আখাউড়া স্টেশন থেকে সাটিয়াজুরী ৫৯ কোটি ২৩ লাখ ২৮ হাজার ও সিলেট স্টেশন থেকে সাটিয়াজুরী পর্যন্ত ১৯০ কোটি ৫৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রাক্কলিক ব্যয় ধরা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট কাজে অভিজ্ঞ একাধিক ঠিকাদার জানান, এসব কাজ আগে ২ থেকে ৫/৭ কোটি টাকার প্যাকেজ করা হতো। বড় প্যাকেজের কারণে স্থানীয় ও ছোট-মাঝারি ঠিকাদারদের অংশগ্রহণের সুযোগ কার্যত সংকুচিত হয়েছে। তাদের অভিযোগ, অতীতে একই ধরনের কাজ ছোট ছোট প্যাকেজে দেওয়া হলেও এবার বিভিন্ন কাজ একত্র করে বড় প্যাকেজ করা হয়েছে। এতে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্যদের প্রতিযোগিতায় আসা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এসব টেন্ডারে যারা প্রতিযোগিতা করে তাদের বাইরে রাখতেই এবার চালাকি করা হয়েছে। আর রেলের টাকা নয়-ছয় করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যেখানে কাজ দরকার নেই সেসব জায়গাও প্রকল্পে রাখা হয়েছে। যেহেতেু প্রতিযোগী পাওয়া যাবে না তাই ইচ্ছে করেই অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়েছে। যাতে লুটপাট করতে সহজ হয় সেভাবেই প্রাক্কলন ব্যয় হিসাব করা হয়েছে।

কাজের ভলিউম অনুযায়ী, ২ থেকে ৪টি প্রতিষ্ঠান আছে যারা এই কাজে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা রাখে। তারা সবাই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবসা করেছে। আর সরকার পতনের পরও কতিপয় অসৎ কর্মকর্তা তাদের বিশেষ সুবিধা দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এর ফলে পথে বসছে ছোট ও মাঝারি মানের ঠিকাদারেরা।

অন্যদিকে, প্রতিযোগি না থাকায় অতিরিক্ত ব্যয়ে মাফিয়া ঠিকাদারেরা অনায়াসে কাজ নিতে পারবে। এছাড়া বিএনপি সরকারের আমলেও আগের সুবিধাবাধীরা রেলকে লুটেপুটে খাওয়ার চেষ্টা করছে সমানতালে। আর আওয়ামী লীগের সহযোগীরা কাজ পেলে এই অর্থ খরচ করবে আওয়ামী লীগ নেতার পেছনে ও রাজনীতির কর্মকাণ্ডে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ঠিকাদার বলেন, ‘কাজের ভলিউম অনুযায়ী মাত্র দুই থেকে চারটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা এসব প্যাকেজে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা রাখে। প্রতিযোগিতা সীমিত থাকলে স্বাভাবিকভাবেই দরপত্রে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নষ্ট হবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভূক্তভোগি একাধিক ঠিকাদার জানান, আওয়ামী লীগের শাসনামলের ১৬ বছর যারা দালালি করেছে তারা ঠিকাদারি করেছে। আর যারা বিএনপির রাজনীতি করেছে তারা ব্যবসা করার সুযোগ পায়নি। মামলা, হামলা, দলীয় কর্মসূচি ও রাজপথের আন্দোলনের কারণে পুলিশি হয়রানি ছিল নিত্যসঙ্গী। কাজের দক্ষতা ও সক্ষমতা থাকলেও তাদের অর্থনেতিক অভিজ্ঞতা তেমন নেই।

কয়েকজন ঠিকাদার বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ ভালো করেই জানে এখানে বিএনপির কোনো দলীয় নেতা বা সমর্থকের প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে পারবে না। বাধ্য হয়েই আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগীদের হাতে কাজ তুলে দিতে হবে। আর আওয়ামী লীগের নেতা বা তাদের অনুসারিরা সেই অর্থ সরকারবিরোধী আন্দোলনে খরচ করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চাইবে। অন্যদিকে যারা দলের জন্য দীর্ঘ ত্যাগ স্বীকার করে সর্বসান্ত্ব হয়েছেন তারা বরাবরই নিষ্পেষিত হবেন অভাবের যাঁতাকলে।

রেলের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি দুটি টেন্ডারে সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে ২৩৫ কোটি টাকার প্যাকেজে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি ২টি টেন্ডারের মধ্যে ২৩৫ কোটি টাকার টেন্ডারে একটিমাত্র প্রতিষ্ঠান দরপত্র দাখিল করেছে। অন্যদিকে ৩৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকার প্যাকেজে দুটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। তাদের দাবি, একক দরদাতা থাকা সত্ত্বেও ওই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার জন্য একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। সক্ষমতা থাকলেও আর্থিক যোগ্যতা না থাকায় অংশ নিতে পারেনি বিএনপি সমর্থিত অনেক ঠিকাদার।

কয়েকজন ঠিকাদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যারা দীর্ঘদিন নিজের পকেটের টাকা খরচ করে বিএনপির জন্য কাজ করেছে তারা আজ অবহেলিত। সুসময়ে যদি লিগ্যাল ব্যবসা করারও সুযোগ না থাকে তাহলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোই কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে এসব কাজ আরো ছোট প্যাকেজ করে অবারিত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সর্বনিম্ন দরদাতাদের সঙ্গে চুক্তি করার দাবি জানান।

এবিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী ও ট্র্যাক রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন প্রকল্পের পিডি মো. তানভীরুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পটি আওয়ামী লীগের আমলে নেওয়া তবে চূড়ান্ত অনুমোদন হয়েছে ২০২৫ সালে। কাজের ভলিউম বড় হওয়ায় প্রতিযোগিতা হচ্ছে না। ২০০ কোটি ও ১৯০ কোটি টাকার ২টি প্যাকেজকে ভেঙে আরো ২টি প্যাকেজ বাড়ানো হয়েছে। তবু যদি কোনো সমস্যা থাকে তাহলে তা সমাধানের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে প্যাকেজ ছোট করা যেতে পারে। আমরা পিপিআর ২০২৫ এর শর্ত পালন সাপেক্ষে টেন্ডার প্রক্রিয়া চালাচ্ছি, কর্তৃপক্ষ চাইলে তা বাতিল করা হবে”।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬


রেলে কালো বিড়াল: ৮৮৪ কোটি লোপাটে মহাপরিকল্পনা

প্রকাশের তারিখ : ২৫ আগস্ট ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ৮৮৩ কোটি ৭২ লাখ (৮৮৪ কোটি প্রায়) টাকার ট্র্যাক রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন প্রকল্পে নিজেদের পছন্দের ঠিকাদারের মাঝে ভাগ ভাটোয়ারা করে বিপুল অর্থ লোপাটের ছক তৈরি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এসব কাজকে এমনভাবে প্যাকেজ তৈরি করা হয়েছে যাতে হাতে গোনা ২/৩টি প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যদের অংশগ্রহণেরই সুযোগ না থাকে। আর যারা অংশগ্রহণ করতে পারবে তারা সবাই অনেক ক্ষমতাশালী মাফিয়া ঠিকাদার হিসেবে পরিচিত। তাদের চাওয়া দরেই কাজ পাবেন বলে মনে করছেন অনেকে। এর ফলে মাফিয়াদের মাধ্যমে রেলের দুর্নীতিবাজ কালো বিড়ালরা ইঞ্জিনিয়ারিং করে অর্থ লোপাটের মহাপরিকল্পনা করছে বলে মনে করছেন স্থানীয় ঠিকাদারেরা।

সূত্রমতে, রেলের ট্র্যাক মেরামতের জন্য স্থানীয় অনেক ঠিকাদার রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রেলের কতিপয় অসৎ কর্মকর্তার যোগসাজসে নিজেদের পছন্দের লোককে কাজ পাইয়ে দিতে নানাভাবে তদবির করে আসছিল। ছোট ছোট প্যাকেজে উন্মুক্ত দরপত্র করা হলে অনেকেই অংশ নিতে পারে। তখন পছন্দের কাউকে কাজ দেওয়া যাবে না ভেবে বিকল্প পথে হাটে সংশ্লিষ্টরা।

একসঙ্গে অনেকগুলো কাজ মিলিয়ে নেওয়া হয় বড় প্রকল্প আকারে। যেখানে কাজের প্রাক্কলিত ব্যয় বেশি ধরায় বড় কাজের অভিজ্ঞতা থাকার বাধ্যবাধকতা রয়েছে, ফলে ছোট ও মাঝারি ঠিকাদারদের অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা হয়নি। পরে অন্তবর্তী সরকারের আমলেও এই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে এগিয়ে নেয় প্রকল্পের কাজ।

সূত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই সরঞ্জামসহ মোট ১৭৬১ কোটি টাকার প্রকল্পের মধ্যে ট্র্যাক মেরামতের জন্য প্রাক্কলিত ব্যয় অনুমোদিত হয় ৮৮৩ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এই পুরো প্রকল্পকে ৮টি প্যাকেজে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে চট্টগ্রামের ষোলশহর থেকে ফতেয়াবাদ হয়ে নাজিরহাট ও ফতেয়াবাদ থেকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ৫৮ কোটি ৯০ লাখ ৬৪ হাজার টাকা, লাকসাম থেকে নোয়াখালী সেকশনে ৪৬ কোটি ৩০ লাখ ৯ হাজার, জয়দেবপুর থেকে শ্রীপুর ৩৯ কোটি ৭৬ লাখ ২৮ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে।

একইভাবে ময়মনসিংহ থেকে বেগুনবাড়ি, ময়মনসিংহ থেকে মোহনগঞ্জ, শ্যামগঞ্জ জংশন থেকে জারিয়া জাঞ্জাইল স্টেশন ও গৌরিপুর ময়মনসিংহ জংশন থেকে আঠারোবাড়ী স্টেশন পর্যন্ত ২৩৫ কেটি ৬ লাখ ১৭ হাজার টাকা, বেগুনবাড়ী থেকে দেওয়ানগঞ্জ বাজার, জগন্নাথগঞ্জ ঘাট থেকে তারাকান্দি, তারাকান্দি থেকে বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব স্টেশন পর্যন্ত ২০০ কোটি ২২ লাখ ৬০ হাজার টাকা, ভৈরব বাজার জংশন থেকে আঠরোবাড়ী স্টেশন পর্যন্ত ৫৩ কোটি ৬৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা, আখাউড়া স্টেশন থেকে সাটিয়াজুরী ৫৯ কোটি ২৩ লাখ ২৮ হাজার ও সিলেট স্টেশন থেকে সাটিয়াজুরী পর্যন্ত ১৯০ কোটি ৫৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রাক্কলিক ব্যয় ধরা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট কাজে অভিজ্ঞ একাধিক ঠিকাদার জানান, এসব কাজ আগে ২ থেকে ৫/৭ কোটি টাকার প্যাকেজ করা হতো। বড় প্যাকেজের কারণে স্থানীয় ও ছোট-মাঝারি ঠিকাদারদের অংশগ্রহণের সুযোগ কার্যত সংকুচিত হয়েছে। তাদের অভিযোগ, অতীতে একই ধরনের কাজ ছোট ছোট প্যাকেজে দেওয়া হলেও এবার বিভিন্ন কাজ একত্র করে বড় প্যাকেজ করা হয়েছে। এতে নির্দিষ্ট কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্যদের প্রতিযোগিতায় আসা কঠিন হয়ে পড়েছে।

এসব টেন্ডারে যারা প্রতিযোগিতা করে তাদের বাইরে রাখতেই এবার চালাকি করা হয়েছে। আর রেলের টাকা নয়-ছয় করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে যেখানে কাজ দরকার নেই সেসব জায়গাও প্রকল্পে রাখা হয়েছে। যেহেতেু প্রতিযোগী পাওয়া যাবে না তাই ইচ্ছে করেই অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়েছে। যাতে লুটপাট করতে সহজ হয় সেভাবেই প্রাক্কলন ব্যয় হিসাব করা হয়েছে।

কাজের ভলিউম অনুযায়ী, ২ থেকে ৪টি প্রতিষ্ঠান আছে যারা এই কাজে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা রাখে। তারা সবাই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যবসা করেছে। আর সরকার পতনের পরও কতিপয় অসৎ কর্মকর্তা তাদের বিশেষ সুবিধা দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এর ফলে পথে বসছে ছোট ও মাঝারি মানের ঠিকাদারেরা।

অন্যদিকে, প্রতিযোগি না থাকায় অতিরিক্ত ব্যয়ে মাফিয়া ঠিকাদারেরা অনায়াসে কাজ নিতে পারবে। এছাড়া বিএনপি সরকারের আমলেও আগের সুবিধাবাধীরা রেলকে লুটেপুটে খাওয়ার চেষ্টা করছে সমানতালে। আর আওয়ামী লীগের সহযোগীরা কাজ পেলে এই অর্থ খরচ করবে আওয়ামী লীগ নেতার পেছনে ও রাজনীতির কর্মকাণ্ডে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ঠিকাদার বলেন, ‘কাজের ভলিউম অনুযায়ী মাত্র দুই থেকে চারটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা এসব প্যাকেজে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা রাখে। প্রতিযোগিতা সীমিত থাকলে স্বাভাবিকভাবেই দরপত্রে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নষ্ট হবে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভূক্তভোগি একাধিক ঠিকাদার জানান, আওয়ামী লীগের শাসনামলের ১৬ বছর যারা দালালি করেছে তারা ঠিকাদারি করেছে। আর যারা বিএনপির রাজনীতি করেছে তারা ব্যবসা করার সুযোগ পায়নি। মামলা, হামলা, দলীয় কর্মসূচি ও রাজপথের আন্দোলনের কারণে পুলিশি হয়রানি ছিল নিত্যসঙ্গী। কাজের দক্ষতা ও সক্ষমতা থাকলেও তাদের অর্থনেতিক অভিজ্ঞতা তেমন নেই।

কয়েকজন ঠিকাদার বলেন, ‘কর্তৃপক্ষ ভালো করেই জানে এখানে বিএনপির কোনো দলীয় নেতা বা সমর্থকের প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে পারবে না। বাধ্য হয়েই আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগীদের হাতে কাজ তুলে দিতে হবে। আর আওয়ামী লীগের নেতা বা তাদের অনুসারিরা সেই অর্থ সরকারবিরোধী আন্দোলনে খরচ করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে চাইবে। অন্যদিকে যারা দলের জন্য দীর্ঘ ত্যাগ স্বীকার করে সর্বসান্ত্ব হয়েছেন তারা বরাবরই নিষ্পেষিত হবেন অভাবের যাঁতাকলে।

রেলের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি দুটি টেন্ডারে সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। এর মধ্যে ২৩৫ কোটি টাকার প্যাকেজে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দিয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি ২টি টেন্ডারের মধ্যে ২৩৫ কোটি টাকার টেন্ডারে একটিমাত্র প্রতিষ্ঠান দরপত্র দাখিল করেছে। অন্যদিকে ৩৯ কোটি ৭৬ লাখ টাকার প্যাকেজে দুটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছে। তাদের দাবি, একক দরদাতা থাকা সত্ত্বেও ওই প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়ার জন্য একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। সক্ষমতা থাকলেও আর্থিক যোগ্যতা না থাকায় অংশ নিতে পারেনি বিএনপি সমর্থিত অনেক ঠিকাদার।

কয়েকজন ঠিকাদার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘যারা দীর্ঘদিন নিজের পকেটের টাকা খরচ করে বিএনপির জন্য কাজ করেছে তারা আজ অবহেলিত। সুসময়ে যদি লিগ্যাল ব্যবসা করারও সুযোগ না থাকে তাহলে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোই কঠিন হয়ে পড়বে। ফলে এসব কাজ আরো ছোট প্যাকেজ করে অবারিত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে সর্বনিম্ন দরদাতাদের সঙ্গে চুক্তি করার দাবি জানান।

এবিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান প্রকৌশলী ও ট্র্যাক রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্বাসন প্রকল্পের পিডি মো. তানভীরুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পটি আওয়ামী লীগের আমলে নেওয়া তবে চূড়ান্ত অনুমোদন হয়েছে ২০২৫ সালে। কাজের ভলিউম বড় হওয়ায় প্রতিযোগিতা হচ্ছে না। ২০০ কোটি ও ১৯০ কোটি টাকার ২টি প্যাকেজকে ভেঙে আরো ২টি প্যাকেজ বাড়ানো হয়েছে। তবু যদি কোনো সমস্যা থাকে তাহলে তা সমাধানের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে প্যাকেজ ছোট করা যেতে পারে। আমরা পিপিআর ২০২৫ এর শর্ত পালন সাপেক্ষে টেন্ডার প্রক্রিয়া চালাচ্ছি, কর্তৃপক্ষ চাইলে তা বাতিল করা হবে”।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত