সংবাদ

দেড় দশকেও হলো না যশোরের নতুন শিল্প পার্ক


প্রতিনিধি, বেনাপোল (যশোর)
প্রতিনিধি, বেনাপোল (যশোর)
প্রকাশ: ৫ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫০ এএম

দেড় দশকেও হলো না যশোরের নতুন শিল্প পার্ক
ছবি : সংবাদ

প্লট সংকট, জলাবদ্ধতা, জরাজীর্ণ সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং নিরাপত্তা হীনতার কারণে যশোর বিসিক শিল্পনগরীতে উৎপাদন ও নতুন বিনিয়োগ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, নতুন নতুন বিনিয়োগের প্রচুর সম্ভাবনা ও চাহিদা থাকলেও একখণ্ড খালি প্লট না থাকায় শিল্প কারখানা স্থাপনের সুযোগ দেওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে, বিসিকের জায়গা সংকট কাটাতে প্রায় দেড় দশক আগে দ্বিতীয় শিল্পনগরী স্থাপনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা আজও বাস্তবায়িত হয়নি।

যশোর শহরসংলগ্ন যশোর-নড়াইল মহাসড়কের ঝুমঝুমপুরে ১৯৬২ সালে ৫০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠে এই বিসিক শিল্পনগরী। জেলা বিসিক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এখানে ১২২টি শিল্প ইউনিট চালু রয়েছে। এসব কারখানায় হালকা প্রকৌশল (লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং), অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, কৃষি যন্ত্রপাতি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্লাস্টিক ও কেমিক্যালসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদিত হয়। বর্তমানে এখান থেকে বছরে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। কর্মসংস্থান হয়েছে ৬ হাজার ৯১৮ জনের, যার মধ্যে অর্ধেকের কাছাকাছি (প্রায় ২ হাজার ৯৮৬ জন) নারী শ্রমিক।

উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রয়োজনীয় সংস্কার না হওয়ায় শিল্পনগরীর সার্বিক অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে। সড়কে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত, অকার্যকর হয়ে পড়েছে ড্রেনেজ ব্যবস্থা। সামান্য বৃষ্টিতেই কারখানার ভেতরে পানি ঢুকে পড়ে ব্যাহত হয় নিত্যদিনের উৎপাদন। বিসিককে নিয়মিত সার্ভিস চার্জ দেওয়া হলেও তার বিনিময়ে ন্যুনতম পরিষেবা মিলছে না বলে দাবি তাদের।

এনায়েত ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বত্বাধিকারী আকতার হোসেন বলেন, ১৯৬২ সালে মাত্র ২৫টি কারখানার জন্য স্থাপিত একটি পানির পাম্পের পুরোনো ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে এখন ১২২টি ইউনিট চলছে। দীর্ঘদিন ধরে এটি সংস্কার না করায় স্বাভাবিক পানি সরবরাহ একপ্রকার বন্ধ। এমনকি আকস্মিক আগুন লাগলে তা নেভানোর জন্য পর্যাপ্ত পানির উৎসও নেই পুরো বিসিকে।

আকতার হোসেন আরও বলেন, অভ্যন্তরীণ সড়কগুলো চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। রাতের বেলা পর্যাপ্ত সড়কবাতি না থাকা এবং স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প না থাকায় নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিনিয়ত উদ্বেগে থাকতে হয়।

রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এমইউ সিইএ ফুডসের স্বত্বাধিকারী শ্যামল দাস জানান, শিল্পনগরীটির কোনো নিজস্ব সীমানাপ্রাচীর, প্রধান ফটক বা পৃথক বৈদ্যুতিক ফিডার নেই। ভেতরের প্রায় তিন কিলোমিটার পাকা সড়ক ও ছয় কিলোমিটার ড্রেনের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারহীন অবস্থায় অকেজো হয়ে আছে।

বিসিকের নথি সূত্রে জানা গেছে, শিল্প মালিকদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১১ সালের ৮ মে যশোর-নড়াইল সড়কের ফতেপুর এলাকায় ৪০ একর খাসজমিতে অটোমোবাইল শিল্পাঞ্চল স্থাপনের প্রস্তাব জেলা প্রশাসন থেকে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে স্থান পরিবর্তন করে সদর উপজেলার রামনগরে ‘লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প পার্ক’ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। কিন্তু দেড় দশক অতিক্রম হতে চললেও এই প্রকল্প বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।

অথচ যশোর শহর ও তার আশপাশের এলাকায় অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ তৈরি, বাস-ট্রাকের বডি নির্মাণ, তিন চাকার যান সংযোজন ও মেরামতের একাধিক ঐতিহ্যবাহী কারখানা গড়ে উঠেছে। জায়গার অভাবে তারা ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারছেন না।

যশোর চেম্বার অব কমার্সের সাধারণ সম্পাদক তানভিরুল ইসলাম সোহান বলেন, অবকাঠামোগত বেহাল দশায় নতুন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখানে বিনিয়োগের আগ্রহ হারাচ্ছেন। বিদ্যমান বিসিকের আধুনিকায়নের পাশাপাশি প্রস্তাবিত শিল্প পার্ক দ্রুত বাস্তবায়ন করা না গেলে যশোরের শিল্প খাত স্থবির হয়ে পড়বে। চেম্বারের সভাপতি মিজানুর রহমান খান উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ সহায়তার জোর দাবি জানান।

সার্বিক বিষয়ে যশোর বিসিকের জেলা কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপমহাব্যবস্থাপক এম এনাম আহমেদ বলেন, 'বিদ্যমান বিসিকের অবকাঠামোগত সমস্যা দূর করতে সংস্কার ও আধুনিকায়নের বেশ কিছু পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জলাবদ্ধতা কাটাতে বিকল্প ড্রেনেজ ব্যবস্থার একটি খসড়া প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।'

প্রস্তাবিত নতুন পার্কের বিষয়ে তিনি বলেন, রামনগরে ‘লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প পার্ক’ স্থাপনের কাজ দ্রুত শুরু করার চেষ্টা চলছে। এটি বাস্তবায়িত হলে কয়েক হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং শহরের প্লট সংকট অনেকাংশে ঘুচে যাবে।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬


দেড় দশকেও হলো না যশোরের নতুন শিল্প পার্ক

প্রকাশের তারিখ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

প্লট সংকট, জলাবদ্ধতা, জরাজীর্ণ সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানির অভাব এবং নিরাপত্তা হীনতার কারণে যশোর বিসিক শিল্পনগরীতে উৎপাদন ও নতুন বিনিয়োগ চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, নতুন নতুন বিনিয়োগের প্রচুর সম্ভাবনা ও চাহিদা থাকলেও একখণ্ড খালি প্লট না থাকায় শিল্প কারখানা স্থাপনের সুযোগ দেওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে, বিসিকের জায়গা সংকট কাটাতে প্রায় দেড় দশক আগে দ্বিতীয় শিল্পনগরী স্থাপনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা আজও বাস্তবায়িত হয়নি।

যশোর শহরসংলগ্ন যশোর-নড়াইল মহাসড়কের ঝুমঝুমপুরে ১৯৬২ সালে ৫০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠে এই বিসিক শিল্পনগরী। জেলা বিসিক কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এখানে ১২২টি শিল্প ইউনিট চালু রয়েছে। এসব কারখানায় হালকা প্রকৌশল (লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং), অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ, কৃষি যন্ত্রপাতি, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্লাস্টিক ও কেমিক্যালসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদিত হয়। বর্তমানে এখান থেকে বছরে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে। কর্মসংস্থান হয়েছে ৬ হাজার ৯১৮ জনের, যার মধ্যে অর্ধেকের কাছাকাছি (প্রায় ২ হাজার ৯৮৬ জন) নারী শ্রমিক।

উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রয়োজনীয় সংস্কার না হওয়ায় শিল্পনগরীর সার্বিক অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে। সড়কে তৈরি হয়েছে বড় বড় গর্ত, অকার্যকর হয়ে পড়েছে ড্রেনেজ ব্যবস্থা। সামান্য বৃষ্টিতেই কারখানার ভেতরে পানি ঢুকে পড়ে ব্যাহত হয় নিত্যদিনের উৎপাদন। বিসিককে নিয়মিত সার্ভিস চার্জ দেওয়া হলেও তার বিনিময়ে ন্যুনতম পরিষেবা মিলছে না বলে দাবি তাদের।

এনায়েত ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বত্বাধিকারী আকতার হোসেন বলেন, ১৯৬২ সালে মাত্র ২৫টি কারখানার জন্য স্থাপিত একটি পানির পাম্পের পুরোনো ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে এখন ১২২টি ইউনিট চলছে। দীর্ঘদিন ধরে এটি সংস্কার না করায় স্বাভাবিক পানি সরবরাহ একপ্রকার বন্ধ। এমনকি আকস্মিক আগুন লাগলে তা নেভানোর জন্য পর্যাপ্ত পানির উৎসও নেই পুরো বিসিকে।

আকতার হোসেন আরও বলেন, অভ্যন্তরীণ সড়কগুলো চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। রাতের বেলা পর্যাপ্ত সড়কবাতি না থাকা এবং স্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প না থাকায় নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রতিনিয়ত উদ্বেগে থাকতে হয়।

রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এমইউ সিইএ ফুডসের স্বত্বাধিকারী শ্যামল দাস জানান, শিল্পনগরীটির কোনো নিজস্ব সীমানাপ্রাচীর, প্রধান ফটক বা পৃথক বৈদ্যুতিক ফিডার নেই। ভেতরের প্রায় তিন কিলোমিটার পাকা সড়ক ও ছয় কিলোমিটার ড্রেনের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারহীন অবস্থায় অকেজো হয়ে আছে।

বিসিকের নথি সূত্রে জানা গেছে, শিল্প মালিকদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০১১ সালের ৮ মে যশোর-নড়াইল সড়কের ফতেপুর এলাকায় ৪০ একর খাসজমিতে অটোমোবাইল শিল্পাঞ্চল স্থাপনের প্রস্তাব জেলা প্রশাসন থেকে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে স্থান পরিবর্তন করে সদর উপজেলার রামনগরে ‘লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প পার্ক’ স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। কিন্তু দেড় দশক অতিক্রম হতে চললেও এই প্রকল্প বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।

অথচ যশোর শহর ও তার আশপাশের এলাকায় অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ তৈরি, বাস-ট্রাকের বডি নির্মাণ, তিন চাকার যান সংযোজন ও মেরামতের একাধিক ঐতিহ্যবাহী কারখানা গড়ে উঠেছে। জায়গার অভাবে তারা ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারছেন না।

যশোর চেম্বার অব কমার্সের সাধারণ সম্পাদক তানভিরুল ইসলাম সোহান বলেন, অবকাঠামোগত বেহাল দশায় নতুন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখানে বিনিয়োগের আগ্রহ হারাচ্ছেন। বিদ্যমান বিসিকের আধুনিকায়নের পাশাপাশি প্রস্তাবিত শিল্প পার্ক দ্রুত বাস্তবায়ন করা না গেলে যশোরের শিল্প খাত স্থবির হয়ে পড়বে। চেম্বারের সভাপতি মিজানুর রহমান খান উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ সহায়তার জোর দাবি জানান।

সার্বিক বিষয়ে যশোর বিসিকের জেলা কার্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপমহাব্যবস্থাপক এম এনাম আহমেদ বলেন, 'বিদ্যমান বিসিকের অবকাঠামোগত সমস্যা দূর করতে সংস্কার ও আধুনিকায়নের বেশ কিছু পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। জলাবদ্ধতা কাটাতে বিকল্প ড্রেনেজ ব্যবস্থার একটি খসড়া প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে।'

প্রস্তাবিত নতুন পার্কের বিষয়ে তিনি বলেন, রামনগরে ‘লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প পার্ক’ স্থাপনের কাজ দ্রুত শুরু করার চেষ্টা চলছে। এটি বাস্তবায়িত হলে কয়েক হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং শহরের প্লট সংকট অনেকাংশে ঘুচে যাবে।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত