অপভ্রংশ স্বপ্নমালা
মাটির মমতাঘেরা স্বপ্নগুলো উচ্ছেদের উলঙ্গ পরোয়ানায় পরঘরী হয়ে যায়
আশ্রিত ঘরের ফুটো চালে একবিন্দু নীল আকাশের দেখা পেলে
আমার কল্পনাপাখা
উড়ে-উড়ে দেখে আসে
বসতভিটির হরিৎভূমিতে বুলডোজারের প্রেতনৃত্য
ছোটো মাছ, রাজকাঁকড়ার বিচরণে ছলছল জলসেই খালটাতে
এখন কনক্রিটের বাঁধের পাহারা
পাশের সকলে চলে গেছে যে যেদিকে পারে খোঁড়াতে-খোঁড়াতে
গরিব-গুরবার দল
জুমের আদরলাগা মাচাংঘর কবে থেকে কাত হয়ে আছে
থাক-থাক করে রাখা সিমেন্টের বস্তার কিনারে
ঠোঁটের ওপর লালঘেরওলা বনমোরগ দূরের ডালে বসে
সব হারানোর যন্ত্রণা নীরবে সয় ঘাড় নুয়ে
আধপোড়া ভিটায় আমার স্বপ্নমালা
ভস্মমাখা বিবর্ণ ঘাসের বিছানায়
হতাশার বিবমিষা ঝাড়ে গড়াতে-গড়াতে ...
আমার দুর্ধর্ষ স্পৃহা
কুমড়ার জেদি, অগ্রসরমান লতার মতন
আমার স্পৃহাকে কাটতে পারে না
কোনো দারিদ্র্য বা দুঃখের করাত
আমার মনের গাইরিং
বোমাং থংয়ের পথের ধারের শৈ শৈ ক্যাফে
দিনভর কাজ আর রাতজাগা
কনসার্টের উদ্যম আনে
নাগকেশরের চাপা সুগন্ধের মতো
জ্যেষ্ঠজনেদের জ্ঞানে
আমার পরান ঝোপে-ঝোপে
পাখিদের বাসায় ঘুমায়
দূরের মাটির মই বেয়ে স্বর্গে যাবার রাস্তায়
ঘিলাফুলে খেলে কলরবে
আমার ভেতরে জেগে থাকা হাসিখুশি শিশুবেলা
আঁধার রাইতে তারার নয়নে চোখ রেখে
ইজোরে গভীর নিদ্রা এলে
খোয়াবে নিড়ানি হাতে
সাফ করি
মাথাচাড়া দেওয়া সব পরগাছা
ধলপহরে সোনার আলো হয়ে ফুটুক বরপরঙে হারা গৌরবের ফুলগুলো ...
:: গাইরিং : ত্রিপুরা শব্দ। জুমভূমির অস্থায়ী ঘর।
:: বোমাং থং : মারমা শব্দ। বান্দরবান অর্থাৎ ঐতিহ্যবাহী বোমাং সার্কেল।
:: ঘিলাফুল : চাকমা শব্দ। শিশুদের প্রাকৃতিক খেলার সামগ্রী।
:: ইজোর : চাকমা শব্দ। বাঁশের তৈরি মাচাং ঘরের সামনের খোলা অংশ।
:: বরপরঙ : চাকমা শব্দ। কাপ্তাই বাঁধের ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষের স্থানচ্যুতি।
বনজুঁইগাথা
বনজুঁইগুচ্ছ আমাকে থামিয়ে রাখে আলাভোলা পথের কিনারে
দশদিক থেকে রেশমি হাওয়ারা আসে মৃদু-মন্দ, কাঁপে বনজুঁই
চাপালিশ, অর্জুনের বড়-বড় কাঁচাপাকা পাতাগুলো হাত নাড়ে
বিশেষ মুদ্রায়— এই বিজন ছায়ায় শান্তি পাবি, এইখানে আয় তুই
এই মন তবু সরেনাকো ঝোপের রূপসী বনজুঁইগুচ্ছের চৌহদ্দি থেকে
ঘিরে-ঘিরে ওদের নিরালা ঘর দেখে আর চাপা-চাপা গন্ধে উহাদের সঙ্গে
মিঠা-মিঠা কথা কয় অর্জুন ও চাপালিশদের অবিশ্বাসী সাক্ষী রেখে
গুঞ্জনের ঢেউ তুলে আচানক বুকজুড়ে বসে কালো এক মধুকর রাজকীয় রঙ্গে
বনজুঁইগুচ্ছ গোস্সা হয়ে ঝরে পড়ে নিচে দূর্বাশীর্ষে থোকার নিবাস ছেড়ে
বনপিঁপড়ের দল গভীর মাতম তুলে পড়ে থাকা বনজুঁইদের নিয়ে যায়
মাটির হলুদ আঁকাবাঁকা পথ ধরে আরও-আরও ভেতরের ঘেরে
শোকে মনভার হয়ে আসা আমিও ওদের লগে মিশে যাই খুদে পায়-পায়
বনজুঁইদের শববাহী আমরা যখন কাঁদতে-কাঁদতে ভেসেছি ঝিরির জলে
ঠান্ডা রোদে— লতার ছায়ায়— ধুলোবালির পোশাকে নিঃশব্দ জঙ্গলে
এই বিশ্বভুবনের রাজার প্রাসাদ, আমজনতার কেহ কিছু জানে না তা
শুধু জানে নির্বিকার অর্জুন, গর্জন, চাপালিশ আর তাহাদের বড়-বড় পাতা ...
জুম্মবুড়ি
মিষ্টিকুমড়ার লতা পেড়ে আনো সই নখের আলগা-আলগা খোঁচায়
পুরোনো কাঠের হামানদিস্তায় জুম-মরিচের ঝাঁজালো ভর্তায়
ভাপে সিদ্ধ ওই লতায় আজকে হবে
দুপুরের খাবারদাবার
অত দুদ্দুরাদন কেন রে ভাই
ভেজা মাটির শরীরে আস্তে পা ফেলো তোমার
ওখানে এখন বলবন্ত বীজ
আছে মাথা তুলবার অপেক্ষায়
এই যে ভাতের কয়েকটা দানা আঙুলের ফাঁক গলে
পড়ে গেল মাদুরে— ওগুলো
আবার কুড়িয়ে ধুয়ে নাও, সোনাধন
ঘরের দাওয়ায় বসে শুভ্রকেশি জুম্মবুড়ি— সবার বেভেই
ছানিপড়া চোখ ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে এইসব কথা বলছিল
তার নাতনি ও নাতিদের ...
:: দুদ্দুরাদন : চাকমা শব্দ। দাপাদাপি করা।
:: বেভেই : চাকমা শব্দ। নানি।
আমি সেই ব্যর্থতার বদনাম
ব্যর্থতা ব্যর্থতা ব্যর্থতার কাঁটায় শরীর ফুলে-ফুলে গেছে
বুনোকাঁকরোলের স্বভাবে
জনান্তিকে আমাকে পেয়েছ
দূরের দৃষ্টিতে দেখে তাই যাচ্ছ চলে দলে-দলে
অনেকটা পলায়নপর, ভয়ার্ত চাহনি তোমাদের
ছুটছ দঙ্গলে
নাচতে-নাচতে
ব্যারিকেড, মব-দুর্ভোগের ঘূর্ণাবর্তে
লাল আপেল মুঠোয় গরিলার উলঙ্গ ধরনে
কী সুখের বশে রেস্তোরাঁয় গুঞ্জনে মেতেছ কেউ-কেউ
গ্রিল্ড চিকেনের টসটসে রসে
দিনের হত্যাকাণ্ডের পর
আলো-আঁধারের লেনদেনে
তবুও আমাকে পিঠের ঝুড়িতে ভরে
নিকটের বাজারে, নদীর দিকে শান্ত মুখ রেখে
নিয়ে যায় দেখো আদিবাসী সওদাগর
ঠোঁটে আমাকপাতার ঘন নীলধোঁয়া ওড়াতে-ওড়াতে
নিত্য আহার-বিহারে আমিই তো সেই ব্যর্থতার বদনাম ...
দুনিয়াদারির মর্তবা
দুনিয়াদারির ব্যাপারে কিছুটা ইন্তেজারি হওয়াই ভালো
মরণের পরে কোনো ইতিনেতি নেই— সবই কালো
এখানে যা-কিছু ক্ষয়, ডরভয়, যা-কিছু অপরিমেয় সয়
হোক না তা মুখ থুবড়ানো, রক্ত-কাদামাখা পরাজয়
যেভাবেই হোক, জুটলেও জুটতে তো পারে আড়ে-আড়ে
লোকাল না-হোক ইন্টারন্যাশনালের বড় ঘাড়ে
চেপে অভিবাসনের মওকা— কতজন তো পেলই
ধর্মের অবমাননা, গণহত্যা শেষে উড়ে তো গেলই
দুনিয়াদারির মর্তবাই দেখছি সম্পূর্ণ ভিন্ন বা আলাদা
দৌলতের খোঁটা, ক্ষমতার নেওটা, অপকর্মের সকল নাদা
ধুয়েমুছে নিয়ে পূতঃ হতে সবে যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে আছে
এখানেই হুকুমতের ঝাঁপিতে কালনাগিনীরা মুকুট দুলিয়ে নাচে
মৃত্যুর মাজারে কোথায় প্রতিযোগিতা, শরাবের প্লুত পেয়ালার আড্ডা
গানের আসরে ধোঁয়াওড়া বেচইন নৃত্য, রূপসীর প্রেমে মেরে গাড্ডা
গজলে-ভজনে াদল্ ভাসা— আমি সেই সেতার— বাজালে
তুমি এসে স্পর্শে— এসব কোথায় পাবো অমৃতবচন— তুমিই সাজালে
আমার হৃদয়কুঞ্জ, প্রাণের শবরী— এই যে কবিতা লেখা— এই মর্তে
কে চায় এসব ছাড়তে, বলো তো দুনিয়ায় কে চায় মরতে ...
বেতবুনিয়াকাব্য
আমাকে প্রান্তেই রাখো
আমি চাষি কিরণচন্দ্রের শিষ্য, তার মতো গাছের পেয়ারা পেড়ে এনে
আতিথেয়তায় বাঁধবো সবুজ সাঁকো
স্বর্ণাদি’র হাসির ফোয়ারা নিয়ে
বেতবুনিয়ায় তোমাদের প্রিয় দিদি হয়ে বুড়ি হবোদেখো
খুব মিথ্যে অভিমানের গহনা পরে
তোমাদের টেনে আনবো আমার ঘরে
পড়শিজনের মধ্যখানে বসে শাকসবজি, মাছের চাষে
উৎসাহ দেবো গলা ফুলিয়ে হরেক গেরস্তের
সফল দৃষ্টান্ত খাড়া করে-করে
বেঁচে থাকার আশ্বাসে
প্রান্তবর্তী বলে তোমাদের মতো শাদা মনের পাগল কেউ-কেউ
আমার ঘরের দোরে এসে
কখনোসখনো খোঁজখবরটা নিয়ো হেসে-হেসে
সেসবের মর্যাদা রাখবো না আমি— ইতর নাকি অত
তোমরা কোথায় যাবে, আমি যদি এই ভিটায় না-থাকি বিচরণরত ...
ও আমার মাতৃচূড়া
ও আমার মাতৃচূড়া, তোমাকে সালাম
এ অবোধ মাংসপিণ্ডটাকে— লোকে যাকে শিশু বলে
তোমার অপূর্ব স্বাদের বুকের দুধে
বলিষ্ঠ কোমর ও হাতের কামিয়াবি বেষ্টনে-বেষ্টনে
একটা পৃথিবী বানিয়ে দিয়েছ ধীরে-ধীরে
তোমার যৌবন, তোমার জীবন ক্ষয়ে-ক্ষয়ে
সেই নাদান এখন তাকাচ্ছে লোকের ধনভান্ডারে প্রশ্নবোধক চিহ্নের ধরনে
সে এখন উত্তাল বিপ্লবী— কোরান পুরাণ বেদ বাইবেল ম্রো জাতির ক্রামাধর্ম পড়ে
সে বুঝেছে— মানুষ বস্তুত চাটুকার
আর গায়েবি ক্ষমতা ও শক্তির যূপকাষ্ঠ
বিপরীতে সত্যের জিয়োরদানো ব্রুনো
আর সুফিরাজ শারমাদ শাহিদেরও ভক্ত
তোমার এ পোলা যেন থাকে দুনিয়ার সকল নির্যাসে, হে জননী সৃষ্টির শিখর ...
আমাকে পাথরে রূপান্তরিত করো
আমাকে এবার পাথরে রূপান্তরিত করো, হে দয়াল
যেমন দেবতাখুমে বড়-বড় পাথরেরা
সম্মানিত হয়
গ্রামমানুষের
হৃৎজোড়া ভালোবাসার জোয়ারে
যেমন পাহাড়ি রূপসীরা
মহাস্থবিরের মান্য চোখের কোণের দিকে চেয়ে
তাহাদের গেরুয়া আশির্বাদের রেণু নিয়ে হাসতে-হাসতে
ঘরে ফেরে নিরাপদে
আমাকে অমন অটল গাম্ভীর্য দিতে কার্পণ্য করো না প্রভু
হে রাব্Ÿুল আলামিন
হে পরমেশ্বর
হে গোজেন
হে গরয়া
হে গৌতম অমিতাভ
দয়াময়, আমাকে করুণ ও কাতর দেখে
ইতিহাসে আর পড়ায়ো না
বর্জ্য প্রাচীন মধ্য ও আধুনিক যুগ— এইসব আর দেখায়ো না
এসব তো ভেঙে ফেলেছে তোমারই স্থির পাথরেরা
থম মারা স্তব্ধতার আলোয়ান পরে
—নাফাখুমে
এই ভারী উত্তরাধিকার বেয়ে
আমি সেই ছেলে হতে চাই কালজ্ঞানহীন
পাথরতলের স্বচ্ছজলে
ছলছল ...
ক্ষত
[কথাসাহিত্যিক বিপম চাকমার নেওয়া ‘ডুবে যাওয়া মানুষ’ নামে এক বর্ষীয়ান আদিবাসীর সাক্ষাৎকার পড়ে]
বুকে কাপ্তাই বাঁধের ক্ষতচিহ্নসম ঘরহারা জমিহারা
পিতৃপুরুষের চোখের কিনারে জমা
পিঁচুটির ভার নিয়ে
পথ চলি নুয়ে-নুয়ে
বনকাষ্ঠের বেপারি
কানে খুবই খর্ব
বয়স তো হলো পরপারে যাবার সে ডাক আসার সমান
ঝামার ধরনে স্মৃতিও বিগতপ্রায় খটখটে শব্দ তুলে শুধু
দারুণ বিভ্রমে
—কী আর আশা ও ভবিষ্যত আলা
তাই বারবার ফিরে যাই অচ্ছুত অতীত হাতড়ে-হাতড়ে
যদি একটি ঝলকে এসে ছুঁয়ে যায় আচমকা
সেই সোনার কৈশোরকণা ...
***
হাফিজ রশিদ খান। গত শতকের আশির দশকের বিশিষ্ট কবি, লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক, আদিবাসী সাহিত্য গবেষক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অপভ্রংশ স্বপ্নমালা
মাটির মমতাঘেরা স্বপ্নগুলো উচ্ছেদের উলঙ্গ পরোয়ানায় পরঘরী হয়ে যায়
আশ্রিত ঘরের ফুটো চালে একবিন্দু নীল আকাশের দেখা পেলে
আমার কল্পনাপাখা
উড়ে-উড়ে দেখে আসে
বসতভিটির হরিৎভূমিতে বুলডোজারের প্রেতনৃত্য
ছোটো মাছ, রাজকাঁকড়ার বিচরণে ছলছল জলসেই খালটাতে
এখন কনক্রিটের বাঁধের পাহারা
পাশের সকলে চলে গেছে যে যেদিকে পারে খোঁড়াতে-খোঁড়াতে
গরিব-গুরবার দল
জুমের আদরলাগা মাচাংঘর কবে থেকে কাত হয়ে আছে
থাক-থাক করে রাখা সিমেন্টের বস্তার কিনারে
ঠোঁটের ওপর লালঘেরওলা বনমোরগ দূরের ডালে বসে
সব হারানোর যন্ত্রণা নীরবে সয় ঘাড় নুয়ে
আধপোড়া ভিটায় আমার স্বপ্নমালা
ভস্মমাখা বিবর্ণ ঘাসের বিছানায়
হতাশার বিবমিষা ঝাড়ে গড়াতে-গড়াতে ...
আমার দুর্ধর্ষ স্পৃহা
কুমড়ার জেদি, অগ্রসরমান লতার মতন
আমার স্পৃহাকে কাটতে পারে না
কোনো দারিদ্র্য বা দুঃখের করাত
আমার মনের গাইরিং
বোমাং থংয়ের পথের ধারের শৈ শৈ ক্যাফে
দিনভর কাজ আর রাতজাগা
কনসার্টের উদ্যম আনে
নাগকেশরের চাপা সুগন্ধের মতো
জ্যেষ্ঠজনেদের জ্ঞানে
আমার পরান ঝোপে-ঝোপে
পাখিদের বাসায় ঘুমায়
দূরের মাটির মই বেয়ে স্বর্গে যাবার রাস্তায়
ঘিলাফুলে খেলে কলরবে
আমার ভেতরে জেগে থাকা হাসিখুশি শিশুবেলা
আঁধার রাইতে তারার নয়নে চোখ রেখে
ইজোরে গভীর নিদ্রা এলে
খোয়াবে নিড়ানি হাতে
সাফ করি
মাথাচাড়া দেওয়া সব পরগাছা
ধলপহরে সোনার আলো হয়ে ফুটুক বরপরঙে হারা গৌরবের ফুলগুলো ...
:: গাইরিং : ত্রিপুরা শব্দ। জুমভূমির অস্থায়ী ঘর।
:: বোমাং থং : মারমা শব্দ। বান্দরবান অর্থাৎ ঐতিহ্যবাহী বোমাং সার্কেল।
:: ঘিলাফুল : চাকমা শব্দ। শিশুদের প্রাকৃতিক খেলার সামগ্রী।
:: ইজোর : চাকমা শব্দ। বাঁশের তৈরি মাচাং ঘরের সামনের খোলা অংশ।
:: বরপরঙ : চাকমা শব্দ। কাপ্তাই বাঁধের ফলে বিপুল সংখ্যক মানুষের স্থানচ্যুতি।
বনজুঁইগাথা
বনজুঁইগুচ্ছ আমাকে থামিয়ে রাখে আলাভোলা পথের কিনারে
দশদিক থেকে রেশমি হাওয়ারা আসে মৃদু-মন্দ, কাঁপে বনজুঁই
চাপালিশ, অর্জুনের বড়-বড় কাঁচাপাকা পাতাগুলো হাত নাড়ে
বিশেষ মুদ্রায়— এই বিজন ছায়ায় শান্তি পাবি, এইখানে আয় তুই
এই মন তবু সরেনাকো ঝোপের রূপসী বনজুঁইগুচ্ছের চৌহদ্দি থেকে
ঘিরে-ঘিরে ওদের নিরালা ঘর দেখে আর চাপা-চাপা গন্ধে উহাদের সঙ্গে
মিঠা-মিঠা কথা কয় অর্জুন ও চাপালিশদের অবিশ্বাসী সাক্ষী রেখে
গুঞ্জনের ঢেউ তুলে আচানক বুকজুড়ে বসে কালো এক মধুকর রাজকীয় রঙ্গে
বনজুঁইগুচ্ছ গোস্সা হয়ে ঝরে পড়ে নিচে দূর্বাশীর্ষে থোকার নিবাস ছেড়ে
বনপিঁপড়ের দল গভীর মাতম তুলে পড়ে থাকা বনজুঁইদের নিয়ে যায়
মাটির হলুদ আঁকাবাঁকা পথ ধরে আরও-আরও ভেতরের ঘেরে
শোকে মনভার হয়ে আসা আমিও ওদের লগে মিশে যাই খুদে পায়-পায়
বনজুঁইদের শববাহী আমরা যখন কাঁদতে-কাঁদতে ভেসেছি ঝিরির জলে
ঠান্ডা রোদে— লতার ছায়ায়— ধুলোবালির পোশাকে নিঃশব্দ জঙ্গলে
এই বিশ্বভুবনের রাজার প্রাসাদ, আমজনতার কেহ কিছু জানে না তা
শুধু জানে নির্বিকার অর্জুন, গর্জন, চাপালিশ আর তাহাদের বড়-বড় পাতা ...
জুম্মবুড়ি
মিষ্টিকুমড়ার লতা পেড়ে আনো সই নখের আলগা-আলগা খোঁচায়
পুরোনো কাঠের হামানদিস্তায় জুম-মরিচের ঝাঁজালো ভর্তায়
ভাপে সিদ্ধ ওই লতায় আজকে হবে
দুপুরের খাবারদাবার
অত দুদ্দুরাদন কেন রে ভাই
ভেজা মাটির শরীরে আস্তে পা ফেলো তোমার
ওখানে এখন বলবন্ত বীজ
আছে মাথা তুলবার অপেক্ষায়
এই যে ভাতের কয়েকটা দানা আঙুলের ফাঁক গলে
পড়ে গেল মাদুরে— ওগুলো
আবার কুড়িয়ে ধুয়ে নাও, সোনাধন
ঘরের দাওয়ায় বসে শুভ্রকেশি জুম্মবুড়ি— সবার বেভেই
ছানিপড়া চোখ ঘুরিয়ে-ঘুরিয়ে এইসব কথা বলছিল
তার নাতনি ও নাতিদের ...
:: দুদ্দুরাদন : চাকমা শব্দ। দাপাদাপি করা।
:: বেভেই : চাকমা শব্দ। নানি।
আমি সেই ব্যর্থতার বদনাম
ব্যর্থতা ব্যর্থতা ব্যর্থতার কাঁটায় শরীর ফুলে-ফুলে গেছে
বুনোকাঁকরোলের স্বভাবে
জনান্তিকে আমাকে পেয়েছ
দূরের দৃষ্টিতে দেখে তাই যাচ্ছ চলে দলে-দলে
অনেকটা পলায়নপর, ভয়ার্ত চাহনি তোমাদের
ছুটছ দঙ্গলে
নাচতে-নাচতে
ব্যারিকেড, মব-দুর্ভোগের ঘূর্ণাবর্তে
লাল আপেল মুঠোয় গরিলার উলঙ্গ ধরনে
কী সুখের বশে রেস্তোরাঁয় গুঞ্জনে মেতেছ কেউ-কেউ
গ্রিল্ড চিকেনের টসটসে রসে
দিনের হত্যাকাণ্ডের পর
আলো-আঁধারের লেনদেনে
তবুও আমাকে পিঠের ঝুড়িতে ভরে
নিকটের বাজারে, নদীর দিকে শান্ত মুখ রেখে
নিয়ে যায় দেখো আদিবাসী সওদাগর
ঠোঁটে আমাকপাতার ঘন নীলধোঁয়া ওড়াতে-ওড়াতে
নিত্য আহার-বিহারে আমিই তো সেই ব্যর্থতার বদনাম ...
দুনিয়াদারির মর্তবা
দুনিয়াদারির ব্যাপারে কিছুটা ইন্তেজারি হওয়াই ভালো
মরণের পরে কোনো ইতিনেতি নেই— সবই কালো
এখানে যা-কিছু ক্ষয়, ডরভয়, যা-কিছু অপরিমেয় সয়
হোক না তা মুখ থুবড়ানো, রক্ত-কাদামাখা পরাজয়
যেভাবেই হোক, জুটলেও জুটতে তো পারে আড়ে-আড়ে
লোকাল না-হোক ইন্টারন্যাশনালের বড় ঘাড়ে
চেপে অভিবাসনের মওকা— কতজন তো পেলই
ধর্মের অবমাননা, গণহত্যা শেষে উড়ে তো গেলই
দুনিয়াদারির মর্তবাই দেখছি সম্পূর্ণ ভিন্ন বা আলাদা
দৌলতের খোঁটা, ক্ষমতার নেওটা, অপকর্মের সকল নাদা
ধুয়েমুছে নিয়ে পূতঃ হতে সবে যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়ে আছে
এখানেই হুকুমতের ঝাঁপিতে কালনাগিনীরা মুকুট দুলিয়ে নাচে
মৃত্যুর মাজারে কোথায় প্রতিযোগিতা, শরাবের প্লুত পেয়ালার আড্ডা
গানের আসরে ধোঁয়াওড়া বেচইন নৃত্য, রূপসীর প্রেমে মেরে গাড্ডা
গজলে-ভজনে াদল্ ভাসা— আমি সেই সেতার— বাজালে
তুমি এসে স্পর্শে— এসব কোথায় পাবো অমৃতবচন— তুমিই সাজালে
আমার হৃদয়কুঞ্জ, প্রাণের শবরী— এই যে কবিতা লেখা— এই মর্তে
কে চায় এসব ছাড়তে, বলো তো দুনিয়ায় কে চায় মরতে ...
বেতবুনিয়াকাব্য
আমাকে প্রান্তেই রাখো
আমি চাষি কিরণচন্দ্রের শিষ্য, তার মতো গাছের পেয়ারা পেড়ে এনে
আতিথেয়তায় বাঁধবো সবুজ সাঁকো
স্বর্ণাদি’র হাসির ফোয়ারা নিয়ে
বেতবুনিয়ায় তোমাদের প্রিয় দিদি হয়ে বুড়ি হবোদেখো
খুব মিথ্যে অভিমানের গহনা পরে
তোমাদের টেনে আনবো আমার ঘরে
পড়শিজনের মধ্যখানে বসে শাকসবজি, মাছের চাষে
উৎসাহ দেবো গলা ফুলিয়ে হরেক গেরস্তের
সফল দৃষ্টান্ত খাড়া করে-করে
বেঁচে থাকার আশ্বাসে
প্রান্তবর্তী বলে তোমাদের মতো শাদা মনের পাগল কেউ-কেউ
আমার ঘরের দোরে এসে
কখনোসখনো খোঁজখবরটা নিয়ো হেসে-হেসে
সেসবের মর্যাদা রাখবো না আমি— ইতর নাকি অত
তোমরা কোথায় যাবে, আমি যদি এই ভিটায় না-থাকি বিচরণরত ...
ও আমার মাতৃচূড়া
ও আমার মাতৃচূড়া, তোমাকে সালাম
এ অবোধ মাংসপিণ্ডটাকে— লোকে যাকে শিশু বলে
তোমার অপূর্ব স্বাদের বুকের দুধে
বলিষ্ঠ কোমর ও হাতের কামিয়াবি বেষ্টনে-বেষ্টনে
একটা পৃথিবী বানিয়ে দিয়েছ ধীরে-ধীরে
তোমার যৌবন, তোমার জীবন ক্ষয়ে-ক্ষয়ে
সেই নাদান এখন তাকাচ্ছে লোকের ধনভান্ডারে প্রশ্নবোধক চিহ্নের ধরনে
সে এখন উত্তাল বিপ্লবী— কোরান পুরাণ বেদ বাইবেল ম্রো জাতির ক্রামাধর্ম পড়ে
সে বুঝেছে— মানুষ বস্তুত চাটুকার
আর গায়েবি ক্ষমতা ও শক্তির যূপকাষ্ঠ
বিপরীতে সত্যের জিয়োরদানো ব্রুনো
আর সুফিরাজ শারমাদ শাহিদেরও ভক্ত
তোমার এ পোলা যেন থাকে দুনিয়ার সকল নির্যাসে, হে জননী সৃষ্টির শিখর ...
আমাকে পাথরে রূপান্তরিত করো
আমাকে এবার পাথরে রূপান্তরিত করো, হে দয়াল
যেমন দেবতাখুমে বড়-বড় পাথরেরা
সম্মানিত হয়
গ্রামমানুষের
হৃৎজোড়া ভালোবাসার জোয়ারে
যেমন পাহাড়ি রূপসীরা
মহাস্থবিরের মান্য চোখের কোণের দিকে চেয়ে
তাহাদের গেরুয়া আশির্বাদের রেণু নিয়ে হাসতে-হাসতে
ঘরে ফেরে নিরাপদে
আমাকে অমন অটল গাম্ভীর্য দিতে কার্পণ্য করো না প্রভু
হে রাব্Ÿুল আলামিন
হে পরমেশ্বর
হে গোজেন
হে গরয়া
হে গৌতম অমিতাভ
দয়াময়, আমাকে করুণ ও কাতর দেখে
ইতিহাসে আর পড়ায়ো না
বর্জ্য প্রাচীন মধ্য ও আধুনিক যুগ— এইসব আর দেখায়ো না
এসব তো ভেঙে ফেলেছে তোমারই স্থির পাথরেরা
থম মারা স্তব্ধতার আলোয়ান পরে
—নাফাখুমে
এই ভারী উত্তরাধিকার বেয়ে
আমি সেই ছেলে হতে চাই কালজ্ঞানহীন
পাথরতলের স্বচ্ছজলে
ছলছল ...
ক্ষত
[কথাসাহিত্যিক বিপম চাকমার নেওয়া ‘ডুবে যাওয়া মানুষ’ নামে এক বর্ষীয়ান আদিবাসীর সাক্ষাৎকার পড়ে]
বুকে কাপ্তাই বাঁধের ক্ষতচিহ্নসম ঘরহারা জমিহারা
পিতৃপুরুষের চোখের কিনারে জমা
পিঁচুটির ভার নিয়ে
পথ চলি নুয়ে-নুয়ে
বনকাষ্ঠের বেপারি
কানে খুবই খর্ব
বয়স তো হলো পরপারে যাবার সে ডাক আসার সমান
ঝামার ধরনে স্মৃতিও বিগতপ্রায় খটখটে শব্দ তুলে শুধু
দারুণ বিভ্রমে
—কী আর আশা ও ভবিষ্যত আলা
তাই বারবার ফিরে যাই অচ্ছুত অতীত হাতড়ে-হাতড়ে
যদি একটি ঝলকে এসে ছুঁয়ে যায় আচমকা
সেই সোনার কৈশোরকণা ...
***
হাফিজ রশিদ খান। গত শতকের আশির দশকের বিশিষ্ট কবি, লিটল ম্যাগাজিন সম্পাদক, আদিবাসী সাহিত্য গবেষক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক।

আপনার মতামত লিখুন