উচ্চ রক্তচাপ দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে হৃদ্রোগসহ নানা জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই ওষুধের পাশাপাশি খাবার ও পানীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সচেতন থাকা জরুরি। কিছু পানীয় রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে, আবার কিছু পানীয় নিয়মিত বা অতিরিক্ত গ্রহণ করলে রক্তচাপ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
যেসব পানীয় উপকারী হতে পারে
বিটের জুস:
বিটে থাকা প্রাকৃতিক নাইট্রেট শরীরে নাইট্রিক অক্সাইড তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এর ফলে রক্তনালি
প্রসারিত হতে পারে এবং রক্তচাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে। ২০২২ সালের একটি পর্যালোচনাতেও
উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে বিটের জুসের সম্ভাব্য উপকারের কথা উঠে এসেছে।
লবণ ছাড়া টমেটোর জুস:
টমেটোর জুসও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। ২০১৯ সালের জাপানের একটি গবেষণায় দেখা
যায়, নিয়মিত আনসল্টেড টমেটোর জুস পানকারীদের সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক—দুই ধরনের রক্তচাপেই
উন্নতি দেখা যেতে পারে।
ডালিমের রস:
ডালিমে থাকা বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদানের কারণে এর রস নিয়ে রক্তচাপের ওপর প্রভাব
সম্পর্কে গবেষণা হয়েছে। ২০১৭ সালের একটি মেটা-বিশ্লেষণে ডালিমের রস সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক
রক্তচাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়।
চেরি ও ক্র্যানবেরির
জুস:
২০২০ সালের একটি পর্যালোচনায় চেরি ও ক্র্যানবেরির জুস নিয়মিত গ্রহণের সঙ্গে রক্তচাপ
নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে এসব জুসে বাড়তি চিনি থাকলে তা এড়িয়ে চলা
ভালো।
গ্রিন ও ব্ল্যাক টি:
দীর্ঘ সময় নিয়মিত চা পান করলে রক্তচাপের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ২০২০ সালের
একটি মেটা-বিশ্লেষণে তিন মাস বা তার বেশি সময় চা পানকারীদের সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক
রক্তচাপ কমার তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রিন টি এ ক্ষেত্রে ব্ল্যাক টির তুলনায় কিছুটা বেশি
কার্যকর হতে পারে। তবে দুই ধরনের চাতেই ক্যাফেইন থাকায় অতিরিক্ত পান করা ঠিক নয়।
যে পানীয়গুলোতে সতর্কতা জরুরি
অ্যালকোহল:
অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৩ সালের একটি মেটা-বিশ্লেষণে
অ্যালকোহল গ্রহণের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে বিশেষ করে সিস্টোলিক রক্তচাপ বৃদ্ধির সরাসরি
সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে।
সফট ড্রিংকস:
চিনি ও অন্যান্য উপাদানসমৃদ্ধ কোমল পানীয় নিয়মিত পান করা উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকির সঙ্গে
সম্পর্কিত হতে পারে। তাই এসব পানীয়ের পরিবর্তে পানি বা চিনি ছাড়া স্বাস্থ্যকর পানীয়
বেছে নেওয়া যেতে পারে।
অতিরিক্ত ক্যাফেইন:
কফি, ব্ল্যাক টি, এনার্জি ড্রিংকস ও কিছু কোমল পানীয়তে ক্যাফেইন থাকে। ২০২১ সালের একটি
মেটা-বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ রক্তচাপ বাড়াতে পারে। কিশোর-কিশোরীদের
ক্ষেত্রে এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে।
পানীয়ের পাশাপাশি যেসব অভ্যাস
জরুরি
শুধু পানীয় পরিবর্তন করলেই উচ্চ
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। দৈনন্দিন জীবনযাত্রাতেও কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
লবণ কমান:
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরামর্শ অনুযায়ী, অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কের দৈনিক সোডিয়াম
গ্রহণ ২ হাজার ৩০০ মিলিগ্রামের মধ্যে রাখা উচিত। উচ্চ রক্তচাপ থাকলে আদর্শ সীমা ১ হাজার
৫০০ মিলিগ্রাম।
খাবারে পরিবর্তন আনুন:
খাদ্যতালিকায় শাকসবজি ও অন্যান্য উদ্ভিদভিত্তিক খাবারের পরিমাণ বাড়ানো এবং অতিরিক্ত
সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাবার কমানো উপকারী হতে পারে।
শরীরচর্চা করুন:
নিয়মিত দ্রুত হাঁটা বা ব্রিস্ক ওয়াকিংয়ের মতো ব্যায়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে
পারে।
ধূমপান ছাড়ুন:
ধূমপান রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলতে পারে। এমনকি যারা উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ খান,
তাদের ক্ষেত্রেও ধূমপান সমস্যা বাড়াতে পারে।
মানসিক চাপ কমান:
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ রক্তচাপ বাড়াতে বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই পর্যাপ্ত ঘুম, বিশ্রাম ও চাপ নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন:
অতিরিক্ত ওজনের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তাই স্বাস্থ্যকর খাবার
ও নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে
পানীয়ের ভূমিকা থাকলেও কোনো একটি পানীয়কে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়। সুষম
খাদ্য, নিয়মিত শরীরচর্চা, ধূমপান বর্জন ও প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ-এসবের
সমন্বয়েই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
উচ্চ রক্তচাপ দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকলে হৃদ্রোগসহ নানা জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই ওষুধের পাশাপাশি খাবার ও পানীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সচেতন থাকা জরুরি। কিছু পানীয় রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে, আবার কিছু পানীয় নিয়মিত বা অতিরিক্ত গ্রহণ করলে রক্তচাপ বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
যেসব পানীয় উপকারী হতে পারে
বিটের জুস:
বিটে থাকা প্রাকৃতিক নাইট্রেট শরীরে নাইট্রিক অক্সাইড তৈরিতে ভূমিকা রাখে। এর ফলে রক্তনালি
প্রসারিত হতে পারে এবং রক্তচাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে। ২০২২ সালের একটি পর্যালোচনাতেও
উচ্চ রক্তচাপের ক্ষেত্রে বিটের জুসের সম্ভাব্য উপকারের কথা উঠে এসেছে।
লবণ ছাড়া টমেটোর জুস:
টমেটোর জুসও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হতে পারে। ২০১৯ সালের জাপানের একটি গবেষণায় দেখা
যায়, নিয়মিত আনসল্টেড টমেটোর জুস পানকারীদের সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক—দুই ধরনের রক্তচাপেই
উন্নতি দেখা যেতে পারে।
ডালিমের রস:
ডালিমে থাকা বিভিন্ন অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট উপাদানের কারণে এর রস নিয়ে রক্তচাপের ওপর প্রভাব
সম্পর্কে গবেষণা হয়েছে। ২০১৭ সালের একটি মেটা-বিশ্লেষণে ডালিমের রস সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক
রক্তচাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয়।
চেরি ও ক্র্যানবেরির
জুস:
২০২০ সালের একটি পর্যালোচনায় চেরি ও ক্র্যানবেরির জুস নিয়মিত গ্রহণের সঙ্গে রক্তচাপ
নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে এসব জুসে বাড়তি চিনি থাকলে তা এড়িয়ে চলা
ভালো।
গ্রিন ও ব্ল্যাক টি:
দীর্ঘ সময় নিয়মিত চা পান করলে রক্তচাপের ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। ২০২০ সালের
একটি মেটা-বিশ্লেষণে তিন মাস বা তার বেশি সময় চা পানকারীদের সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক
রক্তচাপ কমার তথ্য পাওয়া গেছে। গ্রিন টি এ ক্ষেত্রে ব্ল্যাক টির তুলনায় কিছুটা বেশি
কার্যকর হতে পারে। তবে দুই ধরনের চাতেই ক্যাফেইন থাকায় অতিরিক্ত পান করা ঠিক নয়।
যে পানীয়গুলোতে সতর্কতা জরুরি
অ্যালকোহল:
অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের সম্পর্ক রয়েছে। ২০২৩ সালের একটি মেটা-বিশ্লেষণে
অ্যালকোহল গ্রহণের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে বিশেষ করে সিস্টোলিক রক্তচাপ বৃদ্ধির সরাসরি
সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে।
সফট ড্রিংকস:
চিনি ও অন্যান্য উপাদানসমৃদ্ধ কোমল পানীয় নিয়মিত পান করা উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকির সঙ্গে
সম্পর্কিত হতে পারে। তাই এসব পানীয়ের পরিবর্তে পানি বা চিনি ছাড়া স্বাস্থ্যকর পানীয়
বেছে নেওয়া যেতে পারে।
অতিরিক্ত ক্যাফেইন:
কফি, ব্ল্যাক টি, এনার্জি ড্রিংকস ও কিছু কোমল পানীয়তে ক্যাফেইন থাকে। ২০২১ সালের একটি
মেটা-বিশ্লেষণ অনুযায়ী, অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ রক্তচাপ বাড়াতে পারে। কিশোর-কিশোরীদের
ক্ষেত্রে এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি হতে পারে।
পানীয়ের পাশাপাশি যেসব অভ্যাস
জরুরি
শুধু পানীয় পরিবর্তন করলেই উচ্চ
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব নয়। দৈনন্দিন জীবনযাত্রাতেও কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
লবণ কমান:
আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের পরামর্শ অনুযায়ী, অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কের দৈনিক সোডিয়াম
গ্রহণ ২ হাজার ৩০০ মিলিগ্রামের মধ্যে রাখা উচিত। উচ্চ রক্তচাপ থাকলে আদর্শ সীমা ১ হাজার
৫০০ মিলিগ্রাম।
খাবারে পরিবর্তন আনুন:
খাদ্যতালিকায় শাকসবজি ও অন্যান্য উদ্ভিদভিত্তিক খাবারের পরিমাণ বাড়ানো এবং অতিরিক্ত
সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাবার কমানো উপকারী হতে পারে।
শরীরচর্চা করুন:
নিয়মিত দ্রুত হাঁটা বা ব্রিস্ক ওয়াকিংয়ের মতো ব্যায়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখতে
পারে।
ধূমপান ছাড়ুন:
ধূমপান রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলতে পারে। এমনকি যারা উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ খান,
তাদের ক্ষেত্রেও ধূমপান সমস্যা বাড়াতে পারে।
মানসিক চাপ কমান:
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ রক্তচাপ বাড়াতে বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তাই পর্যাপ্ত ঘুম, বিশ্রাম ও চাপ নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন:
অতিরিক্ত ওজনের সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তাই স্বাস্থ্যকর খাবার
ও নিয়মিত ব্যায়ামের মাধ্যমে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে
পানীয়ের ভূমিকা থাকলেও কোনো একটি পানীয়কে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়। সুষম
খাদ্য, নিয়মিত শরীরচর্চা, ধূমপান বর্জন ও প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ-এসবের
সমন্বয়েই রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আপনার মতামত লিখুন