সংবাদ

জৈব নিরাপত্তা কি শুধু খামারের জন্যই প্রয়োজন?


কে বি এম সাইফুল ইসলাম
কে বি এম সাইফুল ইসলাম
প্রকাশ: ১ অক্টোবর ২০২৬, ০১:৩৮ পিএম

জৈব নিরাপত্তা কি শুধু খামারের জন্যই প্রয়োজন?
দেশের পোলট্রি ও গবাদিপশুর খামারগুলোতে সংক্রামক রোগের বিস্তার নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা

বাংলাদেশে ‘জৈব নিরাপত্তা’ শব্দটি উচ্চারিত হলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে পোলট্রি বা গবাদিপশুর খামারের গেট, জীবাণুনাশকের স্প্রে, ফুটবাথ কিংবা কর্মীদের সুরক্ষাপোশাক। সামগ্রিক ধারণায় এটি যেন কেবল পশুপাখিকে রোগ থেকে বাঁচানোর একটি খামারভিত্তিক ব্যবস্থা। কিন্তু জনস্বাস্থ্য ও অণুজীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধারণা অত্যন্ত সংকীর্ণ। খামারের জৈব নিরাপত্তা ব্যর্থ হলে এর প্রভাব পশুপাখির শরীরেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তা ছড়িয়ে পড়ে মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং জাতীয় জনস্বাস্থ্যে। এই মৌলিক সত্যটি এখনো আমাদের নীতি ও জনআলোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।

বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থা, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ—এই তিনটি স্তম্ভের সঙ্গে খামারের জৈব নিরাপত্তা গভীরভাবে যুক্ত। প্রতিদিন লাখো মানুষ যে মাংস, ডিম বা দুধ গ্রহণ করে, তার উৎস এই খামারগুলো। খামারের ভেতরে রোগ ছড়ালে, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় থাকলে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি থাকলে কিংবা অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার চললে তার মাশুল শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই দিতে হয়। খামারের ব্যর্থতা প্রথমে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারব্যবস্থায় আঘাত হানে। সেখান থেকে তা পৌঁছায় মানুষের রান্নাঘরে এবং শেষ পর্যন্ত মানবদেহে। তাই জৈব নিরাপত্তাকে শুধু পশুপাখির স্বাস্থ্য সুরক্ষার গণ্ডিতে আটকে রাখলে ঝুঁকির প্রকৃত মাত্রা বোঝা যাবে না।

দেশের পোলট্রি ও গবাদিপশুর খামারগুলোতে সংক্রামক রোগের বিস্তার নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। সালমোনেলা, ক্যাম্পিলোব্যাক্টার, ক্ষতিকর ই-কোলাই কিংবা এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো জীবাণুর বিস্তারের অন্যতম কারণ খামারের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, দূষিত পানি ও দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। প্রান্তিক খামারি ও কর্মীদের স্বাস্থ্যবিধি না মানার প্রবণতাও রোগের বিস্তার বাড়ায়। সুরক্ষাপোশাক ব্যবহার না করা, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় না রাখা এবং খামারের পোশাক পরে বাইরে চলাফেরা করা এর উদাহরণ। এসব জীবাণুর অনেকগুলোই জুনোটিক, অর্থাৎ প্রাণী থেকে মানুষের দেহে সংক্রমিত হতে পারে। ফলে খামার পর্যায়ের একটি ছোট অবহেলা সহজেই বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।

বর্তমানে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকিগুলোর একটি হলো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স। খামারে অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়। পরে এসব জীবাণু দুধ-মাংসের মাধ্যমে, খামারের কর্মীদের মাধ্যমে কিংবা বর্জ্য দ্বারা দূষিত পানি ও মাটির মাধ্যমে মানুষের দেহে প্রবেশ করতে পারে। এর পরিণতি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। সাধারণ সংক্রমণের ক্ষেত্রেও জীবনরক্ষাকারী অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। এতে হাসপাতালের চিকিৎসা জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। তাই খামারে সঠিক জৈব নিরাপত্তা বজায় রাখা শুধু পশু সুরক্ষার বিষয় নয়। এটি ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে কার্যকর রাখারও একটি মৌলিক ভিত্তি।

খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের একটি বড় দুর্বলতা। মৃত পশুপাখি, মলমূত্র ও দূষিত তরল বর্জ্য প্রায়ই খোলা জায়গায় ফেলা হয়। এতে আশপাশের নদী, খাল, মাটি ও বাতাসে জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরিবেশের এই দূষণ শেষ পর্যন্ত কৃষিপণ্য, মাছ, শাকসবজি ও পানীয় জলের মাধ্যমে মানুষের খাদ্যচক্রে ফিরে আসে। ফলে জৈব নিরাপত্তার অভাব পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করে এবং মানুষের নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়।

জীবন্ত পাখির বাজার বা কাঁচাবাজারও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। খামারের রোগ বাজারে পৌঁছালে তা হাজারো মানুষের সংস্পর্শে আসে। বাজারের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, খোলা মাংস, রক্ত ও মলমূত্রের মিশ্রণ এবং গরমে পচন—সব মিলিয়ে রোগ ছড়ানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। একটি খামারে জৈব নিরাপত্তা মানা হলেও বাজারব্যবস্থায় যদি তা ভেঙে পড়ে, পুরো প্রক্রিয়াই অকার্যকর হয়ে যায়। তাই জৈব নিরাপত্তাকে শুধু খামারের গণ্ডিতে আটকে রাখলে চলবে না। এটি বাজারব্যবস্থার সঙ্গেও সমানভাবে যুক্ত।

মূলত, জৈব নিরাপত্তা একটি অখণ্ড শৃঙ্খল। খামার, পরিবহন, বাজার, রান্নাঘর ও হাসপাতাল—এই পাঁচটি ধাপের যেকোনো একটিতে ব্যর্থতা পুরো খাদ্য ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। খামারের ব্যর্থতা বাজারে পৌঁছায়, সেখান থেকে মানুষের ঘরে যায় এবং শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে গিয়ে দাঁড়ায়। তাই জৈব নিরাপত্তাকে কেবল পশুপাখির রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে দেখলে পুরো ব্যবস্থাই অরক্ষিত থেকে যায়।

বাংলাদেশে জৈব নিরাপত্তাকে এখনো মূলত খামারের রোগ প্রতিরোধের বিষয় হিসেবে দেখা হয়। নীতিনির্ধারক, খামারি ও সংশ্লিষ্ট খাতের অনেকেই এটিকে মানুষের স্বাস্থ্য বা পরিবেশের স্বাস্থ্যের সঙ্গে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখেন না। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘ওয়ান হেলথ’ বা ‘এক স্বাস্থ্য’ দৃষ্টিভঙ্গিও আমাদের নীতিমালায় আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি দরকার আচরণগত পরিবর্তন, সচেতনতা, সঠিক চর্চা ও নিয়মিত বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ।

জৈব নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে জাতীয় জনস্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়ে। খাদ্যবাহিত রোগ বাড়ে, মহামারির ঝুঁকি তৈরি হয়, অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে যেতে পারে এবং পরিবেশগত স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই জৈব নিরাপত্তাকে খামারের গণ্ডি থেকে বের করে ‘এক স্বাস্থ্য’ ভাবনার আলোকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এটি শুধু পশুপাখির রোগ প্রতিরোধের উপায় নয়; মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবেশের স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষার জন্যও এটি একটি অপরিহার্য নিরাপত্তাব্যবস্থা।

বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যব্যবস্থা—এসবই নির্ভর করছে আমরা জৈব নিরাপত্তাকে কতটা বিস্তৃতভাবে দেখি তার ওপর। খামারের ব্যর্থতা মানুষের ঘরে পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগে না। তাই জৈব নিরাপত্তাকে শুধু পশুপাখির জন্য নয়, মানুষের জীবন, পরিবেশ ও জাতীয় জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি মৌলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে।

[লেখক: সাবেক ডিন, ফ্যাকাল্টি অব অ্যানিম্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন; সাবেক চেয়ারম্যান, ডিপার্টমেন্ট অব মেডিসিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬


জৈব নিরাপত্তা কি শুধু খামারের জন্যই প্রয়োজন?

প্রকাশের তারিখ : ০১ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

বাংলাদেশে ‘জৈব নিরাপত্তা’ শব্দটি উচ্চারিত হলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে পোলট্রি বা গবাদিপশুর খামারের গেট, জীবাণুনাশকের স্প্রে, ফুটবাথ কিংবা কর্মীদের সুরক্ষাপোশাক। সামগ্রিক ধারণায় এটি যেন কেবল পশুপাখিকে রোগ থেকে বাঁচানোর একটি খামারভিত্তিক ব্যবস্থা। কিন্তু জনস্বাস্থ্য ও অণুজীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ধারণা অত্যন্ত সংকীর্ণ। খামারের জৈব নিরাপত্তা ব্যর্থ হলে এর প্রভাব পশুপাখির শরীরেই সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং তা ছড়িয়ে পড়ে মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং জাতীয় জনস্বাস্থ্যে। এই মৌলিক সত্যটি এখনো আমাদের নীতি ও জনআলোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।

বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থা, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ—এই তিনটি স্তম্ভের সঙ্গে খামারের জৈব নিরাপত্তা গভীরভাবে যুক্ত। প্রতিদিন লাখো মানুষ যে মাংস, ডিম বা দুধ গ্রহণ করে, তার উৎস এই খামারগুলো। খামারের ভেতরে রোগ ছড়ালে, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় থাকলে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি থাকলে কিংবা অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার চললে তার মাশুল শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষকেই দিতে হয়। খামারের ব্যর্থতা প্রথমে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারব্যবস্থায় আঘাত হানে। সেখান থেকে তা পৌঁছায় মানুষের রান্নাঘরে এবং শেষ পর্যন্ত মানবদেহে। তাই জৈব নিরাপত্তাকে শুধু পশুপাখির স্বাস্থ্য সুরক্ষার গণ্ডিতে আটকে রাখলে ঝুঁকির প্রকৃত মাত্রা বোঝা যাবে না।

দেশের পোলট্রি ও গবাদিপশুর খামারগুলোতে সংক্রামক রোগের বিস্তার নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। সালমোনেলা, ক্যাম্পিলোব্যাক্টার, ক্ষতিকর ই-কোলাই কিংবা এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো জীবাণুর বিস্তারের অন্যতম কারণ খামারের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, দূষিত পানি ও দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। প্রান্তিক খামারি ও কর্মীদের স্বাস্থ্যবিধি না মানার প্রবণতাও রোগের বিস্তার বাড়ায়। সুরক্ষাপোশাক ব্যবহার না করা, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় না রাখা এবং খামারের পোশাক পরে বাইরে চলাফেরা করা এর উদাহরণ। এসব জীবাণুর অনেকগুলোই জুনোটিক, অর্থাৎ প্রাণী থেকে মানুষের দেহে সংক্রমিত হতে পারে। ফলে খামার পর্যায়ের একটি ছোট অবহেলা সহজেই বড় জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিতে পারে।

বর্তমানে বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকিগুলোর একটি হলো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স। খামারে অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া তৈরি হয়। পরে এসব জীবাণু দুধ-মাংসের মাধ্যমে, খামারের কর্মীদের মাধ্যমে কিংবা বর্জ্য দ্বারা দূষিত পানি ও মাটির মাধ্যমে মানুষের দেহে প্রবেশ করতে পারে। এর পরিণতি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। সাধারণ সংক্রমণের ক্ষেত্রেও জীবনরক্ষাকারী অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে যেতে পারে। এতে হাসপাতালের চিকিৎসা জটিল ও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। তাই খামারে সঠিক জৈব নিরাপত্তা বজায় রাখা শুধু পশু সুরক্ষার বিষয় নয়। এটি ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে কার্যকর রাখারও একটি মৌলিক ভিত্তি।

খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের একটি বড় দুর্বলতা। মৃত পশুপাখি, মলমূত্র ও দূষিত তরল বর্জ্য প্রায়ই খোলা জায়গায় ফেলা হয়। এতে আশপাশের নদী, খাল, মাটি ও বাতাসে জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরিবেশের এই দূষণ শেষ পর্যন্ত কৃষিপণ্য, মাছ, শাকসবজি ও পানীয় জলের মাধ্যমে মানুষের খাদ্যচক্রে ফিরে আসে। ফলে জৈব নিরাপত্তার অভাব পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করে এবং মানুষের নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়।

জীবন্ত পাখির বাজার বা কাঁচাবাজারও বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। খামারের রোগ বাজারে পৌঁছালে তা হাজারো মানুষের সংস্পর্শে আসে। বাজারের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, খোলা মাংস, রক্ত ও মলমূত্রের মিশ্রণ এবং গরমে পচন—সব মিলিয়ে রোগ ছড়ানোর অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়। একটি খামারে জৈব নিরাপত্তা মানা হলেও বাজারব্যবস্থায় যদি তা ভেঙে পড়ে, পুরো প্রক্রিয়াই অকার্যকর হয়ে যায়। তাই জৈব নিরাপত্তাকে শুধু খামারের গণ্ডিতে আটকে রাখলে চলবে না। এটি বাজারব্যবস্থার সঙ্গেও সমানভাবে যুক্ত।

মূলত, জৈব নিরাপত্তা একটি অখণ্ড শৃঙ্খল। খামার, পরিবহন, বাজার, রান্নাঘর ও হাসপাতাল—এই পাঁচটি ধাপের যেকোনো একটিতে ব্যর্থতা পুরো খাদ্য ও স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে। খামারের ব্যর্থতা বাজারে পৌঁছায়, সেখান থেকে মানুষের ঘরে যায় এবং শেষ পর্যন্ত হাসপাতালে গিয়ে দাঁড়ায়। তাই জৈব নিরাপত্তাকে কেবল পশুপাখির রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে দেখলে পুরো ব্যবস্থাই অরক্ষিত থেকে যায়।

বাংলাদেশে জৈব নিরাপত্তাকে এখনো মূলত খামারের রোগ প্রতিরোধের বিষয় হিসেবে দেখা হয়। নীতিনির্ধারক, খামারি ও সংশ্লিষ্ট খাতের অনেকেই এটিকে মানুষের স্বাস্থ্য বা পরিবেশের স্বাস্থ্যের সঙ্গে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখেন না। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘ওয়ান হেলথ’ বা ‘এক স্বাস্থ্য’ দৃষ্টিভঙ্গিও আমাদের নীতিমালায় আরও শক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি দরকার আচরণগত পরিবর্তন, সচেতনতা, সঠিক চর্চা ও নিয়মিত বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণ।

জৈব নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে জাতীয় জনস্বাস্থ্য মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়ে। খাদ্যবাহিত রোগ বাড়ে, মহামারির ঝুঁকি তৈরি হয়, অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে যেতে পারে এবং পরিবেশগত স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই জৈব নিরাপত্তাকে খামারের গণ্ডি থেকে বের করে ‘এক স্বাস্থ্য’ ভাবনার আলোকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এটি শুধু পশুপাখির রোগ প্রতিরোধের উপায় নয়; মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবেশের স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষার জন্যও এটি একটি অপরিহার্য নিরাপত্তাব্যবস্থা।

বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যব্যবস্থা—এসবই নির্ভর করছে আমরা জৈব নিরাপত্তাকে কতটা বিস্তৃতভাবে দেখি তার ওপর। খামারের ব্যর্থতা মানুষের ঘরে পৌঁছাতে খুব বেশি সময় লাগে না। তাই জৈব নিরাপত্তাকে শুধু পশুপাখির জন্য নয়, মানুষের জীবন, পরিবেশ ও জাতীয় জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি মৌলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা হিসেবে দেখতে হবে।

[লেখক: সাবেক ডিন, ফ্যাকাল্টি অব অ্যানিম্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ভেটেরিনারি মেডিসিন; সাবেক চেয়ারম্যান, ডিপার্টমেন্ট অব মেডিসিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত