কবিতা
হাসান কল্লোল
অবশেষে জীবনের শেষভাগে এসে
জাপানে এসেছি!
আমাদের জীবনের যা কিছু ভালো, উজ্জ্বল, অমলিন
শেষ বিকেলের আলোয় দেখতে আরো বেশি আলোকপ্লাবিত,
তা আরো বেশি আনন্দময়তায় বিষণ্ন হয়ে ওঠে!
টোকিওর সুউচ্চ রেস্তোরাঁর বসে
যেন সাসাকি ক্রিসটাল গ্লাস
যেখানে প্রাচুর্যময় শহরের বৈভব ছডিয়ে আছে
পরম মমতায় তুমি বন্ধু এগিয়ে দিলে আমার দিকে—
আর সব টেবিলের সবগুলো বিনম্র জলে ভরা গ্লাস নিয়ে
মেরুন এপ্রোন পরা জাপানি সুন্দরী এগিয়ে এসে
মখমলের মতো সন্ধ্যার সম্ভাষণ জানালো আমাকে!
আমার মধ্যবিত্তীয় চোখে যেখানে প্রতিদিন
দারিদ্র্য ও অভাবের পোস্টার
সেখানে জলতরঙ্গ, সেইখানে রঙিন নিশিকিগইযের উচ্ছ্বাস!
টোকিওর এক সাব রেলস্টেশনে অপেক্ষমাণ
অস্থির চোখ তুমি ভালো আছো?
আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাও মেঘ
একদা প্রমত্ত ফুজি পর্বতের চূড়ায়!
সেখনে বসে আমি গাইবো শান্তির গান!
চেরি ফোটার কালে হাইকিং-এ যাবার আনন্দে বিভোর
হে স্বপ্নবাজ আরোহী বন্ধুরা
স্কাইট্রিতে বসে থাকা তোমাদের করতলের
রেইল ক্যাটের আদর কি আমার স্বদেশের অনাথ শিশুরা কোনদিন
পেতে পাবে না?
ডেথবেড কনফেশান
মুশাররাত
তুমি জানালাটা খুলে দাও
দম বন্ধ হয়ে আসছে—
চারদিকে এতো অন্ধকার কেন!
আমি তোমাকে ডাকছি
কেন শুনতে পাচ্ছ না—
প্রথমত, তুমি আমাকে ভালোবেসে
বল, পৃথিবীটা সুন্দর
আমাদের বেঁচে থাকার সময়টা
আরও দীর্ঘ হওয়া উচিৎ কিনা—
এখনই কি আঁধার ঘনিয়ে আসলেই না!
মধ্যশীতের লতানো শিমগাছের মতো
চকচক করে জেগে থাকা প্রাণের
মতো উজ্জীবিতভাবে বেঁচে থাকতে চাই
আলো দাও রোদ্দুরের
বিশ্বাস করো, জিঘাংসার জীবন
মানুষের না
মানুষের জন্ম হয়েছে শুধু
ভালোবাসার জন্য
মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তেই কেবল বুঝবে
বেঁচে থাকা কত সুন্দর ছিলো—
আণবিক বোমার প্রযুক্তির বদলে
আমাদের উদ্ভাবন করা দরকার ছিলো
ভালোবাসার মারণাস্ত্র দিয়ে
অমরত্বকে টিকিয়ে রাখার কৌশল।
সীমান্ত
সোহেল মাজহার
বৈদ্যুতিক কাঁটাতার, ওপারে তোমাদের বাড়ি
এপাড়ে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ছাদে
বৃষ্টিতে নিভে গেছে আমার হাতে ধরা সিগারেট।
পাতার অন্তর্বাস সরিয়ে উঁকি দিয়ে দেখছে
দৃষ্টিসীমায় গাছে ঝুলে থাকা ফুলের আভা
প্রবল বাতাসে লুকিয়ে যাচ্ছে আবার।
এ কেমন আবহাওয়া পীড়িত দিন
আমার কেবল জ্বর জ্বর দশা।
নদীতে ডৃবে পাথর তুলে আনা লোকগুলো
অক্লেশে শিকার করে মীনের ভঙ্গি,
পাহাড়ি স্রোতে সীমান্ত পেরিয়ে আসা
কাঠ ভেবে অনুপ্রবেশকারী সাপের আদল।
ছলনাপ্রবণ পাখি কেন এত রঙ্গময়?
কাছে না আসে, তরঙ্গ তবু ইশারায় ডাকে।
সার্চলাইটের দৃষ্টি, বৈদ্যুতিক কাঁটাতার এড়িয়ে
কিচিরমিচিরে গুঞ্জরিত আমাদের লোকালয়...
নেই কোনো সম্প্রদায়, ভূগোল কিংবা ভাষা পরিচয়
পাসপোর্ট ও ভিসার চিহ্নরেখা অহেতু ঈঙ্গিতময়।
প্রতিদান
শারমিন সুলতানা রীনা
কী ভয়ংকর সুখের খাঁচায় আষ্টেপৃষ্ঠে
বাঁধা পড়েছি
যে খাঁচা থেকে বের হবার শক্তি
ক্রমশঃ নিঃশেষ করে দিচ্ছে
মহা সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে বুঝেছি
পতঙ্গের মতো আগুনের কাছেই সমর্পণ
চারপাশে মৃত্যুর হুলিয়া
নিঃশব্দে ধারালো বটির কাছে
মাছের মতো টুকরো টুকরো
প্রাপ্তির খাতায় পড়েনি কলমের আঁচড়
জীবনের কেমিস্ট্রি বড় অদ্ভুত
দহনে দহনে ঝলসে যাই
এ কেমন প্রতিদান বাসি ফুলের মতো
স্তূপ হয়ে আছি ময়লার ভাগাড়ে...
এই মরীচিকার মানচিত্র তোমাদের নয়
রফিকুল ইসলাম আধার
প্রিয় বাছাধন,
এই ভঙ্গুর প্রান্তর, এই মরীচিকার মানচিত্র তোমাদের নয়,
এখানে পাপহীন কুঁড়ি আর ডানারা অকাতরে ঝরে যায় রোজ;
এখানে প্রতিটি ফ্যাকাশে চোখে বাসা বাঁধে এক অলিখিত ত্রাস,
এখানে পশুর ছদ্মবেশে চলে পচনের নিঃশব্দ মহোৎসব।
এখানে মানুষের নাম কেবলই কিছু ক্ষমতাহীন অংক মাত্র,
তপ্ত তাম্রচক্ষু পিষে দেয় তৃষ্ণা, শোষণের সুখে বাঁচে শাসনের অহং।
এখানে মৃত্যুর দীর্ঘ খাতায় কোনো হিসাব মেলে না রূপকের ভিড়ে,
রক্তের দাগ মুছে যায় বিচারহীনতার অতল বধিরতায়।
এখানে অন্ন মানেই ছদ্মবেশী বিষ, সাজানো গ্রাসে উচ্ছিষ্টের ঘ্রাণ,
এখানে আশ্রয় কেবলই হিংস্র পদের অবাধ ও অন্ধ চারণভূমি।
হে অপ্রতিম,
রামিসা কিংবা আছিয়ার মতো তোমার রক্তে রঞ্জিত এ পথ—
তোমাদের ক্ষতকে আঁধারে রেখে,
নিশ্চিন্তের চাদরে রাষ্ট্র আজ বেমালুম ঘুমায়।
আপনি চলে যান
মাসুদ অর্ণব
আপনি চলে যাওয়ার পর— সন্ধ্যা
আরো ঘনীভূত হোক, জোনাকি পোকার
বিলুপ্তি ঘটুক; তারপরও আপনি চলে যান।
আমি চাই— একজন বেহিসেবী মানুষ;
যে-মানুষ নিজের উলঙ্গতা ভুলে
অন্যের লজ্জা নিবারণে ব্যস্ত থাকে।
সেই মানুষের আগমনে দরকার
আরো বীভৎস অন্ধকার! আপনি হতে পারেন
বিশ্বখ্যাত পাহাড়। সেই পাহাড় দরকার নেই
যে-পাহাড়ে ওঠে আমি স্বপ্ন দেখতে পারি না।
আপনি চলে যান— আপনার ভার
আর বইতে পারছি না। একজন কৃষকই
আমার ভেতরে জাগায় সবুজ শিহরন।
জঙ্গম
আদ্যনাথ ঘোষ
চেনা আর অচেনার মাঝে তোমার উড়াল।
যৌবনের জোয়ার ভেঙে কিছু ফেলে রেখে অবিরত খুঁজি।
শরতের দোলনচাঁপায়, শিউলির পড়ে থাকা মাটির ভেতর,
নতুন পথের গন্ধে আটকে পড়ে থাকি!
এদিকে এলোচুলে খরস্রোতা ঢেউ দাঁড়িয়ে আছে,
অপরাজিতার আলোর মতো পূর্ণিমা ছড়ায়ে।
পেছনের শিকড় হাতছানি দেয়,
ভুলে যাই তোমার সেইসব পথ!
দুরন্ত পাখির মতো উড়ে চলি রোজ।
মৃত্যুর আগুন বুকে নিয়ে যদি ঢেউ ভেঙে চলি,
তবে কি শরৎ ফেলে দিয়ে যজ্ঞে জ্বলে উঠি।
কেমন হবে, বলো তো! অবারিত অনন্ত সময়।
দাওয়াই
তরুন ইউসুফ
তোমার দিকে তাকালে সবুজ পাই
শাড়ির আঁচলে এক টুকরো বাগান
কাপড়ে যে পাড় তোমার ব্লাউজ ঢেকে রাখে (আংশিক)
তার নিচে সুডৌল স্তনের আঘ্রাণ
তুমি ব্লাউজে গোলাপ আঁকতে জানো
গোলাপের সৌন্দর্য পেরিয়ে বুকের ঢেউ
কেউ না কেউ ওপথে হাঁটে (অন্তত হাঁটার ইচ্ছে রাখে)
অবশ্য আমিও তাদের মধ্যে যে কেউ।
পথিক হিসেবে বারেবারেই পথ হারাই
অচেনা পথে খানিকটা ভয় পাই
তব্ওু তোমার দিকে তাকাই
দৃষ্টিরা মৌমাছি হলে ফুলে চোখ পড়বেই
যেখানে মধু জমা থাকে নাগাল পেলে ভালুক খাবেই
এইভাবে তোমার চারপাশ আজন্ম একটা সম্ভাবনা
ফলে মৌমাছি অথবা ভালুক হওয়ার চেষ্টায় আছি
সেইসব অত্যাচারে প্রায়শই শরীর ম্যাজম্যাজ করে
ডাক্তার প্রেসকিপশনে লিখে দিয়েছে সেই কবে
অন্তত একবেলা নিয়ম করে শরীরে প্রেম মাখতে হবে।
নয় মাস ষষ্ঠ দিনে প্রস্ফুটিত সুকিফুল
সাইয়্যিদ মঞ্জু
একটি চড়ুই রোজ উড়ে যায় বটতলী থেকে
অথচ মানুষ জানে না গন্তব্য কত দূর,
কোন আঙিনায়—
চতুর্দশী চাঁদ নাকি আগমনী উৎসব করে
কবিতার শিরোনাম দেখে!
বর্ষা—
নিজের হাতেই এঁকে গেল শরৎ-আল্পনা।
সেই পথ, ঘর, উঠোনেতে বয়স্ক মাধবীলতা
এই বুঝি তুমি হেঁটে গেলে—
ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে স্মৃতির শৈশব,
আর—
নিজেও জানি না, আজও এত পেট পোড়ে কেন।
সুকিফুল প্রস্ফুটিত মনের বাগানজুড়ে
বটতলী উৎসব আজ...
চরকি
উদ্ভিদ উদ্দিন
নরম বিছানায় লাল বালিশ নিঃসঙ্গ
যদিও একটা জীবন্ত খুলি বুকে
জেগে আছে ঘুম
ইচ্ছে করছে তার চোখ চেপে ধরি।
ঘুমের চোখ খুঁজতে খুঁজতে চলে যায় রাত
আমাকে দিনের বৃত্তে ফেলে।
আমি আমার হাত দিয়ে— রাতের হাত ধরতে পারি না
প্রত্যহ চলে যায় রাত
জেগে থাকে ঘুম।

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ অক্টোবর ২০২৬
কবিতা
হাসান কল্লোল
অবশেষে জীবনের শেষভাগে এসে
জাপানে এসেছি!
