বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক ঐতিহাসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক—তিন দিক থেকেই গভীর। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের প্রধান উৎস নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনীতি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, খাদ্যপ্রক্রিয়াজাত শিল্প, পরিবহন ও বাজারব্যবস্থা। কিন্তু কৃষির এত বড় অবদান থাকা সত্ত্বেও কৃষককে উৎপাদন ব্যয়, বাজারদর, মধ্যস্বত্বভোগী, সংরক্ষণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, ঋণের উচ্চ ব্যয় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এসব সমস্যা মোকাবিলায় কৃষিভিত্তিক সমবায় একটি কার্যকর অর্থনৈতিক কাঠামো হতে পারে। কৃষকের বিচ্ছিন্ন শক্তিকে সংগঠিত শক্তিতে রূপান্তর করে উৎপাদন, বিপণন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিনিয়োগে যৌথ সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব সমবায়ের মাধ্যমে।
আমাদের দেশে সমবায় আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা অনেক। কিন্তু অশিক্ষা, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও অসাধুতার কারণে সমবায় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। কৃষক সমাজে সমবায়ের চেতনার ঘাটতি এবং যৌথ উদ্যোগ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণাও রয়েছে। সামাজিক ও পারিবারিক বাধা, আর্থিক সংকট, অনীহা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে অনেক ক্ষেত্রে সম্মিলিতভাবে কৃষিকাজ করা কঠিন হয়। তাই কৃষকদের মধ্যে শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়াতে হবে। কৃষিভিত্তিক মৌলিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সমবায়ের সুফল ও সুযোগ সম্পর্কে কৃষকদের বাস্তব ধারণা দিতে হবে।
বাংলাদেশে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের সমবায় সমিতি রয়েছে। এসব সমবায়ের একটি বড় অংশ কৃষির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। সমবায়ের মাধ্যমে কৃষক উন্নত বীজ, সার, সেচ ও কৃষি যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করতে পারেন। তাঁরা যৌথভাবে ফসল সংগ্রহ, মাড়াই, ঝাড়াই ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারেন। সংগঠিতভাবে উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমানো এবং কৃষকের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। বন্যা, খরা, শৈত্যপ্রবাহসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায়ও সমবায়ী উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে। কৃষিব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও গ্রামীণ জীবনমান উন্নয়নে তাই সমবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কৃষিভিত্তিক সমবায় কৃষকদের জ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনতে পারে। একজন কৃষকের পক্ষে নতুন জাতের বীজ, আধুনিক চাষপদ্ধতি, মাটির স্বাস্থ্য, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা ও বাজারের তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করা কঠিন। কিন্তু সমবায় সংগঠিতভাবে কৃষিবিদ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি কৃষি সম্প্রসারণ সংস্থা ও বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। সদস্যদের জন্য প্রশিক্ষণ, মাঠদিবস, প্রদর্শনী প্লট ও প্রযুক্তি ব্যবহারের কর্মসূচি আয়োজন করা সম্ভব। এতে কৃষি উৎপাদনে বৈজ্ঞানিক ও তথ্যনির্ভর পদ্ধতির ব্যবহার বাড়বে।
বাজারব্যবস্থায়ও কৃষিভিত্তিক সমবায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সমবায় একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সদস্যদের পণ্য তালিকাভুক্ত করে অনলাইন অর্ডার গ্রহণ ও সংগঠিতভাবে সরবরাহ করতে পারে। সুপারশপ, রেস্টুরেন্ট, খাদ্যপ্রক্রিয়াজাত প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি চুক্তিভিত্তিক বাজার তৈরি করা গেলে কৃষকের আয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্যের বাজারও স্থিতিশীল হতে পারে। উৎপাদনের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন করা গেলে কৃষকের আয় আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
কৃষিভিত্তিক সমবায়ের বিভিন্ন ধরন হতে পারে। শস্য উৎপাদন ও বিপণন সমবায়, দুগ্ধ সমবায়, মৎস্য চাষি সমবায়, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ সমবায় এবং সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের সমবায় কৃষি উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশেও এসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের সঙ্গে সমবায়কে যুক্ত করে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
কৃষিভিত্তিক সমবায় নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেও ভূমিকা রাখতে পারে। গ্রামীণ নারীরা কৃষিকাজ, পশুপালন, হাঁস-মুরগি পালন, বীজ সংরক্ষণ ও খাদ্যপ্রক্রিয়াজাতকরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। কিন্তু তাঁদের শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য অনেক সময় যথাযথভাবে স্বীকৃত হয় না। নারী-কেন্দ্রিক কৃষি সমবায় বা বিদ্যমান সমবায়ে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন, বিপণন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের ভূমিকা বাড়বে। এর ফলে পরিবারের আয় বৃদ্ধি এবং নারীর আর্থিক স্বাধীনতা—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলাতেও কৃষি সমবায় কার্যকর হতে পারে। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা, অতিবৃষ্টি ও তাপমাত্রার পরিবর্তন বাংলাদেশের কৃষিকে ক্রমাগত ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। একক কৃষকের পক্ষে এসব ঝুঁকি মোকাবিলা করা কঠিন। সমবায়ের মাধ্যমে জলবায়ু-সহনশীল জাত, উন্নত সেচব্যবস্থা, ফসল বৈচিত্র্যকরণ, পানি সংরক্ষণ, কৃষিবীমা ও দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন কার্যক্রম যৌথভাবে গ্রহণ করা সম্ভব। এতে কৃষকের ঝুঁকি কমবে এবং উৎপাদনের স্থিতিশীলতা বাড়বে।
তবে সমবায় আন্দোলনের বড় সমস্যা এর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। সমবায় গঠন, নিবন্ধন, পরিচালনা, অডিট ও নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতা সমবায়ের স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। বিভিন্ন সমবায়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। এসব সমস্যা দূর করতে সমবায়ীদের অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। সমবায়ের নিবন্ধন ও পরিচালনা প্রক্রিয়াকে সহজ করতে হবে। সমবায় কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সদস্যদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়াতে হবে।
কৃষিভিত্তিক সমবায়কে জাতীয় অর্থনীতির বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গেও যুক্ত করতে হবে। কৃষকের উৎপাদিত কাঁচামাল স্থানীয় শিল্পে ব্যবহার করা গেলে কৃষি ও শিল্পের মধ্যে সংযোগ তৈরি হবে। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত হয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে গেলে মূল্যশৃঙ্খলে কৃষকের অংশও বাড়ানো সম্ভব। এতে আমদানি নির্ভরতা কমানো, কৃষিভিত্তিক রপ্তানি বাড়ানো এবং অভ্যন্তরীণ বাজার শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে তরুণদের কৃষিতে আকৃষ্ট করতে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তে অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে বাজারব্যবস্থার সংস্কারও জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কৃষিভিত্তিক সমবায়কে শুধু কৃষকদের একটি সংগঠন হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে একটি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, বাজার গবেষণা, হিসাব ব্যবস্থাপনা, দক্ষ নেতৃত্ব, প্রযুক্তি, মান নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন। সমবায় সফল হবে তখনই, যখন সদস্যরা এটিকে অনুদাননির্ভর প্রকল্প নয়, নিজেদের মালিকানাধীন ও পরিচালিত অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করবেন। সদস্যদের অংশগ্রহণ, পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতাই হবে এর মূল পুঁজি।
কৃষিভিত্তিক সমবায় কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাতে, বাজারে দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে, ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে, কৃষিপণ্যে মূল্য সংযোজন করতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে। একই সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষির আধুনিকায়ন, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলাতেও এর ভূমিকা থাকতে পারে। তবে এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, পেশাদার ব্যবস্থাপনা, সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং বাজারভিত্তিক পরিকল্পনা।
কৃষককে শুধু উৎপাদক নয়, উদ্যোক্তা ও অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কার্যকর পথ হতে পারে কৃষিভিত্তিক সমবায়। সঠিক নীতি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে সমবায়কে শক্তিশালী করা গেলে এটি শুধু কৃষকের আয় বৃদ্ধির মাধ্যম হবে না; বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক, উৎপাদনশীল ও বিকেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে।
[লেখক: সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬
বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে কৃষির সম্পর্ক ঐতিহাসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক—তিন দিক থেকেই গভীর। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। কৃষি শুধু খাদ্য উৎপাদনের প্রধান উৎস নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনীতি, ক্ষুদ্র ব্যবসা, খাদ্যপ্রক্রিয়াজাত শিল্প, পরিবহন ও বাজারব্যবস্থা। কিন্তু কৃষির এত বড় অবদান থাকা সত্ত্বেও কৃষককে উৎপাদন ব্যয়, বাজারদর, মধ্যস্বত্বভোগী, সংরক্ষণব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, ঋণের উচ্চ ব্যয় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। এসব সমস্যা মোকাবিলায় কৃষিভিত্তিক সমবায় একটি কার্যকর অর্থনৈতিক কাঠামো হতে পারে। কৃষকের বিচ্ছিন্ন শক্তিকে সংগঠিত শক্তিতে রূপান্তর করে উৎপাদন, বিপণন, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিনিয়োগে যৌথ সক্ষমতা তৈরি করা সম্ভব সমবায়ের মাধ্যমে।
আমাদের দেশে সমবায় আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা অনেক। কিন্তু অশিক্ষা, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও অসাধুতার কারণে সমবায় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। কৃষক সমাজে সমবায়ের চেতনার ঘাটতি এবং যৌথ উদ্যোগ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণাও রয়েছে। সামাজিক ও পারিবারিক বাধা, আর্থিক সংকট, অনীহা ও পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে অনেক ক্ষেত্রে সম্মিলিতভাবে কৃষিকাজ করা কঠিন হয়। তাই কৃষকদের মধ্যে শিক্ষা ও সচেতনতা বাড়াতে হবে। কৃষিভিত্তিক মৌলিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সমবায়ের সুফল ও সুযোগ সম্পর্কে কৃষকদের বাস্তব ধারণা দিতে হবে।
বাংলাদেশে বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের সমবায় সমিতি রয়েছে। এসব সমবায়ের একটি বড় অংশ কৃষির সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। সমবায়ের মাধ্যমে কৃষক উন্নত বীজ, সার, সেচ ও কৃষি যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করতে পারেন। তাঁরা যৌথভাবে ফসল সংগ্রহ, মাড়াই, ঝাড়াই ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারেন। সংগঠিতভাবে উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমানো এবং কৃষকের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব। বন্যা, খরা, শৈত্যপ্রবাহসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায়ও সমবায়ী উদ্যোগ কার্যকর হতে পারে। কৃষিব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও গ্রামীণ জীবনমান উন্নয়নে তাই সমবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কৃষিভিত্তিক সমবায় কৃষকদের জ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনতে পারে। একজন কৃষকের পক্ষে নতুন জাতের বীজ, আধুনিক চাষপদ্ধতি, মাটির স্বাস্থ্য, আবহাওয়ার পূর্বাভাস, রোগবালাই ব্যবস্থাপনা ও বাজারের তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করা কঠিন। কিন্তু সমবায় সংগঠিতভাবে কৃষিবিদ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সরকারি কৃষি সম্প্রসারণ সংস্থা ও বেসরকারি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। সদস্যদের জন্য প্রশিক্ষণ, মাঠদিবস, প্রদর্শনী প্লট ও প্রযুক্তি ব্যবহারের কর্মসূচি আয়োজন করা সম্ভব। এতে কৃষি উৎপাদনে বৈজ্ঞানিক ও তথ্যনির্ভর পদ্ধতির ব্যবহার বাড়বে।
বাজারব্যবস্থায়ও কৃষিভিত্তিক সমবায় বড় পরিবর্তন আনতে পারে। ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষক ও ভোক্তার মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সমবায় একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সদস্যদের পণ্য তালিকাভুক্ত করে অনলাইন অর্ডার গ্রহণ ও সংগঠিতভাবে সরবরাহ করতে পারে। সুপারশপ, রেস্টুরেন্ট, খাদ্যপ্রক্রিয়াজাত প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি চুক্তিভিত্তিক বাজার তৈরি করা গেলে কৃষকের আয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্যের বাজারও স্থিতিশীল হতে পারে। উৎপাদনের পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন করা গেলে কৃষকের আয় আরও বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
কৃষিভিত্তিক সমবায়ের বিভিন্ন ধরন হতে পারে। শস্য উৎপাদন ও বিপণন সমবায়, দুগ্ধ সমবায়, মৎস্য চাষি সমবায়, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ সমবায় এবং সেচ ও পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের সমবায় কৃষি উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশেও এসব অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের সঙ্গে সমবায়কে যুক্ত করে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।
কৃষিভিত্তিক সমবায় নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেও ভূমিকা রাখতে পারে। গ্রামীণ নারীরা কৃষিকাজ, পশুপালন, হাঁস-মুরগি পালন, বীজ সংরক্ষণ ও খাদ্যপ্রক্রিয়াজাতকরণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। কিন্তু তাঁদের শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্য অনেক সময় যথাযথভাবে স্বীকৃত হয় না। নারী-কেন্দ্রিক কৃষি সমবায় বা বিদ্যমান সমবায়ে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা গেলে উৎপাদন, বিপণন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের ভূমিকা বাড়বে। এর ফলে পরিবারের আয় বৃদ্ধি এবং নারীর আর্থিক স্বাধীনতা—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলাতেও কৃষি সমবায় কার্যকর হতে পারে। বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা, অতিবৃষ্টি ও তাপমাত্রার পরিবর্তন বাংলাদেশের কৃষিকে ক্রমাগত ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। একক কৃষকের পক্ষে এসব ঝুঁকি মোকাবিলা করা কঠিন। সমবায়ের মাধ্যমে জলবায়ু-সহনশীল জাত, উন্নত সেচব্যবস্থা, ফসল বৈচিত্র্যকরণ, পানি সংরক্ষণ, কৃষিবীমা ও দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন কার্যক্রম যৌথভাবে গ্রহণ করা সম্ভব। এতে কৃষকের ঝুঁকি কমবে এবং উৎপাদনের স্থিতিশীলতা বাড়বে।
তবে সমবায় আন্দোলনের বড় সমস্যা এর প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা। সমবায় গঠন, নিবন্ধন, পরিচালনা, অডিট ও নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত আমলাতান্ত্রিক নির্ভরতা সমবায়ের স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। বিভিন্ন সমবায়ে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগও রয়েছে। এসব সমস্যা দূর করতে সমবায়ীদের অংশগ্রহণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। সমবায়ের নিবন্ধন ও পরিচালনা প্রক্রিয়াকে সহজ করতে হবে। সমবায় কর্মকর্তার নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সদস্যদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়াতে হবে।
কৃষিভিত্তিক সমবায়কে জাতীয় অর্থনীতির বৃহত্তর কাঠামোর সঙ্গেও যুক্ত করতে হবে। কৃষকের উৎপাদিত কাঁচামাল স্থানীয় শিল্পে ব্যবহার করা গেলে কৃষি ও শিল্পের মধ্যে সংযোগ তৈরি হবে। কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত হয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে গেলে মূল্যশৃঙ্খলে কৃষকের অংশও বাড়ানো সম্ভব। এতে আমদানি নির্ভরতা কমানো, কৃষিভিত্তিক রপ্তানি বাড়ানো এবং অভ্যন্তরীণ বাজার শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে তরুণদের কৃষিতে আকৃষ্ট করতে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি, প্রশিক্ষণ এবং সহজ শর্তে অর্থায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে বাজারব্যবস্থার সংস্কারও জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কৃষিভিত্তিক সমবায়কে শুধু কৃষকদের একটি সংগঠন হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে একটি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, বাজার গবেষণা, হিসাব ব্যবস্থাপনা, দক্ষ নেতৃত্ব, প্রযুক্তি, মান নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন। সমবায় সফল হবে তখনই, যখন সদস্যরা এটিকে অনুদাননির্ভর প্রকল্প নয়, নিজেদের মালিকানাধীন ও পরিচালিত অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করবেন। সদস্যদের অংশগ্রহণ, পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতাই হবে এর মূল পুঁজি।
কৃষিভিত্তিক সমবায় কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাতে, বাজারে দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াতে, ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে, কৃষিপণ্যে মূল্য সংযোজন করতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে। একই সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষির আধুনিকায়ন, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলাতেও এর ভূমিকা থাকতে পারে। তবে এ সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, পেশাদার ব্যবস্থাপনা, সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং বাজারভিত্তিক পরিকল্পনা।
কৃষককে শুধু উৎপাদক নয়, উদ্যোক্তা ও অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কার্যকর পথ হতে পারে কৃষিভিত্তিক সমবায়। সঠিক নীতি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে সমবায়কে শক্তিশালী করা গেলে এটি শুধু কৃষকের আয় বৃদ্ধির মাধ্যম হবে না; বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক, উৎপাদনশীল ও বিকেন্দ্রীভূত অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিতে পরিণত হতে পারে।
[লেখক: সাবেক উপ-মহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি]

আপনার মতামত লিখুন