সংবাদ

ইতিহাস আজ ধ্বংসের মুখে, চোখে পড়ছে না কারো?


সামিয়া আক্তার
সামিয়া আক্তার
প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২২ পিএম

ইতিহাস আজ ধ্বংসের মুখে, চোখে পড়ছে না কারো?
রূপলাল হাউজ

সূত্রাপুর জমিদার বাড়ি

পুরান ঢাকার অলিতে গলিতে ছড়িয়ে আছে শত বছরের পুরনো অসংখ্য স্থাপনা। যা বিভিন্ন সময়ের ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। কিন্তু এসব স্থাপনা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়।

এর মধ্যে অন্যতম সূত্রাপুর জমিদার বাড়ি। এই জমিদার বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা প্রতাপশালী হিন্দু জমিদার রেবতী মোহন দাস। ২০ শতকের গোড়ার দিকে তিনি এই বাড়িটি নির্মাণ করেন।

পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলে এই বাড়ির মালিক হন তার ছেলে জমিদার রায় বাহাদুর সত্যেন্দ্রনাথ কুমার দাস। তিনি ওয়াল্টার রোড়ে অনেক গুলো বিজলী বাতি স্থাপনের জন্য অর্থ প্রদান করেন। এজন্য ওয়াল্টার রোড়ের একটি বিরাট অংশের নাম তার পিতা রেবতী মোহন দাস এর নামানুসারে রেবতী মোহন দাস বা সংক্ষেপে আর এম রোড় রাখা হয়।

কিন্তু দেশভাগের সময় জমিদার বাড়ির বংশধর গণবাড়িটি ছেড়ে চলে যায়। পরে বাড়িটি সরকারের তত্ত্বাবধায়নে চলে আসে।

পৃথক দুটি ৩তলা বিশিষ্ট ভবনের সমম্বয়ে তৈরি ভবনটিতে অসাধারণ ফুলপাতার কারুকার্য রয়েছে যা সময়ের স্থাপত্য শিল্পের নিদর্শন বহন করে। দক্ষিণের অংশটি বেশি প্রাচীন এবং এর প্রায় ৫০ ফুট উঁচু প্রবেশ মুখ রয়েছে। আর ছাদ তিনটি করিন্থিয়ান স্তম্ভ দ্বারা স্থাপিত। পুরো দালানের ভিতরে বিভিন্ন আয়তনের প্রায় ৩৫টি কক্ষ রয়েছে। অন্য দিকে উত্তর পার্শ্বের তিনতলা ভবনটি রেবতী মোহন দাসের কোন এক আত্মীয় নির্মাণ করেন বলে জানা যায়। এখানেও ৫০ ফুটের প্রবেশমুখ প্রায় সমান সংখ্যক কক্ষ রয়েছে।

কিন্তু বর্তমানে ভবনটি মলিন জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যা এখন ব্যবহৃত হয় ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্সের কোয়ার্টার হিসেবে। এতে করে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে এবং বসতি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় যথাযথ ভাবে সংরক্ষন সম্ভব হচ্ছে না।

 

রূপলাল হাউজ

রূপলাল হাউস বাংলাদেশের ঢাকার ফরাসগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত ঊনবিংশ শতাব্দীর এক বিশাল অট্টালিকা। ১৮২৫ সালে স্টিফেন আরাটুন নামের একজন আর্মেনীয় ব্যবসায়ী এটি নির্মাণ করেন। কিন্তু ১৮৪০ সালের দিকে ব্যবসায়ী রূপলাল দাশ তার ভাই রঘুনাথ দাশ এই বাড়িটি কিনে নেন। পরবর্তীতে, এই বাড়িটির নামকরণ হয়রূপলাল হাউজ ছোট ব্যবসা দিয়ে শুরু করে রূপলাল হয়ে ওঠেন শহরের ধনীদের মধ্যে অন্যতম একজন।

রূপলাল হাউজের সৌন্দর্য ছিল নৈস্বর্গিক। বুড়িগঙ্গার পাড় ঘেঁষে প্রতিষ্ঠিত এই অট্টালিকার মধ্যে প্রায় ৫০টি ঘর, জলশা ঘর বিভিন্ন আলোচনা কক্ষ ছিল। যা তিনটি ব্লকে বিভক্ত ছিল যথা- রূপলাল ব্লক, রঘুনাথ ব্লক কেন্দ্রীয় ব্লক। এর জানালা, দরজা, বারান্দা ভিতের কারুকার্য অত্যন্ত শৈল্পিক। এছাড়া বুড়িগঙ্গার স্নিগ্ধ বাতাস এক অন্যরকম আবহ তৈরি করতো।

রূপলাল হাউজ প্রথম আলোচনায় আসে ১৮৮৬ সালে যখন রূপলাল দাশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড ডাফরিনের সম্মানে একটি বল ডান্স পার্টির আয়োজন করেন। এছাড়া ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগীতজ্ঞ শিল্পরা আসতেন যার মধ্যে কাজী নজরুল ইসলামের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আর এটি ছিল তখনকার সময়ে ঢাকা বিলাসবহুল ২টি বাড়ির মধ্যে একটি।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পরে রূপলাল দাশের পরিবার কলকাতায় চলে যায়। পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে একটি আনুষ্ঠানিক বিনিময় দলিলের মাধ্যমে সিদ্দিক জামাল বাড়িটি কিনে নেয়।

ইতিহাসের চিহ্ন বহনকারী এই অট্টালিকা এখনও দাঁড়িয়ে আছে পরম অযত্ন আর অবহেলায়। যা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে কয়েক দশকের খন্ডিত মালিকানা আর সীমিত রক্ষণাবেক্ষণের ফলে ধসে পড়া দেয়াল, ভেঙে পড়া সিলিং, দেয়ালের চিরে জন্মানো আগাছা, জমধরা লোহার নকশা আর দেয়ালের বের হওয়া যাওয়া ইটে।

সম্প্রতি, প্রত্মতত্ত্ব বিভাগ কিছু অংশের রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার পেলেও সম্পুর্ণ এর আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। রূপলাল হাউজের ধ্বংস শুধু একটি ভবনের ধ্বংস নয় বরং ঊনিশ শতকের ইতিহাস ঐতিহ্যের ধ্বংস।

[লেখক: শিক্ষার্থী, ‎ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

 

 

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬


ইতিহাস আজ ধ্বংসের মুখে, চোখে পড়ছে না কারো?

প্রকাশের তারিখ : ২৭ আগস্ট ২০২৬

featured Image

সূত্রাপুর জমিদার বাড়ি

পুরান ঢাকার অলিতে গলিতে ছড়িয়ে আছে শত বছরের পুরনো অসংখ্য স্থাপনা। যা বিভিন্ন সময়ের ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। কিন্তু এসব স্থাপনা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে যথেষ্ট ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়।

এর মধ্যে অন্যতম সূত্রাপুর জমিদার বাড়ি। এই জমিদার বাড়ির প্রতিষ্ঠাতা প্রতাপশালী হিন্দু জমিদার রেবতী মোহন দাস। ২০ শতকের গোড়ার দিকে তিনি এই বাড়িটি নির্মাণ করেন।

পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলে এই বাড়ির মালিক হন তার ছেলে জমিদার রায় বাহাদুর সত্যেন্দ্রনাথ কুমার দাস। তিনি ওয়াল্টার রোড়ে অনেক গুলো বিজলী বাতি স্থাপনের জন্য অর্থ প্রদান করেন। এজন্য ওয়াল্টার রোড়ের একটি বিরাট অংশের নাম তার পিতা রেবতী মোহন দাস এর নামানুসারে রেবতী মোহন দাস বা সংক্ষেপে আর এম রোড় রাখা হয়।

কিন্তু দেশভাগের সময় জমিদার বাড়ির বংশধর গণবাড়িটি ছেড়ে চলে যায়। পরে বাড়িটি সরকারের তত্ত্বাবধায়নে চলে আসে।

পৃথক দুটি ৩তলা বিশিষ্ট ভবনের সমম্বয়ে তৈরি ভবনটিতে অসাধারণ ফুলপাতার কারুকার্য রয়েছে যা সময়ের স্থাপত্য শিল্পের নিদর্শন বহন করে। দক্ষিণের অংশটি বেশি প্রাচীন এবং এর প্রায় ৫০ ফুট উঁচু প্রবেশ মুখ রয়েছে। আর ছাদ তিনটি করিন্থিয়ান স্তম্ভ দ্বারা স্থাপিত। পুরো দালানের ভিতরে বিভিন্ন আয়তনের প্রায় ৩৫টি কক্ষ রয়েছে। অন্য দিকে উত্তর পার্শ্বের তিনতলা ভবনটি রেবতী মোহন দাসের কোন এক আত্মীয় নির্মাণ করেন বলে জানা যায়। এখানেও ৫০ ফুটের প্রবেশমুখ প্রায় সমান সংখ্যক কক্ষ রয়েছে।

কিন্তু বর্তমানে ভবনটি মলিন জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। যা এখন ব্যবহৃত হয় ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্সের কোয়ার্টার হিসেবে। এতে করে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক এর রক্ষণাবেক্ষণ ব্যাহত হচ্ছে এবং বসতি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ায় যথাযথ ভাবে সংরক্ষন সম্ভব হচ্ছে না।

 

রূপলাল হাউজ

রূপলাল হাউস বাংলাদেশের ঢাকার ফরাসগঞ্জ এলাকায় অবস্থিত ঊনবিংশ শতাব্দীর এক বিশাল অট্টালিকা। ১৮২৫ সালে স্টিফেন আরাটুন নামের একজন আর্মেনীয় ব্যবসায়ী এটি নির্মাণ করেন। কিন্তু ১৮৪০ সালের দিকে ব্যবসায়ী রূপলাল দাশ তার ভাই রঘুনাথ দাশ এই বাড়িটি কিনে নেন। পরবর্তীতে, এই বাড়িটির নামকরণ হয়রূপলাল হাউজ ছোট ব্যবসা দিয়ে শুরু করে রূপলাল হয়ে ওঠেন শহরের ধনীদের মধ্যে অন্যতম একজন।

রূপলাল হাউজের সৌন্দর্য ছিল নৈস্বর্গিক। বুড়িগঙ্গার পাড় ঘেঁষে প্রতিষ্ঠিত এই অট্টালিকার মধ্যে প্রায় ৫০টি ঘর, জলশা ঘর বিভিন্ন আলোচনা কক্ষ ছিল। যা তিনটি ব্লকে বিভক্ত ছিল যথা- রূপলাল ব্লক, রঘুনাথ ব্লক কেন্দ্রীয় ব্লক। এর জানালা, দরজা, বারান্দা ভিতের কারুকার্য অত্যন্ত শৈল্পিক। এছাড়া বুড়িগঙ্গার স্নিগ্ধ বাতাস এক অন্যরকম আবহ তৈরি করতো।

রূপলাল হাউজ প্রথম আলোচনায় আসে ১৮৮৬ সালে যখন রূপলাল দাশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড ডাফরিনের সম্মানে একটি বল ডান্স পার্টির আয়োজন করেন। এছাড়া ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সংগীতজ্ঞ শিল্পরা আসতেন যার মধ্যে কাজী নজরুল ইসলামের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আর এটি ছিল তখনকার সময়ে ঢাকা বিলাসবহুল ২টি বাড়ির মধ্যে একটি।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের পরে রূপলাল দাশের পরিবার কলকাতায় চলে যায়। পরবর্তীতে ১৯৬২ সালে একটি আনুষ্ঠানিক বিনিময় দলিলের মাধ্যমে সিদ্দিক জামাল বাড়িটি কিনে নেয়।

ইতিহাসের চিহ্ন বহনকারী এই অট্টালিকা এখনও দাঁড়িয়ে আছে পরম অযত্ন আর অবহেলায়। যা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে কয়েক দশকের খন্ডিত মালিকানা আর সীমিত রক্ষণাবেক্ষণের ফলে ধসে পড়া দেয়াল, ভেঙে পড়া সিলিং, দেয়ালের চিরে জন্মানো আগাছা, জমধরা লোহার নকশা আর দেয়ালের বের হওয়া যাওয়া ইটে।

সম্প্রতি, প্রত্মতত্ত্ব বিভাগ কিছু অংশের রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার পেলেও সম্পুর্ণ এর আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। রূপলাল হাউজের ধ্বংস শুধু একটি ভবনের ধ্বংস নয় বরং ঊনিশ শতকের ইতিহাস ঐতিহ্যের ধ্বংস।

[লেখক: শিক্ষার্থী, ‎ইতিহাস বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়]

 

 


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত