এক হাতে ব্যাডমিন্টনের র্যাকেট, অন্য হাতে পরিবারের দায়িত্ব–জীবনের হাজারো প্রতিকূলতা পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নিজের অনন্য সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী লিকা পোদ্দার। ৪০তম জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপের নারী এককে শিরোপা জিতে খেলোয়াড়ি জীবনে প্রথমবারের মতো সিনিয়র জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন তিনি। তবে এই শিরোপা কেবল একটি পদক বা জয় নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, মায়ের স্বপ্ন এবং নিজের প্রতি অবিচল বিশ্বাসের এক উজ্জ্বল প্রতিফলন।
বাগেরহাটের মোংলা থেকে উঠে আসা ২৪ বছর বয়সী লিকার এই অর্জনের পথ মোটেও সহজ ছিল না। আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারে বেড়ে ওঠা লিকার বাবা একজন সাধারণ মৎস্যজীবী। নদীতে মাছ ধরে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই চলে চার সদস্যের এই সংসার। বাবা-মা ও দুই বোনের পরিবারে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পারিবারিক দায়িত্বের একটি বড় অংশ নিজের কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে লিকাকে। কিন্তু সব প্রতিকূলতা পেরিয়েও খেলাধুলা চালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন থেকে একচুলও সরে দাঁড়াননি তিনি।
সেই স্বপ্নেরই সফল রূপায়ণ দেখা গেছে ৪০তম জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপের কোর্টে। নারী এককের ফাইনালে তার প্রতিপক্ষ ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক চ্যাম্পিয়ন শাটলার উর্মি আক্তার। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে প্রথম গেম ২২-২০ পয়েন্টে জিতে এগিয়ে যান লিকা। দ্বিতীয় গেমে ১১-২১ পয়েন্টে হেরে গেলেও নির্ধারণী গেমে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ২১-১৮ পয়েন্টে জয় নিশ্চিত করেন তিনি। নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার হয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া লিকার হাতে ওঠে কাঙ্ক্ষিত জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা।
২০১৯ সালে মোংলায় ব্যাডমিন্টন খেলার মধ্য দিয়েই লিকার পেশাদার খেলোয়াড়ি জীবনের যাত্রা শুরু হয়। প্রথম কোচ মিলন সর্দার জুষ্টের তত্ত্বাবধানে শুরু থেকেই কঠোর অনুশীলন চালিয়ে যান তিনি। জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর নিজের এই সাফল্যের জন্য প্রথম কোচের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন লিকা। পরবর্তী সময়ে দিনাজপুরের ‘এলোরা শাটলার একাডেমি’তে প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা অর্জন তার খেলোয়াড়ি জীবনের বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মুহূর্তটি লিকার জন্য ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। জয় নিশ্চিত হওয়ার পর মোংলায় থাকা মায়ের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলতে গিয়ে আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি তিনি। আনন্দে কেঁদে ফেলেন লিকা। মেয়েকে বড় কিছু অর্জন করতে দেখার স্বপ্ন ছিল মায়ের দীর্ঘদিনের। জীবনের প্রথম সিনিয়র জাতীয় ফাইনালের চাপ সামলে শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে মায়ের সেই স্বপ্ন পূরণের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন তিনি।
জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য পাওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়াব্যবস্থা নিয়েও নিজের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন লিকা। তিনি বলেন, যবিপ্রবিতে জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণকারী ও পদকজয়ী অনেক শিক্ষার্থী থাকলেও তাদের ধারাবাহিক উন্নতির জন্য নিয়মিত অনুশীলন ও মানসম্মত প্রশিক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে দক্ষ কোচের সংখ্যা বাড়ানো হলে খেলোয়াড়েরা নিজেদের পারফরম্যান্স আরও উন্নত করার সুযোগ পাবেন।
একই সঙ্গে খেলাধুলার পাশাপাশি একাডেমিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরেন এই শাটলার। জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ ও নিয়মিত অনুশীলনের ব্যস্ততার মধ্যেই শিক্ষার্থীদের ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। তার মতে, জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়দের বাস্তবতা বিবেচনায় উপস্থিতি ও পরীক্ষার ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয়তা রাখা হলে তারা পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায়ও আরও ভালোভাবে মনোযোগ ধরে রাখতে পারবেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে লিকা বলেন, “জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আমার মূল লক্ষ্য নিজের এই পারফরম্যান্স ধরে রাখা। পাশাপাশি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে চাই। দেশের হয়ে খেলে দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনাই এখন আমার একমাত্র স্বপ্ন।”
অভাব-অনটনের সংসার থেকে উঠে এসে জাতীয় পর্যায়ের শিরোপা জয়ের পর নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার পর লিকাকে ঘিরে তৈরি হয় এক আনন্দঘন পরিবেশ। তার এই সাফল্যে উচ্ছ্বসিত এলাকাবাসী ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন তাকে। স্থানীয়দের ভালোবাসা ও সংবর্ধনায় লিকার এই অর্জন পায় ভিন্ন এক মাত্রা। জীবনের নানা প্রতিকূলতা জয় করে ব্যাডমিন্টনের কোর্টে লিকার এই সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত অর্জনেই সীমাবদ্ধ নয়; তার এই লড়াই ও অধ্যবসায় স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে চলা অসংখ্য তরুণ-তরুণীর জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা।

রোববার, ০১ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ নভেম্বর ২০২৬
এক হাতে ব্যাডমিন্টনের র্যাকেট, অন্য হাতে পরিবারের দায়িত্ব–জীবনের হাজারো প্রতিকূলতা পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নিজের অনন্য সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী লিকা পোদ্দার। ৪০তম জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপের নারী এককে শিরোপা জিতে খেলোয়াড়ি জীবনে প্রথমবারের মতো সিনিয়র জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন তিনি। তবে এই শিরোপা কেবল একটি পদক বা জয় নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, মায়ের স্বপ্ন এবং নিজের প্রতি অবিচল বিশ্বাসের এক উজ্জ্বল প্রতিফলন।
বাগেরহাটের মোংলা থেকে উঠে আসা ২৪ বছর বয়সী লিকার এই অর্জনের পথ মোটেও সহজ ছিল না। আর্থিকভাবে অসচ্ছল পরিবারে বেড়ে ওঠা লিকার বাবা একজন সাধারণ মৎস্যজীবী। নদীতে মাছ ধরে যে সামান্য আয় হয়, তা দিয়েই চলে চার সদস্যের এই সংসার। বাবা-মা ও দুই বোনের পরিবারে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পারিবারিক দায়িত্বের একটি বড় অংশ নিজের কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে লিকাকে। কিন্তু সব প্রতিকূলতা পেরিয়েও খেলাধুলা চালিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন থেকে একচুলও সরে দাঁড়াননি তিনি।
সেই স্বপ্নেরই সফল রূপায়ণ দেখা গেছে ৪০তম জাতীয় ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়নশিপের কোর্টে। নারী এককের ফাইনালে তার প্রতিপক্ষ ছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাবেক চ্যাম্পিয়ন শাটলার উর্মি আক্তার। হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে প্রথম গেম ২২-২০ পয়েন্টে জিতে এগিয়ে যান লিকা। দ্বিতীয় গেমে ১১-২১ পয়েন্টে হেরে গেলেও নির্ধারণী গেমে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে ২১-১৮ পয়েন্টে জয় নিশ্চিত করেন তিনি। নারায়ণগঞ্জ জেলা ক্রীড়া সংস্থার হয়ে প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া লিকার হাতে ওঠে কাঙ্ক্ষিত জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা।
২০১৯ সালে মোংলায় ব্যাডমিন্টন খেলার মধ্য দিয়েই লিকার পেশাদার খেলোয়াড়ি জীবনের যাত্রা শুরু হয়। প্রথম কোচ মিলন সর্দার জুষ্টের তত্ত্বাবধানে শুরু থেকেই কঠোর অনুশীলন চালিয়ে যান তিনি। জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর নিজের এই সাফল্যের জন্য প্রথম কোচের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন লিকা। পরবর্তী সময়ে দিনাজপুরের ‘এলোরা শাটলার একাডেমি’তে প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা অর্জন তার খেলোয়াড়ি জীবনের বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মুহূর্তটি লিকার জন্য ছিল অত্যন্ত আবেগঘন। জয় নিশ্চিত হওয়ার পর মোংলায় থাকা মায়ের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলতে গিয়ে আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি তিনি। আনন্দে কেঁদে ফেলেন লিকা। মেয়েকে বড় কিছু অর্জন করতে দেখার স্বপ্ন ছিল মায়ের দীর্ঘদিনের। জীবনের প্রথম সিনিয়র জাতীয় ফাইনালের চাপ সামলে শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে মায়ের সেই স্বপ্ন পূরণের পথে আরও এক ধাপ এগিয়ে গেলেন তিনি।
জাতীয় পর্যায়ে সাফল্য পাওয়ার পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়াব্যবস্থা নিয়েও নিজের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশার কথা জানিয়েছেন লিকা। তিনি বলেন, যবিপ্রবিতে জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণকারী ও পদকজয়ী অনেক শিক্ষার্থী থাকলেও তাদের ধারাবাহিক উন্নতির জন্য নিয়মিত অনুশীলন ও মানসম্মত প্রশিক্ষণ অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে দক্ষ কোচের সংখ্যা বাড়ানো হলে খেলোয়াড়েরা নিজেদের পারফরম্যান্স আরও উন্নত করার সুযোগ পাবেন।
একই সঙ্গে খেলাধুলার পাশাপাশি একাডেমিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরেন এই শাটলার। জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ ও নিয়মিত অনুশীলনের ব্যস্ততার মধ্যেই শিক্ষার্থীদের ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়। তার মতে, জাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড়দের বাস্তবতা বিবেচনায় উপস্থিতি ও পরীক্ষার ক্ষেত্রে কিছুটা নমনীয়তা রাখা হলে তারা পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায়ও আরও ভালোভাবে মনোযোগ ধরে রাখতে পারবেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে লিকা বলেন, “জাতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর আমার মূল লক্ষ্য নিজের এই পারফরম্যান্স ধরে রাখা। পাশাপাশি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে চাই। দেশের হয়ে খেলে দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনাই এখন আমার একমাত্র স্বপ্ন।”
অভাব-অনটনের সংসার থেকে উঠে এসে জাতীয় পর্যায়ের শিরোপা জয়ের পর নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার পর লিকাকে ঘিরে তৈরি হয় এক আনন্দঘন পরিবেশ। তার এই সাফল্যে উচ্ছ্বসিত এলাকাবাসী ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন তাকে। স্থানীয়দের ভালোবাসা ও সংবর্ধনায় লিকার এই অর্জন পায় ভিন্ন এক মাত্রা। জীবনের নানা প্রতিকূলতা জয় করে ব্যাডমিন্টনের কোর্টে লিকার এই সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত অর্জনেই সীমাবদ্ধ নয়; তার এই লড়াই ও অধ্যবসায় স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে চলা অসংখ্য তরুণ-তরুণীর জন্য এক বিশাল অনুপ্রেরণা।

আপনার মতামত লিখুন