লিওনেল মেসি কেবল আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সিধারী অধিনায়ক নন, তিনি দেশটির ফুটবল অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। মাঠের ফুটবলে তার ম্যাজিক যেমন আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জেতায়, মাঠের বাইরে তার ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ তেমনি সমৃদ্ধ করে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) কোষাগার। ফুটবল বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, মেসির বিয়োগে আর্জেন্টিনা যে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে, তা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগতে পারে কয়েক দশক।
আর্জেন্টিনা জাতীয় দল যখন বিশ্বের কোথাও প্রীতি ম্যাচ খেলতে যায়, তখন আয়োজকদের প্রথম শর্ত থাকে ‘মেসিকে খেলতে হবে’। স্পোর্টস মার্কেটিং এজেন্সিগুলোর তথ্যমতে, মেসি থাকলে আর্জেন্টিনা একটি প্রীতি ম্যাচের জন্য ৫ থেকে ৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৬০ থেকে ৮০ কোটি টাকা) দাবি করতে পারে। মেসিহীন আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে এই দর নেমে আসে ২ থেকে ৩ মিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ, প্রতিটি প্রীতি ম্যাচেই এএফএ প্রায় ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকা আয় হারাবে।
বর্তমানে আর্জেন্টিনা দলের প্রধান স্পন্সরদের তালিকায় আছে অ্যাডিডাস, কোকা-কোলা, বিন্যান্স ও শিয়াওমি’র মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড। এই কোম্পানিগুলো আর্জেন্টিনার সঙ্গে চুক্তি বাড়িয়েছে মূলত মেসির আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে। মেসির অনুপস্থিতিতে বৈশ্বিক বাজারে আর্জেন্টিনার আকাশী-নীল জার্সির আবেদন কমে যাবে। ফলে পরবর্তী চুক্তির সময় স্পন্সররা আগের মতো বিপুল অংকের অর্থ বিনিয়োগে অনাগ্রহী হতে পারে, যা এএফএর দীর্ঘমেয়াদী আয়ে বড় ধাক্কা দেবে।
বিশ্বজুড়ে অ্যাডিডাসের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ফুটবল জার্সির একটি হলো মেসির ‘১০ নম্বর’ জার্সি। কাতার বিশ্বকাপের সময় মেসির জার্সির চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেয়েছিল কোম্পানিটি। এই জার্সি বিক্রির লভ্যাংশের একটি বড় অংশ পায় আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশন। মেসি না থাকলে এই বিপুল পরিমাণ জার্সি ও মার্চেন্ডাইজ বিক্রি রাতারাতি কমে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে এএফএর বাৎসরিক আয়ের ওপর।
ফোর্বসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেসির কারণে আর্জেন্টিনা দলের ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ গত তিন বছরে প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মেসি বিহীন আর্জেন্টিনা কেবল একটি শক্তিশালী দল, কিন্তু ‘গ্লোবাল ব্র্যান্ড’ নয়। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি নতুন সমর্থক তৈরি হওয়ার মূলে ছিলেন মেসি। এই সমর্থকগোষ্ঠী কমে যাওয়া মানে হলো ডিজিটাল স্ট্রিমিং রাইটস, সোশ্যাল মিডিয়া রেভিনিউ এবং বৈশ্বিক ফ্যানবেস থেকে আসা পরোক্ষ আয় হারানো।
আর্জেন্টিনার পর্যটন খাতের একটি অংশ সরাসরি ফুটবলের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা আর্জেন্টিনায় যান কেবল মেসির দেশ দেখতে বা তার খেলা সরাসরি উপভোগ করতে। দেশটির ‘সফট পাওয়ার’ বা বৈশ্বিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে মেসির অবদান অতুলনীয়। অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত আর্জেন্টিনার জন্য মেসির এই ‘ব্র্যান্ড ইমেজ’ ছিল অনেকটা লাইফলাইনের মতো।
আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্লাউদিও তাপিয়া একবার বলেছিলেন, ‘মেসি আমাদের ফুটবলের সবচেয়ে বড় সম্পদ।’ আর্থিক মানদণ্ডে হিসাব করলে দেখা যায়, মেসিহীন আর্জেন্টিনা মানে কেবল একজন খেলোয়াড় হারানো নয়, বরং বছরে কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের নিশ্চিত রাজস্ব হারানো। ফুটবলার মেসিকে হয়তো কেউ প্রতিস্থাপন করবেন, কিন্তু ‘ব্র্যান্ড মেসি’র আর্থিক শূন্যতা পূরণ করা অসম্ভব।
সব মিলিয়ে, মেসিহীন আর্জেন্টিনা মানে কেবল একজন খেলোয়াড় হারানো নয়, বরং একটি আর্থিক সাম্রাজ্য এবং জয়ের নিশ্চয়তা হারানো। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, মেসির বিয়োগে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বছরে শত কোটি টাকার (ডলারের হিসেবে) রাজস্ব হারাতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় লস হবে 'আবেগ' আর 'ম্যাজিকের', যার কোনো আর্থিক মূল্য হয় না।

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
লিওনেল মেসি কেবল আর্জেন্টিনার ১০ নম্বর জার্সিধারী অধিনায়ক নন, তিনি দেশটির ফুটবল অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। মাঠের ফুটবলে তার ম্যাজিক যেমন আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জেতায়, মাঠের বাইরে তার ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ তেমনি সমৃদ্ধ করে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের (এএফএ) কোষাগার। ফুটবল বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদদের মতে, মেসির বিয়োগে আর্জেন্টিনা যে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে, তা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগতে পারে কয়েক দশক।
আর্জেন্টিনা জাতীয় দল যখন বিশ্বের কোথাও প্রীতি ম্যাচ খেলতে যায়, তখন আয়োজকদের প্রথম শর্ত থাকে ‘মেসিকে খেলতে হবে’। স্পোর্টস মার্কেটিং এজেন্সিগুলোর তথ্যমতে, মেসি থাকলে আর্জেন্টিনা একটি প্রীতি ম্যাচের জন্য ৫ থেকে ৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ৬০ থেকে ৮০ কোটি টাকা) দাবি করতে পারে। মেসিহীন আর্জেন্টিনার ক্ষেত্রে এই দর নেমে আসে ২ থেকে ৩ মিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ, প্রতিটি প্রীতি ম্যাচেই এএফএ প্রায় ৩০ থেকে ৪০ কোটি টাকা আয় হারাবে।
বর্তমানে আর্জেন্টিনা দলের প্রধান স্পন্সরদের তালিকায় আছে অ্যাডিডাস, কোকা-কোলা, বিন্যান্স ও শিয়াওমি’র মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড। এই কোম্পানিগুলো আর্জেন্টিনার সঙ্গে চুক্তি বাড়িয়েছে মূলত মেসির আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তাকে পুঁজি করে। মেসির অনুপস্থিতিতে বৈশ্বিক বাজারে আর্জেন্টিনার আকাশী-নীল জার্সির আবেদন কমে যাবে। ফলে পরবর্তী চুক্তির সময় স্পন্সররা আগের মতো বিপুল অংকের অর্থ বিনিয়োগে অনাগ্রহী হতে পারে, যা এএফএর দীর্ঘমেয়াদী আয়ে বড় ধাক্কা দেবে।
বিশ্বজুড়ে অ্যাডিডাসের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ফুটবল জার্সির একটি হলো মেসির ‘১০ নম্বর’ জার্সি। কাতার বিশ্বকাপের সময় মেসির জার্সির চাহিদা মেটাতে হিমশিম খেয়েছিল কোম্পানিটি। এই জার্সি বিক্রির লভ্যাংশের একটি বড় অংশ পায় আর্জেন্টিনা ফুটবল ফেডারেশন। মেসি না থাকলে এই বিপুল পরিমাণ জার্সি ও মার্চেন্ডাইজ বিক্রি রাতারাতি কমে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে এএফএর বাৎসরিক আয়ের ওপর।
ফোর্বসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেসির কারণে আর্জেন্টিনা দলের ‘ব্র্যান্ড ভ্যালু’ গত তিন বছরে প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। মেসি বিহীন আর্জেন্টিনা কেবল একটি শক্তিশালী দল, কিন্তু ‘গ্লোবাল ব্র্যান্ড’ নয়। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি নতুন সমর্থক তৈরি হওয়ার মূলে ছিলেন মেসি। এই সমর্থকগোষ্ঠী কমে যাওয়া মানে হলো ডিজিটাল স্ট্রিমিং রাইটস, সোশ্যাল মিডিয়া রেভিনিউ এবং বৈশ্বিক ফ্যানবেস থেকে আসা পরোক্ষ আয় হারানো।
আর্জেন্টিনার পর্যটন খাতের একটি অংশ সরাসরি ফুটবলের ওপর নির্ভরশীল। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা আর্জেন্টিনায় যান কেবল মেসির দেশ দেখতে বা তার খেলা সরাসরি উপভোগ করতে। দেশটির ‘সফট পাওয়ার’ বা বৈশ্বিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে মেসির অবদান অতুলনীয়। অর্থনৈতিক সংকটে জর্জরিত আর্জেন্টিনার জন্য মেসির এই ‘ব্র্যান্ড ইমেজ’ ছিল অনেকটা লাইফলাইনের মতো।
আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্লাউদিও তাপিয়া একবার বলেছিলেন, ‘মেসি আমাদের ফুটবলের সবচেয়ে বড় সম্পদ।’ আর্থিক মানদণ্ডে হিসাব করলে দেখা যায়, মেসিহীন আর্জেন্টিনা মানে কেবল একজন খেলোয়াড় হারানো নয়, বরং বছরে কয়েকশ মিলিয়ন ডলারের নিশ্চিত রাজস্ব হারানো। ফুটবলার মেসিকে হয়তো কেউ প্রতিস্থাপন করবেন, কিন্তু ‘ব্র্যান্ড মেসি’র আর্থিক শূন্যতা পূরণ করা অসম্ভব।
সব মিলিয়ে, মেসিহীন আর্জেন্টিনা মানে কেবল একজন খেলোয়াড় হারানো নয়, বরং একটি আর্থিক সাম্রাজ্য এবং জয়ের নিশ্চয়তা হারানো। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, মেসির বিয়োগে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বছরে শত কোটি টাকার (ডলারের হিসেবে) রাজস্ব হারাতে পারে। তবে সবচেয়ে বড় লস হবে 'আবেগ' আর 'ম্যাজিকের', যার কোনো আর্থিক মূল্য হয় না।

আপনার মতামত লিখুন