পাহাড়ের ঢালে সারি সারি চা-বাগান। চারপাশে সবুজের সমারোহ। কোথাও লেবু ও কাঁঠালের বাগান, কোথাও বাঁশ-কাঠে তৈরি নান্দনিক কটেজ। সন্ধ্যা নামলেই জ্বলে ওঠে রিসোর্টের আলো। ছুটির দিনে সড়কজুড়ে বাড়ে পর্যটকবাহী গাড়ির চলাচল। পরিবার-পরিজন কিংবা বন্ধুদের নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসছেন প্রকৃতির কাছে কিছুটা সময় কাটাতে।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার রাধানগর এখন আর নিছক একটি গ্রাম নয়। পর্যটনের বিকাশে বদলে যাওয়া এই গ্রাম পরিচিতি পেয়েছে ‘টুরিস্ট ভিলেজ’ বা পর্যটনের গ্রাম হিসেবে। গড়ে উঠেছে ৫০টির বেশি রিসোর্ট, কটেজ ও গেস্টহাউস। পর্যটনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে রেস্তোরাঁ, পরিবহন, গাইড, হস্তশিল্প, চা-পাতা ও মণিপুরি কাপড়সহ নানা ব্যবসা। সরাসরি ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে কয়েক শ মানুষের।
বর্তমানে আধুনিক রাধানগরে পর্যটনশিল্পকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। একসময়ের নির্জন, কৃষিনির্ভর এই জনপদে এখন গড়ে উঠেছে আধুনিক মানের হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও নানা পর্যটনসুবিধা। এসব বিনিয়োগ শুধু রাধানগরের চেহারাই বদলায়নি, স্থানীয় অর্থনীতিতেও তৈরি করেছে নতুন গতি।
তবে রাধানগরের গল্প শুধু পর্যটনের নয়। এই নামের পেছনে রয়েছে প্রায় দেড় শ বছরের পুরোনো এক ইতিহাস। রয়েছে এক জমিদারের দূরদর্শিতা, ভূমিদান, শিক্ষানুরাগ ও সমাজসেবার কাহিনি। তিনি রাধানাথ দেব চৌধুরী। তার নামেই পরিচিতি পাওয়া এই জনপদ আজ পর্যটনের আলোয় আলোকিত হলেও নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই তার জীবন ও অবদানের ইতিহাস অজানা।
রাধানগরের বর্তমান উন্নয়নের সঙ্গে সেই বিস্মৃত ইতিহাসকে মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, একটি জনপদের বিকাশ শুধু তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের গল্প নয়; এর পেছনে থাকে মানুষের স্বপ্ন, উদ্যোগ ও ত্যাগের দীর্ঘ ইতিহাস।
জমিদার রাধানাথ দেব চৌধুরী ও রাধানগরের গোড়াপত্তন
রাধানাথ দেব চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন ১৮৭৫ সালের ৩১ আগস্ট। তিনি ছিলেন শ্রীমঙ্গলের একজন দানবীর জমিদার, শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক ও রাজনীতিক। হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ থানার ভুবীরবাগ এলাকার জমিদার হিসেবেও তার পরিচিতি ছিল। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের আসাম-বেঙ্গল অঞ্চলের ৫৭টি এজেন্সির মালিক ছিলেন তিনি। সর্বোচ্চ করদাতা হিসেবেও তার খ্যাতি ছিল।
ব্রিটিশ শাসনামলে শ্রীমঙ্গলের ডলুছড়া পাহাড়ে প্রায় ১৭৮ বিঘা জমি কিনেছিলেন তিনি। শুধু সম্পদ বাড়ানো তার উদ্দেশ্য ছিল না। ওই জমিতে এলাকার উন্নয়ন, বসতি স্থাপন ও সামাজিক পুনর্গঠনের পরিকল্পনা ছিল তার। সেই সময় পাহাড়ঘেরা ও অপেক্ষাকৃত অনুন্নত একটি অঞ্চলে বসতি ও উন্নয়নের সম্ভাবনা দেখা ছিল নিঃসন্দেহে দূরদর্শিতার পরিচয়।
তার মৃত্যুর পর ওই ভূমি চার পুত্রের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে তাদের কেউ জমি বিক্রি করেন, কেউ জমি হারান। ফলে জমির মালিকানা ও ব্যবহার বদলে যায়। কিন্তু রাধানাথ দেব চৌধুরীর উদ্যোগে যে উন্নয়নের বীজ বপন হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় এলাকাটি ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে ওঠে ‘রাধানগর’ নামে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা শহর থেকে বর্তমান রাধানগরের দূরত্ব প্রায় আড়াই থেকে তিন কিলোমিটার। শহরের এত কাছে হয়েও একসময় এটি ছিল পাহাড়ঘেরা নির্জন জনপদ।
শিক্ষা ও সমাজসেবায় এক অনন্য অবদান
রাধানাথ দেব চৌধুরীর পরিচয় শুধু জমিদার হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষা বিস্তারে তার আগ্রহ ছিল গভীর। পিতার স্মৃতিতে তিনি চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য ভূমি দান করেন। মায়ের নামে প্রতিষ্ঠা করেন দীনময়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। পরে বিদ্যালয়টি ‘শ্রীমঙ্গল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’ নামে পরিচিত হয়।
তার সুযোগ্য পুত্র ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরীও বাবার সেই ধারাকে এগিয়ে নেন। তিনি ৩১ শতক জমিতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘রাধানাথ প্রাথমিক বিদ্যালয়’। পরে বিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন হয়ে হয় ‘বিরামপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়’।
একটি পরিবারের এসব উদ্যোগের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি শুধু জমিদারি বা ব্যক্তিগত সম্পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক অবকাঠামো ও জনকল্যাণের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা ছিল। শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে তাদের অবদানের ছাপ রয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ইতিহাস অনেকটাই বিস্মৃত হয়েছে।
কৃষিভিত্তিক গ্রাম থেকে পর্যটনকেন্দ্রিক যাত্রা
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পরও রাধানগর ছিল মূলত কৃষিনির্ভর গ্রাম। একসময় আখচাষের জন্য এলাকাটি পরিচিত ছিল। পরে লেবু ও কাঁঠালের বাগান গড়ে ওঠে। কৃষিকাজ ও বাগানই ছিল মানুষের জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন।
পরিবর্তনের সূচনা হয় নব্বইয়ের দশকে। ১৯৯৬ সালে লাউয়াছড়া বনকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করার পর পর্যটকদের আগমন বাড়তে থাকে। বিশেষ করে বিদেশি পর্যটকেরা লাউয়াছড়ার জীববৈচিত্র্য দেখতে আসতে শুরু করেন। প্রকৃতির কাছাকাছি তাদের রাতযাপনের প্রয়োজন থেকে তৈরি হয় ‘নিসর্গ ইকো কটেজ’।
এরপর লাউয়াছড়া ও চা-বাগানের কাছাকাছি প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে ওঠে এ অঞ্চলের প্রথম পাঁচ তারকা মানের রিসোর্ট ‘গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ’। সেই রিসোর্টের সাফল্য দেখে রাধানগর ও আশপাশের এলাকায় পর্যটন ব্যবসায় বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে ওঠেন উদ্যোক্তারা। ২০০০ সালের দিকে পর্যটনের সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট হতে থাকে। একের পর এক রিসোর্ট, কটেজ ও গেস্টহাউস গড়ে উঠতে থাকে। ধীরে ধীরে বদলে যায় গ্রামের চেহারা।
মেগা বিনিয়োগ ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন
পর্যটনের বিকাশের সঙ্গে রাধানগরে শুরু হয় বড় ধরনের বিনিয়োগ। বর্তমানে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা পর্যটনশিল্পকে কেন্দ্র করে এখানে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। এসব বিনিয়োগের ফলে একসময়কার নির্জন গ্রামে গড়ে উঠেছে আধুনিক অবকাশকেন্দ্র, বিলাসবহুল রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট নানা প্রতিষ্ঠান।
বিনিয়োগের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে জমির ব্যবহার, যোগাযোগব্যবস্থা ও স্থানীয় অর্থনীতির ধরন। স্থানীয় তরুণদের জন্য তৈরি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ। পর্যটকদের কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা। ফলে রাধানগর এখন শুধু শ্রীমঙ্গলের পর্যটনকেন্দ্র নয়, স্থানীয় অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রাধানগরে ৫০টির বেশি রিসোর্ট, কটেজ ও গেস্টহাউস রয়েছে। পুরো শ্রীমঙ্গলে প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজার পর্যটকের রাতযাপনের ব্যবস্থা থাকলেও শুধু রাধানগরেই থাকতে পারেন প্রায় দেড় হাজার পর্যটক।
গ্রামের উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে হোটেল প্যারাগন, নভেম ইকো রিসোর্ট, বালিশিরা রিসোর্ট, মাধবীলতা ইকো কটেজ, অরণ্যের দিনরাত্রি, শান্তিবাড়ি ইকো রিসোর্ট, লিচিবাড়ি ইকো রিসোর্ট, নিসর্গ নিরব ইকো কটেজ, চামুং রেস্টুরেন্ট, ওয়ান্ডার হিল ইকো রিসোর্ট, হারমিটেজ রিসোর্ট, ভ্রমণ কুঠী, পত্রস্নান ইকো রিসোর্ট, জলধারা রিসোর্ট ও বৃষ্টি বিলাস রিসোর্ট।
এসব রিসোর্টের অনেকগুলোর স্থাপত্যেও রয়েছে বৈচিত্র্য। বাঁশ ও কাঠের ব্যবহার, খোলা জায়গা এবং সবুজের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি স্থাপনা পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে। ফলে রাধানগরে পরিবেশবান্ধব পর্যটনেরও একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ও কর্মসংস্থান
পর্যটনের কারণে স্থানীয় অর্থনীতিতে এসেছে বড় পরিবর্তন। প্রায় চার-পাঁচ শ মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে পর্যটনশিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানান। কেউ রিসোর্ট পরিচালনা করছেন, কেউ রেস্তোরাঁয় কাজ করছেন, কেউ পর্যটক পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত। আবার কেউ হস্তশিল্প, চা-পাতা, মণিপুরি কাপড়, গাইডিং কিংবা অন্যান্য পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
ঢাকার তুলনামূলক কাছাকাছি হওয়ায় সারা বছরই এখানে পর্যটকের আনাগোনা থাকে। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে পরিবার ও বন্ধুদের দল নিয়ে পর্যটকেরা ভিড় করেন। বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ও শনিবার রাধানগরের রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁগুলোতে ব্যস্ততা বেড়ে যায়।
রাধানগরের হারমিটেজ রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী অ্যাডভোকেট সুলতানা নাহার বলেন, ‘শ্রীমঙ্গল দেশের পর্যটনের উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় একটা জায়গা। ইতোমধ্যে রাধানগরে কমিউনিটি বেসড ট্যুরিজম গড়ে উঠেছে, যা স্থানীয় উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক উন্নতিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। রাস্তাঘটের উন্নয়নসহ সরকারের আরো উদ্যোগ এ এলাকায় বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়তা করবে।’
রাধানগরের পর্যটন বিকাশের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের সম্পৃক্ততাই এখন এই এলাকার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আগে যেখানে কৃষি ও বাগাননির্ভর অর্থনীতি ছিল, সেখানে এখন পর্যটনকেন্দ্রিক নানা পেশার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে গ্রামের তরুণদের একটি অংশ স্থানীয়ভাবেই কর্মসংস্থানের পথ খুঁজে পাচ্ছেন।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ ভাবনা
শ্রীমঙ্গল প্রেস ক্লাবের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুল হাই ডন বলেন, ‘পর্যটন শিল্পে শ্রীমঙ্গলের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে সরকার রাধানগরে নৈশকালীন সড়কবাতি স্থাপন করেছে। পর্যটন উন্নয়নে আরো কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে পরিবেশবান্ধব পর্যটন শিল্প বিকাশে কাজ চলছে।’
পর্যটনের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ রাধানগরের প্রধান আকর্ষণই তার প্রাকৃতিক পরিবেশ। পাহাড়, চা-বাগান, বাগান ও সবুজ প্রকৃতি নষ্ট হলে পর্যটনের মূল আকর্ষণও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ইতিহাস সংরক্ষণ ও ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটনের সম্ভাবনা
রাধানগরের বর্তমান পরিচিতি যতটা উজ্জ্বল, এর অতীতের ইতিহাস ততটাই অনালোচিত। যে মানুষের নাম থেকে এই জনপদের নামকরণ, সেই রাধানাথ দেব চৌধুরীর জীবন ও কর্ম নিয়ে নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ গবেষণা বা স্মারক প্রতিষ্ঠান। অথচ তার জীবনের দিকে তাকালে পাওয়া যায় ব্রিটিশ আমলের জমিদারি ব্যবস্থা, শিক্ষা বিস্তার, ভূমিদান, সামাজিক উন্নয়ন এবং জনকল্যাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় ইতিহাস। তার পুত্র ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরীর অবদানও সেই ইতিহাসের অংশ।
এই ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য রাধানগরে একটি জাদুঘর, তথ্যকেন্দ্র কিংবা স্মারক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের এলাকার অতীত সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে। পর্যটকেরা শুধু রিসোর্ট কিংবা প্রকৃতি দেখতে নয়, রাধানগরের ইতিহাস জানতেও সেখানে আসতে পারবেন। এতে পর্যটন ও ইতিহাস—দুইয়ের মধ্যে তৈরি হতে পারে নতুন একটি সংযোগ। স্থানীয় ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে ইতিহাসভিত্তিক পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা।
অতীত ও বর্তমানের মেলবন্ধন
আজ রাধানগরের পরিচয় বদলে গেছে। একসময় যে গ্রামে ছিল নীরবতা, কৃষিজমি আর বাগান, সেখানে এখন পর্যটকদের আনাগোনা। আধুনিক রিসোর্টের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নানা ব্যবসা। দেশ-বিদেশের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগে গড়ে উঠেছে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা। স্থানীয় মানুষের আয় বেড়েছে, কর্মসংস্থান হয়েছে, বদলেছে যোগাযোগব্যবস্থা।
কিন্তু রাধানগরের এই বর্তমানকে বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় অতীতের দিকে। কারণ এই জনপদের নামের সঙ্গে যে মানুষটির নাম জড়িয়ে আছে, তিনি শুধু একজন জমিদার ছিলেন না; শিক্ষা ও সমাজসেবায়ও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
রাধানাথ দেব চৌধুরী ১৯৫৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর বহু বছর পর রাধানগর আজ পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণীয় এলাকায় পরিণত হয়েছে। তার সময়ের সেই উন্নয়নের স্বপ্ন আজ ভিন্ন রূপে বাস্তবতা পেয়েছে। রাধানগর তাই শুধু সবুজ পাহাড়, চা-বাগান আর বিলাসবহুল রিসোর্টের সমষ্টি নয়। এটি একটি জনপদের পরিবর্তনের গল্প। সেই গল্পের এক প্রান্তে আছেন দানবীর রাধানাথ দেব চৌধুরী; অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক পর্যটনের রাধানগর।
আজকের প্রজন্মের কাছে রাধানগরের অর্থ হয়তো পর্যটন, অবকাশ আর প্রকৃতির সান্নিধ্য। কিন্তু এই নামের ভেতরে লুকিয়ে আছে একজন মানুষের স্বপ্ন, একটি পরিবারের দান ও একটি জনপদের দীর্ঘ ইতিহাস। সেই ইতিহাস সংরক্ষণ করা গেলে রাধানগর শুধু বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রেই নয়, দেশের স্থানীয় ইতিহাসের মানচিত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিতে পারে।

মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পাহাড়ের ঢালে সারি সারি চা-বাগান। চারপাশে সবুজের সমারোহ। কোথাও লেবু ও কাঁঠালের বাগান, কোথাও বাঁশ-কাঠে তৈরি নান্দনিক কটেজ। সন্ধ্যা নামলেই জ্বলে ওঠে রিসোর্টের আলো। ছুটির দিনে সড়কজুড়ে বাড়ে পর্যটকবাহী গাড়ির চলাচল। পরিবার-পরিজন কিংবা বন্ধুদের নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ আসছেন প্রকৃতির কাছে কিছুটা সময় কাটাতে।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার রাধানগর এখন আর নিছক একটি গ্রাম নয়। পর্যটনের বিকাশে বদলে যাওয়া এই গ্রাম পরিচিতি পেয়েছে ‘টুরিস্ট ভিলেজ’ বা পর্যটনের গ্রাম হিসেবে। গড়ে উঠেছে ৫০টির বেশি রিসোর্ট, কটেজ ও গেস্টহাউস। পর্যটনকে ঘিরে তৈরি হয়েছে রেস্তোরাঁ, পরিবহন, গাইড, হস্তশিল্প, চা-পাতা ও মণিপুরি কাপড়সহ নানা ব্যবসা। সরাসরি ও পরোক্ষভাবে কর্মসংস্থান হয়েছে কয়েক শ মানুষের।
বর্তমানে আধুনিক রাধানগরে পর্যটনশিল্পকে কেন্দ্র করে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। একসময়ের নির্জন, কৃষিনির্ভর এই জনপদে এখন গড়ে উঠেছে আধুনিক মানের হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও নানা পর্যটনসুবিধা। এসব বিনিয়োগ শুধু রাধানগরের চেহারাই বদলায়নি, স্থানীয় অর্থনীতিতেও তৈরি করেছে নতুন গতি।
তবে রাধানগরের গল্প শুধু পর্যটনের নয়। এই নামের পেছনে রয়েছে প্রায় দেড় শ বছরের পুরোনো এক ইতিহাস। রয়েছে এক জমিদারের দূরদর্শিতা, ভূমিদান, শিক্ষানুরাগ ও সমাজসেবার কাহিনি। তিনি রাধানাথ দেব চৌধুরী। তার নামেই পরিচিতি পাওয়া এই জনপদ আজ পর্যটনের আলোয় আলোকিত হলেও নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই তার জীবন ও অবদানের ইতিহাস অজানা।
রাধানগরের বর্তমান উন্নয়নের সঙ্গে সেই বিস্মৃত ইতিহাসকে মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, একটি জনপদের বিকাশ শুধু তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের গল্প নয়; এর পেছনে থাকে মানুষের স্বপ্ন, উদ্যোগ ও ত্যাগের দীর্ঘ ইতিহাস।
জমিদার রাধানাথ দেব চৌধুরী ও রাধানগরের গোড়াপত্তন
রাধানাথ দেব চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন ১৮৭৫ সালের ৩১ আগস্ট। তিনি ছিলেন শ্রীমঙ্গলের একজন দানবীর জমিদার, শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক ও রাজনীতিক। হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ থানার ভুবীরবাগ এলাকার জমিদার হিসেবেও তার পরিচিতি ছিল। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের আসাম-বেঙ্গল অঞ্চলের ৫৭টি এজেন্সির মালিক ছিলেন তিনি। সর্বোচ্চ করদাতা হিসেবেও তার খ্যাতি ছিল।
ব্রিটিশ শাসনামলে শ্রীমঙ্গলের ডলুছড়া পাহাড়ে প্রায় ১৭৮ বিঘা জমি কিনেছিলেন তিনি। শুধু সম্পদ বাড়ানো তার উদ্দেশ্য ছিল না। ওই জমিতে এলাকার উন্নয়ন, বসতি স্থাপন ও সামাজিক পুনর্গঠনের পরিকল্পনা ছিল তার। সেই সময় পাহাড়ঘেরা ও অপেক্ষাকৃত অনুন্নত একটি অঞ্চলে বসতি ও উন্নয়নের সম্ভাবনা দেখা ছিল নিঃসন্দেহে দূরদর্শিতার পরিচয়।
তার মৃত্যুর পর ওই ভূমি চার পুত্রের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। পরবর্তী সময়ে তাদের কেউ জমি বিক্রি করেন, কেউ জমি হারান। ফলে জমির মালিকানা ও ব্যবহার বদলে যায়। কিন্তু রাধানাথ দেব চৌধুরীর উদ্যোগে যে উন্নয়নের বীজ বপন হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় এলাকাটি ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে ওঠে ‘রাধানগর’ নামে।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা শহর থেকে বর্তমান রাধানগরের দূরত্ব প্রায় আড়াই থেকে তিন কিলোমিটার। শহরের এত কাছে হয়েও একসময় এটি ছিল পাহাড়ঘেরা নির্জন জনপদ।
শিক্ষা ও সমাজসেবায় এক অনন্য অবদান
রাধানাথ দেব চৌধুরীর পরিচয় শুধু জমিদার হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষা বিস্তারে তার আগ্রহ ছিল গভীর। পিতার স্মৃতিতে তিনি চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য ভূমি দান করেন। মায়ের নামে প্রতিষ্ঠা করেন দীনময়ী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। পরে বিদ্যালয়টি ‘শ্রীমঙ্গল বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়’ নামে পরিচিত হয়।
তার সুযোগ্য পুত্র ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরীও বাবার সেই ধারাকে এগিয়ে নেন। তিনি ৩১ শতক জমিতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘রাধানাথ প্রাথমিক বিদ্যালয়’। পরে বিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন হয়ে হয় ‘বিরামপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়’।
একটি পরিবারের এসব উদ্যোগের দিকে তাকালে বোঝা যায়, তাদের দৃষ্টিভঙ্গি শুধু জমিদারি বা ব্যক্তিগত সম্পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক অবকাঠামো ও জনকল্যাণের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা ছিল। শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও জনসেবামূলক কর্মকাণ্ডে তাদের অবদানের ছাপ রয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ইতিহাস অনেকটাই বিস্মৃত হয়েছে।
কৃষিভিত্তিক গ্রাম থেকে পর্যটনকেন্দ্রিক যাত্রা
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্বাধীনতার পরও রাধানগর ছিল মূলত কৃষিনির্ভর গ্রাম। একসময় আখচাষের জন্য এলাকাটি পরিচিত ছিল। পরে লেবু ও কাঁঠালের বাগান গড়ে ওঠে। কৃষিকাজ ও বাগানই ছিল মানুষের জীবিকার অন্যতম প্রধান অবলম্বন।
পরিবর্তনের সূচনা হয় নব্বইয়ের দশকে। ১৯৯৬ সালে লাউয়াছড়া বনকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করার পর পর্যটকদের আগমন বাড়তে থাকে। বিশেষ করে বিদেশি পর্যটকেরা লাউয়াছড়ার জীববৈচিত্র্য দেখতে আসতে শুরু করেন। প্রকৃতির কাছাকাছি তাদের রাতযাপনের প্রয়োজন থেকে তৈরি হয় ‘নিসর্গ ইকো কটেজ’।
এরপর লাউয়াছড়া ও চা-বাগানের কাছাকাছি প্রাকৃতিক পরিবেশে গড়ে ওঠে এ অঞ্চলের প্রথম পাঁচ তারকা মানের রিসোর্ট ‘গ্র্যান্ড সুলতান টি রিসোর্ট অ্যান্ড গলফ’। সেই রিসোর্টের সাফল্য দেখে রাধানগর ও আশপাশের এলাকায় পর্যটন ব্যবসায় বিনিয়োগে আগ্রহী হয়ে ওঠেন উদ্যোক্তারা। ২০০০ সালের দিকে পর্যটনের সম্ভাবনা আরও স্পষ্ট হতে থাকে। একের পর এক রিসোর্ট, কটেজ ও গেস্টহাউস গড়ে উঠতে থাকে। ধীরে ধীরে বদলে যায় গ্রামের চেহারা।
মেগা বিনিয়োগ ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন
পর্যটনের বিকাশের সঙ্গে রাধানগরে শুরু হয় বড় ধরনের বিনিয়োগ। বর্তমানে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা পর্যটনশিল্পকে কেন্দ্র করে এখানে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছেন। এসব বিনিয়োগের ফলে একসময়কার নির্জন গ্রামে গড়ে উঠেছে আধুনিক অবকাশকেন্দ্র, বিলাসবহুল রিসোর্ট, কটেজ, রেস্তোরাঁ ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট নানা প্রতিষ্ঠান।
বিনিয়োগের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে জমির ব্যবহার, যোগাযোগব্যবস্থা ও স্থানীয় অর্থনীতির ধরন। স্থানীয় তরুণদের জন্য তৈরি হয়েছে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ। পর্যটকদের কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা। ফলে রাধানগর এখন শুধু শ্রীমঙ্গলের পর্যটনকেন্দ্র নয়, স্থানীয় অর্থনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে রাধানগরে ৫০টির বেশি রিসোর্ট, কটেজ ও গেস্টহাউস রয়েছে। পুরো শ্রীমঙ্গলে প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজার পর্যটকের রাতযাপনের ব্যবস্থা থাকলেও শুধু রাধানগরেই থাকতে পারেন প্রায় দেড় হাজার পর্যটক।
গ্রামের উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে হোটেল প্যারাগন, নভেম ইকো রিসোর্ট, বালিশিরা রিসোর্ট, মাধবীলতা ইকো কটেজ, অরণ্যের দিনরাত্রি, শান্তিবাড়ি ইকো রিসোর্ট, লিচিবাড়ি ইকো রিসোর্ট, নিসর্গ নিরব ইকো কটেজ, চামুং রেস্টুরেন্ট, ওয়ান্ডার হিল ইকো রিসোর্ট, হারমিটেজ রিসোর্ট, ভ্রমণ কুঠী, পত্রস্নান ইকো রিসোর্ট, জলধারা রিসোর্ট ও বৃষ্টি বিলাস রিসোর্ট।
এসব রিসোর্টের অনেকগুলোর স্থাপত্যেও রয়েছে বৈচিত্র্য। বাঁশ ও কাঠের ব্যবহার, খোলা জায়গা এবং সবুজের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি স্থাপনা পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে। ফলে রাধানগরে পরিবেশবান্ধব পর্যটনেরও একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ও কর্মসংস্থান
পর্যটনের কারণে স্থানীয় অর্থনীতিতে এসেছে বড় পরিবর্তন। প্রায় চার-পাঁচ শ মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে পর্যটনশিল্পের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন বলে স্থানীয়রা জানান। কেউ রিসোর্ট পরিচালনা করছেন, কেউ রেস্তোরাঁয় কাজ করছেন, কেউ পর্যটক পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত। আবার কেউ হস্তশিল্প, চা-পাতা, মণিপুরি কাপড়, গাইডিং কিংবা অন্যান্য পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
ঢাকার তুলনামূলক কাছাকাছি হওয়ায় সারা বছরই এখানে পর্যটকের আনাগোনা থাকে। বিশেষ করে ছুটির দিনগুলোতে পরিবার ও বন্ধুদের দল নিয়ে পর্যটকেরা ভিড় করেন। বৃহস্পতিবার, শুক্রবার ও শনিবার রাধানগরের রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁগুলোতে ব্যস্ততা বেড়ে যায়।
রাধানগরের হারমিটেজ রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী অ্যাডভোকেট সুলতানা নাহার বলেন, ‘শ্রীমঙ্গল দেশের পর্যটনের উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় একটা জায়গা। ইতোমধ্যে রাধানগরে কমিউনিটি বেসড ট্যুরিজম গড়ে উঠেছে, যা স্থানীয় উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক উন্নতিতে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। রাস্তাঘটের উন্নয়নসহ সরকারের আরো উদ্যোগ এ এলাকায় বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়তা করবে।’
রাধানগরের পর্যটন বিকাশের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের সম্পৃক্ততাই এখন এই এলাকার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। আগে যেখানে কৃষি ও বাগাননির্ভর অর্থনীতি ছিল, সেখানে এখন পর্যটনকেন্দ্রিক নানা পেশার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে গ্রামের তরুণদের একটি অংশ স্থানীয়ভাবেই কর্মসংস্থানের পথ খুঁজে পাচ্ছেন।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ ভাবনা
শ্রীমঙ্গল প্রেস ক্লাবের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুল হাই ডন বলেন, ‘পর্যটন শিল্পে শ্রীমঙ্গলের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে সরকার রাধানগরে নৈশকালীন সড়কবাতি স্থাপন করেছে। পর্যটন উন্নয়নে আরো কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে পরিবেশবান্ধব পর্যটন শিল্প বিকাশে কাজ চলছে।’
পর্যটনের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। কারণ রাধানগরের প্রধান আকর্ষণই তার প্রাকৃতিক পরিবেশ। পাহাড়, চা-বাগান, বাগান ও সবুজ প্রকৃতি নষ্ট হলে পর্যটনের মূল আকর্ষণও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ইতিহাস সংরক্ষণ ও ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটনের সম্ভাবনা
রাধানগরের বর্তমান পরিচিতি যতটা উজ্জ্বল, এর অতীতের ইতিহাস ততটাই অনালোচিত। যে মানুষের নাম থেকে এই জনপদের নামকরণ, সেই রাধানাথ দেব চৌধুরীর জীবন ও কর্ম নিয়ে নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ গবেষণা বা স্মারক প্রতিষ্ঠান। অথচ তার জীবনের দিকে তাকালে পাওয়া যায় ব্রিটিশ আমলের জমিদারি ব্যবস্থা, শিক্ষা বিস্তার, ভূমিদান, সামাজিক উন্নয়ন এবং জনকল্যাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় ইতিহাস। তার পুত্র ক্ষীরদ বিহারী দেব চৌধুরীর অবদানও সেই ইতিহাসের অংশ।
এই ইতিহাস সংরক্ষণের জন্য রাধানগরে একটি জাদুঘর, তথ্যকেন্দ্র কিংবা স্মারক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের এলাকার অতীত সম্পর্কে জানার সুযোগ পাবে। পর্যটকেরা শুধু রিসোর্ট কিংবা প্রকৃতি দেখতে নয়, রাধানগরের ইতিহাস জানতেও সেখানে আসতে পারবেন। এতে পর্যটন ও ইতিহাস—দুইয়ের মধ্যে তৈরি হতে পারে নতুন একটি সংযোগ। স্থানীয় ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে ইতিহাসভিত্তিক পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা।
অতীত ও বর্তমানের মেলবন্ধন
আজ রাধানগরের পরিচয় বদলে গেছে। একসময় যে গ্রামে ছিল নীরবতা, কৃষিজমি আর বাগান, সেখানে এখন পর্যটকদের আনাগোনা। আধুনিক রিসোর্টের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে নানা ব্যবসা। দেশ-বিদেশের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের হাজার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগে গড়ে উঠেছে নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা। স্থানীয় মানুষের আয় বেড়েছে, কর্মসংস্থান হয়েছে, বদলেছে যোগাযোগব্যবস্থা।
কিন্তু রাধানগরের এই বর্তমানকে বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় অতীতের দিকে। কারণ এই জনপদের নামের সঙ্গে যে মানুষটির নাম জড়িয়ে আছে, তিনি শুধু একজন জমিদার ছিলেন না; শিক্ষা ও সমাজসেবায়ও রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।
রাধানাথ দেব চৌধুরী ১৯৫৮ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর বহু বছর পর রাধানগর আজ পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণীয় এলাকায় পরিণত হয়েছে। তার সময়ের সেই উন্নয়নের স্বপ্ন আজ ভিন্ন রূপে বাস্তবতা পেয়েছে। রাধানগর তাই শুধু সবুজ পাহাড়, চা-বাগান আর বিলাসবহুল রিসোর্টের সমষ্টি নয়। এটি একটি জনপদের পরিবর্তনের গল্প। সেই গল্পের এক প্রান্তে আছেন দানবীর রাধানাথ দেব চৌধুরী; অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক পর্যটনের রাধানগর।
আজকের প্রজন্মের কাছে রাধানগরের অর্থ হয়তো পর্যটন, অবকাশ আর প্রকৃতির সান্নিধ্য। কিন্তু এই নামের ভেতরে লুকিয়ে আছে একজন মানুষের স্বপ্ন, একটি পরিবারের দান ও একটি জনপদের দীর্ঘ ইতিহাস। সেই ইতিহাস সংরক্ষণ করা গেলে রাধানগর শুধু বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্রেই নয়, দেশের স্থানীয় ইতিহাসের মানচিত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নিতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন