দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটার সম্ভাবনা তৈরি হলেও তা আবারও দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শক (পিএমসি) নিয়োগের আন্তর্জাতিক দরপত্র বাতিলের নির্দেশ দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। নতুন করে দরপত্র আহ্বান এবং শর্ত পুনর্মূল্যায়নের এই নির্দেশনার ফলে প্রকল্পটি নতুন জটিলতায় পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পতেঙ্গার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় অবলম্বন। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই রিফাইনারির ক্রুড অয়েল (অপরিশোধিত তেল) শোধনের সক্ষমতা সীমিত থাকায় বর্তমানে দেশে বাড়তি মূল্যে পরিশোধিত তেল আমদানির নির্ভরতা ও ব্যয় উভয়ই বাড়ছে। দেশের প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদার বড় অংশই আমদানি হয় পরিশোধিত অবস্থায়, যার ফলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, ইস্টার্ন রিফাইনারির মাধ্যমে বছরে ৪৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল শোধন করা সম্ভব হলে প্রতি বছর প্রায় ৪৭৩ মিলিয়ন ডলার বা ৫ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা সাশ্রয় করা যাবে। এই বিপুল অর্থ সাশ্রয় ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০১২ সালে ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি-২’ নামে নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যয় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা ধরা হলেও নকশা প্রণয়ন, পরামর্শক নিয়োগ, অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন পদ্ধতির জটিলতায় তা দীর্ঘদিনেও এগোয়নি।
২০১৬ সালে প্রকল্পের ব্যয় সংশোধন করে ১৬ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। ফরাসি প্রতিষ্ঠান ‘টেকনিপ’কে ফিড প্রণয়ন এবং ভারতের ‘ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেড’কে (ইআইএল) পিএমসি হিসেবে নিয়োগের চুক্তি করা হলেও ভৌত কাজ শুরু হতে বিলম্ব ঘটে। ২০২২ সালের শেষ দিকে সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৫৮ কোটি টাকা এবং পরবর্তীতে তা বাড়িয়ে ৩১ হাজার কোটি টাকা ছাড়ায়। প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘মডার্নাইজেশন অ্যান্ড এক্সপ্যানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড’।
গত বছরের ১১ আগস্ট পুনর্গঠিত ডিপিপি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পাঠায় বিপিসি। এরপর গত ৩ সেপ্টেম্বর ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি) সঙ্গে ১ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং আইডিবির প্রতিনিধিদল প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে। সরকারের বড় অঙ্কের অর্থায়নের পাশাপাশি এই বৈদেশিক ঋণের ফলে দীর্ঘদিনের অর্থায়ন সংকট কেটে গিয়েছিল।
প্রকল্পের জন্য আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগের লক্ষ্যে আহ্বান করা দরপত্রে বিশ্বের ২৩টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এর মধ্যে শীর্ষ ৫টি প্রতিষ্ঠান— থাইল্যান্ডের ফোস্টার হুইলার, তুরস্কের বিআরআর ইন্ডাস্ট্রিজ, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি যৌথ উদ্যোগের আইএলএফ কনসাল্টিং ইঞ্জিনিয়ার্স, ইতালির রাইনা কনসাল্টিং এবং স্পেনের ইনটেকসা ইন্ডাস্ট্রিয়ালকে শর্টলিস্ট করা হয়েছিল।
তবে গত ১৯ অক্টোবর বিকোসি চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে চলমান এই দরপ্রক্রিয়া বাতিলের নির্দেশ দেয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর), ২০২৫ অনুসরণে নতুন করে আগ্রহপত্র আহ্বান এবং পিএমসি নিয়োগের কার্যপরিধি বা টিওআর পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশনায় ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও বেশি প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরির কথা বলা হয়েছে।
নতুন করে দরপত্র আহ্বান, মূল্যায়ন ও পরামর্শক নিয়োগের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে কয়েক মাস সময় লাগার আশঙ্কা থাকলেও প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে সামগ্রিক কার্যক্রমে বড় প্রভাব পড়বে না।
প্রকল্প পরিচালক আসমা আরা বেগম বলেন, আরও বেশি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় পরামর্শক নিয়োগের উদ্দেশ্যেই সম্ভবত দরপত্র বাতিল করা হয়েছে। আগের প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
তিনি আরও আশা প্রকাশ করেন যে, প্রকল্পের অন্যান্য কার্যক্রম চলমান থাকায় পিএমসি নিয়োগের এই পরিবর্তন পুরো প্রকল্পের বাস্তবায়নে বড় ধরনের কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না এবং নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হবে।

মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ অক্টোবর ২০২৬
দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটার সম্ভাবনা তৈরি হলেও তা আবারও দীর্ঘসূত্রতায় পড়েছে। প্রকল্প ব্যবস্থাপনা পরামর্শক (পিএমসি) নিয়োগের আন্তর্জাতিক দরপত্র বাতিলের নির্দেশ দিয়েছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। নতুন করে দরপত্র আহ্বান এবং শর্ত পুনর্মূল্যায়নের এই নির্দেশনার ফলে প্রকল্পটি নতুন জটিলতায় পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পতেঙ্গার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় অবলম্বন। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই রিফাইনারির ক্রুড অয়েল (অপরিশোধিত তেল) শোধনের সক্ষমতা সীমিত থাকায় বর্তমানে দেশে বাড়তি মূল্যে পরিশোধিত তেল আমদানির নির্ভরতা ও ব্যয় উভয়ই বাড়ছে। দেশের প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদার বড় অংশই আমদানি হয় পরিশোধিত অবস্থায়, যার ফলে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্য অনুযায়ী, ইস্টার্ন রিফাইনারির মাধ্যমে বছরে ৪৫ লাখ টন ক্রুড অয়েল শোধন করা সম্ভব হলে প্রতি বছর প্রায় ৪৭৩ মিলিয়ন ডলার বা ৫ হাজার ৭৮৮ কোটি টাকা সাশ্রয় করা যাবে। এই বিপুল অর্থ সাশ্রয় ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০১২ সালে ‘ইস্টার্ন রিফাইনারি-২’ নামে নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ব্যয় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা ধরা হলেও নকশা প্রণয়ন, পরামর্শক নিয়োগ, অর্থায়ন ও বাস্তবায়ন পদ্ধতির জটিলতায় তা দীর্ঘদিনেও এগোয়নি।
২০১৬ সালে প্রকল্পের ব্যয় সংশোধন করে ১৬ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। ফরাসি প্রতিষ্ঠান ‘টেকনিপ’কে ফিড প্রণয়ন এবং ভারতের ‘ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্ডিয়া লিমিটেড’কে (ইআইএল) পিএমসি হিসেবে নিয়োগের চুক্তি করা হলেও ভৌত কাজ শুরু হতে বিলম্ব ঘটে। ২০২২ সালের শেষ দিকে সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় দাঁড়ায় ২৩ হাজার ৫৮ কোটি টাকা এবং পরবর্তীতে তা বাড়িয়ে ৩১ হাজার কোটি টাকা ছাড়ায়। প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘মডার্নাইজেশন অ্যান্ড এক্সপ্যানশন অব ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড’।
গত বছরের ১১ আগস্ট পুনর্গঠিত ডিপিপি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগে পাঠায় বিপিসি। এরপর গত ৩ সেপ্টেম্বর ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি) সঙ্গে ১ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয় এবং আইডিবির প্রতিনিধিদল প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে। সরকারের বড় অঙ্কের অর্থায়নের পাশাপাশি এই বৈদেশিক ঋণের ফলে দীর্ঘদিনের অর্থায়ন সংকট কেটে গিয়েছিল।
প্রকল্পের জন্য আন্তর্জাতিক পরামর্শক নিয়োগের লক্ষ্যে আহ্বান করা দরপত্রে বিশ্বের ২৩টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। এর মধ্যে শীর্ষ ৫টি প্রতিষ্ঠান— থাইল্যান্ডের ফোস্টার হুইলার, তুরস্কের বিআরআর ইন্ডাস্ট্রিজ, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি যৌথ উদ্যোগের আইএলএফ কনসাল্টিং ইঞ্জিনিয়ার্স, ইতালির রাইনা কনসাল্টিং এবং স্পেনের ইনটেকসা ইন্ডাস্ট্রিয়ালকে শর্টলিস্ট করা হয়েছিল।
তবে গত ১৯ অক্টোবর বিকোসি চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে চলমান এই দরপ্রক্রিয়া বাতিলের নির্দেশ দেয় জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর), ২০২৫ অনুসরণে নতুন করে আগ্রহপত্র আহ্বান এবং পিএমসি নিয়োগের কার্যপরিধি বা টিওআর পুনর্মূল্যায়নের নির্দেশনায় ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও বেশি প্রতিযোগিতার সুযোগ তৈরির কথা বলা হয়েছে।
নতুন করে দরপত্র আহ্বান, মূল্যায়ন ও পরামর্শক নিয়োগের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে কয়েক মাস সময় লাগার আশঙ্কা থাকলেও প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে সামগ্রিক কার্যক্রমে বড় প্রভাব পড়বে না।
প্রকল্প পরিচালক আসমা আরা বেগম বলেন, আরও বেশি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় পরামর্শক নিয়োগের উদ্দেশ্যেই সম্ভবত দরপত্র বাতিল করা হয়েছে। আগের প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকবে।
তিনি আরও আশা প্রকাশ করেন যে, প্রকল্পের অন্যান্য কার্যক্রম চলমান থাকায় পিএমসি নিয়োগের এই পরিবর্তন পুরো প্রকল্পের বাস্তবায়নে বড় ধরনের কোনো বাধা সৃষ্টি করবে না এবং নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যেই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হবে।

আপনার মতামত লিখুন