সংবাদ

ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে সাগরে নামার প্রস্তুতি উপকূলীয় জেলেদের


প্রতিনিধি, রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী)
প্রতিনিধি, রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী)
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১২:৩০ পিএম

ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে সাগরে নামার প্রস্তুতি উপকূলীয় জেলেদের
মা ইলিশ রক্ষায় টানা ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষে আজ রাত ১২টায় সাগরে জাল ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন উপকূলের জেলেরা।

মা ইলিশ সুরক্ষায় সরকারের নির্ধারিত টানা ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাত ১২টায়। নিষেধাজ্ঞা শেষে উত্তাল সাগরে জাল ফেলার প্রস্তুতি নিতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপকূলের হাজার হাজার জেলে। তবে সাগরে নামার এই চিরচেনা আনন্দের আড়ালে জেলেদের চোখে-মুখে এখন শুধু দুশ্চিন্তার ঘোর মেঘ। ট্রলার মেরামত ও রসদ সংগ্রহের খরচ মেটাতে সিংহভাগ জেলেকেই জড়িয়ে পড়তে হয়েছে চড়া সুদে দাদন এবং এনজিওর ঋণের শৃঙ্খলে।

উপজেলার চরমোন্তাজ, সোনারচরসহ বিভিন্ন জেলেপল্লী ও মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, ঘাটে ঘাটে নোঙর করে রাখা সারি সারি ট্রলার মেরামতে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলেরা। কেউ ট্রলারে নতুন রঙের প্রলেপ দিচ্ছেন, কেউ ছিঁড়ে যাওয়া জাল ঠিক করছেন, আবার কেউ নতুন জাল বুনছেন। যে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোতে কিছুদিন আগেও প্রতিদিন ভোর থেকে লাখ লাখ টাকার মাছ কেনাবেচায় মুখরিত থাকত, সেখানে এখন প্রস্তুতিমূলক কর্মচাঞ্চল্যের মাঝেও বিরাজ করছে এক ধরনের চাপা উৎকণ্ঠা।

স্থানীয় জেলেরা জানান, নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সরকারিভাবে যে চাল সহায়তা দেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে কোনোমতে পেটের ক্ষুধা নিবারণ হলেও পরিবারের অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানো সম্ভব হয়নি। তার ওপর ট্রলার মেরামত, জাল ঠিক করা এবং সাগরে যাওয়ার আগে জ্বালানি তেল, বরফ ও খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহের জন্য একেকটি ট্রলারের পেছনে ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। প্রায় এক মাস উপার্জন সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়েই দাদন ব্যবসায়ী কিংবা স্থানীয় এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়েছে তাদের।

চরমোন্তাজ এলাকার সমুদ্রগামী জেলে মো. খোকন সরদার বলেন, 'পুরো নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সংসার চালাতে গিয়ে দেনার বোঝা মাথায় চেপেছে। মাছ বিক্রি করে এখন এই দেনা শোধ করার চেষ্টা করতে হবে। এ বছর মৌসুমের শুরু থেকেই সাগর উত্তাল থাকায় মাছ কম মিলেছে, শেষ সময়টাও ভালো যায়নি। এর মধ্যেই আবার এই নিষেধাজ্ঞা কাটাতে হলো।'

আরেক জেলে মো. আল-আমীন মোল্লা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, 'সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতি প্রায় শেষ। এবার জালে পর্যাপ্ত মাছ ধরা পড়লে ঋণ শোধ করতে পারব। কিন্তু মাছ না পেলে বড় বিপদে পড়তে হবে। তখন ঋণ শোধ করা তো দূরের কথা, আগামীতে সংসার চালানোই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।'

জেলেদের মূল দুশ্চিন্তা এখন একটাই–সাগরে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা মিলবে তো? আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে কিংবা জালে পর্যাপ্ত মাছ না উঠলে ঋণের বোঝা কীভাবে নামাবেন এবং সংসারই বা কীভাবে চালাবেন, সেই চিন্তায় কাটছে তাদের নিদ্রাহীন রাত।

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, উপকূলীয় জেলেদের এই স্থায়ী ঋণের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে কেবল নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন নির্দিষ্ট পরিমাণ চাল সহায়তা দিলেই চলবে না, বরং তাদের জন্য সহজ শর্তে ও বিনাসুদে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি।

এ বিষয়ে রাঙ্গাবালী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন জানান, উপজেলার প্রায় ২০ হাজার জেলের মাঝে জনপ্রতি ২৫ কেজি করে মোট ৫০০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, 'জেলেরা সমুদ্রে পর্যাপ্ত মাছ পাবেন এবং আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন।'

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬


ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে সাগরে নামার প্রস্তুতি উপকূলীয় জেলেদের

প্রকাশের তারিখ : ২৯ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

মা ইলিশ সুরক্ষায় সরকারের নির্ধারিত টানা ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) রাত ১২টায়। নিষেধাজ্ঞা শেষে উত্তাল সাগরে জাল ফেলার প্রস্তুতি নিতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছেন পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপকূলের হাজার হাজার জেলে। তবে সাগরে নামার এই চিরচেনা আনন্দের আড়ালে জেলেদের চোখে-মুখে এখন শুধু দুশ্চিন্তার ঘোর মেঘ। ট্রলার মেরামত ও রসদ সংগ্রহের খরচ মেটাতে সিংহভাগ জেলেকেই জড়িয়ে পড়তে হয়েছে চড়া সুদে দাদন এবং এনজিওর ঋণের শৃঙ্খলে।

উপজেলার চরমোন্তাজ, সোনারচরসহ বিভিন্ন জেলেপল্লী ও মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, ঘাটে ঘাটে নোঙর করে রাখা সারি সারি ট্রলার মেরামতে ব্যস্ত সময় পার করছেন জেলেরা। কেউ ট্রলারে নতুন রঙের প্রলেপ দিচ্ছেন, কেউ ছিঁড়ে যাওয়া জাল ঠিক করছেন, আবার কেউ নতুন জাল বুনছেন। যে মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রগুলোতে কিছুদিন আগেও প্রতিদিন ভোর থেকে লাখ লাখ টাকার মাছ কেনাবেচায় মুখরিত থাকত, সেখানে এখন প্রস্তুতিমূলক কর্মচাঞ্চল্যের মাঝেও বিরাজ করছে এক ধরনের চাপা উৎকণ্ঠা।

স্থানীয় জেলেরা জানান, নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সরকারিভাবে যে চাল সহায়তা দেওয়া হয়েছে, তা দিয়ে কোনোমতে পেটের ক্ষুধা নিবারণ হলেও পরিবারের অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানো সম্ভব হয়নি। তার ওপর ট্রলার মেরামত, জাল ঠিক করা এবং সাগরে যাওয়ার আগে জ্বালানি তেল, বরফ ও খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহের জন্য একেকটি ট্রলারের পেছনে ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হয়। প্রায় এক মাস উপার্জন সম্পূর্ণ বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়েই দাদন ব্যবসায়ী কিংবা স্থানীয় এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়েছে তাদের।

চরমোন্তাজ এলাকার সমুদ্রগামী জেলে মো. খোকন সরদার বলেন, 'পুরো নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন সংসার চালাতে গিয়ে দেনার বোঝা মাথায় চেপেছে। মাছ বিক্রি করে এখন এই দেনা শোধ করার চেষ্টা করতে হবে। এ বছর মৌসুমের শুরু থেকেই সাগর উত্তাল থাকায় মাছ কম মিলেছে, শেষ সময়টাও ভালো যায়নি। এর মধ্যেই আবার এই নিষেধাজ্ঞা কাটাতে হলো।'

আরেক জেলে মো. আল-আমীন মোল্লা শঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, 'সাগরে যাওয়ার প্রস্তুতি প্রায় শেষ। এবার জালে পর্যাপ্ত মাছ ধরা পড়লে ঋণ শোধ করতে পারব। কিন্তু মাছ না পেলে বড় বিপদে পড়তে হবে। তখন ঋণ শোধ করা তো দূরের কথা, আগামীতে সংসার চালানোই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।'

জেলেদের মূল দুশ্চিন্তা এখন একটাই–সাগরে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত ইলিশের দেখা মিলবে তো? আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলে কিংবা জালে পর্যাপ্ত মাছ না উঠলে ঋণের বোঝা কীভাবে নামাবেন এবং সংসারই বা কীভাবে চালাবেন, সেই চিন্তায় কাটছে তাদের নিদ্রাহীন রাত।

বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, উপকূলীয় জেলেদের এই স্থায়ী ঋণের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করতে কেবল নিষেধাজ্ঞা চলাকালীন নির্দিষ্ট পরিমাণ চাল সহায়তা দিলেই চলবে না, বরং তাদের জন্য সহজ শর্তে ও বিনাসুদে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত জরুরি।

এ বিষয়ে রাঙ্গাবালী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন জানান, উপজেলার প্রায় ২০ হাজার জেলের মাঝে জনপ্রতি ২৫ কেজি করে মোট ৫০০ মেট্রিক টন চাল বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, 'জেলেরা সমুদ্রে পর্যাপ্ত মাছ পাবেন এবং আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন।'


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত