সবুজ ফসলের খেতের মাঝখানে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে আছে মানুষের মতো কেউ। মাথায় পুরোনো মাটির হাঁড়ি, খড়ের তৈরি শরীরে বিবর্ণ ছেঁড়া-ফাটা শার্ট। দূর থেকে দেখে মনে হবে, যেন কেউ কৃষকের ফসল পাহারা দিচ্ছে। কাছে গেলে বোঝা যায়, এটি মানুষ নয়, কাকতাড়ুয়া। একসময় গ্রামবাংলার ফসলের মাঠে এমন দৃশ্য ছিল খুবই পরিচিত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কৃষকের জমি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় এই চাষাবাদের পদ্ধতির অনুসঙ্গ।
একসময় কৃষকের কাছে কাকতাড়ুয়া ছিল ফসল রক্ষার অন্যতম নির্ভরযোগ্য উপায়। শুধু পাখি তাড়ানো নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বিশ্বাস, লোকজ সংস্কৃতি এবং কৃষিজীবনের নানা গল্প। অনেক কৃষকের ধারণা ছিল, জমিতে কাকতাড়ুয়া থাকলে পাখি, ইঁদুর কিংবা অন্যান্য প্রাণী সহজে ফসলের ক্ষতি করতে পারে না। আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করতেন, এটি জমিকে অশুভ দৃষ্টি বা কুদৃষ্টি থেকেও রক্ষা করে। এতে ফলন ভালো হয়, গোলাভর্তি ধান ওঠে।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, মিশরীয় সভ্যতায় প্রথম কাকতাড়ুয়ার ব্যবহার শুরু হয়। নীলদের অববাহিকার উর্বর পলিমাটিতে মিশরীয়রা চাষাবাদ করত। গম থেকে শুরু করে নানা রকমের শস্য তারা খুব পরিশ্রম করে ফলাতো। কিন্তু পাখির উৎপাতে সেসব রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছিল মিশরীয়দের জন্য। ফসল রক্ষার জন্য তারা জমিতে জাল বিছিয়ে পাখি ধরত। ফসলও বাঁচত, পাখির মাংসও খাওয়া হতো। কিন্তু এভাবে পাখি আটকানো যাচ্ছিল না। তখনই পাথর দিয়ে ভয়দৃশ্য কিছু কাঠামোগো সাজিয়ে খেজে দাঁড় করিয়ে রাখা শুরু হয়। সভ্যতার প্রথম কাকতাড়ুয়া সম্ভবত সেটাই ছিল।
বর্তমানে কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার, উন্নত জাতের বীজ, রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও যান্ত্রিক কৃষি ব্যবস্থার বিস্তারের ফলে কাকতাড়ুয়ার প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে গেছে। ফলে নতুন প্রজন্মের অনেক কৃষকই এই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত নন। একসময় যে কাকতাড়ুয়া ছিল প্রায় প্রতিটি খেতের অবিচ্ছেদ্য অংশ, এখন তা কেবল দু’একটি জমিতে চোখে পড়ে।
গ্রামের বিস্তৃত মাঠে ঘুরে দেখলে, সবুজ ধানখেত কিংবা ভুট্টার জমির সারি থাকলেও আগের মতো আর কাকতাড়ুয়ার উপস্থিতি নেই। কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে একটি-দুটি কাকতাড়ুয়া দাঁড়িয়ে থাকলেও তা এখন অনেকটাই ব্যতিক্রম। কাকতাড়ুয়া তৈরির পদ্ধতিও অত্যন্ত সহজ, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। সাধারণত কয়েকটি বাঁশ, খড়, দড়ি, পুরোনো কাপড় এবং একটি মাটির হাঁড়ি দিয়ে তৈরি করা হতো এটি। প্রথমে বাঁশ দিয়ে মানুষের শরীরের মতো কাঠামো বানানো হতো। এরপর খড় দিয়ে শরীরের আকৃতি দেওয়া হতো। মাথার জায়গায় বসানো হতো মাটির হাঁড়ি অথবা খড় পেচিয়ে গোলাকার আকৃতি তৈরি করা হতো। অনেকেই হাঁড়ির গায়ে সাদা রং বা কয়লা দিয়ে চোখ, নাক ও মুখ এঁকে মানুষের মুখাবয়বের মতো করে তুলতেন। পরে গায়ে পরিয়ে দেওয়া হতো পুরোনো শার্ট, গেঞ্জি কিংবা লুঙ্গি। সবার শেষে সেটিকে ফসলের জমির মাঝখানে পুঁতে দেওয়া হতো। দূর থেকে দেখতে একেবারেই মানুষের মতো মনে হওয়ায় কাক, শালিক, বক, ঘুঘুসহ নানা পাখি এবং অনেক বন্যপ্রাণী বিভ্রান্ত হয়ে জমিতে নামার সাহস পেত না।

শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩১ অক্টোবর ২০২৬
সবুজ ফসলের খেতের মাঝখানে দুই হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে আছে মানুষের মতো কেউ। মাথায় পুরোনো মাটির হাঁড়ি, খড়ের তৈরি শরীরে বিবর্ণ ছেঁড়া-ফাটা শার্ট। দূর থেকে দেখে মনে হবে, যেন কেউ কৃষকের ফসল পাহারা দিচ্ছে। কাছে গেলে বোঝা যায়, এটি মানুষ নয়, কাকতাড়ুয়া। একসময় গ্রামবাংলার ফসলের মাঠে এমন দৃশ্য ছিল খুবই পরিচিত। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কৃষকের জমি থেকে হারিয়ে যাচ্ছে দেশীয় এই চাষাবাদের পদ্ধতির অনুসঙ্গ।
একসময় কৃষকের কাছে কাকতাড়ুয়া ছিল ফসল রক্ষার অন্যতম নির্ভরযোগ্য উপায়। শুধু পাখি তাড়ানো নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে ছিল বিশ্বাস, লোকজ সংস্কৃতি এবং কৃষিজীবনের নানা গল্প। অনেক কৃষকের ধারণা ছিল, জমিতে কাকতাড়ুয়া থাকলে পাখি, ইঁদুর কিংবা অন্যান্য প্রাণী সহজে ফসলের ক্ষতি করতে পারে না। আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করতেন, এটি জমিকে অশুভ দৃষ্টি বা কুদৃষ্টি থেকেও রক্ষা করে। এতে ফলন ভালো হয়, গোলাভর্তি ধান ওঠে।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, মিশরীয় সভ্যতায় প্রথম কাকতাড়ুয়ার ব্যবহার শুরু হয়। নীলদের অববাহিকার উর্বর পলিমাটিতে মিশরীয়রা চাষাবাদ করত। গম থেকে শুরু করে নানা রকমের শস্য তারা খুব পরিশ্রম করে ফলাতো। কিন্তু পাখির উৎপাতে সেসব রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছিল মিশরীয়দের জন্য। ফসল রক্ষার জন্য তারা জমিতে জাল বিছিয়ে পাখি ধরত। ফসলও বাঁচত, পাখির মাংসও খাওয়া হতো। কিন্তু এভাবে পাখি আটকানো যাচ্ছিল না। তখনই পাথর দিয়ে ভয়দৃশ্য কিছু কাঠামোগো সাজিয়ে খেজে দাঁড় করিয়ে রাখা শুরু হয়। সভ্যতার প্রথম কাকতাড়ুয়া সম্ভবত সেটাই ছিল।
বর্তমানে কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহার, উন্নত জাতের বীজ, রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও যান্ত্রিক কৃষি ব্যবস্থার বিস্তারের ফলে কাকতাড়ুয়ার প্রয়োজনীয়তা অনেকটাই কমে গেছে। ফলে নতুন প্রজন্মের অনেক কৃষকই এই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত নন। একসময় যে কাকতাড়ুয়া ছিল প্রায় প্রতিটি খেতের অবিচ্ছেদ্য অংশ, এখন তা কেবল দু’একটি জমিতে চোখে পড়ে।
গ্রামের বিস্তৃত মাঠে ঘুরে দেখলে, সবুজ ধানখেত কিংবা ভুট্টার জমির সারি থাকলেও আগের মতো আর কাকতাড়ুয়ার উপস্থিতি নেই। কোথাও কোথাও বিক্ষিপ্তভাবে একটি-দুটি কাকতাড়ুয়া দাঁড়িয়ে থাকলেও তা এখন অনেকটাই ব্যতিক্রম। কাকতাড়ুয়া তৈরির পদ্ধতিও অত্যন্ত সহজ, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব। সাধারণত কয়েকটি বাঁশ, খড়, দড়ি, পুরোনো কাপড় এবং একটি মাটির হাঁড়ি দিয়ে তৈরি করা হতো এটি। প্রথমে বাঁশ দিয়ে মানুষের শরীরের মতো কাঠামো বানানো হতো। এরপর খড় দিয়ে শরীরের আকৃতি দেওয়া হতো। মাথার জায়গায় বসানো হতো মাটির হাঁড়ি অথবা খড় পেচিয়ে গোলাকার আকৃতি তৈরি করা হতো। অনেকেই হাঁড়ির গায়ে সাদা রং বা কয়লা দিয়ে চোখ, নাক ও মুখ এঁকে মানুষের মুখাবয়বের মতো করে তুলতেন। পরে গায়ে পরিয়ে দেওয়া হতো পুরোনো শার্ট, গেঞ্জি কিংবা লুঙ্গি। সবার শেষে সেটিকে ফসলের জমির মাঝখানে পুঁতে দেওয়া হতো। দূর থেকে দেখতে একেবারেই মানুষের মতো মনে হওয়ায় কাক, শালিক, বক, ঘুঘুসহ নানা পাখি এবং অনেক বন্যপ্রাণী বিভ্রান্ত হয়ে জমিতে নামার সাহস পেত না।

আপনার মতামত লিখুন