আমাদের জীবনের যা কিছু ভালো, উজ্জ্বল, অমলিন
শেষ বিকেলের আলোয় দেখতে আরো বেশি আলোকপ্লাবিত,
তা আরো বেশি আনন্দময়তায় বিষণ্ন হয়ে ওঠে!
টোকিওর সুউচ্চ রেস্তোরাঁর বসে
যেন সাসাকি ক্রিসটাল গ্লাস
যেখানে প্রাচুর্যময় শহরের বৈভব ছডিয়ে আছে
পরম মমতায় তুমি বন্ধু এগিয়ে দিলে আমার দিকে—
আর সব টেবিলের সবগুলো বিনম্র জলে ভরা গ্লাস নিয়ে
মেরুন এপ্রোন পরা জাপানি সুন্দরী এগিয়ে এসে
মখমলের মতো সন্ধ্যার সম্ভাষণ জানালো আমাকে!
আমার মধ্যবিত্তীয় চোখে যেখানে প্রতিদিন
দারিদ্র্য ও অভাবের পোস্টার
সেখানে জলতরঙ্গ, সেইখানে রঙিন নিশিকিগইযের উচ্ছ্বাস!
টোকিওর এক সাব রেলস্টেশনে অপেক্ষমাণ
অস্থির চোখ তুমি ভালো আছো?
আমাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাও মেঘ
একদা প্রমত্ত ফুজি পর্বতের চূড়ায়!
সেখনে বসে আমি গাইবো শান্তির গান!
চেরি ফোটার কালে হাইকিং-এ যাবার আনন্দে বিভোর
হে স্বপ্নবাজ আরোহী বন্ধুরা
স্কাইট্রিতে বসে থাকা তোমাদের করতলের
রেইল ক্যাটের আদর কি আমার স্বদেশের অনাথ শিশুরা কোনদিন
পেতে পাবে না?
ডেথবেড কনফেশান
মুশাররাত
তুমি জানালাটা খুলে দাও
দম বন্ধ হয়ে আসছে—
চারদিকে এতো অন্ধকার কেন!
আমি তোমাকে ডাকছি
কেন শুনতে পাচ্ছ না—
প্রথমত, তুমি আমাকে ভালোবেসে
বল, পৃথিবীটা সুন্দর
আমাদের বেঁচে থাকার সময়টা
আরও দীর্ঘ হওয়া উচিৎ কিনা—
এখনই কি আঁধার ঘনিয়ে আসলেই না!
মধ্যশীতের লতানো শিমগাছের মতো
চকচক করে জেগে থাকা প্রাণের
মতো উজ্জীবিতভাবে বেঁচে থাকতে চাই
আলো দাও রোদ্দুরের
বিশ্বাস করো, জিঘাংসার জীবন
মানুষের না
মানুষের জন্ম হয়েছে শুধু
ভালোবাসার জন্য
মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তেই কেবল বুঝবে
বেঁচে থাকা কত সুন্দর ছিলো—
আণবিক বোমার প্রযুক্তির বদলে
আমাদের উদ্ভাবন করা দরকার ছিলো
ভালোবাসার মারণাস্ত্র দিয়ে
অমরত্বকে টিকিয়ে রাখার কৌশল।
সীমান্ত
সোহেল মাজহার
বৈদ্যুতিক কাঁটাতার, ওপারে তোমাদের বাড়ি
এপাড়ে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ছাদে
বৃষ্টিতে নিভে গেছে আমার হাতে ধরা সিগারেট।
পাতার অন্তর্বাস সরিয়ে উঁকি দিয়ে দেখছে
দৃষ্টিসীমায় গাছে ঝুলে থাকা ফুলের আভা
প্রবল বাতাসে লুকিয়ে যাচ্ছে আবার।
এ কেমন আবহাওয়া পীড়িত দিন
আমার কেবল জ্বর জ্বর দশা।
নদীতে ডৃবে পাথর তুলে আনা লোকগুলো
অক্লেশে শিকার করে মীনের ভঙ্গি,
পাহাড়ি স্রোতে সীমান্ত পেরিয়ে আসা
কাঠ ভেবে অনুপ্রবেশকারী সাপের আদল।
ছলনাপ্রবণ পাখি কেন এত রঙ্গময়?
কাছে না আসে, তরঙ্গ তবু ইশারায় ডাকে।
সার্চলাইটের দৃষ্টি, বৈদ্যুতিক কাঁটাতার এড়িয়ে
কিচিরমিচিরে গুঞ্জরিত আমাদের লোকালয়...
নেই কোনো সম্প্রদায়, ভূগোল কিংবা ভাষা পরিচয়
পাসপোর্ট ও ভিসার চিহ্নরেখা অহেতু ঈঙ্গিতময়।
প্রতিদান
শারমিন সুলতানা রীনা
কী ভয়ংকর সুখের খাঁচায় আষ্টেপৃষ্ঠে
বাঁধা পড়েছি
যে খাঁচা থেকে বের হবার শক্তি
ক্রমশঃ নিঃশেষ করে দিচ্ছে
মহা সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে বুঝেছি
পতঙ্গের মতো আগুনের কাছেই সমর্পণ
চারপাশে মৃত্যুর হুলিয়া
নিঃশব্দে ধারালো বটির কাছে
মাছের মতো টুকরো টুকরো
প্রাপ্তির খাতায় পড়েনি কলমের আঁচড়
জীবনের কেমিস্ট্রি বড় অদ্ভুত
দহনে দহনে ঝলসে যাই
এ কেমন প্রতিদান বাসি ফুলের মতো
স্তূপ হয়ে আছি ময়লার ভাগাড়ে...
এই মরীচিকার মানচিত্র তোমাদের নয়
রফিকুল ইসলাম আধার
প্রিয় বাছাধন,
এই ভঙ্গুর প্রান্তর, এই মরীচিকার মানচিত্র তোমাদের নয়,
এখানে পাপহীন কুঁড়ি আর ডানারা অকাতরে ঝরে যায় রোজ;
এখানে প্রতিটি ফ্যাকাশে চোখে বাসা বাঁধে এক অলিখিত ত্রাস,
এখানে পশুর ছদ্মবেশে চলে পচনের নিঃশব্দ মহোৎসব।
এখানে মানুষের নাম কেবলই কিছু ক্ষমতাহীন অংক মাত্র,
তপ্ত তাম্রচক্ষু পিষে দেয় তৃষ্ণা, শোষণের সুখে বাঁচে শাসনের অহং।
এখানে মৃত্যুর দীর্ঘ খাতায় কোনো হিসাব মেলে না রূপকের ভিড়ে,
রক্তের দাগ মুছে যায় বিচারহীনতার অতল বধিরতায়।
এখানে অন্ন মানেই ছদ্মবেশী বিষ, সাজানো গ্রাসে উচ্ছিষ্টের ঘ্রাণ,
এখানে আশ্রয় কেবলই হিংস্র পদের অবাধ ও অন্ধ চারণভূমি।
হে অপ্রতিম,
রামিসা কিংবা আছিয়ার মতো তোমার রক্তে রঞ্জিত এ পথ—
তোমাদের ক্ষতকে আঁধারে রেখে,
নিশ্চিন্তের চাদরে রাষ্ট্র আজ বেমালুম ঘুমায়।
আপনি চলে যান
মাসুদ অর্ণব
আপনি চলে যাওয়ার পর— সন্ধ্যা
আরো ঘনীভূত হোক, জোনাকি পোকার
বিলুপ্তি ঘটুক; তারপরও আপনি চলে যান।
আমি চাই— একজন বেহিসেবী মানুষ;
যে-মানুষ নিজের উলঙ্গতা ভুলে
অন্যের লজ্জা নিবারণে ব্যস্ত থাকে।
সেই মানুষের আগমনে দরকার
আরো বীভৎস অন্ধকার! আপনি হতে পারেন
বিশ্বখ্যাত পাহাড়। সেই পাহাড় দরকার নেই
যে-পাহাড়ে ওঠে আমি স্বপ্ন দেখতে পারি না।
আপনি চলে যান— আপনার ভার
আর বইতে পারছি না। একজন কৃষকই
আমার ভেতরে জাগায় সবুজ শিহরন।
জঙ্গম
আদ্যনাথ ঘোষ
চেনা আর অচেনার মাঝে তোমার উড়াল।
যৌবনের জোয়ার ভেঙে কিছু ফেলে রেখে অবিরত খুঁজি।
শরতের দোলনচাঁপায়, শিউলির পড়ে থাকা মাটির ভেতর,
নতুন পথের গন্ধে আটকে পড়ে থাকি!
এদিকে এলোচুলে খরস্রোতা ঢেউ দাঁড়িয়ে আছে,
অপরাজিতার আলোর মতো পূর্ণিমা ছড়ায়ে।
পেছনের শিকড় হাতছানি দেয়,
ভুলে যাই তোমার সেইসব পথ!
দুরন্ত পাখির মতো উড়ে চলি রোজ।
মৃত্যুর আগুন বুকে নিয়ে যদি ঢেউ ভেঙে চলি,
তবে কি শরৎ ফেলে দিয়ে যজ্ঞে জ্বলে উঠি।
কেমন হবে, বলো তো! অবারিত অনন্ত সময়।
দাওয়াই
তরুন ইউসুফ
তোমার দিকে তাকালে সবুজ পাই
শাড়ির আঁচলে এক টুকরো বাগান
কাপড়ে যে পাড় তোমার ব্লাউজ ঢেকে রাখে (আংশিক)
তার নিচে সুডৌল স্তনের আঘ্রাণ
তুমি ব্লাউজে গোলাপ আঁকতে জানো
গোলাপের সৌন্দর্য পেরিয়ে বুকের ঢেউ
কেউ না কেউ ওপথে হাঁটে (অন্তত হাঁটার ইচ্ছে রাখে)
অবশ্য আমিও তাদের মধ্যে যে কেউ।
পথিক হিসেবে বারেবারেই পথ হারাই
অচেনা পথে খানিকটা ভয় পাই
তব্ওু তোমার দিকে তাকাই
দৃষ্টিরা মৌমাছি হলে ফুলে চোখ পড়বেই
যেখানে মধু জমা থাকে নাগাল পেলে ভালুক খাবেই
এইভাবে তোমার চারপাশ আজন্ম একটা সম্ভাবনা
ফলে মৌমাছি অথবা ভালুক হওয়ার চেষ্টায় আছি
সেইসব অত্যাচারে প্রায়শই শরীর ম্যাজম্যাজ করে
ডাক্তার প্রেসকিপশনে লিখে দিয়েছে সেই কবে
অন্তত একবেলা নিয়ম করে শরীরে প্রেম মাখতে হবে।
নয় মাস ষষ্ঠ দিনে প্রস্ফুটিত সুকিফুল
সাইয়্যিদ মঞ্জু
একটি চড়ুই রোজ উড়ে যায় বটতলী থেকে
অথচ মানুষ জানে না গন্তব্য কত দূর,
কোন আঙিনায়—
চতুর্দশী চাঁদ নাকি আগমনী উৎসব করে
কবিতার শিরোনাম দেখে!
বর্ষা—
নিজের হাতেই এঁকে গেল শরৎ-আল্পনা।
সেই পথ, ঘর, উঠোনেতে বয়স্ক মাধবীলতা
এই বুঝি তুমি হেঁটে গেলে—
ঘুম ভেঙে জেগে ওঠে স্মৃতির শৈশব,
আর—
নিজেও জানি না, আজও এত পেট পোড়ে কেন।
সুকিফুল প্রস্ফুটিত মনের বাগানজুড়ে
বটতলী উৎসব আজ...
চরকি
উদ্ভিদ উদ্দিন
নরম বিছানায় লাল বালিশ নিঃসঙ্গ
যদিও একটা জীবন্ত খুলি বুকে
জেগে আছে ঘুম
ইচ্ছে করছে তার চোখ চেপে ধরি।
ঘুমের চোখ খুঁজতে খুঁজতে চলে যায় রাত
আমাকে দিনের বৃত্তে ফেলে।
আমি আমার হাত দিয়ে— রাতের হাত ধরতে পারি না
প্রত্যহ চলে যায় রাত
জেগে থাকে ঘুম।

আপনার মতামত লিখুন