সুন্দরবনের সবচেয়ে পরিচিত ও নিরীহ প্রাণী চিত্রা হরিণ। এরা সাধারণত দলবদ্ধভাবে থাকে এবং প্রধানত ঘাস, লতাপাতা ও ফলমূল খেয়ে বাঁচে। কিন্তু লাভের লোভে সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার কিছু চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই নিরীহ প্রাণী শিকার করে আসছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বরগুনার পাথরঘাটা এলাকা থেকে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন নৌপথে নেছারাবাদে হরিণের মাংস পাচার করা হচ্ছে। কাঠ, গোলপাতা ও মাছবাহী ট্রলারে অত্যন্ত সুকৌশলে এসব মাংস আনা হয়। পরে তা পৌঁছে দেওয়া হয় স্থানীয় অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতে।
এমনকি দীর্ঘদিন সংরক্ষণের ফলে পচে যাওয়া মাংস কিংবা হরিণের মাংসের সঙ্গে অন্য প্রাণীর মাংস মিশিয়ে বিক্রির অভিযোগও করেছেন অনেকে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) দুপুরে পিরোজপুরের নেছারাবাদে অভিযান চালিয়ে ২২০ কেজি হরিণের মাংসসহ দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে নৌপুলিশ। উপজেলার ভরতকাঠি খেয়াঘাট এলাকার বেলুয়া নদীতে একটি কাঠবাহী ট্রলারে তল্লাশি চালিয়ে এসব মাংস উদ্ধার করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন– বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার খাসতবক গ্রামের মো. খলিল (৪১) এবং একই উপজেলার তাফালবাড়িয়া গ্রামের বাবুল ফরাজি (৪২)।
দৈহারী নৌপুলিশ ফাঁড়ি সূত্রে জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সোমবার দুপুরে ভরতকাঠি খেয়াঘাট এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় একটি সন্দেহভাজন ট্রলার থামিয়ে তল্লাশি করা হলে বস্তাভর্তি ২২০ কেজি হরিণের মাংস পাওয়া যায়। পরে মাংস পরিবহনের দায়ে ট্রলারে থাকা খলিল ও বাবুলকে গ্রেপ্তার করা হয়।
দৈহারী নৌপুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. নিয়াজ মোর্শেদ জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে থানায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে । জব্দকৃত মাংসের বিষয়ে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সুন্দরবন থেকে বন্যপ্রাণী পাচার শুধু হরিণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, দেশের বন্যপ্রাণীর অবৈধ ব্যবসা দিন দিন বড় হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পাচারকারীচক্রের কাছে বন্যপ্রাণীর অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ । পাচার হওয়া বন্যপ্রাণীদের একটি বড় অংশের উৎস সুন্দরবন ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকা। পাচার হওয়া বন্যপ্রাণীদের তালিকায় রয়েছে বাঘ, কুমির, হরিণ, সাপ, তক্ষক, কচ্ছপ ও হাঙ্গর।
হরিণের মাংসের দামও এই পাচারের অন্যতম কারণ। সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় হরিণের প্রতি কেজি মাংস ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়, আর জেলা শহরে প্রতি কেজি হরিণের মাংসের দাম ১,০০০ টাকা থেকে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় । গরু ও খাসির মাংসের তুলনায় হরিণের মাংসের দাম কম হওয়ায় সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় এই বন্যপ্রাণীর মাংসের চাহিদা বাড়ছে।
বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬ অনুযায়ী, হরিণ শিকার ও পাচারের শাস্তি সর্বোচ্চ ১ বছর কারাদণ্ড বা ১ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড । একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটালে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড বা ২ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে।
যদিও এই আইনের কঠোরতা থাকলেও, এলাকাবাসীর দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে মাঝেমধ্যে পাচারকারীরা ধরা পড়লেও মূল হোতারা আড়ালে থেকে যাচ্ছে। বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি হরিণ শিকারি ও পাচারকারী পুরো চক্রকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
হরিণ শিকার বন্ধে তথ্য প্রদানকারীকে বনের ভেতরের জন্য ২০ হাজার টাকা এবং বনের বাইরে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা রয়েছে। কিন্তু তথ্য প্রদানের নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তার অভাবে অনেকেই এগিয়ে আসছেন না। সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থান টিকিয়ে রাখতে এই নিরীহ প্রাণীদের রক্ষা করা জরুরি।

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সুন্দরবনের সবচেয়ে পরিচিত ও নিরীহ প্রাণী চিত্রা হরিণ। এরা সাধারণত দলবদ্ধভাবে থাকে এবং প্রধানত ঘাস, লতাপাতা ও ফলমূল খেয়ে বাঁচে। কিন্তু লাভের লোভে সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকার কিছু চক্র দীর্ঘদিন ধরে এই নিরীহ প্রাণী শিকার করে আসছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বরগুনার পাথরঘাটা এলাকা থেকে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন নৌপথে নেছারাবাদে হরিণের মাংস পাচার করা হচ্ছে। কাঠ, গোলপাতা ও মাছবাহী ট্রলারে অত্যন্ত সুকৌশলে এসব মাংস আনা হয়। পরে তা পৌঁছে দেওয়া হয় স্থানীয় অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতে।
এমনকি দীর্ঘদিন সংরক্ষণের ফলে পচে যাওয়া মাংস কিংবা হরিণের মাংসের সঙ্গে অন্য প্রাণীর মাংস মিশিয়ে বিক্রির অভিযোগও করেছেন অনেকে।
সোমবার (৩১ আগস্ট) দুপুরে পিরোজপুরের নেছারাবাদে অভিযান চালিয়ে ২২০ কেজি হরিণের মাংসসহ দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে নৌপুলিশ। উপজেলার ভরতকাঠি খেয়াঘাট এলাকার বেলুয়া নদীতে একটি কাঠবাহী ট্রলারে তল্লাশি চালিয়ে এসব মাংস উদ্ধার করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন– বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার খাসতবক গ্রামের মো. খলিল (৪১) এবং একই উপজেলার তাফালবাড়িয়া গ্রামের বাবুল ফরাজি (৪২)।
দৈহারী নৌপুলিশ ফাঁড়ি সূত্রে জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সোমবার দুপুরে ভরতকাঠি খেয়াঘাট এলাকায় অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় একটি সন্দেহভাজন ট্রলার থামিয়ে তল্লাশি করা হলে বস্তাভর্তি ২২০ কেজি হরিণের মাংস পাওয়া যায়। পরে মাংস পরিবহনের দায়ে ট্রলারে থাকা খলিল ও বাবুলকে গ্রেপ্তার করা হয়।
দৈহারী নৌপুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. নিয়াজ মোর্শেদ জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে থানায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে । জব্দকৃত মাংসের বিষয়ে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সুন্দরবন থেকে বন্যপ্রাণী পাচার শুধু হরিণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, দেশের বন্যপ্রাণীর অবৈধ ব্যবসা দিন দিন বড় হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পাচারকারীচক্রের কাছে বন্যপ্রাণীর অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ । পাচার হওয়া বন্যপ্রাণীদের একটি বড় অংশের উৎস সুন্দরবন ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকা। পাচার হওয়া বন্যপ্রাণীদের তালিকায় রয়েছে বাঘ, কুমির, হরিণ, সাপ, তক্ষক, কচ্ছপ ও হাঙ্গর।
হরিণের মাংসের দামও এই পাচারের অন্যতম কারণ। সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় হরিণের প্রতি কেজি মাংস ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়, আর জেলা শহরে প্রতি কেজি হরিণের মাংসের দাম ১,০০০ টাকা থেকে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয় । গরু ও খাসির মাংসের তুলনায় হরিণের মাংসের দাম কম হওয়ায় সুন্দরবন-সংলগ্ন এলাকায় এই বন্যপ্রাণীর মাংসের চাহিদা বাড়ছে।
বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬ অনুযায়ী, হরিণ শিকার ও পাচারের শাস্তি সর্বোচ্চ ১ বছর কারাদণ্ড বা ১ লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ড । একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটালে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড বা ২ লাখ টাকা জরিমানা হতে পারে।
যদিও এই আইনের কঠোরতা থাকলেও, এলাকাবাসীর দাবি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে মাঝেমধ্যে পাচারকারীরা ধরা পড়লেও মূল হোতারা আড়ালে থেকে যাচ্ছে। বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি হরিণ শিকারি ও পাচারকারী পুরো চক্রকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।
হরিণ শিকার বন্ধে তথ্য প্রদানকারীকে বনের ভেতরের জন্য ২০ হাজার টাকা এবং বনের বাইরে ১০ হাজার টাকা পুরস্কার ঘোষণা রয়েছে। কিন্তু তথ্য প্রদানের নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তার অভাবে অনেকেই এগিয়ে আসছেন না। সুন্দরবনের বাস্তুসংস্থান টিকিয়ে রাখতে এই নিরীহ প্রাণীদের রক্ষা করা জরুরি।

আপনার মতামত লিখুন