শাশ্বত বাংলার সংস্কৃতি হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা ও লোকায়ত জীবনের সমন্বিত রূপ। এই সংস্কৃতি বাংলার মানুষের আবেগ ও চেতনাকে ধারণ করে আসছে। বাংলা ভাষা ও সমৃদ্ধ সাহিত্য এর প্রাণকেন্দ্র হলেও এটি কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। নদীমাতৃক প্রকৃতির মতোই এ সংস্কৃতি প্রবহমান, উদার ও মানবিক। প্রাচীন জনগোষ্ঠীর জীবনাচার ও বিশ্বাসও বাংলা সংস্কৃতির মূল শিকড়ের অংশ। এ সংস্কৃতির নানা উপাদান ভারতীয় উপমহাদেশজুড়ে ছড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলের সাঁওতাল ও অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ‘ছাতা পরব’ বা ‘ছত্তাবোঙ্গা’ নামে একটি লোকউৎসবের প্রচলন রয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও ঝাড়খণ্ডের মানভূম এলাকায় এটি বিশেষভাবে জনপ্রিয়। উত্তরবঙ্গের কোনো কোনো এলাকাতেও সাঁওতালরা এ ধরনের উৎসব পালন করেন। মূলত বর্ষার শেষ, শস্য ও বৃক্ষকে কেন্দ্র করে এ উৎসবের আয়োজন হয়। বাঁশ বা শালগাছের সঙ্গে তালপাতা কিংবা বিশেষ প্রতীক যুক্ত করে ছাতার মতো কাঠামো তৈরি করে বিভিন্ন আচার পালন করা হয়।
সাঁওতাল বিশ্বাসে ‘বোঙ্গা’ হলো নৈসর্গিক আত্মা। তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে বোঙ্গার গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। আদি দেবতা নিরাকার—এমন বিশ্বাসও তাদের মধ্যে প্রচলিত। পার্থিব জীবনের মঙ্গল-অমঙ্গল, প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ককে কেন্দ্র করেই তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবন আবর্তিত।
পুরুলিয়ার চাকলতোড় গ্রামের ‘ছাতা পরব’ এ উৎসবের অন্যতম বড় আয়োজন। ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে এখানে বিশাল মেলা বসে। কয়েকশ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই উৎসবে পঞ্চকোট রাজবংশের উত্তরসূরিরা ছাতা উত্তোলনের সংকেত দেন। রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হলেও উৎসবকে ঘিরে এক দিনের প্রতীকী রাজতন্ত্রের ঐতিহ্য এখনো টিকে আছে। একসময় এই অঞ্চলের শাসক ছিলেন পঞ্চকোট রাজবংশের সদস্যরা। সেই ঐতিহ্যের স্মৃতি ধারণ করেই প্রতিবছর উৎসবটি আয়োজন করা হয়।
ছাতা পরবের সঙ্গে শস্য ও বৃক্ষের সম্পর্ক রয়েছে। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, জ্যৈষ্ঠের রোহিণী পরবে বৃষ্টির দেবতা ইন্দ্রের মর্ত্যে আগমন ঘটে। তিন মাস পৃথিবীতে অবস্থান করে তিনি রুক্ষ জমিকে শস্যশ্যামল করে ভাদ্র পূর্ণিমায় স্বর্গে ফিরে যান। তার প্রত্যাবর্তনের পর ভাদ্র সংক্রান্তিতে ছাতা তোলা হয়। এ কারণে অনেকেই ছাতা পরবকে শস্য ও প্রকৃতির উৎসব হিসেবে বিবেচনা করেন।
এই উৎসবের সঙ্গে আদিবাসী সমাজের সামাজিক জীবনও গভীরভাবে যুক্ত। মেলা হয়ে ওঠে বৃহৎ মিলনমেলা। ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, বিহার ও ছত্তিশগড় থেকেও অনেকে এতে অংশ নেন। নাচ, গান, মাদল, লোকাচার ও আনন্দের পাশাপাশি অবিবাহিত তরুণ-তরুণীদের পারস্পরিক পরিচয় ও জীবনসঙ্গী নির্বাচনের সুযোগও তৈরি হয়। ফলে ছাতা পরব কেবল ধর্মীয় বা লোকাচারভিত্তিক উৎসব নয়, আদিবাসী সমাজের সামাজিক সম্পর্ক ও সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পুরুলিয়ার চাকলতোড় ছাড়াও সরবাড়ি, মালথোর, সঁটরা, বলরামপুর, বোঙ্গাবাড়ি, বান্দোয়ান ও চিতোড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ছাতা পরবের আয়োজন হয়। একইভাবে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম ও বিষ্ণুপুরের বিভিন্ন এলাকায় ‘ইঁদ পরব’-এরও প্রচলন রয়েছে। লোকমুখে তাই শোনা যায়—
‘বরাবাজারের ইঁদ আর চাকলতোড়ের ছাতা রে,/ মেলা দেখিতে লোক চলে কাতারে কাতারে।’
চাকলতোড়ের ছাতামেলার সঙ্গে প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্যের কথা বলা হয়। চুয়াড় বিদ্রোহের সময় আদিবাসীদের সঙ্গে নিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিজয়ের স্মৃতি ধরে রাখতে কাশীপুরের রাজা প্রথম ছাতা তুলেছিলেন—এমন একটি লোককথাও প্রচলিত রয়েছে। সেই স্মৃতিকে কেন্দ্র করে উৎসবের ঐতিহ্য আজও বহমান।
এই উৎসবের আরেকটি তাৎপর্য আদিবাসী নারীদের সামাজিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, চাকলতোড়ের ছাতামেলায় অংশ নেওয়া সাঁওতাল কন্যাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পর্যায় সম্পন্ন হয়। মেলায় অনেক সময় পাত্র-পাত্রীর পরিচয় ও বিয়ের সিদ্ধান্তও হয়। ফলে এটি আদিবাসী সমাজে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
হাজার বছর ধরে হিন্দু ও মুসলমান সমাজের পাশাপাশি বসবাস করেও সাঁওতাল সমাজ তাদের স্বাতন্ত্র্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। প্রকৃতি, লোকবিশ্বাস, নৈতিক মূল্যবোধ ও সামাজিক রীতিনীতি তাদের জীবনযাপনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ছাতা পরব সেই ঐতিহ্যেরই একটি উজ্জ্বল প্রকাশ।
ছাতা পরব তাই শুধু একটি লোকউৎসব নয়; এটি বাংলা জনপদের বহুত্ব, আদিবাসী সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য এবং প্রকৃতিনির্ভর জীবনদর্শনের এক জীবন্ত নিদর্শন। সময়ের পরিবর্তনের মধ্যেও এই ঐতিহ্য টিকে থাকা আমাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যরে শক্তিকেই তুলে ধরে।
[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শাশ্বত বাংলার সংস্কৃতি হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভাষা ও লোকায়ত জীবনের সমন্বিত রূপ। এই সংস্কৃতি বাংলার মানুষের আবেগ ও চেতনাকে ধারণ করে আসছে। বাংলা ভাষা ও সমৃদ্ধ সাহিত্য এর প্রাণকেন্দ্র হলেও এটি কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। নদীমাতৃক প্রকৃতির মতোই এ সংস্কৃতি প্রবহমান, উদার ও মানবিক। প্রাচীন জনগোষ্ঠীর জীবনাচার ও বিশ্বাসও বাংলা সংস্কৃতির মূল শিকড়ের অংশ। এ সংস্কৃতির নানা উপাদান ভারতীয় উপমহাদেশজুড়ে ছড়িয়ে আছে।
বাংলাদেশের কোনো কোনো অঞ্চলের সাঁওতাল ও অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে ‘ছাতা পরব’ বা ‘ছত্তাবোঙ্গা’ নামে একটি লোকউৎসবের প্রচলন রয়েছে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া, বাঁকুড়া ও ঝাড়খণ্ডের মানভূম এলাকায় এটি বিশেষভাবে জনপ্রিয়। উত্তরবঙ্গের কোনো কোনো এলাকাতেও সাঁওতালরা এ ধরনের উৎসব পালন করেন। মূলত বর্ষার শেষ, শস্য ও বৃক্ষকে কেন্দ্র করে এ উৎসবের আয়োজন হয়। বাঁশ বা শালগাছের সঙ্গে তালপাতা কিংবা বিশেষ প্রতীক যুক্ত করে ছাতার মতো কাঠামো তৈরি করে বিভিন্ন আচার পালন করা হয়।
সাঁওতাল বিশ্বাসে ‘বোঙ্গা’ হলো নৈসর্গিক আত্মা। তাদের ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনে বোঙ্গার গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। আদি দেবতা নিরাকার—এমন বিশ্বাসও তাদের মধ্যে প্রচলিত। পার্থিব জীবনের মঙ্গল-অমঙ্গল, প্রকৃতি ও মানুষের সম্পর্ককে কেন্দ্র করেই তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবন আবর্তিত।
পুরুলিয়ার চাকলতোড় গ্রামের ‘ছাতা পরব’ এ উৎসবের অন্যতম বড় আয়োজন। ভাদ্র মাসের সংক্রান্তিতে এখানে বিশাল মেলা বসে। কয়েকশ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই উৎসবে পঞ্চকোট রাজবংশের উত্তরসূরিরা ছাতা উত্তোলনের সংকেত দেন। রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হলেও উৎসবকে ঘিরে এক দিনের প্রতীকী রাজতন্ত্রের ঐতিহ্য এখনো টিকে আছে। একসময় এই অঞ্চলের শাসক ছিলেন পঞ্চকোট রাজবংশের সদস্যরা। সেই ঐতিহ্যের স্মৃতি ধারণ করেই প্রতিবছর উৎসবটি আয়োজন করা হয়।
ছাতা পরবের সঙ্গে শস্য ও বৃক্ষের সম্পর্ক রয়েছে। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, জ্যৈষ্ঠের রোহিণী পরবে বৃষ্টির দেবতা ইন্দ্রের মর্ত্যে আগমন ঘটে। তিন মাস পৃথিবীতে অবস্থান করে তিনি রুক্ষ জমিকে শস্যশ্যামল করে ভাদ্র পূর্ণিমায় স্বর্গে ফিরে যান। তার প্রত্যাবর্তনের পর ভাদ্র সংক্রান্তিতে ছাতা তোলা হয়। এ কারণে অনেকেই ছাতা পরবকে শস্য ও প্রকৃতির উৎসব হিসেবে বিবেচনা করেন।
এই উৎসবের সঙ্গে আদিবাসী সমাজের সামাজিক জীবনও গভীরভাবে যুক্ত। মেলা হয়ে ওঠে বৃহৎ মিলনমেলা। ঝাড়খণ্ড, ওড়িশা, বিহার ও ছত্তিশগড় থেকেও অনেকে এতে অংশ নেন। নাচ, গান, মাদল, লোকাচার ও আনন্দের পাশাপাশি অবিবাহিত তরুণ-তরুণীদের পারস্পরিক পরিচয় ও জীবনসঙ্গী নির্বাচনের সুযোগও তৈরি হয়। ফলে ছাতা পরব কেবল ধর্মীয় বা লোকাচারভিত্তিক উৎসব নয়, আদিবাসী সমাজের সামাজিক সম্পর্ক ও সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পুরুলিয়ার চাকলতোড় ছাড়াও সরবাড়ি, মালথোর, সঁটরা, বলরামপুর, বোঙ্গাবাড়ি, বান্দোয়ান ও চিতোড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় ছাতা পরবের আয়োজন হয়। একইভাবে পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, ঝাড়গ্রাম ও বিষ্ণুপুরের বিভিন্ন এলাকায় ‘ইঁদ পরব’-এরও প্রচলন রয়েছে। লোকমুখে তাই শোনা যায়—
‘বরাবাজারের ইঁদ আর চাকলতোড়ের ছাতা রে,/ মেলা দেখিতে লোক চলে কাতারে কাতারে।’
চাকলতোড়ের ছাতামেলার সঙ্গে প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্যের কথা বলা হয়। চুয়াড় বিদ্রোহের সময় আদিবাসীদের সঙ্গে নিয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে বিজয়ের স্মৃতি ধরে রাখতে কাশীপুরের রাজা প্রথম ছাতা তুলেছিলেন—এমন একটি লোককথাও প্রচলিত রয়েছে। সেই স্মৃতিকে কেন্দ্র করে উৎসবের ঐতিহ্য আজও বহমান।
এই উৎসবের আরেকটি তাৎপর্য আদিবাসী নারীদের সামাজিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, চাকলতোড়ের ছাতামেলায় অংশ নেওয়া সাঁওতাল কন্যাদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক পর্যায় সম্পন্ন হয়। মেলায় অনেক সময় পাত্র-পাত্রীর পরিচয় ও বিয়ের সিদ্ধান্তও হয়। ফলে এটি আদিবাসী সমাজে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র।
হাজার বছর ধরে হিন্দু ও মুসলমান সমাজের পাশাপাশি বসবাস করেও সাঁওতাল সমাজ তাদের স্বাতন্ত্র্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। প্রকৃতি, লোকবিশ্বাস, নৈতিক মূল্যবোধ ও সামাজিক রীতিনীতি তাদের জীবনযাপনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ছাতা পরব সেই ঐতিহ্যেরই একটি উজ্জ্বল প্রকাশ।
ছাতা পরব তাই শুধু একটি লোকউৎসব নয়; এটি বাংলা জনপদের বহুত্ব, আদিবাসী সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্য এবং প্রকৃতিনির্ভর জীবনদর্শনের এক জীবন্ত নিদর্শন। সময়ের পরিবর্তনের মধ্যেও এই ঐতিহ্য টিকে থাকা আমাদের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যরে শক্তিকেই তুলে ধরে।
[লেখক: উন্নয়নকর্মী]

আপনার মতামত লিখুন