সংবাদ

বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে সাংবাদিক হত্যার বিচারহীনতা


সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
সংবাদ ডিজিটাল রিপোর্ট
প্রকাশ: ৩ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:১০ এএম

বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে সাংবাদিক হত্যার বিচারহীনতা

  • এক দশকে সর্বোচ্চ রেকর্ড স্পর্শ করলো দায়মুক্তির হার
  • সংঘাতময় এলাকায় ড্রোন হামলায় প্রাণ হারাচ্ছেন সাংবাদিকরা
  • ইউনেস্কোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে নতুন বৈশ্বিক উদ্বেগের চিত্র

বিশ্বজুড়ে এক দশকেরও বেশি সময় পর সাংবাদিক হত্যার ঘটনায় দায়মুক্তির হার এক আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইউনেস্কোর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ সালের পর প্রথমবারের মতো সাংবাদিক হত্যার বিচারে এই দায়মুক্তির হার ৮৬ শতাংশে এসে ঠেকেছে। ২ নভেম্বর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের দায়মুক্তি অবসানের আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো এই বিশেষ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। ২০১২ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী সাংবাদিক হত্যা ও বিচারহীনতার ওপর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালিয়ে আসছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সাংবাদিক হত্যার ঘটনা আগের দুই বছরের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এই দুই বছরে বিশ্বজুড়ে অন্তত ১৮৯ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী তাদের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় নিহতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি; ১২৭ জন, যা মোট নিহতের প্রায় ৬৭ শতাংশ।

এই বিষয়ে ইউনেস্কোর মহাপরিচালক খালেদ এল-এনানি উদ্বেগ প্রকাশ করে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "যুদ্ধের সম্মুখসারিতে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রাণহানির ঘটনা বাড়ছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই হত্যার জন্য দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে না।"

অন্যদিকে সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোতে সাংবাদিক হত্যার বিচার না হওয়ার প্রবণতা প্রায় ১০০ শতাংশের কাছাকাছি বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন, "গত এক বছরে অন্তত ৩৪ জন সাংবাদিক প্রাণ দিয়েছেন। এ ধরনের হত্যার প্রতি সাতটির মধ্যে ছয়টিরই বিচার হয় না। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় দায়মুক্তির হার প্রায় ১০০ শতাংশের কাছাকাছি।"

তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন, "সত্য তুলে ধরার জন্য বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করা এবং তাদের প্রতিবেদন বন্ধ করে দেওয়া শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।"

ভৌগোলিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ সালে আরব অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি ৯৭ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ফিলিস্তিনে নিহতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এছাড়া আধুনিক যুদ্ধের কৌশল হিসেবে ড্রোন হামলা এখন সাংবাদিকদের জন্য এক নতুন প্রাণঘাতী হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে নিহত সাংবাদিকদের প্রায় ৪০ শতাংশই ড্রোনের মাধ্যমে করা হামলার শিকার হয়েছেন। তবে ইতিবাচক দিক হলো, সংঘাতহীন শান্ত অঞ্চলে সাংবাদিক হত্যার বিচারহীনতার হার আগের চেয়ে কিছুটা কমে ৭৭ শতাংশে নেমে এসেছে।

প্রতিবেদনে নারী সাংবাদিকদের প্রতি ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির বিষয়টিও উঠে এসেছে। সশস্ত্র সংঘাতের অঞ্চলে ২০২৪-২৫ মেয়াদে নিহত ১৪ জন নারী সাংবাদিকের মধ্যে ১৩ জনই প্রাণ হারিয়েছেন যুদ্ধের মধ্যে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ৭৫ শতাংশ নারী সাংবাদিক বর্তমানে অনলাইন ও সরাসরি নানা ধরনের হয়রানির সম্মুখীন হচ্ছেন। সার্বিক পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ২০১৫ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত ২২২২ নম্বর প্রস্তাব কঠোরভাবে বাস্তবায়নের জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি বিনীত আহ্বান জানান।

আপনার মতামত লিখুন

সংবাদ

মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬


বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে সাংবাদিক হত্যার বিচারহীনতা

প্রকাশের তারিখ : ০৩ নভেম্বর ২০২৬

featured Image

  • এক দশকে সর্বোচ্চ রেকর্ড স্পর্শ করলো দায়মুক্তির হার
  • সংঘাতময় এলাকায় ড্রোন হামলায় প্রাণ হারাচ্ছেন সাংবাদিকরা
  • ইউনেস্কোর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে নতুন বৈশ্বিক উদ্বেগের চিত্র

বিশ্বজুড়ে এক দশকেরও বেশি সময় পর সাংবাদিক হত্যার ঘটনায় দায়মুক্তির হার এক আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইউনেস্কোর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ সালের পর প্রথমবারের মতো সাংবাদিক হত্যার বিচারে এই দায়মুক্তির হার ৮৬ শতাংশে এসে ঠেকেছে। ২ নভেম্বর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের দায়মুক্তি অবসানের আন্তর্জাতিক দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কো এই বিশেষ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে। ২০১২ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী সাংবাদিক হত্যা ও বিচারহীনতার ওপর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ চালিয়ে আসছে সংস্থাটি।

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে সাংবাদিক হত্যার ঘটনা আগের দুই বছরের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। এই দুই বছরে বিশ্বজুড়ে অন্তত ১৮৯ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী তাদের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে সংঘাতপূর্ণ এলাকায় নিহতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি; ১২৭ জন, যা মোট নিহতের প্রায় ৬৭ শতাংশ।

এই বিষয়ে ইউনেস্কোর মহাপরিচালক খালেদ এল-এনানি উদ্বেগ প্রকাশ করে স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "যুদ্ধের সম্মুখসারিতে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের প্রাণহানির ঘটনা বাড়ছে। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই হত্যার জন্য দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে না।"

অন্যদিকে সংঘাতপূর্ণ এলাকাগুলোতে সাংবাদিক হত্যার বিচার না হওয়ার প্রবণতা প্রায় ১০০ শতাংশের কাছাকাছি বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া এক বক্তব্যে বলেন, "গত এক বছরে অন্তত ৩৪ জন সাংবাদিক প্রাণ দিয়েছেন। এ ধরনের হত্যার প্রতি সাতটির মধ্যে ছয়টিরই বিচার হয় না। সংঘাতপূর্ণ এলাকায় দায়মুক্তির হার প্রায় ১০০ শতাংশের কাছাকাছি।"

তিনি আরও স্মরণ করিয়ে দেন, "সত্য তুলে ধরার জন্য বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে। সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু করা এবং তাদের প্রতিবেদন বন্ধ করে দেওয়া শেষ পর্যন্ত পুরো সমাজকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।"

ভৌগোলিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪-২৫ সালে আরব অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি ৯৭ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ফিলিস্তিনে নিহতের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এছাড়া আধুনিক যুদ্ধের কৌশল হিসেবে ড্রোন হামলা এখন সাংবাদিকদের জন্য এক নতুন প্রাণঘাতী হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে নিহত সাংবাদিকদের প্রায় ৪০ শতাংশই ড্রোনের মাধ্যমে করা হামলার শিকার হয়েছেন। তবে ইতিবাচক দিক হলো, সংঘাতহীন শান্ত অঞ্চলে সাংবাদিক হত্যার বিচারহীনতার হার আগের চেয়ে কিছুটা কমে ৭৭ শতাংশে নেমে এসেছে।

প্রতিবেদনে নারী সাংবাদিকদের প্রতি ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির বিষয়টিও উঠে এসেছে। সশস্ত্র সংঘাতের অঞ্চলে ২০২৪-২৫ মেয়াদে নিহত ১৪ জন নারী সাংবাদিকের মধ্যে ১৩ জনই প্রাণ হারিয়েছেন যুদ্ধের মধ্যে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ৭৫ শতাংশ নারী সাংবাদিক বর্তমানে অনলাইন ও সরাসরি নানা ধরনের হয়রানির সম্মুখীন হচ্ছেন। সার্বিক পরিস্থিতিতে সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ২০১৫ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত ২২২২ নম্বর প্রস্তাব কঠোরভাবে বাস্তবায়নের জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর প্রতি বিনীত আহ্বান জানান।


সংবাদ

সম্পাদক ও প্রকাশক
আলতামাশ কবির

নির্বাহী সম্পাদক
শাহরিয়ার করিম

প্রধান, সংবাদ ডিজিটাল
রাশেদ আহমেদ


কপিরাইট © ২০২৬ | সংবাদ | সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত