সংবাদ

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন বার্তার অর্থ কী


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২১ পিএম

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন বার্তার অর্থ কী
ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বহুল ব্যবহৃত বাক্য হলো—দুই দেশ প্রতিবেশী, ইতিহাস ও ভূগোল তাদের আলাদা করার সুযোগ দেয় না। কিন্তু প্রতিবেশী হওয়া আর সম্পর্ক স্বস্তিকর থাকা এক বিষয় নয়। গত কয়েক বছরে দুই দেশের সম্পর্কে যেমন ঘনিষ্ঠতা ছিল, তেমনি তৈরি হয়েছে অবিশ্বাস, রাজনৈতিক দূরত্ব ও নানা অমীমাংসিত প্রশ্ন।

এই বাস্তবতার মধ্যেই ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সাম্প্রতিক বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ‘অতীতে আটকে থাকার সুযোগ নেই’। অতীত ভুলে যেতে হবে—তিনি এমন কথা বলেননি; বরং অতীতের সমস্যাগুলোকে সঙ্গে নিয়েই সামনে এগোনোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তার যুক্তি, দুই দেশ যদি অতীতে আটকে থাকে, তাহলে জনগণের সম্পর্ক ভালো হবে না, উন্নয়নও থেমে যাবে।

এ বক্তব্যকে কেবল একজন কূটনীতিকের সৌজন্যবার্তা হিসেবে দেখলে হয়তো পুরো বিষয়টি ধরা পড়বে না। কারণ, ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক এখন এমন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে পুরোনো বিরোধ মীমাংসা এবং নতুন সহযোগিতা—দুটিকেই একই সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে রাজনৈতিক আস্থার বড় ধাক্কা এসেছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে নতুন ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তাকে ফেরত পাঠানোর বাংলাদেশের দাবি, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, পানি বণ্টন এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বক্তব্য—এসব বিষয় দুই দেশের জনমতেও প্রভাব ফেলেছে।

বর্তমান সরকারও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে। গত আগস্টে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করতে ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন। ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে তার বৈঠককে দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের ধারায় গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এরপর ত্রিবেদীও একাধিকবার একই ধরনের বার্তা দিয়েছেন—সমস্যা থাকবে, কিন্তু সমস্যা মানেই সম্পর্কের ব্যর্থতা নয়; আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। আগস্টে তিনি বলেছিলেন, দুই দেশ আলোচনায় বসলে কোনো সমস্যাই সমাধানের বাইরে নয় এবং লক্ষ্য হওয়া উচিত উভয়ের জন্য লাভজনক সমাধান।

ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কের ইতিহাস শুধু বিরোধের নয়। বরং কিছু বড় সাফল্য দেখিয়েছে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে জটিল সমস্যারও সমাধান সম্ভব। ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি ছিল এমনই একটি মাইলফলক। দীর্ঘদিনের পানি বিরোধের পর দুই দেশ ৩০ বছরের চুক্তিতে পৌঁছায়।

২০১৫ সালে আসে আরও দুটি বড় সাফল্য—স্থলসীমা চুক্তি বাস্তবায়ন এবং সমুদ্রসীমা নির্ধারণ। ছিটমহল সমস্যার অবসান ঘটে; দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনাতেও নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। ভারতের সংসদীয় একটি সাম্প্রতিক পর্যালোচনাতেও এসব চুক্তিকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।অর্থাৎ ইতিহাসের শিক্ষা হচ্ছে—আলোচনা বন্ধ হলে সমস্যা জমে, আলোচনা চললে অসম্ভব মনে হওয়া সমস্যারও সমাধান হয়।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি পানি।গঙ্গার পানি চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হওয়ার কথা। ফলে নতুন করে চুক্তি নবায়ন বা পরবর্তী কাঠামো নিয়ে আলোচনা দুই দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে তিস্তা, অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনা, উজানে অবকাঠামো নির্মাণ—এসব প্রশ্নও রয়েছে। বাংলাদেশের দৃষ্টিতে নদীর পানি শুধু কূটনৈতিক ইস্যু নয়; এটি কৃষি, পরিবেশ, জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্ন।

দুই দেশের প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার সীমান্ত। সীমান্তে প্রাণহানি বাংলাদেশের জনমনে দীর্ঘদিনের ক্ষোভের একটি বড় কারণ।সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সহযোগিতা রয়েছে। কিন্তু সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনা এখনো বড় পরীক্ষার জায়গা। জনগণের সম্পর্কের কথা বললে সীমান্তের মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

ভারত বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। কিন্তু দুই দেশের বাণিজ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বড় ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য প্রশ্ন হলো—ভারতের বিশাল বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ আরও কীভাবে বাড়ানো যায়। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে মঙ্গলবারের বৈঠকেও আলোচনা হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের চরিত্রই বদলে যেতে পারে। তবে এর জন্য শুল্ক, অশুল্ক বাধা, মাননিয়ন্ত্রণ, কাস্টমস ও বাণিজ্য সুবিধার মতো বিষয়গুলোতে বাস্তব অগ্রগতি দরকার।

গত এক দশকে দুই দেশের মধ্যে সড়ক, রেল ও নৌপথে যোগাযোগ বেড়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।আখাউড়া-আগরতলা রেলসংযোগ, খুলনা-মোংলা রেলপথ, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের মতো উদ্যোগ দুই দেশের অর্থনৈতিক ভূগোল বদলানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে।কিন্তু যোগাযোগের অবকাঠামো থাকলেই সম্পর্ক গভীর হয় না। তার সঙ্গে দরকার নিরবচ্ছিন্ন বাণিজ্য, সহজ যাতায়াত, ভিসা সুবিধা এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ।

ত্রিবেদী যে ‘জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক’-এর ওপর বারবার গুরুত্ব দিচ্ছেন, তার তাৎপর্য এখানেই। আগস্টেও তিনি বলেছিলেন, দুই দেশের সম্পর্কের ‘সত্যিকারের হৃদস্পন্দন’ হচ্ছে জনগণের যোগাযোগ ও পারস্পরিক সদিচ্ছা। রাজনীতি নয়, সম্পর্কের ভিত্তি হতে পারে জনগণ। এটাই সম্ভবত ত্রিবেদীর বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।

তিনি মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) স্পষ্ট বলেছেন, একজন রাষ্ট্রদূত হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে মন্তব্য করা তাঁর কাজ নয়। বাংলাদেশের জনগণ এবং তাদের নির্বাচিত সরকারই দেশের জন্য কী ভালো, তা সবচেয়ে ভালো বোঝে—এমন অবস্থানও তিনি জানিয়েছেন।

এই অবস্থানটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দুই দেশের সম্পর্ক যখন কোনো নির্দিষ্ট সরকার বা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে, তখন সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বরং রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক, সরকারের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক—এই তিনটি স্তরকে আলাদা রেখে এগোনোই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার পথ।

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আবদুল মঈন খান বৈঠকে দুই দেশের জনগণের ঐতিহাসিক ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি মুক্ত বাণিজ্যের সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। এটি ইঙ্গিত দেয়, ঢাকা এখন সম্পর্ককে শুধু রাজনৈতিক বা নিরাপত্তার কাঠামোয় নয়, অর্থনীতি ও জনগণের স্বার্থের কাঠামোয় দেখতে চাইছে।

অন্যদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ভারতীয় পর্যবেক্ষক পাঠানোর আগ্রহের কথাও বলা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা প্রয়োজন হবে। তাহলে কি নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে?সম্ভাবনা আছে। তবে এটিকে এখনই ‘নতুন অধ্যায়’ বলে ঘোষণা করার সময় আসেনি। কারণ সম্পর্কের সামনে বেশ কয়েকটি কঠিন প্রশ্ন এখনো রয়েছে—পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য ভারসাম্য, ভিসা ও মানুষের যাতায়াত, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং পারস্পরিক আস্থা।

দুই দেশের মধ্যে ৪০টির বেশি প্রাতিষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় কাঠামো রয়েছে—পানি, বাণিজ্য, সীমান্ত, নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও কনস্যুলার বিষয়সহ। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এর অনেকগুলো কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল; ২০২৬ সালে সেগুলো আবার সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সুতরাং ত্রিবেদীর ‘অতীতে আটকে থাকা যাবে না’ কথাটিকে সবচেয়ে বাস্তবভাবে পড়লে এর অর্থ দাঁড়ায়— অতীতকে মুছে ফেলা নয়, অতীতের বিরোধগুলোকে ব্যবস্থাপনা করে ভবিষ্যতের স্বার্থে এগিয়ে যাওয়া। বাংলাদেশের জন্য সেই ভবিষ্যৎ মানে হতে পারে পানি ও সীমান্তে ন্যায্যতা, ভারতের বাজারে আরও প্রবেশাধিকার, বিনিয়োগ ও যোগাযোগ বৃদ্ধি। ভারতের জন্য এর অর্থ হতে পারে স্থিতিশীল প্রতিবেশী, নিরাপদ উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং বিস্তৃত আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের সুযোগ।

শেষ পর্যন্ত দুই দেশের সম্পর্ক কতটা বদলাবে, তার পরীক্ষা হবে বক্তৃতায় নয়—সীমান্তে, নদীতে, বন্দরে, বাজারে এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াতের পথে। সেখানেই দেখা যাবে, ‘অতীতে আটকে না থাকার’ কূটনৈতিক বার্তা বাস্তবে কতটা নতুন সম্পর্ক তৈরি করতে পারে।


আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নতুন বার্তার অর্থ কী

প্রকাশের তারিখ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বহুল ব্যবহৃত বাক্য হলো—দুই দেশ প্রতিবেশী, ইতিহাস ও ভূগোল তাদের আলাদা করার সুযোগ দেয় না। কিন্তু প্রতিবেশী হওয়া আর সম্পর্ক স্বস্তিকর থাকা এক বিষয় নয়। গত কয়েক বছরে দুই দেশের সম্পর্কে যেমন ঘনিষ্ঠতা ছিল, তেমনি তৈরি হয়েছে অবিশ্বাস, রাজনৈতিক দূরত্ব ও নানা অমীমাংসিত প্রশ্ন।

এই বাস্তবতার মধ্যেই ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সাম্প্রতিক বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক ‘অতীতে আটকে থাকার সুযোগ নেই’। অতীত ভুলে যেতে হবে—তিনি এমন কথা বলেননি; বরং অতীতের সমস্যাগুলোকে সঙ্গে নিয়েই সামনে এগোনোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তার যুক্তি, দুই দেশ যদি অতীতে আটকে থাকে, তাহলে জনগণের সম্পর্ক ভালো হবে না, উন্নয়নও থেমে যাবে।

এ বক্তব্যকে কেবল একজন কূটনীতিকের সৌজন্যবার্তা হিসেবে দেখলে হয়তো পুরো বিষয়টি ধরা পড়বে না। কারণ, ঢাকা-দিল্লির সম্পর্ক এখন এমন একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে পুরোনো বিরোধ মীমাংসা এবং নতুন সহযোগিতা—দুটিকেই একই সঙ্গে এগিয়ে নিতে হবে।

গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে রাজনৈতিক আস্থার বড় ধাক্কা এসেছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে নতুন ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, তাকে ফেরত পাঠানোর বাংলাদেশের দাবি, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, পানি বণ্টন এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বক্তব্য—এসব বিষয় দুই দেশের জনমতেও প্রভাব ফেলেছে।

বর্তমান সরকারও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে নতুন ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে। গত আগস্টে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করতে ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছিলেন। ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গে তার বৈঠককে দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের ধারায় গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এরপর ত্রিবেদীও একাধিকবার একই ধরনের বার্তা দিয়েছেন—সমস্যা থাকবে, কিন্তু সমস্যা মানেই সম্পর্কের ব্যর্থতা নয়; আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। আগস্টে তিনি বলেছিলেন, দুই দেশ আলোচনায় বসলে কোনো সমস্যাই সমাধানের বাইরে নয় এবং লক্ষ্য হওয়া উচিত উভয়ের জন্য লাভজনক সমাধান।

ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কের ইতিহাস শুধু বিরোধের নয়। বরং কিছু বড় সাফল্য দেখিয়েছে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে জটিল সমস্যারও সমাধান সম্ভব। ১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি ছিল এমনই একটি মাইলফলক। দীর্ঘদিনের পানি বিরোধের পর দুই দেশ ৩০ বছরের চুক্তিতে পৌঁছায়।

২০১৫ সালে আসে আরও দুটি বড় সাফল্য—স্থলসীমা চুক্তি বাস্তবায়ন এবং সমুদ্রসীমা নির্ধারণ। ছিটমহল সমস্যার অবসান ঘটে; দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনাতেও নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়। ভারতের সংসদীয় একটি সাম্প্রতিক পর্যালোচনাতেও এসব চুক্তিকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।অর্থাৎ ইতিহাসের শিক্ষা হচ্ছে—আলোচনা বন্ধ হলে সমস্যা জমে, আলোচনা চললে অসম্ভব মনে হওয়া সমস্যারও সমাধান হয়।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি পানি।গঙ্গার পানি চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হওয়ার কথা। ফলে নতুন করে চুক্তি নবায়ন বা পরবর্তী কাঠামো নিয়ে আলোচনা দুই দেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর সঙ্গে তিস্তা, অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনা, উজানে অবকাঠামো নির্মাণ—এসব প্রশ্নও রয়েছে। বাংলাদেশের দৃষ্টিতে নদীর পানি শুধু কূটনৈতিক ইস্যু নয়; এটি কৃষি, পরিবেশ, জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্ন।

দুই দেশের প্রায় ৪ হাজার কিলোমিটার সীমান্ত। সীমান্তে প্রাণহানি বাংলাদেশের জনমনে দীর্ঘদিনের ক্ষোভের একটি বড় কারণ।সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সহযোগিতা রয়েছে। কিন্তু সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনা এখনো বড় পরীক্ষার জায়গা। জনগণের সম্পর্কের কথা বললে সীমান্তের মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

ভারত বাংলাদেশের অন্যতম বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। কিন্তু দুই দেশের বাণিজ্যে দীর্ঘদিন ধরেই বড় ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। বাংলাদেশের জন্য প্রশ্ন হলো—ভারতের বিশাল বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ আরও কীভাবে বাড়ানো যায়। মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে মঙ্গলবারের বৈঠকেও আলোচনা হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের চরিত্রই বদলে যেতে পারে। তবে এর জন্য শুল্ক, অশুল্ক বাধা, মাননিয়ন্ত্রণ, কাস্টমস ও বাণিজ্য সুবিধার মতো বিষয়গুলোতে বাস্তব অগ্রগতি দরকার।

গত এক দশকে দুই দেশের মধ্যে সড়ক, রেল ও নৌপথে যোগাযোগ বেড়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এ ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।আখাউড়া-আগরতলা রেলসংযোগ, খুলনা-মোংলা রেলপথ, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহারের মতো উদ্যোগ দুই দেশের অর্থনৈতিক ভূগোল বদলানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছে।কিন্তু যোগাযোগের অবকাঠামো থাকলেই সম্পর্ক গভীর হয় না। তার সঙ্গে দরকার নিরবচ্ছিন্ন বাণিজ্য, সহজ যাতায়াত, ভিসা সুবিধা এবং মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ।

ত্রিবেদী যে ‘জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক’-এর ওপর বারবার গুরুত্ব দিচ্ছেন, তার তাৎপর্য এখানেই। আগস্টেও তিনি বলেছিলেন, দুই দেশের সম্পর্কের ‘সত্যিকারের হৃদস্পন্দন’ হচ্ছে জনগণের যোগাযোগ ও পারস্পরিক সদিচ্ছা। রাজনীতি নয়, সম্পর্কের ভিত্তি হতে পারে জনগণ। এটাই সম্ভবত ত্রিবেদীর বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক।

তিনি মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) স্পষ্ট বলেছেন, একজন রাষ্ট্রদূত হিসেবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে মন্তব্য করা তাঁর কাজ নয়। বাংলাদেশের জনগণ এবং তাদের নির্বাচিত সরকারই দেশের জন্য কী ভালো, তা সবচেয়ে ভালো বোঝে—এমন অবস্থানও তিনি জানিয়েছেন।

এই অবস্থানটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দুই দেশের সম্পর্ক যখন কোনো নির্দিষ্ট সরকার বা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে অতিরিক্তভাবে যুক্ত হয়ে পড়ে, তখন সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কেও টানাপোড়েন তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বরং রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক, সরকারের সঙ্গে সরকারের সম্পর্ক এবং জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক—এই তিনটি স্তরকে আলাদা রেখে এগোনোই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার পথ।

স্থানীয় সরকারমন্ত্রী আবদুল মঈন খান বৈঠকে দুই দেশের জনগণের ঐতিহাসিক ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি মুক্ত বাণিজ্যের সম্ভাবনাও আলোচনায় এসেছে। এটি ইঙ্গিত দেয়, ঢাকা এখন সম্পর্ককে শুধু রাজনৈতিক বা নিরাপত্তার কাঠামোয় নয়, অর্থনীতি ও জনগণের স্বার্থের কাঠামোয় দেখতে চাইছে।

অন্যদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে ভারতীয় পর্যবেক্ষক পাঠানোর আগ্রহের কথাও বলা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে আলোচনা প্রয়োজন হবে। তাহলে কি নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে?সম্ভাবনা আছে। তবে এটিকে এখনই ‘নতুন অধ্যায়’ বলে ঘোষণা করার সময় আসেনি। কারণ সম্পর্কের সামনে বেশ কয়েকটি কঠিন প্রশ্ন এখনো রয়েছে—পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য ভারসাম্য, ভিসা ও মানুষের যাতায়াত, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং পারস্পরিক আস্থা।

দুই দেশের মধ্যে ৪০টির বেশি প্রাতিষ্ঠানিক দ্বিপক্ষীয় কাঠামো রয়েছে—পানি, বাণিজ্য, সীমান্ত, নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও কনস্যুলার বিষয়সহ। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর এর অনেকগুলো কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল; ২০২৬ সালে সেগুলো আবার সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সুতরাং ত্রিবেদীর ‘অতীতে আটকে থাকা যাবে না’ কথাটিকে সবচেয়ে বাস্তবভাবে পড়লে এর অর্থ দাঁড়ায়— অতীতকে মুছে ফেলা নয়, অতীতের বিরোধগুলোকে ব্যবস্থাপনা করে ভবিষ্যতের স্বার্থে এগিয়ে যাওয়া। বাংলাদেশের জন্য সেই ভবিষ্যৎ মানে হতে পারে পানি ও সীমান্তে ন্যায্যতা, ভারতের বাজারে আরও প্রবেশাধিকার, বিনিয়োগ ও যোগাযোগ বৃদ্ধি। ভারতের জন্য এর অর্থ হতে পারে স্থিতিশীল প্রতিবেশী, নিরাপদ উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং বিস্তৃত আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্যের সুযোগ।

শেষ পর্যন্ত দুই দেশের সম্পর্ক কতটা বদলাবে, তার পরীক্ষা হবে বক্তৃতায় নয়—সীমান্তে, নদীতে, বন্দরে, বাজারে এবং সাধারণ মানুষের যাতায়াতের পথে। সেখানেই দেখা যাবে, ‘অতীতে আটকে না থাকার’ কূটনৈতিক বার্তা বাস্তবে কতটা নতুন সম্পর্ক তৈরি করতে পারে।



সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত