সংবাদ

রোবোটিক সার্জারি: শল্যচিকিৎসার নতুন অধ্যায়


নাজমুল হুদা খান
নাজমুল হুদা খান
প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:৫০ এএম

রোবোটিক সার্জারি: শল্যচিকিৎসার নতুন অধ্যায়
বাংলাদেশও রোবোটিক সার্জারি প্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করেছে

সার্জারি চিকিৎসার ইতিহাস প্রায় ১০ হাজার বছরের হলেও একসময় ইউরোপের অন্ধকার যুগে নাপিতেরা কাঁটাছেঁড়া বা সার্জারির কাজ করতেন। আজ চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় সার্জারি এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে প্রযুক্তির প্রতিটি নতুন সংযোজন রোগীর জন্য আরও নিরাপদ, কম আঘাতপ্রবণ ও অধিক নিখুঁত চিকিৎসার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ওপেন সার্জারি থেকে ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি, ল্যাপারোস্কোপি থেকে রোবোটিক-অ্যাসিস্টেড সার্জারি—এই বিবর্তনের সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি হলো রোবোটিক সার্জারি।

রোবোটিক সার্জারির ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়। ১৯৮৫ সালে ‘পুমা-৫৬০’ নামের একটি রোবোটিক সিস্টেম ব্যবহার করে মস্তিষ্কের টিস্যু পরীক্ষা করা হয়। এটিকে রোবোটিক-অ্যাসিস্টেড সার্জারির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরবর্তী সময়ে ‘প্রোবট’, ‘রোবোডক’, ‘এইসপ’ ও ‘জিউস’-এর মতো বিভিন্ন সিস্টেমের উন্নয়ন ঘটে।

১৯৯০-এর দশকে নাসার প্রতিরক্ষা গবেষণা ও টেলিসার্জারির ধারণা রোবোটিক সার্জারি প্রযুক্তির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে দুর্গম স্থান, যুদ্ধক্ষেত্র কিংবা মহাকাশে অবস্থানরত রোগীর কাছে দূরবর্তী সার্জনের দক্ষতা পৌঁছে দেওয়ার ধারণা থেকে টেলিরোবোটিক সার্জারির গবেষণা এগিয়ে যায়। এরপর আসে ‘দা ভিঞ্চি সার্জিক্যাল সিস্টেম’-এর যুগ। ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ ‘দা ভিঞ্চি’ সিস্টেমকে সাধারণ ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির জন্য অনুমোদন দেয়। এরপর ইউরোলজি, গাইনোকোলজি, জেনারেল সার্জারি, থোরাসিক সার্জারি এবং বিভিন্ন ক্যান্সার সার্জারিতে রোবোটিক প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বিস্তৃত হয়।

বাংলাদেশও এখন এই প্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করেছে। গত আগস্ট মাসে ‘মেডবট টুমাই’ এন্ডোস্কোপিক সার্জিক্যাল রোবটের সহায়তায় দুটি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়—একটি রোবোটিক কোলেসিস্টেকটমি এবং অন্যটি রোবোটিক হিস্টেরেকটমি। অনেকে এটিকে বাংলাদেশে নিয়মিত রোবোটিক সার্জারি সেবার সূচনা হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

রোবোটিক সার্জারি এমন একটি উন্নত মিনিমালি ইনভেসিভ বা স্বল্প-আঘাতের অস্ত্রোপচার পদ্ধতি, যেখানে সার্জন একটি কনসোলে বসে বিশেষায়িত যন্ত্র ও ক্যামেরা-সমৃদ্ধ রোবোটিক বাহু নিয়ন্ত্রণ করে জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রোবট নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে রোগীর অস্ত্রোপচার করে না। রোবোটিক সিস্টেম সার্জনের হাতের নড়াচড়াকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নিয়ন্ত্রিতভাবে রোগীর শরীরের ভেতরের যন্ত্রে রূপান্তর করে। সাধারণত একটি রোবোটিক সার্জিক্যাল প্ল্যাটফর্মে থাকে সার্জনের কনসোল, রোগীর পাশে থাকা একাধিক রোবোটিক আর্ম, উচ্চ-রেজল্যুশনের থ্রি-ডি ক্যামেরা, সূক্ষ্ম ও বিভিন্ন ধরনের সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট এবং সফটওয়্যার-নিয়ন্ত্রিত মুভমেন্ট ও মুভমেন্ট স্কেলিং ব্যবস্থা। ফলে সার্জন শরীরের গভীর ও সংকীর্ণ স্থানে ত্রিমাত্রিক ও বড় করে দেখা অপারেটিভ ফিল্ডে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কাজ করতে পারেন।

প্রথমে রোগীর শরীরে কয়েকটি ছোট ছিদ্র করা হয়। এসব ছিদ্রের মাধ্যমে ক্যামেরা ও বিশেষ সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট প্রবেশ করানো হয়। রোবোটিক বাহুগুলো রোগীর শরীরের বাইরে অবস্থান করে এবং ভেতরের যন্ত্রগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। যন্ত্রের মাথা মানুষের কব্জির মতো বিভিন্ন দিকে নড়াচড়া করতে সক্ষম। কিছু সিস্টেমে ৩৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত মুভমেন্টের সুবিধা থাকে। একই সঙ্গে হাতের স্বাভাবিক বা সূক্ষ্ম কাঁপুনি সফটওয়্যার-নিয়ন্ত্রিতভাবে কমিয়ে আনা যায়।

এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সূক্ষ্মতা। মানুষের হাত যতই দক্ষ হোক, তার স্বাভাবিক নড়াচড়া ও কাঁপুনির কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। রোবোটিক প্রযুক্তি সেই নড়াচড়াকে সফটওয়্যারের মাধ্যমে আরও নিয়ন্ত্রিত করতে পারে। যন্ত্রের মাথা মানুষের কব্জির মতো বিভিন্ন দিকে নড়াচড়া করতে পারে এবং শরীরের গভীর ও সংকীর্ণ স্থানে কাজ করার সুযোগ তৈরি করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় উচ্চক্ষমতার ত্রিমাত্রিক ভিশন। শরীরের গভীরে কোনো অতি সূক্ষ্ম অ্যানাটমিক কাঠামো, রক্তনালি বা টিস্যুর স্তর শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এই উন্নত দৃষ্টিশক্তি সার্জনকে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে জটিল ও সূক্ষ্ম অস্ত্রোপচারে এর গুরুত্ব রয়েছে।

রোবোটিক সার্জারির আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো, এটি সাধারণত মিনিমালি ইনভেসিভ পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। বড় করে কেটে অস্ত্রোপচার করার পরিবর্তে ছোট ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে ক্যামেরা ও বিশেষ যন্ত্র প্রবেশ করানো হয়। এর ফলে নির্বাচিত রোগীদের ক্ষেত্রে অপারেশনের পর ব্যথা কম হতে পারে, ক্ষত দ্রুত শুকাতে পারে, সংক্রমণের ঝুঁকি কমতে পারে এবং রোগী তুলনামূলক দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন। কিছু নির্বাচিত অস্ত্রোপচারে রক্তক্ষরণও কম হতে পারে। ইউরোলজি, গাইনোকোলজি, জেনারেল সার্জারি, থোরাসিক সার্জারি এবং বিভিন্ন ক্যান্সার সার্জারিতে রোবোটিক প্রযুক্তির ব্যবহার ইতোমধ্যে বিস্তৃত হয়েছে। পেলভিস, প্রোস্টেট, জরায়ু, কোলন-রেকটামসহ শরীরের জটিল অঞ্চলে সার্জনের জন্য উন্নত ভিশন ও সূক্ষ্ম মুভমেন্টের সুবিধা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

রোবোটিক সার্জারি অত্যাধুনিক হলেও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। ফলে অন্য অস্ত্রোপচারের মতোই রক্তপাত, সংক্রমণ, অ্যানেস্থেসিয়া-সংক্রান্ত জটিলতা এবং অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গে জখমের সম্ভাবনা থাকে। নিরাপদভাবে রোবোটিক সার্জারি করা সম্ভব না হলে ওপেন সার্জারিতে রূপান্তর করতে হতে পারে। রোবোটিক সার্জারিতে যান্ত্রিক ত্রুটি বা প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই বিকল্প সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত টিম প্রস্তুত রাখা অপরিহার্য। রোবোটিক সার্জারি পরিচালনার জন্য দক্ষ সার্জন, সহকারী, অবেদন বিশেষজ্ঞ, নার্সিং ও বায়োমেডিক্যাল টিম তৈরি রাখা প্রয়োজন। শুধু রোবট স্থাপন করলেই নিরাপদ সার্জারি পরিচালনা সম্ভব নয়; এর জন্য দীর্ঘ ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। রোবোটিক প্ল্যাটফর্ম, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি এখনো ব্যয়বহুল। তাই অপারেশনের খরচও বেশি। রোবোটিক সার্জারির খরচ প্রচলিত সার্জারি বা ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির তুলনায় প্রায় দুই থেকে তিন গুণ হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ১ লাখ ২০ হাজার টাকার একটি প্রচলিত অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে রোবোটিক সার্জারিতে প্রায় সাড়ে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা খরচ হতে পারে।

রোবোটিক সার্জারি নিয়ে সাধারণের একটি ভুল ধারণা হলো—এতে হয়তো ভবিষ্যতে সার্জনের প্রয়োজন থাকবে না। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা হলো, এটি সার্জন প্রতিস্থাপন নয়, সার্জন-সহায়ক প্রযুক্তি। সিদ্ধান্ত নেন সার্জন; রোগীর সমস্যা বোঝেন সার্জন; কখন, কোথায়, কীভাবে অপারেশন করতে হবে এবং কোনো জটিলতা দেখা দিলে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে—এসবের জন্য সার্জনের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। রোবট সার্জনের চোখকে আরও স্পষ্টভাবে দেখতে, হাতকে আরও সূক্ষ্মভাবে কাজ করতে এবং জটিল অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গভীরে আরও সঠিকভাবে পৌঁছাতে সহায়তা করে।

বাংলাদেশে রোবোটিক সার্জারির সূচনা নিঃসন্দেহে চিকিৎসা প্রযুক্তির বিবর্তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এর মাধ্যমে দেশের সার্জনদের আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ এবং গবেষণার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি রোবট কেনা কোনো হাসপাতালের চিকিৎসার মানের চূড়ান্ত পরিচয় নয়। রোবট কতটি আছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—কতজন দক্ষ সার্জন এটি পরিচালনা করছেন; কতটা নিরাপদভাবে ব্যবহার হচ্ছে; রোগী নির্বাচন কতটা বৈজ্ঞানিক; জটিলতার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত; এবং সর্বোপরি রোগী কতটা উপকৃত হচ্ছেন।

শল্যচিকিৎসার ভবিষ্যৎ নিঃসন্দেহে আরও প্রযুক্তিনির্ভর হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত ইমেজিং, রোবোটিক্স ও ডেটা-নির্ভর চিকিৎসা একদিন সার্জারির চেহারা আরও বদলে দিতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, চিকিৎসার মূল দর্শন অপরিবর্তিত থাকবে—রোগীর নিরাপত্তা, মানবিকতা ও সর্বোত্তম চিকিৎসা নিশ্চিত করা। অতএব, বাংলাদেশে রোবোটিক সার্জারির অগ্রযাত্রাকে স্বাগত জানাতে হবে, তবে অন্ধ উচ্ছ্বাসের সঙ্গে নয়; বিজ্ঞান, প্রশিক্ষণ, গবেষণা, নিরাপত্তা ও রোগীর সামর্থ্যের বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে। কারণ শেষ পর্যন্ত সাফল্যের মাপকাঠি হবে না কতটি রোবট দেশে এসেছে—সাফল্যের মাপকাঠি হবে, এই প্রযুক্তি দিয়ে আমরা কতটা নিরাপদ, কার্যকর ও মানবিক শল্যচিকিৎসা দিতে পারছি।

[লেখক: পরিচালক, মেডিক্যাল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬


রোবোটিক সার্জারি: শল্যচিকিৎসার নতুন অধ্যায়

প্রকাশের তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

সার্জারি চিকিৎসার ইতিহাস প্রায় ১০ হাজার বছরের হলেও একসময় ইউরোপের অন্ধকার যুগে নাপিতেরা কাঁটাছেঁড়া বা সার্জারির কাজ করতেন। আজ চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রযাত্রায় সার্জারি এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে প্রযুক্তির প্রতিটি নতুন সংযোজন রোগীর জন্য আরও নিরাপদ, কম আঘাতপ্রবণ ও অধিক নিখুঁত চিকিৎসার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। ওপেন সার্জারি থেকে ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি, ল্যাপারোস্কোপি থেকে রোবোটিক-অ্যাসিস্টেড সার্জারি—এই বিবর্তনের সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি হলো রোবোটিক সার্জারি।

রোবোটিক সার্জারির ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়। ১৯৮৫ সালে ‘পুমা-৫৬০’ নামের একটি রোবোটিক সিস্টেম ব্যবহার করে মস্তিষ্কের টিস্যু পরীক্ষা করা হয়। এটিকে রোবোটিক-অ্যাসিস্টেড সার্জারির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পরবর্তী সময়ে ‘প্রোবট’, ‘রোবোডক’, ‘এইসপ’ ও ‘জিউস’-এর মতো বিভিন্ন সিস্টেমের উন্নয়ন ঘটে।

১৯৯০-এর দশকে নাসার প্রতিরক্ষা গবেষণা ও টেলিসার্জারির ধারণা রোবোটিক সার্জারি প্রযুক্তির বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে দুর্গম স্থান, যুদ্ধক্ষেত্র কিংবা মহাকাশে অবস্থানরত রোগীর কাছে দূরবর্তী সার্জনের দক্ষতা পৌঁছে দেওয়ার ধারণা থেকে টেলিরোবোটিক সার্জারির গবেষণা এগিয়ে যায়। এরপর আসে ‘দা ভিঞ্চি সার্জিক্যাল সিস্টেম’-এর যুগ। ২০০০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এফডিএ ‘দা ভিঞ্চি’ সিস্টেমকে সাধারণ ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির জন্য অনুমোদন দেয়। এরপর ইউরোলজি, গাইনোকোলজি, জেনারেল সার্জারি, থোরাসিক সার্জারি এবং বিভিন্ন ক্যান্সার সার্জারিতে রোবোটিক প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বিস্তৃত হয়।

বাংলাদেশও এখন এই প্রযুক্তির যুগে প্রবেশ করেছে। গত আগস্ট মাসে ‘মেডবট টুমাই’ এন্ডোস্কোপিক সার্জিক্যাল রোবটের সহায়তায় দুটি অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়—একটি রোবোটিক কোলেসিস্টেকটমি এবং অন্যটি রোবোটিক হিস্টেরেকটমি। অনেকে এটিকে বাংলাদেশে নিয়মিত রোবোটিক সার্জারি সেবার সূচনা হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

রোবোটিক সার্জারি এমন একটি উন্নত মিনিমালি ইনভেসিভ বা স্বল্প-আঘাতের অস্ত্রোপচার পদ্ধতি, যেখানে সার্জন একটি কনসোলে বসে বিশেষায়িত যন্ত্র ও ক্যামেরা-সমৃদ্ধ রোবোটিক বাহু নিয়ন্ত্রণ করে জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—রোবট নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে রোগীর অস্ত্রোপচার করে না। রোবোটিক সিস্টেম সার্জনের হাতের নড়াচড়াকে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নিয়ন্ত্রিতভাবে রোগীর শরীরের ভেতরের যন্ত্রে রূপান্তর করে। সাধারণত একটি রোবোটিক সার্জিক্যাল প্ল্যাটফর্মে থাকে সার্জনের কনসোল, রোগীর পাশে থাকা একাধিক রোবোটিক আর্ম, উচ্চ-রেজল্যুশনের থ্রি-ডি ক্যামেরা, সূক্ষ্ম ও বিভিন্ন ধরনের সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট এবং সফটওয়্যার-নিয়ন্ত্রিত মুভমেন্ট ও মুভমেন্ট স্কেলিং ব্যবস্থা। ফলে সার্জন শরীরের গভীর ও সংকীর্ণ স্থানে ত্রিমাত্রিক ও বড় করে দেখা অপারেটিভ ফিল্ডে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কাজ করতে পারেন।

প্রথমে রোগীর শরীরে কয়েকটি ছোট ছিদ্র করা হয়। এসব ছিদ্রের মাধ্যমে ক্যামেরা ও বিশেষ সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট প্রবেশ করানো হয়। রোবোটিক বাহুগুলো রোগীর শরীরের বাইরে অবস্থান করে এবং ভেতরের যন্ত্রগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করে। যন্ত্রের মাথা মানুষের কব্জির মতো বিভিন্ন দিকে নড়াচড়া করতে সক্ষম। কিছু সিস্টেমে ৩৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত মুভমেন্টের সুবিধা থাকে। একই সঙ্গে হাতের স্বাভাবিক বা সূক্ষ্ম কাঁপুনি সফটওয়্যার-নিয়ন্ত্রিতভাবে কমিয়ে আনা যায়।

এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো সূক্ষ্মতা। মানুষের হাত যতই দক্ষ হোক, তার স্বাভাবিক নড়াচড়া ও কাঁপুনির কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে। রোবোটিক প্রযুক্তি সেই নড়াচড়াকে সফটওয়্যারের মাধ্যমে আরও নিয়ন্ত্রিত করতে পারে। যন্ত্রের মাথা মানুষের কব্জির মতো বিভিন্ন দিকে নড়াচড়া করতে পারে এবং শরীরের গভীর ও সংকীর্ণ স্থানে কাজ করার সুযোগ তৈরি করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় উচ্চক্ষমতার ত্রিমাত্রিক ভিশন। শরীরের গভীরে কোনো অতি সূক্ষ্ম অ্যানাটমিক কাঠামো, রক্তনালি বা টিস্যুর স্তর শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এই উন্নত দৃষ্টিশক্তি সার্জনকে সহায়তা করতে পারে। বিশেষ করে জটিল ও সূক্ষ্ম অস্ত্রোপচারে এর গুরুত্ব রয়েছে।

রোবোটিক সার্জারির আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো, এটি সাধারণত মিনিমালি ইনভেসিভ পদ্ধতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়। বড় করে কেটে অস্ত্রোপচার করার পরিবর্তে ছোট ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে ক্যামেরা ও বিশেষ যন্ত্র প্রবেশ করানো হয়। এর ফলে নির্বাচিত রোগীদের ক্ষেত্রে অপারেশনের পর ব্যথা কম হতে পারে, ক্ষত দ্রুত শুকাতে পারে, সংক্রমণের ঝুঁকি কমতে পারে এবং রোগী তুলনামূলক দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেন। কিছু নির্বাচিত অস্ত্রোপচারে রক্তক্ষরণও কম হতে পারে। ইউরোলজি, গাইনোকোলজি, জেনারেল সার্জারি, থোরাসিক সার্জারি এবং বিভিন্ন ক্যান্সার সার্জারিতে রোবোটিক প্রযুক্তির ব্যবহার ইতোমধ্যে বিস্তৃত হয়েছে। পেলভিস, প্রোস্টেট, জরায়ু, কোলন-রেকটামসহ শরীরের জটিল অঞ্চলে সার্জনের জন্য উন্নত ভিশন ও সূক্ষ্ম মুভমেন্টের সুবিধা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

রোবোটিক সার্জারি অত্যাধুনিক হলেও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। ফলে অন্য অস্ত্রোপচারের মতোই রক্তপাত, সংক্রমণ, অ্যানেস্থেসিয়া-সংক্রান্ত জটিলতা এবং অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গে জখমের সম্ভাবনা থাকে। নিরাপদভাবে রোবোটিক সার্জারি করা সম্ভব না হলে ওপেন সার্জারিতে রূপান্তর করতে হতে পারে। রোবোটিক সার্জারিতে যান্ত্রিক ত্রুটি বা প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই বিকল্প সার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত টিম প্রস্তুত রাখা অপরিহার্য। রোবোটিক সার্জারি পরিচালনার জন্য দক্ষ সার্জন, সহকারী, অবেদন বিশেষজ্ঞ, নার্সিং ও বায়োমেডিক্যাল টিম তৈরি রাখা প্রয়োজন। শুধু রোবট স্থাপন করলেই নিরাপদ সার্জারি পরিচালনা সম্ভব নয়; এর জন্য দীর্ঘ ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। রোবোটিক প্ল্যাটফর্ম, প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি এখনো ব্যয়বহুল। তাই অপারেশনের খরচও বেশি। রোবোটিক সার্জারির খরচ প্রচলিত সার্জারি বা ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির তুলনায় প্রায় দুই থেকে তিন গুণ হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ১ লাখ ২০ হাজার টাকার একটি প্রচলিত অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে রোবোটিক সার্জারিতে প্রায় সাড়ে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা খরচ হতে পারে।

রোবোটিক সার্জারি নিয়ে সাধারণের একটি ভুল ধারণা হলো—এতে হয়তো ভবিষ্যতে সার্জনের প্রয়োজন থাকবে না। কিন্তু প্রকৃত অবস্থা হলো, এটি সার্জন প্রতিস্থাপন নয়, সার্জন-সহায়ক প্রযুক্তি। সিদ্ধান্ত নেন সার্জন; রোগীর সমস্যা বোঝেন সার্জন; কখন, কোথায়, কীভাবে অপারেশন করতে হবে এবং কোনো জটিলতা দেখা দিলে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে—এসবের জন্য সার্জনের প্রয়োজনীয়তা অপরিহার্য। রোবট সার্জনের চোখকে আরও স্পষ্টভাবে দেখতে, হাতকে আরও সূক্ষ্মভাবে কাজ করতে এবং জটিল অঙ্গপ্রত্যঙ্গের গভীরে আরও সঠিকভাবে পৌঁছাতে সহায়তা করে।

বাংলাদেশে রোবোটিক সার্জারির সূচনা নিঃসন্দেহে চিকিৎসা প্রযুক্তির বিবর্তনে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এর মাধ্যমে দেশের সার্জনদের আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জন, আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ এবং গবেষণার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি রোবট কেনা কোনো হাসপাতালের চিকিৎসার মানের চূড়ান্ত পরিচয় নয়। রোবট কতটি আছে, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—কতজন দক্ষ সার্জন এটি পরিচালনা করছেন; কতটা নিরাপদভাবে ব্যবহার হচ্ছে; রোগী নির্বাচন কতটা বৈজ্ঞানিক; জটিলতার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত; এবং সর্বোপরি রোগী কতটা উপকৃত হচ্ছেন।

শল্যচিকিৎসার ভবিষ্যৎ নিঃসন্দেহে আরও প্রযুক্তিনির্ভর হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উন্নত ইমেজিং, রোবোটিক্স ও ডেটা-নির্ভর চিকিৎসা একদিন সার্জারির চেহারা আরও বদলে দিতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক, চিকিৎসার মূল দর্শন অপরিবর্তিত থাকবে—রোগীর নিরাপত্তা, মানবিকতা ও সর্বোত্তম চিকিৎসা নিশ্চিত করা। অতএব, বাংলাদেশে রোবোটিক সার্জারির অগ্রযাত্রাকে স্বাগত জানাতে হবে, তবে অন্ধ উচ্ছ্বাসের সঙ্গে নয়; বিজ্ঞান, প্রশিক্ষণ, গবেষণা, নিরাপত্তা ও রোগীর সামর্থ্যের বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে। কারণ শেষ পর্যন্ত সাফল্যের মাপকাঠি হবে না কতটি রোবট দেশে এসেছে—সাফল্যের মাপকাঠি হবে, এই প্রযুক্তি দিয়ে আমরা কতটা নিরাপদ, কার্যকর ও মানবিক শল্যচিকিৎসা দিতে পারছি।

[লেখক: পরিচালক, মেডিক্যাল সার্ভিসেস, বিআরবি হাসপাতাল]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত