সংবাদ

পরিবেশবান্ধব যানবাহন টেকসই ভবিষ্যতের চালিকাশক্তি


অমৃত চিছাম
অমৃত চিছাম
প্রকাশ: ৮ নভেম্বর ২০২৬, ০২:৩৬ পিএম

পরিবেশবান্ধব যানবাহন টেকসই ভবিষ্যতের চালিকাশক্তি

আমাদের প্রতিদিনকার জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যানবাহন। সকালে ঘুম থেকে উঠে স্কুল, কলেজ ও বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতের জন্য সিংহভাগ মানুষ নানা ধরনের যানবাহন ব্যবহার করে থাকে। দেশে বিদ্যমান যানবাহনগুলোর মধ্যে বেশির ভাগই জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে সচল থাকে। দেশের সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) দেওয়া তথ্যমতে, দেশের মোট নিবন্ধিত মোটরযানের প্রায় ৫০ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে চলাচল করে। শহরাঞ্চলের বায়ুদূষণের ৪০ শতাংশের বেশি আসে যানবাহন থেকে। আর এই বিপুলসংখ্যক যানবাহনের দূষণ দেশের পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব বিস্তার করে। তবে ভুলে গেলে চলবে না, যানবাহন ছাড়া আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা প্রায় স্থবির হয়ে পড়বে। শুধু যানবাহন ব্যবহার করলেই সবকিছু শেষ হয়ে যায় না, সেই সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষার কথাও ভাবা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশের ক্ষতি করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কথা কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব। লালন ফকিরের বিখ্যাত গানের একটি লাইনের কথা মনে পড়ে গেল, যেখানে তিনি বলেছিলেন—“সময় গেলে সাধন হবে না”। তাই সময় থাকতেই ভবিষ্যতের কথা ভাবা জ্ঞানীর কাজ।

বিশ্বের জলবায়ু পরিস্থিতি দিন দিন সংকটাপন্ন হচ্ছে। জাতিসংঘের দেওয়া তথ্য অনুসারে, বিশ্বের মোট কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের প্রায় ২৩ শতাংশ আসে পরিবহন খাত থেকে। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারে বায়ু ও শব্দদূষণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতাও বাড়ছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যানবাহনের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের ২০২৪ সালের দেওয়া এক তথ্যমতে, ঢাকা শহরের বায়ুদূষণের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে ৩২ শতাংশ আসে জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত যানবাহন থেকে। এই অবস্থায় পরিবেশবান্ধব যানবাহন বা সবুজ যানবাহন হয়ে উঠেছে টেকসই ভবিষ্যতের অপরিহার্য উপাদান। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে।

প্রথমেই সংক্ষেপে জেনে নেওয়া যাক, পরিবেশবান্ধব যানবাহন আসলে কী। পরিবেশবান্ধব যানবাহন হলো এমন সব যানবাহন, যেগুলোর জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ও কারিগরি কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে এগুলোর কার্বন নিঃসরণ অত্যন্ত কম বা শূন্য হয়। এ ধরনের যানবাহন সৌরশক্তি, বিদ্যুৎ, হাইড্রোজেন জ্বালানি কোষ কিংবা জৈব জ্বালানি দ্বারা চালিত হয়। বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) ব্যাটারিচালিত হয় এবং কোনো ধরনের দহনপ্রক্রিয়া ছাড়াই চলে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্যানুসারে, ২০২৪ সালে বিশ্বে বৈদ্যুতিক যানবাহনের সংখ্যা ২ কোটি ৩০ লাখ ছাড়িয়েছে, যা ২০২০ সালের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।

হাইব্রিড যানবাহনে পেট্রোল ও বৈদ্যুতিক মোটর উভয়ই ব্যবহৃত হয়। এটি জ্বালানিসাশ্রয়ী এবং তুলনামূলকভাবে কম দূষণকারী। টয়োটা প্রিয়াসের মতো গাড়ি বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত জনপ্রিয় হাইব্রিড মডেল। আমাদের দেশেও বর্তমানে হাইব্রিড মডেলের যানবাহন ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ব্র্যান্ড হলো—টয়োটা, হোন্ডা, নিসান, মিতসুবিশি, সুবারু, এমজি ও বিএমডব্লিউ। বর্তমানে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় হাইড্রোজেন জ্বালানি কোষচালিত গাড়ির ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী শহুরে যাতায়াতে বৈদ্যুতিক সাইকেল ও স্কুটারের চাহিদাও বাড়ছে। ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী বৈদ্যুতিক সাইকেল বিক্রির পরিমাণ ছিল ৫ কোটি ইউনিট, যা ২০২৮ সালের মধ্যে প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশেও বৈদ্যুতিক সাইকেল ও স্কুটার ব্যবহারকারীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে।

