সংবাদ

প্রযুক্তির যুগেও আইসিটি-ইংরেজিতে বড় ধাক্কা যে কারণে


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:০৫ পিএম

প্রযুক্তির যুগেও আইসিটি-ইংরেজিতে বড় ধাক্কা যে কারণে
ছবি: সংগৃহীত

চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এক আশঙ্কাজনক চিত্র ভেসে উঠেছে। শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি অকৃতকার্য হয়েছেন মূলত তিনটি বিষয়ের পরীক্ষায়—ইংরেজি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) এবং ব্যবসায় শিক্ষা শাখার হিসাববিজ্ঞান।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে মাত্র একটি বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৭০ শতাংশের ওপরে উঠতে পেরেছে। পাঁচটি বোর্ডে এই হার নেমে এসেছে ৫০-এর ঘরে (যশোর ৫৪.৯৫%, বরিশাল ৫৪.০৮%, দিনাজপুর ৫৬.০৫%, রাজশাহী ৫৬.০১%)। আইসিটিতে ছয়টি বোর্ডে পাসের হার ৭০%-এর ওপরে থাকলেও বাকি তিনটিতে তা ৬০-এর ঘরে আটকে গেছে। 

অপরদিকে, ব্যবসায় শিক্ষার মূল স্তম্ভ হিসাববিজ্ঞানে তিনটি বোর্ডে পাসের হার প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি—রাজশাহীতে ৫২.৮৪%, বরিশালে ৫২.২০% এবং দিনাজপুরে ৫৩.০২%।

প্রযুক্তির স্বর্ণযুগে দাঁড়িয়েও দক্ষতানির্ভর এই তিন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের এই গণধস কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং এটি আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার 'কাঠামোগত ফাটল' ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার স্পষ্ট প্রতিফলন।

লার্নিং গ্যাপ

ইংরেজি, আইসিটি ও হিসাববিজ্ঞান—তিনটি বিষয়ই মূলত অনুশীলনী ও দক্ষতানির্ভর। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে এসে একজন শিক্ষার্থী মাত্র ১৮ থেকে ২০ মাসের কার্যকর ক্লাসের সময় পায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের মতে, মাধ্যমিক (এসএসসি) বা তার আগের ১০ বছর জুড়ে যে ঘাটতি তৈরি হয়, তা এই দুই বছরের সীমিত সময়ের শিক্ষাবর্ষে পূরণ করা মোটেও সম্ভব নয়।

মাধ্যমিক পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক যোগ্য শিক্ষক না থাকায় স্কুলগুলোতে প্রায়ই অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ দিয়ে ক্লাসে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে গোড়াতেই যাদের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে, এইচএসসির তুলনামূলক জটিল সিলেবাসে এসে তারা খেই হারিয়ে ফেলছে।

নামমাত্র আইসিটি

ডিজিটাল বাংলাদেশ কিংবা প্রযুক্তিভিত্তিক ভবিষ্যতের যে বার্তা দেওয়া হচ্ছে, ক্লাসরুমের বাস্তবতা তার সম্পূর্ণ বিপরীত। সারাদেশে আইসিটি বিষয়টিকে বাধ্যতামূলক করা হলেও মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই প্রয়োজনীয় কম্পিউটার, ইন্টারনেট সংযোগ কিংবা ল্যাব সুবিধা নেই।

প্র্যাকটিক্যাল জ্ঞান ছাড়াই শিক্ষার্থীরা স্রেফ বইয়ের পাতা মুখস্থ করে পরীক্ষায় বসছে। বিশেষ করে মফস্বল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বোর্ডগুলোতে (যেমন রাজশাহী ও যশোর) আইসিটির এই ফল স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, হাতেনাতে শেখার সুবিধা না থাকলে মুখস্থবিদ্যা দিয়ে আইসিটিতে টিক থাকা সম্ভব নয়।

হিসাববিজ্ঞানে বিষাদ

হিসাববিজ্ঞান বিষয়টি গণিত ও যুক্তিনির্ভর। কিন্তু মাধ্যমিক স্তর থেকেই ব্যবসার নীতি ও হিসাবের মৌলিক কাঠামো পরিষ্কার না করে শিক্ষার্থীদের কেবল রেওয়ামিল বা জাবেদার গাণিতিক ছক মুখস্থ করানো হয়। শিক্ষক সংকটের কারণে গ্রামাঞ্চলের কলেজগুলোতে হিসাববিজ্ঞানের প্রতিটি অধ্যায়ের মৌলিক ধারণাভিত্তিক ক্লাস নেওয়া সম্ভব হয় না।

ফলস্বরূপ রাজশাহী (৫২.৮৪%), বরিশাল (৫২.২০%), দিনাজপুর (৫৩.০২%) ও ময়মনসিংহের (৫৭.৯৬%) মতো বোর্ডগুলোতে অর্ধেকের কাছাকাছি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন।

ইংরেজি ভীতি

ইংরেজি বিষয়ে ঢাকার পাসের হার ৭৩.৬২% হলেও ঢাকার বাইরে অন্যান্য প্রধান বোর্ডগুলোতে এই চিত্র অত্যন্ত করুণ। ইংরেজিতে ব্যাকরণগত মুখস্থ বিদ্যার ওপর জোর দেওয়া হলেও 'রিডিং, রাইটিং ও লিসেনিং' দক্ষতার বৈজ্ঞানিক চর্চা মাধ্যমিক পর্যায়ে হয়ই না। ফলে অনুচ্ছেদ বা সৃজনশীল কোনো প্রশ্ন এলেই গ্রাম ও শহরের শিক্ষার্থীদের মেধার ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সমাধানের পথ

শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাষা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা না বাড়িয়ে একের পর এক নতুন বিষয় যুক্ত করার নীতি উল্টো ফল দিচ্ছে। কেবল ওপরের স্তরে সংস্কার না করে গোড়া থেকে সমস্যা সমাধানের তাগিদ দিচ্ছেন তারা-

মাধ্যমিকে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ: অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে তড়িঘড়ি ইংরেজি বা আইসিটি পড়ানোর সংস্কৃতি বন্ধ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক থেকেই বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক তৈরি করা।

ল্যাব ও প্র্যাকটিক্যাল অবকাঠামো নিশ্চিতকরণ: নামমাত্র আইসিটি না রেখে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অন্তত সচল কম্পিউটার ল্যাব নিশ্চিত করা।

প্রশিক্ষণ ও শিখন পদ্ধতির পরিবর্তন: মুখস্থভিত্তিক পরীক্ষার বদলে বাস্তবদক্ষতা এবং ধারণাগত স্বচ্ছতার ওপর মূল্যায়ন করা।

প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা না কাটিয়ে কেবল কাঠামোগত পরীক্ষার রূপ বদলালে বা সাময়িক পরিবর্তন আনলে এই ‘লার্নিং গ্যাপ’ মেটানো সম্ভব নয়। উচ্চমাধ্যমিকের এই বেহাল ফল মূলত দীর্ঘমেয়াদি অবহেলারই এক সতর্কসংকেত।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬


প্রযুক্তির যুগেও আইসিটি-ইংরেজিতে বড় ধাক্কা যে কারণে

প্রকাশের তারিখ : ৩১ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

চলতি বছরের উচ্চমাধ্যমিক (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এক আশঙ্কাজনক চিত্র ভেসে উঠেছে। শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি অকৃতকার্য হয়েছেন মূলত তিনটি বিষয়ের পরীক্ষায়—ইংরেজি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) এবং ব্যবসায় শিক্ষা শাখার হিসাববিজ্ঞান।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নয়টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে মাত্র একটি বোর্ডে ইংরেজিতে পাসের হার ৭০ শতাংশের ওপরে উঠতে পেরেছে। পাঁচটি বোর্ডে এই হার নেমে এসেছে ৫০-এর ঘরে (যশোর ৫৪.৯৫%, বরিশাল ৫৪.০৮%, দিনাজপুর ৫৬.০৫%, রাজশাহী ৫৬.০১%)। আইসিটিতে ছয়টি বোর্ডে পাসের হার ৭০%-এর ওপরে থাকলেও বাকি তিনটিতে তা ৬০-এর ঘরে আটকে গেছে। 

অপরদিকে, ব্যবসায় শিক্ষার মূল স্তম্ভ হিসাববিজ্ঞানে তিনটি বোর্ডে পাসের হার প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি—রাজশাহীতে ৫২.৮৪%, বরিশালে ৫২.২০% এবং দিনাজপুরে ৫৩.০২%।

প্রযুক্তির স্বর্ণযুগে দাঁড়িয়েও দক্ষতানির্ভর এই তিন বিষয়ে শিক্ষার্থীদের এই গণধস কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং এটি আমাদের পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার 'কাঠামোগত ফাটল' ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার স্পষ্ট প্রতিফলন।

লার্নিং গ্যাপ

ইংরেজি, আইসিটি ও হিসাববিজ্ঞান—তিনটি বিষয়ই মূলত অনুশীলনী ও দক্ষতানির্ভর। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে এসে একজন শিক্ষার্থী মাত্র ১৮ থেকে ২০ মাসের কার্যকর ক্লাসের সময় পায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের মতে, মাধ্যমিক (এসএসসি) বা তার আগের ১০ বছর জুড়ে যে ঘাটতি তৈরি হয়, তা এই দুই বছরের সীমিত সময়ের শিক্ষাবর্ষে পূরণ করা মোটেও সম্ভব নয়।

মাধ্যমিক পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক যোগ্য শিক্ষক না থাকায় স্কুলগুলোতে প্রায়ই অন্য বিষয়ের শিক্ষকদের স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ দিয়ে ক্লাসে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। ফলে গোড়াতেই যাদের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে, এইচএসসির তুলনামূলক জটিল সিলেবাসে এসে তারা খেই হারিয়ে ফেলছে।

নামমাত্র আইসিটি

ডিজিটাল বাংলাদেশ কিংবা প্রযুক্তিভিত্তিক ভবিষ্যতের যে বার্তা দেওয়া হচ্ছে, ক্লাসরুমের বাস্তবতা তার সম্পূর্ণ বিপরীত। সারাদেশে আইসিটি বিষয়টিকে বাধ্যতামূলক করা হলেও মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের অধিকাংশ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই প্রয়োজনীয় কম্পিউটার, ইন্টারনেট সংযোগ কিংবা ল্যাব সুবিধা নেই।

প্র্যাকটিক্যাল জ্ঞান ছাড়াই শিক্ষার্থীরা স্রেফ বইয়ের পাতা মুখস্থ করে পরীক্ষায় বসছে। বিশেষ করে মফস্বল ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বোর্ডগুলোতে (যেমন রাজশাহী ও যশোর) আইসিটির এই ফল স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে, হাতেনাতে শেখার সুবিধা না থাকলে মুখস্থবিদ্যা দিয়ে আইসিটিতে টিক থাকা সম্ভব নয়।

হিসাববিজ্ঞানে বিষাদ

হিসাববিজ্ঞান বিষয়টি গণিত ও যুক্তিনির্ভর। কিন্তু মাধ্যমিক স্তর থেকেই ব্যবসার নীতি ও হিসাবের মৌলিক কাঠামো পরিষ্কার না করে শিক্ষার্থীদের কেবল রেওয়ামিল বা জাবেদার গাণিতিক ছক মুখস্থ করানো হয়। শিক্ষক সংকটের কারণে গ্রামাঞ্চলের কলেজগুলোতে হিসাববিজ্ঞানের প্রতিটি অধ্যায়ের মৌলিক ধারণাভিত্তিক ক্লাস নেওয়া সম্ভব হয় না।

ফলস্বরূপ রাজশাহী (৫২.৮৪%), বরিশাল (৫২.২০%), দিনাজপুর (৫৩.০২%) ও ময়মনসিংহের (৫৭.৯৬%) মতো বোর্ডগুলোতে অর্ধেকের কাছাকাছি শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন।

ইংরেজি ভীতি

ইংরেজি বিষয়ে ঢাকার পাসের হার ৭৩.৬২% হলেও ঢাকার বাইরে অন্যান্য প্রধান বোর্ডগুলোতে এই চিত্র অত্যন্ত করুণ। ইংরেজিতে ব্যাকরণগত মুখস্থ বিদ্যার ওপর জোর দেওয়া হলেও 'রিডিং, রাইটিং ও লিসেনিং' দক্ষতার বৈজ্ঞানিক চর্চা মাধ্যমিক পর্যায়ে হয়ই না। ফলে অনুচ্ছেদ বা সৃজনশীল কোনো প্রশ্ন এলেই গ্রাম ও শহরের শিক্ষার্থীদের মেধার ব্যবধান স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

সমাধানের পথ

শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভাষা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা না বাড়িয়ে একের পর এক নতুন বিষয় যুক্ত করার নীতি উল্টো ফল দিচ্ছে। কেবল ওপরের স্তরে সংস্কার না করে গোড়া থেকে সমস্যা সমাধানের তাগিদ দিচ্ছেন তারা-

মাধ্যমিকে বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ: অন্যান্য বিষয়ের শিক্ষক দিয়ে তড়িঘড়ি ইংরেজি বা আইসিটি পড়ানোর সংস্কৃতি বন্ধ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক থেকেই বিষয়ভিত্তিক দক্ষ শিক্ষক তৈরি করা।

ল্যাব ও প্র্যাকটিক্যাল অবকাঠামো নিশ্চিতকরণ: নামমাত্র আইসিটি না রেখে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অন্তত সচল কম্পিউটার ল্যাব নিশ্চিত করা।

প্রশিক্ষণ ও শিখন পদ্ধতির পরিবর্তন: মুখস্থভিত্তিক পরীক্ষার বদলে বাস্তবদক্ষতা এবং ধারণাগত স্বচ্ছতার ওপর মূল্যায়ন করা।

প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা না কাটিয়ে কেবল কাঠামোগত পরীক্ষার রূপ বদলালে বা সাময়িক পরিবর্তন আনলে এই ‘লার্নিং গ্যাপ’ মেটানো সম্ভব নয়। উচ্চমাধ্যমিকের এই বেহাল ফল মূলত দীর্ঘমেয়াদি অবহেলারই এক সতর্কসংকেত।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত