মঞ্চ নাটকের দর্শক তৈরিতে বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে অনন্য ভূমিকা রেখে চলা লোকনাট্য দলের জনপ্রিয় প্রযোজনা ‘কঞ্জুস’ এখন আটশোঁতম মঞ্চায়নের মাইলফলকের অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থান করছে।
ঢাকার ৪১৬ বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের আয়োজনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মূল হলে সম্প্রতি নাটকটির ৭৯৮তম প্রদর্শনী মঞ্চস্থ হয়েছে। আর মাত্র দুটি প্রদর্শনী সম্পন্ন হলেই চার দশকের দীর্ঘ যাত্রায় নাটকটি ৮০০তম মঞ্চায়নের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করবে। ১৯৮৭ সালে যাত্রা শুরু করা এই হাস্যরসাত্মক প্রযোজনাটি দীর্ঘ সময় ধরে দর্শকদের মনে সমানভাবে নিজেদের জনপ্রিয়তার ধারা বজায় রেখেছে।
ফরাসি নাট্যকার মলিয়েরের বিখ্যাত নাটক ‘দ্য মাইজার’ অবলম্বনে নাটকটির রূপান্তর করেছেন বিশিষ্ট নাট্যজন তারিক আনাম খান এবং এর নির্দেশনা দিয়েছেন কামরুন নূর চৌধুরী। নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র হাড়কিপ্টে স্বভাবের হায়দার আলী খানের ভূমিকায় অত্যন্ত সাবলীল অভিনয় করেছেন অভিজ্ঞ অভিনেতা আবদুল্লাহ আল হারুন। তার মঞ্চের প্রাণবন্ত উপস্থিতি এবং সংলাপ বলার ভঙ্গি দীর্ঘদিনের মঞ্চ-অভিজ্ঞতার পরিপক্বতার পরিচয় বহন করে।
নাটকের মূল কাহিনী এগিয়েছে হায়দার আলীর ছেলে কাযিম আলী খান এবং মেয়ে লাইলি বেগমকে কেন্দ্র করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বদিউজ্জামান ওরফে বদি মিয়ার মজার প্রেমকাহিনি, যিনি সমুদ্র ভ্রমণে লাইলির প্রেমে পড়ে শেষ পর্যন্ত হায়দার আলীর খাস চাকর হিসেবে কাজ শুরু করেন।
অন্যদিকে পাশের বাড়ির মর্জিনা বেগমের সঙ্গে কাযিমের প্রেমের সম্পর্ক যখন তুঙ্গে, ঠিক সেই মুহূর্তে কৃপণ বাবা হায়দার আলীর চোখ পড়ে মর্জিনার ওপর। ঘটক গোলাপজানের মধ্যস্থতায় পরবর্তীতে লাইলির সঙ্গে হায়দার আলীর বিয়ের কথাবার্তাও এগোতে থাকে।
এই পারিবারিক জটিল ও হাস্যরসাত্মক নানা টানাপোড়েনই নাটকটির মূল গল্পকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। নাটকটিতে ঘটকের চরিত্রে অভিনয় করা সামসাদ বেগম একাই পাঁচশোর বেশি প্রদর্শনীতে একই ভূমিকায় অভিনয় করে এক অনন্য রেকর্ড গড়েছেন।
প্রধান চরিত্রের শিল্পীদের পাশাপাশি সহযোগী চরিত্রের কুশলীরাও তাদের চমৎকার অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন। প্রতিটি দৃশ্যের নিখুঁত উপস্থাপন এবং কোরিওগ্রাফির মুনশিয়ানা দর্শকদের বারবার হাততালি দিতে বাধ্য করে। নাটকের সংলাপের ভাষা সহজ ও সাবলীল হলেও এর রচনাশৈলী একে দারুণ আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
বিশেষ করে পুরোনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ‘ঢাকাইয়া’ ভাষা ও সংস্কৃতির জীবন্ত চিত্রায়ন নাটকটিতে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। মঞ্চসজ্জা, নৃত্য, আলোকসজ্জা, পোশাক, সংগীত ও রূপসজ্জার সুনিপুণ সমন্বয়ে পুরো পরিবেশটি একটি প্রাণবন্ত নাট্য-আবহ তৈরি করে।
বাংলাদেশে মঞ্চ নাটকের দর্শক সৃষ্টিতে ‘কঞ্জুস’ নাটকটি এক বিরাট ভূমিকা পালন করে আসছে। একবার যিনি নাটকটি উপভোগ করেন, তিনি পরবর্তীতে নিজের পাড়া-প্রতিবেশী ও বন্ধুবান্ধবদেরও সঙ্গে নিয়ে আসার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এভাবেই মুখে মুখে প্রচারের মাধ্যমে নাটকটি একটি বিশাল দর্শকসমাজ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যাদের অনেকের জন্যই মঞ্চনাটকের সঙ্গে এটিই প্রথম পরিচয়।
কেবল রাজধানী ঢাকাতেই নয়, বরং দেশের বিভিন্ন জেলা এবং পৃথিবীর নানা দেশেও সফলভাবে প্রদর্শিত হয়েছে নাটকটি। দেশ ও বিদেশের দর্শকের কাছে এর এই ধারাবাহিক গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে যে হাসির কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই।
নাটক শেষ হওয়ার পর দর্শকদের মুখে তৃপ্তির ছাপ স্পষ্ট ফুটে ওঠে। কিছু দৃশ্যে অভিনেতাদের আবেগের প্রকাশ সামান্য বেশি মনে হলেও নাটকের সার্বিক নান্দনিক আবেদন তাতে একটুও ম্লান হয় না। নির্দেশক ও নাট্যকর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সব কলাকুশলীর আন্তরিক নিষ্ঠার ফলেই প্রতিটি দৃশ্যের নিখুঁত উপস্থাপন আজ সম্ভব হয়েছে।
চার দশক পেরিয়ে এসেও ৭৯৮তম মঞ্চায়নে নাটকটির এভাবে দর্শকের মন জয় করতে পারা বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের ইতিহাসে এক বিরল অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ঢাকার ৪১৬ বছর পূর্তির এই আয়োজনে ‘কঞ্জুস’ কেবল একটি নাটক উপভোগ করার মাধ্যম ছিল না, বরং দেশের সমৃদ্ধ নাট্যচর্চার ঐতিহ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগও তৈরি করেছিল।

সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ অক্টোবর ২০২৬
মঞ্চ নাটকের দর্শক তৈরিতে বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনে অনন্য ভূমিকা রেখে চলা লোকনাট্য দলের জনপ্রিয় প্রযোজনা ‘কঞ্জুস’ এখন আটশোঁতম মঞ্চায়নের মাইলফলকের অত্যন্ত কাছাকাছি অবস্থান করছে।
ঢাকার ৪১৬ বছর পূর্তি উপলক্ষে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের আয়োজনে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মূল হলে সম্প্রতি নাটকটির ৭৯৮তম প্রদর্শনী মঞ্চস্থ হয়েছে। আর মাত্র দুটি প্রদর্শনী সম্পন্ন হলেই চার দশকের দীর্ঘ যাত্রায় নাটকটি ৮০০তম মঞ্চায়নের এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করবে। ১৯৮৭ সালে যাত্রা শুরু করা এই হাস্যরসাত্মক প্রযোজনাটি দীর্ঘ সময় ধরে দর্শকদের মনে সমানভাবে নিজেদের জনপ্রিয়তার ধারা বজায় রেখেছে।
ফরাসি নাট্যকার মলিয়েরের বিখ্যাত নাটক ‘দ্য মাইজার’ অবলম্বনে নাটকটির রূপান্তর করেছেন বিশিষ্ট নাট্যজন তারিক আনাম খান এবং এর নির্দেশনা দিয়েছেন কামরুন নূর চৌধুরী। নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্র হাড়কিপ্টে স্বভাবের হায়দার আলী খানের ভূমিকায় অত্যন্ত সাবলীল অভিনয় করেছেন অভিজ্ঞ অভিনেতা আবদুল্লাহ আল হারুন। তার মঞ্চের প্রাণবন্ত উপস্থিতি এবং সংলাপ বলার ভঙ্গি দীর্ঘদিনের মঞ্চ-অভিজ্ঞতার পরিপক্বতার পরিচয় বহন করে।
নাটকের মূল কাহিনী এগিয়েছে হায়দার আলীর ছেলে কাযিম আলী খান এবং মেয়ে লাইলি বেগমকে কেন্দ্র করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বদিউজ্জামান ওরফে বদি মিয়ার মজার প্রেমকাহিনি, যিনি সমুদ্র ভ্রমণে লাইলির প্রেমে পড়ে শেষ পর্যন্ত হায়দার আলীর খাস চাকর হিসেবে কাজ শুরু করেন।
অন্যদিকে পাশের বাড়ির মর্জিনা বেগমের সঙ্গে কাযিমের প্রেমের সম্পর্ক যখন তুঙ্গে, ঠিক সেই মুহূর্তে কৃপণ বাবা হায়দার আলীর চোখ পড়ে মর্জিনার ওপর। ঘটক গোলাপজানের মধ্যস্থতায় পরবর্তীতে লাইলির সঙ্গে হায়দার আলীর বিয়ের কথাবার্তাও এগোতে থাকে।
এই পারিবারিক জটিল ও হাস্যরসাত্মক নানা টানাপোড়েনই নাটকটির মূল গল্পকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। নাটকটিতে ঘটকের চরিত্রে অভিনয় করা সামসাদ বেগম একাই পাঁচশোর বেশি প্রদর্শনীতে একই ভূমিকায় অভিনয় করে এক অনন্য রেকর্ড গড়েছেন।
প্রধান চরিত্রের শিল্পীদের পাশাপাশি সহযোগী চরিত্রের কুশলীরাও তাদের চমৎকার অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করেছেন। প্রতিটি দৃশ্যের নিখুঁত উপস্থাপন এবং কোরিওগ্রাফির মুনশিয়ানা দর্শকদের বারবার হাততালি দিতে বাধ্য করে। নাটকের সংলাপের ভাষা সহজ ও সাবলীল হলেও এর রচনাশৈলী একে দারুণ আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
বিশেষ করে পুরোনো ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ‘ঢাকাইয়া’ ভাষা ও সংস্কৃতির জীবন্ত চিত্রায়ন নাটকটিতে এক ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। মঞ্চসজ্জা, নৃত্য, আলোকসজ্জা, পোশাক, সংগীত ও রূপসজ্জার সুনিপুণ সমন্বয়ে পুরো পরিবেশটি একটি প্রাণবন্ত নাট্য-আবহ তৈরি করে।
বাংলাদেশে মঞ্চ নাটকের দর্শক সৃষ্টিতে ‘কঞ্জুস’ নাটকটি এক বিরাট ভূমিকা পালন করে আসছে। একবার যিনি নাটকটি উপভোগ করেন, তিনি পরবর্তীতে নিজের পাড়া-প্রতিবেশী ও বন্ধুবান্ধবদেরও সঙ্গে নিয়ে আসার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এভাবেই মুখে মুখে প্রচারের মাধ্যমে নাটকটি একটি বিশাল দর্শকসমাজ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে, যাদের অনেকের জন্যই মঞ্চনাটকের সঙ্গে এটিই প্রথম পরিচয়।
কেবল রাজধানী ঢাকাতেই নয়, বরং দেশের বিভিন্ন জেলা এবং পৃথিবীর নানা দেশেও সফলভাবে প্রদর্শিত হয়েছে নাটকটি। দেশ ও বিদেশের দর্শকের কাছে এর এই ধারাবাহিক গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করে যে হাসির কোনো ভৌগোলিক সীমানা নেই।
নাটক শেষ হওয়ার পর দর্শকদের মুখে তৃপ্তির ছাপ স্পষ্ট ফুটে ওঠে। কিছু দৃশ্যে অভিনেতাদের আবেগের প্রকাশ সামান্য বেশি মনে হলেও নাটকের সার্বিক নান্দনিক আবেদন তাতে একটুও ম্লান হয় না। নির্দেশক ও নাট্যকর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রম এবং সব কলাকুশলীর আন্তরিক নিষ্ঠার ফলেই প্রতিটি দৃশ্যের নিখুঁত উপস্থাপন আজ সম্ভব হয়েছে।
চার দশক পেরিয়ে এসেও ৭৯৮তম মঞ্চায়নে নাটকটির এভাবে দর্শকের মন জয় করতে পারা বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের ইতিহাসে এক বিরল অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ঢাকার ৪১৬ বছর পূর্তির এই আয়োজনে ‘কঞ্জুস’ কেবল একটি নাটক উপভোগ করার মাধ্যম ছিল না, বরং দেশের সমৃদ্ধ নাট্যচর্চার ঐতিহ্যের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগও তৈরি করেছিল।

আপনার মতামত লিখুন