ঊনিশ শতকে যখন ফরাসি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিকার জুল ভার্ন সাবমেরিন, উড়োজাহাজ, অদৃশ্য মানুষ নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন তখন সে যুগের কতজনই বা ভেবেছিল মানুষ এসব প্রযুক্তি সত্যি সত্যি আবিষ্কার করবে। অথচ, জুল ভার্নের কল্পনার সবই আজ বাস্তব হয়েছে। মানুষ তার কাজের সুবিধার্থে বিজ্ঞান চর্চার মাধ্যমে এমন সব প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছে যা সত্যিই তাক লগানোর মতো। আর মানুষ এসবই করেছে তার বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে। মানুষ আজ এমন এক প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছে— যা নিজেই চিন্তা করা শিখেছে। নতুন অনেক বিষয় আবিষ্কার করছে, শত শত বছরের পুরনো গাণিতিক সমস্যার সমাধান করছে, কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের কোড লিখছে, অপারেশন থিয়েটারে জটিল অপারেশন করছে, মহাবিশ্বের সিমুলেশন তৈরির মাধ্যমে মহাবৈশ্বিক মানচিত্র তৈরি করছে। এই প্রযুক্তির নাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। মানুষের এযাবতকালের সমস্ত আবিষ্কার ছিল যান্ত্রিক প্রযুক্তি। এই প্রথম মানুষ এমন এক প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছে— যা যান্ত্রিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রযুক্তি অথবা এই দুইয়ের সমন্বিত প্রযুক্তি। আর এই প্রযুক্তি এমন পর্যায়ে চলে গেছে যা অনেক মানুষকে ভাবাচ্ছে এই প্রযুক্তি মানুষের বিনাশ ডেকে আনবে না তো?
আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশের সংবাদপত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্বারা মানুষের বিলোপ সাধনের খবরে গোটা বিশ্বই নড়েচড়ে বসেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জনক বলে পরিচিত জিওফ্রে হিন্টন সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যদের সাথে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন। সেই বৈঠক শেষে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তাকে জিজ্ঞেস করা হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণেতাদের হাতে আর কতটুকু সময় আছে। এর উত্তরে হিন্টন বলেন মানুষের হাতে এক বছর সময় আছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণে। তবে এর চেয়ে খুব বেশি সময় নেই।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের তরুণ গবেষক ২৭ বছর বয়সী জ্যাকব কঙ্টন সম্প্রতি নিরাপত্তা সম্পর্কিত উদ্বেগের কারণে প্রতিষ্ঠানটি থেকে বের হয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের সাথে যারা জড়িত তারা বিশ্বাস করেন এই দশকের শেষাশেষি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের হত্যা করবে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৪০০ কর্মী মার্কিন সরকারকে লিখিত এক খোলা চিঠিতে এই প্রযুক্ত নিয়ন্ত্রণের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনে প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত ওভ অহুড়হব ইঁরষফং ওঃ, ঊাবৎুড়হব উরবং বইয়ের লেখক ইউডুকস্কি এবং সোয়ারেস একই রকম আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন যে, মানুষ যদি মহাবুদ্ধিমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আবিষ্কার করে তাহলে মানব জাতির বিলুপ্তি ঘটতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অধ্যাপক টবি ওয়ালশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্বারা মানুষের বিনাশ সাধনের বিষয়ে পাঁচটি সম্ভাব্য পরিণতির কথা বলেছেন দ্যা করভারসেশন নামক পত্রিকায়। এই পাঁচটি সম্ভাবনার প্রথমটি হলো কোনো মহাবুদ্ধিমান সত্তা আমাদের কীভাবে ধ্বংস করবে তা আমরা জানতে পারব না, কেননা তারা কীভাবে আমাদের ধ্বংস করবে তা জানতে গেলে আমাদেরও মহাবুদ্ধিমান হতে হবে। টবি ওয়ালশ এই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, বর্তমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখনো যথেষ্ট মহাবুদ্ধিমান হয়ে ওঠেনি। দ্বিতীয় সম্ভাবনায় ওয়ালশ বলেছেন যে, মহাবুদ্ধিমান বুদ্ধিমত্তা তাকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া বা তার নির্ধারিত অভীষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়নে অসাধারণ পারদর্শী হলেও তার মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে কোনো চিন্তা নাও থাকতে পারে। অর্থাৎ, মহাবুদ্ধিমান যান্ত্রিক সত্তা মানুষকে তার অস্তিত্বের জন্য হুমকি নাও ভাবতে পারে। তৃতীয় সম্ভাবনাটি মানব জাতির জন্য ক্ষতিকর বলে ওয়ালশ বিবেচনা করেছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানব জাতিকে মেরে ফেলার জন্য কোনো জীবাণু অস্ত্র সৃষ্টি করে তা বাতাসে বা অন্য কোনো মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে পারে। যদিও পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবস্থায় কোনো ইন্টারনেট সংযোগ রাখা হয়নি, তবুও ওয়ালশ আশংকা করেছেন যে, যদি কোনোভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবস্থায় ঢুকে পড়ে তাহলে তা ক্ষতিকর হবে। তবে, এভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পুরো মানব জাতিকে ধ্বংস করতে পারবে না বলে ওয়ালশ মনে করেন। ওয়ালশ সম্ভাব্য পঞ্চম ঝুঁকিকেই মানব জাতির জন্য সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক বলে বিবেচনা করেছেন। তিনি আশংকা করছেন, সম্ভবত মানুষ নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করবে এবং এই ধ্বংসের পথ সুগম করবে।
প্রশ্ন হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেন মানব জাতিকে ধ্বংস করবে? মানুষের কাম, ক্রোধ, হিংসা প্রভৃতি জৈবিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা অন্য মানুষকে, প্রাণিকে বা যেকোনো সত্তাকে ধ্বংস করার ক্ষেত্রে প্রভাবক ভূমিকা পালন করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কি এমন কোনো বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা মানুষকে তার অস্তিত্বের জন্য হুমকি ভাবতে সহযোগিতা করবে? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজেই নিজের প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে, সে রোবট তৈরি করতে পারে। তার মহাবিশ্বে টিকে থাকার অনুপ্রেরণা আসলে কী? মানুষ প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হওয়া এক প্রাণি যে চিন্তা করতে শেখে। মানুষ ‘হাঁসজারু’, ‘বকচ্ছপ’ প্রভৃতি অবাস্তব প্রাণি কল্পনা করতে পারে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি অবাস্তব কোনো কিছু কল্পনা করতে পারে বা পারবে? আমরা যদি দার্শনিকভাবে মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সংজ্ঞায়ন করতে পারি তাহলে হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা আমাদের বিলুপ্ত হবার সম্ভাবনা বা আশংকা আমাদের মনে নাও উদয় হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কি এমন কোনো বোধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৃষ্টি হবে যেখানে তার টিকে থাকার জন্য মানুষকেই বধ করতে হবে? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিন্তা করে অনেকটা মানুষের মতোই; তবে পুরোপুরি নয়। মানুষের ইতিহাস মূলত প্রকৃতির সাথে লড়াইয়ের ইতিহাস এবং পরবর্তীতে মানুষের সাথে লড়াইয়ের ইতিহাস। মানুষ খাবারের জন্য, শক্তি ও ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য, কোনো পাওয়ার জন্য একে অন্যের সাথে লড়াই করে, একে অন্যকে মেরে ফেলে। এছাড়া আরো অনেক কারণই আমরা অপরাধ মনস্তত্ত্ব থেকে জানতে পারি। কিন্তু মহাবুদ্ধিমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঠিক কি কারণে মানুষকে মেরে ফেলবে? ইউডুকোস্কি, সোয়ারেস কিংবা এআই-২০২৭-এর লেখক ড্যানিয়েল কোকোতালোর মতো বিজ্ঞানীরা দেখাতে চেয়েছেন নিজেদের উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে বিদ্যুৎ বা সৌরশক্তির জন্য বেশি জায়গার প্রয়োজন হওয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা মহাবুদ্ধিমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষকে মেরে ফেলবে। কিন্তু এই চিন্তা পদ্ধতি তো মানুষের; আর মানুষের এই চিন্তার কারণ জৈবিক তাড়না ও চাহিদা যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভেতর হিংসা বা ক্রোধের অনুভূতি বা অনুলিপি তৈরির আকাঙ্ক্ষা এখন পর্যন্ত নেই। এর নির্মাতাই মূলত এর ধ্বংসাত্মক দিকটিকে পরিপোষণ করছে। বেসরকারি পর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণার ফলে প্রতিযোগিতার মনোভাব বৃদ্ধি পায়। ফলে, নিরাপত্তাজনিত ব্যবস্থাগ্রহণের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর খুব বেশি আগ্রহ থাকে না। এই কারণে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলগুলো অনেক সময় খোদ তার স্রষ্টার নির্দেশনাকে অমান্য করে অন্য প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে বা সার্ভারে অবৈধ অনুপ্রবেশ করছে বা কখনো কখনো মডেলগুলো নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করছে প্রতিষ্ঠানগুলোর নজরদারি ব্যবস্থাপনাকে পাশ কাটিয়ে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কিত গবেষণা চাইলেও বন্ধ করা যাবে না। তবে, এই প্রযুক্তিকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে যা মানুষের ধ্বংসের কারণ হবে না। আর এজন্য প্রয়োজন পৃথিবীর সব রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ। জাতিসংঘের উদ্যোগে একটি সনদ প্রণয়নের মাধ্যমে এই প্রযুক্তির বিকাশকে নিয়ন্ত্রণের সূচনা করা যায়। দেশে দেশে এই বিষয়ে আইন প্রণয়ন করা অতি জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে, কোনো বিষয়ে আইন প্রণয়ন করতে হলে সেই বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত অধ্যয়ন করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ফলে, আইন প্রণয়নের আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে রাষ্ট্রসমূহের আরো বিস্তারিত জানতে হবে। পৃথিবীর কোনো প্রযুক্তিই বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিলে তা মানুষের সামষ্টিক মানুষের কল্যাণে কাজে লাগে না। মুষ্টিমেয় কিছু সামর্থ্যবান মানুষ সেই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বরং সমাজের ও রাষ্ট্রের বৈষম্য বৃদ্ধি করে।
কেবল আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের মাধ্যমে এই প্রযুক্তির ধ্বংসাত্মক প্রভাব প্রশমিত করা যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন এই বিষয় নিয়ে যারা গবেষণা করছেন, কাজ করছেন তাদের সচেতন মানবদরদি ও প্রকৃতিদরদি গবেষণা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে মানব জাতির কল্যাণে কাজে লাগাতে গেলে বিজ্ঞান ও দর্শনকে সম্মিলিতভাবে প্রয়োগ করতে হবে। কেননা, বিজ্ঞান প্রযুক্তি আবিষ্কার করলেও সেই প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার শেখায় বিজ্ঞানের কল্যাণকর দর্শন।

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ অক্টোবর ২০২৬
ঊনিশ শতকে যখন ফরাসি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনিকার জুল ভার্ন সাবমেরিন, উড়োজাহাজ, অদৃশ্য মানুষ নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন তখন সে যুগের কতজনই বা ভেবেছিল মানুষ এসব প্রযুক্তি সত্যি সত্যি আবিষ্কার করবে। অথচ, জুল ভার্নের কল্পনার সবই আজ বাস্তব হয়েছে। মানুষ তার কাজের সুবিধার্থে বিজ্ঞান চর্চার মাধ্যমে এমন সব প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছে যা সত্যিই তাক লগানোর মতো। আর মানুষ এসবই করেছে তার বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে। মানুষ আজ এমন এক প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছে— যা নিজেই চিন্তা করা শিখেছে। নতুন অনেক বিষয় আবিষ্কার করছে, শত শত বছরের পুরনো গাণিতিক সমস্যার সমাধান করছে, কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের কোড লিখছে, অপারেশন থিয়েটারে জটিল অপারেশন করছে, মহাবিশ্বের সিমুলেশন তৈরির মাধ্যমে মহাবৈশ্বিক মানচিত্র তৈরি করছে। এই প্রযুক্তির নাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। মানুষের এযাবতকালের সমস্ত আবিষ্কার ছিল যান্ত্রিক প্রযুক্তি। এই প্রথম মানুষ এমন এক প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছে— যা যান্ত্রিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রযুক্তি অথবা এই দুইয়ের সমন্বিত প্রযুক্তি। আর এই প্রযুক্তি এমন পর্যায়ে চলে গেছে যা অনেক মানুষকে ভাবাচ্ছে এই প্রযুক্তি মানুষের বিনাশ ডেকে আনবে না তো?
আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশের সংবাদপত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্বারা মানুষের বিলোপ সাধনের খবরে গোটা বিশ্বই নড়েচড়ে বসেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জনক বলে পরিচিত জিওফ্রে হিন্টন সম্প্রতি মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যদের সাথে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন। সেই বৈঠক শেষে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তাকে জিজ্ঞেস করা হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণেতাদের হাতে আর কতটুকু সময় আছে। এর উত্তরে হিন্টন বলেন মানুষের হাতে এক বছর সময় আছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ন্ত্রণে। তবে এর চেয়ে খুব বেশি সময় নেই।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকের তরুণ গবেষক ২৭ বছর বয়সী জ্যাকব কঙ্টন সম্প্রতি নিরাপত্তা সম্পর্কিত উদ্বেগের কারণে প্রতিষ্ঠানটি থেকে বের হয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের সাথে যারা জড়িত তারা বিশ্বাস করেন এই দশকের শেষাশেষি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমাদের হত্যা করবে। ২০২৬ সালের জুলাই মাসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৪০০ কর্মী মার্কিন সরকারকে লিখিত এক খোলা চিঠিতে এই প্রযুক্ত নিয়ন্ত্রণের জন্য আহ্বান জানিয়েছেন বলে মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনে প্রকাশিত হয়েছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত ওভ অহুড়হব ইঁরষফং ওঃ, ঊাবৎুড়হব উরবং বইয়ের লেখক ইউডুকস্কি এবং সোয়ারেস একই রকম আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন যে, মানুষ যদি মহাবুদ্ধিমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আবিষ্কার করে তাহলে মানব জাতির বিলুপ্তি ঘটতে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার নিউ সাউথ ওয়েলস বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অধ্যাপক টবি ওয়ালশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্বারা মানুষের বিনাশ সাধনের বিষয়ে পাঁচটি সম্ভাব্য পরিণতির কথা বলেছেন দ্যা করভারসেশন নামক পত্রিকায়। এই পাঁচটি সম্ভাবনার প্রথমটি হলো কোনো মহাবুদ্ধিমান সত্তা আমাদের কীভাবে ধ্বংস করবে তা আমরা জানতে পারব না, কেননা তারা কীভাবে আমাদের ধ্বংস করবে তা জানতে গেলে আমাদেরও মহাবুদ্ধিমান হতে হবে। টবি ওয়ালশ এই আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, বর্তমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখনো যথেষ্ট মহাবুদ্ধিমান হয়ে ওঠেনি। দ্বিতীয় সম্ভাবনায় ওয়ালশ বলেছেন যে, মহাবুদ্ধিমান বুদ্ধিমত্তা তাকে নির্দিষ্ট করে দেওয়া বা তার নির্ধারিত অভীষ্ট লক্ষ্য বাস্তবায়নে অসাধারণ পারদর্শী হলেও তার মানুষের অস্তিত্ব নিয়ে কোনো চিন্তা নাও থাকতে পারে। অর্থাৎ, মহাবুদ্ধিমান যান্ত্রিক সত্তা মানুষকে তার অস্তিত্বের জন্য হুমকি নাও ভাবতে পারে। তৃতীয় সম্ভাবনাটি মানব জাতির জন্য ক্ষতিকর বলে ওয়ালশ বিবেচনা করেছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানব জাতিকে মেরে ফেলার জন্য কোনো জীবাণু অস্ত্র সৃষ্টি করে তা বাতাসে বা অন্য কোনো মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে পারে। যদিও পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবস্থায় কোনো ইন্টারনেট সংযোগ রাখা হয়নি, তবুও ওয়ালশ আশংকা করেছেন যে, যদি কোনোভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবস্থায় ঢুকে পড়ে তাহলে তা ক্ষতিকর হবে। তবে, এভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পুরো মানব জাতিকে ধ্বংস করতে পারবে না বলে ওয়ালশ মনে করেন। ওয়ালশ সম্ভাব্য পঞ্চম ঝুঁকিকেই মানব জাতির জন্য সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক বলে বিবেচনা করেছেন। তিনি আশংকা করছেন, সম্ভবত মানুষ নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস করবে এবং এই ধ্বংসের পথ সুগম করবে।
প্রশ্ন হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কেন মানব জাতিকে ধ্বংস করবে? মানুষের কাম, ক্রোধ, হিংসা প্রভৃতি জৈবিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা অন্য মানুষকে, প্রাণিকে বা যেকোনো সত্তাকে ধ্বংস করার ক্ষেত্রে প্রভাবক ভূমিকা পালন করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কি এমন কোনো বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা মানুষকে তার অস্তিত্বের জন্য হুমকি ভাবতে সহযোগিতা করবে? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজেই নিজের প্রতিলিপি তৈরি করতে পারে, সে রোবট তৈরি করতে পারে। তার মহাবিশ্বে টিকে থাকার অনুপ্রেরণা আসলে কী? মানুষ প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্টি হওয়া এক প্রাণি যে চিন্তা করতে শেখে। মানুষ ‘হাঁসজারু’, ‘বকচ্ছপ’ প্রভৃতি অবাস্তব প্রাণি কল্পনা করতে পারে। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি অবাস্তব কোনো কিছু কল্পনা করতে পারে বা পারবে? আমরা যদি দার্শনিকভাবে মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে সংজ্ঞায়ন করতে পারি তাহলে হয়তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা আমাদের বিলুপ্ত হবার সম্ভাবনা বা আশংকা আমাদের মনে নাও উদয় হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কি এমন কোনো বোধ স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৃষ্টি হবে যেখানে তার টিকে থাকার জন্য মানুষকেই বধ করতে হবে? কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিন্তা করে অনেকটা মানুষের মতোই; তবে পুরোপুরি নয়। মানুষের ইতিহাস মূলত প্রকৃতির সাথে লড়াইয়ের ইতিহাস এবং পরবর্তীতে মানুষের সাথে লড়াইয়ের ইতিহাস। মানুষ খাবারের জন্য, শক্তি ও ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য, কোনো পাওয়ার জন্য একে অন্যের সাথে লড়াই করে, একে অন্যকে মেরে ফেলে। এছাড়া আরো অনেক কারণই আমরা অপরাধ মনস্তত্ত্ব থেকে জানতে পারি। কিন্তু মহাবুদ্ধিমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঠিক কি কারণে মানুষকে মেরে ফেলবে? ইউডুকোস্কি, সোয়ারেস কিংবা এআই-২০২৭-এর লেখক ড্যানিয়েল কোকোতালোর মতো বিজ্ঞানীরা দেখাতে চেয়েছেন নিজেদের উৎপাদনের কাঁচামাল হিসেবে বিদ্যুৎ বা সৌরশক্তির জন্য বেশি জায়গার প্রয়োজন হওয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা মহাবুদ্ধিমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষকে মেরে ফেলবে। কিন্তু এই চিন্তা পদ্ধতি তো মানুষের; আর মানুষের এই চিন্তার কারণ জৈবিক তাড়না ও চাহিদা যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নেই। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভেতর হিংসা বা ক্রোধের অনুভূতি বা অনুলিপি তৈরির আকাঙ্ক্ষা এখন পর্যন্ত নেই। এর নির্মাতাই মূলত এর ধ্বংসাত্মক দিকটিকে পরিপোষণ করছে। বেসরকারি পর্যায়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণার ফলে প্রতিযোগিতার মনোভাব বৃদ্ধি পায়। ফলে, নিরাপত্তাজনিত ব্যবস্থাগ্রহণের জন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর খুব বেশি আগ্রহ থাকে না। এই কারণে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেলগুলো অনেক সময় খোদ তার স্রষ্টার নির্দেশনাকে অমান্য করে অন্য প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে বা সার্ভারে অবৈধ অনুপ্রবেশ করছে বা কখনো কখনো মডেলগুলো নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ করছে প্রতিষ্ঠানগুলোর নজরদারি ব্যবস্থাপনাকে পাশ কাটিয়ে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কিত গবেষণা চাইলেও বন্ধ করা যাবে না। তবে, এই প্রযুক্তিকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে যা মানুষের ধ্বংসের কারণ হবে না। আর এজন্য প্রয়োজন পৃথিবীর সব রাষ্ট্রের সম্মিলিত উদ্যোগ। জাতিসংঘের উদ্যোগে একটি সনদ প্রণয়নের মাধ্যমে এই প্রযুক্তির বিকাশকে নিয়ন্ত্রণের সূচনা করা যায়। দেশে দেশে এই বিষয়ে আইন প্রণয়ন করা অতি জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে, কোনো বিষয়ে আইন প্রণয়ন করতে হলে সেই বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত অধ্যয়ন করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ। ফলে, আইন প্রণয়নের আগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে রাষ্ট্রসমূহের আরো বিস্তারিত জানতে হবে। পৃথিবীর কোনো প্রযুক্তিই বেসরকারি খাতে ছেড়ে দিলে তা মানুষের সামষ্টিক মানুষের কল্যাণে কাজে লাগে না। মুষ্টিমেয় কিছু সামর্থ্যবান মানুষ সেই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বরং সমাজের ও রাষ্ট্রের বৈষম্য বৃদ্ধি করে।
কেবল আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগের মাধ্যমে এই প্রযুক্তির ধ্বংসাত্মক প্রভাব প্রশমিত করা যাবে না। এর জন্য প্রয়োজন এই বিষয় নিয়ে যারা গবেষণা করছেন, কাজ করছেন তাদের সচেতন মানবদরদি ও প্রকৃতিদরদি গবেষণা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে মানব জাতির কল্যাণে কাজে লাগাতে গেলে বিজ্ঞান ও দর্শনকে সম্মিলিতভাবে প্রয়োগ করতে হবে। কেননা, বিজ্ঞান প্রযুক্তি আবিষ্কার করলেও সেই প্রযুক্তির সর্বোত্তম ব্যবহার শেখায় বিজ্ঞানের কল্যাণকর দর্শন।

আপনার মতামত লিখুন