আজ থেকে মাসছয় আগের কথা। এক সন্ধ্যায় আমাদের গ্রামের বাড়ির মসজিদের তরুণ ইমাম সিয়াম আহমেদ বললো, কাকা দ্যাখুন--
--আপনার পায়ের কাছে একটা ছোট্ট মুরগির বাচ্চা আছে। বয়স একমাসেরও কম হবে। সে সম্ভবত তার মাকে হারিয়ে ফেলেছে। মনে হয়, তারা অন্য বাড়ি থেকে আসছিল, ফেরার সময় সে পথ ভুলে এখানে আটকা পড়ে গেছে ।
আমি ভাবছি, মা মুরগিটার হয়তো অনেকগুলো বাচ্চা ছিল। একজন সঙ্গে নেই তা মা-ও বুঝতে পারেনি। আসলে পৃথিবীর তাবৎ প্রাণিকুলে অনেক সন্তানের মা-রা না-কি অপেক্ষাকৃতভাবে খানিকটা উদাসীন হয়।
-- হুজুর জানায়, গত দু'দিন ধরে বারান্দায় রাখা আপনার আড্ডার টেবিলের নিচে সে রাত কাটাচ্ছে। দেখলাম তাই তো, সে চুপটি করে বসে আছে। আমাদের কথাবার্তা শুনছে। খুব বেশি ভয়ও পাচ্ছে না। তার চিন্তা শুধু রাত কাটানো।
বললাম শোন,
-- তার একটা নাম দেওয়া যায়। আজ থেকে একে 'মল্লিকা' বলে ডাকবে। মল্লিকা একটা ফুলের নাম। ওরা রাতে ফোটে আবার খুব সকালেই ঝরে যায়। সে-ও সারাদিন বাইরে থেকে রাতে এসে আশ্রয় নেয়। দিনের বেলায় থাকে না। তা-ই নাম হোক মল্লিকা। আর তাকে কিন্তু যত্ন করো, মাঝেমধ্যে একটু খাবার দিয়ো, তোমার সওয়াব হবে।
হুজুর বেচারা সত্যিই মল্লিকার প্রতি বিশেষ সদয় হলো। এরই মধ্যে মল্লিকাও হুজুরকে বেশ আস্হায় নিয়ে ফেলেছে। হুজুর ডাক দিলেই সে ছুটে আসে, আবার পরক্ষণে বাড়ির উঠানে, আঙিনায় বেরিয়ে পড়ে। হাঁটে, দৌড়ায়, এদিক-ওদিক চোখ রাখে।
বেশকিছু দিন থেকে আমিও লক্ষ করে আসছি, মল্লিকা আমাকেও একটু একটু চিনতে পারছে। সতর্ক হয়ে কাছে আসে, খুব ভয়ও পায়না এমন। আরও লক্ষ করলাম, সে সবসময় দলছুট হয়ে থাকে, উঠানে দৌড়াদৌড়ি করা অসংখ্য মুরগির সাথে তার কোনো সখ্যতা নেই। তাকে কেউ দলে নেয় না। মল্লিকা যেন অচ্যুত, অস্পৃশ্য নিম্নবর্গের কেউ। অন্য বাচ্চাদের সাথে তাদের মা আছে, ভাই-বোন আছে, তারা ঐক্যবদ্ধ। আবার মা'র কড়া নজরদারিতে অবলীলায় বিচরণ করছে। কিন্তু আমাদের আশ্রয়ে থাকা মল্লিকা এতিম অসহায়ের মতন আলাদা থাকে। তার সঙ্গে অন্য মা মুরগিও বিমাতাসুলভ আচরণ করে। কাছে পেলে আঘাত করে, তাড়িয়ে দেয়। তারা ভাবে, তুই এ বাড়িতে কোথায় থেকে আসলে? তোর মা কোথায়? সে লজ্জা পায়, পৃথক হয়ে যায়, অন্যদিকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হাঁটে। মাটিতে ঠুকরে খাবার খায়, আনমনে ঘুরে ফিরে। তবে সে নিশ্চয়ই মনে মনে বলে, 'তোমরা এতিম বলে আমাকে যতই অবহেলা করো, আমি কিন্তু তোমাদের চেয়ে ভালো উন্নত ঘরে ঘুমাই'।
২.
দেখতে দেখতে মল্লিকা বড় হয়ে যাচ্ছে। মনে হয় মাসটা যেতেই সে একটুখানি বড় হয়ে ওঠেছে। হুজুর বলে, দ্যাখুন কাকা মুরগির বাচ্চাটি কিন্তু বেশ নাদুসনুদুস হয়ে ওঠেছে। ও কিছু দিনের ভেতর ডিম দিবে। জিজ্ঞেস করে জানি, টেবিলের নিচেই তার আসল আস্তানা। সন্ধ্যার আগে প্রবেশ করে আবার সকালে অন্যরা জাগার পূর্বে সে নিজের অন্ন যোগাড়ে বেরিয়ে পড়ে। তার কোনো চিন্তা নেই, তার খাবার আশেপাশের বাড়ি ঘরের উঠোনে, গাছ তলায়, পুকুর পাড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আজকাল হুজুরও মাঝেমধ্যে কিছু বাড়তি খাবার দেয়। ফলে তার অন্ন, বাসস্থান আর নিরাপত্তার বিষয়ে তেমন কোনো ঝুঁকি অবশিষ্ট নেই। সেদিন দেখলাম, মল্লিকা বেশ ডাঙ্গর হয়ে গেছে। গায়ের রঙও সুন্দর আকর্ষনীয় দেখাচ্ছে। চোখের সামনে দিয়ে সে সচকিত পায়ে হেঁটে যায়। কখনো হুজুর তাকে ডেকে ফিড জাতীয় সামান্য খাবার ছিটিয়ে দিচ্ছে। সাথে সাথে সে দৌড়ে আসে কিন্তু তার সঙ্গে আরও ক'টা মুরগি চলে আসে। হুজুর বাকিদের তাড়িয়ে দিয়ে শুধু তাকে খাবার দেয়, এতে করে অন্য মুরগিগুলো বেশ ক্ষেপে যাচ্ছে। যদিও সেই মুহূর্তে তারা তাকে কিছু করতে পারছে না। কিন্তু পরে শোধ নিবে।
--বললাম, হুজুর তুমি তো দেখছি, তাকে ক্রমাগত স্বগোত্রীয়দের শত্রুতে পরিণত করছো হে! সে তো এমনিতেই মূল উৎপাটিত এবং একঘরে হয়ে আছে। এর ওপর তাকে অধিক অগ্রাধিকার দিলে এখানকার স্হায়ীরা সংক্ষুব্ধ হবে এটাই স্বাভাবিক।
--হুজুর বললো, জ্বি কাকা, আমাদের মল্লিকাকে সবাই মারে, তার পক্ষে এ বাড়ির কোনো মুরগী নেই । সকলেই হিংসা করে, দলাদলি করে। এমনকি আপনার টেবিলের নিচে বাস করুক এটাও অন্যরা চায় না।
৩.
এবার বাড়িতে গিয়ে দেখি, মল্লিকা দেখতে প্রায় প্রাপ্তবয়স্কা এক মুরগির মতন। সে সারাক্ষণ ডাকাডাকি করছে। টেবিলের নিচে বসতে চাচ্ছে না। ওড়াল দিয়ে এখানে ওখানে বসছে। তার স্থিরতা নেই।
হুজুর বললো, কাকা সে ডিম পারবে, এ জন্যই অন্য একটা নিরাপদ জায়গা খুঁজছে। আমি দোতলার বারান্দায় একটা কার্টনের ভেতরে কিছু খড় বিছিয়ে দিয়েছি, সে ওখানে যাবে।
জিজ্ঞেস করলাম - সে বুঝবে কিভাবে?
-- হুজুর বলে, আমি সঙ্গে নিয়ে একবার দেখিয়ে দিয়েছি। এখন সে ওড়াল দিয়ে দোতলায় ওঠে যায়। গতরাত থেকে মল্লিকা ওখানেই থাকে।
এবার আমি আরও বিস্মিত হলাম। সকাল বেলায় যখন শুনলাম, সে একটা ডিম দিয়েছে। হুজুর হাতে করে এনে আমাকে দেখালো। আহা! কী আনন্দ আমার এবং হুজুরের। পরদিন যথারীতি দুটো ডিম হলো। সন্ধ্যা নেমে আসলে মল্লিকা এখন আর নিচ থেকে সিঁড়ি দিয়ে যায় না, সরাসরি পাখনায় ওড়ে উঠানামা করে। ডিম নিয়েও সারাদিন তার কোনো দুঃশ্চিতা নেই। শতভাগ নিরাপত্তার দায় হুজুরের ওপর ছেড়ে দিয়ে সে দিব্যি খাচ্ছে-দাচ্ছে এমনকি প্রতিবেশীর মোরগের সঙ্গেও সময় কাটাচ্ছে।
৪.
বিপত্তি বাঁধলো গতকাল। আমার এক বন্ধু ঢাকা থেকে সস্ত্রীক বেড়াতে এসেছেন গ্রামে। তাদের থাকতে দিলাম দোতলার একটা কক্ষে। খোলামেলা বাতাসবাহী কক্ষ থাকায় সেটি তাদের জন্য নির্বাচন করা হলো। সন্ধ্যা রাতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় তারা দু'জন বারান্দায় গিয়ে দেখতে পায়, মল্লিকা আরামে নিদ্রাতুর হয়ে আছে। তার কোনো বিদ্যুৎ, আলো বা বাতাসের প্রয়োজন নেই। সে যে শতভাগ প্রকৃতির সন্তান।
এক পর্যায়ে বন্ধু'র স্ত্রী মিনু মল্লিকাকে আগন্তুক ভেবে সরিয়ে দিলে সে চিৎকার করতে করতে নিচে নেমে আসে। তখন সে শুধু হুজুরকে খুঁজছিল, মূলত নালিশ করার জন্য যে,' আমাকে আপনি কোথায় থাকতে দিলেন যেখানে রাতের বেলায়ও শান্তি নেই'? মল্লিকার আর্ত চিৎকারে হুজুর বেরিয়ে আসলো। এদিকে আমার বন্ধু জামি, হাসি মুখে ডিম দুটো হাতে করে নিয়ে এসে বললো, এই দ্যাখো, বারান্দায় দুটো দেশি জাতের ডিম পেলাম। মুরগিটা পালিয়ে গেছে। এগুলো কিন্তু খুব টেস্টি হয় বুঝলে ? আর সবসময় পাওয়া যায় না।
আমি বললাম, 'আরে এ যে আমাদের মল্লিকার পরবর্তী বংশপরম্পরার এক মহামূল্যবান ধন'। গল্প শুনে বন্ধুটি কিছুক্ষণ বাকরহিত ছিল।
[লেখক: গল্পকার]

সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬
আজ থেকে মাসছয় আগের কথা। এক সন্ধ্যায় আমাদের গ্রামের বাড়ির মসজিদের তরুণ ইমাম সিয়াম আহমেদ বললো, কাকা দ্যাখুন--
--আপনার পায়ের কাছে একটা ছোট্ট মুরগির বাচ্চা আছে। বয়স একমাসেরও কম হবে। সে সম্ভবত তার মাকে হারিয়ে ফেলেছে। মনে হয়, তারা অন্য বাড়ি থেকে আসছিল, ফেরার সময় সে পথ ভুলে এখানে আটকা পড়ে গেছে ।
আমি ভাবছি, মা মুরগিটার হয়তো অনেকগুলো বাচ্চা ছিল। একজন সঙ্গে নেই তা মা-ও বুঝতে পারেনি। আসলে পৃথিবীর তাবৎ প্রাণিকুলে অনেক সন্তানের মা-রা না-কি অপেক্ষাকৃতভাবে খানিকটা উদাসীন হয়।
-- হুজুর জানায়, গত দু'দিন ধরে বারান্দায় রাখা আপনার আড্ডার টেবিলের নিচে সে রাত কাটাচ্ছে। দেখলাম তাই তো, সে চুপটি করে বসে আছে। আমাদের কথাবার্তা শুনছে। খুব বেশি ভয়ও পাচ্ছে না। তার চিন্তা শুধু রাত কাটানো।
বললাম শোন,
-- তার একটা নাম দেওয়া যায়। আজ থেকে একে 'মল্লিকা' বলে ডাকবে। মল্লিকা একটা ফুলের নাম। ওরা রাতে ফোটে আবার খুব সকালেই ঝরে যায়। সে-ও সারাদিন বাইরে থেকে রাতে এসে আশ্রয় নেয়। দিনের বেলায় থাকে না। তা-ই নাম হোক মল্লিকা। আর তাকে কিন্তু যত্ন করো, মাঝেমধ্যে একটু খাবার দিয়ো, তোমার সওয়াব হবে।
হুজুর বেচারা সত্যিই মল্লিকার প্রতি বিশেষ সদয় হলো। এরই মধ্যে মল্লিকাও হুজুরকে বেশ আস্হায় নিয়ে ফেলেছে। হুজুর ডাক দিলেই সে ছুটে আসে, আবার পরক্ষণে বাড়ির উঠানে, আঙিনায় বেরিয়ে পড়ে। হাঁটে, দৌড়ায়, এদিক-ওদিক চোখ রাখে।
বেশকিছু দিন থেকে আমিও লক্ষ করে আসছি, মল্লিকা আমাকেও একটু একটু চিনতে পারছে। সতর্ক হয়ে কাছে আসে, খুব ভয়ও পায়না এমন। আরও লক্ষ করলাম, সে সবসময় দলছুট হয়ে থাকে, উঠানে দৌড়াদৌড়ি করা অসংখ্য মুরগির সাথে তার কোনো সখ্যতা নেই। তাকে কেউ দলে নেয় না। মল্লিকা যেন অচ্যুত, অস্পৃশ্য নিম্নবর্গের কেউ। অন্য বাচ্চাদের সাথে তাদের মা আছে, ভাই-বোন আছে, তারা ঐক্যবদ্ধ। আবার মা'র কড়া নজরদারিতে অবলীলায় বিচরণ করছে। কিন্তু আমাদের আশ্রয়ে থাকা মল্লিকা এতিম অসহায়ের মতন আলাদা থাকে। তার সঙ্গে অন্য মা মুরগিও বিমাতাসুলভ আচরণ করে। কাছে পেলে আঘাত করে, তাড়িয়ে দেয়। তারা ভাবে, তুই এ বাড়িতে কোথায় থেকে আসলে? তোর মা কোথায়? সে লজ্জা পায়, পৃথক হয়ে যায়, অন্যদিকে বিচ্ছিন্ন হয়ে হাঁটে। মাটিতে ঠুকরে খাবার খায়, আনমনে ঘুরে ফিরে। তবে সে নিশ্চয়ই মনে মনে বলে, 'তোমরা এতিম বলে আমাকে যতই অবহেলা করো, আমি কিন্তু তোমাদের চেয়ে ভালো উন্নত ঘরে ঘুমাই'।
২.
দেখতে দেখতে মল্লিকা বড় হয়ে যাচ্ছে। মনে হয় মাসটা যেতেই সে একটুখানি বড় হয়ে ওঠেছে। হুজুর বলে, দ্যাখুন কাকা মুরগির বাচ্চাটি কিন্তু বেশ নাদুসনুদুস হয়ে ওঠেছে। ও কিছু দিনের ভেতর ডিম দিবে। জিজ্ঞেস করে জানি, টেবিলের নিচেই তার আসল আস্তানা। সন্ধ্যার আগে প্রবেশ করে আবার সকালে অন্যরা জাগার পূর্বে সে নিজের অন্ন যোগাড়ে বেরিয়ে পড়ে। তার কোনো চিন্তা নেই, তার খাবার আশেপাশের বাড়ি ঘরের উঠোনে, গাছ তলায়, পুকুর পাড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। আজকাল হুজুরও মাঝেমধ্যে কিছু বাড়তি খাবার দেয়। ফলে তার অন্ন, বাসস্থান আর নিরাপত্তার বিষয়ে তেমন কোনো ঝুঁকি অবশিষ্ট নেই। সেদিন দেখলাম, মল্লিকা বেশ ডাঙ্গর হয়ে গেছে। গায়ের রঙও সুন্দর আকর্ষনীয় দেখাচ্ছে। চোখের সামনে দিয়ে সে সচকিত পায়ে হেঁটে যায়। কখনো হুজুর তাকে ডেকে ফিড জাতীয় সামান্য খাবার ছিটিয়ে দিচ্ছে। সাথে সাথে সে দৌড়ে আসে কিন্তু তার সঙ্গে আরও ক'টা মুরগি চলে আসে। হুজুর বাকিদের তাড়িয়ে দিয়ে শুধু তাকে খাবার দেয়, এতে করে অন্য মুরগিগুলো বেশ ক্ষেপে যাচ্ছে। যদিও সেই মুহূর্তে তারা তাকে কিছু করতে পারছে না। কিন্তু পরে শোধ নিবে।
--বললাম, হুজুর তুমি তো দেখছি, তাকে ক্রমাগত স্বগোত্রীয়দের শত্রুতে পরিণত করছো হে! সে তো এমনিতেই মূল উৎপাটিত এবং একঘরে হয়ে আছে। এর ওপর তাকে অধিক অগ্রাধিকার দিলে এখানকার স্হায়ীরা সংক্ষুব্ধ হবে এটাই স্বাভাবিক।
--হুজুর বললো, জ্বি কাকা, আমাদের মল্লিকাকে সবাই মারে, তার পক্ষে এ বাড়ির কোনো মুরগী নেই । সকলেই হিংসা করে, দলাদলি করে। এমনকি আপনার টেবিলের নিচে বাস করুক এটাও অন্যরা চায় না।
৩.
এবার বাড়িতে গিয়ে দেখি, মল্লিকা দেখতে প্রায় প্রাপ্তবয়স্কা এক মুরগির মতন। সে সারাক্ষণ ডাকাডাকি করছে। টেবিলের নিচে বসতে চাচ্ছে না। ওড়াল দিয়ে এখানে ওখানে বসছে। তার স্থিরতা নেই।
হুজুর বললো, কাকা সে ডিম পারবে, এ জন্যই অন্য একটা নিরাপদ জায়গা খুঁজছে। আমি দোতলার বারান্দায় একটা কার্টনের ভেতরে কিছু খড় বিছিয়ে দিয়েছি, সে ওখানে যাবে।
জিজ্ঞেস করলাম - সে বুঝবে কিভাবে?
-- হুজুর বলে, আমি সঙ্গে নিয়ে একবার দেখিয়ে দিয়েছি। এখন সে ওড়াল দিয়ে দোতলায় ওঠে যায়। গতরাত থেকে মল্লিকা ওখানেই থাকে।
এবার আমি আরও বিস্মিত হলাম। সকাল বেলায় যখন শুনলাম, সে একটা ডিম দিয়েছে। হুজুর হাতে করে এনে আমাকে দেখালো। আহা! কী আনন্দ আমার এবং হুজুরের। পরদিন যথারীতি দুটো ডিম হলো। সন্ধ্যা নেমে আসলে মল্লিকা এখন আর নিচ থেকে সিঁড়ি দিয়ে যায় না, সরাসরি পাখনায় ওড়ে উঠানামা করে। ডিম নিয়েও সারাদিন তার কোনো দুঃশ্চিতা নেই। শতভাগ নিরাপত্তার দায় হুজুরের ওপর ছেড়ে দিয়ে সে দিব্যি খাচ্ছে-দাচ্ছে এমনকি প্রতিবেশীর মোরগের সঙ্গেও সময় কাটাচ্ছে।
৪.
বিপত্তি বাঁধলো গতকাল। আমার এক বন্ধু ঢাকা থেকে সস্ত্রীক বেড়াতে এসেছেন গ্রামে। তাদের থাকতে দিলাম দোতলার একটা কক্ষে। খোলামেলা বাতাসবাহী কক্ষ থাকায় সেটি তাদের জন্য নির্বাচন করা হলো। সন্ধ্যা রাতে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় তারা দু'জন বারান্দায় গিয়ে দেখতে পায়, মল্লিকা আরামে নিদ্রাতুর হয়ে আছে। তার কোনো বিদ্যুৎ, আলো বা বাতাসের প্রয়োজন নেই। সে যে শতভাগ প্রকৃতির সন্তান।
এক পর্যায়ে বন্ধু'র স্ত্রী মিনু মল্লিকাকে আগন্তুক ভেবে সরিয়ে দিলে সে চিৎকার করতে করতে নিচে নেমে আসে। তখন সে শুধু হুজুরকে খুঁজছিল, মূলত নালিশ করার জন্য যে,' আমাকে আপনি কোথায় থাকতে দিলেন যেখানে রাতের বেলায়ও শান্তি নেই'? মল্লিকার আর্ত চিৎকারে হুজুর বেরিয়ে আসলো। এদিকে আমার বন্ধু জামি, হাসি মুখে ডিম দুটো হাতে করে নিয়ে এসে বললো, এই দ্যাখো, বারান্দায় দুটো দেশি জাতের ডিম পেলাম। মুরগিটা পালিয়ে গেছে। এগুলো কিন্তু খুব টেস্টি হয় বুঝলে ? আর সবসময় পাওয়া যায় না।
আমি বললাম, 'আরে এ যে আমাদের মল্লিকার পরবর্তী বংশপরম্পরার এক মহামূল্যবান ধন'। গল্প শুনে বন্ধুটি কিছুক্ষণ বাকরহিত ছিল।
[লেখক: গল্পকার]

আপনার মতামত লিখুন