২৬ আগস্ট, ২০২৬। হিমালয়ের নেপাল–তিব্বত সীমান্তে হঠাৎ নেমে এল বরফ, পাথর, কাদা ও পানির এক ভয়ংকর স্রোত। নদী তার স্বাভাবিক চরিত্র হারিয়ে মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হলো ধ্বংসের স্রোতে। প্রাথমিক বিশ্লেষণে বিশাল বরফ–শিলা ধসের পর নদীর গতিপথে আকস্মিক জলপ্রবাহ তৈরির কথা বলা হচ্ছে। ঘটনাটিকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখছেন না বিজ্ঞানীরা; উষ্ণায়ন, হিমবাহের দ্রুত পরিবর্তন, পাহাড়ের অস্থিতিশীলতা এবং মানুষের বাড়তে থাকা অবকাঠামোগত চাপ- সব মিলিয়ে হিমালয়ের ঝুঁকির নতুন বাস্তবতার দিকে তাকাতে হচ্ছে।
অর্থাৎ, হিমালয়ের সংকট আসলে সভ্যতার সংকট। আজ যে হিমালয়কে আমরা পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতমালা হিসেবে দেখি, তার শুরু হয়েছিল প্রায় ৪–৫ কোটি বছর আগে। তখন ভারত কোনো মহাদেশীয় উপদ্বীপ ছিল না বর্তমান অর্থে; ভারতীয় ভূখণ্ডের উত্তর দিকে ছিল টেথিস মহাসাগর। ভারতীয় প্লেট ক্রমাগত উত্তরে এগিয়ে গিয়ে ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। দুই মহাদেশীয় প্লেটের ঘনত্ব কাছাকাছি হওয়ায় কোনো একটি সহজে অন্যটির নিচে ঢুকে যেতে পারেনি। ফলে ভূত্বক ভাঁজ হয়ে ওপরে উঠে তৈরি হয়েছে হিমালয় ও তিব্বতি মালভূমি।
কোটি কোটি বছর ধরে যে ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া পাহাড় বানিয়েছে, সেই একই প্রক্রিয়া আজও তার ভেতরে শক্তি জমা করছে। তাই হিমালয়ের গল্প শুধু পাহাড়ের গল্প নয়। এটি সমতলেরও গল্প। পর্বতের শিলা ক্ষয় হয়ে নদীর সঙ্গে নেমে এসেছে মাটি, বালি ও পলি। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, সিন্ধু, যমুনা, শতদ্রু, তিস্তা কিংবা আরও অসংখ্য নদী সেই পলি বহন করে তৈরি করেছে বিশাল ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমি। এই সমভূমি পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ও পুরু পললভূমি।
এই প্রক্রিয়াটি শুধু ভূতাত্ত্বিক ছিল না—এটি ছিল সভ্যতা নির্মাণের প্রক্রিয়াও। পাহাড় থেকে নদী, নদী থেকে পলি, পলি থেকে উর্বর মাটি, মাটি থেকে কৃষি। এরপর খাদ্য উদ্বৃত্ত। তারপর বসতি, নগর, রাষ্ট্র, সভ্যতা।
প্রাচীন মানুষের জন্য নদী ছিল পানির উৎস, মাছের উৎস, যোগাযোগের পথ এবং কৃষির প্রাণ। হিমালয়ের নদীগুলো যে বিপুল পলি সমতলে এনেছে, তা কৃষির জন্য তৈরি করেছে উর্বর ভূমি। সিন্ধু সভ্যতার ক্ষেত্রেও নদী ও সমভূমির সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্নতাত্ত্বিক ও ভূবৈজ্ঞানিক গবেষণা দেখিয়েছে, হিমালয়-উৎসারিত নদীর গতিপথ ও পরিবর্তন প্রাচীন বসতির বিস্তার এবং নগরায়ণের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।অর্থাৎ কয়েক হাজার বছর আগে মানুষ হয়তো জানত না প্লেট টেকটনিকস কী, হিমবাহ কীভাবে তৈরি হয় কিংবা নদী কীভাবে পলি বহন করে। কিন্তু তাদের জীবন ছিল এসব প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, হিমালয় দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ ভৌত বাধা হিসেবে কাজ করে এবং উপমহাদেশের জলবায়ু কাঠামোকে প্রভাবিত করে। তিব্বতি মালভূমির উত্থানও এশিয়ার জলবায়ুর দীর্ঘমেয়াদি বিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। ভূতাত্ত্বিক গবেষণা বলছে, তিব্বতি মালভূমি ও হিমালয়ের উত্থানের সঙ্গে এশীয় মৌসুমি জলবায়ুর বিকাশের দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। তাই হিমালয়কে শুধু ‘বরফের পাহাড়’ বলা ভুল। এটি এশিয়ার একটি বিশাল জলবায়ু-নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা।
