মা-ছেলের সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কিছু নেই। সন্তানের অসুস্থতায় মায়ের উদ্বেগ, পছন্দের খাবার তৈরি করে দেওয়া কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পাশে থাকা—এসবই পারিবারিক ভালোবাসার স্বাভাবিক প্রকাশ। তবে সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও যদি জীবনের প্রায় প্রতিটি সিদ্ধান্তে মায়ের মতামতের ওপর নির্ভরশীল থাকেন, তখন সম্পর্কের এই ঘনিষ্ঠতা ভিন্ন মাত্রা নিতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন সম্পর্ক বোঝাতে প্রায়ই ব্যবহৃত হয় ‘মামাস বয়’ শব্দটি। মায়ের প্রতি ভালোবাসা বা গভীর টান নিজে কোনো সমস্যা নয়। জটিলতা তৈরি হতে পারে তখন, যখন সেই ভালোবাসা ব্যক্তিগত সীমানা অতিক্রম করে একজন প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের জীবনযাপনের সিদ্ধান্তেও অতিরিক্ত প্রভাব ফেলতে শুরু করে।
ভালো চাওয়া আর নিয়ন্ত্রণ এক নয়
পরিবার আমাদের সমাজে শুধু সম্পর্কের বন্ধন নয়, নিরাপত্তা ও আবেগেরও বড় আশ্রয়। সন্তান বড় হয়ে গেলেও তার খাবার, পোশাক, চাকরি, বাসস্থান কিংবা বিয়ের মতো বিষয় নিয়ে মায়ের আগ্রহ থাকতেই পারে। অনেক পরিবারের কাছে এটিই স্বাভাবিক মাতৃস্নেহ।
তবে ‘সন্তানের ভালো চাই’ এবং ‘সন্তানের হয়ে সব সিদ্ধান্ত নিতে চাই’—এই দুই অবস্থার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সেই সীমাটি অস্পষ্ট হয়ে গেলেই সম্পর্কের মধ্যে তৈরি হতে পারে টানাপোড়েন।
মনস্তত্ত্বে ‘এনমেশমেন্ট’ বলতে এমন সম্পর্ককে বোঝানো হয়, যেখানে ব্যক্তিগত আবেগগত সীমারেখা স্পষ্ট থাকে না। কে কোন সিদ্ধান্ত নেবেন কিংবা কার অনুভূতির দায়িত্ব কার—এসব আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে। মা-ছেলের সম্পর্কেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান নিজের জীবন সম্পর্কে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে অস্বস্তি বোধ করতে পারেন।
বিয়ের পর কেন বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়?
বিয়ের পর একজন ছেলে একই সঙ্গে কারও সন্তান এবং একজন স্বামী। ফলে জীবনে নতুন একটি সম্পর্ক ও তার নিজস্ব পরিসর তৈরি হয়। কিন্তু বিয়ের পরও যদি আগের অভ্যাস অনুযায়ী সংসারের প্রায় প্রতিটি বিষয় মায়ের সঙ্গে আলোচনা করা হয়, তাহলে দাম্পত্যের ব্যক্তিগত জায়গা সংকুচিত হতে পারে।
স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত আলোচনা, মতবিরোধ কিংবা সংসারের সিদ্ধান্ত নিয়মিতভাবে মায়ের কাছে পৌঁছাতে থাকলে নিজেদের সম্পর্কের গোপনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
ব্যক্তিগত পরিসর কমলে কী হয়?
দাম্পত্য সম্পর্কে এমন কিছু বিষয় থাকে, যেগুলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা প্রয়োজন। প্রতিটি বিষয়ে তৃতীয় একজনের নিয়মিত সম্পৃক্ততা থাকলে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।
একপর্যায়ে স্বামী-স্ত্রীর মনে এমন অনুভূতিও তৈরি হতে পারে যে নিজেদের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আর আগের মতো নেই। সেখান থেকেই দূরত্ব বাড়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
দুই দিক সামলানোর চাপ
মায়ের মতামত অগ্রাহ্য করলে ছেলে মনে করতে পারেন, এতে মা কষ্ট পাবেন। আবার স্ত্রীর পরিবর্তে মায়ের মতকে অগ্রাধিকার দিলে দাম্পত্যে তৈরি হতে পারে মন খারাপ বা অসন্তোষ।
ফলে একজনকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে অন্যজনের অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে। এভাবে দুই দিক সামলানোর চাপ ধীরে ধীরে তিনটি সম্পর্কেই অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
প্রতিযোগিতা না থাকলেও টানাপোড়েন হতে পারে
মা ও স্ত্রীর মধ্যে সরাসরি কোনো প্রতিযোগিতা না থাকলেও পরিস্থিতি কখনো কখনো সেদিকে গড়াতে পারে। কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কার কথা আগে শোনা হবে কিংবা কার জন্য বেশি সময় রাখা হবে—এ ধরনের প্রশ্ন থেকেই তৈরি হতে পারে অঘোষিত মানসিক চাপ।
ছোট কোনো ঘটনাও তখন বড় ভুল বোঝাবুঝির কারণ হতে পারে।
সীমারেখা মানে দূরত্ব নয়
সুস্থ সীমারেখা তৈরি করার অর্থ মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়। বরং কোন বিষয়ে কোথায় থামতে হবে, সেটি বোঝা।
একজন ছেলে মাকে ভালোবাসবেন, তাঁর খোঁজ নেবেন এবং সম্মান করবেন। পাশাপাশি নিজের সংসার, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত ও ব্যক্তিগত জীবনের দায়িত্বও নিজেকেই নিতে হবে। মায়ের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু নিজের জীবনের প্রয়োজন বিবেচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গাটিও নিজের থাকা প্রয়োজন।
অন্যদিকে সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর মায়ের ভূমিকাতেও পরিবর্তন আসতে পারে। সব বিষয়ে যুক্ত থাকার পরিবর্তে সন্তানকে নিজের জীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ দিলে সম্পর্ক আরও পরিণত হতে পারে। নিজের শখ, বন্ধুত্ব ও সামাজিক জীবন নিয়েও ব্যস্ত থাকা সম্ভব।
স্ত্রীর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ
স্বামী ও তাঁর মায়ের দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। বরং পারস্পরিক সম্মান এবং স্পষ্ট সীমারেখার মাধ্যমে সম্পর্কগুলোকে স্বাভাবিক রাখা সম্ভব।
মায়ের ভালোবাসা যত গভীরই হোক, প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের জীবনে সেই ভালোবাসার পাশাপাশি স্বাধীনতার জায়গাও থাকা প্রয়োজন। সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি শুধু ভালোবাসা নয়; এর সঙ্গে পরস্পরের প্রতি সম্মান এবং ব্যক্তিগত পরিসর বোঝার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ অক্টোবর ২০২৬
মা-ছেলের সম্পর্কের গভীরতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কিছু নেই। সন্তানের অসুস্থতায় মায়ের উদ্বেগ, পছন্দের খাবার তৈরি করে দেওয়া কিংবা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পাশে থাকা—এসবই পারিবারিক ভালোবাসার স্বাভাবিক প্রকাশ। তবে সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও যদি জীবনের প্রায় প্রতিটি সিদ্ধান্তে মায়ের মতামতের ওপর নির্ভরশীল থাকেন, তখন সম্পর্কের এই ঘনিষ্ঠতা ভিন্ন মাত্রা নিতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন সম্পর্ক বোঝাতে প্রায়ই ব্যবহৃত হয় ‘মামাস বয়’ শব্দটি। মায়ের প্রতি ভালোবাসা বা গভীর টান নিজে কোনো সমস্যা নয়। জটিলতা তৈরি হতে পারে তখন, যখন সেই ভালোবাসা ব্যক্তিগত সীমানা অতিক্রম করে একজন প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের জীবনযাপনের সিদ্ধান্তেও অতিরিক্ত প্রভাব ফেলতে শুরু করে।
ভালো চাওয়া আর নিয়ন্ত্রণ এক নয়
পরিবার আমাদের সমাজে শুধু সম্পর্কের বন্ধন নয়, নিরাপত্তা ও আবেগেরও বড় আশ্রয়। সন্তান বড় হয়ে গেলেও তার খাবার, পোশাক, চাকরি, বাসস্থান কিংবা বিয়ের মতো বিষয় নিয়ে মায়ের আগ্রহ থাকতেই পারে। অনেক পরিবারের কাছে এটিই স্বাভাবিক মাতৃস্নেহ।
তবে ‘সন্তানের ভালো চাই’ এবং ‘সন্তানের হয়ে সব সিদ্ধান্ত নিতে চাই’—এই দুই অবস্থার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। সেই সীমাটি অস্পষ্ট হয়ে গেলেই সম্পর্কের মধ্যে তৈরি হতে পারে টানাপোড়েন।
মনস্তত্ত্বে ‘এনমেশমেন্ট’ বলতে এমন সম্পর্ককে বোঝানো হয়, যেখানে ব্যক্তিগত আবেগগত সীমারেখা স্পষ্ট থাকে না। কে কোন সিদ্ধান্ত নেবেন কিংবা কার অনুভূতির দায়িত্ব কার—এসব আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়ে। মা-ছেলের সম্পর্কেও এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তান নিজের জীবন সম্পর্কে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে অস্বস্তি বোধ করতে পারেন।
বিয়ের পর কেন বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়?
বিয়ের পর একজন ছেলে একই সঙ্গে কারও সন্তান এবং একজন স্বামী। ফলে জীবনে নতুন একটি সম্পর্ক ও তার নিজস্ব পরিসর তৈরি হয়। কিন্তু বিয়ের পরও যদি আগের অভ্যাস অনুযায়ী সংসারের প্রায় প্রতিটি বিষয় মায়ের সঙ্গে আলোচনা করা হয়, তাহলে দাম্পত্যের ব্যক্তিগত জায়গা সংকুচিত হতে পারে।
স্বামী-স্ত্রীর ব্যক্তিগত আলোচনা, মতবিরোধ কিংবা সংসারের সিদ্ধান্ত নিয়মিতভাবে মায়ের কাছে পৌঁছাতে থাকলে নিজেদের সম্পর্কের গোপনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
ব্যক্তিগত পরিসর কমলে কী হয়?
দাম্পত্য সম্পর্কে এমন কিছু বিষয় থাকে, যেগুলো স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা প্রয়োজন। প্রতিটি বিষয়ে তৃতীয় একজনের নিয়মিত সম্পৃক্ততা থাকলে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।
একপর্যায়ে স্বামী-স্ত্রীর মনে এমন অনুভূতিও তৈরি হতে পারে যে নিজেদের সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আর আগের মতো নেই। সেখান থেকেই দূরত্ব বাড়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
দুই দিক সামলানোর চাপ
মায়ের মতামত অগ্রাহ্য করলে ছেলে মনে করতে পারেন, এতে মা কষ্ট পাবেন। আবার স্ত্রীর পরিবর্তে মায়ের মতকে অগ্রাধিকার দিলে দাম্পত্যে তৈরি হতে পারে মন খারাপ বা অসন্তোষ।
ফলে একজনকে সন্তুষ্ট করতে গিয়ে অন্যজনের অনুভূতিতে আঘাত লাগতে পারে। এভাবে দুই দিক সামলানোর চাপ ধীরে ধীরে তিনটি সম্পর্কেই অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।
প্রতিযোগিতা না থাকলেও টানাপোড়েন হতে পারে
মা ও স্ত্রীর মধ্যে সরাসরি কোনো প্রতিযোগিতা না থাকলেও পরিস্থিতি কখনো কখনো সেদিকে গড়াতে পারে। কে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কার কথা আগে শোনা হবে কিংবা কার জন্য বেশি সময় রাখা হবে—এ ধরনের প্রশ্ন থেকেই তৈরি হতে পারে অঘোষিত মানসিক চাপ।
ছোট কোনো ঘটনাও তখন বড় ভুল বোঝাবুঝির কারণ হতে পারে।
সীমারেখা মানে দূরত্ব নয়
সুস্থ সীমারেখা তৈরি করার অর্থ মায়ের কাছ থেকে দূরে সরে যাওয়া নয়। বরং কোন বিষয়ে কোথায় থামতে হবে, সেটি বোঝা।
একজন ছেলে মাকে ভালোবাসবেন, তাঁর খোঁজ নেবেন এবং সম্মান করবেন। পাশাপাশি নিজের সংসার, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত ও ব্যক্তিগত জীবনের দায়িত্বও নিজেকেই নিতে হবে। মায়ের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু নিজের জীবনের প্রয়োজন বিবেচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গাটিও নিজের থাকা প্রয়োজন।
অন্যদিকে সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর মায়ের ভূমিকাতেও পরিবর্তন আসতে পারে। সব বিষয়ে যুক্ত থাকার পরিবর্তে সন্তানকে নিজের জীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ দিলে সম্পর্ক আরও পরিণত হতে পারে। নিজের শখ, বন্ধুত্ব ও সামাজিক জীবন নিয়েও ব্যস্ত থাকা সম্ভব।
স্ত্রীর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ
স্বামী ও তাঁর মায়ের দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। বরং পারস্পরিক সম্মান এবং স্পষ্ট সীমারেখার মাধ্যমে সম্পর্কগুলোকে স্বাভাবিক রাখা সম্ভব।
মায়ের ভালোবাসা যত গভীরই হোক, প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের জীবনে সেই ভালোবাসার পাশাপাশি স্বাধীনতার জায়গাও থাকা প্রয়োজন। সুস্থ সম্পর্কের ভিত্তি শুধু ভালোবাসা নয়; এর সঙ্গে পরস্পরের প্রতি সম্মান এবং ব্যক্তিগত পরিসর বোঝার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

আপনার মতামত লিখুন