নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোট চুরির অভিযোগ, এসআইআর নিয়ে বিতর্ক এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে এবার নজিরবিহীন রাজনৈতিক পদক্ষেপ বিরোধীদের। সংসদের ভিতরে নয়, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গের বাসভবনে বসেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ‘পাবলিক ইমপিচমেন্ট’ বা প্রতীকী অভিশংসনের প্রস্তাব আনল ইন্ডিয়া জোট।
বিরোধীদের দাবি, দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা রক্ষার প্রশ্নেই এই প্রতিবাদ। তবে এই কর্মসূচির সাংবিধানিক কোনও অভিশংসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক নেই। এটি বিরোধীদের প্রতীকী রাজনৈতিক প্রতিবাদ।
দিল্লিতে শুক্রবার প্রবল বৃষ্টির কারণে পিছিয়ে গিয়েছিল কর্মসূচি। অবশেষে আজ শনিবার, ৩১ অক্টোবর, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গের বাসভবনে অনুষ্ঠিত হল বহুচর্চিত এই প্রতীকী অভিশংসন। উপস্থিত ছিলেন কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব-সহ ইন্ডিয়া জোটের একাধিক সাংসদ। ছিলেন সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী-সহ বিরোধী নেতারা।
এদিনের কর্মসূচির জন্য তৈরি করা হয়েছিল একটি মক পার্লামেন্ট বা ছায়া সংসদ। লোকসভার প্রাক্তন স্পিকার মীরা কুমার সেই প্রতীকী সংসদের স্পিকারের ভূমিকা পালন করেন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাব পেশ করেন খাড়্গে নিজেই।
খাড়্গের অভিযোগ, দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার ষড়যন্ত্রে জড়িত মুখ্য নির্বাচন কমিশনার। তাঁর বিরুদ্ধে ছয়টি গুরুতর অভিযোগ তুলেছে বিরোধী জোট।
প্রথমত, নির্বাচনে কারচুপির ষড়যন্ত্র। দ্বিতীয়ত, ১৩ কোটি ২০ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া। তৃতীয়ত, সংসদকে পাশ কাটিয়ে ফর্ম ৬-এর পরিবর্তন। চতুর্থত, ECINET-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকার নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত করা। পঞ্চমত, নির্বাচন কমিশনের অন্য দুই কমিশনারকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। এবং ষষ্ঠত, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নির্দেশে কাজ করার অভিযোগ।
খাড়্গে আরও অভিযোগ করেন, ২০২৩ সালের আইনের মাধ্যমে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে যে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, তা জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের আড়াল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, সংবিধান ও দেশের মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তবে এই সমস্ত অভিযোগই বিরোধী জোটের রাজনৈতিক অভিযোগ। এগুলি কোনও আদালতের রায় নয়। নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং অভিযোগগুলির আইনি নিষ্পত্তি এই বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রশ্ন উঠছে, সংসদের বাইরে এই ‘পাবলিক ইমপিচমেন্ট’-এর গুরুত্ব ঠিক কোথায়? ভারতের সাংবিধানিক ব্যবস্থায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের নির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে। বিরোধীদের এই প্রতীকী কর্মসূচি সেই সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার বিকল্প নয়। কিন্তু রাজনৈতিক দিক থেকে এর তাৎপর্য যথেষ্ট। কারণ, দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিরোধীরা এবার সংসদীয় প্রতিবাদের বাইরে একটি প্রতীকী সংসদীয় প্রক্রিয়া তৈরি করল।
এই ধরনের ‘পাবলিক ইমপিচমেন্ট’ কর্মসূচি ভারতের রাজনীতিতে বিরল। ফলে এটি শুধু একটি প্রতিবাদ নয়, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোর নতুন কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, এই কর্মসূচিকে কটাক্ষ করেছে বিজেপি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বক্তব্য, নির্বাচনে জেতার ক্ষমতা নেই বলেই বিরোধীরা নিজেদের পছন্দমতো সংসদ তৈরি করে বসেছে। তাঁর দাবি, সংসদে আলোচনা করতে প্রস্তুত বিজেপি, কিন্তু বিরোধীরা আলোচনার বদলে রাস্তায় নেমে নাটক করতে চাইছে।
এই রাজনৈতিক চাপানউতোরের মধ্যেই আগামী কাল ১ নভেম্বর দিল্লির রামলীলা ময়দানে বড় সমাবেশের ডাক দিয়েছে ইন্ডিয়া জোট। তার ঠিক আগের দিন এই প্রতীকী অভিশংসন কর্মসূচি বিরোধীদের আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করল।
সব মিলিয়ে, জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের এই পদক্ষেপ কতটা রাজনৈতিক প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক এখন আর শুধু সংসদীয় আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই। তা ক্রমশ বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপ নিচ্ছে।

শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩১ অক্টোবর ২০২৬
নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোট চুরির অভিযোগ, এসআইআর নিয়ে বিতর্ক এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে এবার নজিরবিহীন রাজনৈতিক পদক্ষেপ বিরোধীদের। সংসদের ভিতরে নয়, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গের বাসভবনে বসেই মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে ‘পাবলিক ইমপিচমেন্ট’ বা প্রতীকী অভিশংসনের প্রস্তাব আনল ইন্ডিয়া জোট।
বিরোধীদের দাবি, দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা রক্ষার প্রশ্নেই এই প্রতিবাদ। তবে এই কর্মসূচির সাংবিধানিক কোনও অভিশংসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক নেই। এটি বিরোধীদের প্রতীকী রাজনৈতিক প্রতিবাদ।
দিল্লিতে শুক্রবার প্রবল বৃষ্টির কারণে পিছিয়ে গিয়েছিল কর্মসূচি। অবশেষে আজ শনিবার, ৩১ অক্টোবর, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গের বাসভবনে অনুষ্ঠিত হল বহুচর্চিত এই প্রতীকী অভিশংসন। উপস্থিত ছিলেন কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব-সহ ইন্ডিয়া জোটের একাধিক সাংসদ। ছিলেন সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী-সহ বিরোধী নেতারা।
এদিনের কর্মসূচির জন্য তৈরি করা হয়েছিল একটি মক পার্লামেন্ট বা ছায়া সংসদ। লোকসভার প্রাক্তন স্পিকার মীরা কুমার সেই প্রতীকী সংসদের স্পিকারের ভূমিকা পালন করেন। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাব পেশ করেন খাড়্গে নিজেই।
খাড়্গের অভিযোগ, দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করার ষড়যন্ত্রে জড়িত মুখ্য নির্বাচন কমিশনার। তাঁর বিরুদ্ধে ছয়টি গুরুতর অভিযোগ তুলেছে বিরোধী জোট।
প্রথমত, নির্বাচনে কারচুপির ষড়যন্ত্র। দ্বিতীয়ত, ১৩ কোটি ২০ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ দেওয়া। তৃতীয়ত, সংসদকে পাশ কাটিয়ে ফর্ম ৬-এর পরিবর্তন। চতুর্থত, ECINET-এর মাধ্যমে ভোটার তালিকার নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত করা। পঞ্চমত, নির্বাচন কমিশনের অন্য দুই কমিশনারকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। এবং ষষ্ঠত, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নির্দেশে কাজ করার অভিযোগ।
খাড়্গে আরও অভিযোগ করেন, ২০২৩ সালের আইনের মাধ্যমে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে যে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে, তা জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের আড়াল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাঁর দাবি, সংবিধান ও দেশের মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
তবে এই সমস্ত অভিযোগই বিরোধী জোটের রাজনৈতিক অভিযোগ। এগুলি কোনও আদালতের রায় নয়। নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য এবং অভিযোগগুলির আইনি নিষ্পত্তি এই বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
প্রশ্ন উঠছে, সংসদের বাইরে এই ‘পাবলিক ইমপিচমেন্ট’-এর গুরুত্ব ঠিক কোথায়? ভারতের সাংবিধানিক ব্যবস্থায় মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে অপসারণের নির্দিষ্ট পদ্ধতি রয়েছে। বিরোধীদের এই প্রতীকী কর্মসূচি সেই সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার বিকল্প নয়। কিন্তু রাজনৈতিক দিক থেকে এর তাৎপর্য যথেষ্ট। কারণ, দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিরোধীরা এবার সংসদীয় প্রতিবাদের বাইরে একটি প্রতীকী সংসদীয় প্রক্রিয়া তৈরি করল।
এই ধরনের ‘পাবলিক ইমপিচমেন্ট’ কর্মসূচি ভারতের রাজনীতিতে বিরল। ফলে এটি শুধু একটি প্রতিবাদ নয়, নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোর নতুন কৌশল হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, এই কর্মসূচিকে কটাক্ষ করেছে বিজেপি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের বক্তব্য, নির্বাচনে জেতার ক্ষমতা নেই বলেই বিরোধীরা নিজেদের পছন্দমতো সংসদ তৈরি করে বসেছে। তাঁর দাবি, সংসদে আলোচনা করতে প্রস্তুত বিজেপি, কিন্তু বিরোধীরা আলোচনার বদলে রাস্তায় নেমে নাটক করতে চাইছে।
এই রাজনৈতিক চাপানউতোরের মধ্যেই আগামী কাল ১ নভেম্বর দিল্লির রামলীলা ময়দানে বড় সমাবেশের ডাক দিয়েছে ইন্ডিয়া জোট। তার ঠিক আগের দিন এই প্রতীকী অভিশংসন কর্মসূচি বিরোধীদের আন্দোলনে নতুন মাত্রা যোগ করল।
সব মিলিয়ে, জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের এই পদক্ষেপ কতটা রাজনৈতিক প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক এখন আর শুধু সংসদীয় আলোচনায় সীমাবদ্ধ নেই। তা ক্রমশ বৃহত্তর রাজনৈতিক আন্দোলনের রূপ নিচ্ছে।

আপনার মতামত লিখুন