বরফের নিচে লুকানো এশিয়ার ভবিষ্যৎ
হিন্দুকুশ–হিমালয় অঞ্চলকে বলা হয় ‘থার্ড পোল’ বা তৃতীয় মেরু। মেরু অঞ্চলের বাইরে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ বরফ ও তুষারভাণ্ডার এখানে। এই অঞ্চল থেকে উৎপত্তি হয়েছে এশিয়ার ১০টি বড় নদী ব্যবস্থার। এসব নদীর অববাহিকায় বসবাস করে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ। হিমালয় অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জীবন-জীবিকা যেমন এর ওপর নির্ভরশীল, তেমনি বহু দূরের সমভূমির কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ ও নগরজীবনও এই পানির সঙ্গে যুক্ত।
এখানে একটি ভয়ংকর বৈপরীত্য আছে। যে বরফ হাজার হাজার বছর ধরে পানির সঞ্চয় হিসেবে কাজ করেছে, মানুষ এখন সেই বরফকে খুব দ্রুত হারাচ্ছে। ২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন আন্তর্জাতিক কেন্দ্র (আইসিআইএমওডি)-এর নতুন মূল্যায়ন বলছে, হিন্দুকুশ–হিমালয়ের হিমবাহে বরফ হারানোর হার ২০০০ সালের পর দ্বিগুণ হয়েছে। ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হিমবাহগুলোর মোট আয়তন প্রায় ১২ শতাংশ এবং অনুমিত বরফভাণ্ডার প্রায় ৯ শতাংশ কমেছে। ১৯৭৫ সালের তুলনায় কিছু অঞ্চলে বরফের পুরুত্বের ক্ষতি ২৭ মিটার পর্যন্ত হয়েছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৩ সালের আইসিআইএমওডি মূল্যায়নে দেখা যায়, ২০১১–২০২০ দশকে হিমবাহের বরফ হারানোর হার আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেশি ছিল। বর্তমান উচ্চ নিঃসরণ অব্যাহত থাকলে শতাব্দীর শেষে হিমবাহের বর্তমান আয়তনের বিপুল অংশ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।ভূমিধস নদী আটকে দিতে পারে। কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন পর সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে নেমে আসতে পারে আকস্মিক বন্যা। বরফ ও পাথরের ধস নদীতে পড়ে তৈরি করতে পারে ভয়াবহ ডেব্রিস ফ্লো বা ধ্বংসাবশেষ প্রবাহ।
অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে হিমবাহ ছোট হয়ে গেলে বরফ থেকে পাওয়া পানির মজুত কমে যায়। অর্থাৎ আজকের অতিরিক্ত পানি ভবিষ্যতের পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না; বরং একসময় উল্টো পানির ঘাটতি তৈরি করতে পারে। আইসিআইএমওডি-এর গবেষণাও বলছে, হিমবাহ ও তুষারের পরিবর্তনের ফলে মধ্য শতাব্দীর দিকে পানির প্রাপ্যতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে পরে কমতে পারে।
নীরব প্রান্তরে নিশ্চিন্ত প্রাণী
হিমালয় এমনিতেই ভূতাত্ত্বিকভাবে অস্থিতিশীল। তার ওপর বরফ গলছে, মাটির ভেতরের স্থায়ী বরফ বা পারমাফ্রস্ট বদলাচ্ছে, বৃষ্টির ধরন পাল্টাচ্ছে। এই অবস্থায় পাহাড় কেটে ভারী অবকাঠামো বসালে ঝুঁকি এক জায়গায় এসে জমা হয়।
আইসিআইএমওডি বলছে, হিমালয়ের ক্রায়োস্ফিয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হড়পা বান বা আকস্মিক বন্যা, ধ্বংসাবশেষ প্রবাহ, ভূমিধসসহ বিভিন্ন দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে এবং এর প্রভাব পড়ছে বসতি, অবকাঠামো, পানি, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তায়।
জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানির প্রবাহ যখন অনিশ্চিত হয়ে উঠছে, তখন এই অবকাঠামোকেও নতুন ঝুঁকির হিসাবের মধ্যে আনতে হবে।
যে পাহাড়কে দেবতা ভাবত মানুষ
এখানে আধুনিক উন্নয়নের সঙ্গে প্রাচীন সভ্যতার একটি গভীর বৈপরীত্য দেখা যায়।হিমালয় মানুষের কাছে শুধু সম্পদ ছিল না। এটি ছিল পবিত্রতা। কৈলাস হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন এবং তিব্বতি বন ঐতিহ্যে পবিত্র। গঙ্গা শুধু নদী নয়—দেবী। অসংখ্য ঝরনা, বন, পাহাড়, পাথর, হ্রদ ও গুহা স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত।
হিমালয়কে দেবতাই মনে করতো আদি পুরুষরা
আধুনিক মানুষ সেই জায়গায় বসিয়েছে অন্য একটি ধারণা—সম্পদ।পাহাড় মানে জলবিদ্যুৎ।নদী মানে বিদ্যুৎ।বন মানে কাঠ।জমি মানে রিয়েল এস্টেট।পাহাড় মানে পর্যটন।খনিজ মানে অর্থনীতি। এখানেই সভ্যতার সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব।
পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার
হিমালয়ের উচ্চতা কয়েক শ’ মিটারের সমভূমি থেকে আট হাজার মিটারেরও বেশি শৃঙ্গে পৌঁছেছে। এই বিপুল উচ্চতার পার্থক্য সৃষ্টি করেছে অসংখ্য ক্ষুদ্র জলবায়ু অঞ্চল।ফলে একই অঞ্চলের মধ্যে পাওয়া যায় উষ্ণ অরণ্য, নাতিশীতোষ্ণ বন, শঙ্কুযুক্ত বন, তৃণভূমি, আলপাইন অঞ্চল এবং তুষারভূমি।
হিন্দুকুশ–হিমালয় চারটি বৈশ্বিক ‘বায়োডাইভারসিটি হটস্পট’-এর সঙ্গে যুক্ত এবং এখানে ৩৫ হাজারের বেশি উদ্ভিদ, প্রায় ২০০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী ও প্রায় ১০ হাজার প্রজাতির পাখির উপস্থিতির কথা আইসিআইএমওডি উল্লেখ করেছে।
কিন্তু এই বৈচিত্র্য এখন চাপে। বন উজাড়, অতিচারণ, কৃষিজমির বিস্তার, নগরায়ণ, অবকাঠামো এবং জলবায়ু পরিবর্তন মিলিয়ে আবাসস্থল খণ্ডিত হচ্ছে। উচ্চ পাহাড়ের এমন অনেক প্রাণী আছে, যারা নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও উচ্চতার মধ্যে বেঁচে থাকে।
সভ্যতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হচ্ছে নদীকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। অথচ হিমালয়ের নদীগুলোকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছি। বাঁধ দিয়ে। ব্যারাজ দিয়ে। বিদ্যুৎকেন্দ্র দিয়ে। তীররক্ষা দিয়ে। নদীর গতিপথ বদলে। কিন্তু নদী কেবল পানির প্রবাহ নয়। নদী বহন করে পলি, শক্তি, জৈবপদার্থ, বীজ এবং জীবনের অসংখ্য উপাদান।
নদীকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে তার স্বাভাবিক গতিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করা হয়। আর হিমালয়ের মতো তরুণ, সক্রিয় ও দ্রুত পরিবর্তনশীল পর্বতব্যবস্থায় সেই হস্তক্ষেপের ফল কখনো কখনো অনাকাঙ্ক্ষিত হতে পারে। প্রাচীন সভ্যতাগুলো নদীর সঙ্গে বসবাস করতে শিখেছিল। অথচ এ যুগে এসে আধুনিক সভ্যতা নদীকে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী বদলাতে চায়। এই দুই দর্শনের মধ্যে পার্থক্যটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।উপমহাদেশের তিনটি ভবিষ্যৎ
হিমালয়ের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত তিনটি বড় প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। প্রথমত, পানি। সিন্ধু অববাহিকা ভারত ও পাকিস্তানের কোটি মানুষের কৃষির ভিত্তি। গঙ্গা ভারত ও বাংলাদেশের কোটি মানুষের জীবনধারার অংশ। ব্রহ্মপুত্র চীন, ভারত ও বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বহমান। হিমালয়ের বরফ ও তুষারের পরিবর্তন তাই সীমান্ত মানবে না।
দ্বিতীয়ত, খাদ্য। হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীর পানি এবং পলি দক্ষিণ এশিয়ার কৃষির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। পানি প্রবাহের সময় বদলে গেলে সেচব্যবস্থা, ফসলের ক্যালেন্ডার এবং কৃষি উৎপাদনও বদলাতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য বিপদটা কোথায়?
বাংলাদেশ হিমালয়ের পাদদেশে নয়। কিন্তু হিমালয়ের নদীর শেষ প্রান্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ। এই কারণে পাহাড়ে যা ঘটে, তার প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থায় পৌঁছাতে পারে। অতিরিক্ত বৃষ্টির সঙ্গে হিমবাহজাত পানির প্রবাহ মিললে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে বরফ ও তুষারের মজুত কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদি পানির প্রাপ্যতায় চাপ তৈরি হতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হবে— নদীভাঙন, পলি পরিবহন, কৃষি, মৎস্য, নদীর নাব্যতা, ভূগর্ভস্থ পানি, উপকূলীয় লবণাক্ততা এবং আন্তঃসীমান্ত পানি-রাজনীতি। বাংলাদেশ তাই হিমালয়ের দর্শক নয়। বরং বাংলাদেশ হিমালয়ের ডাউনস্ট্রিম স্টেকহোল্ডার বা পরবর্তী ধাপের অংশীজন। এই বাস্তবতাটি আমাদের জাতীয় জলবায়ু ও পানি নীতিতে আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার সময় এসেছে।২০২৩ সালের আইসিআইএমওডি মূল্যায়ন এই পরিবর্তনকে মানবসময়ের বিচারে ‘অভূতপূর্ব এবং অনেক ক্ষেত্রে অপরিবর্তনীয়’ বলে বর্ণনা করেছিল। ২০২৬ সালের নতুন তথ্য বলছে, বরফ হারানোর গতি আরও তীব্র হয়েছে। আর ২৬ আগস্টের নেপাল–তিব্বত বিপর্যয় আমাদের চোখের সামনে দেখিয়ে দিল—উচ্চ পাহাড়ে একটি পরিবর্তন কীভাবে কয়েক মিনিটের মধ্যে নদী, রাস্তা, বসতি, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও মানুষের জীবনকে একসঙ্গে বিপন্ন করতে পারে।
সভ্যতার ঋণ কি শোধ করতে পারব?
হাজার হাজার বছর আগে মানুষ হিমালয়ের কাছ থেকে নিয়েছিল পানি। নদী দিয়েছিল কৃষি। পলি দিয়েছিল উর্বর মাটি। বন দিয়েছিল খাদ্য ও জ্বালানি। পর্বত দিয়েছিল বৃষ্টি ও জলবায়ুর আশ্রয়। মানুষ সেই সম্পদের ওপর বসতি গড়েছে। নগর বানিয়েছে। সাম্রাজ্য তৈরি করেছে। ধর্ম ও সংস্কৃতি নির্মাণ করেছে। কোটি কোটি মানুষের জীবন দাঁড়িয়ে গেছে হিমালয় থেকে নেমে আসা পানির ওপর।
আজ সেই মানুষই পাহাড়ে আরও রাস্তা বানাচ্ছে, নদী আটকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, বন কাটছে, পর্যটননগরী বানাচ্ছে, কার্বন নিঃসরণ বাড়াচ্ছে। সভ্যতার সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ হয়তো এটাই—যে প্রকৃতি তাকে জন্ম দিয়েছে, উন্নয়নের নামে সেই প্রকৃতিকেই সে দুর্বল করে তুলছে।
কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে অপরিকল্পিত নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। হিমবাহ ও তুষারভাণ্ডার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। হিমবাহের হ্রদ ফেটে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের আগাম সতর্কতা বাড়াতে হবে। নদী অববাহিকাভিত্তিক পরিকল্পনা করতে হবে। ভারত, চীন, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে তথ্য বিনিময় বাড়াতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পের আগে পাহাড়ের ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ু ঝুঁকিকে বাধ্যতামূলকভাবে বিবেচনায় আনতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, হিমালয়কে সম্পদ হিসেবে দেখার পাশাপাশি একটি জীবন্ত ইকোসিস্টেম হিসেবে দেখতে হবে। কারণ পাহাড়ের ওপর যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তার ফল অনেক সময় পাহাড়ে থাকে না। তা নেমে আসে নদীতে। নদী থেকে সমতলে। সমতল থেকে কৃষিক্ষেতে। আর শেষ পর্যন্ত মানুষের ঘরে।হিমালয় হয়তো টিকে থাকবে। প্রশ্ন হলো—হিমালয় বদলে যাওয়ার পরও আমরা কি একই সভ্যতা হিসেবে টিকে থাকতে পারব?
লেখক: কবি ও সাংবাদিক

শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ আগস্ট ২০২৬
২৬ আগস্ট, ২০২৬। হিমালয়ের নেপাল–তিব্বত সীমান্তে হঠাৎ নেমে এল বরফ, পাথর, কাদা ও পানির এক ভয়ংকর স্রোত। নদী তার স্বাভাবিক চরিত্র হারিয়ে মুহূর্তের মধ্যে পরিণত হলো ধ্বংসের স্রোতে। প্রাথমিক বিশ্লেষণে বিশাল বরফ–শিলা ধসের পর নদীর গতিপথে আকস্মিক জলপ্রবাহ তৈরির কথা বলা হচ্ছে। ঘটনাটিকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখছেন না বিজ্ঞানীরা; উষ্ণায়ন, হিমবাহের দ্রুত পরিবর্তন, পাহাড়ের অস্থিতিশীলতা এবং মানুষের বাড়তে থাকা অবকাঠামোগত চাপ- সব মিলিয়ে হিমালয়ের ঝুঁকির নতুন বাস্তবতার দিকে তাকাতে হচ্ছে।
অর্থাৎ, হিমালয়ের সংকট আসলে সভ্যতার সংকট। আজ যে হিমালয়কে আমরা পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতমালা হিসেবে দেখি, তার শুরু হয়েছিল প্রায় ৪–৫ কোটি বছর আগে। তখন ভারত কোনো মহাদেশীয় উপদ্বীপ ছিল না বর্তমান অর্থে; ভারতীয় ভূখণ্ডের উত্তর দিকে ছিল টেথিস মহাসাগর। ভারতীয় প্লেট ক্রমাগত উত্তরে এগিয়ে গিয়ে ইউরেশীয় প্লেটের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। দুই মহাদেশীয় প্লেটের ঘনত্ব কাছাকাছি হওয়ায় কোনো একটি সহজে অন্যটির নিচে ঢুকে যেতে পারেনি। ফলে ভূত্বক ভাঁজ হয়ে ওপরে উঠে তৈরি হয়েছে হিমালয় ও তিব্বতি মালভূমি।
কোটি কোটি বছর ধরে যে ভূতাত্ত্বিক প্রক্রিয়া পাহাড় বানিয়েছে, সেই একই প্রক্রিয়া আজও তার ভেতরে শক্তি জমা করছে। তাই হিমালয়ের গল্প শুধু পাহাড়ের গল্প নয়। এটি সমতলেরও গল্প। পর্বতের শিলা ক্ষয় হয়ে নদীর সঙ্গে নেমে এসেছে মাটি, বালি ও পলি। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, সিন্ধু, যমুনা, শতদ্রু, তিস্তা কিংবা আরও অসংখ্য নদী সেই পলি বহন করে তৈরি করেছে বিশাল ইন্দো-গাঙ্গেয় সমভূমি। এই সমভূমি পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ও পুরু পললভূমি।
এই প্রক্রিয়াটি শুধু ভূতাত্ত্বিক ছিল না—এটি ছিল সভ্যতা নির্মাণের প্রক্রিয়াও। পাহাড় থেকে নদী, নদী থেকে পলি, পলি থেকে উর্বর মাটি, মাটি থেকে কৃষি। এরপর খাদ্য উদ্বৃত্ত। তারপর বসতি, নগর, রাষ্ট্র, সভ্যতা।
প্রাচীন মানুষের জন্য নদী ছিল পানির উৎস, মাছের উৎস, যোগাযোগের পথ এবং কৃষির প্রাণ। হিমালয়ের নদীগুলো যে বিপুল পলি সমতলে এনেছে, তা কৃষির জন্য তৈরি করেছে উর্বর ভূমি। সিন্ধু সভ্যতার ক্ষেত্রেও নদী ও সমভূমির সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্নতাত্ত্বিক ও ভূবৈজ্ঞানিক গবেষণা দেখিয়েছে, হিমালয়-উৎসারিত নদীর গতিপথ ও পরিবর্তন প্রাচীন বসতির বিস্তার এবং নগরায়ণের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।অর্থাৎ কয়েক হাজার বছর আগে মানুষ হয়তো জানত না প্লেট টেকটনিকস কী, হিমবাহ কীভাবে তৈরি হয় কিংবা নদী কীভাবে পলি বহন করে। কিন্তু তাদের জীবন ছিল এসব প্রাকৃতিক ব্যবস্থার ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল।
বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, হিমালয় দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বায়ুপ্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ ভৌত বাধা হিসেবে কাজ করে এবং উপমহাদেশের জলবায়ু কাঠামোকে প্রভাবিত করে। তিব্বতি মালভূমির উত্থানও এশিয়ার জলবায়ুর দীর্ঘমেয়াদি বিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। ভূতাত্ত্বিক গবেষণা বলছে, তিব্বতি মালভূমি ও হিমালয়ের উত্থানের সঙ্গে এশীয় মৌসুমি জলবায়ুর বিকাশের দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। তাই হিমালয়কে শুধু ‘বরফের পাহাড়’ বলা ভুল। এটি এশিয়ার একটি বিশাল জলবায়ু-নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা।
