আজ ১ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী জাতিসংঘ ঘোষিত ‘আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস’ পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য—‘দীর্ঘায়ুর যুগ: দীর্ঘ জীবনের জন্য ব্যবস্থার পুনর্ভাবনা’। প্রবীণ ব্যক্তিরা শুধু সামাজিক সুরক্ষার সুবিধাভোগী নন; তাঁদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও দক্ষতা সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ও আজীবন শিক্ষার ব্যবস্থা নতুনভাবে গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। দীর্ঘায়ুকে স্বাস্থ্যকর, উৎপাদনশীল ও মর্যাদাপূর্ণ করার পাশাপাশি সমাজের সব ক্ষেত্রে প্রবীণদের সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর ৪৫/১০৬ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে ১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ঘোষণা করে। ১৯৯১ সালের ১ অক্টোবর প্রথমবার দিবসটি পালিত হয়। বিশ্বজুড়ে জনসংখ্যার বয়স কাঠামো দ্রুত বদলে যাচ্ছে। জাতিসংঘের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। ফলে সুস্থ বার্ধক্য নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।
জাতিসংঘের ‘বিশ্ব জনসংখ্যা পরিস্থিতি ২০২৪’ অনুযায়ী, ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বে ৮০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ২৬ কোটি ৫০ লাখে পৌঁছাতে পারে। ২০৭০-এর দশকের শেষ দিকে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ২২০ কোটিতে পৌঁছানোর প্রাক্কলন রয়েছে। ২০৮০ সালের মধ্যে এই বয়সী মানুষের সংখ্যা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের ছাড়িয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ বিশ্ব প্রবীণ সমাজের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশেও একই ধরনের জনমিতিক পরিবর্তন ঘটছে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের প্রবীণ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বাংলাদেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের প্রবীণ ধরা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০২৫’ অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৬ শতাংশ বা প্রায় ১ কোটি ৫৭ লাখ মানুষ ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী। জাতিসংঘের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ থেকে ৪ কোটি ৪০ লাখে পৌঁছাতে পারে।
প্রবীণদের কল্যাণ ও আর্থসামাজিক সুরক্ষায় বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৮ সাল থেকে বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। ২০১৩ সালে ‘জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা’ প্রণয়ন করা হয়। এর লক্ষ্য প্রবীণদের মর্যাদাপূর্ণ, দারিদ্র্যমুক্ত, কর্মময়, সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ সামাজিক জীবন নিশ্চিত করা। নীতিমালায় স্বাস্থ্যসেবায় অগ্রাধিকার, প্রবীণবান্ধব অবকাঠামো, সামাজিক অংশগ্রহণ, দুর্যোগকালে বিশেষ সুরক্ষা, গবেষণা এবং আন্তঃপ্রজন্ম যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’, ‘বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি বাস্তবায়ন নীতিমালা, ২০১৩’ এবং ‘সুস্থ বার্ধক্য বিষয়ক জাতীয় কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (২০২৪-২০৩০)’সহ বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০২২ সালে বয়স্কদের সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক জাতীয় নির্দেশিকাও প্রণয়ন করেছে। এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য প্রশংসনীয় হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়া, কর্মসংস্থানের অভাব, সঞ্চয়হীনতা, রোগব্যাধি, একাকিত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং পারিবারিক সহায়তার ঘাটতির কারণে অনেক প্রবীণ সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
জাতীয় প্রবীণ নীতিমালায় প্রবীণদের জন্য পরিচয়পত্র, গণপরিবহনে পৃথক টিকিট কাউন্টার, হাসপাতাল ও জনসেবা প্রতিষ্ঠানে র্যাম্প, প্রবীণ নিবাস ও দিবা-যত্ন কেন্দ্রসহ বিভিন্ন সুবিধার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের অনেকগুলো এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। নীতিমালা প্রণয়নের এক দশকের বেশি সময় পরও এর কার্যকর বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় হালনাগাদ জরুরি হয়ে পড়েছে।
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ার বিষয়টি শুধু সমাজকল্যাণের নয়; এটি স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, নগর পরিকল্পনা ও সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। তাই প্রবীণদের জন্য বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা, নিরাপদ চলাচল, আর্থিক সুরক্ষা ও সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে সমাজের কাজে লাগানোর পথও তৈরি করতে হবে।
প্রবীণবান্ধব সমাজ গড়ার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, সুশীল সমাজ, পরিবার এবং সমাজের সব বয়সী মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। দীর্ঘায়ু যখন মানবসভ্যতার বড় অর্জন, তখন দীর্ঘ জীবন যেন একাকিত্ব, অসহায়ত্ব ও অবহেলার কারণ না হয়—এটাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।
[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক ও লাইন ডাইরেক্টর (এমআইএস), পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর]

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ অক্টোবর ২০২৬
আজ ১ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী জাতিসংঘ ঘোষিত ‘আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস’ পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য—‘দীর্ঘায়ুর যুগ: দীর্ঘ জীবনের জন্য ব্যবস্থার পুনর্ভাবনা’। প্রবীণ ব্যক্তিরা শুধু সামাজিক সুরক্ষার সুবিধাভোগী নন; তাঁদের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও দক্ষতা সমাজের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই সামাজিক সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ও আজীবন শিক্ষার ব্যবস্থা নতুনভাবে গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে। দীর্ঘায়ুকে স্বাস্থ্যকর, উৎপাদনশীল ও মর্যাদাপূর্ণ করার পাশাপাশি সমাজের সব ক্ষেত্রে প্রবীণদের সক্রিয় অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর ৪৫/১০৬ নম্বর প্রস্তাবের মাধ্যমে ১ অক্টোবরকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ঘোষণা করে। ১৯৯১ সালের ১ অক্টোবর প্রথমবার দিবসটি পালিত হয়। বিশ্বজুড়ে জনসংখ্যার বয়স কাঠামো দ্রুত বদলে যাচ্ছে। জাতিসংঘের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। ফলে সুস্থ বার্ধক্য নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সুরক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার ব্যবস্থা শক্তিশালী করা জরুরি।
জাতিসংঘের ‘বিশ্ব জনসংখ্যা পরিস্থিতি ২০২৪’ অনুযায়ী, ২০৩০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে বিশ্বে ৮০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ২৬ কোটি ৫০ লাখে পৌঁছাতে পারে। ২০৭০-এর দশকের শেষ দিকে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ২২০ কোটিতে পৌঁছানোর প্রাক্কলন রয়েছে। ২০৮০ সালের মধ্যে এই বয়সী মানুষের সংখ্যা ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের ছাড়িয়ে যেতে পারে। অর্থাৎ বিশ্ব প্রবীণ সমাজের দিকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশেও একই ধরনের জনমিতিক পরিবর্তন ঘটছে। বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সীদের প্রবীণ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বাংলাদেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সীদের প্রবীণ ধরা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ‘বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বর্ষগ্রন্থ ২০২৫’ অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৬ শতাংশ বা প্রায় ১ কোটি ৫৭ লাখ মানুষ ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী। জাতিসংঘের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ থেকে ৪ কোটি ৪০ লাখে পৌঁছাতে পারে।
প্রবীণদের কল্যাণ ও আর্থসামাজিক সুরক্ষায় বাংলাদেশ সরকার ১৯৯৮ সাল থেকে বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। ২০১৩ সালে ‘জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা’ প্রণয়ন করা হয়। এর লক্ষ্য প্রবীণদের মর্যাদাপূর্ণ, দারিদ্র্যমুক্ত, কর্মময়, সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ সামাজিক জীবন নিশ্চিত করা। নীতিমালায় স্বাস্থ্যসেবায় অগ্রাধিকার, প্রবীণবান্ধব অবকাঠামো, সামাজিক অংশগ্রহণ, দুর্যোগকালে বিশেষ সুরক্ষা, গবেষণা এবং আন্তঃপ্রজন্ম যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ‘পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩’, ‘বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি বাস্তবায়ন নীতিমালা, ২০১৩’ এবং ‘সুস্থ বার্ধক্য বিষয়ক জাতীয় কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (২০২৪-২০৩০)’সহ বিভিন্ন উদ্যোগ রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ২০২২ সালে বয়স্কদের সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক জাতীয় নির্দেশিকাও প্রণয়ন করেছে। এসব উদ্যোগের উদ্দেশ্য প্রশংসনীয় হলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। যৌথ পরিবার ভেঙে যাওয়া, কর্মসংস্থানের অভাব, সঞ্চয়হীনতা, রোগব্যাধি, একাকিত্ব, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং পারিবারিক সহায়তার ঘাটতির কারণে অনেক প্রবীণ সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সুরক্ষার অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
জাতীয় প্রবীণ নীতিমালায় প্রবীণদের জন্য পরিচয়পত্র, গণপরিবহনে পৃথক টিকিট কাউন্টার, হাসপাতাল ও জনসেবা প্রতিষ্ঠানে র্যাম্প, প্রবীণ নিবাস ও দিবা-যত্ন কেন্দ্রসহ বিভিন্ন সুবিধার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এসব উদ্যোগের অনেকগুলো এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। নীতিমালা প্রণয়নের এক দশকের বেশি সময় পরও এর কার্যকর বাস্তবায়ন ও প্রয়োজনীয় হালনাগাদ জরুরি হয়ে পড়েছে।
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ার বিষয়টি শুধু সমাজকল্যাণের নয়; এটি স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, নগর পরিকল্পনা ও সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। তাই প্রবীণদের জন্য বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা, নিরাপদ চলাচল, আর্থিক সুরক্ষা ও সামাজিক অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে হবে। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতাকে সমাজের কাজে লাগানোর পথও তৈরি করতে হবে।
প্রবীণবান্ধব সমাজ গড়ার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, সুশীল সমাজ, পরিবার এবং সমাজের সব বয়সী মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। দীর্ঘায়ু যখন মানবসভ্যতার বড় অর্জন, তখন দীর্ঘ জীবন যেন একাকিত্ব, অসহায়ত্ব ও অবহেলার কারণ না হয়—এটাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।
[লেখক: অবসরপ্রাপ্ত পরিচালক ও লাইন ডাইরেক্টর (এমআইএস), পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর]

আপনার মতামত লিখুন