মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সামরিক সংঘাত, আঞ্চলিক নিরাপত্তাহীনতা এবং আন্তর্জাতিক ভিসা প্রক্রিয়ার নানা জটিলতায় একের পর এক চরম বাধার মুখে পড়ছে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাত। একদিকে যুদ্ধের উত্তাপে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারগুলোতে নতুন কর্মী নিয়োগের গতি আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে, অন্যদিকে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে যাওয়ার অনুমতি পেয়েও ভিসা, কনসুলার জটিলতা ও বিমান চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় আটকে গেছেন হাজার হাজার প্রবাসী ও গমনেচ্ছুক কর্মী।
ছুটিতে দেশে এসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ায় কর্মস্থলে ফিরতে না পারার অভিযোগ যেমন বাড়ছে, তেমনই ইউরোপের বিভিন্ন দেশের কাজের অনুমতিপত্র (ওয়ার্ক পারমিট) পেয়েও ভারতীয় ভিসার জটিলতায় পাসপোর্ট জমা দিতে না পেরে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন অনেকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সৌদি আরবের নিরাপত্তাসংকট ও ফ্লাইট চলাচলে ঘন ঘন বিঘ্ন ঘটার ঘটনা।
সব মিলিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি চাকরি হারানো, নিয়োগ বাতিল, চরম আর্থিক ক্ষতি এবং দেশে ফিরে আসার শঙ্কা বাড়ছে। অথচ এই মুহূর্তে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) ঊর্ধ্বমুখী। তবে অর্থনীতির এই আপাত স্বস্তির আড়ালে নতুন কর্মী যাওয়ার ধারাবাহিক পতন ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবাহের গতি ধরে রাখা নিয়ে গুরুতর সংশয় তৈরি করেছে।
জনশক্তি রফতানিতে পিছিয়ে চট্টগ্রাম, তবে রেমিট্যান্সে শীর্ষে
জনশক্তি রফতানিতে চট্টগ্রাম একসময় দেশের শীর্ষ অগ্রগামী জেলাগুলোর একটি হলেও সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে সেখানে বড় ধস লক্ষ্য করা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের প্রবাসী পরিবারগুলোর বিস্তৃত যোগাযোগ ও নেটওয়ার্ক থাকলেও এখন হিসাব-নিকাশ পাল্টে গেছে। কর্মী পাঠানোর হারে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুরের মতো প্রতিবেশী জেলাগুলোর তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম।
অবশ্য প্রবাসী আয় প্রবাহের ক্ষেত্রে এখনো দেশের অন্যতম শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছে চট্টগ্রাম। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কেবল চট্টগ্রাম জেলায় ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয় এসেছে ৩ দশমিক ২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই এসেছে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার। তবে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে জেলাটির বৈদেশিক কর্মসংস্থান দিনে দিনে কমছে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলা থেকে ৮৭ হাজার ৫২৪ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। একই সময়ে কুমিল্লা থেকে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৩৩ জন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ১ লাখ ৪২ হাজার ৩৩৮ জন কর্মী বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন।
বিএমইটির কর্মকর্তারা জানান, নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ, সব ধরনের পেশায় যুক্ত হওয়ার অনিচ্ছা এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাওয়ায় চট্টগ্রাম থেকে বিদেশে যাওয়ার ঝোঁক কিছুটা কমেছে। পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে নিয়োগ ব্যয় বৃদ্ধি, দক্ষতার ঘাটতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতাও এর প্রধান কারণ।
প্রবাসী আয়ের স্বস্তি ও জাতীয় চিত্র
২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট প্রবাসী আয় এসেছিল প্রায় ৩৫ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার একটি বড় অংশ এসেছে চট্টগ্রামের ব্যাংক শাখাগুলোর মাধ্যমে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের জেলাভিত্তিক চিত্র বিশ্লেষণ করলেও একই ধারাবাহিকতা দেখা যায়। জুলাইয়ে চট্টগ্রাম জেলায় প্রবাসী আয় এসেছে ২০১ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার, আগস্টে ১৯৯ দশমিক ৯ মিলিয়ন এবং সেপ্টেম্বরে ১৯৬ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রথম প্রান্তিকে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৫৮১ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার।
তবে মুদ্রার অন্য পিঠটি বেশ উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘মান্থলি ইকোনমিক ট্রেন্ডস, সেপ্টেম্বর ২০২৬’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বিদেশে যাওয়া কর্মীর সংখ্যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ কমে গেছে। গত এপ্রিলে শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অভিঘাতে গত মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে বিদেশে গিয়েছেন ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৩৬ জন বাংলাদেশি কর্মী; যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ছিল ২ লাখ ৬০ হাজার ৪৩৮ জন। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে কর্মী যাওয়ার হার অর্ধেকে নেমে এসেছে।
সৌদি শ্রমবাজারে ধাক্কা ও ভিসা জটিলতা
সৌদি আরবে বর্তমানে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি বসবাস করছেন। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে কেবল সৌদি আরব থেকেই এসেছে ১ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স; যা মোট রেমিট্যান্সের ১৯ দশমিক ২ শতাংশ। বায়রার (বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ) একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হলে কেবল কর্মসংস্থান নয়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও তার মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের বিমানবন্দরগুলোতে ফ্লাইট পরিচালনা ব্যাহত হওয়ায় নতুন কর্মীদের যোগদান এবং ছুটিতে আসা কর্মীদের ফেরত যাওয়া ঝুলে গেছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়ছেন হাজার হাজার প্রবাসী। একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতে শান্তিকালীন সময়ে ছুটিতে এসে প্রায় সাড়ে চার হাজার বাংলাদেশির ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাওয়ার মতো অভিযোগ উঠেছে।
ইউরোপের ভিসা দীর্ঘসূত্রতা
শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউরোপে কাজ পাওয়া কর্মীদের ভাগ্যও এখন অনিশ্চিত। ভারতে অবস্থিত ইউরোপীয় দেশগুলোর দূতাবাস ও ভিএফএস কেন্দ্রে গিয়ে সরাসরি সাক্ষাৎকার বা পাসপোর্ট জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু ভারতীয় ভিসা পাওয়ার সুযোগ সীমিত থাকায় নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে পৌঁছাতে না পেরে অনেকের ভিসার মেয়াদই উত্তীর্ণ হয়ে যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করে বলছেন, বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বৃদ্ধি ও সরকারের প্রণোদনার কারণে আপাতত রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও নতুন কর্মী যাওয়ার পথ দীর্ঘমেয়াদে রুদ্ধ থাকলে এই প্রবাহ বেশিদিন ধরে রাখা সম্ভব হবে না। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে কর্মী ফেরত আসার যে পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তা সামাল দিতে এখন থেকেই নতুন নতুন বিকল্প শ্রমবাজার খোঁজা এবং বিদ্যমান আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনা জোরদার করা জরুরি।

বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ অক্টোবর ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সামরিক সংঘাত, আঞ্চলিক নিরাপত্তাহীনতা এবং আন্তর্জাতিক ভিসা প্রক্রিয়ার নানা জটিলতায় একের পর এক চরম বাধার মুখে পড়ছে বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাত। একদিকে যুদ্ধের উত্তাপে মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারগুলোতে নতুন কর্মী নিয়োগের গতি আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে, অন্যদিকে ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে যাওয়ার অনুমতি পেয়েও ভিসা, কনসুলার জটিলতা ও বিমান চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় আটকে গেছেন হাজার হাজার প্রবাসী ও গমনেচ্ছুক কর্মী।
ছুটিতে দেশে এসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ায় কর্মস্থলে ফিরতে না পারার অভিযোগ যেমন বাড়ছে, তেমনই ইউরোপের বিভিন্ন দেশের কাজের অনুমতিপত্র (ওয়ার্ক পারমিট) পেয়েও ভারতীয় ভিসার জটিলতায় পাসপোর্ট জমা দিতে না পেরে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন অনেকে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সৌদি আরবের নিরাপত্তাসংকট ও ফ্লাইট চলাচলে ঘন ঘন বিঘ্ন ঘটার ঘটনা।
সব মিলিয়ে বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি চাকরি হারানো, নিয়োগ বাতিল, চরম আর্থিক ক্ষতি এবং দেশে ফিরে আসার শঙ্কা বাড়ছে। অথচ এই মুহূর্তে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) ঊর্ধ্বমুখী। তবে অর্থনীতির এই আপাত স্বস্তির আড়ালে নতুন কর্মী যাওয়ার ধারাবাহিক পতন ভবিষ্যতে রেমিট্যান্স প্রবাহের গতি ধরে রাখা নিয়ে গুরুতর সংশয় তৈরি করেছে।
জনশক্তি রফতানিতে পিছিয়ে চট্টগ্রাম, তবে রেমিট্যান্সে শীর্ষে
জনশক্তি রফতানিতে চট্টগ্রাম একসময় দেশের শীর্ষ অগ্রগামী জেলাগুলোর একটি হলেও সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে সেখানে বড় ধস লক্ষ্য করা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে চট্টগ্রামের প্রবাসী পরিবারগুলোর বিস্তৃত যোগাযোগ ও নেটওয়ার্ক থাকলেও এখন হিসাব-নিকাশ পাল্টে গেছে। কর্মী পাঠানোর হারে কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুরের মতো প্রতিবেশী জেলাগুলোর তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম।
অবশ্য প্রবাসী আয় প্রবাহের ক্ষেত্রে এখনো দেশের অন্যতম শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছে চট্টগ্রাম। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কেবল চট্টগ্রাম জেলায় ব্যাংকিং চ্যানেলে প্রবাসী আয় এসেছে ৩ দশমিক ২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আর চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই এসেছে প্রায় ৬০০ মিলিয়ন ডলার। তবে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতির কারণে জেলাটির বৈদেশিক কর্মসংস্থান দিনে দিনে কমছে।
জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মে পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলা থেকে ৮৭ হাজার ৫২৪ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। একই সময়ে কুমিল্লা থেকে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৩৩ জন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ১ লাখ ৪২ হাজার ৩৩৮ জন কর্মী বিদেশে পাড়ি জমিয়েছেন।
বিএমইটির কর্মকর্তারা জানান, নির্দিষ্ট কয়েকটি দেশের প্রতি অতিরিক্ত আগ্রহ, সব ধরনের পেশায় যুক্ত হওয়ার অনিচ্ছা এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাওয়ায় চট্টগ্রাম থেকে বিদেশে যাওয়ার ঝোঁক কিছুটা কমেছে। পাশাপাশি বিশ্বজুড়ে নিয়োগ ব্যয় বৃদ্ধি, দক্ষতার ঘাটতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক অস্থিরতাও এর প্রধান কারণ।
প্রবাসী আয়ের স্বস্তি ও জাতীয় চিত্র
২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে মোট প্রবাসী আয় এসেছিল প্রায় ৩৫ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার একটি বড় অংশ এসেছে চট্টগ্রামের ব্যাংক শাখাগুলোর মাধ্যমে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের জেলাভিত্তিক চিত্র বিশ্লেষণ করলেও একই ধারাবাহিকতা দেখা যায়। জুলাইয়ে চট্টগ্রাম জেলায় প্রবাসী আয় এসেছে ২০১ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলার, আগস্টে ১৯৯ দশমিক ৯ মিলিয়ন এবং সেপ্টেম্বরে ১৯৬ দশমিক ৪ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রথম প্রান্তিকে মোট রেমিট্যান্স এসেছে ৫৮১ দশমিক ১ মিলিয়ন ডলার।
তবে মুদ্রার অন্য পিঠটি বেশ উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘মান্থলি ইকোনমিক ট্রেন্ডস, সেপ্টেম্বর ২০২৬’ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বিদেশে যাওয়া কর্মীর সংখ্যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ কমে গেছে। গত এপ্রিলে শুরু হওয়া মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অভিঘাতে গত মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে বিদেশে গিয়েছেন ১ লাখ ২৩ হাজার ৬৩৬ জন বাংলাদেশি কর্মী; যা ২০২৫ সালের একই সময়ে ছিল ২ লাখ ৬০ হাজার ৪৩৮ জন। অর্থাৎ মাত্র এক বছরের ব্যবধানে কর্মী যাওয়ার হার অর্ধেকে নেমে এসেছে।
সৌদি শ্রমবাজারে ধাক্কা ও ভিসা জটিলতা
সৌদি আরবে বর্তমানে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি বসবাস করছেন। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে কেবল সৌদি আরব থেকেই এসেছে ১ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স; যা মোট রেমিট্যান্সের ১৯ দশমিক ২ শতাংশ। বায়রার (বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ) একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ বা রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হলে কেবল কর্মসংস্থান নয়, দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও তার মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের বিমানবন্দরগুলোতে ফ্লাইট পরিচালনা ব্যাহত হওয়ায় নতুন কর্মীদের যোগদান এবং ছুটিতে আসা কর্মীদের ফেরত যাওয়া ঝুলে গেছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়ছেন হাজার হাজার প্রবাসী। একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতে শান্তিকালীন সময়ে ছুটিতে এসে প্রায় সাড়ে চার হাজার বাংলাদেশির ভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাওয়ার মতো অভিযোগ উঠেছে।
ইউরোপের ভিসা দীর্ঘসূত্রতা
শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, ইউরোপে কাজ পাওয়া কর্মীদের ভাগ্যও এখন অনিশ্চিত। ভারতে অবস্থিত ইউরোপীয় দেশগুলোর দূতাবাস ও ভিএফএস কেন্দ্রে গিয়ে সরাসরি সাক্ষাৎকার বা পাসপোর্ট জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু ভারতীয় ভিসা পাওয়ার সুযোগ সীমিত থাকায় নির্দিষ্ট সময়ে সেখানে পৌঁছাতে না পেরে অনেকের ভিসার মেয়াদই উত্তীর্ণ হয়ে যাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করে বলছেন, বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর প্রবণতা বৃদ্ধি ও সরকারের প্রণোদনার কারণে আপাতত রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি দেখা গেলেও নতুন কর্মী যাওয়ার পথ দীর্ঘমেয়াদে রুদ্ধ থাকলে এই প্রবাহ বেশিদিন ধরে রাখা সম্ভব হবে না। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে কর্মী ফেরত আসার যে পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, তা সামাল দিতে এখন থেকেই নতুন নতুন বিকল্প শ্রমবাজার খোঁজা এবং বিদ্যমান আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক আলোচনা জোরদার করা জরুরি।

আপনার মতামত লিখুন