বৈদ্যুতিক বা হাইড্রোজেনচালিত যানবাহন থেকে সরাসরি কোনো ধরনের বায়ুদূষক গ্যাস নির্গত হয় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যমতে, প্রতি বছর বায়ুদূষণজনিত কারণে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়, যার একটি বড় অংশের জন্য দায়ী যানবাহনজনিত দূষণ। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার দেওয়া এক তথ্য অনুসারে, সমমানের পেট্রোলচালিত গাড়ির তুলনায় একটি বৈদ্যুতিক গাড়ি প্রতিবছর ১ দশমিক ৫ থেকে ২ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমাতে পারে। বৈদ্যুতিক গাড়ির পরিচালন ব্যয় প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ২ থেকে ৩ টাকা, যেখানে পেট্রোলচালিত গাড়ির ব্যয় প্রায় ৮ থেকে ১২ টাকা। এর ফলে আমাদের যাতায়াতের দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় অনেকাংশে কমে আসে। এতে ব্যক্তিগত আর্থিক সাশ্রয়ের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বৈদ্যুতিক যানবাহন প্রায় নিঃশব্দে চলে, যা শহরাঞ্চলে শব্দদূষণ হ্রাসে বড় ভূমিকা রাখে। ফলে শব্দদূষণের কারণে সৃষ্ট নানা ধরনের রোগব্যাধিও অনেকটা কমে আসে।

চীন বর্তমানে বৈদ্যুতিক যানবাহন ব্যবহারে সবার শীর্ষে অবস্থান করছে। ২০২৪ সালে বিশ্বের প্রায় ৫৫ শতাংশ বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি হয়েছে শুধু চীনে। নরওয়েতে নতুন নিবন্ধিত গাড়ির ৮০ শতাংশের বেশি এখন বৈদ্যুতিক, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০৩৫ সাল থেকে নতুন জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত গাড়ি বিক্রি নিষিদ্ধ করার মতো সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।

বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার এখনো সীমিত হলেও সম্প্রতি এ খাতে অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। বর্তমানে দেশের রাস্তায় প্রায় ১০ লাখ বৈদ্যুতিক রিকশা ও ইজিবাইক চলছে (বিআরটিসি, ২০২৪)। ঢাকার রাস্তায় পরীক্ষামূলকভাবে বৈদ্যুতিক বাস চালু হয়েছে (বিআরটিসি ও ব্র্যাকের যৌথ প্রকল্পে)। বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে কমপক্ষে ২০ শতাংশ নতুন গাড়ি বৈদ্যুতিক হবে—এমন কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে।

দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশবান্ধব যানবাহন ব্যবহারে বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২০২১ সালের ইউরোপীয় গ্রিন ডিল: ২০৩৫ সালের মধ্যে নতুন পেট্রোল ও ডিজেলচালিত গাড়ি বিক্রিতে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের লক্ষ্যমাত্রা।

জাপানের বৈদ্যুতিক যানবাহন প্রণোদনা নীতি: হাইড্রোজেন জ্বালানি কোষচালিত যানবাহন ও বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য বড় ধরনের সরকারি ভর্তুকি এবং করসুবিধা প্রদান।

যুক্তরাষ্ট্রের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি পরিকল্পনা: বৈদ্যুতিক গাড়ির উন্নয়ন ও ব্যাটারি উৎপাদনে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো।

নরওয়ের বৈদ্যুতিক যানবাহন নীতি: নতুন নিবন্ধিত গাড়ির ৮০ শতাংশের বেশি এখন বৈদ্যুতিক। বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতে নির্দিষ্ট কর ও শুল্ক থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ২০১০: দেশের পরিবেশদূষণ কমাতে যানবাহন থেকে নির্গত দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন বিধান রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবহন নীতি, ২০১৮: পরিবহন খাতে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন ও পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানোর নির্দেশনা রয়েছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতি, ২০১৫: নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব যানবাহন পরিচালনায় উৎসাহ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারের বৈদ্যুতিক যানবাহন প্রণোদনা প্যাকেজ, ২০২৩: বৈদ্যুতিক যানবাহন আমদানিতে শুল্ক কমানো, করছাড় এবং চার্জিং অবকাঠামো নির্মাণে সরকারি সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগ।

ঢাকা শহরে চার্জিং স্টেশন স্থাপনের নীতিমালা: ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে বৈদ্যুতিক যানবাহনের চার্জিং স্টেশন স্থাপন ও উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগ রয়েছে।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বা এসডিজি ১৭টি লক্ষ্য নিয়ে গঠিত। ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্য, পরিবেশদূষণ, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ মানবকল্যাণ নিশ্চিত করাই এর উদ্দেশ্য। পরিবেশবান্ধব যানবাহন এসব লক্ষ্য অর্জনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।

এসডিজি ৩: সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ নিশ্চিত করা

পরিবহন খাতের দূষণ কমিয়ে বায়ুদূষণ হ্রাস করা গেলে শ্বাসতন্ত্র ও হৃদ্‌রোগজনিত অসুস্থতা কমবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করে, যানবাহনের বায়ুদূষণ কমাতে পারলে প্রতিবছর বহু মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব।

এসডিজি ৭: সাশ্রয়ী ও আধুনিক জ্বালানি নিশ্চিত করা

পরিবেশবান্ধব যানবাহন, বিশেষ করে বৈদ্যুতিক যানবাহন, নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে জ্বালানিসাশ্রয় ও উন্নত শক্তি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারে।

এসডিজি ১১: টেকসই শহর ও সম্প্রদায় গঠন

শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণ কমিয়ে পরিবেশবান্ধব যানবাহন শহুরে এলাকাকে বাসযোগ্য ও নিরাপদ করে তোলে।

এসডিজি ১৩: জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্যবস্থা গ্রহণ

জ্বালানি দহনহীন যানবাহন ব্যবহারে কার্বন নিঃসরণ ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহায়ক।

পরিবেশবান্ধব যানবাহন কেবল আধুনিক পরিবহনব্যবস্থার বিকল্প নয়, বরং একটি নিরাপদ, দূষণমুক্ত ও টেকসই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। ক্রমবর্ধমান বায়ুদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, জীবাশ্ম জ্বালানির সীমিত মজুত এবং নগরায়ণের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বৈদ্যুতিক যানবাহন, হাইব্রিড গাড়ি, সৌরশক্তিচালিত যান এবং গণপরিবহনের ব্যবহার বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব যানবাহনের প্রসার ঘটাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, চার্জিং অবকাঠামোর উন্নয়ন, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, কার্যকর নীতিমালা এবং জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি হাঁটা ও সাইকেলবান্ধব নগরব্যবস্থা এবং উন্নত গণপরিবহন নিশ্চিত করতে হবে।

সর্বোপরি, পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার বৃদ্ধি শুধু পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করবে না, বরং জ্বালানি নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আন্তপ্রজন্ম ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই বর্তমান প্রজন্মের সচেতন উদ্যোগ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলাই হোক একটি সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও টেকসই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের অঙ্গীকার। পরিশেষে তাই বলি—“দূষণমুক্ত পরিবহন, সুস্থ জীবন ও সমৃদ্ধির বন্ধন”।

[লেখক: ল্যাবরেটরি অ্যাটেনডেন্ট, এনভায়রনমেন্টাল অর্গানিক কেমিস্ট্রি ল্যাবরেটরি, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কেন্দ্র]

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬


পরিবেশবান্ধব যানবাহন টেকসই ভবিষ্যতের চালিকাশক্তি

প্রকাশের তারিখ : ০৮ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

আমাদের প্রতিদিনকার জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যানবাহন। সকালে ঘুম থেকে উঠে স্কুল, কলেজ ও বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতের জন্য সিংহভাগ মানুষ নানা ধরনের যানবাহন ব্যবহার করে থাকে। দেশে বিদ্যমান যানবাহনগুলোর মধ্যে বেশির ভাগই জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে সচল থাকে। দেশের সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) দেওয়া তথ্যমতে, দেশের মোট নিবন্ধিত মোটরযানের প্রায় ৫০ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে চলাচল করে। শহরাঞ্চলের বায়ুদূষণের ৪০ শতাংশের বেশি আসে যানবাহন থেকে। আর এই বিপুলসংখ্যক যানবাহনের দূষণ দেশের পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব বিস্তার করে। তবে ভুলে গেলে চলবে না, যানবাহন ছাড়া আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা প্রায় স্থবির হয়ে পড়বে। শুধু যানবাহন ব্যবহার করলেই সবকিছু শেষ হয়ে যায় না, সেই সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষার কথাও ভাবা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিবেশের ক্ষতি করে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কথা কল্পনা করা প্রায় অসম্ভব। লালন ফকিরের বিখ্যাত গানের একটি লাইনের কথা মনে পড়ে গেল, যেখানে তিনি বলেছিলেন—“সময় গেলে সাধন হবে না”। তাই সময় থাকতেই ভবিষ্যতের কথা ভাবা জ্ঞানীর কাজ।


বিশ্বের জলবায়ু পরিস্থিতি দিন দিন সংকটাপন্ন হচ্ছে। জাতিসংঘের দেওয়া তথ্য অনুসারে, বিশ্বের মোট কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণের প্রায় ২৩ শতাংশ আসে পরিবহন খাত থেকে। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারে বায়ু ও শব্দদূষণের পাশাপাশি অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতাও বাড়ছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যানবাহনের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের ২০২৪ সালের দেওয়া এক তথ্যমতে, ঢাকা শহরের বায়ুদূষণের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে ৩২ শতাংশ আসে জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত যানবাহন থেকে। এই অবস্থায় পরিবেশবান্ধব যানবাহন বা সবুজ যানবাহন হয়ে উঠেছে টেকসই ভবিষ্যতের অপরিহার্য উপাদান। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার অতীব জরুরি হয়ে পড়েছে।


প্রথমেই সংক্ষেপে জেনে নেওয়া যাক, পরিবেশবান্ধব যানবাহন আসলে কী। পরিবেশবান্ধব যানবাহন হলো এমন সব যানবাহন, যেগুলোর জ্বালানি ব্যবস্থাপনা ও কারিগরি কাঠামো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে এগুলোর কার্বন নিঃসরণ অত্যন্ত কম বা শূন্য হয়। এ ধরনের যানবাহন সৌরশক্তি, বিদ্যুৎ, হাইড্রোজেন জ্বালানি কোষ কিংবা জৈব জ্বালানি দ্বারা চালিত হয়। বৈদ্যুতিক যানবাহন (ইভি) ব্যাটারিচালিত হয় এবং কোনো ধরনের দহনপ্রক্রিয়া ছাড়াই চলে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) তথ্যানুসারে, ২০২৪ সালে বিশ্বে বৈদ্যুতিক যানবাহনের সংখ্যা ২ কোটি ৩০ লাখ ছাড়িয়েছে, যা ২০২০ সালের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।


হাইব্রিড যানবাহনে পেট্রোল ও বৈদ্যুতিক মোটর উভয়ই ব্যবহৃত হয়। এটি জ্বালানিসাশ্রয়ী এবং তুলনামূলকভাবে কম দূষণকারী। টয়োটা প্রিয়াসের মতো গাড়ি বিশ্বব্যাপী অত্যন্ত জনপ্রিয় হাইব্রিড মডেল। আমাদের দেশেও বর্তমানে হাইব্রিড মডেলের যানবাহন ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ব্র্যান্ড হলো—টয়োটা, হোন্ডা, নিসান, মিতসুবিশি, সুবারু, এমজি ও বিএমডব্লিউ। বর্তমানে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় হাইড্রোজেন জ্বালানি কোষচালিত গাড়ির ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী শহুরে যাতায়াতে বৈদ্যুতিক সাইকেল ও স্কুটারের চাহিদাও বাড়ছে। ২০২৪ সালে বিশ্বব্যাপী বৈদ্যুতিক সাইকেল বিক্রির পরিমাণ ছিল ৫ কোটি ইউনিট, যা ২০২৮ সালের মধ্যে প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশেও বৈদ্যুতিক সাইকেল ও স্কুটার ব্যবহারকারীর সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে।


বৈদ্যুতিক বা হাইড্রোজেনচালিত যানবাহন থেকে সরাসরি কোনো ধরনের বায়ুদূষক গ্যাস নির্গত হয় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্যমতে, প্রতি বছর বায়ুদূষণজনিত কারণে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ প্রাণ হারায়, যার একটি বড় অংশের জন্য দায়ী যানবাহনজনিত দূষণ। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার দেওয়া এক তথ্য অনুসারে, সমমানের পেট্রোলচালিত গাড়ির তুলনায় একটি বৈদ্যুতিক গাড়ি প্রতিবছর ১ দশমিক ৫ থেকে ২ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমাতে পারে। বৈদ্যুতিক গাড়ির পরিচালন ব্যয় প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ২ থেকে ৩ টাকা, যেখানে পেট্রোলচালিত গাড়ির ব্যয় প্রায় ৮ থেকে ১২ টাকা। এর ফলে আমাদের যাতায়াতের দীর্ঘমেয়াদি ব্যয় অনেকাংশে কমে আসে। এতে ব্যক্তিগত আর্থিক সাশ্রয়ের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। বৈদ্যুতিক যানবাহন প্রায় নিঃশব্দে চলে, যা শহরাঞ্চলে শব্দদূষণ হ্রাসে বড় ভূমিকা রাখে। ফলে শব্দদূষণের কারণে সৃষ্ট নানা ধরনের রোগব্যাধিও অনেকটা কমে আসে।


চীন বর্তমানে বৈদ্যুতিক যানবাহন ব্যবহারে সবার শীর্ষে অবস্থান করছে। ২০২৪ সালে বিশ্বের প্রায় ৫৫ শতাংশ বৈদ্যুতিক গাড়ি বিক্রি হয়েছে শুধু চীনে। নরওয়েতে নতুন নিবন্ধিত গাড়ির ৮০ শতাংশের বেশি এখন বৈদ্যুতিক, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০৩৫ সাল থেকে নতুন জীবাশ্ম জ্বালানিচালিত গাড়ি বিক্রি নিষিদ্ধ করার মতো সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।


বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার এখনো সীমিত হলেও সম্প্রতি এ খাতে অগ্রগতি লক্ষ করা যাচ্ছে। বর্তমানে দেশের রাস্তায় প্রায় ১০ লাখ বৈদ্যুতিক রিকশা ও ইজিবাইক চলছে (বিআরটিসি, ২০২৪)। ঢাকার রাস্তায় পরীক্ষামূলকভাবে বৈদ্যুতিক বাস চালু হয়েছে (বিআরটিসি ও ব্র্যাকের যৌথ প্রকল্পে)। বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে কমপক্ষে ২০ শতাংশ নতুন গাড়ি বৈদ্যুতিক হবে—এমন কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে।


দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিবেশবান্ধব যানবাহন ব্যবহারে বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—


ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২০২১ সালের ইউরোপীয় গ্রিন ডিল: ২০৩৫ সালের মধ্যে নতুন পেট্রোল ও ডিজেলচালিত গাড়ি বিক্রিতে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের লক্ষ্যমাত্রা।


জাপানের বৈদ্যুতিক যানবাহন প্রণোদনা নীতি: হাইড্রোজেন জ্বালানি কোষচালিত যানবাহন ও বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য বড় ধরনের সরকারি ভর্তুকি এবং করসুবিধা প্রদান।


যুক্তরাষ্ট্রের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি পরিকল্পনা: বৈদ্যুতিক গাড়ির উন্নয়ন ও ব্যাটারি উৎপাদনে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো।


নরওয়ের বৈদ্যুতিক যানবাহন নীতি: নতুন নিবন্ধিত গাড়ির ৮০ শতাংশের বেশি এখন বৈদ্যুতিক। বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বাড়াতে নির্দিষ্ট কর ও শুল্ক থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।


পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ২০১০: দেশের পরিবেশদূষণ কমাতে যানবাহন থেকে নির্গত দূষণ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন বিধান রয়েছে।


বাংলাদেশ পরিবহন নীতি, ২০১৮: পরিবহন খাতে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন ও পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার বাড়ানোর নির্দেশনা রয়েছে।


বিদ্যুৎ ও জ্বালানি নীতি, ২০১৫: নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস ব্যবহার করে পরিবেশবান্ধব যানবাহন পরিচালনায় উৎসাহ দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।


বাংলাদেশ সরকারের বৈদ্যুতিক যানবাহন প্রণোদনা প্যাকেজ, ২০২৩: বৈদ্যুতিক যানবাহন আমদানিতে শুল্ক কমানো, করছাড় এবং চার্জিং অবকাঠামো নির্মাণে সরকারি সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগ।


ঢাকা শহরে চার্জিং স্টেশন স্থাপনের নীতিমালা: ঢাকা শহরের বিভিন্ন স্থানে বৈদ্যুতিক যানবাহনের চার্জিং স্টেশন স্থাপন ও উন্নয়নে সরকারি উদ্যোগ রয়েছে।


জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বা এসডিজি ১৭টি লক্ষ্য নিয়ে গঠিত। ২০৩০ সালের মধ্যে দারিদ্র্য, পরিবেশদূষণ, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ মানবকল্যাণ নিশ্চিত করাই এর উদ্দেশ্য। পরিবেশবান্ধব যানবাহন এসব লক্ষ্য অর্জনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে।


এসডিজি ৩: সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ নিশ্চিত করা


পরিবহন খাতের দূষণ কমিয়ে বায়ুদূষণ হ্রাস করা গেলে শ্বাসতন্ত্র ও হৃদ্‌রোগজনিত অসুস্থতা কমবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করে, যানবাহনের বায়ুদূষণ কমাতে পারলে প্রতিবছর বহু মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব।


এসডিজি ৭: সাশ্রয়ী ও আধুনিক জ্বালানি নিশ্চিত করা


পরিবেশবান্ধব যানবাহন, বিশেষ করে বৈদ্যুতিক যানবাহন, নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে জ্বালানিসাশ্রয় ও উন্নত শক্তি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারে।


এসডিজি ১১: টেকসই শহর ও সম্প্রদায় গঠন


শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণ কমিয়ে পরিবেশবান্ধব যানবাহন শহুরে এলাকাকে বাসযোগ্য ও নিরাপদ করে তোলে।


এসডিজি ১৩: জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্যবস্থা গ্রহণ


জ্বালানি দহনহীন যানবাহন ব্যবহারে কার্বন নিঃসরণ ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সহায়ক।


পরিবেশবান্ধব যানবাহন কেবল আধুনিক পরিবহনব্যবস্থার বিকল্প নয়, বরং একটি নিরাপদ, দূষণমুক্ত ও টেকসই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। ক্রমবর্ধমান বায়ুদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, জীবাশ্ম জ্বালানির সীমিত মজুত এবং নগরায়ণের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বৈদ্যুতিক যানবাহন, হাইব্রিড গাড়ি, সৌরশক্তিচালিত যান এবং গণপরিবহনের ব্যবহার বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব যানবাহনের প্রসার ঘটাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, চার্জিং অবকাঠামোর উন্নয়ন, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন, কার্যকর নীতিমালা এবং জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি হাঁটা ও সাইকেলবান্ধব নগরব্যবস্থা এবং উন্নত গণপরিবহন নিশ্চিত করতে হবে।


সর্বোপরি, পরিবেশবান্ধব যানবাহনের ব্যবহার বৃদ্ধি শুধু পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করবে না, বরং জ্বালানি নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং আন্তপ্রজন্ম ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তাই বর্তমান প্রজন্মের সচেতন উদ্যোগ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলাই হোক একটি সবুজ, পরিচ্ছন্ন ও টেকসই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণের অঙ্গীকার। পরিশেষে তাই বলি—“দূষণমুক্ত পরিবহন, সুস্থ জীবন ও সমৃদ্ধির বন্ধন”।


[লেখক: ল্যাবরেটরি অ্যাটেনডেন্ট, এনভায়রনমেন্টাল অর্গানিক কেমিস্ট্রি ল্যাবরেটরি, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কেন্দ্র]


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত