সংবাদ

সাত দিনে গ্যাস সংকট কাটবে? যে হিসাব মিলছে না


বিশাখা চৌধুরী
বিশাখা চৌধুরী
প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:৪৬ পিএম

সাত দিনে গ্যাস সংকট কাটবে? যে হিসাব মিলছে না
ছবি: সংগৃহীত

সাত দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে—সরকারের পক্ষ থেকে এমন আশ্বাস এসেছে। কিন্তু গ্যাসের সাম্প্রতিক সরবরাহ, এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাজারের দাম এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের কার্গো সংগ্রহের হিসাব বলছে, সাত দিনে সংকট পুরোপুরি কেটে যাবে—এমন নিশ্চয়তা এখনই দেওয়া কঠিন।

বরং বাস্তবতা হচ্ছে, মহেশখালীর একটি এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা আংশিকভাবে কাটলেও বাংলাদেশের গ্যাস ব্যবস্থার সংকট এখন আর শুধু একটি টার্মিনালের সমস্যা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমদানিনির্ভরতা, স্পট মার্কেটের উচ্চ দাম, কার্গো সংগ্রহের অনিশ্চয়তা এবং দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা।

মহেশখালীর সমস্যা কি শেষ: গ্যাস সংকটের সাম্প্রতিক সূত্রপাত ২১ জুলাই। সেদিন মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুনে বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার ক্ষতি হয়। এতে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০–৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

আগস্টের শুরুতে টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হয়। একটি বয়লার সচল হওয়ার পর সেখান থেকে প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু হয়। অন্য টার্মিনালটি প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করছিল।

তবে সমস্যার শেষ এখানে হয়নি। গত ১৯ আগস্ট এক্সিলারেট টার্মিনাল আবার এলএনজি শেষ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ২২ আগস্ট নতুন কার্গো আসার পর সেটি আবার চালু হয়। অর্থাৎ টার্মিনাল চালু থাকা আর পর্যাপ্ত এলএনজি থাকা—দুটি আলাদা বিষয়।

সরবরাহ বাড়লেও ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে: গত ১৫ আগস্ট পেট্রোবাংলার হিসাবে জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২,৪৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে ১,৬১৫ এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে ৮২৮ মিলিয়ন ঘনফুট এসেছে। 

শুনতে সংখ্যাটি বড়। কিন্তু চাহিদার সঙ্গে তুলনা করলেই সমস্যার গভীরতা বোঝা যায়। দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩,৮০০–৪,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে ২,৪০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি সরবরাহ মানে চাহিদার তুলনায় কয়েক শ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।

এই ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা, সার কারখানা, সিএনজি এবং আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে সরবরাহের অগ্রাধিকার ঠিক করতে হচ্ছে। ফলে কোথাও গ্যাসের চাপ কমছে, কোথাও শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কোথাও বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের জোগান বাড়াতে অন্য খাতে সরবরাহ কমানো হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা হচ্ছে, দুটি টার্মিনালের পুরো সক্ষমতা কি পাওয়া যাচ্ছে? মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সম্মিলিত রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা প্রায় ১,১০০ মিলিয়ন ঘনফুট প্রতিদিন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন কারিগরি সমস্যা, আবহাওয়া এবং এলএনজি কার্গো গ্রহণের জটিলতায় তারা সব সময় পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারেনি।

গত ২৩ আগস্ট দুই টার্মিনালই চালু থাকার পরও এলএনজি থেকে সরবরাহ ছিল প্রায় ৭৫৮ মিলিয়ন ঘনফুট—তাদের সম্মিলিত সক্ষমতার অনেক নিচে। অর্থাৎ শুধু টার্মিনাল মেরামত করলেই হবে না। টার্মিনালে নিয়মিত এলএনজি পৌঁছাতে হবে। এখানেই দ্বিতীয় সংকট।

আন্তর্জাতিক দামই বড় মাথাব্যথা: বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির একটি অংশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এলেও ঘাটতি পূরণ করতে স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করতে হয়। আর এই বাজার অত্যন্ত অস্থির। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে এলএনজি সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে কার্গো কিনতে হয়েছে।

চলতি অর্থবছরে এলএনজি ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা মূল বরাদ্দের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেড়ে ১৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছানোর তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। জ্বালানি আমদানির এই অতিরিক্ত ব্যয় শুধু সরকারের ভর্তুকির বোঝা বাড়াচ্ছে না; এটি গ্যাস সরবরাহের স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।

সরকার যে প্রত্যাশার কথা বলছে, সেই জায়গাটা কোথায়? বলা যায়, সাত দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার পথে সরকারের অন্যতম হাতিয়ার হচ্ছে নতুন এলএনজি কার্গো সংগ্রহ।

মঙ্গলবারের (১ সেপ্টেম্বর) তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে সরবরাহের জন্য চারটি স্পট কার্গো কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একটি কার্গোর জন্য আগের টেন্ডার পুনরায় ডাকা হয়েছে। কারণ আগের দর প্রত্যাশার তুলনায় বেশি ছিল। অন্য তিনটি কার্গোর জন্য নতুন টেন্ডার করা হয়েছে।

এর আগে সেপ্টেম্বরের জন্য দুটি কার্গো কেনার অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। একটি এলএনজি কার্গো কিনতে প্রতি ইউনিটে প্রায় ২৫ ডলার খরচ হচ্ছে। অর্থাৎ সরকার গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় কার্গো আনার চেষ্টা করছে—এটি সত্য। কিন্তু কার্গো কেনা মানেই সঙ্গে সঙ্গে গ্যাস পাওয়া নয়। দর, সরবরাহকারীর সম্মতি, জাহাজের সময়সূচি, বন্দরে পৌঁছানো, আনলোডিং এবং টার্মিনালের সক্ষমতা—সবকিছু ঠিকঠাক থাকতে হবে।

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, সাত দিনে সংকট কাটার সম্ভাবনা কতটা? এখানে দুটি বিষয় আলাদা করতে হবে। প্রথমত, গ্যাস সরবরাহের সাময়িক উন্নতি। এটি সাত দিনের মধ্যে সম্ভব। টার্মিনাল সচল থাকা, নতুন কার্গো আসা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ অগ্রাধিকার দিলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের প্রবাহ বাড়তে পারে।

দ্বিতীয়ত, পুরো গ্যাস সংকটের অবসান। যা অনেক কঠিন। কারণ দেশের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে কাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে। আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজারের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদনও চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না। তাই একটি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা মেরামত করাকে পুরো সংকটের সমাধান হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

আরেকটি বড় ঝুঁকি হচ্ছে, বিদ্যুৎ বনাম শিল্প। গ্যাস কম থাকলে সরকারকে অগ্রাধিকার ঠিক করতে হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস বাড়ালে শিল্পে কমতে পারে। শিল্পে গ্যাস বাড়ালে বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ পড়তে পারে। 

আগস্টের মাঝামাঝি সরবরাহ বাড়ার সময়ও বিদ্যুৎ খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ফলে অন্যান্য খাতে সরবরাহ কমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অর্থাৎ গ্যাসের সংকট কেবল রান্নার চুলার সমস্যা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি, কর্মসংস্থান আর মূল্যস্ফীতি। এক জায়গায় ঘাটতি তৈরি হলে তার ঢেউ অন্য জায়গায় গিয়ে লাগে।

গ্যাসের চাপ বাড়ছে না

সাত দিনে সমাধান কীভাবে: সরকার যদি আগামী সাত দিনে এলএনজি সরবরাহ বাড়াতে পারে, টার্মিনালগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে পারে এবং কয়েকটি নতুন কার্গো সময়মতো দেশে আনতে পারে, তাহলে গ্যাসের চাপ কিছুটা কমবে—এমন সম্ভাবনা যথেষ্ট। কিন্তু বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে ‘সাত দিনেই গ্যাস সংকট পুরোপুরি শেষ’—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সময় এখনো আসেনি।

কারণ সংকটের একটি অংশ মহেশখালীর টার্মিনালে, একটি অংশ আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজারে এবং সবচেয়ে বড় অংশটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামোয়। তাই আগামী সাত দিন হবে মূলত একটি পরীক্ষা। টার্মিনাল কি পূর্ণ সক্ষমতায় থাকবে, প্রয়োজনীয় এলএনজি কার্গো কি সময়মতো আসবে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কোথায় থাকবে আর ঘাটতি হলে কোন খাত কতটা গ্যাস পাবে? এসব প্রশ্নের উত্তরেই নিহিত সাত দিনের আশ্বাস বাস্তবে কতটা টেকে।


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


সাত দিনে গ্যাস সংকট কাটবে? যে হিসাব মিলছে না

প্রকাশের তারিখ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

সাত দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে যাবে—সরকারের পক্ষ থেকে এমন আশ্বাস এসেছে। কিন্তু গ্যাসের সাম্প্রতিক সরবরাহ, এলএনজি টার্মিনালের সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাজারের দাম এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের কার্গো সংগ্রহের হিসাব বলছে, সাত দিনে সংকট পুরোপুরি কেটে যাবে—এমন নিশ্চয়তা এখনই দেওয়া কঠিন।

বরং বাস্তবতা হচ্ছে, মহেশখালীর একটি এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা আংশিকভাবে কাটলেও বাংলাদেশের গ্যাস ব্যবস্থার সংকট এখন আর শুধু একটি টার্মিনালের সমস্যা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমদানিনির্ভরতা, স্পট মার্কেটের উচ্চ দাম, কার্গো সংগ্রহের অনিশ্চয়তা এবং দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ার দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা।

মহেশখালীর সমস্যা কি শেষ: গ্যাস সংকটের সাম্প্রতিক সূত্রপাত ২১ জুলাই। সেদিন মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির পরিচালিত ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুনে বৈদ্যুতিক ব্যবস্থার ক্ষতি হয়। এতে প্রতিদিন প্রায় ৪৫০–৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহের সক্ষমতা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

আগস্টের শুরুতে টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হয়। একটি বয়লার সচল হওয়ার পর সেখান থেকে প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ শুরু হয়। অন্য টার্মিনালটি প্রায় ৫৫০ মিলিয়ন ঘনফুট সরবরাহ করছিল।

তবে সমস্যার শেষ এখানে হয়নি। গত ১৯ আগস্ট এক্সিলারেট টার্মিনাল আবার এলএনজি শেষ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ বন্ধ করে দেয়। ২২ আগস্ট নতুন কার্গো আসার পর সেটি আবার চালু হয়। অর্থাৎ টার্মিনাল চালু থাকা আর পর্যাপ্ত এলএনজি থাকা—দুটি আলাদা বিষয়।

সরবরাহ বাড়লেও ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে: গত ১৫ আগস্ট পেট্রোবাংলার হিসাবে জাতীয় গ্রিডে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২,৪৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে ১,৬১৫ এবং আমদানি করা এলএনজি থেকে ৮২৮ মিলিয়ন ঘনফুট এসেছে। 

শুনতে সংখ্যাটি বড়। কিন্তু চাহিদার সঙ্গে তুলনা করলেই সমস্যার গভীরতা বোঝা যায়। দেশের দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩,৮০০–৪,০০০ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে ২,৪০০ মিলিয়ন ঘনফুটের কিছু বেশি সরবরাহ মানে চাহিদার তুলনায় কয়েক শ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।

এই ঘাটতি পূরণ করতে গিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র, শিল্পকারখানা, সার কারখানা, সিএনজি এবং আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে সরবরাহের অগ্রাধিকার ঠিক করতে হচ্ছে। ফলে কোথাও গ্যাসের চাপ কমছে, কোথাও শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, কোথাও বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের জোগান বাড়াতে অন্য খাতে সরবরাহ কমানো হচ্ছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটা হচ্ছে, দুটি টার্মিনালের পুরো সক্ষমতা কি পাওয়া যাচ্ছে? মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের সম্মিলিত রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা প্রায় ১,১০০ মিলিয়ন ঘনফুট প্রতিদিন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন কারিগরি সমস্যা, আবহাওয়া এবং এলএনজি কার্গো গ্রহণের জটিলতায় তারা সব সময় পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারেনি।

গত ২৩ আগস্ট দুই টার্মিনালই চালু থাকার পরও এলএনজি থেকে সরবরাহ ছিল প্রায় ৭৫৮ মিলিয়ন ঘনফুট—তাদের সম্মিলিত সক্ষমতার অনেক নিচে। অর্থাৎ শুধু টার্মিনাল মেরামত করলেই হবে না। টার্মিনালে নিয়মিত এলএনজি পৌঁছাতে হবে। এখানেই দ্বিতীয় সংকট।

আন্তর্জাতিক দামই বড় মাথাব্যথা: বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির একটি অংশ দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এলেও ঘাটতি পূরণ করতে স্পট মার্কেটের ওপর নির্ভর করতে হয়। আর এই বাজার অত্যন্ত অস্থির। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে এলএনজি সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় বাংলাদেশকে স্পট মার্কেট থেকে বেশি দামে কার্গো কিনতে হয়েছে।

চলতি অর্থবছরে এলএনজি ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তা মূল বরাদ্দের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেড়ে ১৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছানোর তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। জ্বালানি আমদানির এই অতিরিক্ত ব্যয় শুধু সরকারের ভর্তুকির বোঝা বাড়াচ্ছে না; এটি গ্যাস সরবরাহের স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।

সরকার যে প্রত্যাশার কথা বলছে, সেই জায়গাটা কোথায়? বলা যায়, সাত দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার পথে সরকারের অন্যতম হাতিয়ার হচ্ছে নতুন এলএনজি কার্গো সংগ্রহ।

মঙ্গলবারের (১ সেপ্টেম্বর) তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে সরবরাহের জন্য চারটি স্পট কার্গো কেনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একটি কার্গোর জন্য আগের টেন্ডার পুনরায় ডাকা হয়েছে। কারণ আগের দর প্রত্যাশার তুলনায় বেশি ছিল। অন্য তিনটি কার্গোর জন্য নতুন টেন্ডার করা হয়েছে।

এর আগে সেপ্টেম্বরের জন্য দুটি কার্গো কেনার অনুমোদনও দেওয়া হয়েছে। একটি এলএনজি কার্গো কিনতে প্রতি ইউনিটে প্রায় ২৫ ডলার খরচ হচ্ছে। অর্থাৎ সরকার গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলায় কার্গো আনার চেষ্টা করছে—এটি সত্য। কিন্তু কার্গো কেনা মানেই সঙ্গে সঙ্গে গ্যাস পাওয়া নয়। দর, সরবরাহকারীর সম্মতি, জাহাজের সময়সূচি, বন্দরে পৌঁছানো, আনলোডিং এবং টার্মিনালের সক্ষমতা—সবকিছু ঠিকঠাক থাকতে হবে।

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, সাত দিনে সংকট কাটার সম্ভাবনা কতটা? এখানে দুটি বিষয় আলাদা করতে হবে। প্রথমত, গ্যাস সরবরাহের সাময়িক উন্নতি। এটি সাত দিনের মধ্যে সম্ভব। টার্মিনাল সচল থাকা, নতুন কার্গো আসা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রে সরবরাহ অগ্রাধিকার দিলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের প্রবাহ বাড়তে পারে।

দ্বিতীয়ত, পুরো গ্যাস সংকটের অবসান। যা অনেক কঠিন। কারণ দেশের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে কাঠামোগত ঘাটতি রয়েছে। আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজারের ওপর নির্ভরতা রয়েছে। দেশীয় গ্যাস উৎপাদনও চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে না। তাই একটি টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা মেরামত করাকে পুরো সংকটের সমাধান হিসেবে দেখলে ভুল হবে।

আরেকটি বড় ঝুঁকি হচ্ছে, বিদ্যুৎ বনাম শিল্প। গ্যাস কম থাকলে সরকারকে অগ্রাধিকার ঠিক করতে হয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস বাড়ালে শিল্পে কমতে পারে। শিল্পে গ্যাস বাড়ালে বিদ্যুৎ উৎপাদনে চাপ পড়তে পারে। 

আগস্টের মাঝামাঝি সরবরাহ বাড়ার সময়ও বিদ্যুৎ খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ফলে অন্যান্য খাতে সরবরাহ কমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অর্থাৎ গ্যাসের সংকট কেবল রান্নার চুলার সমস্যা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প উৎপাদন, রপ্তানি, কর্মসংস্থান আর মূল্যস্ফীতি। এক জায়গায় ঘাটতি তৈরি হলে তার ঢেউ অন্য জায়গায় গিয়ে লাগে।

গ্যাসের চাপ বাড়ছে না

সাত দিনে সমাধান কীভাবে: সরকার যদি আগামী সাত দিনে এলএনজি সরবরাহ বাড়াতে পারে, টার্মিনালগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালাতে পারে এবং কয়েকটি নতুন কার্গো সময়মতো দেশে আনতে পারে, তাহলে গ্যাসের চাপ কিছুটা কমবে—এমন সম্ভাবনা যথেষ্ট। কিন্তু বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে ‘সাত দিনেই গ্যাস সংকট পুরোপুরি শেষ’—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সময় এখনো আসেনি।

কারণ সংকটের একটি অংশ মহেশখালীর টার্মিনালে, একটি অংশ আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজারে এবং সবচেয়ে বড় অংশটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামোয়। তাই আগামী সাত দিন হবে মূলত একটি পরীক্ষা। টার্মিনাল কি পূর্ণ সক্ষমতায় থাকবে, প্রয়োজনীয় এলএনজি কার্গো কি সময়মতো আসবে, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কোথায় থাকবে আর ঘাটতি হলে কোন খাত কতটা গ্যাস পাবে? এসব প্রশ্নের উত্তরেই নিহিত সাত দিনের আশ্বাস বাস্তবে কতটা টেকে।



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত