চট্টগ্রাম বন্দরের কর্ণফুলী নদীতীরে লালদিয়ার চরে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় টার্মিনাল অপারেটর ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালস নির্মাণ করতে চলেছে একটি আধুনিক গ্রিনফিল্ড কন্টেনার টার্মিনাল। ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগে তৈরি এই টার্মিনাল চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরে যুক্ত হবে বছরে ৮ লাখের বেশি টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা। বড় জাহাজ সরাসরি ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হওয়ায় আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ব্যয় ও সময় কমানোর নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এপিএম টার্মিনালস এবং স্থানীয় অংশীদার কিউএনএস কন্টেনার সার্ভিসেস লিমিটেডের চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কাঠামোর এই প্রকল্পে টার্মিনালটি নকশা, অর্থায়ন, নির্মাণ ও পরিচালনা করবে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। বন্দর কর্তৃপক্ষ জমির মালিকানা ধরে রাখবে। ৩০ বছরের কনসেশন মেয়াদ শেষে কার্যক্রমের শর্ত পূরণ সাপেক্ষে মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
কর্ণফুলী নদীর পাড়ের ৫৯.১৫ একর জায়গায় হবে টার্মিনালটি। এর মধ্যে ৩২ একরে মূল টার্মিনাল, ৭.১৫ একরে কন্টেনার ইয়ার্ড এবং ১০ একরে ট্রাক পার্কিং। নির্মাণকাল ৩ বছর। অপারেশন চলবে ৩০ বছর, প্রয়োজনে বাড়বে আরও ১৫ বছর। বছরে ৯ লাখ টিইইউএস হ্যান্ডলিং ক্ষমতার টার্মিনালে ৬১৩ মিটারের জেটিতে ভিড়তে পারবে ১০.৫ মিটার ড্রাফট ও ৬ হাজার টিইইউএস ধারণক্ষমতার বড় জাহাজ।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষও প্রকল্প থেকে সরাসরি আর্থিক সুবিধা পাবে। প্রথম ৮ লাখ টিইইউএস পর্যন্ত প্রতি কন্টেনারে বন্দর কর্তৃপক্ষ ২১ মার্কিন ডলার এবং ৮ লাখের বেশি থেকে ৯ লাখ টিইইউএস পর্যন্ত ২৩ ডলার করে পাবে। এপিএম টার্মিনালস থেকে ২৫ মিলিয়ন ডলার এককালীন পেয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বছরে পাবে আড়াই লাখ ডলার কনসেশন ফি। প্রকল্প এলাকা থেকে উচ্ছেদ হওয়া ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে ১৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে এপিএম টার্মিনালস। ২০৩০ সালে অপারেশনে যাবে লালদিয়া টার্মিনাল।
প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর সক্ষমতা ও প্রযুক্তি। লালদিয়া টার্মিনালে থাকবে সাতটি শিপ-টু-শোর (এসটিএস) গ্যান্ট্রি ক্রেন, ৩২টি ইলেকট্রিক রাবার-টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন এবং ৪১টি ইলেকট্রিক টার্মিনাল ট্রাক্টর। থাকবে ৬১৩ মিটার দীর্ঘ কন্টেনার জেটি। টার্মিনালটি ১০.৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ বার্থিংয়ের উপযোগী করে তৈরি করা হবে এবং সর্বোচ্চ ৬ হাজার টিইইউ ধারণক্ষমতার কন্টেনার জাহাজ এখানে ভিড়তে পারবে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের আকারের সীমাবদ্ধতা থাকায় বড় কন্টনার জাহাজের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো যায় না। এ টার্মিনালে তা সম্ভব হবে, যা ফিডার নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি বড় জাহাজে পণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়াবে।
পিপিপি কর্তৃপক্ষ জানায়, টার্মিনাল চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় ৪৪ শতাংশ বাড়তে পারে। পুরো প্রকল্পটি বেসরকারি বিনিয়োগে নির্মিত ও পরিচালিত হবে। আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি দেশে আসবে। টার্মিনালটি হবে ‘গ্রিন টার্মিনাল’, যেখানে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। ক্রেনগুলো অফিস থেকে দূরনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।
লালদিয়া টার্মিনালকে ঘিরে ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘বিশ্বের সেরা একটি কোম্পানি বাংলাদেশে গ্রিনফিল্ড প্রজেক্ট করছে, এটি আমাদের জন্য গৌরবের। এটি গেম চেঞ্জার প্রজেক্ট।’ ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, টার্মিনালটি শুধু তথ্যপ্রযুক্তি সমৃদ্ধ গ্রিন প্রজেক্টই নয়, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্র্যান্ডিং করবে।এপিএম টার্মিনালস বিশ্বের ৬০টির বেশি দেশে টার্মিনাল পরিচালনা করে। বিশ্বের শীর্ষ ২০টি দক্ষ কন্টেনার বন্দরের ১০টিতে তাদের কার্যক্রম রয়েছে। লালদিয়াকে তারা দক্ষিণ এশিয়ায় আধুনিক, কম কার্বন নিঃসরণ ও জ্বালানি সাশ্রয়ী টার্মিনালের প্রদর্শনী প্রকল্প হিসেবে গড়তে চায়।
শুধু বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো নয়, এর প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের পুরো সাপ্লাই চেইনে। পোশাক, চামড়া, ওষুধ, কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে সময়মতো পণ্য পৌঁছানো এখন গুরুত্বপূর্ণ। বড় জাহাজ সরাসরি চট্টগ্রামে ভেড়ার সুযোগ পেলে পণ্য পরিবহনে অপেক্ষার সময় কমতে পারে। নির্মাণ ও পরিচালন পর্যায়ে সরাসরি ৫০০ থেকে ৭০০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট খাতে কয়েক হাজার পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে।
রোববার (৩০ আগস্ট) চট্টগ্রামের পতেঙ্গা বোট ক্লাব সংলগ্ন এলাকায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক নির্মাণকাজ শুরু হবে লালদিয়া এপিএম টার্মিনালের।

শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬
চট্টগ্রাম বন্দরের কর্ণফুলী নদীতীরে লালদিয়ার চরে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় টার্মিনাল অপারেটর ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালস নির্মাণ করতে চলেছে একটি আধুনিক গ্রিনফিল্ড কন্টেনার টার্মিনাল। ৫৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিদেশি বিনিয়োগে তৈরি এই টার্মিনাল চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরে যুক্ত হবে বছরে ৮ লাখের বেশি টিইইউএস কন্টেনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা। বড় জাহাজ সরাসরি ভেড়ানোর সুযোগ তৈরি হওয়ায় আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের ব্যয় ও সময় কমানোর নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এপিএম টার্মিনালস এবং স্থানীয় অংশীদার কিউএনএস কন্টেনার সার্ভিসেস লিমিটেডের চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কাঠামোর এই প্রকল্পে টার্মিনালটি নকশা, অর্থায়ন, নির্মাণ ও পরিচালনা করবে বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান। বন্দর কর্তৃপক্ষ জমির মালিকানা ধরে রাখবে। ৩০ বছরের কনসেশন মেয়াদ শেষে কার্যক্রমের শর্ত পূরণ সাপেক্ষে মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
কর্ণফুলী নদীর পাড়ের ৫৯.১৫ একর জায়গায় হবে টার্মিনালটি। এর মধ্যে ৩২ একরে মূল টার্মিনাল, ৭.১৫ একরে কন্টেনার ইয়ার্ড এবং ১০ একরে ট্রাক পার্কিং। নির্মাণকাল ৩ বছর। অপারেশন চলবে ৩০ বছর, প্রয়োজনে বাড়বে আরও ১৫ বছর। বছরে ৯ লাখ টিইইউএস হ্যান্ডলিং ক্ষমতার টার্মিনালে ৬১৩ মিটারের জেটিতে ভিড়তে পারবে ১০.৫ মিটার ড্রাফট ও ৬ হাজার টিইইউএস ধারণক্ষমতার বড় জাহাজ।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষও প্রকল্প থেকে সরাসরি আর্থিক সুবিধা পাবে। প্রথম ৮ লাখ টিইইউএস পর্যন্ত প্রতি কন্টেনারে বন্দর কর্তৃপক্ষ ২১ মার্কিন ডলার এবং ৮ লাখের বেশি থেকে ৯ লাখ টিইইউএস পর্যন্ত ২৩ ডলার করে পাবে। এপিএম টার্মিনালস থেকে ২৫ মিলিয়ন ডলার এককালীন পেয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বছরে পাবে আড়াই লাখ ডলার কনসেশন ফি। প্রকল্প এলাকা থেকে উচ্ছেদ হওয়া ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে ১৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে এপিএম টার্মিনালস। ২০৩০ সালে অপারেশনে যাবে লালদিয়া টার্মিনাল।
প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এর সক্ষমতা ও প্রযুক্তি। লালদিয়া টার্মিনালে থাকবে সাতটি শিপ-টু-শোর (এসটিএস) গ্যান্ট্রি ক্রেন, ৩২টি ইলেকট্রিক রাবার-টায়ার্ড গ্যান্ট্রি ক্রেন এবং ৪১টি ইলেকট্রিক টার্মিনাল ট্রাক্টর। থাকবে ৬১৩ মিটার দীর্ঘ কন্টেনার জেটি। টার্মিনালটি ১০.৫ মিটার ড্রাফটের জাহাজ বার্থিংয়ের উপযোগী করে তৈরি করা হবে এবং সর্বোচ্চ ৬ হাজার টিইইউ ধারণক্ষমতার কন্টেনার জাহাজ এখানে ভিড়তে পারবে।
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজের আকারের সীমাবদ্ধতা থাকায় বড় কন্টনার জাহাজের পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো যায় না। এ টার্মিনালে তা সম্ভব হবে, যা ফিডার নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি বড় জাহাজে পণ্য পরিবহনের সুযোগ বাড়াবে।
পিপিপি কর্তৃপক্ষ জানায়, টার্মিনাল চালু হলে চট্টগ্রাম বন্দরের কন্টেনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা প্রায় ৪৪ শতাংশ বাড়তে পারে। পুরো প্রকল্পটি বেসরকারি বিনিয়োগে নির্মিত ও পরিচালিত হবে। আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি দেশে আসবে। টার্মিনালটি হবে ‘গ্রিন টার্মিনাল’, যেখানে সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। ক্রেনগুলো অফিস থেকে দূরনিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হবে।
লালদিয়া টার্মিনালকে ঘিরে ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, ‘বিশ্বের সেরা একটি কোম্পানি বাংলাদেশে গ্রিনফিল্ড প্রজেক্ট করছে, এটি আমাদের জন্য গৌরবের। এটি গেম চেঞ্জার প্রজেক্ট।’ ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, টার্মিনালটি শুধু তথ্যপ্রযুক্তি সমৃদ্ধ গ্রিন প্রজেক্টই নয়, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে ব্র্যান্ডিং করবে।এপিএম টার্মিনালস বিশ্বের ৬০টির বেশি দেশে টার্মিনাল পরিচালনা করে। বিশ্বের শীর্ষ ২০টি দক্ষ কন্টেনার বন্দরের ১০টিতে তাদের কার্যক্রম রয়েছে। লালদিয়াকে তারা দক্ষিণ এশিয়ায় আধুনিক, কম কার্বন নিঃসরণ ও জ্বালানি সাশ্রয়ী টার্মিনালের প্রদর্শনী প্রকল্প হিসেবে গড়তে চায়।
শুধু বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো নয়, এর প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের পুরো সাপ্লাই চেইনে। পোশাক, চামড়া, ওষুধ, কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে সময়মতো পণ্য পৌঁছানো এখন গুরুত্বপূর্ণ। বড় জাহাজ সরাসরি চট্টগ্রামে ভেড়ার সুযোগ পেলে পণ্য পরিবহনে অপেক্ষার সময় কমতে পারে। নির্মাণ ও পরিচালন পর্যায়ে সরাসরি ৫০০ থেকে ৭০০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট খাতে কয়েক হাজার পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে।
রোববার (৩০ আগস্ট) চট্টগ্রামের পতেঙ্গা বোট ক্লাব সংলগ্ন এলাকায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক নির্মাণকাজ শুরু হবে লালদিয়া এপিএম টার্মিনালের।

আপনার মতামত লিখুন