বরফের নিচে লুকানো এশিয়ার ভবিষ্যৎ
হিন্দুকুশ–হিমালয় অঞ্চলকে বলা হয় ‘থার্ড পোল’ বা তৃতীয় মেরু। মেরু অঞ্চলের বাইরে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ বরফ ও তুষারভাণ্ডার এখানে। এই অঞ্চল থেকে উৎপত্তি হয়েছে এশিয়ার ১০টি বড় নদী ব্যবস্থার। এসব নদীর অববাহিকায় বসবাস করে প্রায় ২০০ কোটি মানুষ। হিমালয় অঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জীবন-জীবিকা যেমন এর ওপর নির্ভরশীল, তেমনি বহু দূরের সমভূমির কৃষি, শিল্প, বিদ্যুৎ ও নগরজীবনও এই পানির সঙ্গে যুক্ত।
এখানে একটি ভয়ংকর বৈপরীত্য আছে। যে বরফ হাজার হাজার বছর ধরে পানির সঞ্চয় হিসেবে কাজ করেছে, মানুষ এখন সেই বরফকে খুব দ্রুত হারাচ্ছে। ২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন আন্তর্জাতিক কেন্দ্র (আইসিআইএমওডি)-এর নতুন মূল্যায়ন বলছে, হিন্দুকুশ–হিমালয়ের হিমবাহে বরফ হারানোর হার ২০০০ সালের পর দ্বিগুণ হয়েছে। ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হিমবাহগুলোর মোট আয়তন প্রায় ১২ শতাংশ এবং অনুমিত বরফভাণ্ডার প্রায় ৯ শতাংশ কমেছে। ১৯৭৫ সালের তুলনায় কিছু অঞ্চলে বরফের পুরুত্বের ক্ষতি ২৭ মিটার পর্যন্ত হয়েছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০২৩ সালের আইসিআইএমওডি মূল্যায়নে দেখা যায়, ২০১১–২০২০ দশকে হিমবাহের বরফ হারানোর হার আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ বেশি ছিল। বর্তমান উচ্চ নিঃসরণ অব্যাহত থাকলে শতাব্দীর শেষে হিমবাহের বর্তমান আয়তনের বিপুল অংশ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।ভূমিধস নদী আটকে দিতে পারে। কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন পর সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে গেলে নেমে আসতে পারে আকস্মিক বন্যা। বরফ ও পাথরের ধস নদীতে পড়ে তৈরি করতে পারে ভয়াবহ ডেব্রিস ফ্লো বা ধ্বংসাবশেষ প্রবাহ।
অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে হিমবাহ ছোট হয়ে গেলে বরফ থেকে পাওয়া পানির মজুত কমে যায়। অর্থাৎ আজকের অতিরিক্ত পানি ভবিষ্যতের পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করে না; বরং একসময় উল্টো পানির ঘাটতি তৈরি করতে পারে। আইসিআইএমওডি-এর গবেষণাও বলছে, হিমবাহ ও তুষারের পরিবর্তনের ফলে মধ্য শতাব্দীর দিকে পানির প্রাপ্যতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে পরে কমতে পারে।
নীরব প্রান্তরে নিশ্চিন্ত প্রাণী
হিমালয় এমনিতেই ভূতাত্ত্বিকভাবে অস্থিতিশীল। তার ওপর বরফ গলছে, মাটির ভেতরের স্থায়ী বরফ বা পারমাফ্রস্ট বদলাচ্ছে, বৃষ্টির ধরন পাল্টাচ্ছে। এই অবস্থায় পাহাড় কেটে ভারী অবকাঠামো বসালে ঝুঁকি এক জায়গায় এসে জমা হয়।
আইসিআইএমওডি বলছে, হিমালয়ের ক্রায়োস্ফিয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে হড়পা বান বা আকস্মিক বন্যা, ধ্বংসাবশেষ প্রবাহ, ভূমিধসসহ বিভিন্ন দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়ছে এবং এর প্রভাব পড়ছে বসতি, অবকাঠামো, পানি, জ্বালানি ও খাদ্যনিরাপত্তায়।
জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানির প্রবাহ যখন অনিশ্চিত হয়ে উঠছে, তখন এই অবকাঠামোকেও নতুন ঝুঁকির হিসাবের মধ্যে আনতে হবে।
যে পাহাড়কে দেবতা ভাবত মানুষ
এখানে আধুনিক উন্নয়নের সঙ্গে প্রাচীন সভ্যতার একটি গভীর বৈপরীত্য দেখা যায়।হিমালয় মানুষের কাছে শুধু সম্পদ ছিল না। এটি ছিল পবিত্রতা। কৈলাস হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন এবং তিব্বতি বন ঐতিহ্যে পবিত্র। গঙ্গা শুধু নদী নয়—দেবী। অসংখ্য ঝরনা, বন, পাহাড়, পাথর, হ্রদ ও গুহা স্থানীয় মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত।
হিমালয়কে দেবতাই মনে করতো আদি পুরুষরা
আধুনিক মানুষ সেই জায়গায় বসিয়েছে অন্য একটি ধারণা—সম্পদ।পাহাড় মানে জলবিদ্যুৎ।নদী মানে বিদ্যুৎ।বন মানে কাঠ।জমি মানে রিয়েল এস্টেট।পাহাড় মানে পর্যটন।খনিজ মানে অর্থনীতি। এখানেই সভ্যতার সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব।
পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার
হিমালয়ের উচ্চতা কয়েক শ’ মিটারের সমভূমি থেকে আট হাজার মিটারেরও বেশি শৃঙ্গে পৌঁছেছে। এই বিপুল উচ্চতার পার্থক্য সৃষ্টি করেছে অসংখ্য ক্ষুদ্র জলবায়ু অঞ্চল।ফলে একই অঞ্চলের মধ্যে পাওয়া যায় উষ্ণ অরণ্য, নাতিশীতোষ্ণ বন, শঙ্কুযুক্ত বন, তৃণভূমি, আলপাইন অঞ্চল এবং তুষারভূমি।
হিন্দুকুশ–হিমালয় চারটি বৈশ্বিক ‘বায়োডাইভারসিটি হটস্পট’-এর সঙ্গে যুক্ত এবং এখানে ৩৫ হাজারের বেশি উদ্ভিদ, প্রায় ২০০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী ও প্রায় ১০ হাজার প্রজাতির পাখির উপস্থিতির কথা আইসিআইএমওডি উল্লেখ করেছে।
কিন্তু এই বৈচিত্র্য এখন চাপে। বন উজাড়, অতিচারণ, কৃষিজমির বিস্তার, নগরায়ণ, অবকাঠামো এবং জলবায়ু পরিবর্তন মিলিয়ে আবাসস্থল খণ্ডিত হচ্ছে। উচ্চ পাহাড়ের এমন অনেক প্রাণী আছে, যারা নির্দিষ্ট তাপমাত্রা ও উচ্চতার মধ্যে বেঁচে থাকে।
সভ্যতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হচ্ছে নদীকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। অথচ হিমালয়ের নদীগুলোকে আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছি। বাঁধ দিয়ে। ব্যারাজ দিয়ে। বিদ্যুৎকেন্দ্র দিয়ে। তীররক্ষা দিয়ে। নদীর গতিপথ বদলে। কিন্তু নদী কেবল পানির প্রবাহ নয়। নদী বহন করে পলি, শক্তি, জৈবপদার্থ, বীজ এবং জীবনের অসংখ্য উপাদান।
নদীকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ করতে গেলে তার স্বাভাবিক গতিশীলতাকে বাধাগ্রস্ত করা হয়। আর হিমালয়ের মতো তরুণ, সক্রিয় ও দ্রুত পরিবর্তনশীল পর্বতব্যবস্থায় সেই হস্তক্ষেপের ফল কখনো কখনো অনাকাঙ্ক্ষিত হতে পারে। প্রাচীন সভ্যতাগুলো নদীর সঙ্গে বসবাস করতে শিখেছিল। অথচ এ যুগে এসে আধুনিক সভ্যতা নদীকে নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী বদলাতে চায়। এই দুই দর্শনের মধ্যে পার্থক্যটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।উপমহাদেশের তিনটি ভবিষ্যৎ
হিমালয়ের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত তিনটি বড় প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। প্রথমত, পানি। সিন্ধু অববাহিকা ভারত ও পাকিস্তানের কোটি মানুষের কৃষির ভিত্তি। গঙ্গা ভারত ও বাংলাদেশের কোটি মানুষের জীবনধারার অংশ। ব্রহ্মপুত্র চীন, ভারত ও বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বহমান। হিমালয়ের বরফ ও তুষারের পরিবর্তন তাই সীমান্ত মানবে না।
দ্বিতীয়ত, খাদ্য। হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীর পানি এবং পলি দক্ষিণ এশিয়ার কৃষির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। পানি প্রবাহের সময় বদলে গেলে সেচব্যবস্থা, ফসলের ক্যালেন্ডার এবং কৃষি উৎপাদনও বদলাতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য বিপদটা কোথায়?
বাংলাদেশ হিমালয়ের পাদদেশে নয়। কিন্তু হিমালয়ের নদীর শেষ প্রান্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ। এই কারণে পাহাড়ে যা ঘটে, তার প্রতিক্রিয়া বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থায় পৌঁছাতে পারে। অতিরিক্ত বৃষ্টির সঙ্গে হিমবাহজাত পানির প্রবাহ মিললে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে বরফ ও তুষারের মজুত কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদি পানির প্রাপ্যতায় চাপ তৈরি হতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হবে— নদীভাঙন, পলি পরিবহন, কৃষি, মৎস্য, নদীর নাব্যতা, ভূগর্ভস্থ পানি, উপকূলীয় লবণাক্ততা এবং আন্তঃসীমান্ত পানি-রাজনীতি। বাংলাদেশ তাই হিমালয়ের দর্শক নয়। বরং বাংলাদেশ হিমালয়ের ডাউনস্ট্রিম স্টেকহোল্ডার বা পরবর্তী ধাপের অংশীজন। এই বাস্তবতাটি আমাদের জাতীয় জলবায়ু ও পানি নীতিতে আরও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার সময় এসেছে।২০২৩ সালের আইসিআইএমওডি মূল্যায়ন এই পরিবর্তনকে মানবসময়ের বিচারে ‘অভূতপূর্ব এবং অনেক ক্ষেত্রে অপরিবর্তনীয়’ বলে বর্ণনা করেছিল। ২০২৬ সালের নতুন তথ্য বলছে, বরফ হারানোর গতি আরও তীব্র হয়েছে। আর ২৬ আগস্টের নেপাল–তিব্বত বিপর্যয় আমাদের চোখের সামনে দেখিয়ে দিল—উচ্চ পাহাড়ে একটি পরিবর্তন কীভাবে কয়েক মিনিটের মধ্যে নদী, রাস্তা, বসতি, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও মানুষের জীবনকে একসঙ্গে বিপন্ন করতে পারে।
সভ্যতার ঋণ কি শোধ করতে পারব?
হাজার হাজার বছর আগে মানুষ হিমালয়ের কাছ থেকে নিয়েছিল পানি। নদী দিয়েছিল কৃষি। পলি দিয়েছিল উর্বর মাটি। বন দিয়েছিল খাদ্য ও জ্বালানি। পর্বত দিয়েছিল বৃষ্টি ও জলবায়ুর আশ্রয়। মানুষ সেই সম্পদের ওপর বসতি গড়েছে। নগর বানিয়েছে। সাম্রাজ্য তৈরি করেছে। ধর্ম ও সংস্কৃতি নির্মাণ করেছে। কোটি কোটি মানুষের জীবন দাঁড়িয়ে গেছে হিমালয় থেকে নেমে আসা পানির ওপর।
আজ সেই মানুষই পাহাড়ে আরও রাস্তা বানাচ্ছে, নদী আটকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, বন কাটছে, পর্যটননগরী বানাচ্ছে, কার্বন নিঃসরণ বাড়াচ্ছে। সভ্যতার সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ হয়তো এটাই—যে প্রকৃতি তাকে জন্ম দিয়েছে, উন্নয়নের নামে সেই প্রকৃতিকেই সে দুর্বল করে তুলছে।
কার্বন নিঃসরণ কমাতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে অপরিকল্পিত নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। হিমবাহ ও তুষারভাণ্ডার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। হিমবাহের হ্রদ ফেটে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের আগাম সতর্কতা বাড়াতে হবে। নদী অববাহিকাভিত্তিক পরিকল্পনা করতে হবে। ভারত, চীন, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে তথ্য বিনিময় বাড়াতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পের আগে পাহাড়ের ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ু ঝুঁকিকে বাধ্যতামূলকভাবে বিবেচনায় আনতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, হিমালয়কে সম্পদ হিসেবে দেখার পাশাপাশি একটি জীবন্ত ইকোসিস্টেম হিসেবে দেখতে হবে। কারণ পাহাড়ের ওপর যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তার ফল অনেক সময় পাহাড়ে থাকে না। তা নেমে আসে নদীতে। নদী থেকে সমতলে। সমতল থেকে কৃষিক্ষেতে। আর শেষ পর্যন্ত মানুষের ঘরে।হিমালয় হয়তো টিকে থাকবে। প্রশ্ন হলো—হিমালয় বদলে যাওয়ার পরও আমরা কি একই সভ্যতা হিসেবে টিকে থাকতে পারব?
লেখক: কবি ও সাংবাদিক

আপনার মতামত লিখুন